Next
Previous
0

ধারাবাহিক - মনোজ কর

Posted in




















২য় পর্ব- মোহনাশহর বিলবাও এবং গুগেলহাইম মিউজিয়ম।




যে রকম আগের থেকে ঠিক করা হয়েছিল এবং মিনি প্লেনের টিকিট আর হোটেল

ব্যবস্থা করে রেখেছিল সেইমত ২৬শে মার্চ সকালবেলা রওনা দিলাম বিলবাও এর

উদ্দেশ্যে। মুনমুনের পায়ের সমস্যাটা তখনও মেটেনি। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা এবং

হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল তখনও। তা সত্ত্বেও ক্যান্সেলেশন এবং রি-বুকিং এর

ঝামেলা এড়াতে ও কিছুটা জোর করেই বেরিয়ে পড়ল। বোলোনিয়া থেকে মিউনিখ,

মিউনিখ থেকে প্লেন চেঞ্জ করে বিলবাও পৌঁছতে বিকাল হয়ে গেল। আগে থেকে বলে

পুরোটাই হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তাই অসুবিধে খুব একটা হয়নি।

বিলবাও স্পেনের একটি আধুনিক বাণিজ্য শহর। এই শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে

নারভিয়ন নদী। লন্ডনে যেমন টেমস, প্যারিসে যেমন সেইন, কলকাতায় যেমন হুগলী

তেমনই বিলবাওতে নারভিয়ন। নদীর দু’পাশে গড়ে উঠেছিল জনপদ যা ক্রমে ক্রমে

এখন এক আধুনিক দর্শনীয় শহরের চেহারা নিয়েছে। আমরা যে হোটেলে উঠলাম সেটা

নদীর ধারেই। জায়গাটার নাম ক্যাম্পো ভোলান্টিন। হোটেলের জানলা দিয়ে নদী আর

নদীর পাশের রাস্তা দেখতে দেখতে সময় কাটিয়ে দেওয়া যায় অনায়াসে। হোটেল থেকে

বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে ওপারে যাবার জন্য ফুটব্রিজ। এই ফুটব্রিজের নাম

জুবিজুরি। জুবিজুরি অর্থ সাদা ব্রিজ। জুবিজুরি টায়েড আর্চ ব্রিজ অর্থাৎ এপারে

ক্যাম্পো ভোলান্টিন থেকে ওপারে উরিবিতার্তে অবধি বিস্তৃত দুটো স্টিল আর্চের

থেকে স্টিলের মোটা পাকানো দড়ি দিয়ে ঝোলানো এই ব্রিজ। ব্রিজের রঙ সাদা এবং

রাস্তা কাচের ইট দিয়ে তৈরি। ১৯৯৭ সালে নির্মিত এই ব্রিজের রূপকার বিশিষ্ট

স্থপতি স্যান্টিয়াগো কালাভাত্রা। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে যাওয়া

যায়। ওপারে বিলবাও-এর পুরনো সিটি সেন্টার। গাড়ি নিয়ে পুরনো সিটি সেন্টারে

ঢোকা যায়না। সরু সরু রাস্তার দুপাশে রকমারি দোকান পাট, রেস্টুরেন্ট। সরু

রাস্তাগুলো এসে মিলেছে একটা স্কোয়ারে। স্কোয়ারে পাতা আছে অনেক চেয়ার,

বেঞ্চি। বাজার দোকান ঘুরে এককাপ কফি বা একগ্লাস বিয়র নিয়ে একটু জিরিয়ে

নেয় পর্যটকেরা। নতুন সিটি সেন্টারের চেয়ে পুরনো সিটি সেন্টারে জিনিসপত্র একটু

সস্তা। জায়গাটাও নতুন সিটি সেন্টারের থেকে বেশ শান্ত। উরিবিতার্তের থেকে নদীর

ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত আর্ট মিউজিয়ম গুগেনহাইম

মিউজিয়মে। হাঁটতে কষ্ট হলে অথবা বৃষ্টি এসে গেলে রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়া

ট্রামে উঠে পড়া যায়। বিলবাও শহরের প্রান্তদেশ ছাড়িয়ে একটু এগোলেই চোখে

পড়বে তিন নদীর মিলনস্থল। নারভিয়ন,ইবাইজাবাল আর কাডাগুয়া। ক্যাম্পো

ভোলান্টিন থেকে নদীর ধার দিয়ে হাঁটা পথ শেষ হয়েছে নতুন অত্যাধুনিক সিটি

সেন্টারে। বিশাল বিশাল মল, হোটেল ,ব্যাঙ্ক আর নামী দামী ব্র্যান্ডের শো-রুম




ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চারিদিকে। ভূগর্ভস্থ মেট্রো রেলে চেপে পৌঁছে যাওয়া যায়

শহরের সর্বত্র।


২৭শে মার্চ বিলবাও শহরটা ঘুরে দেখে ফিরে এলাম হোটেলে। পরেরদিন গুগেনহাইম

মিউজিয়ম দর্শন। মিনি আগে থেকে টিকিট কেটে রেখেছিল। দেশ বিদেশের অসংখ্য

পর্যটক এবং শিল্পরসিক বিলবাও আসে এই মিউজিয়মের আকর্ষণে। এই

মিউজিয়মের মূলত সংরক্ষিত আছে বিংশ শতাব্দীর কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পীর

আধুনিক শিল্পসম্ভার। এদের মধ্যে একজন হলেন রুথ আইকো আসাওয়া।

আসাওয়ার জন্ম আমেরিকার নরওয়াকে ১৯২৬ সালের জানুয়ারিতে। আসাওয়ার বাবা

মা ছিলেন জাপানি উদ্বাস্তু। সাত ভাইবোনের চতুর্থ আসাওয়ার বড় হয়ে ওঠা

নরওয়াকের এক ছোট্ট খামারবাড়ির এক চিলতে ঘরে।১৯৪৫ সালে দ্বিতীয়

বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় ১,২০,০০০ জাপানি উদ্বাস্তুকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ১০টি

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। এই ক্যাম্পে থাকার সময় আসাওয়া কয়েকজন জাপানি

শিল্পীর সান্নিধ্যে আসেন যাঁরা ক্যাম্পে আসার আগে কাজ করতেন ওয়াল্ট ডিসনি

স্টুডিওতে। তাঁদের কাছে অঙ্কনবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে স্কলারশিপ অর্জন করে

আসাওয়া উচ্চতর শিল্প শিক্ষার জন্য যোগ দেন উইস্কন্সিন কলেজ অফ




মিলওয়াউকিতে। কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর ঐ কলেজেই শিক্ষকতার যোগ্যতা

অর্জন করেন আসাওয়া। কিন্তু সরকারি নির্দেশে জাপানি উদ্বাস্তুর সন্তান হওয়ার

জন্য সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয় আসাওয়াকে। হতোদ্যম না হয়ে ১৯৪৫ সালে

বড় বোনকে সঙ্গে নিয়ে মেক্সিকো পাড়ি দেন আসাওয়া। সেখানে গিয়ে এক

মেক্সিকান শিল্পীর কাছে তার বোনার কাজ শিখে শিল্পের ঐ বিশেষ বিভাগে পারদর্শী

হয়ে ওঠেন আসাওয়া এবং পরবর্তীকালে তার বোনার এই বিশেষ শিল্পে বিশ্ববিখ্যাত

হয়ে ওঠেন আসাওয়া। ১৯৪৬ সালে আসাওয়া নর্থ ক্যারোলিনার ব্ল্যাক মাউন্টেন

আর্ট কলেজে চিত্রশিল্পী জোসেফ আলবার এবং বিখ্যাত আমেরিকান স্থপতি

বাকমিনস্টার ফুলারের অধীনে শিল্পশিক্ষা শুরু করেন। যে পদ্ধতিতে তার বুনে ঝুড়ি

তৈরি করা হয় সেই পদ্ধতিতে তার বুনে নানান অসাধারণ শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে ধীরে

ধীরে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যান আসাওয়া। ১৯৫৫ সালে তাঁর শিল্পকর্মের প্রথম

প্রদর্শনী হয় নিউ ইয়র্কে। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি আসাওয়াকে।

‘সকলের জন্য শিল্প’ এই মন্ত্র বুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সান ফ্রান্সিস্কো স্কুল

অফ আর্টস। ২০১১ সালে আসাওয়ার ৭৫তম জন্মবার্ষিকীতে এই আর্ট কলেজের

নাম পরিবর্তন করে ‘রুথ আসাওয়া সান ফ্রান্সিস্কো স্কুল অফ আর্টস’ রাখা হয়।




আসাওয়ার শিল্পকর্ম আমেরিকা এবং বিলবাও-এর গুগেনহাইম মিউজিয়ম ছাড়াও

নিউ ইয়র্কের হুইটনি মিউজিয়ম অফ আমেরিকান আর্টস এবং সান ফ্রান্সিস্কোর

ডি ইয়ং মিউজিয়মে সসম্মানে রক্ষিত আছে। ইউ এস পোস্টাল বিভাগ আসাওয়ার

সম্মানে তাঁর ছবি সম্বলিত কুড়িটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে।

সেইসময় আমেরিকায় অসবর্ণ বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও আসাওয়া ব্ল্যাক

মাউন্টেন কলেজের সতীর্থ স্থপতিশিল্পী অ্যালবার্ট লেনিয়রের সঙ্গে ১৯৪৯ সালে

বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ছয় সন্তানের মাতা আসাওয়া ২০১৩ সালে শেষ নিঃশ্বাস

ত্যাগ করেন।




আসাওয়া নিজের অতীত সম্বন্ধে বলেছেন,’ আমি যে অপরিসীম দুঃখ কষ্টের মধ্যে

দিয়ে বড় হয়েছি তার জন্য আমার কোনও ক্ষোভ নেই। আমি তার জন্য কাউকে দায়ী

করতেও চাইনা। আমি বিশ্বাস করি প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই মানুষ বিকশিত

হয়। আমার ছোটবেলা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে না কাটলে হয়ত আমি আমি এই

উচ্চতায় পৌঁছতে পারতাম না। আমার নিজের জন্য আমি গর্ব অনুভব করি।‘

আজও হাজার হাজার শিল্পপ্রেমী আসাওয়ার সান ফ্রান্সিস্কোর বাসগৃহ দর্শন

করতে আসেন। ‘আমার বাসগৃহই আমার স্টুডিও’ –বলেছিলেন আসাওয়া।

রুথ আসাওয়া ছাড়াও এই প্রজন্মের আর এক বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী মার্ক লেকে ও

তাঁর অপূর্ব সৃষ্টি ‘ অ্যান্ড দি সিটি স্টুড ইন ইটস ব্রাইটনেস’ সম্বন্ধে কিছু কথা

বলে এই পর্ব শেষ করব।

লিভারপুলের কাছে উইরাল নামে এক ছোট্ট দ্বীপে মার্ক লেকের জন্ম ১৯৬৪ সালে।

মার্ক দি গার্ডিয়ান পত্রিকার এক ইন্টারভিউতে নিজের শ্রমজীবি বাবা-মা সম্বন্ধে

বলার সময় বলেন তিনি ছোটবেলায় বখাটে হয়ে গিয়েছিলেন। বাবা-মা লিভারপুলে

লিটলউড নামে একটি দোকানে কাজ করতেন। স্কুলের লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি

মার্কের। মাত্র পনের বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দেন মার্ক। ১৯ বছর বয়সে প্রাচীন

সভ্যতার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে নিজেই পড়াশুনা শুরু করে দেন মার্ক এবং নিজেকে

স্বশিক্ষিত বলতেই ভালোবাসেন মার্ক। ১৯৯৫ সালে আমেরিকা পাড়ি দেন মার্ক

কিন্তু ১৯৯৭ সালে আবার লন্ডনে ফিরে আসেন। লন্ডনে ওয়েব ডিজাইন এজেন্সি

অনলাইন ম্যাজিক কোম্পানিতে কাজ করতে শুরু করেন মার্ক। ওখানে থাকাকালীন

১৯৯৯ সালে তিনি তৈরি করেন তাঁর বিখ্যাত মিউজিক ভিডিও ‘ফিরৌসি মেড মি

হার্ডকোর’ । ফিটসরোভিয়ার, উইন্ডমিল স্ট্রিটের একচিলতে ফ্ল্যাটে তখন

থাকতেন মার্ক। সেইসময়ই এড লাইকের সঙ্গে শুরু করেন তাঁর মিউজিক ব্যান্ড

ডেনঅ্যাটেল। এই ব্যান্ডের প্রথম মিউজিকাল শো হয় ব্রিক্সটনের ৪১৪ ক্লাবে।

পরবর্তীকালে বিখ্যাত শিল্পী এনরিকো ডেভিড এবং বনি ক্যাম্পলিন যোগ দেন এই

ব্যান্ডে। ২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত তিনি স্ট্যাডেলশুল, ফ্রাঙ্কফুর্ট-এ

সিনেমা বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। বর্তমানে মার্ক নর্থ লন্ডনে স্ত্রী লিজি কারে-

টমাস এবং কন্যার সঙ্গে বাস করেন। মার্কের স্ত্রী লিজা সার্পেনটাইন গ্যালারিতে

সমকালীন শিল্পের কিউরেটর হিসাবে কাজ করেন। মার্ক নিজেকে পপ আর্টিস্ট

হিসাবেই পরিচয় দিতে ভালোবাসেন।

‘ অ্যান্ড দি সিটি স্টুড ইন ইটস ব্রাইটনেস’ ভাস্কর্য, সঙ্গীত এবং আলোর এক

অদ্ভুত সংমিশ্রণ। গুগেনহাইমের প্রদর্শশালায় অন্ধকার ঘরে এই শিল্পকর্ম দেখা,

শোনা এবং অনুভব করা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। একটি কাল্পনিক মধ্যযুগীয়




দুর্গশহরের ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে সঙ্গীত এবং আলোর মায়াময় ছন্দোময়তা

এই শিল্পকর্মের মূল উপজীব্য। বাস্তব এবং কল্পনার সীমানাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে

এক অদ্ভুত অনুভূতি আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিল দীর্ঘক্ষণ। ঘোর কাটতে

শিল্পপ্রেমী আরও অনেক মানুষের এক নির্বাক মিছিলের সঙ্গে সঙ্গে আস্তে

আস্তে বেরিয়ে এলাম গুগেনহাইম মিউজিয়মের বাইরে।