গল্প - সমরেন্দ্র বিশ্বাস
Posted in গল্পস্মৃতিসৌধটা রাতের অন্ধকারে ঝিমোচ্ছে, ল্যাম্পপোষ্ট থেকে সামান্য আলো ছিটকে পড়ছে নতুন লাগানো নাম-ফলকটাতে, সৌধটার গায়ে। চারপাশে হাওয়া নেই। স্মৃতিসৌধটার মাথায় পতাকাটা। তার নড়াচড়া ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। জনাদুয়েক ভিখারী গোছের মানুষ, কাছেই চাতালে গভীর ঘুমে ডুবে আছে। কাল সকালেই জায়গার চেহারাটা বদলে যাবে। ট্যুরিষ্ট আর লোকাল লোকেদের আনাগোনায়।
এই ঝিম ধরা নির্জন রাতে থমকে থাকা বাতাসকে একটা ধারালো ছুরিতে চিড়ে ফেলে নিঃশব্দে দুটো মূর্তি এসে শহীদবেদীটার সামনে দাঁড়ালো! একজন পক্ককেশ অতি অতি বৃদ্ধ পুরুষ। আরেকজন এলোমেলো পক্ককেশী বৃদ্ধা। দুজনেরই বয়েস একশোর বেশী। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে স্মৃতিসৌধটাকে স্যালুট জানিয়ে ওরা একসঙ্গে বলে উঠলো – জয় হিন্দ! ওরা দুজনেই স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহনকারী। কার্তিক শবর ও তারই মেয়ে দেমাতি দেই শালিহান!
মনুমেন্টটার দেয়ালে লাগানো নামফলকটাকে দেখে শালিহান বললো – ‘এই নামফলকটা তো আগে ছিলো না! মনে হচ্ছে, অল্প কিছুদিন হলো লাগানো হয়েছে।’ আধা আলো অন্ধকার। মেয়েটা কাছে ঝুঁকে সৌধফলকে লেখা নামের তালিকাটা দেখলো। এক দুই তিন করে সাতেরো জন লোকের নাম! এরা সবাই স্বাধীনতা সংগ্রামী। একে একে পরিচিত নামগুলো পড়ে নিয়ে শালিহান তার বাবাকে বললো – ‘বাপো! এই সাতেরো জন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে তোর নামটা, মানে কার্তিক শবরের নামটাই নেই!’
বুড়ো মানুষটা বললো - ‘এতে আশ্চর্য হবার কি আছে! সৌধফলকে আমার নাম থাকবে তার জন্যে তো আমরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ি নি! আমরা লড়াই করেছি দেশটাকে স্বাধীন করার জন্যে। সত্যিকারের ইতিহাস লেখা হলে, মনুমেন্টের এই ফলকটাতে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তোর নামটাও থাকতো। আমি জানি, দেমাতি দেই শালিহান-এর নামটা ওরা সৌধফলকে লিখতে ভুলে গেছে!’
তখনো ভোর হতে অনেক বাকী। মেয়ে বাপকে বললো – ‘চলো তো, স্বাধীন দেশটাকে এই রাতের অন্ধকারে আরো কিছুক্ষণ উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে দেখি।’
তখনই সেই অশরীরী আত্মাদুটো আকাশে উড়াল দিলো। নীচে আলো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে শালিহা গ্রামের স্মৃতিসৌধটা। সেটা ম্লান রাতের অন্ধকারে লজ্জায় ম্রিয়মান!
(২)
‘এ কেমন কতা রে বাপো! জঙ্গল থেকে লকড়ি লাবু, তার জন্যে খাজনা দিতে হবু। জঙ্গলে বকরি গাই চড়াবু, তার জন্যে ধলা সাহেবদের খাজনা দিতে হবু। বাপোর জম্মেও এমন কানুন ছিলুক নাই!’ লকড়ু শবরের চোখে মুখে হতাশা!
‘আমরা মানবু ক্যানে? বিটিশ কানুন আমরা মানবুক নাই!’ – লোদা শবরের দুচোখে ধারালো আগুন জ্বলছে!
ব্রিটিশ শাসিত দেশ, উড়িষ্যার নুয়াপাড়া অঞ্চল। আদিবাসী শবর অধ্যুষিত এলাকা। সময়টা ১৯২৯-১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দ। ভারতবর্ষের দিকে দিকে গান্ধীজির সত্যাগ্রহ চলছে। পিছিয়ে পড়া শালিহা গ্রামেও তার আঁচ!
সেদিনটাতে বট শাল গাছের ছায়ায় গ্রামীন মানুষ, আদমি আওরতদের জটলা। তাদের এই নিস্তরঙ্গ ভিটে মাটি গ্রামেও ব্রিটিশ হানাদাররা থাবা মারছে। স্বভাবতই এলাকার সরল মতি মানুষজনেরা অসন্তুষ্ট। কানু শবর কাজ করতে গিয়েছিল ভিন প্রদেশে। সে জটলাতে জানালো, গান্ধীজি তার দলবল নিয়ে মিছিল করে শীঘ্রই এদিকেই আসছে। তবে ঠিক কবে এসে পৌঁছাবে, তা সে জানে না।
কার্তিক শবর ঠান্ডা মাথায় জবাব দিলো, ‘গান্ধীজি দেশের নেতা। আমরা তার নির্দেশের অপেক্ষায় থাকবো। কিন্তু তিনি যতদিন না এসে পৌঁছান আমরা আমাদের উলগুলান চালিয়ে যাবো। এই মাটি আমাদের, এই জঙ্গল আমাদের! আমাদের বাপ ঠাকুদ্দাদের গাঁও! তোরা কোন বিলাইতী মানুষ? মোদের উপর খবদ্দারি কত্তে এয়েছিস? যত্তো সব জবরদস্তি! জঙ্গল থেকে কাঠ-লকড়ি কুড়াবার খাজনা আমরা বিটিশদের দেবো না, জঙ্গলে জানোয়ার চড়াবার খাজনাও আমরা দেবো না!’
জমায়েতে বেশ কিছু শবর নারী ও পুরুষ। তারা তাদের হাতের লাঠি আর কাস্তে উপরে তুলে ধরে একসঙ্গে চেঁচিয়ে বলে উঠলো – ‘উলগুলান! উলগুলান! লড়াই! লড়াই! বিটিশ কানুন আমরা মানবুক নাই!’
কার্তিক শবর এই জমায়েতকে জানালো, ‘তোমরা তৈরী থাকো। লাঠি আর মশাল নিয়ে আমরা শান্তিপূর্ণ মিছিল করবো! আর কয়েক দিনের মধ্যেই সবাই দল বেঁধে থানায় যাবো! আমরা ব্রিটিশ-শাসন মানি না। গান্ধীজি আমাদের নেতা। সত্যাগ্রহ আন্দোলন আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে। খাজনা আমরা দেবো না!’
ওই জমায়েতে কতগুলো নারী-পুরুষ কন্ঠ একসাথে আওয়াজ তুললো – ‘বিটিশ-রাজ মানছি না, মানবো না। খাজনা আমরা দেবো না, দেবো না! বিটিশ, তু এঠারো ছাড়ি পলাই যা! পলাই যা!’
কার্তিক শবরের মেয়ে দেমাতি দেই শালিহান ওই জমায়েতে দাঁড়িয়ে বাপের কথা শুনছিল। সেও জনতার সাথে গলা মেলালো – ‘বিটিশ, তু এঠারো ছাড়ি পলাই যা! পলাই যা! ….’
সবার অলক্ষে শবরদের ওই জমায়েতে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়েছিল একজন উচ্চ বর্ণের মানুষ। স্থানীয় জমিদারের চর! সেদিন বিকেলেই জমিদারের কাছে খবর চলে গেলো, শীঘ্রই থানা ঘেরাও হবে। এই খবরটা থানাতেও শীঘ্রিই পৌঁছে গেলো। ব্রিটিশ শাসন অভিজ্ঞ। তারা জানে, জনজাগরণকে প্রথমেই ঠান্ডা করে দেয়া ভালো! তার রাস্তা হচ্ছে নেতা মানুষটাকে প্রথমেই টাইট করে দেয়া!
(৩)
দেমাতি-র বাপ কার্তিক শবর সেদিন জঙ্গলে আসে নি। কটক থেকে একজন সত্যাগ্রহী আসছে, কার্তিক শবরের কুটিরে তার পদার্পণ করার কথা। গান্ধীজির সত্যাগ্রহ আন্দোলনকে কি করে প্রত্যন্ত নুয়াপাড়া অঞ্চলে, আসপাশের গ্রামে গ্রামে আরো ছড়িয়ে দেয়া যায়?
অন্যদিকে মেয়ে পুরুষেরা জঙ্গলে বেরিয়েছে সেই কোন সকালে। কার্তিক শবরের মেয়ে দেমাতি দেই-ও ওদের দলে। এখানে শবর ছেলেমেয়েরা সবাই জঙ্গলে যায়। প্রত্যেকের হতে এক একটা বাঁশের বড়ো আকারের লাঠি। নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে। ওরা জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে মহুয়া বীজ, বুনো ফল, নানা ধরণের প্রাকৃতিক শস্য। পাথরের টুকরো দিয়ে মাটি খুঁড়ে ওরা সংগ্রহ করে গাছের মূল। গাভিন গরুছাগলের জন্যে জঙ্গল থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসে ঘাস লতা পাতা। সব সময়েই ওদের সতর্ক থাকতে হয়, যে কোন সময়ে বুনো শিয়াল, দাঁত বের করা কোনো হিংস্র জন্তু ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
সূর্য তখনো মাঝ আকাশ ছোঁয় নি। যেটা ভাবা, সেদিন সেটাই হলো। কতগুলো বাঁদর হঠাৎ লাফালাফি শুরু করলো। পাখিগুলো হঠাতই অশান্ত হয়ে কিচির মিচির শুরু করে দিলো। একটা নেকড়ে দূরে ওৎ পেতে ছিল; মতলব করছিল বাছুরটার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে! তক্ষুনি নজরে এলো বিধু শবরের। চিৎকার – ‘জানোয়ায়! জানোয়ার!’ শবর দলের পুরুষদের দলটা তেড়ে গেলো হিংস্র নেকড়েটার দিকে। এতোগুলো লোককে একসাথে তেড়ে আসতে দেখে নেকড়েটা ভয়ে পেছনে ছুটছে। বিধু শবর আর পুরুষদের ছোট্ট দলটাও ছুটছে নেকড়েটার পেছন পেছন। ওটাকে এলাকা ছাড়া করতে হবে। এরকম ঘটনা ওদের জীবনে নতুন কিছু না!
ওদিকে কার্তিক শবরের মেয়ে দেমাতি দেই। সে জঙ্গলে দেখছিল একটা গাছ, তার নীচে কুরমা জাতীয় কন্দ আছে। ভাবছিল, কন্দটা মাটির নীচ থেকে খুঁড়ে বের করবে কিনা? তখনই ব্যাপারটা নজরে এলো। চেঁচাতে চেঁচাতে দেমাতির দিকে ছুটে আসছে তাদেরই গাঁওএর মেয়েটা! – ‘তোর বাপাকো পুলিশ পিটুছে! তু জলদি করি ঘরকে যা! জলদি, জলদি!’
যুবতী শবরকন্যা দেমাতি দেই-এর মাথাটা ঘুরে গেলো। তার বাপকে পুলিশ মারছে! সঙ্গিনীরা দেখলো, কাঁধে লাঠিটা উঠিয়ে দেমাতি দেই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে তাদের গ্রামের দিকে ছুটছে। সে দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্য!
সঙ্গিনী শবর মেয়েগুলি চেঁচিয়ে জানালো – দাঁড়া দাঁড়া। তুই একা যাস না। আমরাও আসছি। কিন্তু দেমাতির হাতে অপেক্ষা করার মতো সময় নেই। তার বাপ কার্তিক শবর আক্রান্ত!
(৪)
দেমাতি ছুটতে ছুটতে তার গাঁওএর কাছে গিয়ে দেখলো, বট শাল গাছের ঘন ছায়ার নীচে অল্প কিছু গ্রামীন মানুষদের জটলা। সেখানে মাটিতে পড়ে আছে কার্তিক শবরের আহত শরীর। তার পায়ের মাংসল পেশী খানিকটা জখম করে বেরিয়ে গেছে গুলিটা। বেরিয়ে আসছে রক্ত। আর সেখানে উর্দিধারী তিনজন ব্রিটিশ পুলিশ হা হা করে হাসছে! এই দৃশ্য দেখে ষোলো বছরের যুবতী দেমাতির মাথায় রক্ত চড়ে গেছে!
ততক্ষণে অকুস্থলে প্রায় ত্রিশ চল্লিশ জনের একটা মেয়েদের দল এসে পড়েছে, যারা দেমাতির সাথে জঙ্গলে খাবার ফলমূল কাঠকুঠো এসব সংগ্রহ করছিল। মেয়েদের সবার কাঁধে এক একটা লাঠি! শবরদের গ্রামের সেই জায়গাটা মুহূর্তেই পরিণত হলো একটা রণক্ষেত্রে।
দেমাতি তেমন কিছু কথা না খরচ করে মুহুর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়লো কোমরে বন্দুকধারী ব্রিটিশ পুলিশটার উপরে! তার কানে এসেছিলো, এই বদমাশ বন্দুকয়ালা পুলিশটা তার বাপকে গুলি চালিয়েছে! দেমাতি তার নিজের লম্বা লাঠিটা দিয়ে নিমেষেই পুলিশটার ডান হাত আর বাম হাতে জবরদস্ত কয়েকটা মোক্ষম আঘাত মারলো! ঘটনাটা খুবই আকস্মিক, স্বতঃস্ফুর্ত! অদম্য সাহসে দেমাতি এলোপাথারি পেটাতে লাগলো তার বাপকে যে মেরেছে, সেই উর্দিয়ালা ব্রিটিশ দালালটাকে। পুলিশটা জবরদস্ত আক্রান্ত। সাধ্য কি, তার আহত হাত দুটোয় বন্দুকটা দিয়ে সে কি করে নিশানা বাঁধবে।
প্রায় ত্রিশ চল্লিশ জনের সেই মেয়েদের দলটা যারা লাঠি হাতে দেমাতির পেছন পেছন ছুটতে ছুটতে এসেছিল। ততক্ষণে তারাও ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দেমাতির দেখাদেখি তারাও ঘিরে ফেলেছে পুলিশদের বাকি দুজনকে। এলোপাথারি আক্রমণ।
মূল ভূমিকায় মাত্র ষোল বছর বয়েসী শবর যুবতী দেমাতি! তার সঙ্গী ত্রিশ-চল্লিশ জন শবর মেয়ে। বিপরীতে তিনজন অর্ধ সশস্ত্র পুলিশ।
সমস্ত ব্যাপারটা এমনই আচমকা ছিল, যে পুলিশেরা কিছু করার মতো অবস্থায় ছিল না! ওরা তিনজন দুটো সাইকেলে এসেছিল। কোনোক্রমে তারা বেশী আহত পুলিশ সঙ্গীটাকে একটা সাইকেলের পেছনে বসালো। দুটো সাইকেলে তারা তিনজন আত্মরক্ষার তাগিদে পগার পার! ফিরে গেলো নিজেদের ঠেকে!
এদিকে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা লাঠি হাতে শবরদের বিশাল প্রমিলা বাহিনী আর উপস্থিত গ্রামের লোকজন তাদের ভাষায় চিৎকার দিতে লাগলো – ‘বিটিশরাজ মানছি না। মানবো না। জঙ্গলের খাজনা দিচ্ছি না দেবো না! বিটিশ, তু এঠারো ছাড়ি পলাই যা! তু এ দেশ ছাড়ি পলাই যা!’
সমবেত শ্লোগান শুনে মাটিতে পড়ে থাকা কার্তিক শবরের রক্তাক্ত শরীরটা উজ্জীবিত হলো। ডান পায়ের থাই জখম। গড়িয়ে নামছে রক্ত। সে পা দু’টো টান টান করে জমিতে এক হাতে ভর দিয়ে পেছনে ঝুঁকে বসলো। কার্তিক শবরের গলার থেকেও ক্ষীণ স্বরে বেরিয়ে এলো বেদনার্ত আওয়াজ – ‘বিটিশ, তু এঠারো ছাড়ি পলাই যা!’
দেমাতি তার হাতের লাঠিটা মাটিতে রেখে বাপের শরীরটাতে ঠিক মতো বসালো। কেউ একজন মাটির পাত্রে তার দিকে জল এগিয়ে দিলো। সবাই মিলে শলা পরামর্শ করে ঠিক করা হলো, কার্তিক শবরকে কবিরাজের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। ডাক্তার তো এখানে অমিল। অগত্যা সবাই মিলে ধরাধরি করে কার্তিক শবরকে নিয়ে গেলো স্থানীয় কবিরাজের কাছে। যদিও থাইএর ক্ষতস্থান থেকে মাংস বেরিয়ে পড়েছে, তবুও ভেতরে বুলেট আটকে নেই। কবিরাজ ক্ষতটা পরিস্কার করে, জড়ি বুটি লাগিয়ে সেখানে কাপড়ের ব্যান্ডেজ করে দিল। সে যাত্রা কার্তিক শবর বেঁচে গেলো। তার আত্মজা দেমাতি আর লাঠি হাতে মেয়েদের দল সেদিন গড়ে তুললো শবর বিদ্রোহের এক নতুন ইতিহাস! সেটা ১৯২৯-৩০ সাল!
নানা সক্রিয়তায়। বহু মানুষের আত্মত্যাগে পরাধীন দেশটার ইতিহাস এগিয়ে চললো। দেশটাও স্বাধীন হলো। সময়ের নদীতে গড়িয়ে গেলো অনেক জল!
(৫)
স্বাধীনতার পরেও কিন্তু দেমাতি দেই শালিহানের অবস্থা তেমন কিছু পালটায় নি। সে থাকে গ্রামেরই একটা ঝুপড়ি ঘরে। কোনো ক্রমে চলে দিন আনা দিন খাওয়া। যে স্বাধীনতার জন্যে তার বাপ জেলে গেছে, যে স্বাধীনতার জন্যে সে উড়িষ্যার একটা গ্রামে একদল মেয়ে নিয়ে ব্রিটিশ পুলিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তারপর অনেক অনেক কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অনেকে নেতা মন্ত্রী হয়েছে, অনেকে মাসিক পেনশন পেয়েছে, কিন্তু দেমাতি দেইর কপালে সেসব কিছুই জোটে নি। কারণ সে জেল খাটে নি, তার নামে কারাগার-যাপনের কোনো সার্টিফিকেট বা নথিপত্র পাওয়া যায় নি। তাই তার জীবনের দুঃরবস্থা ঘোচে নি। অথচ ১৯২৯-১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দে একটা গ্রামে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যে উল্লেখযোগ্য স্বাধীনতার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে দেমাতি দেই শালিহানের অবদান কি কিছু কম ছিল?
দেমাতি এখনো চোখ বুঝলে দেখতে পায় ব্রিটিশদের সাথে লড়াইএর সে সব দিনগুলোকে। তার বাপ কার্তিক শবরের সেই দীর্ঘস্থায়ী লড়াই।
১৯৯৭তে দেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর। ১৯৩০ এর শালিহা সত্যাগ্রহ, তখন দেমাতি দেই-র বয়েস ছিল ষোলো। এখন তার বয়েস ৯৭ বছর, আন্দোলনের ৬৭বছর অতিক্রান্ত!
সেদিনটাতে গ্রামের প্রধান একটা চিঠি নিয়ে এলো। শালিহা বিদ্রোহের স্মরণে একটা স্মৃতিসৌধর উন্মোচন করা হবে। তাতে দেমাতি দেই-ও আমন্ত্রিত। প্রথমে একটা অনিচ্ছা সুলভ মনোভাব দেখালেও খবরটা পেয়ে সে খুশি হলো।
মঞ্চে আসীন বৃদ্ধা দেমাতি দেই শালিহান। কিছুটা ভাব প্রবণ হয়ে পড়েছিল সে। অনেক লোকজন সেখানে জড়ো হয়েছে। দেশের একজন বড় নেতা স্মৃতিসৌধটির উন্মোচন করলেন। সেই বিশাল অনুষ্ঠানে দেমাতি দেই শালিহানকে সরকারী তরফে একটা সুসজ্জিত রঙিন প্রশংসাপত্র দিয়ে সম্মানিত করা হলো। একজন স্থানীয় নেতা তার ভাষণে জানালো, - নুয়াপাড়ার এই গ্রামের নাম ‘শালিহা’ রাখা হয়েছে তাদেরই বীর কন্যা দেমাতি দেই শালিহান-এর নামে! তিনি এই গ্রামেরই সেই মেয়ে, যিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে অসীম সাহসে ব্রিটিশ পুলিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, এমন ঘটনা ইতিহাসে বিরল! তিনি এই সভায় আজ উপস্থিত, তাকে সম্বর্ধনা দিতে পেরে আমরা গ্রামবাসীরা গর্বিত!
শালিহা গ্রামে সুসজ্জিত স্মৃতিসৌধটার উন্মোচন দেমাতি-র জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তারই উপস্থিতিতে, তাকে সম্বর্ধিত করে একটা অনুষ্ঠান! জেল খাটা স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তার মৃত বাপ কার্তিক শবরের নামটাও সেই অনুষ্ঠানে বারবার উচ্চারিত হয়েছিল।
সেদিন খুশী মনে দেমাতি ঘরে ফিরে এলো। মনে মনে বিশ্বাস করেছিল, সে আর তার বাপ কার্তিক শবর, এই স্মৃতিসৌধটার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের দুজন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে ইতিহাসে বেঁচে থাকবে। কিন্তু সে কতটা ঠিক জানতো?
(৬)
দশ এগারো বছর কেটে গেছে। ২০০৮ এর পরবর্তী কোন একটা সময়।
শালিহার এই স্মৃতিসৌধটার উপরে একটা সুদৃশ্য নাম ফলক লাগানো হয়েছে! সেখানে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে খোঁদাই রয়েছে পরপর ১৭ জনের নাম। না! তাদের নাম নেই! সেখানে দেমাতি দেই শালিহানের নাম নাই থাকতে পারে, তার বাপ কার্তিক শবরের নামটাও নেই। যদিও তারা দুজন তখন আর বেঁচেও নেই। মৃত! কিন্তু স্মৃতিরও কি মৃত্যু হতে পারে? হায়! স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস!
তাই মাঝে মাঝেই ওদের দুজনের আত্মা মাঝরাতে এসে শহীদবেদীটার সামনে দাঁড়ায়! পাশাপাশি দাঁড়িয়ে স্মৃতিসৌধটাকে স্যালুট জানিয়ে দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠলো – জয় হিন্দ!
মেয়েটি বুড়ো মানুষটাকে বললো – ‘বাবা! এই সাতেরো জন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে কার্তিক শবরের নামটাই নেই!’
বুড়ো মানুষটার বুকে সেই পুরোনো কথা, ‘এতে অবাক হবার কি আছে! সৌধের ফলকে নাম থাকবে, তার জন্যে তো সেই যুগে আমরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করি নি! আজকাল দেশের নেতারা তো ধান্ধায় ঘোরে। দেশের ফয়দা? নাকি নিজের নিজের ফয়দা? কি করে ভোটে জেতা যাবে। কি করে গদী দখল করা যাবে! যাক সে সব কথা!’
রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে শালিহার স্মৃতিসৌধটা মাঝে মাঝে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ওটা দেখতে পায় শালিহা গ্রামে ঘটে যাওয়া অতীত দিনের ছবি। দেমাতি দেই শালিহানের এর সেই তান্ডব মূর্তি! স্মৃতিসৌধটা শুনতে পায় ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে ১৯৩০ সালের শবর-মানুষজনের গন উত্থান – উলগুলান! উলগুলান! অথচ মাত্র সাতেরোজন, বাছাই-করা! কে বেছেছে? বাদবাকী সব নাম বাদ! মাত্র সাতেরোজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর বিজ্ঞাপন বুকে সেঁটে এই স্মৃতিসৌধটার ভয়ে লজ্জায় দুঃখে মাথা হেঁট করে থাকে! তখনই আকাশে শবর বংশীয় বাপ-মেয়ের জোড়া আত্মাদুটো শহীদবেদীটার মাথার উপরে চক্কর লাগায় – তারা দেখে দেশের মানচিত্র, দেখে অঞ্চলের হালচাল, নেতাদের কার্যকলাপ! ওরা আকাশে ওড়ে, ওদের কোন দায় নেই, কারণ ওরা এখন মৃত!
[তথ্য ঋণ – পি সাইনাথ রচিত গ্রন্থ “আননোন হিরোস অফ ইন্ডিয়া’স ফ্রীডম স্ট্রাগল”।]


0 comments: