প্রচ্ছদ নিবন্ধ - সব্যসাচী মজুমদার
Posted in প্রচ্ছদ নিবন্ধএই জগতে, জগত বলতে যতদূর মানুষ আন্দাজ করতে পেরেছে যতটা পদার্থ আছে, তার থেকেও বেশি অপদার্থ রয়ে গেছে। এন্টিম্যাটারের কথা বলতে চাইছি। এই যা কিছু আমরা চোখে দেখি, তার অনেক অংশ শূন্য। নিরাকার, নির্বাঁধ, অসীম। তাকে আমরা শূন্য বলি। কিন্তু,শূন্য মানে কি ? এর উত্তর দেওয়ার অধিকারী কি আমি ? তবুও মনে প্রশ্ন জাগে। সেই প্রশ্নের কারণে ভাবতে ইচ্ছে করে। এরকম একটা ভাবনা থেকে মনে হচ্ছিল শূন্য তো আসলে নিরাকার, নির্জন,রিক্ত নয়। সে রীতিমতো একটা অস্তিত্ব। একটা অবস্থা। অংকের ক্ষেত্রে শূন্য তৈরি হয় অসংখ্য, অনিঃশেষ নেগেটিভ সংখ্যার সংকলনে। কেবল অশেষ সেই সংখ্যার কল্পনা। আমাদের সমকালীন গবেষণাগুলিও জানিয়ে দিয়েছে, যাকে এই মহাবিশ্বে আমরা শূন্য বলে মনে করি; গ্রহ থেকে আরেকটি গ্রহের মাঝখানের দূরত্ব কেই ধরা যাক না, যেখানে মাঝেমাঝে উল্কা, বিচ্ছিন্ন গ্রহাণু চলাচল করে, যেখানে বাতাস নেই কেবল আলো আছে — শূন্য বলে মনে করি। কিন্তু, তবুও সেখানে আলো আছে। মানে অসংখ্য কণা রয়েছে, যাদেরকে আমরা চোখে দেখতে পাই। কিন্তু, যেখানে আলোও নেই ! বিজ্ঞানী বলছেন সেখানে রয়েছে এন্টিম্যাটার। এবং এই জগতে ( যতটা অনুমান করা গেছে ) যতটা পদার্থ আছে, তার চেয়েও বেশি এন্টিম্যাটার আছে। এবং তারাই বজায় রেখেছে ক্রমবর্ধমান মহাবিশ্বের ভারসাম্য।
আমাদের অনুভব প্রধানত এই দৃশ্যমান বস্তু সমূহকে নির্ভর করেই আবর্তিত হয়। কবিই কেবল বলতে পারেন, ' শূন্যের ভেতর এত ঢেউ '। শূন্যের স্তর, শূন্যের বহুমাত্রিকতা, অনুপস্থিতির তীব্র অভিঘাত একমাত্র কবিই ( কবিতা যিনি লেখেন তিনিই কবি — এরকম ধারণায় আটকে থাকতে চাইছি না ) অনুভব করতে পারেন সম্ভবত। আর এই সূত্রে যদি আন্দ্রেই আর্সেনেভিচ তারকোভস্কি'র ছবির প্রসঙ্গ ওঠে, তবে, কথা আমাদের স্বীকার করে নেওয়ার পর্ব চুকে গিয়েছে যে তারকোভস্কি কবি। সিনেমার কবি। ক্যামেরায় কবিতা লিখেছেন। অনুভব করতে চেয়েছেন আমাদের চারপাশের দৃশ্য জগৎ - অদৃশ্য জগতের। অদৃশ্যের অন্তরালে থাকা আরেক সমান্তরাল দৃশ্যগুচ্ছকে। আমাদের দেখিয়েছেন তারকোভস্কি, আমাদের অনুভব করিয়েছেন তারকোভস্কি। মানুষের মুক্তি চেয়েছেন, ব্যক্তি মানুষকে নির্ণয় করতে চেয়ে পার্টির- রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হয়েছেন, কিন্তু তার পরেও তারকোভস্কি তাঁর বেদনার দিকে, বিস্ময়ের দিকে, শূন্যতার দিকে যাত্রা অব্যহত রেখেছেন। ঠিক এ কারণেই আমার, একান্তই নিজের অনুভবে তারকোভস্কি'কে একজন বিশুদ্ধ কবি মনে হয়।
কেন বিশুদ্ধ কবি ?
সঙ্গত কারণেই এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। সেক্ষেত্রে একটি উত্তর নির্মাণের চেষ্টা করা যাক।
আমরা সকলেই জানি তারকোভস্কির সৃষ্টি সম্ভার ও স্বীকৃতি সম্পর্কে। ফলে সেসব তথ্য তুলে ধরে এই আলোচনাকে ভারাক্রান্ত করতে চাইছি না। বরং একবার জানা সত্ত্বেও মনে করে নিই কাকে বলে বিশুদ্ধ কবিতা। আলোচনায় সুবিধা হবে,
"message-free verse that is concerned with exploring the essential musical nature of the language rather than with conveying a narrative or having didactic purpose. The term has been associated particularly with the poems of Edgar Allan Poe. Pure poetry was also written by George Moore (who published An Anthology of Pure Poetry in 1924), "
এই কারণকে মনে রাখলে আমরা বিশুদ্ধ কবিতার কয়েকটি স্বভাবলক্ষণ পেতে পারি,
১.এ কবিতা কোনও বার্তা, উপদেশ,নির্দেশ,নির্ণয় কিছুই দিতে চায় না।
২.লিরিক্যালিটি থাকবে এবং অবশ্যই দৃশ্যের বর্ণনার সঙ্গে ওতোপ্রোতো জড়িয়ে থাকবে।
৩. ঘটনা বলতে,এমন ঘটমানতা যা তীব্রভাবে সম্ভাব্যকে আক্রমণ করে না।যা সম্ভাব্যের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চায়।
৪. সাংগীতিক ধর্ম বজায় থাকতেও পারে।যদিও এই সাংগীতিক ধর্ম বিষয়ের সাপেক্ষে নির্মীত হয়।
তারকোভস্কি কোন উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ছবি তৈরি করেছিলেন? কোন প্রোপাগান্ডা ছিল তাঁর ! আমরা জানি, মানুষের শিল্পী সত্তার সঙ্গে সবসময় পার্টি কালচারের বিরোধ ঘটেছে। ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে ঘটেছে, কমিউনিস্টদের সঙ্গে ঘটেছে, লিবারালদের সঙ্গেও ঘটেছে। আমরা এও জানি, পার্টি কালচার বা প্রোপাগান্ডা একজন শিল্পীর বহুস্তরিক বিন্যাসকে বাধা দেয়। একজন মানুষ হিসেবে, মানুষের শিল্প হিসেবে বিকাশের ঘাটতি সঙ্গত কারণেই প্রোপাগান্ডার আইসোটোপ তৈরি করে। এ কথা আমরা জানি বলেই আমাদের মনে পড়ছে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সলঝেনেৎসিনিন পর্যায় এপিসোড। আমাদের একই সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ছে এই কথা যে, তারকোভস্কি 'ইডিয়ট' -এর চিত্রনাট্য করার পর সেটি নাকোচ করেছিল সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র। যৌথ খামারের রাষ্ট্র রাশিয়া। এই প্রসঙ্গে একটা অদ্ভুত ধাঁধা তৈরি হয়। যদিও এই লেখার সঙ্গে ধাঁধাঁটির একটি সুদূরপ্রসারী সম্পর্ক রয়েছে।
কি সেই ধাঁধা ?
সাঁর্ত্র মনে করতেন ইতিহাসের চলন অনুভবের ক্ষেত্রে বার্গম্যান বা আন্তোনিওর থেকেও উৎকৃষ্ট তারকোভস্কি। সাঁর্ত্র স্টালিনের শাসন পদ্ধতির সমর্থক ছিলেন। সাঁর্ত্র অস্তিত্ববাদী। এই অস্তিত্ববাদের অন্যতম প্রবক্তা ডস্টয়ভস্কি। এবার তারকোভস্কি যখন ইডিয়ট অবলম্বনে সিনেমা করার কথা ভাবছেন, নাকোচ করছে রাষ্ট্র। যদিও সাঁর্ত্র তাঁর অবস্থান বদল করেছেন অনেকক্ষেত্রেই। তবে এ ক্ষেত্রে এই জটিল বিন্যাসটি আমাদের এই তথ্য দিচ্ছে, কোনও নির্দিষ্ট মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে বা নির্দিষ্টিকৃত করে বিষয়কে ব্যখ্যা করতে গেলে জটিলতা সৃষ্টি হবেই। যেমন এক্ষেত্রে হয়েছিল সাঁর্ত্রর। যদিও আমরা পরবর্তী সময়ে এই জটিলতাটি অনেকটাই স্পষ্ট রূপ ধারণ করতে পেরেছিল।
যা হোক, মূল আলোচনায় ঢুকলে আমাদের যে সামনে যে নির্ণয়টি ফুটে উঠছে, তা হল, বিশুদ্ধ কবি হিসেবে তারকোভস্কিকে অনুমান। আমরা বিশুদ্ধ কবিতার যে লক্ষণ গুলিকে একবার দেখে নিয়েছি সেই অবস্থান থেকে যদি তারকোভস্কির সিনেমার দিকে তাকাই, তবে, ইভানস চাইল্ডহুড ( ১৯৬২ ) থেকে দ্য স্যাক্রিফাইস ( ১৯৮৬) পর্যন্ত প্রলম্বিত তারকোভস্কির সিনেমায় খুঁজে পাই এমন কিছু চিহ্ন ও চিন্তা ও চিন্তার বিনির্মাণ, আমাদের প্ররোচিত করে বাস্তবতার সমান্তরাল আরেকটি জায়মান মনোজগতের নির্মাণে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে শ্রীসঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের একটি চমৎকার মন্তব্য,
"যদিও বোদল্যেরের সেই সমুদ্রবিহঙ্গ আলবাট্রসের মতোই তারকোভস্কি নিজেকে 'সমাজতান্ত্রিক' ব্যবস্থায় নির্যাতিত, রুদ্ধগতি ও অসহায় ভাবেন, কিন্তু একই সঙ্গে কখনওই মনে করেন না যে, শিল্পীর সঙ্গে সমাজের বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত। এক নিবিড় ইতিবচন থেকে তিনি মনে করেন, সিনেমায় যত প্রকট বাস্তবের অন্তর্গত থেকেই অনাহত বাস্তব তাঁকে রচনা করতে হবে।" ( সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, তারকোভস্কির ডায়েরি : অনশ্বর রোজ নামচা )
সময় পর্বে তারকোভস্কি সক্রিয় ছিলেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির মনোভাবের ক্ষেত্রে ভীষণ জরুরি ছিল সময়টি। কেন ? যে সময় তাঁর কাজের সূচনা, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব তার সোনালী অতীত অতিক্রম করেছে। কিছু মিথ, কিছু রূপকথা, অনেকটা রিয়েলিটির দ্বন্দ্ব তখন অবশিষ্ট। ক্রমশ লিবারেলদের সামনে প্রচ্ছন্ন হতে শুরু করেছে। আর যখন শেষ করছেন তারকোভস্কি, তার তিন বছর পর ঘটবে চেচেস্কুর বক্তৃতা পর্ব। আসতে চলেছে বিখ্যাত নব্বই দশক। অর্থাৎ প্রার্থিত যৌথ খামারের অবলুপ্তি আপাতত ঘটতে চলেছে তারকোভস্কি জেনে গেছিলেন কেবল তো নয়, তাঁর জীবনের বিশ্বাস, চিন্তা এবং অবস্থানেরও একটি বিবর্তন ঘটে গেছে। তা কেবল স্বপ্ন বয়নের বিবর্তন নয়, স্বপ্ন ভঙ্গেরও।
আমরা তো এটুকু সকলেই বুঝতে পারি তারকোভস্কি যেমন সামাজিক মানুষের জন্য আশা খুঁজতে চেয়েছিলেন, তেমনই চেয়েছিলেন ব্যক্তি মানুষের মুক্তি। এই মুক্তি কামনাকে যদি অস্তিত্ববাদ বলে মনে করি কিংবা তরজমায় নির্ভর না করে যদি সরাসরি এক্সিসটেনসিয়ালিজম বলে ভাবতে চাই, তবে কমিউনিস্ট পার্টি সরাসরি তত্ত্বটিকে নাকোচ করেছিল। এমনকি বুর্জোয়াদের শেষ চেষ্টা গোছের তকমা লাগিয়ে দিয়েওছিল। ( একটি সূত্র আবার মনে পড়ছে এই প্রসঙ্গে, অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি সাঁর্ত্রকে নাকোচ করছে। অথচ সাঁর্ত্র ছিলেন অন্যতম মার্ক্স ব্যখ্যাকার )। প্রসঙ্গে ফিরলে দেখা যাচ্ছে, তারকোভস্কির এই ব্যক্তি মানুষের আত্ম উন্মোচনের কাঙ্খার সঙ্গে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত, পলিটব্যুরো নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থার সংঘাত তৈরি হবে এতো বলাই বাহুল্য। ওয়াল্টার হুইটম্যান কথিত 'I contain multitude ' যেন অনেকাংশে, অনেক স্তরন্যাসে ধরা পড়ে তারকোভস্কির ছবিতে। ছবির বয়ানে।
রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও ব্যক্তি মানুষের আত্ম সন্ধানের, আত্ম নিমগ্নতার অধিকার আছে, এই ধারণা তো আমলা তান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে বিরক্তির, অস্বস্তির, বিবমিষার কারণ হয়ে উঠবে— স্বাভাবিক। তারকোভস্কি আপোস করেননি। নিজের কথা বলেছেন। তাঁর প্রত্যেকটি লং শট যেন সে কথা বলতে চায়। এবং এই প্রসঙ্গে আমরা আবার এই আলোচনায় ফিরে আসতে পারি কেন তারকোভস্কি বিশুদ্ধ কবি?
প্রথমত তারকোভস্কির সিনেমা মানুষের পরিশুদ্ধি, মানুষের প্রসন্ন বোধ, মানুষের কবিত্বের প্রমা বহন করেছে মাত্র। এর চেয়ে বেশি কোনও নির্দিষ্ট দার্শনিক বোধ কিংবা রাজনৈতিক চিন্তাকে অনুসরণ করেনি।
দ্বিতীয়ত তারকোভস্কির লং শট। একটা দৃশ্যকে অনেক্ষণ ধরে একটি অবস্থান থেকে বহু মাত্রায় ও বিনির্মাণে দেখে নেওয়ার আয়োজন যেন। প্রতিটি লং শট একটি কাব্যের একটি অংশকে পুনঃ পুনঃ পাঠের ও পুনরাবিস্কারের প্রক্রিয়া যেন। নাটকীয় মুহূর্ত গুলিও অবলীলায় অনুচ্চকিত হয়ে ওঠে গ্রন্থনা ও উপস্থাপনায়। তৈরি করে একটা অনিবার্য মূর্ছনার। আমাদের এখনই মনে পড়ছে স্টকারে যেখানে 'জোন'-এর কাছে এসে রেল কোম্পানি থেকে চোরাই গাড়িটিকে ছেড়ে দিয়ে একলা হয়ে যাচ্ছে তিনজন। কুয়াশা ঘন জলাভূমির ভেতরে তিনটি ল্যাম্পপোস্ট। একটি গীতিকাব্য তৈরি করে মাত্র।
তৃতীয়ত তারকোভস্কির ছবিতে কেবল মানুষ নয়, অন্যান্য প্রাণী গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ঘোড়া, যেমন কুকুর। মাত্র কয়েকটা দৃশ্যেই মাত্র শহরকে দেখেছেন তারকোভস্কি। এবং যতবার দেখেছেন ততবার তাকে প্রেক্ষাপটের তুলনায় বিসদৃশ, কৃত্রিম করে দেখানই যেন উদ্দেশ্য। মূলত মানুষের গড়ে তোলা শহর ব্যতিরেকে পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণ করাও ছিল তারকোভস্কির অন্যতম উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যে তিনি সফল। এবং সফল বলেই তিনি অনেকটাই মেটাফিজিক্যাল বলেও মনে হয়।
এক্ষেত্রে আরেকটি কৌতুহলেও আক্রান্ত হতে হয় যে, কেন তথাকথিত পশুরা তাঁর শিল্পের অন্যতম চিহ্ন হয়ে উঠছে ? এ কারণেই বলে মনে হয়, তারকোভস্কি তাঁর পরিবেশের, অস্তিত্বের প্রতিটি অবস্থান, কৌণিক বিন্দু থেকে দেখতে চান তাঁর সঙ্গে অস্তিত্বের, জায়মানতার কি সম্পর্ক ? জানতে চেয়েছেন বলেই হয়তো দৃশ্যের প্রতিটি বিন্দু, প্রতিটি সরণ, প্রতিটি চলনকে অনুভব করতে, অনুবাদ করতে চেয়েছিলেন ক্যামেরায়। হয়তো চেয়েছিলেন স্বাধীন দৃশ্যের উদারতা।
এখন, সেই স্বাধীনতার ওপর, ব্যক্তি মুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ নামিয়ে এনেছিল রাষ্ট্র। অস্তিত্ববাদের বিকাশ মেনে নেয়নি — এই তথ্য আমরা ইতিপূর্বে এই আলোচনায় এনেছি। এখন এই প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসতে চাই। কেননা, এই কথাটি নির্ণয় করা খুবই জরুরি যে, তবে কি তারকোভস্কির প্রসঙ্গের অন্তরালে এই কথাটি বলতে চাইছি যে, অস্তিত্ববাদের সপক্ষে ?
বলাটা অপরাধ নয় যদিও। তবুও, একথা তো ঠিক, যে, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের ধারণাটি এখন অনেকটাই প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। বরং তার বদলে এই তথ্য মানুষ জেনে নিয়েছে যে, তার সাফল্যের পেছনে, তার অস্তিত্বের বিকাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে গোষ্ঠী চেতনা। অর্থাৎ একসঙ্গে ভাবার এবং ভাবানর ক্ষমতা। এবং আজকের মানুষের পক্ষে একা বেঁচে থাকাটা কার্যত অসম্ভব। এ কারণেই গোষ্ঠী নির্ভর জীবন ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের ধারণাকে হয়তো খুব গুরুত্ব দিতে চায়নি। আমি নির্ণায়ক কেউ নই। অধিকারীও নই। তবে এক্ষেত্রে এই বিষয়টিই আমার কাছে বড় হয়ে উঠছে যে, কোনও মতকে, মতের বিকাশকে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য হানিকর হয়ে উঠছে, রাষ্ট তাকে বাধা দিলে সেটি বোধহয় রাষ্ট্রের পক্ষে ভাল বিজ্ঞাপন হয় না বা আদর্শ রাষ্ট্রের উদাহরণও হয় না।
কিন্তু, এই যে ব্যক্তি মুক্তির চিন্তাকে ধারণ করেছিলেন তারকোভস্কি, সেই কাঙ্খিত মুক্তি কি পেলেন তিনি? এই প্রশ্নের সমাধানের জন্য আমাদের দারস্থ হতে হয় তিনটি ছবির — ভয়েজ ইন টাইম ( ১৯৮২), স্টকার ( ১৯৮৩), দ্য স্যাক্রিফাইস ( ১৯৮৬)। মনে রাখতে হবে, এই সময়ের ইতালিতে কমিউনিস্ট পার্টির শাসন চলছে।
বিশেষ করে ক্যান্সার আক্রান্ত তারকোভস্কি যেভাবে স্যাক্রিফাইস শেষ করেছেন, পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে মানুষকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত যেভাবে নিজেকে এবং পরিবারকে ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করেন, তাতে এ ছবি কাব্য হয়ে ওঠে শেষ পর্যন্ত এবং তারকোভস্কি'কে পৌঁছে দেয় অনেকটাই মেটাফিজিক্যালিটির কাছাকাছি। তারকোভস্কির সিনেমা হয়ে ওঠে সামাজিক মানুষের পুনর্বিন্যাস। 'ইডিয়ট'কে কেন্দ্র করে যে অভিমান গড়ে উঠেছিল, তা অবস্থানেই যেন স্যাক্রিফাইস বুঝিয়ে দেয় রাষ্ট্রিয় দখলদারিত্বের সমান্তরালে একটি প্রত্যাহারের প্রবণতাও থেকে যায়। তাকে স্বীকার করতে হয়। তার ধারণাকে আত্তিকরণ। নইলে একটি রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত জড় মানচিত্রে পরিণত হয়। তাকে তখন নস্যাৎ করা সহজ। তারকোভস্কি রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতায় বিশ্বাস করেছিলেন।
মানুষের সিনেমার এক শীর্ষ বিন্দু তারকোভস্কি, মানবিক মহাকাব্যের একটি অধ্যায় তারকোভস্কি।










