0

স্মৃতির সরণী - বিপুল দাস

Posted in


স্মৃতির সরণী


কথামালা
বিপুল দাস



পাহাড়তলিতে ‘অ্যান্টিবায়োটিক’ নামে একটা গল্প লিখেছিলাম। অনেকে এখনও গল্পটার কথা বলে। নিখিলের মতো খুঁতখুঁতে মানুষও বলেছিল – মন্দ হয়নি। ওই গল্পটিই আমার গল্পের জগতে যাত্রার সবুজ সংকেত। ওই গল্পটাই পেছনে লাথ মেরে আমাকে অপার দুঃখের জগতে ঠেলে দিয়েছে। পরে আমি বেশ কিছুদিন নাটক নিয়ে, এবং প্রায় কুড়ি বছর সেতার নিয়ে রগড়েছি। শেষে আবার গল্পের কাছে ফিরে এসে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছি। মাঝের সময়টা লেখালেখি করেছি, কিন্তু অনিয়মিত ভাবে। টেনশন ছাড়া। ওভাবে লেখা হয় না। দু”টি অসমতল তলের ঘর্ষণ ছাড়া, সংশয় ছাড়া, নিজেকে সিংকটাপন্ন করে তুলতে না পারলে লেখা যায় না। এ সত্য আমাকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর কাছে আর সিরাজদার কাছে আমি জীবন ও শিল্প-বিষয়ক অনেক গূঢ় কথা জেনেছি।

আমার বাড়ি শিলিগুড়ি। উত্তরবাংলার এই মফস্‌সল শহরে আমার জন্ম। আমি বড় হয়েছি তিস্তা, তোর্সা, মহানন্দা। করতোয়ার ভিজে বাতাসে। নদীপারে কাশবনের দোলা আর উত্তরে তাকালেই দা গ্রেট হিমালয়ান রেঞ্জ। পাহাড় পরিষ্কার থাকলেই ভোরে দেখতে পাই কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র মুকুটে একরকম লাল, আবার বিকেল গড়ালে সেখানে কেমন দুখি লাল। আমার অস্তিত্ত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মইষাল বন্ধুর গান, চা-বাগানের কুলি-লাইনের গল্প, বৈকুণ্ঠপুর ফরেস্টের আর মহানন্দা স্যাংচুয়ারির গাঢ় সবুজ গন্ধ। উত্তরের দারুণ বর্ষা আর কনকনে শীত। শালশিমুলজারুলখয়েরের ছায়ায় আমার বড় হয়ে ওঠা। মানুষের চৈতন্যে অবিরত রেকর্ডিং হতে থাকে ছড়ানো-ছেটানো এই সব উপাদান। সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে শুষে নেওয়া এই সব উপকরণ যেন একটা আর্কাইভে জমা হতে থাকে। বস্তুত, প্রায় তখনই ঠিক হয়ে সে কী লিখবে, কাদের নিয়ে লিখবে। এই কারণেই আমার গল্পে বারে বারে তিস্তা নদী এসেছে, কাঠমাফিয়াদের কথা এসেছে, ভাওয়াইয়া ও রাজবংশীদের কথা এসেছে। বহুদিন আগে দেখা ডুয়ার্সের বাসে একজন ভুটিয়া রমণীর নাকে সোনার নথের ঝিকমিক মগ্ন-চৈতন্যে নিহিত থাকে। ধুপগুড়ির রোদ্দুর আর ওই নথের ঝিলিক নিয়ে একটা গল্প তৈরি হয় আমার মগজে। স্কুলে পড়ার সময় পিকনিক করতে গিয়ে সেভোকে করোনেশন ব্রিজের ওপর থেকে একমুঠো পাহাড়ি ঝাউপাতা ফেলে দিয়েছিলাম তিস্তার জলে। এই নদী বাংলাদেশে জলে গেছে। এখন বয়স যখন হেলে পড়েছে অড সাইডে, একটা গল্প তৈরি হতে চায়, যার নাম হতে পারে – মনোয়ারা বেগমের প্রতি শুভেচ্ছা।

ষাটের দশক চলছে। পাহাড়তলির শহর শিলিগুড়ি তখন নেহাতই এক অর্বাচীন শহর। বড়সড় একটা গঞ্জ থেকে ক্রমশ শহর হয়ে উঠছে। নাগরিক ব্যাধি তখনও তার শরীরে রোগজীবাণু ছড়িয়ে দেয়নি। শহড়জুড়ে নারকেলসুপারি, আমজাম, শিরীষ, দেবদারু গাছ ছড়িয়ে আছে। হাইরাইজ কাকে বলে, প্রোমোটার কাকে বলে, এগ-রোল কিংবা পার্লার কাকে বলে – শিলিগুড়ি জানে না। গ্রামীন সারল্য এবং লাবণ্য ছিল শিলিগুড়ির অন্তর এবং বহিরাবরণে। তখন উত্তরে তাকালেই কাঞ্চনজঙ্ঘা, তখন মহানন্দার জল ছিল সত্যি কাকচক্ষু। ওপর থেকে পরিষ্কার দেখা যেত টলটলে জলের নীচে নুড়িপাথরের গড়িয়ে চলা। পুবে জনপদ শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে যেত বৈকুণ্ঠপুর ফরেস্টের ঘনসবুজ। সেদিক থেকে শহরের দিকে উড়ে আসত টিয়াপাখির ঝাঁক। শহরে বেশির ভাগ বাড়ি ছিল তরাই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য মেনে কাঠের খুঁটির ওপর মাটি থেকে অন্তত চারফুট উঁচুতে কাঠেরই ঘর। তখনও কাঠা অত আক্রা হয়নি এ শহরে। তখনও রাতে গাড়ির হেড-লাইট নিভিয়ে লোভের ট্রাক চকচকে করাত নিয়ে লুঠ করত না জঙ্গলের শালশিমুলসেগুনশিশুর দীর্ঘ বনস্পতি।

এই সব লাবণ্য, সবুজ ঘ্রাণ, পাহাড়ি নদীর ছন্দ, ছোট শহরের মানুষের আন্তরিক আত্মীয়তার উষ্ণতা ঘিরে রেখেছিল আমাদের। 

মহানগরের দুষ্ট ক্ষতগুলো তখনও শিলিগুড়িকে আক্রমণ করেনি। বাতাস তখনও অনেক পরিষ্কার। শহরে ধুলো কম, অক্সিজেন বেশি। মোমো আসেনি, মিষ্টির দোকানগুলো তখনও বাঙালি ব্যবসায়ীদের হাতে। পরিষ্কার-পরিছন্ন ছোট্ট শহর। ট্রেন চলে না, কিন্তু শহরের মহাধমনি হিলকার্ট রোডের ওপরে তখনও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়েজের ন্যারোগেজ লাইন পড়ে আছে। পরে সেগুলো তুলে ফেলা হবে। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন হব-হব করছে। পুরনো টাউন স্টেশনের যৌবন ঢলে পড়লেও তার চ্ছটা রয়েছে। তখনও উত্তরে তাকালে শহরের মানুষ দেখতে পায় কাঞ্চনজঙ্ঘায় রক্তরাগ। বিধান মার্কেট সবে শুরু, হংকং মার্কেট চালু হয়নি। অশ্রুকুমার সিকদারের নাম বিরল-উচ্চারিত। আমরা নবোত্থিত-শ্মশ্রু সদ্য-তরুণ কিছু যুবা বয়সের দোষে দু’ছত্তর কবিতা লিখে ফেলেছি। বুদ্ধদেব বসু, সুধীন দত্ত, জীবনানন্দের তিন ছত্তর পড়েও ফেলেছি। অশ্রু সিকদারের নাম অস্পষ্ট কানে আসছে। কে একজন বলল –অশ্রুবাবুর দাঁত দেখা যায় না। আমার বিশ্বাস হয়নি। কোনও মানুষ কখনই হাসেন না, তাই আবার হয় নাকি। পরে সাক্ষাৎ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, উক্ত ধারণা হাইপোথেসিস মাত্র। আমরা ক’জন বন্ধু বেশ কয়েক বার দূর থেকে সৌম্য, শান্ত, একটু ওজনদার চাউনির ধবধবে ধুতিপাঞ্জাবিপরিহিত অধ্যাপককে দূর থেকে দেখে শিহরিত, মনে হয়েছিল একেই বলে অধ্যাপক। আর, বাংলা সাহিত্যের এ রকম একজন ওস্তাদ আমাদের শহরে থাকেন, এটা যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। মাঝে মাঝেই বাবুপাড়ায় তাঁর বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের মনে হতো কিছু একটা রেডিয়েশন বোধহয় আমাদেরও স্পর্শ করে গেল।

