0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in


ধারাবাহিক


গার্ড (অনুবাদ গল্প) 
নন্দিনী সেনগুপ্ত 



৭ 

লেনার যাবার কথা শুনে ঠীল ঘুমন্ত অবস্থাতেই আরেকটু হলে লাফ দিয়ে উঠছিল। অতিকষ্টে আধাবোজা চোখে সে বিছানায় পড়ে রইল। 

‘এইটাই সময়’... লেনা বলে যাচ্ছিল... ‘বেশি দেরি করা যাবেনা। এর মধ্যেই আলু বুনে ফেলতে হবে। সারাদিন তো লেগেই যাবে কাজ সারতে, ... সেইজন্য বাচ্চাগুলোকে সঙ্গে নিয়েই যাবো।’ ঠীল দুর্বোধ্য ঘুমজড়ানো গলায় একটু আধটু প্রতিবাদ জানাচ্ছিল, কিন্তু সেসবে লেনা কর্ণপাত করছিলনা। সে পিছন ফিরে রাত্রিবাস পরতে ব্যস্ত ছিল। ঠীল তার চকচকে বক্ষাবরণীর লেসটা দেখতে পাচ্ছিল। 

হঠাৎ লেনা কোনও এক অজ্ঞাতকারণে পেছন ফিরে ঠীলের আধশোয়া চেহারাটা দেখে চমকে উঠল। ঠীলের মেটেরঙা মুখমণ্ডল যেন এক অদ্ভুত রাগে বেঁকে উঠেছে। তার একটা হাত বিছানার ধারে এগিয়ে এসেছে; উদ্যত যেন কোনও আসন্ন সংঘাতের প্রস্তুতিতে। 

‘ঠীল’... ভয় এবং রাগমিশ্রিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল লেনা। নিশিপাওয়া মানুষকে নাম ধরে ডাকলে যেরকম ভাবে তার সম্বিৎ ফিরে আসে, ঠীলেরও ঠিক সেরকম একটা কিছু হল। সে তাড়াতাড়ি তার কণ্ঠনির্গত দ্বিধাজড়িত প্রতিবাদী শব্দগুলোকে একদম চুপ করিয়ে বালিশে মাথা রেখে নিজের গলা অবধি কম্বল টেনে দিল। 

ভোরবেলায় লেনা সবার আগে ঘুম থেকে উঠে সব প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কোনও চেঁচামেচি না করেই সে ঠিকঠাকভাবে সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছিল। ছোট বাচ্চাটিকে তার ঠেলাগাড়িতে বসানো হয়ে গিয়েছিল। টোবিয়াসকে জাগিয়ে, তাকেও জামাকাপড় পরানো হয়ে গিয়েছিল। কোথায় যাচ্ছে এটা জানতে পেরে টোবিয়াসকে একবার অন্তত হাসতে হবেই। সব প্রস্তুতি সারা হয়ে যাবার পর যখন টেবিলে কফি দেওয়া হল, তখন ঠীল ঘুম থেকে উঠল। যাবার জন্য সবাই তৈরি, এটা দেখে তার খুব অস্বস্তি হতে লাগল। তার এতটুকু ইচ্ছে ছিল না যে তার কাজের জায়গায় সবাই যায়। মনে মনে সবার যাওয়া পণ্ড করে দেবার একটা ইচ্ছে জাগছিল, কিন্তু সে ভেবে পাচ্ছিল না যে কীভাবে সেটা সম্ভব? কীভাবে... লেনাকে কোন কথা বলে, কোন কারণটা দেখিয়ে আটকে রাখবে সে? 

ধীরে ধীরে ঠীল নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করতে লাগলো। সে মনকে বোঝাতে লাগল যে বাচ্চাদের নিয়ে বেশ একটা ঘোরাঘুরি তো হবে, আর কিছু হোক না হোক। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাবার সময় তার অস্বস্তি অনেকখানি কেটে গিয়েছিল, মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। জঙ্গলের নরম কাদাবালি মাখা জমির মধ্য দিয়ে বাচ্চার গাড়িটা ঠেলতে অসুবিধে হলেও সে সেটা বেশ প্রফুল্লমনে করছিল। গাড়ির পেছনের খোপটা ভরে উঠছিল জঙ্গল থেকে টোবিয়াসের তুলে নিয়ে আসা নানা রঙের ফুলের গুচ্ছে। 

টোবিয়াস ভীষণ ভীষণ খুশি ছিল। কান ঢাকা বাদামিরঙের টুপি পরে লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছিল জঙ্গলের ফার্নে ঢাকা সবুজ ভেলভেট জমির উপর দিয়ে। কাচের মত চকচকে স্বচ্ছ ডানাওয়ালা ফড়িঙ, যেগুলো এদিক ওদিক উড়ছিল, মাঝে মাঝে সে তাদের পেছন পেছন দৌড়ে বেড়াচ্ছিল। 

জমিতে পৌঁছে লেনা জমিটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল জমিটা। বীজ হিসেবে ব্যবহার করবে বলে যে আলুর টুকরোগুলো লেনা নিয়ে এসেছে, সেটা ভর্তি বস্তাটা রেখে দিল ছোট বার্চ গাছের চকচকে কাণ্ডের গায়ে। হাঁটু গেঁড়ে জমিতে বসে সে দুই হাত দিয়ে ছানতে লাগলো জমির কালচে রঙের বালি- মেশানো মাটি। 

-‘জমিটা কেমন?’ ঠীল খুব ভালোভাবে লেনাকে লক্ষ্য করতে করতে ছুঁড়ে দিল প্রশ্নটা। 

-‘ভালো, ভালো... আমাদের নদীর ধারের জমিটার মতই ভালো!’ ... লেনার উত্তরে ঠীলের কাঁধ থেকে যেন পাষাণভার নেমে গেলো। তার মনে ভয় ছিল যে হয়তো বা লেনার জমিটা পছন্দ হবেনা; সেই চিন্তা থেকে সে বার বার নিজের মাথামুখ চুলকে যাচ্ছিল। 

তাড়াতাড়ি একখানা পুরু রুটির টুকরো গলাধঃকরণ করে লেনা কাজে লেগে পড়ল। উপরের মোটা জ্যাকেটটা খুলে রেখে, মেশিনের মতো দ্রুতগতিতে লেনা মাটি কোপাতে শুরু করল। মাঝেমধ্যে সে একটু সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল আর হাঁপাতে হাঁপাতে জিরিয়ে নিচ্ছিল; তবে সেটুকু এক দুই মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই আবার প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় ফিরে যাচ্ছিল কাজে। মাঝে এক দুবার ছোট শিশুটিকে স্তন্যদান করেছিল তার ঘামে ভিজে যাওয়া বক্ষাবরণী সরিয়ে। 

‘আমাকে একটু দূরে যেতে হবে, আমি টোবিয়াসকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম!’ কিছুক্ষণ পরে কেবিন থেকে চেঁচিয়ে ঠীল লেনাকে বলে উঠল। 

‘যাচ্চলে, তাহলে ছোট বাচ্চাটার কাছে কে থাকবে?’ লেনা দ্বিগুন জোরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘তুমি ফিরে এসো!’ কিন্তু তার আওয়াজ বোধহয় ঠীলের কানে পৌঁছালো না। সে টোবিয়াসকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলল। একমুহূর্তের জন্য লেনা ভেবে পাচ্ছিল না যে সে কি করবে? দৌড়ে গিয়ে ঠীলকে আটকাবে? নাহ... তাতে খামকা সময় নষ্ট হবে। 

ঠীল টোবিয়াসকে নিয়ে রেলের ট্র্যাক বরাবর হাঁটতে লাগলো। টোবিয়াসের কাছে সবকিছু নতুন। তার উত্তেজনা এখন বিস্ময়ের সীমা অতিক্রম করেছে। সে বুঝতে পারছিল না রোদ্দুরে গরম হয়ে থাকা কালো রঙের ধাতব সরু রেলের ট্র্যাকটা আসলে কি! এটা কেন এভাবে পেতে রাখা আছে! সে নানারকমের অদ্ভুত প্রশ্ন করে যাচ্ছিল। সে সবচেয়ে অবাক হয়েছিল টেলিগ্রাফের তার দেখে এবং তার আওয়াজ শুনে। ঠীল এই আওয়াজের খুঁটিনাটি সবকিছু চেনে, প্রতিটা সিগন্যাল তার জানা। এই আওয়াজ থেকেই সে বলে দিতে পারবে যে ট্রেন কোন রুট ধরে যাবে- আসবে। 

ঠীল ছেলের হাত ধরে মাঝেমধ্যেই দাঁড়িয়ে পড়ছিল জঙ্গলের দিক থেকে ভেসে আসা আওয়াজ শুনবার জন্য। গাছের পাতার মর্মরধ্বনি, ঝিঁঝিঁপোকার আওয়াজ, সবকিছু মিলিয়ে যেন চার্চের সম্মিলিতকণ্ঠের উপাসনাসঙ্গীতের মত শোনাচ্ছিল। জঙ্গলের দক্ষিণপ্রান্তে এক অদ্ভুত অনুরণন ওঠে, সেটা ঠীল বহুদিন ধরে লক্ষ্য করেছে। এই সমস্ত স্বরের সংমিশ্রণ তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত ভাব জাগিয়ে তোলে সেটা সে জানে। সে চার্চে গিয়ে যেভাবে ঈশ্বরের সাথে একাত্মবোধ করে, এই জায়গায় এলেও তার সেরকম মনে হয়। সবকিছুকে ছাপিয়ে এক অদ্ভুত ধ্বনি উঠতে থাকে মাটি, আকাশ, জঙ্গলকে ঘিরে; এই ধ্বনি তাকে তার প্রিয়তমা প্রথমা স্ত্রীর কথা মনে করিয়ে দেয়। আজও যেন ঠিক সেরকম হচ্ছিল তার। সব ধ্বনির মাঝে সে শুনতে পাচ্ছিল তার প্রিয়তমার মিষ্টি কণ্ঠস্বর। আবেগে তার চোখ ছলছলিয়ে উঠছিল। 

টোবিয়াস বারে বারে রাস্তার ধার থেকে ফুল তুলতে চাইছিল। ঠীল রাস্তায় দাঁড়াচ্ছিল না বলে টোবিয়াসের ইচ্ছে পূর্ণ হচ্ছিল না। আকাশীরঙের অজস্র ফুলের গুচ্ছ এমনভাবে ফুটে আছে যে মনে হচ্ছিল আকাশের একটা টুকরোকে কেউ জঙ্গলের জমির মধ্যে পেতে রেখে দিয়ে গেছে। রঙিন প্রজাপতির ঝাঁক নিঃশব্দে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল গাছের কাণ্ডের গায়ে গায়ে, ফুলের গুচ্ছের আশেপাশে। বার্চ গাছের মাথায় মাথায় খেলে যাচ্ছিল মৃদুমন্দ হাওয়া। টোবিয়াস দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছিল ফুল তুলবার জন্য। ঠীল ছেলের দিকে তাকিয়েছিল। কখনো আবার মাটির দিক থেকে তার দৃষ্টি উঠে যাচ্ছিল উপরের দিকে, যেখানে গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে ঠিকরে আসা আলোয় আকাশটাকে স্বচ্ছ উল্টানো স্ফটিকপাত্রের মতো  দেখাচ্ছিল। 

‘বাবা, বাবা, ওটা কি? তুমি যে ভগবানের কথা বল সবসময়... ওটাই কি ভগবান?’ টোবিয়াস পাইনগাছের গুঁড়ির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা একটা কাঠবিড়ালীর দিকে আঙুল তুলে বলে উঠল। 


(চলবে) 

[গেরহার্ট হাউপ্টমান রচিত ‘বানভ্যার্টার ঠীল’ গল্প অবলম্বনে রচিত] 

0 comments: