2

বিশেষ নিবন্ধঃ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

Posted in


বিশেষ নিবন্ধ

বাঁশী
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী



কেউ এটা সঠিকভাবে জানেই না। জানেই না যে, বাঁশী যারা বাজায়, তাদের কোনও কাজ নেই এ-সংসারে। আর কাজ যদি বা থাকেও, সে কাজটা তার কাজ নয়। তার বাঁশী বাজানোরই কথা ছিল, নেহাৎ কোনও প্রয়োজনে তাকে কাজটা করতে হচ্ছে। আমার মনে আছে, আমি যখন ওপাড়ায় থাকতাম – আমাদের ভাড়াবাড়ির সঙ্গেও বাড়িওয়ালার বিরাট মাঠ ছিল একটা, আর পিছনদিকটায় ছিল এক পরিত্যক্ত ভিটে, যেখানে অনর্থক একটা জঙ্গল ছিল, সেখানে ঘু-ঘু চরে বেড়াত। সেই বাড়ির সামনে দিয়ে যে রাস্তা গেছে, সেই রাস্তায় অলস দুপুরে মাঝে মাঝে এক বাঁশীওয়ালার দেখা পেতাম। সে আপন মনে বাঁশী বাজিয়ে যেত, কারও কাছে সে বাঁশী থামিয়ে পয়সাও চাইত না, কেউ তাকে পয়সা দেবার আগ্রহও দেখাত না। বস্তুত, বাঁশীওয়ালাকে পয়সা দিয়ে যেন অপমানও করা যায় না। ‘বাঁশী বাজায়’ মানেই সে এক উদাসী, সে মানুষকে ঔদাসীন্যের সঙ্গীত শোনায়। এই ঔদাসীন্যের মধ্যে আবার চরম এক ‘রোম্যান্টিসিজম্’ আছে, আছে চরম এক উপভোগ্যতা, যেখানে নিজেকেই বুঝি নিজে সবচেয়ে উপভোগ করে মানুষ।

গাঁয়ের বাড়িতে কমলিনী-দিদিকে দেখেছিলাম। তাঁর পিতা সম্পন্ন গৃহস্থ ছিলেন, কিন্তু পুত্রী কমলিনীর বিয়ে দিতে পারেননি। আমি সজ্ঞানে যখন তাঁকে দেখেছি, তখন তাঁর সাতচল্লিশ-আটচল্লিশ বছর বয়স। দেখতে তখনও বেশ সুন্দরী– সেটা অবশ্য এখন বুঝি। কেননা আমি যখন তাঁকে দেখেছি, তখন স্ত্রীলোকের যৌবন কিম্বা সৌন্দর্য বিচারের জ্ঞান হয়নি আমার। কিন্তু এখন বুঝি, সেই প্রথম-প্রৌঢ়তাতেও কী অসামান্যা সুন্দরী ছিলেন তিনি। অথচ যৌবন-বয়সেই তাঁর যে কী হল, কেউ আমরা বুঝলাম না। তিনি নাকি স্বপ্নে এমন দেখেছেন – শ্যামসুন্দর কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছে। তাঁর আর বিয়ে করার উপায় নেই। এরই মধ্যে কমলিনী-দিদির ঠাকুমার গুরু এসেছিলেন বাড়িতে। তিনি ভারী রসিক ভক্ত বৈষ্ণব মানুষ – মনোহর দাস বাবাজি, বৃন্দাবনে তাঁর বাস। তিনি যেখানেই যান, সেখানেই তাঁর সঙ্গে থাকে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ স্বরূপ গোবর্ধন শিলা। বাবাজি তাঁর মালার থলিতে গোবর্ধন শিলা নিয়ে গলায় ঝোলান, আর শিষ্যবাড়িতে এসে ঠাকুরের চৌদলে সেই মূর্তি বসিয়ে ঝোলা থেকে সোনার চূড়া-বাঁশী বার করে শ্রীমূর্তির পাশে বাঁকা করে রাখেন, শিলার মাথায় পরিয়ে দেন নকল চুল, তার উপর শিখিপুচ্ছ গোঁজা।

বাবাজি-মশায়ের সেবার মাধুর্য দেখে কমলিনী-দিদি তাঁর কাছেই দীক্ষা চাইলেন। বাবাজি চমকে উঠলেন একেবারে। তারপর কমলিনীর পিতা সবিস্তারে জানালেন সব। এমনও বললেন – বাবা! মেয়ে আমার বিয়ে করবে না। বলে নাকি তার বিয়ে হয়ে গেছে শ্যামসুন্দরের সঙ্গে। তাকে অনেক বুঝিয়েছি আমি, সে শুনবে না। তা বাবা, টাকা-পয়সার অভাব আমার নেই। একটা মেয়ের ভাত, সবার পাত কুড়িয়েও হয়ে যাবে। কিন্তু আমি ওর জীবন চালাবার পাথেয় নিয়ে চিন্তা করছি, বাবা! ও জীবন কাটাবে কী করে? কাজেই ওকে দীক্ষা দিন বাবা, ও কৃষ্ণের সেবা করুক, অন্ন ভোগ দিক, ঠাকুরের শিঙার করুক, সন্ধ্যাবেলায় পদাবলী কীর্তন শুনবো আমরা।

মনোহর দাস বাবাজি দু’দিন ধ্যানমগ্ন বসে থেকে পরের দিন বৈষ্ণবমতে দীক্ষা দিলেন কমলিনী-দিদিকে। দীক্ষার শেষে তাঁর গিরিরাজ গোবর্ধনকে সামনে বসিয়ে বাবাজিমশাই গিরিধারীর সোনার বাঁশীখানি কমলিনীর মাথায় ঠেকিয়ে বললেন – এই বাঁশী আমার শ্যামল সুন্দরের প্রতিমূর্তি। তুমি তোমার প্রাণের স্বামী ভেবে এই বাঁশীর উপর কৃষ্ণের পূজা-অর্চনা-শিঙার করবে। এই বাঁশীই তোমার বংশীধারী শ্যামসুন্দর কৃষ্ণ।

আমি কমলিনী-দিদির ঠাকুরের সিংহাসন দেখেছি ছোটবেলায়। তাঁর ঠাকুরের ঘরে দু’টি সিংহাসন। একটিতে অদ্ভুত একটি পাথরের উপর ‘মাউন্ট’ করা সেই গুরুদেবের দেওয়া কৃষ্ণ-প্রতিরূপিনী বাঁশীটি। অপর একটি সিংহাসনে রাধা-কৃষ্ণের পৃথক দু’টি যুগলমূর্তি। শুনেছি, বৃন্দাবনের গোবর্ধন-পাহাড় থেকে কমলিনী-দিদি একটি বড়ো ধরনের গিরিধারী শিলা আনিয়েছিলেন। কৃষ্ণের ভাব আনার জন্য তাতে খচিত হয়েছিল মিনে করা আঠায় লাগানো চোখ-মুখ-নাক, আর বাঁশীটি সযত্নে সন্নিবেশ করা হত সেই গিরিধারী গোপালের মুখের কাছে। তার সঙ্গে সারা সিংহাসন জুড়ে বন্য ফুলের সাজ। সেই বাঁশীখানিকে তখন সজীব মনে হত। যেন এখনই তান উঠবে বংশীধারীর ‘কুঞ্চিতাধরপুটে’। কমলিনী বিকেল হলেই বলতেন – আমার ঠাকুরের শিঙার করার সময়। এখন তাঁকে শৃঙ্গার-বেশে সাজাতে হবে; আর সেই সময়টাতেই বিগ্রহের অবস্থানে একটা পরিবর্তন ঘটাতেন কমলিনী-দিদি। পাশের সিংহাসন থেকে কৃষ্ণের অবয়বী মূর্তিখানি নিয়ে আসা হত গোবর্ধন-শিলার সামনে এবং সেই মূর্তির হাতের ফুটোর মধ্যে দিয়ে বাঁশীখানি গলিয়ে দিতেন কমলিনী-দিদি। ‘ত্রিভঙ্গ-ভঙ্গিম-ঠামে’ দাঁড়ানো এই কৃষ্ণমূর্তিটিকে একটু ব্যাঁকা-ত্যারচা করে অবস্থিত করার পর দিদি বলতেন – এই বাঁশী ছাড়া সারাটা দিন কেমন আভরণহীন মলিন লাগে মানুষটাকে, দেখেছো তো! আবার দ্যাখো, সেই শৃঙ্গারোজ্জ্বল বেশ, ‘অখিলরসামৃত মূর্তি’ – বাঁশী ছাড়া আমার কৃষ্ণকে মানায়ই না। বাঁশীটাই ওর সব, এই বাঁশীই তিনি।

জিজ্ঞাসা করেছিলাম – তাহলে সারা দিনই বাঁশীটা দিয়ে রাখো না কেন ওই হাতের কুণ্ডলীতে? কমলিনী বলেছিলেন, সকাল সাড়ে দশটা-এগারোটায় একবার দিই বটে। তখন ওর গোষ্ঠে যাবার সময়, গোরু চরাতে গেলে ওর বাঁশী লাগে। বলে কিনা – দাদা বলরামের শিঙা শুনলে গোরুগুলি বড্ড লাফালাফি করে, তাঁকে বলাও যায় না কিছু। কিন্তু বাঁশীর তানে ওরা একটু ঠাণ্ডা থাকে, বিকেল হলে গোরুগুলোকে এক জায়গায় আনতেও কাজে লাগে। আমি বলেছিলাম – কিন্তু তুমি তো আর সারাদিন বাঁশীটা দাও না তাঁর হাতে। কমলিনী বলেছিলেন, না দিই না। আমরা রাধারানীর সখীকুলের দাসী। মেয়ে বলে মেয়েদের কষ্টটুকু বুঝি শুধু। জননী যশোমতীর কত কষ্ট বলো! ছেলে গোরু চরাতে যাবে রাখালের বেশে, তার সঙ্গে গোপজনের আরও কত রাখাল, তবু তাঁর চিন্তা এই বুঝি কোনও গোরু তার পিছনের পায়ের লাথি মারল তাঁর ছেলের পায়ে, এই বুঝিকংসের লোক এসে ধরল তাঁর ছেলেকে, রাস্তা-ঘাট মোটেই ভালো নয়, হয়তো তুলেই নিয়ে গেল তাঁর ছেলেকে!

কমলিনী-দিদি বলতে বলতে একটু থামলেন এবার। আমি বললাম – তুমি সকালবেলায় তোমার ঠাকুরের হাতে একবার বাঁশী তুলে দাও, সেই সূত্রেই তুমি গোরু থেকে আরম্ভ করে কংসের কথা শোনাতে আরম্ভ করলে। কমলিনী বললেন – শোনাতে তো হবেই, ভাই! আমি ভাবছিলাম, ব্যক্তিগত ভালোবাসা কি ভীষণ স্বার্থপর হয়! এমনকি আমিও তাই। এই দ্যাখো না, জননী যশোমতী রীতিমতো নির্দেশ দিয়ে বলেছেন – অতগুলি গোরু নিয়ে যাবার সময় তোমার দাদা বলাই বলরাম সামনে-সামনে যাবে, ‘আর শিশু বাম ভাগে’, আর তুমি যাবে তাদের মাঝখান দিয়ে। অর্থাৎ গোরুর লাথির ছাট অন্য বাচ্চাদের গায়ে লাগে লাগুক, আমার ছেলেটির গায়ে যেন না লাগে – কমলিনী-দিদি মিহিসুরে গাইলেন – কংসের লোক অন্য ছেলে নেয় নিক, কিন্তু আমারটি যেন না নেয় –

বলাই ধাইবে আগে          আর শিশু বাম ভাগে
শ্রীদাম সুদম সব পাছে।
তুমি তার মাঝে যাইও        সঙ্গ ছাড়া না হইও
মাঠে বড় রিপুভয় আছে।।

কিন্তু এই যে বিরাট গোষ্ঠে যাবার প্রক্রিয়া, এখানে কত নির্দেশ, আদেশ, পরামর্শ – এখানে সবচেয়ে বড়ো কাজটা কিন্তু বাঁশীর – কমলিনী আসল রহস্য জানালেন এবার। এই বাঁশী মানে মায়ের হৃদয় নিশ্চিন্দি হল, তখন তো দূরভাষ ছিল না যেখবর নেবেন মা। তাই পদাবলী আরম্ভেই মার নির্দেশ হল – তুমি গোরুগুলির সামনে-সামনে যাবে না এবং খুব দূরেও যাবে না গোরু চরাতে, এমন দূরত্বে থাকবে যেখান থেকে তোমার বাঁশীর শব্দ শুনতে পাই আমি –

নিকটে রাখিও ধেনু               পুরিও মোহন বেণু
ঘরে বসি আমি যেন শুনি
কমলিনী-দিদি আবারও গেয়ে ফেললেন যাদবেন্দ্র দাসের পদকলি। সেই গ্রাম্য পরিবেশে এই বাঁশীর পদটি যে কি আর্তি বয়ে এনেছিল আমার কাছে, তা আমি পর্যন্ত জননী যশোমতীর সহমর্মিতায় বুঝেছিলাম যেন। কমলিনী-দিদি বলেছিলেন – এক অতিস্নেহময়ী জননীর কাছেই যেখানে বাঁশীর এত আবেদন, সেখানে আমার রাইকিশোরীর হৃদয়ে যে বাঁশী শতেক ঢেউ তুলে তরঙ্গিনী হয়ে ওঠে, ভাই! আমি প্রতিদিন বিকেলে আমার প্রাণের ঠাকুরকে নিয়ে আসি বাঁশীর সিংহাসনে। দাঁড় করিয়ে দিই গিরিরাজ গোবর্ধনের পাশে আর হাতে তুলে দিই সেই মোহন বাঁশীটি। আমার রাধারানী থাকেন অপর সিংহাসনে, অভিসারিকার বেশে। কৃষ্ণের বাঁশী বাজবে আর আমার বিনোদিনী রাইকিশোরী গাইতে গাইতে যাবেন –
ভালে ভালে বনি আওয়ে মদন মোহনিয়া
অধর-সুধা ঝরু মুরলী-তরঙ্গিনী
বিগলিত রঙ্গিনী-হৃদয়-দুকূল।

সে বাঁশী শুনলে আর ঘরে মন বসে না, ভাই! আমরা সকলে অভিসারিনী হয়ে পড়ি, রাধার সখীদের সঙ্গে খুঁজতে থাকি তাঁকে।




বাঁশী মানে এই অন্বেষণ। বাঁশী মানে সেই সুদূরের সুর, যা অনুক্ষণ পাগল করে আমাদের। অথবা বাঁশী মানে সেই অলৌকিক সুদূর, যার অপেক্ষায় এক অলৌকিক বিরহ-বিলাসের সুখের মতো এক ব্যথা অনুভব করি অহরহ। অথবা বাঁশী মানে সেই মধুর অতিক্রম, যেখানে সমস্ত নিয়ম ভেঙে পড়ে কেজো লোকের মর্মে শেল বিঁধিয়ে দিয়ে। কমলিনী-দিদি বলেছিলেন – সেদিন শারদী পূর্ণিমার রাত্রি ছিল। আকাশ-ভরা চাঁদচুয়ানো জ্যোৎস্নার মধ্যে দাঁড়িয়েছিলেন কৃষ্ণ। সেই কোন হেমন্তকালে তিনি কথা দিয়েছিলেন গোপিনী-সখীদের – তোমাদের সঙ্গে মিলন হবে আমার। তোমরা অপেক্ষা কোরো প্রতিদিন। সেই সব নিশিদিন চলতে চলতে আজ শারদী রাত্রি এসেছে। গগনের চাঁদ সারা দিনের প্রতীক্ষায় থাকা পূর্বদিকবধূর গাল ছুঁয়ে দিল তার কিরণকরের স্পর্শে। দিকবধূর গালের লজ্জার লালিমাতে মেটে-লাল হয়ে উঠল পূর্বাকাশ – তদড়ুরাজঃ ককুভ-করৈর্মুখং / প্রাচী আবিলিম্পন্ অরুণেন শন্তমৈঃ। এমন মধুরতা দেখে কৃষ্ণ আর সইতে পারলেন না। তিনি বাঁশী বাজিয়ে দিলেন অশেষ ব্রজযুবতীদের উদ্দেশ্যে – জগৌ কলং বামদৃশাং মনোহরম্।

আর যেই না সেই বাঁশীর সুর হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে এল বৃন্দাবনের কুলযুবতীদের কানে – তখন রাত্রি আঁধার হচ্ছে কেবল, তখন এই বাঁশী শোনার প্রথম প্রতিক্রিয়া হল – যে যে অবস্তায় ছিল, সেই অবস্থায় সমস্ত কাজ রেখে দৌড়তে আরম্ভ করল সেই বাঁশীর সুর লক্ষ্য করে – যে বাঁশী বাজল বনমাঝে কি মনোমাঝে। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া, একজন খেয়াল করল না যে অন্যজন কী করছে। এ যেন একান্ত ব্যক্তিগত এক সুরের আহ্বান, যাতে মনে হয় এ সংকেত শুধু আমরই জন্য, অথচ আমারই মতো অন্য আর একজনও সেই সুর-সংকেত শুনতে পায়, কেননা সে আমারই মতো আর একজন, কিন্তু কৃষ্ণের বাঁশী শুনলে সেই অন্য আর একজনকে খেয়াল থাকে না – সমস্ত আমিগুলো একসঙ্গে দৌড়োয়, সেই গতিতে দুলতে থাকে শুধু কানের দুল – অসঙ্গ সাক্ষীর মতো, বাঁশী শোনার পর অখিল যুবতীকুলের গতির শীঘ্রতার পরিমাপ করে যেন – আজগ্মুরন্যোন্যলক্ষিতোদ্যমাঃ / স যত্র কান্তো জবলোলকুণ্ডলাঃ।

কমলিনী-দিদিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম – এমন হয় কেন? এ কেমন পাগলপারা স্বভাব তৈরি হয় বাঁশীর সুরে যেখানে এতগুলো যুবতী মেয়ে, তারা যে যে-কাজ করছিল, সব ফেলে দৌড়োল – কেউ এক চোখে কাজল পরে, কেউ পায়ের নূপুর গললায় পরে, কারও ‘খসন বসন রসন চেলী / গলিত বেণী লোলনী। এ কেমন করে হয়? কমলিনী-দিদি গল্প শুনিয়ে বলেছিলেন – এটা আমার গুরুর মুখে শোনা কথা। সেই আমার হাতে গিরিধারীর বাঁশী দিয়ে তিনি বলেছিলেন – বাঁশী হল সেই সুরের বঁড়শি, একবার সুরের সুতোয় তোর গলায় এসে বিঁধল, তো তুই যতই জলের মধ্যে ঘোরাফেরা কর, তোকে যেতে হবে তাঁর কাছেই। আমি এই আমার বাপের সংসারে আছি, তবু ধন্যি বাপ আমার! তিনি আমাকে হাতা-খুন্তি আর সন্তান জন্ম দেওয়ার দায় থেকে মুক্তি দিয়েছেন, আমাকে শুনতে দিয়েছেন বাঁশীর সুর। আমার বাবাজিমশায় বাঁশীর জন্মকাহিনী শুনিয়েছিলেন একদিন – বলেছিলেন – যেদিন এই দেহ হবে বাঁশীর মতো, সেদিন সেই সুরের গুরু সুর সাধবেন এই বাঁশীতে।

কথাটা ভাল করে বুঝলাম না বলে কমলিনী বললেন – কৃষ্ণ ব্রজভূমির নায়ক, শতপুষ্পের কুঞ্জবনে তাঁর চলাফেরা, বৃন্দাতুলসী তাঁর সখী, গলায় বনফুলের মালা, এমন মানুষের কাছে প্রকৃতি হল সব চাইতে ভালোবাসার জিনিস। কৃষ্ণ প্রতিদিন বনভূমিতে আসেন, প্রতিটি গাছের কাছে যান, তাদের সুখদুঃখের কথা শোনেন, তাদের পরিচর্যা করেন। আর গাছেরাও তাঁকে ভীষণ ভালোবাসে। গভীর পারস্পরিকতায় প্রতিদিন তাঁদের কুশল বিনিময় হয়। কিন্তু এই গভীর আন্তরিকতার মধ্যেই একদিন সেই বিপর্যয় ঘটে গেল। কৃষ্ণ সেদিন বনভূমিতে প্রবেশ করে কাউকে ভালোবাসা জানালেন না, কোনও পত্রপুষ্পে অঙ্কন করলেন না তাঁর করাঙ্গুলির স্পর্শ। তিনি এসে উপস্থিত হলেন বংশমণ্ডপে বাঁশবনর ছায়ায় এবং তাকিয়ে রইলেন একটি বাঁশগাছের দিকে। বাঁশ গাছ বলল – হ্যাঁগো, এমন করে তাকিয়ে আছ কেন আমার পানে? কৃষ্ণ বললেন দুঃখ-স্বরে – একট জিনিস চাই তোমার কাছে, কিন্তু বড়ো কষ্টের সেই চাওয়া। বাঁশ বলল – বলো কী চাই তোমা, তোমাকে অদেয় নেই কিছু। কৃষ্ণ বললেন – আমি তোমার প্রাণ চাই। তোমাকে কাটতে হবে আমায়। বাঁশ খানিকক্ষণ ভাবল। তারপর বলল – তোমার কাছে সব সমর্পণ করে বসে আছি আমরা। এ দেহ কাটবে কী রাখবে, সব তোমার ই্চ্ছে।

কৃষ্ণ সেই বাঁশ গাছ কেটে খণ্ড খণ্ড করলেন। তারপর উপযুক্ত বংশখণ্ডটি নিয়ে তাতে ফুটো করতে আরম্ভ করলেন। কৃষ্ণ এক-একটিফুটো করেন আর বাঁশী যন্ত্রণায় কাঁদতে থাকে। অবশেষে তৈরি হল বাঁশী, কৃষ্ণ ফুঁ দিলেন বাঁশীতে – তাতে থেমে গেল ব্রজভূমিতে গোরুর বিচরণ, ময়ূরের নৃত্য, পক্ষীকুলের কলকাকলি। ব্রজগোপীরা বললেন – মুখরিত এই বংশীধ্বনি শুনে মৃগ-পক্ষীদের মধ্যেই এমন আকুল অবস্থা, সেখানে আমরা ঘরে থাকি কী করে – কা স্ত্রাঈ তে কল-পদায়াত-বেণুগীতম্। আর সেই বাঁশ, যে নিজের জীবন দিয়ে বাঁশীর জীবন পেয়েছিল, সে অঝোরে কাঁদছিল এই ভেবে যে, কতট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সে কৃষ্ণের কাছে, কৃষ্ণ বাঁশী ছাড়া এক মুহূর্তও থাকেন না। কৃষ্ণ বংশদণ্ডের জীবন নিয়ে বংশখণ্ডকে আপন জীবনে সর্বক্ষণের জন্য স্থান দিয়েছেন। এর জন্য একদিন কৃষ্ণের প্রিয়তমা সখীরাও ঈর্ষালু হয়ে উঠলেন বাঁশীর উপর, সর্বক্ষণ কৃষ্ণের হাতে থাকা বাঁশীর উপর – মুখরিত মোহন-বংশ।

একদিন গোপিনীরা জিজ্ঞাসা করলেন বাঁশীকে – কী রহস্যটা বলো তো। আমরাও তো সারা জীবনের তপস্যায় তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গিনী হতে পারলাম না, অথচ তোমার এত সৌভাগ্য হয় কি করে? বাঁশী বলল – আমাকে তাঁর পছন্দ হওয়ার কারণ শোন – আমার ভিতরটা পুরো ফাঁপা, আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছে নেই, চাওয়া-পাওয়া নেই, আমি একেবারে জীবন-মুক্ত। তিনি যেমন চালান তেমনি চলি, যেমন বলান তেমনি বলি, আমি সব সমর্পণ করেছি তাঁর কাছে – ‘আমার লাজ ভয়, আমার মান-অপমান সুখ-দুঃখ-ভাবনা’। ভিতরটা এমন নির্গুণ হলে তবেই তিনি সর্বাংশে গ্রহণ করেন। গোপীকুল বুঝি শিক্ষা নিলেন বাঁশীর কাছে – লজ্জা-ভয়, আর্যজনের সমস্ত বিহিত পথ ত্যাগ করে তাঁরা যে এখন কৃষ্ণের কাছে উপস্থিত হন – সেটা শুধুই বাঁশীর শব্দ শুনে।

কমলিনী-দিদির বংশীকাহিনটা ভালই লাগল, অন্তত সেটা আমাকে ভাবিয়ে তুলল আরও। বাঁশীর প্রতীকটুকু কমলিনী-দিদি কৃষ্ণের একা্ত্মতায় ধরেছেন বলেই তাঁর সিংহাসনে সোনার বাঁশীখানি কৃষ্ণ হয়েই বসে আছে। আমি ভাবি, প্রতীক তো শুধু এখানেই নয়, আমার মহাকবিও তো বাঁশীকে ব্যবহার করেছেন কালের রাখালের হাত দিয়ে। আমি যেদিন এই গানখানা শুনেছিলাম – সেই যে মধ্যদিনে যখন পাখিরা গান বন্ধ করে দেয়, তখন কলের রাখাল যে বেণু বাজায়, সে গান শোনে রুদ্র – প্রান্ত-প্রান্তরের কোণে বসে – এ গান শুনে এক অলৌকিক ভয় যেন আকৃষ্ট করে মন; তবু এই ভয়ের মধ্যেও – হে রাখাল! বেণু তব বাজাও একাকী – সেই রাখালের কথা শুনি যেই, অমনই আমদের কৃষ্ণাবেশ ঘটে, কেননা তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে রাখাল ভাবাই যায় না কখনও। তাঁকেই শুধু ভাবা যায় যেন – কেউ যেখানে নেই, সেখানেও তাঁর বাঁশীর আবেদন ভেসে আসে তাঁর কাছে যাবার জন্য। কিন্তু এর চাইতেও বেশি অবাক হয়েছিলুম কালের রাখালকে পৃথিবীর অনন্ত উপরে সেই চিদাকাশের মাঝে ধেনু চরাতে দেখে। সেখানে সেই কোন সুদূরে জগৎসৃষ্টির আদিকেন্দ্রে সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-তারা আর অফুরান নক্ষত্রের ধেনু চরে বেড়াচ্ছে সেই বাঁশীর সুরে – তিনি বাঁশী বাজাচ্ছেন –আর দিগন্তেউচ্চকিত গ্রহ-তারা-নক্ষত্রের দল মহাজাগতিক শৃঙ্খলায় চরে বেড়াচ্ছে – উপনিষদের ঋষি মঙ্গল উচ্চারণ করছেন –

এতস্য বা অক্ষরস্য প্রশাসনে গার্গি সূর্যাচন্দ্রমগৌ বিধৃতৌ তিষ্ঠতঃ।

আমার কবি লিখলেন –

এই তো তোমার আলোক ধেনু সূর্য তারা দলে দলে –
কোথায় বসে বাজাও বেণু, চরাও মহাগগনতলে।

আবারও মনে হল সেই কমলিনী-দিদির কথাই – ওই বাঁশী আমার ঠাকুর। সেই কোন সুদূরে বসে আমার শ্যামল-কিশোর বাঁশী বাজাচ্ছেন, আর আমরা ছুটে বেড়াচ্ছি পাগলের মতো – সুদূর বিপুল সুদূর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরী! আমি বলেছিলাম – জানো তো দিদি, তুমি তো বাঁশী নিয়ে এক ‘রোম্যান্টিক’ জগৎ তৈরি করে ফেলেছ। তাতে আমিও ভাবি – বাঁশীর একটা নিজস্ব জগৎ আছে সত্যি, সেখানে কেজো জগতের সমস্ত বাস্তব, সমস্ত শৃঙ্খলা শেন তুচ্ছ হয়ে যায়। সে বাঁশী যে শুনতে পায়, সে এক বিশৃঙ্খল মধুরতার টানে গা ভাসিয়ে দেয় এই পৃথিবীতে। তার সাথের সাথী হয় উদসী হাওয়া, নদীর জল। আর বিকীর্ণ পৃথিবীর প্রান্তর। তাকে যদি কাজের জগতে ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে শঙ্খের নিনাদ না হলে চলে না। আমার কবি লিখে গেছেন –

সংসারে সবাই যবে সারাক্ষণ শত কর্মে রত
তুই শুধু ছিন্নবাধা পলাতক বালকের মত
মধ্যাহ্ণে মাঠের মাঝেএকাকী বিষণ্ণ তরুচ্ছায়ে
দূরবনগন্ধবহ মন্দগতি ক্লান্ত তপ্ত বায়ে
সারাদিন বাজাইলি বাঁশী। ওরে তুই ওঠ্ আজি।
আগুন লেগেছে কোথা। কার শঙ্খ উঠিয়াছে বাজি
জাগাতে জগৎ-জনে।

কবিতা শুনে কমলিনীর মুখ ভার হল একটু। তারপর খানিক ভেবে বলল – তোমার যিনি কবি তিনি তো আমারও কবি। তবে কিনা আমার কবির স্বভাবের মধ্যে বাঁশীটাই সব, অন্যের জন্য তাঁকে শঙ্খ বাজাতে হয়, অন্যের জন্য তিনি বজ্রের মধ্যে বাঁশী রাখেন, পৃথিবীর হাজার অন্যতর কাজের প্রয়োজন আছে বলেই বাঁশীতে অন্য তান তুলতে হয়। কিন্তু সে আমার কবির স্বাভাবিক জগৎ নয়। তিনি নিজে সেই ছন্নছাড়া পাগলের দলে আছেন বলেই বাঁশী ছেড়ে শঙ্খ বাজাতে গেলে তাঁকে হাহাকার করতে হয়। তা নইলে ওই একই কবিতার মধ্যে তিনি লিখতেন না –

-- যেদিন জগতে চলে আসি,
কোন্ মা আমারে দিলি শুধু এই খেলাবার বাঁশি।
বাজাতে বাজাতে তাই মুগ্ধ হয়ে আপনার সুরে
দীর্ঘ দিন দীর্ঘ রাত্রি চলে গেনু একান্ত সুদূরে
ছাড়ায়ে সংসারসীমা।

কবি ইচ্ছে কিন্তু এই বাঁশীতেই তিনি সেই সুরধ্বনি জাগিয়ে তুলতে চান যাতে গীতশূন্য অবসাদ-পুর জাগ্রত হয়ে ওঠে। কিন্তু এই সুর বাঁশীতে তৈরি হলেও বাঁশীর মধ্যে যেহেতু উদাসীন এক ছন্নছাড়া পাগলপারা ব্যাপার আছে, তাই বাঁশী দিয়ে শঙ্খনাদ হয় না, কবিও তা পারেন না। আমা কবির হাহাকার আছে এখানে। বলেছেন তো –

যে বাঁশীতে শিখেছি যে সুর
তাহারই উল্লাসে যদি গীতশূন্য অবসাদপুর
ধ্বনিয়া তুলিতে পারি মৃত্যুঞ্জয়ী আশার সঙ্গীতে
কর্মহীন জীবনের এক প্রান্ত পারি তরঙ্গিতে
শুধু মুহূর্তের তরে – দুঃখ যদি পায় তার ভাষা...

দেখেছো তো ভাই, ‘যদি’ – কমলিনী-দিদি বললেন – ‘যদি’। আমি জানি বাঁশী দিয়ে বিপ্লব-বিদ্রোহ হয় না। বাঁশীর মধ্যে মোহিনী আছে গো, মোহিনী আছে! সে আকর্ষণ করে, পাগল করে, ঘরছাড়া করে – আমার ঠাকুরের মতো। কমলিনী-দিদি চৈতন্য-চরিতামৃতের কবির সুরে গান ধরলেন –

নীবি খসায় পতি আগে,      গৃহধর্ম্ম করায় ত্যাগে
বলে ধরি’ আনে কৃষ্ণস্থানে।
লোকধর্ম্ম, লজ্জা, ভয়,        সব জ্ঞান লুপ্ত হয়,
ঐছে নাচায় সব নারীগণে।।
কানের ভিতর বাসা করে,     আপনে তাঁহা সদা স্ফুরে
অন্য শব্দ না দেয় প্রবেশিতে।
আন কথা না শুনে কান,           আন বলিতে বোলয় আন,
এই কৃষ্ণের বংশীর চরিতে।।

আমার সামনে কমলিনী-দিদির এই গান গাইতে একটুও লজ্জা হল না। বুঝলাম, বাঁশীতে মজে আছেন কমলিনী। তবে এর চেয়েও বেশি আছে কিছু। এ তো যুবতীজনের কাছে কৃষ্ণের বাঁশীর আবেদন। এমনকি এই সূত্রে নদীয়া-বিনোদিয়া ঠাকুর চৈতন্যের কথাও বুঝি। কেননা তাঁরই গানের কলি গাইলেন তো কমলিনী-দিদি। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা হল ওই মহাপণ্ডিত বুড়োদের নিয়ে। তাঁরা কেউ অদ্বৈতবাদী দার্শনিক, কেউ ধুরন্ধর নৈয়ায়িক, কেউ বা বাঁশীর জন্য নিরাকার নির্গুন ব্রহ্মবাদিতা মাথায় রেখেও কৃষ্ণের বাঁশী না শুনে পারেন না। আমি কমলিনী-দিদিকে সেই অসামান্য শ্লোকরাশি শোনালাম, শুধু বললাম – বাঁশীর সুর নয় শুধু, আমার কৃষ্ণের বাঁশীর সুর – সেখানে তোমার মতো বাঁশী-সোহাগিনীর সঙ্গে নৈয়ায়িক মথুরানাথ তর্কবাগীশ, প্রতাপরুদ্রীয় বাসুদেব সার্বভৌম অথবা মধুসূদন সরস্বতীর কোনও তফাৎ নেই। মোহিনী বাঁশী সকলের মন একত্তর করে দিয়েছে; তুমি তাঁদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠা বংশীসাধিকা কমলিনী-দিদি।



2 comments:

  1. অপূর্ব! বাঁশির মত একটা বিষয় নিয়ে এত সুন্দর একটা মাধুর্যমণ্ডিত শৈল্পিক লেখা আমাদের উপহার দিয়েছেন নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ি!

    ReplyDelete
  2. এটা নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ি বলেই সম্ভব হয়েছিল...

    ReplyDelete