2

প্রবন্ধ - স্যমন্তক দাস

Posted in


রবীন্দ্র কুমার দাশগুপ্তের জন্ম ১১ জুলাই ১৯১৫ সালে, কলকাতায়। প্রাথমিক শিক্ষা কলকাতায়, ম্যাট্রিক পাস ১৯৩১এ। তারপর Scottish Church College থেকে ১৯৩৫এ BA আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি তে MA, ১৯৩৭এ। পরে উনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে PhD করেন ১৯৫০এ, আর ১৯৫৫এ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জন মিলটন নিয়ে ওঁর DPhil গবেষণা, হেলেন গার্ডনারের তত্ত্বাবধানে শেষ করেন ১৯৫০এর দশকে। অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন কলকাতা, দিল্লি ও আন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। রবিবাবু ছিলেন International Comparative Literature Associationএর প্রথম ভারতীয় executive member। পরে জাতীয় গ্রন্থাগারের (National Library), Director General। কিন্তু, আজ আমি সেই অধ্যাপক রবীন্দ্র কুমার দাশগুপ্তের বিষয়ে বিশেষ কিছুই বলব না, আজ আমি সেই রবিবাবুর কথা বলব যিনি বাংলার ও কলকাতার অন্তত পক্ষে এক অংশ মানুষকে তাঁর পান্ডিত্য ও মানবিকতা দিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন, এবং তাঁর জীবন ও লেখার মাধ্যমে সেই মানুষদের একটা স্বচ্ছ, স্বাধীন চিন্তা ও ভাবনার পথ প্রদর্শন করেছিলেন।

রবীন্দ্র কুমার দাশগুপ্তের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় গত শতাব্দীর ৮০-র দশকের শেষের দিকে। আমি তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এমএ পড়ছি। রবিবাবু কিছুদিন আমাদের প্লেটোর রিপাবলিকের উপর ক্লাস নিতেন। প্রথম থেকেই ওঁর বিষয়ে তিনটে জিনিস আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছিল : অগাধ পাণ্ডিত্য, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি এবং ওঁর হাস্যরস, যা কঠিন তত্ত্বকেও স্বচ্ছ্ব, সাবলীলভাবে আমাদের মতন প্রায় অশিক্ষিত ছাত্রছাত্রীদের বুঝিয়ে দিতে সমর্থ ছিল।

পরে যখন রবিবাবুর বাংলা ও ইংরেজি লেখাপড়ি, তখন এই তিনটি চারিত্রিক গুণ আবার স্পষ্ট দেখতে পাই। সাথে আরও দুটি গুণ উপলব্ধি করি। প্রথমত, ওঁর ইতিহাসচেতনা ও দ্বিতীয়ত, ওঁর বিনয়। আসলে শ্রেণীকক্ষে ও এই ইতিহাসবোধ আর বিনয় নিঃসন্দেহে উপস্থিত ছিল, আমরা কেবল সেগুলিকে তেমনভাবে লক্ষ করিনি।

আশির দশকের শেষ দিকেই নীরদচন্দ্র চৌধুরির আত্মজীবনীর দ্বিতীয় ভাগ, Thy Hand, Great Anarch! প্রকাশিত হয়। একদিন ক্লাসে রবিবাবু বললেন, “আসলে নীরদবাবুর আত্মজীবনী একজন মধ্যবিত্ত বাঙালীর ডিভাইন কমেডি।” মানে? আমরা প্রশ্ন করলাম। “মানে আর কী? নীরদ সি চৌধুরির জন্য কলকাতা হচ্ছে ইনফার্নো, দিল্লী পুর্গাতোরিও আর অক্সফোর্ড... (এখানে রবিবাবু একটু মুচকি হেসে, দু’-হাত ছড়িয়ে বললেন) অক্সফোর্ড হচ্ছে প্যারাডিসো!”

তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু এই একটা ছোট্ট ঘটনা থেকে রবিবাবুর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও যাকে ইংরেজিতে বলে critical acumen তা বোঝা যায়। ১৯৬৭ সালে নীরদবাবুর "দুই রবীন্দ্রনাথ" নামক প্রবন্ধ দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর প্রমথনাথ বিশির অনুরোধে রবিবাবু একটি অসাধারণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন – “পড়তে হয়েছে বিস্তর” (‘কথাসাহিত্য’, ১৩৭৪) – যেখানে এক-এক করে নীরদচন্দ্রের উক্তি খণ্ডন করে রবিবাবু প্রমাণ করেন যে বাস্তবে নীরদবাবুর প্রবন্ধের বিষয় রবীন্দ্রনাথ নন, বরঞ্চ উনি স্বয়ং। রবিবাবুর ভাষায় “প্রবন্ধটি মূলত আত্মকথা” (বাঙালী কি আত্মঘাতী ও অন্যান্য রচনা, পৃ ৩৩)। নীরদবাবুর লেখা যে মূলতঃ তাঁর নিজের বিষয়েই, এবং তারই জন্য সে লেখার মধ্যে ইতিহাস বা critical vision প্রায় অনুপস্থিত, তা রবিবাবু অন্য লেখাতেও দেখিয়েছেন, যথা ‘বাঙালি কি আত্মঘাতী?’ (পরিচয়, ১৪০৫) যেখানে রবিবাবু নীরদবাবুর লেখার বিষয়ে বলেছেন, “বাঙালি তুমি দুঃখ করিয়ো না। - নীরদবাবুর হাতে কেবল তুমি মর নাই, সারা বিশ্ব মরিয়াছে।”

নীরদবাবুর বিষয়ে রবিবাবুর লেখা দিয়ে শুরু করার একটা কারণ হল – নীরদবাবু যে যে বিষয়ে বাঙালির অক্ষমতা বা ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তার মধ্যে অনেক বিষয়ে রবিবাবু দেখিয়েছেন যে বাঙালির অনেককিছুই আছে যা নিয়ে সে গর্ববোধ করতে পারে। এইসব প্রবন্ধে রবিবাবু রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন, বিদ্যাসাগর, নজরুল, বিবেকানন্দ থেকে হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে যা লিখেছন তা এখনও পাঠককে নতুনভাবে এই মনীষীদের নিয়ে ভাববার ইন্ধন যোগাতে পারে।

রবিবাবুর সব লেখা আলোচনা করার সময় ও স্থান এখানে নেই। একটি প্রবন্ধ থেকে আমি যা বলতে চাই তা বোঝাতে চেষ্টা করছি। ১৯৫৬তে দেশ পত্রিকাতে প্রকাশিত ‘মাইকেল ও বিদ্যাসাগর’ প্রবন্ধে রবিবাবু লিখেছিলেন যে যদিও ‘আপাতদৃষ্টিতে’ মধুসূদন ও বিদ্যাসাগর ‘দুই ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ’ কারণ ‘একজন বিলাসী, উচ্ছৃঙ্খল, আশঙ্কায় প্রমত্ত; আর একজন বিলাসিতা শূন্য, সংযত, নিরাসক্ত’ বাস্তবে ‘এই বৈসাদৃশ্যকে আমি বাহিরের বৈসাদৃশ্য বলিয়া মনে করি’। বাকি প্রবন্ধে রবিবাবু মধুসূদন ও বিদ্যাসাগরের সম্পর্ক ও তাঁর সাথে মধুসূদনের জীবন ও কাব্য রচনার এক চমৎকার ব্যাখ্যা করেন। “মাইকেল বিদ্যাসাগর সম্পর্কের ... শেষ অধ্যায়টির ট্র্যাজিডি” আলোচনা রবিবাবু যদিওবা করেছেন, ওঁর উক্তি হল যে এই দুই মহাপুরুষ “বাংলার নূতন যুগের যমজ সন্তান”।

বাংলার এই নতুন যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক রবীন্দ্রনাথ – “আমি রবীন্দ্রনাথকে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলি কারণ তিনি যেন আমাদের সমস্ত মনপ্রাণ জুড়িয়া আছেন।” (‘শ্রেষ্ঠ বাঙালী কে’, ‘দৈনিক স্টেট্‌স্‌ম্যান',২০০৪) – তাঁর বিষয়ে রবিবাবু বহু প্রবন্ধ লিখেছেন, বাংলায় ও ইংরেজিতে।

ইংরেজি লেখাগুলির মধ্যে একটিতে রবিবাবু বিলাপ করেছেন যে ‘এক অর্থে বাঙালীরা রবীন্দ্রনাথকে অবহেলা করেছেন।‘ এই প্রবন্ধ (‘Poet of Poets’) রবিবাবু শেষ করেন এই প্রশ্ন করে, “When will Bengal rediscover its Bengali poet?”

বাস্তবে পঞ্চাশের দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের উপর রবিবাবুর যে প্রবন্ধগুলি প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলি যদি একটা সংকলনে পুনঃপ্রকাশ করা যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাঙালি পাঠক বহুমুখী রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারেন। তবে এই ইন্টারনেট আর মেগাসিরিয়ালের যুগে এই কাজ কি কেউ করতে রাজি হবেন?

এই ধরণের সংকলন যদি প্রকাশিত নাও হয়, রবিবাবুর লেখায় রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি লক্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে লেখা প্রবন্ধগুলি ছাড়াও অন্যান্য লেখায় রবিবাবু রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, ভাবনা, কবিতা, প্রবন্ধ ও যাকে বলা যায় রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন, তার ব্যবহার প্রায়শই করেছেন। যেমন ধরা যাক ১৯৯৯-এর ‘বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন’ বক্তৃতাটি (চন্দন ভট্টাচার্য স্মারক বক্তৃতা, প্রেসিডেন্সি কলেজ, ২৫ এপ্রিল ১৯৯৯)। বক্তৃতা শুরু করেছেন রবিবাবু এই বলে, “এখন চারিদিকে তাকাইয়া মনে হয় বাঙালি প্রাণহীন হইয়া পড়ে নাই, মননশীলতায়ও সে তাহার পূর্বগৌরব হারাইয়াছে।” আর এই অধঃপতনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রবিবাবু লিখছেন, “মননশীলতা বা চিন্তাশীলতা গভীর অধ্যয়নের ফলে লাভ করা সম্ভব। কিন্তু হৃদয় কোথায় পাইব?... এই হৃদয়ের দুয়ার কী করিয়া খুলিব? ইহা বন্ধ করিল কে?... আমরা হৃদয়হীন কারণ আমরা আত্মাভিমানী কিন্তু এই অহংবোধ কী করিয়া বর্জন করিব?” এই প্রশ্নের উত্তর উনি দু’জন মহাপুরুষের জীবন ও বাণীতে খুঁজে পান। একজন হলেন বুদ্ধদেব, আর দ্বিতীয়জন হলেন রবীন্দ্রনাথ।

এই দুইজনের জীবন, কর্ম ও উক্তিতে রবিবাবু পেয়েছেন সেই গুণ, যা মানুষকে তার আত্মকেন্দ্রিকতা অতিক্রম করতে সাহায্য করে : করুণা। ঠিক যমন বুদ্ধদেব “করুণাকে চিত্তের শ্রেষ্ঠ সম্পদ” বলে মনে করতেন, ঠিক তেমনই রবীন্দ্রনাথও “তাঁহার মাতৃমন্দিরের সকল সাধককে একত্র হইতে বলিয়াছিলেন”। এই সাধক কারা? কবির ভাষায় “সকল যোগী, সকল ত্যাগী, সকল দুঃসহ দুঃখভাগী”। রবিবাবু বলছেন, আমাদের দেশে যদি এখন এক দুঃসময় আসিয়া থাকে তাহা হইলে তাহার প্রধান কারণ এই যে আমরা আমাদের আপনজনের দুঃখে দুঃখ পাইনা। আমরা কাহারও দুঃখ দূর করিতে সচেষ্ট হই না”, অর্থাৎ, আমাদের এই স্বার্থপর, স্বেচ্ছাচারি জীবনে এখনও রবীন্দ্রনাথের থেকে আমরা শিখতে পারি কিভাবে আবার কবে করুণার উন্মেষ ঘটিয়ে আমরা মানুষের মনুষ্যত্ব ফিরে পেতে পারি।

এক অর্থে, রবিবাবু যখনই কোন ব্যক্তির বিষয়ে লিখেছেন, সেই লেখা হচ্ছে সেই ব্যক্তির মনুষ্যত্ব, তাঁর মানবিকতার এক ধরণের সন্ধান। এবং এই মনুষ্যত্বের সঙ্গে অনেক সময়ই জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিকতা। রাজা রামমোহন রায়ের বিষয়ে রবিবাবু লিখছেন, “যে আন্তর্জাতিকতার আদর্শ আমরা আজ মাথায় করিয়া চলিতেছি তাহার কতিপয় প্রবর্তকের মধ্যে রামমোহন অন্যতম।” আর এই আন্তর্জাতিকতা যে একই সঙ্গে গভীর দেশপ্রেমের প্রতীক তা এই উক্তি থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় : “রামমোহনের নিবিড় বঙ্গবোধ এক নিবিড়তর ভারতবোধে পরিণত এবং সেই ভারতবোধই তাঁহার বিশ্ববোধের উৎস” (‘রাজা রামমোহন রায়’, দৈনিক স্টেট্‌স্‌ম্যান, ২২ মে ২০০৫)।

রামমোহনের মধ্যে যে মানবিক আন্তর্জাতিকতা রবিবাবু পেয়েছেন, সেটা উনি আর কয়েকজন ভারতীয়ের মধ্যে চিহ্নিত করেছেন। যেমন ধরা যাক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের উপর প্রবন্ধ, যেখানে তিনি লিখছেন : “আমি মনে করি মার্ক্সবাদের সঙ্গে ভারতের আদর্শের আত্মীয়তা প্রসঙ্গে হীরেনবাবু যত কথা বলিয়াছেন তাহা সারা বিশ্বের সামনে উপস্থিত করার সময় আসিয়াছে”। রবিবাবুর দৃষ্টিতে, রামমোহনের মত হীরেন্দ্রনাথের মধ্যেও সেই একই ধরণের মানবিকতার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই যেটা দেশের মাটি থেকে উৎসারিত হয়ে সারা বিশ্বকে নিজের করুণার আওতায় নিয়ে আসতে চায়।

এই চারিত্রিক গুণ রবিবাবু পেয়েছেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর জীবন ও কর্মে। “আমরা যাহারা বাঙালিকে এক চিন্তাশীল জাতি বলিয়া কিছু গর্ববোধ করি, আমরা মনে করি, রামেন্দ্রসুন্দর বাঙালির চিন্তার ইতিহাসে এক শ্রেষ্ঠ পুরুষ” (‘আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর’, আলেখ্য, ১৯৩৭ বঙ্গাব্দ)। যে রামেন্দ্রসুন্দরকে বাঙালি আজ প্রায় ভুলে গেছে, তাঁর আদর্শকে রবিবাবু এইভাবে বর্ণনা করেছেন : “আমরা যাহাকে আধ্যাত্মিকতা বলি তাহার আভাসমাত্র রামেন্দ্রসুন্দরের রচনায় নাই। অথচ তিনি মানুষের এক মহৎ আদর্শে বিশ্বাসী”।

এই মানবমুখী আদর্শবাদ রবিবাবু সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, স্বামী বিবেকানন্দ, হেনরি লুইভিভিয়ান ডিরোজিও, এবং আরও অন্য মনীষীদের মধ্যে লক্ষ করেছেন। যদিও এই মানবিকতা, এই আদর্শবাদ, এবং যেটাকে আমরা আন্তর্জাতিকতা বলছি, তার প্রকাশ প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আলাদা, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তার একটা নিজস্ব রূপ, একটা নিজস্ব বিকাশ, একটা নিজস্ব গতি আছে। রাধাকৃষ্ণণের ক্ষেত্রে সেটা যদি হয় এই যে, উনি “ভারতীয় ধর্ম-দর্শন, ভারতীয় সংস্কৃতির সার কথা, ভারতীয় সভ্যতার আদর্শ জগৎসভার প্রচার” করা (‘যুগশিক্ষক রাধাকৃষ্ণন’; দৈনিক স্টেটসম্যান; ৫ সেপ্টেম্বর, ২০০৪), তাহলেডিরোজিওর ক্ষেত্রে এই মানবিকতার প্রকাশ পায়, রবিবাবুর উক্তিতে, “তিনিই আমাদের প্রথম স্বাদেশিকতার কবি” (“ডিরোজিও”; ১৭ এপ্রিল ১৯৯৫, প্রেসিডেন্সি কলেজের ডিরোজিও হলে প্রদত্ত ভাষণ)। এই ভাষণে রবিবাবু ডিরোজিওকে “একজন ইংরেজভাষী বাঙালি” বলে চিহ্নিত করেছেন, এবং এই উক্তির পিছনে আছে রবিবাবুর বিশ্বাস, শ্রেষ্ঠ মানুষ সেই যে নিজের সংকীর্ণ অহংবোধের উর্দ্ধে গিয়ে বৃহৎ মনুষ্যত্বের জন্য সহানুভুতি বোধও প্রকাশ করতে পারে।

ঠিক এই ধরণের কথা আমরা দেখতে পাই যখন রবিবাবুর‘কাজী নজরুল ইসলাম’ (পরিচয়, শারদীয় ১৪০৬ বঙ্গাব্দ) প্রবন্ধটি পড়ি। এখানে উনি লিখেছেন : “তাঁহার সমস্ত রচনার মধ্যে এক উজ্জ্বল সরস ব্যক্তিত্বের পরিচয়। সেই ব্যক্তিত্বের বিচিত্রভাব, বিচিত্র চিন্তার সমাবেশ, এবং এই ধারণা ও চিন্তার যেমন বিস্তার তেমন গভীরতা। তাঁহার কাব্য আমরা যে একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দেখতে পাই তাহার মূলে এই চিন্তা ও ভাবের বিস্তার ও গভীরতা”। নিজের সংকীর্ণ ধর্মীয় পরিচয়ের উর্দ্ধ যেতে সফল হয়েছিলেন বলেই, “নজরুল নিজেকে বাঙালী বলিয়া মনে করিতেন। তিনি হিন্দু কি মুসলমান এই প্রশ্ন তাঁহার কাছে অবান্তর এবং বাঙালী সম্বন্ধে তাহার একটা গর্ববোধ ছিল।

রবিবাবুর বাংলা ও ইংরেজি লেখার বৈচিত্রের মধ্যে কেবল দু’টি দিক ইঙ্গিত করে এই ছোটো লেখা শেষ করব।

প্রথমদিকটি হ’ল রবিবাবুর দেশপ্রেম বা যাকে বলা যেতে পারে জাতীয়তাবোধ। প্রবন্ধের পর প্রবন্ধে রবিবাবু এটা দেখিয়েছেন যে ভারতবর্ষ বিশ্বকে যা দিয়েছে – তা মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ হোক বা বিবেকানন্দের মানবদর্শন, বাল্মীকের কাব্য বা রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তা –তার একটা নিজস্ব সত্তা আছে যা ইউরোপীয় প্রভাব দ্বারা ব্যাখ্যা করা অনুচিত। এই সত্তা, এই ভারতীয়তা, আমরা বোধহয় আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলছি, এবং এই সত্তা হারালে দেশের ও দেশের প্রত্যেকটি মানুষের ক্ষতি হতে বাধ্য। দুই ভাষায় রচিত প্রবন্ধে রবিবাবু তাঁর পাঠকদের সতর্ক করেছেন যে একটা গোষ্ঠি, জাতি বা দেশ শুধু অনুকরণ করে মহান হতে পারে না, গোটাবিশ্ব থেকে তথ্য ও তত্ত্ব সংগ্রহ করে সেগুলিকে বুঝে, আপন করে, সঠিক প্রয়োগ করলেই একটা গোষ্ঠী/জাতি/দেশ নৈতিক ও মানসিক অগ্রগতির পথে পদার্পণ করতে পারে।

হিন্দুধর্ম বনাম হিন্দুত্ব নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। রবিবাবু নিজেকে হিন্দু বলে চিহ্নিত করতে দ্বিধা করতেন না, তবে উনি স্পষ্ট বলেছেন যে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে সব হিন্দুত্ববাদী দলগুলি হিন্দু ধর্ম ব্যবহার করে ক্ষমতা গ্রাস করার চেষ্টা করছে তারা না হিন্দু ধর্মকে বোঝে না ভারতবর্ষকে। “What is Hinduism” প্রবন্ধে উনি লিখেছেন – “The Sangh Parivar is degrading our sublime and humane religion into an aggressive or Jehadi decline”।

হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলগুলি যে এককথায় ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক ঐক্যকে অগ্রাহ্য করছে, তা রবিবাবুর অনেক প্রবন্ধ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে সে সব প্রবন্ধ যেগুলিতে উনি সরাসরি হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণ করছেন বা করেননি। (অনেক ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে কারণ ভারতের রাজনৈতিক মঞ্চে হিন্দুত্ববাদী দলগুলির আবির্ভাবের আগেই এই লেখাগুলি রচিত হয়েছে।)

‘ভারতপথিক রবীন্দ্রনাথ’ (দেশ, সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৯৮ বঙ্গাব্দ) বা ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ বা ‘বঙ্কিম কল্পিত মানবধর্ম’ (দেশ, সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৯৫ বঙ্গাব্দ) বা বিবেকানন্দ বিষয়ে রবিবাবুর উক্তি পড়লে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, যে হিন্দু ধর্মের কথা রবিবাবু বলছেন, সেটা একটা গোঁড়া, সংকীর্ণ, ইসলাম-বিরোধী ধর্ম নয়। রবিবাবুর শব্দে, “...মানবধর্ম কি না সকল মনুষ্যের ধর্ম অর্থাৎ বিশ্বজনের ধর্ম। রবীন্দ্রনাথও এই অর্থে মানবধর্ম শব্দটি ব্যবহার করিয়াছেন, Comte বল, রামমোহন বল, কেশব সেন বল, বিবেকানন্দ বল, শ্রীঅরবিন্দ বল – সকলেই তাঁহাদের স্ব স্ব ভাষায় এই মানবধর্মের কথা বলিয়াছেন।... বঙ্কিমের মানবধর্ম এই মানবতার ধর্ম। সে ধর্ম মানুষের ধর্ম, বিশ্বমানবের ধর্ম। ইহা মানবতার ধর্ম বলিয়াই সকল মানুষের ধর্ম” (‘বঙ্কিম কল্পিত মানবধর্ম’)।

ইংরেজিতে লেখা প্রবন্ধে রবিবাবু এই বিষয়ে অনেক আলোচনা করেছেন, বিশেষ করে গান্ধিজির উপর রচিত প্রবন্ধগুলিতে।‘Swami Vivekananda’s Concept of Morality’প্রবন্ধে রবিবাবু দেখিয়েছেন যে বিবেকানন্দের ন্যায়বোধ, বুদ্ধের বা রবীন্দ্রনাথের ন্যায়বোধের মতন, অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল সেই করুণাবোধের উপর। “It (এই করুণাবোধ যেটা আবার একধরনের মানবমুখী আদর্শবাদ) is also the foundation of his (বিবেকানন্দ) ideal of universal religion, of human fellowship and of man’s true freedom.”।

অন্যত্রও রবিবাবু দেখিয়েছেন কিভাবে যদি আমরা কেবলমাত্র নিজেদের (বা নিজেদের দল বা গোষ্ঠী বা ধর্মের) জন্য ভাবনা-চিন্তা করি তাহলে আমরা শুধু অন্যদের নয়, আমাদের নিজেদের ক্ষতি করতে বাধ্য।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন – “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।“ এই পাপ রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত কখনো করেননি। কিছু লেখায় যদিও উনি ভারতীয়দের, এবং বিশেষ করে বাঙালিদের মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ভারতবর্ষের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনাকে তিরস্কার করেছেন, মোটের উপর উনি মানুষের উপর আস্থা হারাননি। লেখার পর লেখায় উনি আমাদের দেখিয়েছেন কীভাবে, এত অনাচার, এত মিথ্যাচারের মধ্যেও, মানুষের সৃজনশীলতা মানুষের মূল্যবোধ এখনো ধরে রাখার যুক্তি সঙ্গত কারণ আছে। এই মানবিকতার জন্য আজও রবিবাবুর লেখার মূল্য অপরিসীম।

2 comments:

  1. খুব ভাল এবং দামি লেখা।

    ReplyDelete
  2. Glad you wrote this. JU Press could perhaps bring out an anthology of Prof Dasgupta's essays.

    ReplyDelete