টাউন স্টেশনের ওভারব্রিজ থেকে রোজ একটা দু’টো তক্তা কমে যায়। আমরা রেল-ক্যান্টিনে আড্ডা মারতে মারতে পরিকল্পনা করি স্যারের বাড়িতে একদিন দেখা করতে যাব। আলোচনা এর বেশি আর এগোয় না। এদিকে টাউন স্টেশনে কুলি কমে যাচ্ছে, এন জে পি-তে বাড়ছে। শহরে পুরনো লোক কমে যাচ্ছে, আনকো লোক বাড়ছে। হঠাৎ একদিন দেখি প্ল্যাটফর্মে শীর্ষেন্দু মুখোপাধায়। আমরা পাকামি মেরে গিয়ে আলাপ করে জানতে চাইলাম তিনি গল্পটার নাম –‘টিকটিকিরা জল খায় না কেন’ রাখলেন কেন। কী যেন একটা সাদামাটা উত্তর দিয়েছিলেন, যেটা আমদের হতাশ করেছিল। আমরা আশা করেছিলাম উনি অস্তিত্ত্ব-অনস্তিত্ত্ব বিষয়ক কোনও ভারি তত্ত্বের কথা বলবেন। একদিন সাইকেল নিয়ে তিন বন্ধু সেবকে বেড়াতে যাওয়ার পথে দেখলাম পথের দু’পাশের গাছপালা সব সাফ। হু হু করে বাড়ছে জমির দাম। হং কং মার্কেটে নতুন ধরনের হাওয়াই চটি এসে গেল। আমি সাইন্সের ছেলে, কালদোষে কবিতা লিখি। একদিন সাহস করে বাংলার অধ্যাপক অশ্রু সিকদারকে ঘেমে নেয়ে তার ক্লাস-লেকচার শোনার পারমিশন চাইলাম। তখন ইউনিয়ন ছাত্রদের ফুসকুড়ি বা ঘামাচির ব্যাপারে খবর্দারি করত না। স্যার আমাকে অনুমতি দিলে আমি, মনে আছে, লাইব্রেরি নীচে এগারো নাম্বার রুমে তাঁর ক্লাস করেছিলাম। বাংলা অনার্সের স্টুডেন্টের সঙ্গে।

সেই ক্লাসই আমাকে নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল। ক্রমে স্যারের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং প্রমাণিত হয় যে, অশ্রুকুমার সিকদারেরও দাঁত দেখা যায়। কিন্তু আমার একটু আপশোষ থেকে যায়, যে এই গুজব ছড়িয়েছিল, তাকে ব্যাপারটা দেখাতে না পারার জন্য।

উটকো লোকে শহর ভরে যাচ্ছিল। শহরে কাঠের খুঁটির ওপরে পুরনো স্টাইলের বাড়ি কমে যাচ্ছিল। চারতলা, পাঁচতলা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। শিলিগুড়ি কলেজ ক্রমশ আয়তনবান হয়ে উঠছে। কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ তিলক ময়দান হয়ে গেল কাঞ্চনজঙ্ঘা ক্রীড়াঙ্গন। বাঙালিদের মিষ্টির দোকান কমছে, অবাঙালিদের মিষ্টির দোকান বাড়ছে। অশ্রুকুমার সিকদার শিলিগুড়ি কলেজ ছেড়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলেন। আমি তখনও গল্প লিখতে শুরু করিনি। কবিতা লিখছি। অনেকগুলো একসঙ্গে স্যারকে দেখিয়ে আনছি। স্যার অবশ্য সরাসরি বলছেন না – কিস্‌সু হয়নি, মুখে উৎসাহ দিচ্ছেন এবং নিজের সংগ্রহ থেকে কবিতার বই দিচ্ছেন পড়ার জন্য। পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলাম তিনি নাকি আমার কবিতার প্রশংসা করেছেন। বন্ধুদের সেদিন ক্যান্টিনে চায়ের সঙ্গে ভেজিটেবল্‌ চপ খাইয়েছিলাম। সাইকেল চালিয়ে যখন স্টেশন ফিডার রোড ধরে বাড়ি ফিরছি, মনে হ’ল কানের পাশে সুড়সুড়ি লাগছে। হাত দিয়ে দেখলাম ঘাড়ের রোঁয়াগুলো।

মাঝে মাঝে এক আধটা লিটল্‌ ম্যাগাজিন হাতে আসে। আমরা ক’জন গোগ্রাসে গিলি। কলকাতায় গেলে ম্যাগাজিন আর কবিতার বই কিনে আনি। শহর খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। যতটা ভৌগোলিক এবং জনসংখ্যা ও তাদের বিচিত্র বৈশিষ্ট্যে, ততটা সাংস্কৃতিক ভাবে নয়। একটি, দু’টি ম্যাগাজিন বেরোয় বটে, কিন্তু এত বেশি মফস্‌সলি গন্ধমাখা, আধুনিকতা থেকে অনেক দূরে সেই পত্রিকা আমাদের বিরক্ত করত। ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছি বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, সুধীন দত্ত। আমাদের বন্ধু নিখিল বসু বলল বিনয় মজুমদার না পড়লে আধুনিক কবিতা বোঝা যাবে না। নিখিল আমাদের সর্দার। সে সত্তর দশকের প্রথমেই কলকাতায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠের ডাক পেতে শুরু করেছিল। আমাদের আধুনিক করে তোলার কঠিন সংকল্প করেছিল। ‘ফিরে এসো চাকা’ জোগাড় করলাম। প্রকাশক মীনাক্ষী দত্ত, মূল্য তিনটাকা। কালো রং-এর প্রচ্ছদে কবির মুখাবয়ব। বইটা হাতে নিয়ে কেমন যেন গা শিরশির করে উঠল। “ রোমাঞ্চ কি র’য়ে গেছে; গ্রামে অন্ধকারে ঘুম ভেঙে/ দেহের উপর দিয়ে শীতল সাপের চলা বুঝে/ যে-রোমাঞ্চ নেমে এলো, রুদ্ধশ্বাস স্বেদে ভিজে ভিজে।/ সর্পিণী, বোঝোনি তুমি, দেহ কিনা, কার দেহ, প্রাণ”। আমি, গীতাংশু আর নিখিল তর্কে মেতে উঠি কাব্যের অন্তর্গত চিরকালীন সৌন্দর্য ও মৃত্যুর তুলনামূলক আলোচনায়। শেষে ঠিক হয় অশ্রুদা ছাড়া এ শহরে আর দ্বিতীয় কেউ নেই, যাঁর কাছে যাওয়া যেতে পারে। এর আগে একবার এ রকম হয়েছিল একটি পংক্তি পড়ে – একটি কথার দ্বিধা থরো থরো চূড়ে/ ভর করে আছে সাতটি অমরাবতী। শব্দ ও বাক্যের অন্তর্গত ব্যঞ্জনা, ভারসাম্য, ছন্দের চতুরালি, একটি গূঢ় কথার উড়াল বুঝতে পেরে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যাই। এত গোপন ভার বহন করে কবিতা।

এর মাঝে একদিন অশ্রুদা আমাকে উপহার দিলেন শঙ্খ ঘোষের ‘নিহিত পাতালছায়া’। পড়ে আমি ভোঁ হয়ে গেলাম। কী আলতো অথচ অমোঘ উচ্চারণ। এতকাল যা পড়ে এসেছি, মায় জীবনানন্দ, এ একদম আলাদা। “ ... অসীম ছড়ায় শূন্যে শঠ/ প্রতি মুহূর্তের কণ্ঠ ছিঁড়ে নেয় অন্ধকারে পর্বতকন্দরে মহাকাল/ কারণবিহীন এক মহাপরিণাম ভেসে চলে যায় গভীর সাগরে”। আরও চাই, শঙ্খ ঘোষের আরও বই চাই। যা পেরেছি, জোগাড় করেছি। রাত জেগে কবিতা পড়ি। ডাইরির পৃষ্ঠায় আপনমনে লিখি – তোমার নিজের হাতে ভিক্ষা নিতে এত ভালো লাগে। প্রিয় কবির লাইন। ‘নিজের’ ও ‘ভিক্ষা’ শব্দদুটির নিচে পেন দিয়ে দাগ দিলাম। এক ধরণের ভয় করে উঠল হঠাৎ। আচমকাই আমি বুঝতে পারে শব্দ তার নিজের তৈরি বেড়া ভেঙে কীভাবে সামান্য ভরটুকু শক্তিতে রূপান্তরিত করে নিচ্ছে। মনে হয় আকাশে সহস্র সূর্য ঝল্‌সে উঠল বুঝি। ব্যাঙের ছাতার মত মেঘ। কীভাবে যে একটা দুটো শব্দ তীব্র তড়িৎগ্রস্ত কালো মেঘের মত আকাশে ফেটে পড়ে, কবি ছাড়া আর কেউ বুঝি তার নাগাল পায় না। উৎসারিত মারণরশ্মি ধেয়ে আসে চৈতন্যের দিকে। বিপন্ন বিস্ময়ে কবি দেখতে পায় ব্যক্তিগত আবরণ কেমন করে গলে যায়, খসে পড়ে লৌকিক চামড়া। দগদগে পোড়া ঘা-এর যন্ত্রণায় মানুষ মনে করে হেমলক, একগাছা দড়ি অথবা ধাবমান ট্রামের সামনে আছে ম্যাজিক-মলম।আমাদের শহর বদলে যাচ্ছিল। গাছ কমছিল, হোটেল বাড়ছিল। একটু বেশি রাতে হিলকার্ট রোডের আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে থাকে উগ্র সাজে রোগা রোগা মেয়েরা। মহানন্দার জল আরও কালো হয়ে যাচ্ছে। গাড়িধোয়া তেলমবিল, শহরের সব আবিলতা, চা-বাগান গড়িয়ে-আসা বিষ নিয়ে আমাদের শহরের নদী ক্রমে মরে যাচ্ছিল। আমাদের শহরের সব গাছ, তরাই-ডুয়ার্সের গন্ধ, আমাদের নদী – সব চুরি হয়ে যাচ্ছিল। আর আমাদের ভাবনাচিন্তার বদল ঘটে যাচ্ছিল আধুনিক কবিতার দিগ্বলয়ের পরিধি বরাবর। যখনই কোনও সংশয় আসে, মমতাজ আলির রেল-ক্যান্টিনে বসে আমাদের তুমুল তর্ক শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সেই অশ্রুদার বাড়িতে যাওয়া সাব্যস্ত হয়। ততদিনে আমরা জেনে গেছি অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদারের আপাতগম্ভীর আবরণের আড়ালে দিব্যি একজন স্বাভাবিক ভালোমানুষ রয়েছেন। এই বিশাল পণ্ডিত মানুষটির সামনে আমাদের আর তখন কোনও সংকোচ ছিল না।

0 comments: