1

ওবাড়ির চিঠি - শতরূপা দত্ত

Posted in


ওবাড়ির চিঠি


অধুনা ঋতবাক আপনাদের সকলের নিঃশর্ত সক্রিয়তায় একটি যথার্থ আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সংগঠন। এর পাঠক, লেখক, শুভানুধ্যায়ীরা প্রকৃত অর্থেই বিশ্বনাগরিক।

প্রবাসী বাঙালিরা যেমন দূরে বসে বাঙলার মাটির টান ইন্দ্রিয়ে অনুভব করেন, তেমনি কলকাতায় বসে আমরাও খোলা জানলার বাইরে আকাশের দিকে সতৃষ্ণ ইশারা মেলে থাকি। এই দুই বিপরীতমুখী অনুভূতির মধ্যে কিন্তু কোনও বিরোধ-সন্ত্রাস নেই, বরং এক অবিনাশী পারস্পরিক সম্ভ্রমবোধ আমাদের সাহিত্যের স্বাস্থ্যবৃদ্ধির মূল কারণ।

এই সংখ্যা থেকে আমরা শুরু করছি ‘ওবাড়ির চিঠি’ – বাঙলাদেশ থেকে স্বনামধন্যা সাংবাদিক-কলামলেখক শতরূপা দত্ত প্রতি সংখ্যায় আমাদের বাঙলাদেশের কথা শোনাবেন – ওখানকার সমাজ-সাহিত্য-জীবনের কথা – লেখক-সাংবাদিকের চোখ দিয়ে আমরা আমাদের স্বজনদের আরও নিবিড় করে পাবো। ভরসা, যথারীতি ঋতবাকের পাঠকদের আস্কারা।

শতরূপা দত্ত। বাঙলাদেশের একটি বেসরকারী চ্যানেল ‘সময় টেলিভিশন’এর অনলাইন জার্নালিস্ট। ১৯৮৩ সালের ২১শে অক্টোবর চট্টগ্রামে জন্ম। বাবা কবি স্বপন দত্ত, চট্টগ্রামের একটি দৈনিক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক। মা মায়া দত্ত শিক্ষিকা। ভারত সরকারের আইসিসিআর বৃত্তি নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাঙলায় অনার্স, তারপর যাদবপুর থেকে গণসংযোগ ও সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা। ২০০৯-এ দেশে ফিরে ‘একুশে টেলিভিশন’-এ অনুষ্ঠান ও সংবাদ বিভাগে চাকরি চলাকালীনই লেখালেখির শুরু। ইদানিং নিয়মিত কলাম লেখক ‘পূর্বকোণ’ ও অন্যান্য সংবাদপত্রেও।


পূর্বদিগন্তে সূর্যোদয় দেখেছিলেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ
শতরূপা দত্ত


রবীন্দ্রনাথ এমন একটি নাম, বাঙালির কাছে যাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। বাঙালির সুখ-দুঃখ, আবেগ-ভালোবাসায় এমন কোনো অনুভূতি নেই যা রবীন্দ্রনাথ স্পর্শ করেননি। রবীন্দ্রনাথের জন্ম-মৃত্যু অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে। দেশভাগের দুঃখ তাঁকে পেতে হয়নি। তিনি ছিলেন অবিভক্ত ভারতের কবি, দেশ-নির্বিশেষে বাঙালির একান্ত আশ্রয়।

কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৭-এ দেশবিভাগকারী দ্বিজাতি-তত্ত্বের অনুসারী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মদদপুষ্ট এক শ্রেণীর গোঁড়া রক্ষণশীল মানুষ তাঁকে ভারতীয় এবং হিন্দু কবি বলে প্রচার শুরু করেন। পূর্ব পাকিস্তানের রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রচার বন্ধ করা হয়। শিক্ষাঙ্গনে রবীন্দ্র-সাহিত্য চর্চাকে নিরুৎসাহিত করা হতে থাকে। তবে তখনকার সংস্কৃতিমনা প্রগতিশীল বাঙালি সরকারি রবীন্দ্র-নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো-আঙুল দেখিয়ে রবীন্দ্র-চর্চা অব্যহত রাখেন।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা বাধা দেয়। কিন্তু স্বৈরশাসনের রক্তচক্ষু-জেল-জুলুম-প্রবল বাধা সবকিছুকে উপেক্ষা করে সাড়ম্বরেই রবীন্দ্র শতবার্ষিকী পালন করা হয় পূর্ব পাকিস্তানে।

শিল্পী, প্রশিক্ষক, অধ্যাপক এবং সংগঠনকারী হিসেবে বাংলাদেশে রবীন্দ্র-চর্চার প্রতিটি পর্যায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছেন সনজীদা খাতুন। তিনি ডয়েছে ভেলে-কে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্র-বিরোধিতার সেই সময় সম্পর্কে বলেছেন, ‘‘একটা সময় এল যখন আমরা দেখতে পেলাম পাকিস্তান সরকার ঠিক চাইছে না যে রবীন্দ্র সঙ্গীত এখানে প্রচার হোক৷ রেডিওতে শুধু না, বাইরেও গাওয়া হোক এটা তারা চাইছিল না৷ কিন্তু সেটা যে তারা খুব স্পষ্ট করে বলতো এমনও নয়৷’’

রবীন্দ্র শতবর্ষ পালনের সময় থেকেই বাধাটা জোরালো হতে থাকে৷ সনজীদা খাতুন জানিয়েছেন, ’৬১ সালে যখন রবীন্দ্র শতবর্ষ হল, তখন তিনি একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপিকা৷ কাজেই বাইরের অনুষ্ঠানে তাঁর পক্ষে গান গাওয়া খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিল। শতবর্ষ উপলক্ষে ‘তাসের দেশ’নাটক মঞ্চায়ন করার সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে তাঁর গান গাইতে হবে৷ তিনি বলেন, মুখের মধ্যে একটা রুমাল পুরে দিয়ে আমি গান গেয়েছিলাম৷ কারণ আমার গলা চিনে ফেললে আমার সরকারি চাকরিতে অসুবিধা ছিল। তিনি জানান, মোনেম খাঁর লোকজন অনুষ্ঠানে বাধা দেবার জন্য এলে কৌশলে শিল্পীদের অনুষ্ঠানস্থল থেকে পালিয়ে যেতে হয়েছে। পরে মোনেম খাঁর পুত্র এবং অন্যরা এসে ভাঙচুর করেছে।

চিন্তাবিদ ও লেখক যতীন সরকার বলেছেন, ‘‘১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-বিরোধিতাকে প্রতিহত করতে গিয়েই আমরা রবীন্দ্র-সাহিত্যের অন্তরঙ্গ পরিচয় লাভে প্রবৃত্ত হই, রবীন্দ্রসঙ্গীতের মনোযোগী শ্রোতা হয়ে উঠি এবং তখন থেকেই দেশের সর্বত্র রবীন্দ্রচর্চার প্রসার ঘটতে থাকে।’’

তার ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ বাঙালির সমস্ত আন্দোলন-সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে থেকেছেন। সেদিন যেন নিষিদ্ধতার বেড়া ভেঙে বাঙালি আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরেছিল রবীন্দ্রনাথকে। তাই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিকামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করা, আন্দোলিত করা অধিকাংশ গানই ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশাত্মবোধক গান। অজস্র গণসঙ্গীত, কাজী নজরুল-অতুলপ্রসাদ-ডিএল রায়ের দেশের গানের পাশাপাশি সেদিন স্বাধীন বাংলার বেতারের শব্দসৈনিকরা দেশ স্বাধীনের হাতিয়ার হিসেবে গলায় তুলে নিয়েছিলেন বাঙালির চিরচেনা সেই অস্ত্র।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ এলেন জাতীয় সঙ্গীত হয়ে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের, নাকি আমাদের নন, অবসান ঘটলো সেই বিতর্কেরও। বাধাহীনভাবে রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠলেন আমাদের কবি। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথকে নতুন মাত্রায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করা হলো। প্রাবন্ধিক ও গবেষকদের কলমে উন্মোচিত হলো রবীন্দ্রমানসের বিচিত্র দিক। স্বাধীন বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথকে নানান অবস্থানে দাঁড় করিয়ে প্রমাণ করে দিলো- রবীন্দ্রনাথ আমাদের দূরের নন, কাছের মানুষ৷

পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলো বাংলাদেশে। আবারো পাকিস্তান আমলের মতোই সাম্প্রদায়িক মানসিকতার শাসকগোষ্ঠী ও তাদের তাঁবেদারদের দ্বারা আক্রান্ত হলেন রবীন্দ্রনাথ। তবে সুখের কথা, সেই অপশক্তি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চেতনার কাছে আবারো পরাজিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতি-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে আজ রবীন্দ্রনাথ অবিচ্ছিন্ন এক সত্তা।

যেভাবে আমরা রবীন্দ্রনাথকে দেখি, তা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনজাত নয়। তিনি উদার, অসাম্প্রদায়িক, এক কল্যাণকর মানবধর্মের বাণী শুনিয়েছেন। রবীন্দ্রচর্চার অন্যতম উপাদান তাঁর গানের চর্চা। রবীন্দ্র সঙ্গীতের চর্চা আজকের বাংলাদেশে শহুরে নাগরিকতার গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে মফঃস্বল শহরগুলোতেও। যেকোনো অনুষ্ঠানে-আয়োজনে আজো রবীন্দ্রনাথ বাঙালির শেষ আশ্রয়। রবীন্দ্রচর্চার প্রসারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও কম নয়।

বাংলাদেশের সাথে রবীন্দ্রনাথের সংযোগ বহুদিনের, সে সংযোগ প্রাণের, সে সংযোগ মাটির, সে সংযোগ কবিতার-গানের-গল্পের।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের বসতভিটা বাংলাদেশের খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ গ্রামে অবস্থিত। সেটি বাংলাদেশের একটি প্রত্নতাত্বিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ পঞ্চানন কুশারী পিঠাভোগের বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। পঞ্চানন কুশারীর উত্তরপুরুষ দুর্গানারায়ণ এবং গোপীমোহন জমিদারী কিনে জোঁড়াসাকোয় ঠাকুর এস্টেট প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৪ সালে পিঠাভোগে রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের নির্মিত কারুকার্যখচিত একটি ভবন খুলনার জনৈক ব্যবসায়ী ২ লক্ষ ২৪ হাজার টাকায় কিনে নেন। এরপর তিনি ভবনটি ভেঙে ফেলেন। একই বছরে দৈনিক ইত্তেফাক এবং আজকের কাগজে কবির আদি পুরুষের বাড়ি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে খুলনা জেলা প্রশাসক সেই বসতভিটা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। সরকারী উদ্যোগে পিঠাভোগে ৯.৩৫ একর জমির উপরে নির্মিত বসতভিটার খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ১৯৯৪ সালে ২৪ নভেম্বর পিঠাভোগে রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

খুলনা ও যশোর জেলার শেষ সীমানায় খুলনার ফুলতলা উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে দক্ষিণডিহি গ্রামটির অবস্থান। গ্রামের ঠিক মাঝখানে রয়েছে জমিদার বাড়ির বিশাল প্রাঙ্গণ। ওই বাড়িতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীর স্মৃতিধন্য দোতলা ভবন। এটাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি। কবির শ্বশুরবাড়ির প্রাচীন ভবনটিকে সংস্কার করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সেখানে স্থাপন করেছে দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘর।

ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে দক্ষিণডিহির সম্পর্ক নিবিড়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা সারদা সুন্দরী দেবীর জন্ম এই গ্রামে। রবীন্দ্রনাথের কাকিমা ত্রিপুরা সুন্দরী দেবীও দক্ষিণডিহির মেয়ে ছিলেন।

১৮৯১ থেকে ১৯০১, এই দশটি বছর প্রায় একনাগাড়ে রবীন্দ্রনাথ থেকেছেন শিলাইদহ, শাহজাদপুর আর পতিসরে, পিতার নির্দেশে জমিদারি দেখাশোনার কাজে। এসব অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে বিশ্বকবির স্মৃতি।

কুষ্টিয়ার শিলাইদহে ঠাকুর পরিবারের কুঠিবাড়ি। পদ্মাপারের কুঠিবাড়িটি ছিল কবির প্রিয় স্থান। বাড়ি-লাগোয়া ঘাটে বাঁধা থাকত বজরা। শিলাইদহের জমিদারি দেখভাল করতে এলে এ বাড়িতেই থাকতেন কবি। বাড়িটি এখন পরিণত হয়েছে বাঙালির তীর্থস্থানে। গড়ে তোলা হয়েছে জাদুঘর। কবির ব্যবহৃত আসবাবপত্র, নানা সামগ্রী আর আলোকচিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে দোতলা বাড়িটি।

কুষ্টিয়া শহরে রয়েছে ‘টেগোর লজ’, যা ব্যবহৃত হতো ঠাকুর পরিবারের ব্যবসাকেন্দ্রের ‘গদি’ হিসেবে। কবির জীবদ্দশায় যখন আর্থিক সংকট দেখা দেয়, তখন সিদ্ধান্ত হয় দোতলা এই বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়ার। বাড়িটির মালিকানা পরে আরো দুবার হাতবদল হয়। পরে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বাড়িটি তার সর্বশেষ স্বত্বাধিকারীর কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে কিনে নিয়ে জাদুঘরে রূপান্তরিত করে।

ইংরেজদের কাছ থেকে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরের কাচারী বাড়িটি কিনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, ১৮৪২ সালে। এটি একটি দোতলা ভবন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯০ সালের দিকে প্রথম শাহজাদপুরের এই কুঠিবাড়িতে আসেন এবং এখানে তিনি ১৯০১ সাল পর্যন্ত জমিদারী পরিচালনা করেন। বর্তমানে ভবনটি জাদুঘর হিসেবে সাধারণ দর্শকদের জন্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে। এখানে রয়েছে কবি রবীন্দ্রনাথ, শিল্পী রবীন্দ্রনাথ, জমিদার রবীন্দ্রনাথ, কৃষক বন্ধু রবীন্দ্রনাথের নানা বয়সের এবং নানা সময়ের বিচিত্র ভঙ্গির সব ছবি। রয়েছে তাঁর ব্যবহার্য আসবাবপত্র। আছে চঞ্চলা ও চপলা নামে তাঁর ব্যবহার করা দুটো স্পিডবোট, পল্টন, ৮ বেহারার পালকি, কিছু কাঠের চেয়ার, টি টেবিল, সোফাসেট, আরাম চেয়ার, পালংক ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস।

শাহজাদপুরের সঙ্গে কবির স্মৃতি জড়িয়ে আছে আরো একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর কবি দীর্ঘসময় এখানে ছিলেন। নোবেল পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি বড় অংশই তিনি এখানে ব্যয় করেন। শাহজাদপুর অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে পুরস্কারের টাকা ঋণ হিসেবে দেন।

তবে যতোদিন তিনি কুঠিবাড়িতে থেকেছেন, তার চেয়ে সম্ভবত বেশী থেকেছেন নদীতে ভাসন্ত তাঁর প্রিয় বজরা বা বোট ‘পদ্মা’য়৷ তাঁর জমিদারির এলাকার মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিলো নদীপথ৷ এই সূত্রেই নদীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম ঘনিষ্ঠ পরিচয়৷ এই অঞ্চলের নদী ও মানুষ তাঁর অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও চিন্তাচেতনাকে গভীরভাবে আলোড়িত ও আচ্ছন্ন করেছিল৷

শিলাইদহে বাস এবং শাহজাদপুর ও পতিসরে যাতায়াতের সময়গুলিতে রচিত হয় তাঁর সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কণিকা, ক্ষণিকা, কল্পনা, কথা, নৈবেদ্য, চিত্রাঙ্গদা, মালিনী, গান্ধারীর আবেদন, বিদায় অভিশাপ, কর্ণ-কুন্তী সংবাদ এবং এছাড়াও গল্পগুচ্ছের অনেকগুলি গল্প এবং ছিন্নপত্রের পত্রগুচ্ছ৷

রবীন্দ্রনাথের রচনায়, চিঠিপত্রে বাংলাদেশের যেসব নদী রয়েছে সেগুলো হলো পদ্মা, যমুনা, গড়াই, ইছামতী, বড়াল, নাগর, বলেশ্বরী, আত্রাই, হুড়োসাগর ইত্যাদি৷ শিলাইদহ থেকে শাহজাদপুর ও পতিসরের যাত্রাপথের বর্ণনায় তিনি লিখেছেন, ‘বোট ভাসিয়ে চলে যেতুম পদ্মা থেকে কোলের ইছামতীতে, ইছামতী থেকে বড়লে, হুড়ো সাগরে, চলনবিলে, আত্রাইয়ে, নাগর নদীতে, যমুনা পেরিয়ে সাজাদপুরের খাল বেয়ে সাজাদপুরে৷’

রবীন্দ্রনাথের মনকে অধিকার করে রেখেছিলো পদ্মা নদী৷ পদ্মার বিচিত্র চরিত্র ও বিচিত্র প্রবাহ তাঁর রচনায় বিভিন্নভাবে এসেছে৷ স্বীকার করেছেন‘বাস্তবিক, পদ্মা নদীকে আমি ভালবাসি ... আমি যখন শিলাইদহ বোটে থাকি, তখন পদ্মা আমার কাছে স্বতন্ত্র মানুষের মতো।’

১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে সে বছরই ৩০ মে নাইটহুড উপাধি ফিরিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথ। এবছর সেই সাহস দেখানোর একশ বছর। সে সাহস সেদিন যেমন এক ঝটকায় ভারতের স্বাধীনতাকামী মানুষের সাহসও অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছিল, তেমনি পরবর্তীতে যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে এই বাংলার বাঙালিকে এবং বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের পথ দেখিয়েছে।

মানুষের শক্তির প্রতি যে অবিচল আস্থা কবি রেখেছিলেন, তা ভবিষ্যৎকালের বাঙালি জীবনের শক্তি ও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে।’ ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবি কি সেদিন দেখতে পেয়েছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে? দেখতে পেয়েছিলেন পূর্বদিগন্তে স্বাধীনতার আলো ছড়িয়ে দেবেন হিমালয়ের মতো উঁচু এক মহামানব? আমরা সেই মহামানবের ডাক শুনেছি, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, সেদিনের পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনারণ্যে-‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’’ তাই কি আমাদের রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘অপেক্ষা করে থাকব, সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে এসে শোনাবে এই পূর্বদিগন্ত থেকেই’?

1 comment:

  1. এই নতুন কলামটির জন্য ঋতবাক কে ধন্যবাদ।

    ReplyDelete