2

ধারাবাহিক - সুজিত নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

Posted in


ধারাবাহিক


এক কিশোরীর রোজনামচা - ১৫
সুজিত নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়



Diary Entry - 12
11th. July, 1942, Saturday






প্রিয় কিটী,

এখানে আসার পর থেকে আমরা কেউই জায়গাটা মানিয়ে নিতে পারছি না। বিশেষ করে মেনে নিতে পারছি না যে আমাদের গোপনে, লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে। আর কতদিন থাকতে হবে, তা’ও জানি না। শুধু মা, বাবাই নয়, মারগটও এখনও পর্যন্ত, এখানকার বড় ওয়েস্টারটোরেন (Westertoren) ঘড়িটার সময় নির্ধারক ঘন্টা বাজার শব্দের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছে না। মনে হচ্ছে, ওদের অজান্তে সময়টা চলে যাচ্ছে। ওরা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না; শুধুই শুনছে। আর আমি? আমার কথা থাক এখন।

জান, প্রতি পনেরো মিনিট অন্তর ঘড়িটা সময় জানিয়ে বেজে ওঠে। আমার কিন্তু শব্দটা বেশ ভাল, সুন্দর লাগে শুনতে। বিশেষ করে রাত্রিতে যখন আমাদের সময় জানাতে ঘড়িটা বেজে ওঠে, তখন মনে হয়, ওটা যেন বিশ্বস্ত সহায়কের মতো, আমাদের নিরলস সময় জানিয়েই চলেছে। আমার মনে হয়, তুমি যদি ঘড়ি থেকে বেজে ওঠা ওই অদৃশ্য সময়ের ধ্বনি একবার শোন, তা’হলে তোমারও শুনতে ভাল লাগবে। ওটা যেন সময়ের ধ্বনিকেই বাজিয়ে যায়। কিন্তু আমরা বাইরের দুনিয়ার সাথে আমাদের সময়কে মানিয়ে নিতে পারছি না। আমাদের সময় যেন থেমে গেছে এই অ্যানেক্সের পর্দা মোড়া জানালার এ’পারে। 

কেন জানি না আমার বিশ্বাস, আমি এখনও আমার সময়ের ধ্বনিকে চিনতে পারছি না। আমি মেনে নিতে পারছি না আমার অবস্থান, যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি, সেটাকে। আমি ভাবতে পারছি না এটা আমার নিজের বাড়ি। সময় আমায় বা আমাদের কোথায় নিয়ে চলেছে, জানি না। মনে হচ্ছে এই সময়টাই আমার অচেনা, আজানা। তবুও সময় বেজেই চলেছে, সামনের ওয়েস্টারটোরেন ঘড়িটাতে। সে যেন কারুর কথা শোনে না, শুধুই তার আওয়াজ শোনায়। 

যে বাড়িতে অ্যানিরা লুকিয়ে ছিল সেই বাড়ির বাইরে থেকে তোলা ছবি। লুকানোর আদর্শ স্থান।

তুমি এ’কথা ভেব না, যে আমি এই বাড়িটাকে ঘৃণা করি, বা ঘৃণা করতে চাই। এ’সব কিছুই নয়। অপছন্দের অর্থ কখনই ঘৃণা নয়। আমি তাকে চিনতে পারি না, কিংবা সে আমায় চেনা দেয়না, তাই আমি অপছন্দ করি। আসলে কি জান, বাড়িটা অনেকটা বোর্ডিং হাউসের মতো। এখানে এসে খুব সুন্দর একটা ছুটি কাটানো যায়। কিন্তু এখানে থাকা বা বাস করা যায় না। তুমি হয়তঃ আমার কথাটা ঠিক বুঝতে পারছ না, কিংবা শুনতে তোমার প্রলাপের মতো মনে হচ্ছে। তবুও এই বাড়িটা সম্পর্কে এটাই আমার উপলব্ধি। বাড়িটার সঙ্গে যে গোপন ‘সংযোজিত’ অংশটা আছে, সেটা অবশ্যই একটা আদর্শ লুকানোর জায়গা। তাই ত’ আমরা লুকিয়ে আছি। সংযোজিত এই অংশটা একদিকে হেলে আছে। ভিতরটা বেশ স্যাঁতস্যাঁতে, ভিজে ভিজে। তা’সত্বেও তুমি গোটা অ্যামস্টারডাম (Amsterdam) শহর খুঁজে দেখলেও এ’রকম একটা আদর্শ লুকানোর আস্তানা কোথাও পাবে না। শুধু অ্যামস্টারডাম কেন, গোটা হল্যান্ডেও খুঁজে দেখলে বোধহয় এ’রকম জায়গা পাবে না। এখানে আমরা যে ছোট্ট ঘড়টাতে আছি তার দেওয়ালগুলো অনাবৃত, ঘড়টাও একেবারে আসবাহীন। 

এ’রকমই পাশাপাশি দুটি আসবাব বর্জিত ঘরে অ্যানি ও তার পরিবার থাকতেন। 

কিন্তু আমি আমার বাবার কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি আসার সময়, ওই বাড়িতে আমার ঘরে টাঙানো সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ছবিগুলো মনে করে নিয়ে এসেছিলেন। তা’ছাড়াও অনান্য প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিগুলোও তিনি খুলে আনতে ভোলেননি। তাতে যে সুবিধাটা হলো তা’হলো, মোটামুটিভাবে আঠার পাত্র আর একটা ব্রাশ দিয়ে, খালি দেওয়ালে আঠা লাগিয়ে জায়গামতো ছবিগুলো লাগাতে পেরেছি। অনাবৃত দেওয়ালগুলো ঢেকে, একটা দেখার মতো বড় ধরণের চিত্ররূপ আপাত ভাবে দেওয়া গেছে। এ’তে আর কিছু না’হোক, খালি দেওয়ালগুলোর ‘মনখারাপ’ করা বিবর্ণতাকে কিছুটা হলেও ঢাকা দেওয়া গেছে। আর দেওয়ালগুলোও বেশ রঙিন হয়ে উঠেছে। আমাদের চারপাশের ‘গিলে খাওয়া বিবর্ণতা থেকে’ মুক্ত হওয়া গেছে। এরপর যখন ভ্যান ড্যান আসবেন, তখন তাঁকে দিয়ে চিলেকোঠা থেকে কিছু কাঠের টুকরো আর পাটাতন পেড়ে নেব। সেগুলো দিয়ে দেওয়ালে কয়েকটা ক্যাবারড তৈরী করিয়ে নেব। এ’ছাড়াও কিছু টুকিটাকি জায়গা তাঁকে দিয়ে বের করিয়ে নেব। তা’হলে দেওয়ালটা আর এ’রকম ফাঁকা ফাঁকা বা নেড়া নেড়া লাগবে না। 

মা আর মারগটের শরীর আপাততঃ কিছুটা সুস্থ হয়েছে। গতকালের তুলনায় আজকে সুস্থ বোধ করার মা সকালে উঠে আমাদের জন্য আগুনে স্যুপ চাপিয়ে দেয়। তারপর নীচে যায় অন্যদের সাথে কথা বলতে বা তাদের খবরাখবর নিতে। ইতিমধ্যে হঠাৎ নাকে পোড়ার গন্ধ পেয়ে দেখি প্যানের মধ্যে স্যুপের জল শেষ, তারপর স্যুপের দানাগুলো পুড়তে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত মা নীচে থেকে পোড়ার গন্ধ পেয়ে যখন দ্রুত পায়ে ওপরে উঠে আসেন, ততক্ষণে প্যানের মধ্যের স্যুপ নামক খাদ্য দ্রব্যটি সবটা পুড়ে ঝাঁঝ হয়ে গেছে। আর প্যানে ওপর সেটা কালো হয়ে সেঁটে গেছে। 

মিঃ কোও্পহিউস (Mr. Koophuis) আমার জন্য একটা বই এনেছিলেন। বইটার নাম “Young People’s Annuls”। জান, গতকাল আমরা চারজন (বাবা মা সহ) বাড়িটার ব্যক্তিগত অফিসের অংশে গিয়ে, অফিসের রেডিওটা চালিয়েছিলাম। খবর শোনার জন্য। কিন্তু খবর শুনে আমি এত ভয় পেয়ে গেছিলাম, যে, তাড়াতাড়ি বাবার হাতটা চেপে ধরে প্রায় শীৎকারের মতো আর্তনাদ করে বাবাকে বলেছিলাম, “আমাকে তাড়াতাড়ি ওপরে নিয়ে চল। ওখানকার অনেকেই আমার ওই শীৎকার স্বর শুনেছিল। আমার মা’তো অবশ্যই শুনেছিলেন। তিনি নিশ্চিতভাবে বুঝেছিলেন যে আমি সত্যিই ভয়ার্ত ও আতঙ্কিত। মা আমার ভয় পাওয়ার কারণটাও ঠিকঠাক বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনিও তৎক্ষণাৎ আমার সঙ্গে ওপরে উঠে আসেন। মা-এর অবশ্য ভয় পাওয়ার আরও একটা কারণ ছিল। আমার ওই শীৎকারের অওয়াজ যদি আমাদের পড়শীরা কোনভাবে শুনতে পায়, তা’হলে ওরা সন্দেহ করতে পারে আমাদের বাড়ি বা আমাদের অবস্থান সম্পর্কে। তারা জেনে যেতে পারে বা অন্ততঃ অনুমান করতে পারে যে, বাড়ির মধ্যে নিশ্চয় কেউ আছে। আমরা নিজেদের আত্মগোপনের স্বার্থে ও যথাযথ নিরাপত্তার খাতিরে এখানে আসার প্রথম দিনই আমাদের সামনের সমস্ত দিকগুলো সোজাসুজিভাবে মোটা কাপড়ের পর্দা দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলাম। যাতে বাইরে থেকে কেউ আমাদের এখানে থাকার সম্পর্কে কিছু না জানতে পারে। অবশ্য আমারা যেগুলো টাঙ্গিয়ে ছিলাম সেগুলোকে ঠিক প্রচলিত অর্থে পর্দা বলা চলে না। কারণ প্রচলিত পর্দা টাঙ্গালে বাইরের লোকে অন্য কিছু ভাবতে পারে। ওইগুলো ছিল, বিভিন্ন টুকরোটাকরা জিনিষ ও কাপড়ের লম্বা লম্বা ফালি। জিনিষগুলোর রঙ সাইজ সব কিছু আলাদা। ওইগুলোকে আমি আর বাবা আমাদের নিতান্ত অনভ্যস্ত হাতে দড়ি দিয়ে বেঁধে, মোটা সুতো দিয়ে সেলাই করে জোড়া লাগিয়ে আমাদের সামনের দিকের জানালা প্রভৃতি খোলা জায়গাগুলোতে লাগিয়ে দিয়েছি, যাতে বাইরে থেকে কেউ আমাদের দেখতে না পায়। আমার আর বাবার এই ঐতিহাসিক যৌথ “শিল্প কর্মগুলোকে” ছোট ছোট কাটি আর পেরেক দিয়ে এমনভাবে আটকে দিয়েছিলাম, যাতে কোনভাবেই সেগুলো খুলে না যায়, আর আমারা যে ক’দিন এখানে থাকব সে’কদিন যেন কেউ দেখতে বা জানতে না পারে যে এখানে কিছু লোক আছে। 

আমাদের ঠিক ডান পাশে একটা মাঝারি মাপের বাজার বা ব্যবসা কেন্দ্র আছে। আর বাম দিকে আছে একটা আসবাবপত্রের দোকান। সাধারণতঃ দিনের বেলায় কাজের সময়টুকু ছাড়া ওই দুই দিকে কারুরই আসা যাওয়া ছিল না। এ’তে আমাদের সুবিধাই হয়েছিল। কারণ জায়গা দুটো প্রায় ফাঁকা পড়েই থাকত। তবুও, কথায় বলে “দেওয়ালেরও কান আছে” । তাই কেউ কোথাও না থাকলেও সারাটা দিন আমাদের প্রায় আওয়াজহীন চলাফেরা বা কাজকর্ম কথাবার্তা সবই করতে হতো। কারণটা আর কিছুই নয়, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। মাঝে মারগটের খুব কাশি হয়েছিল। জান, আমরা রাত্রে মারগটকে কাশতেও দিতাম না। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা লাগা সত্বেও সে যাতে দিনে বা রাত্রে শব্দ করে না কাশে, তার জন্য, ওকে বেশী ডোজে কোডিন খাওয়ানো হতো। আমি মঙ্গলবারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কারণ ঔ’দিন ভ্যান ড্যানের আসার দিন ছিল। ভ্যান ড্যানরা এলে খুব ভাল হয়। বিশেষকরে ওরা এলে আমার খুব আনন্দ হয়। সবসময় এ’রকম চুপচাপ বসে থাকতে হবে না।
হ্যারম্যান ভ্যান পেলস। এবং অগস্ট ভ্যান ড্যান, বা ভ্যান পেলস । এনারা অ্যানি ফ্রাঙ্কদের সাথে একসাথে উপগৃহে থাকতেন। 

আসলে সন্ধ্যে হলেই আমার ভয় করত। সন্ধ্যে থেকে সারা রাত্রি আমাদের এক আশ্চর্যজনক অন্ধকার আর নিস্তব্ধতার মধ্যে কাটাতে হতো। মনে হতো কেউ কোথাও নেই। আমার খুব ভয় করত। আমি সব সময় চাইতাম সন্ধ্যে থেকে যেন এক শক্তিশালী রক্ষাকর্তা সব সময় আমাদের সঙ্গে থাকে। সে আর কিছু না’হোক অন্ততঃ আমাদের বেঁচে থাকার মতো নিরাপত্তাটুকু যেন দেন। যাতে রাত্রে আমরা পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি। আমি ঠিক তোমায় আমার ভিতরের যন্ত্রণাটাকে বাইরে এনে বোঝাতে পারব না। ভাবতে পারো, ইচ্ছা হলেও আমরা বাইরে বেরোতে পারব না, বাইরের বাতাস নিতে পারব না। সব সময় আমাদের ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়, এই বুঝি বাইরের কেউ আমাদের দেখে ফেলল। আর দেখা মাত্রই আর কিছু না বলে গুলি করে মেরে দিল। এই ভয়ে সারাদিন আমরা ফিস ফিস করে কথা বলি; পা টিপে টিপে হাঁটি। এ’রকম যদি ভুলে গিয়েও না করি তা’হলেই, এই গুদোম হাউসের বাইরের দিকে যারা আছে, চলে ফিরে বেড়াচ্ছে, তারা আমাদের লুকানো অবস্থানটা জেনে যাবে, আর আমাদের ধরিয়ে দেবে। 

কিটী এবার লেখা বন্ধ করছি, কে যেন আমায় ডাকছে। 

ইতি,

তোমার অ্যানি 



অনুবাদকের সংযোজন -
ওয়েস্টারটোরেন-এর (Westertoren) বড় ঘড়িটা ছিল ওয়েস্টারকেরক (Westerkerk) গির্জার সংলগ্ন বড় একটা ঘড়ি। জায়গাটা অ্যানিদের উপগৃহ বা অ্যানেক্সের খুব কাছেই ছিল। এই উপগৃহেই অ্যানিদের ও ভ্যান ড্যান দের পরিবার দুবছরের অধিক সময় অন্তরালবর্তী হয়ে ছিল। নাৎসিদের ভয়ে তারা, উপগৃহের জানালা ভাল করে খুলতেও পারত না। ভিতর থেকে দিন রাত্রির তফাৎ বোঝাও ছিল দুষ্কর। এই ওয়েস্টারটরেনের ঘড়ির আওয়াজই ছিল তাদের সময় জানার অন্যতম উপায়। বাইরের আলো বা আকাশ দেখে দিনের অবস্থান বোঝার পরিপূর্ণ সুযোগ তাদের ছিল না। তাই অ্যানির ডাইরিতে এই ওয়েস্টারটোরেনের ঘড়ির কথা বারবার আলোচনায় এসেছে। এই ঘড়ির উচ্চতম চূড়াটাকে অ্যানেক্সের চিলেকোঠার ছাদ থেকে দেখা যেত। অ্যানি প্রায়শ একা একা অ্যানেক্সের চিলেকোঠায় বসে ওয়েস্টারটোনের ঘড়ির এক্সুরে বাঁধা ঘণ্টার সুরেলা ঐক্যধবনি শুনত। ঘণ্টার সাথে ধ্বনি যন্ত্রের ঐক্যতান তার মধ্যে এক অন্য ধরণের মুক্তি স্বাদ এনে দিত। এক একটা সময়ের এক একটা ধ্বনি তার কাছে বাইরের জগতের পূর্ণ কোলাহল বলে মনে হতো। এই চার্চের বাইরেই অ্যানির স্মৃতি সৌধ তৈরী করা হয়। অনেকে বলেন অ্যানির কাছে এই ঘণ্টার শব্দ ছিল যেন মুক্তি ঘণ্টার আওয়াজ।

2 comments:

  1. স্বচ্ছন্দ ভাষায় গল্প বলার স্টাইলে লেখা, বেশ ভাল লাগছে। পরের সংখ্যার জন্যে অপেক্ষা করতে ইচ্ছা করছে।

    ReplyDelete
  2. Amarnath Banerjee24 March 2017 at 18:43

    This is very easy reading and very good translation barring 2 Bengali spelling mistakes and one wrong application of word. After a long time I am reading such a lucid translation. - Amarnath Banerjee

    ReplyDelete