গল্প - বিশ্বজিৎ দত্ত
Posted in গল্পসিএ হওয়াটা আমার ভবিতব্য ছিল। আমি ছোটবেলা থেকেই একটি খাতায় খালি বিয়োগের হিসাব রাখি। দুঃখ হতো না কোনো, এখনো হয় না। বিয়োগ মানে তো দান করা, দিদু বলেছিল। যা নিজের নয় তা রেখে কী লাভ বলো। যত দান করবে ততই তুমি হালকা হয়ে যাবে। একদিন মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়বে। আমি দিদুর কথার মানে বুঝতে পারিনি। কিন্তু পাখি হয়ে উড়ব নীল আকাশে। এত দারুণ ব্যাপার।
তখন আমার বারো বছর বয়স। সুপ্রিয়র খুব মন খারাপ। সদ্য পিতৃবিয়োগ এবং তার ফলে বাবার সাথে ঘুমও হারিয়ে গিয়েছে তার জীবন থেকে। আমি নিয়ে গেলাম তাঁকে গ্রামের শেষপ্রান্তে। যেখানে আছে একটি ভাঙা মন্দির, একটি টিউবকল ও একটি বহু পুরাতন নিম গাছ। আর আছে সে। তার কথায় পরে আসছি। সেই নিম গাছের নিচে মেরুদণ্ড সোজা করে বসলাম। ঠিক যেমন টিভিতে রামায়ণ সিরিয়াল দেখেছিলাম। সুপ্রিয়র মাথায় হাত দিয়ে বললাম, ভগবান ওকে ঘুম দাও। কিশোর বয়সের একটি কাতরতা থাকে। সেই কাতরতা থেকে মনে হয় সমস্ত সমস্যাই খুব একান্ত। সেই রাতে আমি দু চোখের পাতা এক করতে পারিনি।
সুপ্রিয় পেরেছিল। ও অনেকদিন পর বারো ঘণ্টা ঘুমোয়। সেই শুরু আমার বিয়োগের। এবং তার সাথে খাতায় হিসেব তুলে রাখার। জিভের স্বাদ দিয়ে দিই রানু পিসিকে। রানু পিসির ছোটবেলায় আন্ত্রিক হয়েছিল। এর ফলে জিভের সমস্ত কোষ খারাপ হয়ে যায়। আর তার সাথে শেষ হয়ে যায় মাস্টার শেফ হবার স্বপ্ন। শেফ যদি ফারাক না করতে পারে লবণে ও চিনিতে তাহলে ভালো রান্না আর তৈরি করবে কী করে? আবার বসলাম নিম গাছের নিচে আর দিয়ে দিলাম রানু পিসিকে আমার স্বাদ। প্রতি বছর কলকাতার ফাইভ স্টার হোটেলের রান্নাঘর থেকে আমার জন্মদিনে একটা ৫ কেজির কেক আসে। আমি গ্রামের বাচ্চাদের দিয়ে দিই। আমার কাছে কেকও যা, বার্লিও তাই।
দিদু আমার পনেরো বছর বয়সে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন। দধীচি মুনির গল্প। উনি একদিন একটি নিম গাছের নিচে বসে ধ্যান করছিলেন, বিশ্বকর্মা ওনার কাছে এসে উপস্থিত হন। অসুরদের কাছে দেবতারা খালি পরাজিত হচ্ছে, এর প্রতিকার একটাই, যদি দধীচি মুনি তার হাড় দান করে দেন, তবে বিশ্বকর্মা একটা বজ্র তৈরি করবেন ওই হাড় দিয়ে এবং অসুরদের যুদ্ধে পরাজিত করবেন ইন্দ্র বজ্রাঘাত করে। দধীচি মুনি হাসিমুখে নিজের হাড় দান করেন। আমি দিদুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম দধীচি মুনি কি উড়তে চাইতেন? তিনি নিশ্চয়ই পাখি হয়ে গেছিলেন। দিদু বললেন তা তো জানি না। তবে তুমি ওই দধীচি মুনির বংশধর। তুমি বর পেয়েছ দান করার। আমার দিদুর গল্প শুনে মনে হলো দধীচি মুনিও নিশ্চয়ই মানুষ হবার থেকে পাখি হতেই চাইতেন।
আপনারা নিশ্চয় বুঝেছেন যে গ্রামের লোকজন আমাকে আমার সিএ গুণের থেকেও বেশি দানের জন্য মনে রেখেছে। আমার খাতা অনুসারে ৫০ বছর বয়স অব্দি আমি দান করেছি
১) ঘুম (সাপ্তাহিক কিস্তিতে, সাময়িক),
২) স্বাদ, (চিরজীবনের জন্য)
৩)গানের গলা (ট্রেনে বাউল গান গাইতেন রাহুলদা, পুলিশ মাঝখানে অ্যারেস্ট করে কারণ সরকার নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল ট্রেনে গান গাওয়া, এখন বাংলা সিনেমায় প্লেব্যাক করে),
৪) কাঁদার ক্ষমতা (এক বিধবা স্বামীর মৃত্যুতে কাঁদছিলেন না, আত্মীয়স্বজন তাঁকে মেরে সম্পত্তি নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, নারীর চোখের জলের অসীম ক্ষমতা দেখেছিলাম সেদিন)
৫) জীবনের তিনটি বছর (সমীরের ভাইঝির হার্টে ফুটো ছিল)
আরও অনেক বিয়োগ লেখা আছে কিন্তু যোগ নেই একটাও। কেউ যদি আমায় জিজ্ঞেস করত আমি কি একা, আমি উত্তর দিতাম আমি ব্যস্ত। আমি আসলে গ্রামের পাতকুয়ো। সবাই প্রয়োজনে একটি করে বালতি কুয়োতে ডুবিয়ে জল ভরে নিয়ে যায়। কিন্তু ওই বালতি ডুবোনোর ফলে কুয়োর ভেতরে যে একটি অস্থিরতা তৈরি হয় তার খোঁজ কেউ নেয় না।
তবে আমার একটি খ্যাতি তৈরি হয়েছে এই গ্রামে। কেউ কেউ আমায় সাধক হিসেবে ভাবতে লাগল এবং প্রণামী হিসেবে দশ বিশ টাকা করে দিতে থাকল। ভালোই হলো, আজকাল বিড়ি সিগারেটের যা দাম বেড়েছে, আমার একটু সুবিধা হয়। তবে প্রণামী দিয়ে লাভ হয় না দানের ক্ষেত্রে। আমি একবার টাকার বিনিময়ে সুদীপকে আমার সুন্দর হাতের লেখা দিতে চেয়েছিলাম। সুদীপ UPSC পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছিল। কিন্তু কিছুই হলো না। ওর হাতের লেখা অপরিষ্কার থেকে গেল। তবে আজকাল ও প্রোমোটার হয়েছে। বড় গাড়ি, বড় বাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমাকে দেখে বলে কি সাধু ভালো আছেন? কিছু অসুবিধা হলে বলবেন। আমি হাসি।
গ্রামের ওই শেষ প্রান্তরে আমার বাড়ি তৈরি করে নিয়েছি। ভাঙা মন্দির, পুরাতন নিম গাছ এবং একটি টিউবকল। আর সাথে সে।
নিকষ কালো মার্বেলের তৈরি পাষাণী। হাত জোড় করে নতমস্তকে হাঁটু মুড়ে চেয়ে আছে মন্দির প্রাণে। জনশ্রুতি এই পাষাণীর নাম অহল্যা। স্বামী ছিলেন ব্রাহ্মণ। পুজো করতে বেরিয়েছিলেন এবং সেই সময় উনি ব্যভিচারে লিপ্ত হন দেবরাজ ইন্দ্রের সাথে। সেই ইন্দ্র যার জন্য মুনি প্রাণ ত্যাগ করেন। অহল্যার স্বামী ফিরে এসে অভিশাপ দেন এবং তার ফলে পাথরের মূর্তি হয়ে যান। গ্রামের প্রান্তে রাখা হয়েছে এই মূর্তিটিকে একটি সতর্কীকরণ হিসেবে। পাষাণীর পুজো হয় না ।খালি আমি প্রতি সন্ধ্যায় ওর করজোড় প্রস্তর হাতে একটি তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখি। ছোটো ছেলেরা ওর হাতের প্রদীপটি কেড়ে নিয়ে খেলা করে। সবাই তাঁকে স্পর্শ করে, কিন্তু দেখে না কেউ।
আর পাষাণী অভিশাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে থাকে হাত জোড় করে।
আমি দুবেলা তার সাথে কথা বলি। সকালে বাজার থেকে খবরের কাগজ নিয়ে এসে ওকে পড়ে শোনাই। দুপুরে স্বাদহীন বার্লি খেতে খেতে সমস্ত পৃথিবীর দুঃখ সুখ জানাই। পাষাণী চেয়ে থাকে মন্দির প্রান্তে। অপেক্ষায় আছে কবে অভিশাপ থেকে মুক্তি দেবে এই কঠোর পৃথিবী।
লোকে প্রথমে ঠাট্টা করতে থাকে আমাকে নিয়ে, তারপর অকথা কুকথা চলে, এবং তারপর আবার ঠাট্টা করাতে ফিরে যায়। ঠাট্টা করা সহজ, কুকথা বলতে পরিশ্রম করতে হয়। আমি আমার কথা চালিয়ে যাই। পাষাণীকে আমার খাতার সব বিয়োগ বলি। সে আর পাষাণী নয় আমার সহধর্মিণী হয়ে উঠেছে। সেই সহধর্মিণী যে স্বামীর সমস্ত কথা জানে এবং শুনে বিরক্ত হয়।
পাথরকে পড়ে শোনানোর অভ্যাসের ফল হলো যে একসময় নিজেই নানা রকমের গল্পের ভাণ্ডার হয়ে যায় পাঠক। আমিও গল্পের এনসাইক্লোপিডিয়া হয়ে গেছি। অহল্যার সমস্ত গল্প ওর প্রতি অবিচারের দিকে ইঙ্গিত করে। প্রতি রাত্রে আমি স্বপ্নে পাষাণীকে দেখি। সে বলে আমায় মুক্ত করো। আমি দোষী নই। আমি ঘুম থেকে উঠে পড়ি। ঘর্মাক্ত। বিভ্রান্ত। সকালে পাষাণীর কাছে যাই। ওর নতমস্তক যেন আরেকটু নত হয়েছে। পাথরের গণ্ডে অশ্রুধারা দেখা যাচ্ছে।
আমি ঠিক করি পাষাণে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করব। অহল্যা কেন শাস্তি ভোগ করবে কারুর কপটতার। আজকে ওকে মুক্তি দিয়ে আমার বিয়োগের খাতা এখানেই বন্ধ করব। আমি নিম গাছের নিচে হাঁটু মুড়ে বসলাম, এবং পাষাণী, না আর পাষাণী নয়, অহল্যার মাথায় হাত ঠেকালাম। ভগবান ওকে প্রাণ দাও আমার প্রাণের বিনিময়ে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কিছুই হলো না।
ফিরে গেলাম আবার গল্পের ভাণ্ডারে। কোথাও তো লেখা থাকবে ওর মুক্তির উপায়। প্রতি বছর চড়কের মেলা হয় এই গ্রামেই। সেখানে অহল্যার কথা লাউডস্পিকারে বাউলরা গেয়ে শোনায়। ওর ব্যভিচারের গল্প পুরো মেলায় গমগম করে ওঠে। কিন্তু ওর সাথে তো কপটতা করা হয়েছিল। সেটা তো কেউ বলে না। অহল্যার মুক্তি কী করে হবে? আর আমার দানও কেন কাজ করছে না?
চড়কের মেলায় ঘুরছি আর শুনছি কথকদের গল্পকথা। এই মাঝেই ঝগড়া শুরু হয়েছে মঞ্চের মাঝখানে। এক কথক মেলার কর্মকর্তাকে বলছে পয়সা কেন কম দেওয়া হবে? কর্মকর্তা জবাব দিলেন আপনি তো সাধক মানুষ, আর এত কামিনীকাঞ্চনের লোভ? কথক বললেন লোভ নয়, সম্মান। কপটতা করা কারুর সাথে মানে তাকে অসম্মান করা। অসম্মান মানুষের হৃদয়কে পাষাণ করে তোলে। বাকি কথা আর আমার কানে ঢোকেনি। কারণ আমি ওর মুক্তির সন্ধান পেয়ে গেছি।
………..
আজ শুক্লপক্ষ। প্রচুর সমাগম হয়েছে মন্দিরে। দেবী অহল্যার মন্দিরটি নাকি খুব জাগ্রত। উনি সবার মনস্কামনা নাকি পূর্ণ করেন। তাই প্রচুর লোক এসেছে আজকে পুজো দিতে এই কালো পাষাণের মূর্তির কাছে। ভিড়ে রয়েছে রাহুলদা, প্লেব্যাক সিঙ্গার, সমীরের ভাইঝি যার নাকি হৃদয়ের ফুটো সেরে গেছে এখানে পুজো দিয়ে এবং আরো অনেকে। কলকাতা থেকে বিশাল নামী একজন শেফ এসেছেন। উনি নাকি অহল্যা মায়ের দয়ায় খ্যাতি পেয়েছেন। নাহলে তো আন্ত্রিকের ফলে ওনার জিভের স্বাদই নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। নষ্ট জিভে কি আর রাঁধুনি হওয়া যায়। সব এই মায়ের কৃপা। এখানে নাকি একটা পাগল থাকত আগে এই মন্দিরে। তাকে আর দেখা যায় না।
এটাই আমার খাতায় শেষ বিয়োগ,আমার সিএ কর্মজীবনের ইতি এই পৃথিবীতে। অহল্যাকে আমার খ্যাতি দান করলাম। তাতে মূর্তি প্রাণ পায়নি। সে মূর্তি থেকে বিগ্রহে পরিণত হয়েছে। রাজ্যের সব থেকে বড় মন্দির তৈরি হয়েছে ওর পুজোর জন্য। অহল্যার শাপমোচন ঘটেছে। আমিও আছি। বহু দূরে, নীল নভোচরে,মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে। আমি যাচ্ছি ইন্দ্রের কাছে, ওনার কাছে আমার একটি দেবোত্তর সম্পত্তি গচ্ছিত আছে।


0 comments: