0

ধারাবাহিক - সুবল দত্ত

Posted in


ধারাবাহিক


প্রতিস্রোত
সুবল দত্ত


॥২০॥ 


পেরো শ্বেততপ্ত নিদাঘ দুপুরে সবার অবসাদের সুযোগে/অনেক উঁচু থেকে নেমেছে বিড়াল 





অনেকগুলো ঢাকের দামামা গুঞ্জন খুব অস্পষ্ট হলেও তার বোল পেরো পরিষ্কার ধরতে পারলো। এই কদিনে তার দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি অসম্ভব তীক্ষ্ণ হয়েছে। এমনিতেই এখানের হাওয়া ও ভেষজ ওষুধের গুণে মানুষদের প্রখর ইন্দ্রিয় শক্তি। ঢাকের বোল যে তারই নিজস্ব ঘরানার ও কোন প্রান্তের কোন বাজিয়ে বাজাচ্ছে এখন পেরো তা বলে দিতে পারে। একসময় ধামসা বন্ধ হলো। ঢাকের ভাষা অনুযায়ী অঞ্চলবাসীদের বলা হয়েছে দুধঝর্ণার জল যেখানে গড়িয়ে পড়ছে অনেক নিচে একটা বিশাল খাদে,সেই বিশাল খাদ শুরু হওয়ার ঠিক আগে পাহাড় প্রমাণ চ্যাটালো পাথরের পিছনে সবাই সূর্য মাথার উপর থাকতে থাকতেই যেন চলে যায়। সেখানে যে একটা সুড়ঙ্গমুখ আছে সেটা কেউই জানেনা। পেরো সেখানে বেশ কয়েকবার গেছে মধুর খোঁজে কিন্তু কখনো দেখতে পায়নি। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়াল।গুহামুখ এমনভাবে গুপ্ত রয়েছে,কারোর দ্বারা খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই। এখন ওরা সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে সেখানে যাচ্ছে ওদের আনতে। জোহা বলেছে বহুদিন আগে একজন গোরা মানুষকে আহত অজ্ঞান অবস্থায় এই বিরল প্রান্তে আনা হয়েছিল। তাকে সুস্থ করে আবার দুধ ঝর্ণার পাশে ওই খোলা ময়দানে পৌঁছে দিয়ে এসেছে এখানের মানুষ। কিন্তু তাকে এমন ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল যে সে এখানের ঘটনা ও দৃশ্য তার স্মৃতি থেকে লোপ পেয়ে যায়। পেরো ভাবল, জোহা কি তাকে সেরকম কিছু ওষুধ ওর খাবারের সাথে মিশিয়েছে? হতে পারে। আচ্ছা,ওই গোরা মানুষটি গুরুজী গোরাচাঁদ নয়তো? সে যাক। এখন সেই গুপ্তসুড়ঙ্গ দিয়ে এখন সে চলেছে তার প্রান্তিক মানুষদের এই বিরল স্বর্গে নিয়ে আসতে। আশ্চর্য এখানের মানুষজন। কত উদার কত মহাপ্রাণ। এরা ওই নিপীড়িত মানুষদের শুধু রক্ষাই করতে চায়না ওদের একটা তাত্ক্ষনিক বিবর্তন চায়।যাতে করে ওইসব মিথ্যে মানবিক চামড়ায় মোড়া সভ্য মানুষদের সামনে আমার জংলী কালো অনুন্নত আদিম জনজাতি ভাইয়েরা দেবদূতে রূপান্তরিত হয়ে দাঁড়াতে পারে। পেরো কল্পনার চোখে দেখতে পেল,শয়ে শয়েতার প্রান্তিকভাইয়েরা লাইন দিয়ে শহরের রাজপথে মার্চ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। ওদের যাত্রাপথ থেকে শহরের মানুষেরা সসম্ভ্রমে সরে দাড়াচ্ছে। সারাপৃথিবীর খবরে ছাপছে এক নতুন উন্নত তর জনজাতির উদয় হয়েছে পৃথিবীতে। নীরোগ বলিষ্ঠ নির্ভয় ও আত্মনির্ভরশীল।এইসব ভাবতে ভাবতে পেরোর চোখ থেকে ঝরঝর করে জল ঝরতে লাগল। দুহাতদিয়ে মুখ ঢেকে অশ্রু মুছে ফেলল। জোহা দেখতে পেলে এক্ষুনি দৌড়ে এসে চোখের জল চেটে খেয়ে ফেলবে। পুরুষের অশ্রুপাত ও মোটেই সহ্য করতে পারেনা। পিছন ফিরে দেখে জোহা অনেকটা দূরে ওদের মুখিয়ার সাথে কথা বলতে বলতে আসছে। 

বিশাল পদ্মপুকুর পার হতে হতে দেখল অসংখ্য নীলপদ্ম ফুটে রয়েছে। আর প্রচুর সবুজ পদ্মফল। পাড়ে সারি সারি কলাগাছে ঝুলে আছে বিঘত প্রমাণ কলার কাঁদি। তার পিছনে মহুল গাছের ঘন বন। পদ্মের ও মহুল ফুলের মিশ্র সৌরভ ম ম করছে চারদিক। মহুল গাছে ঝুলে আছে প্রচুর মৌচাক। পদ্মপুকুরে মৌমাছির ঝাঁক এক একবার উড়ে উড়ে বসছে পদ্মফুলে পরক্ষনেই সেখান থেকে একটা সুন্দর নকশার আকারে ঝাঁক তৈরি করে উড়ে বসছে মহুল গাছে ঝোলা মৌচাকে। পদ্মমধু কলা পদ্মবীজ বনখেজুর পুকুর ভর্তি মাছ কত অমৃতই না আছে এখানে। প্রান্তিক ভাইয়েরা এখানে কয়েকদিন থাকলে তাদের কি আর খাবারের অভাব হবে? তিন রাজ্যের ত্রিসীমানার ভিতরে দেশের অনধিকার অঞ্চল শিমুলিয়া। তার মাটির নিচে তপ্ত বিষময় লোভের খনিজ।তার উপরে বিকাশহীন অর্ধ উলঙ্গ ভীতু বোধবুদ্ধিহীন কালো জংলী ভাইয়েরা বাসকরে।তারা এখনো জ্ঞানের আলো দেখেনি। জেরেকা প্রাণ দিয়ে সেই চেষ্টাই করেছে। জানিনা ও এখন বেঁচে আছে কি না। পেরোর বুক ঠেলে আবার আবেগ উথলে উঠলো। জেরেকা তার গর্ভ ধারিণী মা। কিন্তু মনে হচ্ছে ওর যত জনজাতি ভাইয়েরা নিজেদের জীবনের পরোয়া না করে ধামসার একটি সংকেত আদেশে ঘর দুয়ার ছেড়ে এক অচিন গুপ্তস্থানে জমায়েত হচ্ছে, ওরা নিশ্চয় জানে এই অমোঘ আদেশটি তাদের মায়ের। জেরেকা যে তাদেরও মা ! আশ্চর্য ! এই সরল সত্যিকথাটা আগে কেন মনে হয়নি? স্থানবিশেষে বুদ্ধি বিদ্যা জ্ঞানের তারতম্য হয় কি? নিশ্চয় হয়। সুড়ঙ্গের এপারওপার মাত্র। এইপারে মানুষজন ফর্সা শক্তিশালী পরহিতকারী বিপদ থেকে রক্ষাকর্তা ও জ্ঞানী। ওপারে নিষ্ক্রিয় নির্বোধ রোগগ্রস্ত বোধহীন মানুষ। অথচ দুই ক্ষেত্রের মানুষের মাতৃভাষা এক। এটা কেমন করে হয়?অথচ এটা নিষ্ঠুর সত্য। এটা মাটির মহিমা। পেরো ভাবে। 

সুড়ঙ্গমুখ পৌঁছাতে অনেকটা হাঁটতে হলো। অনেকগুলো টিলা অন্ধকারময় জঙ্গল উঁচু পাহাড়ের মাঝে গিরিখাত। পেরো হাঁটতে হাঁটতে খুব মনোযোগ দিয়ে রাস্তা চিনতে লাগলো। আশ্চর্য! এতদূর হেঁটে এলো এতো সময় ধরে,অথচ পেরো উঁচু পাহাড় থেকে পড়তে পড়তে কতো কম সময়ে এই যায়গায় পৌঁছে গেছিল ! কোথায় সেই পাহাড়? পেরো আতিপাতি করে খুঁজতে লাগলো কিন্তু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলো না। জঙ্গলের স্বভাব পেরোর চেনা। জঙ্গলের মানুষ ছাড়া যেকোনো মানুষকে জঙ্গল বিশ্বাসঘাতকতা করে। পেরো যেমন যেমন এগোচ্ছিল প্রকৃতি পরিবেশ ভিন্ন থেকে ভিন্নতর হচ্ছিল। একই রকম গাছপালা সেই শাল আসন করঞ্জ গাম্হার সেগুন কিন্তু তাদের রঙ ঢং মাইল দুই পর পর আলাদা হয়ে যাচ্ছে। পাখিদের ডাকও কেমন এলোমেলো কর্কশ। প্রকৃতিই যখন রূপ বদলায় তো মানুষের চরিত্র তো বদলাবেই ! এই অজানা সূক্ষ্ম অনুভবে পেরোর গা শিরশির করে উঠল। যে জায়গা সে ছেড়ে এসেছে সেখানে বেঁচে থাকার লড়াই নেই। নিজে বাঁচার চেষ্টা কেউই করেনা। ওরা সবাই একে অপরের জন্য বাঁচে। তাদের বাঁচার গন্ডি বড়। তাই গণ্ডির ভিতরে ভয় ও হিংসা স্বার্থপরতা ঢোকেনা। 

ওরা হাঁটতে হাঁটতে একটা বিশাল উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে পাহাড়ের খাড়া দেওয়ালের সামনে থামলো। পাহাড়ের গায়ে লম্বা ঘন লতার ঝুরি নেমেছে। স্বর্ণলতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে রাশি রাশি নানা রঙের বুনো ফুল। এতো সুন্দর যে যেকেউ মোহিত হয়ে সেই লতানে ফুলের ডিজাইন দেখতেই থাকবে। বুঝতেই পারবেনা এই লতাঝুরির পিছনে আছে এক লুকোন বহির্গমন পথ। জোহা এগিয়ে এসে ঝুরির ভিতরে হাত ঢুকিয়ে একটি হলদে গোলাপী ফুলের লতা টেনে বার করলো। সেটা টানতেই স্বর্ণলতার গোছা একটু সরে গিয়ে পাহাড়ের একফালি খোলামুখ দেখা গেল। জোহা দুহাতে লতাঝুরি ফাঁক করে তার ভিতরে ঢুকে গেল। একে একে ওইভাবে সুড়ঙ্গমুখে প্রবেশ করল। 



0 comments: