0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















২১. বঙ্গভঙ্গ থেকে বিশ্ববাংলা কেবল বিশ্বাসঘাতকতা





সুপরিচিতাসু সুস্মি,



তোমার চিঠি যখন পেলাম বাংলার মসদে তখন শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ২০২৬ ফলাফল প্রকাশের পরেই একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে প্রায় সবখানে বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা কবে সাম্প্রদায়িক হয়ে গেলো? তিনদশক শাসন করা কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বহুযুগ ধরে নামেই টিকে আছে, চৌত্রিশ বছরের সাম্রাজ্য পতনের পরে বামফ্রন্টের অবস্থাও একই বলতে গেলে। তৃণমূল ও বাম ঘরানার লোকজন পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে বিজেপিকে প্রতিহত করতে চেয়েছে বারবার। আমার মনে হয় বাংলার রাজনীতিতে এই বিজেপির এই ভূমিধস বিজয় "প্যারাডাইম শিফট" বা কাঠামোগত পরিবর্তন। এটি কেবল একটি দলের পরিবর্তন নয়, বরং স্বাধীনতার পর থেকে বাংলার রাজনীতিতে যে বাম-উদারপন্থী বা সেক্যুলার ঘরানার একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, তার ওপর এক বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আঘাত। এই বিশাল বিজয়ে একটা ব্যাপার নিশ্চিত কাজ করেছে বলেই আমার বিশ্বাস, বিজেপির দ্বারা তৈরি একটি 'কাউন্টার-হেজিমনি' বা পাল্টা-আধিপত্যের সফল রূপায়ণ। তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোষণ রাজনীতির যে অভিযোগ দীর্ঘ বছর ধরে বিজেপি তুলেছিল, তা বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মনে এই ধারণা তৈরি করতে সফল হয়েছে যে—প্রচলিত 'সেক্যুলারিজম' আসলে সংখ্যাগুরুদের অধিকারকে খর্ব করছে। ফলে, মানুষ ঐতিহ্যগত সেক্যুলার কাঠামো ভেঙে বিজেপির 'সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ' বা 'হিন্দুত্ব'-এর ন্যারেটিভকে গ্রহণ করেছে। ভুলে গেলে চলবে না এই পশ্চিমবঙ্গের রয়েছে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ইতিহাস। ছেচল্লিশের দাঙ্গা। দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস। দেশভাগের সময় ও পরে দাঙ্গার ক্ষত। সুপ্ত সেই সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকেই উসকে দিয়েছে মমতার রাজনীতি। প্রতিযোগিতার সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের আবহে পুরো ফায়দা তুলছে বিজেপি। সাতচল্লিশে স্বাধীনতা। দেশভাগ। বাংলা ভাগ। কোটি মানুষের জীবন–জীবিকায় কাঁটাতার। ভিটে হারানোর যন্ত্রণা। স্বদেশ, স্বজন হারানোর হাহাকার। ছিন্নমূল উদ্বাস্তু। বাংলার জনগণ যে সিদ্ধান্ত নিলো তার সুফল কুফল জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে কয়েক বছর। তোমার চিঠি পড়তে পড়তে মনে পড়ছিল একটি কথা যা বুঝতে শেখার কাল থেকেই শুনছি,বাঙালি সবসময় বড়াই করে বাঙালি খুব বুদ্ধিমান ও সংস্কৃতিবান। কিন্তু সারা ভারত যা করে বাঙালি ঠিক তার উল্টোটা করে। তার মানে, হয় বাঙালি বুদ্ধিমান আর সারা ভারত বুদ্ধিহীন। তাই বুদ্ধিমান বাঙ্গালী বাবুরা ছেলেমেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পরে চেয়ে থাকেন ব্যাঙ্গালোর, পুনে বা হায়দরাবাদ এর দিকে। চিকিৎসা করতে গেলে প্রাধান্য দেন ব্যাঙ্গালোর, মনিপাল,হায়দ্রাবাদ,মুম্বাই আর ভেলোরকে। ৪২ লক্ষ বাঙালি শ্রমিক পেটের দায়ে অন্য রাজ্যে কাজ করেন। এখানে কত পলিটেকনিক কলেজ আছে আর কর্নাটকে কত আছে এর তথ্য গুগলে সার্চ করলেই জানা যাবে। লজ্জা হয় না আমাদের, কোন বাঙালিকে ভাবতে দেখিনিনা একবারও এত পিছিয়ে পড়লাম কেন? ১৯৭৭ সালের পরে পশ্চিমবঙ্গ কোনোদিন কেন্দ্র রাজ্যে এক সরকার পায়নি। তার ফল হয়ত আমরা ভোগ করছি। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বঙ্গদেশে প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলমানরা ঢেলে ভোট দিল মুসলিম লীগকে আর বুদ্ধিমান হিন্দু বাঙ্গালী ভোট দিল ধর্ম নিরপেক্ষ কংগ্রেসকে। হিন্দুমহাসভা ভোটে হেরে গেল। কি আনন্দ। বছর ঘুরতে না ঘুরতে পুঁটুলি হাতে বউ বাচ্চা নিয়ে কোটি কোটি বাঙালি হিন্দু ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে এলো এ বঙ্গে ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্তরা আঁকড়ে ধরল কংগ্রেস আর মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবিরা বামপন্থাকে। তাও লজ্জা নেই। গর্ব করে বলে আমা-গো এত বিঘা জমি ছিল, এত বিঘা পুকুর ছিল, এত বড় বাড়ী- সব মনে আছে। মনে নেই কেবল কারা লাথি মেরে তাড়িয়ে ছিল। কারা আপনার বাড়ির মেয়েদের ধর্ষন করেছিল! প্রশান্ত সুর, প্রমোদ দাশগুপ্ত, অশোক মিত্র তাড়া খেয়ে এখানে এসে কমিউনিস্ট পার্টি করেছেন। প্রফুল্ল সেন বরিশাল ছেড়ে গান্ধীবাদ প্রচার করেছেন। আজ তোমাকে লিখতে লিখতে মনে হলো ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ আদতে বিদেশি মত ও পথের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং দেশীয় ইতিহাস ও বাস্তবতা সম্পর্কে উদাসীনতা। বামপন্থী ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিজীবীরা ভারতের শাসকশ্রেণীকে "৫,০০০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস" রচনা করে দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো: ভারত স্বাধীন হওয়ার ২০০ বছর আগে কি কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী বা বেলুচিস্তান থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত উপমহাদেশের মানুষ নিজেদের "ভারতীয়" বলে পরিচয় দিতেন? এই কৃত্রিম "ভারতীয় সভ্যতা" তত্ত্বকে রক্ষা করতে গিয়ে বামেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) হিন্দু সভ্যতার ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয় গঠনের প্রকল্পকে তাত্ত্বিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ তারা নিজেরাই সেই একই "সভ্যতা" তত্ত্বের বাহক। বাঙালি চিরকাল আত্মঘাতী, মনে পড়ছে নীরদ সি চৌধুরীর কথা ছিলেন যিনি আপাদমস্তক ব্রিটিশ ভক্ত। ভারতীয়ত্ব সম্পর্কে একটা নাকউঁচু মনোভাব। আর বাঙালি! বাঙালি সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন ‘বাঙালী থাকিব নাকি মানুষ হইব’। শশাঙ্কের আমল থেকে শুরু করে ইংরেজ আমলে এসে দেখবো দেড়শো বছরের ব্রিটিশ রাজধানী কলকাতায় নিজেদের করণিকের যোগানের স্বার্থে ব্রিটিশেরা কোম্পানির আমল থেকেই কলকাতা শহরে পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারে উদ্যোগী হয়। যার ফলে, ব্রিটিশদের অধীনে চাকরি করে স্থায়ী উপার্জন করতে ও ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার তাগিদ থেকে উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজের প্রতিনিধিরা কলকাতা কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে আবার ঔপনিবেশিক অর্থনীতির স্বার্থে, ব্রিটিশ শাসনের স্বার্থেই হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতা ভাঙার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর ফলে বঙ্গীয় রেনেসাঁ জন্ম নেয়, যা মূলত কলকাতার সাবর্ণ হিন্দু উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই সাবর্ণ সমাজই উনিশ শতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। এরাই ‘ভারত’ দর্শনের প্রবক্তা হয়। এরাই চরম ইসলাম বিদ্বেষ থেকে চালিত হয়ে ব্রিটিশ শাসকদের কাছাকাছি থেকে সমস্ত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভাগিদারী চাইলো। প্রথমে নতজানু হয়ে, তারপর কংগ্রেসের মতন প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে আর শেষ পর্যন্ত হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে। এই সম্প্রদায়ই কিন্তু উত্তর আর পশ্চিম ভারতে হিন্দুত্বের জিগির ওঠার অনেক আগেই "আনন্দমঠ" লিখে হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতে এক আদিম সভ্যতার জয়গান শুরু করে। এই সম্প্রদায়ই কিন্তু ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিল। বঙ্গ ভঙ্গ করার ব্রিটিশ অভিপ্রায় নিয়ে এরাই প্রশ্ন তোলে, জানতে চায় হিন্দু পশ্চিমের সাথে মুসলিম পূর্বের বিচ্ছেদ ঘটানোই কি এই বিভাজনের আসল কারণ? ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে শুধু প্রতিবাদে কাজ না হওয়ায়, বঙ্গ ভঙ্গ আটকাতে তারা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। কিন্তু সেটা কি সত্যিই স্বাধীনতার জন্যে? কোন দেশের স্বাধীনতার জন্যে? বঙ্গের না পঞ্জাবের? ১৯০৫ সালের আন্দোলনে সাবর্ণ ভদ্রলোকদের যোগদানের মূলে ছিল পূর্ববঙ্গে তাদের জমিদারি হাতছাড়া হওয়ার ভয়। এই জমিদারিগুলো পূর্ব বাংলায় হলেও, জমিদারেরা অধিকাংশই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে থাকতেন। আর এই জমিদারি রক্ষার তাগিদ থেকে যে ভদ্রলোকেরা একদিন বঙ্গ ভঙ্গের বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলে ধরলেন, ৪২ বছর পরেই তারা কিন্তু বঙ্গ ভঙ্গ নিয়ে টু শব্দটিও করেনি। বর্তমান বিজেপির প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী যখন বাংলা ভাগের পক্ষে, হিন্দু বাঙালি হোমল্যান্ড বানানোর দাবি নিয়ে হৈচৈ শুরু করেন, হিন্দু মহাসভার খুবই স্বল্প সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে, কমিউনিস্ট পার্টির ভদ্রলোক নেতৃত্ব কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে না। তাঁরা সেই সময়ে, যখন বাংলার অধিকাংশ দলিত, আদিবাসী, শূদ্র-নমঃশুদ্র মানুষ এবং মুসলিমের লেখা পড়া জানতেন না, নিজেদের সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজনীতিকে আবদ্ধ রাখেন দিস্তা দিস্তা কাগজ ছাপানো ও মধ্যবিত্ত কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে, যা সাধারণ হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে অবিশ্বাস কে ভাঙার কাজ করতে ব্যর্থ হয়। কংগ্রেস, লীগ আর মহাসভা যখন বিভেদের রাজনীতি করছে, হিন্দু সাবর্ণ জমিদারদের একটা অংশ আর মাড়োয়ারি পুঁজিপতিরা যখন মুখার্জীকে চাঁদা দিচ্ছে কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গ কে ইন্ডিয়ার অধীনে রাখার, তখন কমিউনিস্ট পার্টির কাছে ছিল এক সুবর্ণ সুযোগ। তাঁরা লেনিনীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে স্বাধীন, ঐক্যবদ্ধ বাংলার সমর্থনে দাঁড়াতে পারতেন, কিন্তু সেটা তাঁরা করেননি।



দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সুভাষ চন্দ্র বসুর অনুজ শরৎ চন্দ্র বসু, হুসেইন সোহরাওয়ার্দী ও কিরণ শঙ্কর রায় সেই বিভেদের দিনে, ১৯৪৬ সালের হানাহানির পরেও, এক সাথে বসে তৈরি করলেন স্বাধীন বাংলার রূপরেখা। যে বাংলার নাম তাঁরা দিলেন ঐক্যবদ্ধ, সমাজতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক বাংলা। যে বাংলায় কৃষকের-শ্রমিকের অধিকারের কথা তাঁরা বললেন, সেই বাংলার প্রস্তাব কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও মেনে নিয়েছিলেন। যখন তিনি বুঝেছিলেন যে পাকিস্তান বানানো মানে একই দেশে দুই ব্যবস্থা চালানো কোনো মতেই সম্ভব না আর পূর্ব পাকিস্তান গড়লে তাতে শিল্পোন্নত কলকাতা ও তার পার্শবর্তী অঞ্চলকে কংগ্রেস বা মাড়োয়ারি পুঁজি কোনো ভাবেই হাত ছাড়া করবে না, তখন জিন্নাহ বলেছিলেন যে ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন বাংলা হলে তিনি খুশি হবেন এবং সেই বাংলা পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আবদ্ধ থাকবে বলেও তিনি জানান। কিন্তু এই প্রস্তাবে কংগ্রেসের ভিতরে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সেই আলোড়ন সৃষ্টি হয় কারণ মাড়োয়ারি আর হিন্দু জমিদারদের প্রতিনিধি মুখার্জীর মহাসভা এই বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ করে। মুখার্জী বড়লাট কে লেখেন যে ভারত ভাগ হোক বা না হোক, বাংলা ভাগ চাই। এই সময়ে দাঁড়িয়ে, বাংলার শ্রমিক কৃষকের ঐক্যের স্বার্থে, মাড়োয়ারি আর হিন্দি পুঁজির থেকে বাংলার শিল্প ও বাণিজ্যের মুক্তির প্রশ্নে কমিউনিস্টদের কাছে সুবর্ণ সুযোগ ছিল ঐক্যবদ্ধ বাংলার স্বার্থে লড়াই গড়ে তোলার, লীগকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার ও কংগ্রেসের দেশপ্রেমী অংশ কে নিজের দিকে টেনে নেওয়ার।কিন্তু সেই কাজ না করে কমিউনিস্টরা পাকিস্তান তৈরির পিছনে তত্ত্বের জাল বোনা শুরু করেন। কমিউনিস্ট পার্টির সাবর্ণ ভদ্রলোক নেতৃত্বের কাছে সেদিন অসুবিধার ব্যাপার ছিল যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশে তাঁদের পক্ষে থাকা ও রাজনীতি করা সম্ভব হবে না। তাঁরা সেই “ভারতীয় দর্শনের” তাড়নায় সেদিনও বাংলার জায়গায় ভারতকে রাখলেন। ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় তথাকথিত ভদ্রলোক-চালিত বামপন্থী শক্তি এক লহমায় তেভাগা আন্দোলনকে শিকেয় তুলে হিন্দুত্বের, হিন্দি আধিপত্যের পতাকা তুলে ধরে।



উদ্বাস্তু বাঙালির কাছে কংগ্রেস ও কমিউনিষ্ট পার্টি আশ্রয়ের নাম হয় উঠলে একান্নতে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জনসংঘ। জওহরলাল নেহরু বললেন, ‘আরএসএসের জারজ সন্তান’। বাহান্নতে নির্বাচন। হাজারে হাজারে মানুষ আসছে ওপার থেকে। এপার থেকেও যাচ্ছে অনেকে। সেই নির্বাচনে আজকের বিজেপির পূর্বসূরি জনসংঘ লোকসভায় এ রাজ্য থেকে পেয়েছিল সাকল্যে দুটি আসন। কলকাতা দক্ষিণ–পূর্ব কেন্দ্র থেকে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। মেদিনীপুর থেকে দুর্গাচরণ ব্যানার্জি। সমর্থনের হার ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। রাজ্য বিধানসভায় পায় ৯টি আসন। সমর্থনের হার ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে, জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি পায় ২৮টি আসন। সমর্থনের হার ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পাঁচ বছর পর সাতান্নর নির্বাচন। লোকসভায় এ রাজ্য থেকে জনসংঘ জিততে পারেনি একটি আসনেও। সমর্থনের হার নেমে আসে দেড় শতাংশে। বিধানসভাতেও শূন্য, সমর্থনের হার কমে ১ শতাংশের নিচে, শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ। বিপরীতে কমিউনিস্ট পার্টির আসনসংখ্যা বেড়ে ৪৬। সমর্থনের হার বেড়ে ১৭ দশমিক ৮১ শতাংশ। সেদিন এহেন সহায়ক পরিস্থিতি পেয়েও দাঁত ফোটাতে পারেনি সাম্প্রদায়িক শক্তি। কিন্তু ভারত আর পাকিস্তান সৃষ্টি করার পরে দুই দেশের শাসকের কাছেই জরুরী হয়ে ওঠে ভাষার প্রশ্নটি। হিন্দুস্তানী ভাষার থেকে সৃষ্ট উর্দু আর হিন্দিকে তারা আরও বেশি করে ধর্মীয় ভাবে ঘষে মেজে নিতে থাকে। এরই ফল স্বরূপ ভাষা আন্দোলন তীব্র হয় পূর্ব পাকিস্তানে। অন্যদিকে ভারতে হিন্দি কে রাষ্ট্র ভাষা করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পরে দ্রাবিড় জনগণ, বিশেষ করে তামিল নাড়ুর জনগণ। অসংখ্য মানুষের রক্তের বিনিময়ে আটকানো হয় কংগ্রেসের হিন্দি চাপানোর ষড়যন্ত্র। এই লড়াইয়েও বাংলার কমিউনিস্ট নেতৃত্ব কে দেখতে পাওয়া যায়নি। যদিও ভারত সরকার হিন্দি চাপানোর সিদ্ধান্ত কে গত শতকের ছয়ের দশকে স্থগিত করে, সংবিধানের হিসাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ধীরে ধীরে ইংরাজি কে অবলুপ্ত করে হিন্দি কে চাপাতে বাধ্য, যদি না সংবিধান সংশোধন হয়। হিন্দি বা উর্দুর মতন কৃত্রিম ভাষাগুলো যে শুধুই ভাষাগত হামলা করে তাই নয় বরং সাংষ্কৃতিক হামলাও চালায়, ক্ষুদ্র ভাষা গোষ্ঠীগুলোকে, জাতিগুলোকে সাংস্কৃতিক ভাবে উপনিবেশে পরিণত করে, সেই ব্যাপারেও কমিউনিস্ট পার্টি কোথাও জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলেনি। ভদ্রলোক শ্রেণীও আসামের বরাক উপত্যকায় অহমীয় চাপানোর বিরোধিতা করে গুলি খায় কিন্তু কোথাও, পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলিমেরা যে ভাবে উর্দুর বিরুদ্ধে লড়ে গুলি খেয়ে প্রাণ দিলেন, সেভাবে হিন্দির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে থাকেননি। বরং হিন্দি সাম্রাজ্যের তিনটি থাবাকে—সেনা বাহিনী, বলিউড ও ক্রিকেট দলের প্রতি সে আনুগত্য দেখিয়েছে এবং এদের মধ্যে ঢোকার আপ্রাণ চেষ্টা করে এসেছে। কিন্তু এই ভদ্রলোক বামেদের মুখে ঝামা ঘষে দেয় তাদেরই স্বজাতির এক কমিউনিস্ট নেতা। ওপার বাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তু হিন্দু পরিবার কিংবা রাজ্যের হিন্দুদের মধ্যে তৈরি করতে পারেনি সমর্থনের এতটুকু ভিত। কারণ, বামপন্থী প্রগতিশীল শক্তি সেদিন গ্রাম-শহরে চ্যাম্পিয়ন করতে পেরেছিল শ্রেণির ইস্যু। দেশভাগের পরেই শহরে খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন, ট্রামের দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন, ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের জমির অধিকার, পুনর্বাসনের আন্দোলন, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন। আর গ্রামে জমিদার-জোতদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, গরিবদের খাদ্যনিরাপত্তার আন্দোলন। এই আন্দোলনগুলোর যোগফলেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বামপন্থীদের পথচলা শুরু। বামপন্থীদের উত্থান। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিকল্প নীতির লড়াই। যার কেন্দ্রে ছিল শ্রেণির ইস্যু। যা পেছনে ঠেলে দেয় পরিচিতি সত্তার রাজনীতিকে, যা পরাধীন ভারতে অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন দাপট চালিয়ে এসেছিল। শ্রেণির ইস্যুতে এই শ্রেণি ঐক্যেই ২০১১ পর্যন্ত ঘটেনি কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনা। ‘পঞ্চাশের দশকে প্রায় প্রতিবছরই কোনো না কোনো গণ-আন্দোলনের ডাক আমরা দিয়েছি এবং প্রতিটি আন্দোলনেই হাজার হাজার মানুষ কারাবরণ করেছে, লাখ লাখ মানুষ মিছিল ও সভায় অংশ নিয়েছে এবং বিভিন্ন দলমতের মানুষের সমর্থন আমরা পেয়েছি’, বলেছেন জ্যোতি বসু। প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের মাঝামাঝি সময়। ১৯৮১–এর সেপ্টেম্বরে। ‘গত তিন দশকের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা’ নিবন্ধে। ‘১৯৫২ সালের গণ–আন্দোলন ছিল দুর্ভিক্ষের অবস্থার বিরুদ্ধে। ১৯৫৩ সালের আন্দোলনের বিষয়বস্তু ছিল ব্রিটিশচালিত ট্রাম কোম্পানির ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে। ১৯৫৪ সালে শিক্ষকেরা প্রথম রাজভবনের সামনে রাস্তায় এসে বসলেন দাবি আদায়ের জন্য এবং অন্যান্য কর্মচারী মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন পেলেন। ১৯৫৬ সালের আন্দোলন ছিল বঙ্গ-বিহার সংযুক্তির সরকারি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। ১৯৫৮ সালে আবার খাদ্য আন্দোলন। ১৯৫৯ সালে খাদ্য আন্দোলনে ৮০ জন শহীদের কথা এখনো অনেকে ভোলেননি। ১৯৬০ সালে হলো সরকারি কর্মচারীদের ধর্মঘট। ১৯৬০-৬৫, চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ এবং পার্টির অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বের জন্য তেমন বড় কোনো আন্দোলন সংগঠিত করা না গেলেও ১৯৬৬-তে খাদ্য ও বন্দীমুক্তি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। এই ব্যাপক গণ-আন্দোলনগুলোর মধ্যে হয়েছে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে অসংখ্য আংশিক সংগ্রাম। কারখানায়, অফিসে, গ্রামে, স্কুল-কলেজে।’



বাংলা ও বাঙালি জাতিসত্ত্বার রয়েছে দীর্ঘ এক ইতিহাস, যা নির্মিতি দিয়েছে সমন্বয়বাদী এক সংস্কৃতির। যাতে যোগ রয়েছে আত্তীকরণ ও সাঙ্গীকরণের দুর্লভ গুণ। যাপিত জীবন এবং চৌদিকের প্রাণ ও প্রকৃতির সমন্বয়ে উদ্ভূত এই সংস্কৃতি কয়েক হাজার বছরের প্রবহমানতায় ঋদ্ধ। আপন ও অপরের যূথবদ্ধ পরিশীলন তাকে করেছে সমগ্র জাতির বেঁচে থাকার জন্য প্রাণ বায়ু বিশেষ। ১৯২০ দশকে যদিও কংগ্রেস ভারতবর্ষে অবিসংবাদিত রাজনৈতিক দল হিসেবে উঠে এসেছিল এবং তার অস্তিত্ব জাহির করার মতো সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানও খানিকটা অর্জন করেছিল; কিন্তু অদ্ভুতভাবে ব্রিটিশ নীতির প্রকৃত স্বরূপ বোঝার পরেও, মুসলমান সম্প্রদায়কে কখনই তারা দলের এক আবশ্যিক অঙ্গ করার জন্য, বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। যে কারণে ব্রিটিশ সরকার সবসময় ভাবার সুযোগ পেয়েছিল যে, কংগ্রেস আসলে, ‘representative of only a microscopic minority’। এর ফলস্বরূপ স্বভাবত সামাজিক দিক থেকে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মনের দূরত্ব বাড়ছিল। ঐতিহাসিক মুশিরুল মন্তব্য করেছেন, ‘The definition of‘Muslim identity’ was integrally related with relevant issues like economic discontent, escalating violence, projection of the political area, new social groups with higher levels of consciousness and greater stakes in power structures, which led to ‘community based strategies’। আবার ঐতিহাসিক অসীম রায়ের মতে, ‘The entire process of identity formation’ of the Bengal Muslims ‘on one hand underlines the seminal role of the elite, spurred into action by the changed historical circumstances of their position, their inner divergences and conflicts underlying their differential response, their manipulation of symbols of group identification for the optimal participation and mobilization of the masses’। মুসলিম লীগ সে সময়ে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিল যে, মুসলমান সম্প্রদায় অবশ্যই যৌথ সমস্যার এক সমাধানসূত্র খুঁজতে চায়; কিন্তু তা অবশ্যই সেই সময়ে তারা যে বিশেষ সুযোগ সুবিধাগুলো শাসকজাতির কাছ থেকে পাচ্ছিল, সেগুলোকে বর্জন করে নয়। সেসময় অনেক মুসলমান দ্বারা পরিচালিত পত্রিকায় এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় লেখা হয়, ‘The Hindu authors were sowing the seeds of distrust and hatred. If the Hindus were not aware of its consequences, the cordial relationships between the two communities would never be possible’। আবার শেখ ওসমান আলী মন্তব্য করেছিলেন, ‘Hindus might be advanced and cultured, but not all of them were. Similarly, though many Muslims might be backward and illiterate, not all of them were. Therefore there is no reason to regard Muslims as contemptible inferiors; I hope every Hindu brother, instead of regarding us with contempt or dislike, will embrace us with genuine brotherly love’। তাই, ১৯২০-এর দশকের পারস্পরিক বিশ্বাসহীনতা এবং সম্প্রদায়গত সহনশীলতা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসার এক ধারা যে পরবর্তী দশকের সম্প্রদায়গত ঘটনাক্রমকে বেশ জোরালোভাবে প্রভাবিত করেছিল, তা বলাবাহুল্য। সেই বঙ্গভঙ্গ ও দেশভাগের দগদগে দাগের সাথে অবজ্ঞা ও অবহেলার সাথে ক্ষত হয়ে জেগে থাকলো ভাষা আন্দোলন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নতুন দেশের স্বপ্ন দেখছে ওপার বাংলা আর এপার বাংলায় ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা সিপিআই (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি যে সব জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার, স্বীকার করে। সিপিআই (এম-এল) প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি যার কর্মসূচী হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার, হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। আর এর মূল কান্ডারি হন বাংলার কৃষক নেতা চারু মজুমদার। তাঁর তিন বছরের নেতৃত্বে চারু মজুমদার শুধু সিপিআই (এম-এল) কে ভারতের শাসক শ্রেণীর এন্টিডোট হিসাবেই গড়ে তোলেননি, এই দলটিকে তিনি ভারতের শোষিত জাতির মানুষের কাছেও একটি বন্ধু হিসাবে উপস্থাপন করেন। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট বিপ্লবীরাও এর ফলে সাহস পান। কিন্তু চারু মজুমদার পরবর্তী সময়ে নানা রাজ্যে বেড়ে ওঠার স্বার্থে, বিশেষ করে হিন্দি বেল্টে সংগঠন বাড়ানোর তাগিদে, সিপিআই(এম-এল) দলের বিভিন্ন গোষ্ঠী হিন্দির বিরুদ্ধে অবস্থান থেকে সরে আসে ধীরে ধীরে। বাংলা আবার প্রতারিত। এবং মজার বিষয় "মুক্তিযুদ্ধ" চলাকালীন কমিউনিস্টদের হাতে অস্ত্র দেওয়া হয়নি মস্কো আর দিল্লির হুকুমে। কমিউনিস্টরা আওয়ামীদের হয়ে প্রচার করেছে, মেডিক্যাল ক্যাম্প করেছে আর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করেছে, কিন্তু যুদ্ধ করেনি। বাংলাদেশ গঠনের সাথেই সিংহ যে শেখের সাথে ঐক্য করে মস্কোর হুকুমে নিজের দল কে আওয়ামী লীগে বিলীন করে বাকশাল গঠন করেন ও যে ভাবে কমিউনিস্ট পার্টি শেখের সমস্ত অপকর্মের সময় তার জোটসঙ্গী হিসাবে নীরব থাকে তার ফল দলটিকে আজও বাংলাদেশে ভুগতে হচ্ছে। একটি বৃহৎ সংগ্রামী দল থেকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আজ শুধুই বিবৃতি প্রকাশ করার পার্টিতে পরিণত হয়েছে। এই ১৯৭১ সালে যখন চারু মজুমদার ও সিপিআই(এম-এল) কংগ্রেসি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ সহ নানা জায়গায় লড়ছে, তখনই কিন্তু কংগ্রেসীদের সাথে হাত মিলিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির ভদ্রলোক নেতৃত্ব শ্রীমতি গান্ধীকে এশিয়ার মুক্তি সূর্য আখ্যা দেন। ভাঙ্গা বাংলার পাশে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ জন্ম নিল। দুই বাংলাতেই খেতে-পরতে পারা ভদ্রলোকের সন্তানদের মধ্যেই বাম মনোভাব বেশি দেখা যায়, আর তারা বঙ্গীয় আত্মপরিচয় নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদ ভাবলেই তারা শিউরে ওঠে পারিবারিকভাবে লালিত-পালিত ইসলাম বিদ্বেষের কারণে। তারা মনে করে হিন্দি ভারতের রাষ্ট্র ভাষা। তাই মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় থেকে সেলিম সাহেব, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের মতন তাঁরাও যে কোনো সময় হঠাৎ হিন্দি সংলাপ বলে আসর গরম করার চেষ্টা করেন। তাঁরাও বলিউড, ক্রিকেট আর সেনাবাহিনীর সম্মিলিত প্রয়াসে তৈরি ভারত দর্শনে বিশ্বাসী। অথচ তারা জানে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসাম পর্যন্ত বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার ততদিন থাকবে যতদিন বাঙালি মুসলিম থাকবে। কারণ শেষ পর্যন্ত রাস্তায় নেমে বিজেপির সাথে লড়াই করার কাজ এই সম্প্রদায়ই করবে। এই সম্প্রদায়কেই নিজেকে বাঁচানোর জন্যে বাংলা ভাষা ও নিজের অস্তিত্ব কে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু তবুও তারা বাংলার আপামর দলিত, আদিবাসী ও মুসলিমদের থেকে নিজেকে বাঁচিয়েই রাখবে।



মনে রাখা জরুরি শুধু সংস্কৃতি দিয়ে একটা জাতি বাঁচে না তার শ্রী বা সমৃদ্ধি প্রয়োজন। সংস্কৃতি মনের খোরাক কিন্তু পেটের খোরাক না জুটলে মানুষ সাধের সংস্কৃতিও জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য। এগারোতে পালা বদলের পর মানুষের আশা ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে এমন কিছু গুণগত পরিবর্তন আনবেন, যা স্বাধীনতা পরবর্তী কংগ্রেস সরকার বা ৩৪ বছরে বামেরা আনতে পারে নি। কিন্তু পরিবর্তনের পনের বছর পর পশ্চিমবঙ্গবাসী দেখছে, তারা মধ্যম থেকে অধমে পরিণত হয়েছে। আলিমুদ্দিনে বসে অনিল বিশ্বাসেরা তবু মধ্যমেধায় সার-জল দিতেন কিন্তু কালীঘাটের পাল্লায় পড়ে বাঙালির মেধাশূন্য হ‌ওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা- সব গোল্লায় গেছে। কমপক্ষে তিরিশ শতাংশ সরকারি বাংলামাধ্যম হাইস্কুল পড়ুয়া শূন্য হ‌ওয়ার মুখে। মধ্যবিত্তের বাংলামাধ্যম থেকে আস্থা উঠে গেছে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে রাজ্যের শহরাঞ্চলে সব সরকারি হাইস্কুল বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারি স্কুলগুলিতে ছেলেমেয়েদের বছরভর ‘সাব-স্ট্যান্ডার্ড’ শিক্ষা দিয়ে পরীক্ষায় ভুরি ভুরি নম্বর পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার অবস্থাও তদ্রুপ। অধিকাংশ কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। কোনও দিন নিয়োগ হবে‌ বলেও মনে হয় না। বহু কলেজে ক্লাস নেওয়ার পাট উঠে গেছে। রাজ্যের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলি দক্ষতাহীন, জ্ঞানবর্জিত ডিগ্রিধারী শিক্ষিত-উচ্চশিক্ষিত যুবক-যুবতীর সংখ্যাই কেবল বাড়িয়ে চলেছে বছর বছর। এমনকি ভাল পড়ালেখা করেও লাভ নেই। নামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দারুণ নম্বর নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের সাত-আট বছর পরেও বেকার থাকতে হচ্ছে ছেলেমেয়েদের। রাজ্যে এমন একটা দল সরকারে, যার কোনও ‘ভিশন’ নেই, ‘মিশন’ একটাই- চুরি করা। দলটা হরেক কিসিমের ধান্ধাবাজদের একটা বৃহৎ ছাতা, ছত্রিশ দল থেকে যেখানে এসে জুটেছে সবাই। দলের যিনি মাথা, তাঁর নিয়ন্ত্রণহীন আত্মপ্রেম ইতিমধ্যেই ‘মেগালোম্যানিয়ায়’ পরিণত হয়েছে এবং রাজ্যের মানুষকে সেই যাতনা দিবানিশি সহ্য করতে‌ হচ্ছে দাঁতে দাঁত চেপে। বাঙালির দরকার প্রভূত সম্পদ ও সমৃদ্ধি। কিন্তু বাঙালিকে বানানো হচ্ছে ভাতাজীবী। বাঙালি ছেলেমেয়েদের দরকার ভাল রোজগার। অথচ ‘তোলাবাজি’ ছাড়া তাদের সামনে কোন‌ও ‘অপশন’ এখন নাক পর্যন্ত ঋণে ডুবে থাকা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজস্বের সবথেকে নির্ভরযোগ্য উৎসের নাম আবগারি।‌ লোকজন ঠাট্টা করে বলে, বাংলায় সরকার চলে ‘মালের’ পয়সায়। মদের দোকানের লাইসেন্স চাওয়া মাত্রই পাওয়া যায়। বাংলার গা গঞ্জেও তিন-চারটি করে অনুমোদিত বিলিতি মদের দোকান। দারু খেয়ে যুবকদের বেকারত্বের জ্বালা ভোলার ভাল ব্যবস্থা করেছে সরকার। বাঙালির বিধিই বুঝি বাম! বছর পনের আগে কত সাধ করে ঘরে ডেকে এনেছিল ঘাস। আশা একটাই- মধ্যম থেকে অধমে নামার পর উত্তম হ‌ওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোন‌ও রাস্তা নেই। অধমের অনিবার্য পরিণতি পতন। পতনের মুখ থেকে বাঙালি কি ঘুরে দাঁড়াবে না? বাঙালি জাতি নিশ্চয় পতনের দুয়ার থেকে ফিরবে। ফিরবেই। তবে ভুলে গেলে চলবে না বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদকে বাদ দিয়ে আজ বাঙালির কথা বলা ধৃষ্টতা। আবার বঙ্গের নানা শোষিত জাতি—গোর্খা, কামতাপুরি, রাভা, সাঁওতাল, চাকমাদের কথা বাদ দিয়ে শুধু বাঙালি জাতীয়তার কথা বলাও উচ্চবিত্তের বিলাসিতার জাতীয়তাবাদ। আজ নানা রাজ্যে বাঙালির উপর হওয়া উৎপীড়নের বীজ লুকানো আছে এই মাটির তলায়। সেই বীজ একা মুখার্জী রোপন করেননি। বিংশ শতকে বিশেষ করে সুভাষকে বের করে দেওয়ার পর থেকে বাংলার বুকে মূলধারার কংগ্রেসি রাজনীতির লুম্পেনীকরণ ঘটেছে যেটা বিধান রায় সামনে থাকার জন্য সেভাবে স্পষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু বাঙালি ভদ্রলোকের একটা ক্রমান্বয়ে নেগেটিভ ফিল্টারিং ঘটেছে কংগ্রেসি রাজনীতিতে। বাঙালি প্রধানত বিপ্লবী, এবং সে বিপ্লবী চিন্তাধারা বিংশ শতকে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের হাত থেকে ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক বামপন্থার একচেটিয়া হয়ে যাবে। কমিউনিস্ট নেতাদেরও দায় আছে। যদিও সিপিআই(এম-এল) একবার চেষ্টা করেছিল, তবুও ব্যাপক ভাবে ভারতে আগ্রাসী হিন্দির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারাও বর্তমানে রাজনৈতিক বাধ্যকতার কারণে পিছিয়ে গেছে।বাঙালি নিপীড়ণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বাঙালি ভদ্রলোক সম্প্রদায় বিশ্বাসের অযোগ্য তাদের ইসলাম বিদ্বেষের কারণে। বাংলার কমিউনিস্টরাও ভরসার অযোগ্য তাদের দিল্লী প্রীতির কারণে। তবুও বঙ্গীয় জাতির মুসলিমরা ধর্মীয় মৌলবাদ ও দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবেন। তাঁরা উর্দুর বিরুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, হিন্দির বিরুদ্ধেও দেবেন। ভদ্রলোক সম্প্রদায় দেবে না।



বিংশ শতকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক প্রকাশ সঠিকভাবে ঘটে নি। কংগ্রেস সর্বভারতীয় আর সিপিএম আন্তর্জাতিক। আনন্দমার্গ বা আমরা বাঙালি কেউই বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠন নয়। সুনীলরা বাংলাদেশ থেকে ভাষাবাদ আমদানি করেছিলেন, সেটার উত্তরাধিকার বহন করে আজকে তৃণমূল সমর্থিত একাধিক ভাষাবাদী সংগঠন। বলা দরকার নব্বই দশকের শেষেও বিজেপির একটা ছোটখাট উত্থান ঘটেছিল, তপন শিকদার দমদমে এবং জলু মুখার্জি কৃষ্ণনগর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কাজেই সিপিএমের জন্য ভাষাবাদ কেবল আমরা বাঙালি নয়, ওই বিজেপি আটকাতেও স্ট্র্যাটেজিক প্রয়োজনে এসে থাকবে। এবারও আমরা দেখেছি যে মমতা ব্যানার্জি ভাষাবাদী কয়েকটি সংগঠনকে দিয়ে বিজেপির বিরোধিতা করিয়েছেন। তবে তাতে নির্বাচনে কতটা লাভ হয়েছে, আর গ্রেটার বাংলাদেশের আশঙ্কা কতটা বেড়েছে সাধারণ হিন্দু ভোটারের কাছে, সেটা আলোচনাসাপেক্ষ। যে ভোটার বিজেপির দিকে চলে গেছে, সে তৃণমূলের মদতে চলা এই সব সংগঠনের ভাষাবাদ দেখে আকৃষ্ট হয়নি? নব্বই দশকে সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, মূলধারার একাডেমিয়া ও মিডিয়া বাংলাদেশে হিন্দুর এথনিক ক্লিনজিং-সংক্রান্ত তথ্য সবটাই সেন্সর করত। আজকের বাংলায় দাঁড়িয়ে প্রতিটি বাঙালিকে বুঝতে হবে কংগ্রেস বাঙালির প্রতিষ্ঠান নয়। যার বীজ বপন শুরু হয়েছিল রাধাকান্ত দেব আর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে এককালে, চরমপন্থী আর নরমপন্থী, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি আর চিত্তরঞ্জন দাশ পরস্পর লড়াই করে সেদিন গান্ধীর হাতে ভারতকে তুলে না দিলে আজ কংগ্রেস নামধারী আদ্যোপান্ত লুম্পেন দল তৃণমূল আর আদ্যোপান্ত অবাঙালি দল বিজেপির মল্লযুদ্ধের এই অলীক কুনাট্য রঙ্গে বাঙালির অস্তিত্বকে ডোডোপাখির মত এত বিপন্ন দেখাত না। এই পরিস্থিতে দাঁড়িয়ে মেকি বাম-হিন্দুত্ব চক্রান্ত ব্যর্থ করা একটি গুরু দায়িত্ব। বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সাম্য আন্দোলন গড়ে তোলাও আজ জরুরী। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন ইতিহাসের এই বিশ্বাসঘাতকতার মুখোমুখি হওয়া এবং সত্যিকারের গণমুখী রাজনীতি গড়ে তোলা।



বহুবছর পর তোমাকে ছাতামাথা কি যে লিখলাম পড়তে বিরক্ত লাগলে পড়ার প্রযোজন নেই, আসলে এইসব কথা আজকাল আর প্রকাশ্যে বলা যায় না, বললেই কিছু অন্ধ মানুষ তেড়ে আসে নয়ত দলকানার মতন কথা জুড়ে তাই এইসব আজকাল বলতেই চাইনা। তুমি বুঝবে বলেই এত বড় চিঠি তোমাকে লিখে ফেললাম। নিরন্তর ভালো থেকো। এখানে এখন ভীষণ গরমের পরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। ভেসে যাচ্ছে চরাচর, কাগজের নৌকা বানিয়ে তোমার কাছে পৌঁছে যাওয়া যেত যদি এইরাতে বেশ হতো বলো…





হারিয়ে যাওয়া সময়ের আনন্দটুকু নিয়ে

বাসু

২৬ মে, ২০২৬

0 comments: