0

গল্প - মনোজ কর

Posted in





















২১



পরের দিন কেলো দারোগা থানায় সবাইকে ডেকে পাঠালো। এই ব্যাপারটা মেটাতে না পারলে তার ঘুম হচ্ছে না। সবাইকে উদ্দেশ্য করে কেলো দারোগা বললো,’ আমি গতকাল সারারাত ধরে একটা ছবি আঁকার চেষ্টা করেছি যা থেকে অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যাবে যে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল।‘সকলে নড়েচড়ে বসলো। কেলো দারোগা বলতে শুরু করলো,’ মেডিক্যাল পরীক্ষা থেকে বোঝা গেছে যে বন্দুকের নল শিবুলালের বুকে ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছিল। যার ফলে গুলি এবং গ্যাস দু’টোই সরাসরি শিবুলালের হৃদপিন্ড ভেদ করে শরীরের ভিতর ঢুকে যায়। রেবা কৈরালার সেদিন ঐ সময়ে শিবুলালের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। রেবা সেদিন ঐ সময় অ্যাপার্টমেন্টের সামনের দরজা দিয়ে শিবুলালের সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রবেশ করে কিন্তু অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পিছনের দরজা দিয়ে বেরোয়। আমার কাছে প্রমাণ আছে যে সে খুন করার পর শিবুলালের দেহ থেকে নির্গত রক্তের ওপর অসাবধানতাবশত পা ফেলে তারপর সেই রক্তের দাগ ধোওয়ার জন্য বাথরুমে যায়। কিন্তু রক্তের ওপর তার জুতোর ছাপ এবং বাথরুমের তোয়ালেতে রক্তের এবং জুতোর ময়লার দাগ থেকে যায়। রেবার বন্ধু কৃষ্ণকালীবাবু ঐ প্রমাণ লোপের জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। সে সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণে আমি পরে আসছি। আমার কাছে প্রমাণ আছে যে যে বন্দুক দিয়ে শিবুলালকে গুলি করা হয়েছিল তা আগে থেকেই রেবার কাছে ছিল। রেবার এবং কৃষ্ণকালীবাবুর পরম শুভাকাঙ্খী আমাদের সকলের পরিচিত এবং শ্রদ্ধেয় পানু রায় মহাশয় ব্যাপারটাকে গুলিয়ে দেবার জন্য এক অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নেন। কিন্তু খুনী বন্দুকটা শেষ অবধি রেবা কৈরালার কাছ থেকেই পাওয়া যায়। রেবাদেবী যদি এব্যাপারে আলোকপাত করেন তাহলে সুবিধা হয়। পানু রায় কেন এই খুনীকে বাঁচাবার চেষ্টা করছেন সে ব্যাপারে আমি পরে আসছি। কিন্তু আপাতত রেবা কৈরালাই যে খুন করেছে সে ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহ নেই। মিঃ রায়, আপনার কিছু বলার আছে?’

-আপনার যদি বলা শেষ হয়ে থাকে তাহলে আমি বলতে পারি। নাহলে আমি আর একটু অপেক্ষা করতে পারি। আপনি ভেবে নিয়ে আমায় বলুন।

-আচ্ছা, আমি একটা ছবি দেখাচ্ছি। ছবিটা আমার তোলা। আমি যখন রেবা কৈরালার বাড়িতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গিয়েছিলাম তখন আমি তার টেবিলে খুনী বন্দুকটা দেখেছিলাম। আমি সেটার একটা ছবি তুলে নিয়ে আসি পরে প্রমাণ হিসাবে দরকার হবে বলে।

ছবিটা পানু রায়ের হাতে দিয়ে কেলো দারোগা বললো,’ এবার আপনি বলুন।‘

-এই ছবির বন্দুকটাকেই কি আপনারা খুনী বন্দুক বলে নির্ধারিত করেছেন?

-অবশ্যই। না হলে এই ছবিটা আপনাকে দেখাচ্ছি কেন?

-বন্দুকটা যখন প্রথম দেখেন আর ছবিটা যখন তোলা হয় বন্দুকটা কি একই জায়গায় ছিল?

-হ্যাঁ, একই পোজিশনে।

-তাহলে বন্দুকটা পরীক্ষা করার আগেই ছবিটা তোলা হয়েছিল?

-হ্যাঁ, মানে ঠিক তা নয়। বন্দুকটা পরীক্ষা করার পর যেমন ছিল ঠিক তেমন করে রেখে ছবিটা তোলা হয়েছিল।

-বেশ, কী পরীক্ষা করেছিলেন?

-আমি সিলিন্ডারটা খুলে দেখেছিলাম একটা গুলি নেই। তারপর শুঁকে দেখেছিলাম কোনও গন্ধ পাওয়া যায় কি না।

-ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেবার জন্য কোনও পাউডার ছড়িয়েছিলেন?

-হ্যাঁ। তারপর বন্দুকটা যে পোজিশনে ছিল সেই পোজিশনে রেখে ছবি তোলা হয়েছিল।

-যে গুলিটা শিবুলালের শরীর থেকে পাওয়া গেছে সেটা যে এই বন্দুক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল সেটা কী করে জানা গেল? আমি জানতে চাইছি কোনও পরীক্ষা করা হয়েছিল না আন্দাজে বলছেন?

-একদম করা হয়েছিল।

-কখন করা হয়েছিল?

-কয়েক ঘন্টার মধ্যে করা হয়েছিল।

-কয়েকঘন্টা মানে কী?

-খুব একটা বেশি সময় নয়।

-কতক্ষণ? চব্বিশ ঘন্টা? আটচল্লিশ ঘন্টা?

-না, আটচল্লিশ ঘন্টা নয়।

-তাহলে চব্বিশ ঘন্টা?

-হয়তো তাই। কমও হতে পারে।

-কে বন্দুকটা আবার যে জায়গায় ছিল সেই জায়গায় রেখে দিল?

-আমিই রেখেছিলাম।

-আপনি কী করে বলছেন আপনি ঠিক সেই জায়গায় সেই অবস্থায় রেখেছিলেন?

-আমার মনে আছে।

-আপনি কি দাগ দিয়ে রেখেছিলেন?

-না, কোনও দাগ দেওয়ার দরকার ছিল না।

-যখন আপনি ঘরে ঢুকলেন এবং বন্দুকটা দেখতে পেলেন তখন বন্দুকের নলটা কোনদিকে মুখ করে রাখা ছিল? দরজার দিকে না অন্য কোনও দিকে?

-ছবিতে যেরকম দেখা যাচ্ছে সেরকম।

- ছবিটা না দেখে বলুন কোনদিকে মুখ করে রাখা ছিল? দরজার দিকে না অন্য কোনও দিকে?

- আমার এখন মনে পড়ছে না। তবে আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে বন্দুকটা রেখেছিলাম তাই তখন আমার মনে ছিল। এখন মনে পড়ছে না।

-আচ্ছা। আর একটা কথা বলুন। রেবা কৈরালা কি আপনাকে কার কাছ থেকে বন্দুকটা পেয়েছিল তার নাম বলেছিল?

- নিশ্চয়ই। সে বলেছিল মিঃ কে কে চৌধুরীর কাছ থেকে পেয়েছিল।

-ওটা নামের আদ্যক্ষর এবং পদবি। আমি জানতে চাইছি নাম বলেছিল কিনা? কেননা আপনি জানেন কৃষ্ণকালী এবং কালীকৃষ্ণ উভয়েই কে কে চৌধুরী।

- এবার বলুন রেবা কি বলেছিল যে কখন সে বন্দুকটা পেয়েছিল?

-না বলে নি। মানে ওনাকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

-আপনি রেবার অ্যাপার্টমেন্টে কখন গিয়েছিলেন?

-এগারোটা পয়ঁতাল্লিশ।

-দারোগা বাবু, আমার মনে হয় রেবার বিরুদ্ধে কেস কোর্টে পাঠানোর আগে আমরা যদি যারা এই বন্দুক, রক্তের দাগ, আঙ্গুলের ছাপ এইসব পরীক্ষা করেছিল তাদের সঙ্গে কথা বলে নিলে ভালো হয়। আমার তাই মনে হয়। আমি এবং আপনি দু’জনেই নিশ্চিত হতে পারলে কোর্টে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয়না। তা না হলে আপনি জানেন আমাদের কোর্টগুলোতে কেসের যে পরিমাণ পাহাড় জমে আছে তাতে তারিখ পেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তারপর দু’দিকের উকিলকে সবকিছু বোঝাতে আবার সময় লাগবে। দেখুন এটা আমার প্রস্তাব। সিদ্ধান্ত আপনার।

-আমাকে একটু সময় দিন। আপনারা বসুন। আমি একটু পরে এসে জানাচ্ছি।

কেলো দারোগা বেরিয়ে গেল। পানু রায় ফোনে কার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন ঠিক বোঝা গেল না। মিনিট দশেক বাদে কেলো দারোগা এসে বলে গেলেন যে উনি যারা বিভিন্ন পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের জানিয়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই এসে যাবে। একজন এলেই আবার কথাবার্তা শুরু করা যাবে। তারপর ঘুরে পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,’ আপনি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই জেলে পাঠাবো না। নিশ্চিন্তে থাকুন। তবে এবার ছাড় পাবেন না।‘পানু রায় হেসে বললেন,’ সত্যের জয় হবে। আমি বা আপনি কেউ নয়। সত্যের সন্ধানই আমাদের কাজ। কাউকে সন্দেহের বশে কোর্টে পাঠানো ঠিক নয়। তাতে যদি একটু সময় যায় সে আর কী এমন বড় ব্যাপার? ‘

কিছুক্ষণের মধ্যেই কেলো দারোগা একজন কমবয়সী সুদর্শন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকলেন। পানু রায়কে বললেন,’ ইনি সাইন্টিফিক ইনভেস্টিগেটর এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট। শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে ইনিই গিয়েছিলেন তদন্তের জন্য। যা যা পরীক্ষা হয়েছিল ইনিই সেগুলি করেছেন এবং আমাদের জানিয়েছেন। আপনি ওনাকে আপনার যা যা জিজ্ঞাসা আছে করতে পারেন।‘

পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ আপনি কি কোনও পরণের জিনিস সেদিন ওখানে পেয়েছিলেন? ‘

-হ্যাঁ, আমি একটা বাঁ পায়ের জুতো পেয়েছিলাম।যার সোল এবং হিলে রক্তের দাগ ছিল।

-আপনি কি নিশ্চিত যে ঐ দাগগুলো মানুষের রক্তের দাগ ছিল?

-না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। জুতোটা ধুয়ে ফেলা হয়েছিল। অল্প যেটুকু দাগ লেগেছিল সেটা পরীক্ষা করে বোঝা গেছে ওটা রক্তের দাগ ছিল।

-জুতোটার কোনও বৈশিষ্ট ছিল?

-ঐ জুতোর সোলটা একধরণের বিশেষ রাবার দিয়ে তৈরি। খুব দামি জুতো ছাড়া ঐ ধরণের রাবার ব্যবহার করা হয় না।

-বেশ। আপনি কি ওখানে কোনও ময়লা তোয়ালে পেয়েছিলেন?

-হ্যাঁ, আমি বলতেই যাচ্ছিলাম। ওখানে একটা তোয়ালে পেয়েছিলাম তাতে রক্তের ছাপ ছিল। বোঝা যাচ্ছিল কোনও রক্তমাখা জিনিসকে মোছার জন্য ওটা ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে খুব ভালো করে পরীক্ষা করে দেখা গেছে ঐ তোয়ালেতে জুতোর সোলে যে রাবার ছিল তার গুঁড়োও লেগেছিল।

কেলো দারোগা বললো,’ আপনি জুতোর ছাপের একটা রঙ্গীন ছবি দেখে কিছু সিদ্ধান্তে এসেছিলেন। সেটা যদি আপনি একবার মিঃ রায়কে বলেন তাহলে উনি আপনার কাছে হয়ত আরও কিছু জানতে চাইতে পারেন। ওনাকে সবদিক দিয়ে সন্তুষ্ট করার পরেই আমরা কোর্টে যাব।‘

-আমি ঐ ছবিতে দু’টো জুতোর ছাপ দেখেছি। একটা জুতোর হিল বেশ উঁচু এবং ধাতুনির্মিত। ঐ হিলের নিচে ইংরেজিতে ৩৩ লেখা আছে এবং যার ছাপ অস্পষ্ট হলেও ছবিতে দেখা যাচ্ছে। আতশ কাঁচের নিচে ধরলে লেখাটা আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ঐ জুতোটার ছাপের ওপর একটা বড় সাইজের ছেলেদের জুতোর ছাপ দেখা যাচ্ছে। এটাও বোঝা যাচ্ছে যে মেয়েদের জুতোর ছাপটার ওপরে বেশ কিছুক্ষন পরে ধরা যেতে পারে দুই থেকে তিনঘন্টা পরে। ছেলেদের জুতোর ছাপটা পড়েছে।

-আমি ধরে নিলাম আপনি দায়িত্ব নিয়েই সময়ের হিসাবটা দিচ্ছেন। আমি বলতে চাইছি কোনও এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যে ব্যাপারে আপনি একজন বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ কেবলমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে নয়।

-অবশ্যই। এটাই আমার পেশা। আমি প্রায় প্রতিদিন এই পরীক্ষা নিরীক্ষাই করে থাকি।

-বেশ, ঐ জুতোটা আপনি কোথায় পেয়েছিলেন?

-কৃষ্ণকালীবাবুর অফিসে একটা স্যুটকেসের ভিতর থেকে।

-ঠিক আছে।এবার আঙ্গুলের ছাপের প্রসঙ্গে আসা যাক। আপনি কি দেখেছিলেন এবং কোথায় দেখেছিলেন?

-শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টের সবকটা দরজার হাতলের সব ছাপ যত্নসহকারে মুছে ফেলা হয়েছিল।কেবলমাত্র একটা ছাড়া।

-কোথায় আঙ্গুলের ছাপ মোছা হয়নি? সেখানে কী দেখা গেল?

-পিছনের দরজায়। কেউ একজন সযত্নে হাতলটা মুছে তার ওপর একটা বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুলের ছাপ বসিয়ে দিয়েছে।

-ওটা কার আঙ্গুলের ছাপ ছিল?

-কৃষ্ণকালী চৌধুরীর।

-আঙ্গুলের ছাপটা কোন সময়ের বলা যেতে পারে? খুনের আগের না পরের?

- সেটা বলতে পারবো না। তবে এটা বলতে পারি যে ঐ ছাপটা বসানো হয়েছিল সমস্ত দরজার হাতল থেকে ছাপ মুছে দেওয়ার পর। যেহেতু ঐ একটি মাত্র ছাপই পাওয়া গেছে সুতরাং বলা যেতে পারে ঐ ছাপগুলো মোছা হয়েছিল উনি যখন ভিতরে ছিলেন।

-এমনও তো হতে পারে কেউ একজন সব দাগগুলো মুছে পিছনের দরজার কাছে এসে বুঝতে পারলো যে কৃষ্ণকালীবাবু পিছনের দরজা দিয়ে আসছেন তখন দরজাটা অল্প খুলে রেখে অপেক্ষা করতে থাকলো। কৃষ্ণকালীবাবু পিছনের দরজা দিয়ে ভিতরে এসে ভিতরের হাতলটা বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ঠেলে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

-না, কেননা ছাপটা ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে ওটা যত্ন করে বসানো হয়েছে। সাধারণভাবে হাতলে আঙ্গুল দিয়ে ঠেললে ঐ রকম স্পষ্ট দাগ হয় না।

-আচ্ছা, কেউতো বাইরের হাতলটা ভিতরে এবং ভিতরের হাতলটা বাইরে করে দিতে পারে?

-আপনি ঠিক বুঝিয়ে বলুন কী বলতে চাইছেন আপনি।

-দেখুন যে হাতলটা কথা আপনি বলছেন সেটা গোলাকার এবং একটা চৌকো পিনের ওপর স্ক্রু দিয়ে আটকানো। যে হাতলটা আপনি দরজার ভিতরের দিকে দেখেছেন সেটা কিছুক্ষণ আগে হয়ত বাইরের দিকে ছিল। কৃষ্ণকালীর আঙ্গুলের ছাপ হয়ত বাইরের হাতলে ছিল। কেউ পরে হাতে গ্লাভস পরে বাইরেরটা ভিতরে আর ভিতরেরটা বাইরে করে দিতে পারে। এমন সম্ভাবনা অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়ে যায় কি?

-না, উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু আপনার কল্পনাশক্তি অসাধারণ।

-কল্পনাশক্তি না সত্যকে দেখতে পাওয়ার শক্তি তা বলা মুস্কিল।

কেলো দারোগা এতক্ষণ শুনছিল। ব্যাপারটা গুলিয়ে গেল দেখে কথাটা ঘুরিয়ে বড়কালীকে জিজ্ঞাসা করলো,’ আচ্ছা, স্যুটকেসে পাওয়া জুতোজোড়া আপনার? ‘ বড়কালী বললো,’হ্যাঁ, আমার’।

-ঐ জুতোটা কি শিবুলালের মৃত্যুর দিন আপনার পায়ে ছিল?

-হ্যাঁ, ছিল।

-আপনি কি ঐ জুতোটা শিবুলালের বাড়িতে রক্তের ওপর রেখে তারপর জুতোটার রক্তমাখা সোল আর একটা মহিলার জুতোর ছাপের ওপর রেখেছিলেন?

-আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবো না।

-কেন দেবেন না?

- আমাকে ফাঁসানোর জন্য এই প্রশ্নটা করা হচ্ছে। আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবো না।

-বেশ, আপনি কি ঐ দিন শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন?

-হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।

-কখন গিয়েছিলেন?

-রাত্রি ১১টা বা ১১-৩০।

-আপনি কি ওখানে পৌঁছে একটা কাপড় বা ঐ জাতীয় কিছু দিয়ে দরজার হাতলগুলো থেকে আঙ্গুলের ছাপ মুছেছিলেন?

-এই প্রশ্নটাও আমাকে ফাঁসানোর জন্য করা হচ্ছে। আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবো না।

-আচ্ছা, ঐ দিন আপনি কি রেবা কৈরালাকে একটা বন্দুক দিয়ে বলেছিলেন যে আত্মরক্ষার জন্য বন্দুকটা তার কাজে লাগতে পারে?

-হ্যাঁ, দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম।

কেলো দারোগা একটা বন্দুক বড়কালীর হাতে দিয়ে বললো,’ দেখুন তো এটাই সেই বন্দুকটা কি না?’ বড়কালী বললো,’ মনে হচ্ছে এটাই।‘

-এবার বলুন সেদিন আপনি কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং কখন?

-আমি কাঠমান্ডু থেকে ফিরে অফিসে যাই। অফিসে গিয়ে স্নান করে, পোশাক পরিবর্তন করি।‘

পানু রায় বড়কালীকে ইঙ্গিতে চুপ করতে বলে বললেন,’ কৃষ্ণকালী আপনার আর কিছু বলার দরকার নেই।‘ তারপর কেলো দারোগার দিকে তাকিয়ে বললেন,’ আপনি এত কথা জানতে চাইছেন কেন? এটা তো ওনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনি যা জানতে চেয়েছিলেন উনি তো বলেছেন। উনি বলেছেন সেদিন ১১টা বা ১১-৩০এর সময় উনি শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন। আর বলেছেন উনি সেদিন রেবা কৈরালাকে বন্দুক দিয়েছিলেন। আর কী জানতে চান?’

-ঐ বন্দুকটা আপনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন বা কিনেছিলেন?

-আমার একটা খেলার এবং নিরাপত্তার সরঞ্জামের দোকান আছে। ঐ দোকানের স্টক থেকে আমি তিনটে একই রকমের বন্দুক নিজের কাছে রেখেছিলাম।

-কোথায় রেখেছিলেন?

-একটা আমার ছেলেকে দিয়েছিলাম। বাকি দুটোর একটা আমার কাছে সবসময় থাকে।আর একটা থাকে আমার অফিসের লকারে।

-বেশ। যে বন্দুকটা আপনি আপনার ছেলেকে দিয়েছিলেন সেটাকে আমরা বলবো ‘ছোট বন্দুক’, যেটা আপনি নিজের কাছে রাখেন সেটাকে আমরা বলব ‘বড় বন্দুক’ আর যেটা লকারে থাকে সেটা ‘লকার বন্দুক’। এবার আমি একটা নির্দিষ্ট প্রশ্ন করতে চাই। আপনি রেবাকে বড় বন্দুকটা দিয়ে অফিসে এসে লকার বন্দুকটা নিজের কাছে রেখেছিলেন? আপনার এই প্রশ্নের ব্যাপারে কোনও আপত্তি আছে , মিঃ রায়?

পানু রায় বললেন,’ না, আমার কোনও আপত্তি নেই।‘ বড়কালী বললো,’ হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলছেন।‘

-সেদিন সন্ধ্যাতেই? কটার সময়?

-হ্যাঁ, সেদিন সন্ধ্যাতেই। ১১টা বাজার মিনিট পাঁচেক আগে।

-তারপর আপনি রেবার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে যান?

-হ্যাঁ, আমি আবার রেবার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলাম।

-আপনি কি রেবার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে গিয়ে বড় বন্দুকটা দেখতে পেয়েছিলেন?

-হ্যাঁ, দেখতে পেয়েছিলাম।

-কোথায় দেখতে পেয়েছিলেন?

-বিছানায়, বালিশের নিচে।

-আপনি কি বন্দুকটা পরীক্ষা করেছিলেন?

-হ্যাঁ, আমি নিজের হাতে পরীক্ষা করেছিলাম।

-পরীক্ষা করে কী দেখলেন?

-আমি বন্দুকটা দিয়েছিলাম গুলিভর্তি অবস্থায় কিন্তু তখন দেখলাম এর ভিতরে একটা গুলি ব্যবহার করা হয়েছে।

-আপনি কি নিশ্চিত যে বন্দুকটা আপনি গুলিভর্তি অবস্থায় দিয়েছিলেন।

-হ্যাঁ, আমি কাঠমান্ডু থেকে আসার আগে বন্দুকটায় গুলি ভরেছিলাম কারণ আমি জানতাম যে আমি আক্রান্ত হতে পারি।

-আর সেদিন আপনি শিবুলালের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন কারণ আপনি ভেবেছিলেন যে আপনি যে বন্দুকটা রেবাকে দিয়েছিলেন সেটা শিবুলালের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।

এবার পানু রায় উঠে দাঁড়ালেন, বললেন,’ দারোগাবাবু, এই মামলাটা রেবা কৈরালার বিরুদ্ধে। কৃষ্ণকালী মনে মনে কী ভেবেছিল তার সঙ্গে এই হত্যাকান্ড এবং রেবার কোনও যোগ নেই। আপনি এধরণের প্রশ্ন কী করে করতে পারেন? আপনি অন্য কোনও প্রশ্ন করুন।‘ কেলো দারোগা বিরক্তি দেখিয়ে বললো,’ আমার কিছু জিজ্ঞাসা করার নেই।‘ পানু রায় বললেন,’ বেশ । তাহলে আমি একটা প্রশ্ন করি? ‘ উত্তরের অপেক্ষা না করে পানু রায় বড়কালীকে জজ্ঞাসা করলেন,’ আপনি বড় বন্দুকটা রেবাকে কেন দিয়েছিলেন?’

-কারণ রেবা একসময় আমার ছেলে কালীকৃষ্ণের প্রেমিকা ছিল। আমি চেয়েছিলাম রেবা আমার পুত্রবধূ হিসাবে আমাদের বাড়ি আসুক। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা হলো না। আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম যে আমি রেবাকে ভালোবেসে ফেলেছি।

-আমি আপনাকে আর একটা প্রশ্ন করতে চাই।এই হত্যাকান্ড যেদিন ঘটে তার আগের দিন বা আরও আগে আপনি কি কিছু খবর পেয়েছিলেন যার থেকে আপনার মনে হয়েছিল যে এই শিবুলালই রেবার বাবাকে হত্যা করেছিল?

-হ্যাঁ। আমার তাই মনে হয়েছিল এবং আমি রেবাকে বলেছিলাম যে আমার ধারণা শিবুলালই রেবার বাবার হত্যাকারী এবং শিবুলাল সুযোগ পেলে রেবাকেও হত্যা করতে পারে। সেইজন্যই আমি সবসময়ে কাছে রাখার জন্য বড় বন্দুকটা রেবাকে দিই। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি প্রমাণ করতে পারবো যে শিবুলালই খুনী এবং কয়েকদিনের মধ্যেই পুলিশ ওকে অ্যারেস্ট করবে।

পানু রায় বললেন,’দারোগা বাবু, এর থেকে কী প্রমাণ হলো? ধরা যাক কোনও অজ্ঞাতকারণে কৃষ্ণকালীর মনে হলো আমি শিবুলালকে হত্যা করেছি। আমাকে বাঁচাবার জন্য সে শিবুলালের ফ্ল্যাটে গেল। গিয়ে দেখলো এমন কোনও তথ্য প্রমাণ সেখানে নেই যার থেকে বলা যেতে পারে আমি খুন করেছি। আমি নিজে সে কথা তাকে বলিনি। আমি তাকে সেখানে যেতেও বলিনি। তা সত্ত্বেও সে আমাকে বাঁচাবার জন্য কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করে ফেললো। এই পুরো ব্যাপারটা কী ভাবে প্রমাণ করতে পারে যে কে খুনী।

-তাহলে আপনি বলতে চাইছেন যে এতক্ষণ যে কথাবার্তা হলো সেগুলো অর্থহীন? আমরা মিছিমিছি সময় নষ্ট করলাম?

-দেখুন দারোগাবাবু, আমি বলছি এই দীর্ঘ আলোচনা থেকে মাত্র দুটি সত্য এই খুনের তদন্তে সাহায্য করতে পারে। প্রথমটি হলো কৃষ্ণকালী গুলিভর্তি বন্দুকটা রেবাকে দিয়েছিল এবং সেদিনই পরে এসে দেখেছিল যে সিলিন্ডারে একটা গুলি কম। দ্বিতীয়টি হলো ঐ জুতোর ছাপটি যেটি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই জুতোটি রেবার।

-বেশ, এবার আমি কালীকৃষ্ণ অর্থাৎ কৃষ্ণকালীবাবুর ছেলেকে কিছু জিগ্যেস করতে পারি?

-অবশ্যই। আমি আপনার সঙ্গে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করবো।

ছোটকালী পিছনের সারির চেয়ার থেকে উঠে এসে সামনে বসলো। কেলো দারোগা এবার ছোটকালীকে জিজ্ঞাসা করলো,’ আপনি বলুন যে যেদিন হত্যাকান্ড ঘটে সেদিন আপনি আপনার বন্দুকটি অর্থাৎ যেটিকে আমরা ছোট বন্দুক বলছি সেটি মিঃ রায়কে দিয়েছিলেন?’

-হ্যাঁ, দিয়েছিলাম।

-মিঃ রায় বন্দুকটি নিয়ে কী করেছিলেন?

পানু রায় বললেন,’ এই প্রশ্নের কোনও সম্বন্ধ নেই এই কেসের সঙ্গে। যেহেতু বড় বন্দুকটি খুনী বন্দুক হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে সেখানে অন্য বন্দুক নিয়ে কে কী করেছিল এই কেসের সঙ্গে তার কী সম্বন্ধ? ‘ কেলো দারোগা ছোটকালীকে বড় বন্দুকটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,’ এই বন্দুকটা আপনি আগে দেখেছেন?’

-হ্যাঁ, এটা আমি আগে দেখেছি।

-কখন দেখেছেন?

-যেদিন খুনের ঘটনাটি ঘটে সেদিন পানু রায় এই বন্দুকটি আমার হাতে দিয়েছিল।

পানু রায় বললেন,’ আমি কী করেছি না করেছি তার সঙ্গে এই হত্যার সম্পর্ক কী?’ কেলো দারোগা বললো,’ আপনি চুপ করুন। আমাকে কথা বলতে দিন। কালীকৃষ্ণবাবু আপনি বলুন মিঃ রায়ের থেকে বন্দুকটা নিয়ে আপনি কী করলেন?’

-আমি এটা নিয়ে রেবা কৈরালার অ্যাপার্টমেন্টে গেলাম।তারপর পানু রায় কী সব বলে গেলেন যার মানে হচ্ছে রেবা খব বিপদের মধ্যে আছে এবং আমি তাকে একটা বন্দুক দেবার জন্য এসেছি যেটা তার কাজে লাগবে। আমি স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়ে রইলাম।

-যাই হোক, বন্দুকটা মিঃ রায় আপনাকে কোথায় দিয়েছিলেন?

-আমার অফিসে।

-এই বন্দুকটা ওনার কাছ থেকে নেবার আগে আপনি কি ওনাকে একটা বন্দুক দিয়েছিলেন?

-হ্যাঁ,দিয়েছিলাম আর সেই বন্দুকটা হাতে নিয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে পানু রায় আমার টেবিলের দিকে তাক করে ট্রিগার টিপে দিলেন।টেবিলটা ফেটে চৌচির হয়ে গেল। ঘরটা ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় ভরে গেল। এই গন্ডগোলের মাঝখানে সবার নজর এড়িয়ে ছোট বন্দুকটা নিজের কাছে রেখে বড় বন্দুকটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিলেন পানু রায়।আমি সেটা বুঝতে পারিনি। আমি ভাবলাম আমি ছোট বন্দুকটাই রেবাকে দিয়ে এলাম।

-আর এইভাবেই মিঃ রায় প্রমাণ তৈরি করলেন যে খুনী বন্দুকটা হত্যাকান্ডের সময় আপনার কাছেই ছিল। ঘটনাচক্রে দু’টি বন্দুকেই একটা করে গুলি কম ছিল।একেবারে জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল। মিঃ রায়, আপনার কিছু বলার আছে?

পানু রায় বললেন,’ কালীকৃষ্ণ , তুমি কি আমাকে বন্দুকটা পাল্টাতে দেখেছ?

-অবশ্যই না।আপনি যা কান্ড করলেন তাতে কারুর পক্ষেই কিছু দেখা সম্ভব ছিলনা। আপনি ইচ্ছে করেই এই কান্ড ঘটিয়েছিলেন যাতে আপনার আসল কাজটা কেউ দেখতে না পায়।এতো দুয়ে দুয়ে চার।

-তার মানে এটা তোমার অনুমান। তুমি নিজের চোখে এটা ঘটতে দেখোনি। তুমি আন্দাজে বলছো।

- হ্যাঁ তাই। আপনি যে এই কাজ করেছেন তা তো সহজেই অনুমান করা যায়।

-বেশ, দারোগাবাবু যদি মনে করেন এতে প্রমাণিত হলো যে আমি এই কাজ করেছি তাহলে আমার কিছু বলার নেই। বাকি কথা আদালতে হবে।

কেলো দারোগা বললো ,’ আপনি অযথা উত্তেজিত হচ্ছেন, মিঃ রায়। আপনাকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। আমাকে একটু কথা বলতে দিন। আচ্ছা কালীকৃষ্ণবাবু আপনি বলছেন যে আপনি একটা বন্দুক মিঃ রায়কে দিয়েছিলেন।তাই তো?’

-হ্যাঁ, যেটাকে ছোট বন্দুক বলা হচ্ছে সেই বন্দুকটা আমি ওনাকে দিয়েছিলাম।

-বন্দুকটা কোথায় ছিল?

-আমার টেবিলের ড্রয়ারে।

-আপনি বন্দুকটা কোথা থেকে পেয়েছিলেন?

-আমার বাবা আমাকে বন্দুকটি দিয়েছিলেন।

-যেদিন খুনের ঘটনাটি ঘটে সেদিন বন্দুকটা কোথায় ছিল?

-আমার কাছেই ছিল।

-সারাদিনই আপনার কাছে ছিল?

হ্যাঁ, সারাদিনই আমার কাছে ছিল।

-আপনি কবে বন্দুকটা মিঃ রায়ের হাতে দিয়েছিলেন?

-পরের দিন বেলার দিকে।

-তারপর কী হলো?

-পানু রায় বন্দুকটা থেকে একটা গুলি টেবিলের উপর ছুঁড়লেন।

-তারপর?

-তারপর উনি বন্দুকটা আমার হাতে দিয়ে বললেন ওটা নিয়ে ওনার সঙ্গে রেবার কাছে যেতে।

-ঐ বন্দুকটা যেটা আপনি রেবার কাছে নিয়ে গেলেন আর যেটা আপনি মিঃ রায়কে দিয়েছিলেন সে’দুটি কি একই বন্দুক?

-না।

এবার পানু রায় বিরক্ত হয়ে বললেন,’ দারোগাবাবু, আপনি কোনও প্রমাণ ছাড়াই এই একই কথা বারবার কেন ওকে দিয়ে বলাচ্ছেন? এটা ওর ব্যক্তিগত মত। এটা কোনও প্রমাণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়।‘কেলো দারোগা বললো,’ ঠিক আছে বন্দুকদু’টো একই না আলাদা সেটা প্রমাণসাপেক্ষ। কালীকৃষ্ণবাবু, আপনি বলুন রেবাদেবী বন্দুকটা নিয়ে কী করলেন? ‘

-রেবা ওটা টেবিলের ওপর রেখে দিল। তারপর কী হলো জানিনা। আমি এবং পানু রায় তারপর ওখান থেকে চলে গেলাম। যাওয়ার সময় দেখলাম আপনি এবং আর একজন পুলিশ অফিসার ওপরে যাওয়ার লিফটের দিকে যাচ্ছেন।

-আপনার কিছু বলার আছে মিঃ রায়?

পানু রায় বললেন,’কালীকৃষ্ণ, তুমি বললে যে ছোট বন্দুকটা যেদিন খুনের ঘটনাটা ঘটে সেদিন সারাক্ষণ তোমার কাছেই ছিল। তুমি যখন লাঞ্চ করতে গিয়েছিলে তখন কি বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে?

-না, তখন ওটা ড্রয়ারে ছিল।

-ড্রয়ারে চাবি দেওয়া ছিল?

-না, আমি ঐ ড্রয়ারটায় চাবি দিইনা। কারণ তাহলে দরকারের সময় চাবি খুলে বন্দুকটা বের করতে দেরি হয়ে যাবে।

-বেশ, তা সত্ত্বেও তুমি মনে করো যে বন্দুকটা সারাক্ষণ তোমার কাছেই ছিল। সেদিন সন্ধ্যাবেলা তুমি কোথায় ছিলে?

-আমি এক ডিলারের সঙ্গে মিটিং এর জন্য গিয়েছিলাম।

-বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে?

-না, ওটা ড্রয়ারেই ছিল। আমি অফিসে ফিরে ওটা পকেটে নিয়ে বাড়ি যাই।

-তারপর বাড়ি গিয়ে বন্দুকটা কোথায় রাখলে?

-আমার বেডরুমের কাবার্ডে।

-রাত্রে কি তোমার অফিস তালাবন্ধ থাকে?

-হ্যাঁ, অফিস তালাবন্ধ থাকে। তবে গেটে দারোয়ান থাকে। গাড়ি পাহারা দেবার জন্য।

-অফিসের চাবি কার কার কাছে থাকে?

-আমার বাবার কাছে, আমার সেক্রেটারির কাছে আর আমার স্ত্রীর কাছে।

-পরেরদিন অফিস যাবার সময় বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে?

-না, আমি নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম। পরে আমার স্ত্রী ওটা কাবার্ডে দেখতে পেয়ে আমায় ফোন করে জানায়। আমি ওকে বন্দুকটা নিয়ে অফিসে আসতে বলি। ও বন্দুকটা নিয়ে অফিসে এসে আমাকে দেয়। আমি সেটা ড্রয়ারে রাখি।

-তুমি কী করে নিশ্চিত হচ্ছো যে তোমার স্ত্রী তোমাকে যে বন্দুকটা দিয়েছিল সেটাই খুনী বন্দুকটা নয় যেটা তুমি আমাকে দিয়েছিলে? কী? হতেও পারে তাই না?

-না, না, তা কী করে হবে? এরকম হতেই পারে না।

-আমি বলছিনা যে এরকমই হয়েছিল। আমি বলছি যে এরকম হতেই পারে। তুমি কিছুতেই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বলতে পারোনা যে আমি বন্দুকটা পাল্টে দিয়েছিলাম। কি দারোগাবাবু, আমি ঠিক বলছি তো?

কেলো দারোগা বললো,’ এটাই তো মুস্কিল, মিঃ রায়। আপনি এমন একটা গল্পের ফাঁদে জড়িয়ে দেন যা কেটে বেরিয়ে আসা যায় না।‘পানু রায় বললেন,’ গল্প কেবন সম্ভাবনার কথা বলে। প্রমাণ সত্য প্রতিষ্ঠা করে। প্রমাণহীন গল্প অর্থহীন। প্রমাণের কথা যখন উঠলো তখন আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। যে গুলিটা আমি সেদিন ছুঁড়েছিলাম সেটা পরীক্ষা করলেই তো পরিষ্কার হয়ে যাবে সেটা কোন বন্দুকটা থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। ঐ গুলিটা কি পরীক্ষা করা হয়েছিল?

-না, মানে ঐ গুলিটা খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ ঐ গুলিটা ওখান থেকে সরিয়ে নিয়েছে।

-সেকি? পুলিশ গুলিটা খুঁজে পায়নি। পুলিশের অকর্মন্যতার জন্য একজন নির্দোষ মহিলাকে আটকে রাখা হয়েছে? দারোগাবাবু, কোর্টে আপনার কী অবস্থা হতে চলেছে বুঝছেন?’

কেলো দারোগা বেগতিক দেখে চুপ করে থাকে। ছোটকালী উঠে এসে পানু রায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে কিছু একটা বলার সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন পানু রায়। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বললেন,’ কী বলছো তুমি? আবার বলো। সবার সামনে বলো। জোরে বলো যাতে সবাই শুনতে পায়।‘ ছোটকালী চুপ করে থাকে। পানু রায় ঝাঁঝিয়ে ওঠেন,’ সাহস থাকে সবার সামনে বলো। চুপ করে আছো কেন?’ কেলো দারোগা ছোটকালীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে,’ কী বলেছেন আপনি? বলুন। সময় নষ্ট করবেন না।‘ ছোটকালী ঘাবড়ে গিয়ে বলে,’ আমি বলেছি আমি ওনাকে থানার বাইরে বেরোলে গুলি করে দেব।‘ পানু রায় চেঁচিয়ে বলে ওঠেন,’ তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো ? তাও আবার থানার মধ্যে? তুমি জানো আমি চাইলে আমি তোমাকে হাতকড়া পরিয়ে লকআপে ঢোকাতে পারি।‘ কেলো দারোগা ছোটকালীকে বলে,’শুনুন, থানাটা গুন্ডাগিরির জায়গা নয়। বেরিয়ে যান। না হলে সোজা লকআপে চালান করে দেব।‘ ছোটকালী মাথা নিচু করে চুপচাপ বেরিয়ে যায়।

মিনিট পাঁচেক পরেই থানায় ঢুকলো এলিনা। পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে কেলো দারোগা বললো ,’ আমি ওনাকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। আপনি নিশ্চয়ই চেনেন ওনাকে।‘ পানু রায় বললেন,’ বিলক্ষণ। আমি ভেবেছিলাম আপনাকে বলবো ওনাকে ডাকতে। যাই হোক, আপনি যখন নিজেই ডেকেছেন শোনা যাক উনি কী বলেন?’

কেলো দারোগা বললো,’ এলিনাদেবী, আপনি এখন কী করেন?’

-আমি একজন মডেল এবং অভিনেত্রী।

-যেদিন খুনের ঘটনাটা ঘটে সেদিন আপনি কী করছিলেন মানে আপনি কি সেদিনও কোনও মডেলিং বা অভিনয়ের কাজে ব্যস্ত ছিলেন?

-না, না, আমি তখন দুর্ভাগ্যবশত কৃষ্ণকালীবাবুর অফিসে ওনার সেক্রেটারির কাজ করতাম।

-যেদিন খুনের ঘটনাটা ঘটে সেদিন আপনার অফিসে কি অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছিল?

-অস্বাভাবিক বলা যাবে কি না জানিনা। তবে সেদিন কৃষ্ণকালীবাবু আমাকে কাঠমান্ডু থেকে ফোন করে বলেছিলেন উনি না আসা পর্যন্ত আমি যেন অফিসে অপেক্ষা করি। ওনার আসতে সাড়ে ন’টা বা দশটা হতে পারে।

-উনি কখন এলেন?

-উনি তার অনেক আগেই এসে যান। পৌনে ন’টা নাগাদ।ওনাকে খুব নার্ভাস লাগছিল।

-উনি কি আপনাকে শিবুলালের ব্যাপারে কিছু বলেছিলেন?

-হ্যাঁ, উনি বললেন যে যে রেবা কৈরালার বাবাকে খুন করেছিল তার সঙ্গে আজ আমার কথা হয়েছে। আমি এগারোটা নাগাদ লোকটার সঙ্গে দেখা করবো।‘

-তারপর কী হলো?

-উনি কোটটা খুলে স্ট্যান্ডে রাখলেন। ভেতরের পকেট থেকে বন্দুকটা বের করে টেবিলের ওপর রেখে বাথরুমে চলে গেলেন।

কেলো দারোগা একটা বন্দুক দেখিয়ে বললো,’আপনি কি বলতে পারবেন এইটাই সেই বন্দুকটা কি না?’

-না,আমি ভীষণ ভয় পাই। বন্দুকের ধারে কাছে যাইনা। তবে অনেকটা একই রকম দেখতে বলে মনে হচ্ছে।

কেলো দারোগা পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,’ আপনি কিছু জানতে চান?’

পানু রায় বললেন,’ উনি আপনাকে বলেছিলেন যে ওনার সঙ্গে শিবুলালের কথা হয়েছে? ‘

-না, উনি বলেছিলেন ‘যে রেবা কৈরালার বাবাকে খুন করেছিল তার সঙ্গে আজ আমার কথা হয়েছে। আমি এগারোটা নাগাদ লোকটার সঙ্গে দেখা করবো।‘

- উনি শিবুলালের নাম বলেন নি?

-না শিবুলালের নাম বলেন নি। তবে আমার মনে হয় উনি শিবুলালের কথাই বলছিলেন।

-আপনার মনে হওয়া না হওয়ায় কিছু এসে যায় না। আমার আর কিছু জানার নেই।

কেলো দারোগা এলিনাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে বেরিয়ে গেলেন। একটু পরে এক সুন্দরী মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকলেন। বললেন, ‘ ইনি কালীকৃষ্ণবাবুর সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী। আমরা এনার সঙ্গেও কথা বলবো।‘ ওনাকে বসতে বলে কেলো দারোগা বড় বন্দুকটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,’ আপনি এই বন্দুকটা আগে দেখেছেন? ‘

- জানিনা এটাই দেখেছি কি না। তবে এরকমই দেখতে একটা বন্দুক আমি কাবার্ডে দেখেছিলাম যেটা কালীকৃষ্ণ ভুল করে ফেলে রেখে অফিসে চলে গিয়েছিল।

-কবে এবং কখন উনি ঐ বন্দুকটা কাবার্ডে রেখেছিলেন।

-যেদিন শিবুলাল খুন হয় সেদিন রাত সাড়ে দশটা হবে।

- আপনি বন্দুকটা পরের দিন দেখেছিলেন?

-হ্যাঁ, দেখেছিলাম।

-তারপর কী করলেন?

-আমি কালীকৃষ্ণকে ফোন করে জানালাম যে সে বন্দুকটা ফেলে রেখে গেছে।

-কখন ফোন করেছিলেন? কালীকৃষ্ণবাবু অফিস পৌঁছনোর পর?

-আমি সদ্যবিবাহিতা। আমি এখন আমার স্বামী অর্থাৎ কালীকৃষ্ণকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি কী ভাবে নিজের ব্রেকফাস্ট নিজে তৈরি করতে হয়। আমি সেজন্য সকাল সাড়ে ন’টা পর্যন্ত ঘুমোই।হ্যাঁ, আমার চোখে যখন পড়লো যে বন্দুকটা কাবার্ডে পড়ে আছে ততক্ষণে কালীকৃষ্ণ অফিস পৌঁছে গেছে।

-তারপর কী হলো?

- কালীকৃষ্ণ আমাকে বললো বন্দুকটা নিয়ে অফিসে পৌঁছে যেতে। আমি সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ অফিসে গিয়ে ওকে বন্দুকটা দিয়ে দিই।

-কালীকৃষ্ণ যখন বাড়ি ফিরেছিল আর পরের দিন যখন আপনি বন্দুকটা ওনাকে ফেরত দিয়েছিলেন সেই সময়ের মধ্যে বন্দুকটা থেকে কি কোনও গুলি ছোঁড়া হয়েছিল?

-অসম্ভব। বন্দুকটা যখন রাখা হয় আর আমি যখন ওটা ফেরত দেবার জন্য নিই তারমধ্যে আমার বেডরুমে কেউ ঢোকেনি। বন্দুকটা একই অবস্থায় ছিল।

-আমার আর কিছু জানার নেই। মিঃ রায় আপনি কিছু জানতে চান?

পানু রায় মহিলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,’ আপনি কি ঐদিন সারাসন্ধ্যে বাড়িতে ছিলেন?’

-হ্যাঁ, অবশ্যই।

-আপনি জানেন কালীকৃষ্ণ আপনাকে দু’বার ফোন করেছিল সেদিন সন্ধ্যায় কিন্তু আপনি ফোন ধরেননি?

-কালীকৃষ্ণ আমাকে একই কথা বলেছে।

-আপনি কি ইচ্ছা করে ধরেননি?

-না, না। আসলে আমি মাঝখানে একঘন্টা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

-আপনি কি কালীকৃষ্ণকে সেকথা বলেছেন?

-না,এটা কখনও বলা যায়? আপনি সিচুয়েশনটা বুঝুন। আমরা মধুচন্দ্রিমা যাপন করছি। আমার স্বামী ব্যবসার কাজে সারাসন্ধ্যে বাড়ির বাইরে এমনকি ডিনারেও আসেনি। আমি ওকে বোঝাতে চাই যে এটা ঠিক নয়, আমি রাগান্বিত এবং মর্মাহত। আমি যদি ওকে বলি যে আমি ওর জন্যে অপেক্ষা করিনি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাহলে ও ব্যাপারটার গুরুত্বটাকে লঘু করে দেখতে পারে। সেইজন্য আমি ওকে বলেছিলাম ও হয়তো ভুল নাম্বারে ডায়াল করেছিল।

-আপনি বলছেন আপনি ওকে বুঝিয়েছিলেন যে ও দু-দুবার ভুল নাম্বার ডায়াল করেছিল। এতো বড় শক্ত কাজ করলেন কী করে?

-বিবাহের অব্যবহিত পরেই একজন স্ত্রী অনেক সহজে তার স্বামীকে অনেক কিছু বোঝাতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজটা কঠিনতর হয়ে ওঠে।

-তার মানে আপনি ওনাকে মিথ্যা কথা বলেছিলেন?

-মিথ্যা কোথায় বললাম। আমি বলেছিলাম অনেক সম্ভাবনার মধ্যে ভুল নাম্বার ডাইয়াল করাও একটা সম্ভাবনা। তাছাড়া ও আমাকে জিজ্ঞাসা করেনি যে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কি না? তাই আমিও কিছু বলিনি।

-বেশ। এবার বলুন যখন বন্দুকটা নিয়ে আপনি কালীকৃষ্ণের কাছে যান আপনি কি তখন জানতেন যে বন্দুকটায় একটা গুলি কম আছে।

-তাহলে আপনি টেবিলে গুলি ছোঁড়ার পর বন্দুকে দুটি গুলি কম থাকতো। তাই না?

-হ্যাঁ, সেটা যদি যে বন্দুকটা আপনি কালীকৃষ্ণকে দিয়েছিলেন সেই বন্দুকটাই কালীকৃষ্ণ আমাকে দিয়ে থাকে।

-একজন স্ত্রীর উচিৎ তার স্বামীকে বিশ্বাস করা। তাই নয় কি, মিঃ রায়?

-ঠিক আছে, আমার আর কিছু জানার নেই।

-তাহলে আমি আসতে পারি, দারোগাবাবু?

কেলো দারোগা বললেন,’ চলুন আপনাকে এগিয়ে দিই।‘ কেলো দারোগা সকলকে বিশেষ করে পানু রায়কে বলে গেল,’ একটু অপেক্ষা করুন। আর একজনকে আমি ডেকেছিলাম। উনি এসেছেন।আমি ওনাকে নিয়ে আসছি।‘ একটু পরেই কেলো দারোগা এক বয়স্কা, স্থূলকায়া মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। বললো,’ ইনি গীতাদেবী। শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টের নিচের তলায় ইনি থাকেন। হত্যার দিন সন্ধ্যাবেলা উনি কিছু দেখেছিলেন যা আমাদের এই হত্যার কিনারা করতে সাহায্য করবে বলে আমার বিশ্বাস অর্থাৎ যা থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে রেবা কৈরালাই খুনী। এবার গীতাদেবী, আপনি বলুন। বসে বসেই বলুন।‘ গীতাদেবী বলতে শুরু করলো,’ সেদিন সন্ধ্যে পৌনে ন’টা নাগাদ আমি একজন মহিলাকে পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখি।আমি ভাবলাম চোর-ছ্যাঁচোর হবে তাই একটা কাছাকাছি দূরত্ব রেখে পিছু নিলাম যাতে বুঝতে না পারে আমি ওকেই অনুসরণ করছি।‘ কেলো দারোগা জিজ্ঞাসা করলো,’ আপনি কি মহিলাকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন?’ গীতাদেবী উত্তর দিল,’ হ্যাঁ, আমি তাকে এই ঘরেও দেখতে পাচ্ছি।‘ গীতাদেবী আঙ্গুল দিয়ে রেবা কৈরালাকে দেখালো।

-উনি তারপর কী করলেন?

-উনি রাস্তায় বেরিয়ে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে শুরু করলেন । তার কিছুক্ষণ পরে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক গাড়ি নিয়ে এসে ওনার পাশে দাঁড়ালেন। ঐ মহিলা গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

-আপনি ঐ বৃদ্ধ ভদ্রলোককে কাছ থেকে দেখেছিলেন?

গীতাদেবী পানু রায়ের দিকে দেখিয়ে বললো,’ইনিই সেই ভদ্রলোক।‘ পানু রায় বললেন,’ আপনি পিছনের সেদিন পিছনের সিঁড়িতে নজর রেখেছিলেন?’

-হ্যাঁ, প্রায়ই আমি পিছনের সিঁড়ি দিয়ে কমবয়সী অপরিচিত মেয়েদের উঠতে নামতে দেখি। সেদিন ঠিক করেছিলাম আজ হাতেনাতে ধরবো এবং জানতে চাইবো তারা কার কাছে আসে এবং কেন আসে?

-তার মানে আপনি বলছেন ঐ মহিলাকে অর্থাৎ রেবাকে আপনি আগে ওখানে যেতে দেখেছেন?

-মানে ওনাকেই দেখেছি কিনা সেটা হলফ করে বলতে পারছিনা।

-আপনি বলছেন ঐ দিনের আগে আপনি ওনাকে দেখেছেন কি না জানেন না। সেদিন আর কোনও অপরিচিত কমবয়সী মহিলাকে দেখেছিলেন?

-না, শুধু ওনাকেই দেখেছিলাম।

-ওনাকে অনুসরণ করলেন কেন?

-আমি দেখতে চাইছিলাম ঐ মহিলা কে?

- শুধু সেইজন্যই অনুসরণ করছিলেন?

-হ্যাঁ, আসলে ওকে ভালো করে দেখার জন্য পিছন পিছন যাচ্ছিলাম।

-ভালো করে দেখা হয়ে গেলেই ফিরে যাবেন ভেবেছিলেন?

-হ্যাঁ, ভেবেছিলাম ভালো করে মুখটা দেখেই ফিরে যাব।

-যখন উনি গাড়িতে উঠছিলেন তখনও আপনি ওনাকে দেখবার চেষ্টা করছিলেন?

-হ্যাঁ আমি তখনও ওনাকে দেখার চেষ্টা করছিলাম।

-তাহলে আপনার নিজের কথা অনুযায়ী আপনি তখনও ওনাকে ভালো করে দেখতে পাননি। তাই না?

-না মানে হ্যাঁ, আমি ওনাকে ভালো করেই দেখতে পেয়েছিলাম। আরও ভালো করে দেখতে চাইছিলাম। কিন্তু আমার মনে হয় আমি ওনাকেই দেখেছিলাম।

-বেশ, উনি যদি গাড়িতে না উঠে আরও খানিকটা হেঁটে যেতেন তাহলে কি আপনি তখনও ওনাকে অনুসরণ করতেন?

-অবশ্যই করতাম। যতক্ষণ না পর্যন্ত ভালো করে মানে আরও ভালো করে ওনাকে না দেখতে পেতাম ততক্ষণ অনুসরণ করতাম।

-ঠিক আছে। আমার আর কিছু জানার নেই। দারোগাবাবু, আমরা কিন্তু যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি। এখনও পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ পাওয়া গেল না। রেবাকে কেবলমাত্র সন্দেহের বশে আটকে রাখার কোনও মানে হয়না।

-আপনার ভরসায় আমি ওনাকে ছেড়ে দিচ্ছি। উনি বাড়ি যেতে পারেন কিন্তু নজরবন্দি থাকবেন আজ। ওনার দরজার সামনে দু’জন কনস্টেবল থাকবে সর্বক্ষণের পাহারায়। কালকে সকালে আবার আমরা এখানে বসবো। আগামি পরশুর মধ্যে আমি চার্জশিট জমা করতে চাই।

-দারোগাবাবু, আমার মনে হয় আপনার তৈরি হয়ে নামাই ভালো। কোর্টে সবার সামনে হেনস্তা হওয়ার চেয়ে নিজেদের মধ্যে একটা ঐক্যমত্যে এলে আপনি জোর গলায় বলতে পারবেন এটা ওপেন অ্যান্ড শাট কেস।

-সেটা আমাকে ভাবতে দিন, মিঃ রায়। কাল দেখা হবে।

পানু রায়, সুন্দরী এবং জগাই থানা থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

0 comments: