Next
Previous
0

প্রবন্ধ - সেবিকা ধর

Posted in










চৈত্রমাসে চৈত্রের বিদায়বেলার ব্যঞ্জনা প্রকৃতিই আমাদের দিয়ে দেয়।তার অবিনাশী প্রভাব, চৈত্রের গাজন, শিবগোত্র পাওয়া ভক্ত্যারা, চৈত্রের পরব,চৈত্রের সবকিছু মিটে যায়, ধীরে ধীরে পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষের কিঞ্চিৎ ছোঁয়ায়।পয়লা বৈশাখের দিন প্রত্যেক বাড়িতে বা ব্যবসা ক্ষেত্রে দেখা যায় নতুন নতুন পোড়ামাটির ঘট, আমপাতা, আমপাতায় তেল সিঁদুরের ছোঁয়া, দেওয়াল জুড়ে 'শ্রী শ্রী কালিমাতার কৃপায় এই ব্যবসা করিতেছি',খাতা নিয়ে ত্রিপুরেশ্বরী কালি মন্দিরে বা নিজেদের গৃহদেবতা বা ঠাকুরের কাছে নিজের তথা সার্বিক কল্যাণ কামনা- মিনতি করা- সবই কিন্তু হিন্দু বাঙালি জীবনের পয়লা বৈশাখ নিয়ে আসে।
পয়লা বৈশাখ এমন একটা দিন, যেদিন বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার ব্যাপার জেগে থাকে। হিন্দু বাঙালি এবং মুসলমান বাঙালি ,তারা তাঁদের পারস্পরিক বিনিময় ও যোগাযোগ করেন, যা তাঁদের কাছে প্রেম ও প্রীতির বন্ধন।

পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন কাপড়, নতুন বসন,অনেকে যাদের পয়সা আছে তারা নতুন গহনা,নতুন বাসনপত্র, মানুষকে নতুন কাপড় দেওয়া, দেবতার মাথায় জলসত্র দেওয়া, জলের ব্যবস্থা, শিবলিঙ্গের মাথায় জল দেওয়া বা গৃহদেবতার মস্তকে জলের ঝাড়ি দেওয়া,ব্রাহ্মণকে বৈশাখের প্রত্যেকদিন একটি করে মাটির কলসি ও তার সঙ্গে দক্ষিণা দান করা এবং যাদের সামর্থ্য আছে তারা ধাতব কলসি,সেই সঙ্গে দক্ষিণা, চাল এই সবই দান করেন যা পয়লা বৈশাখের অনুষঙ্গ।

আমরা লক্ষ্য করি, পুরাতন ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে যায়,চৈত্রের ধূলি-ধূসরিত দেওয়াল তাকে ঝাড়পোঁছ করে একটা নতুন চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় হিন্দু বাঙালি পরিবারে। অনেকে ঘরদোর রঙ করান,অনেকে আসবাবপত্র ঝাড়পোঁছ করেন,ঘর মোছেন,পরিষ্কার করেন, দেবতাদের পুজো করেন,ব্যবসায়ীরাও তা করেন।
গোটা পয়লা বৈশাখ হচ্ছে আমাদের অন্তরের প্রক্ষালন ব্যবস্থাকে সজাগ করা।

ইদানীং পয়লা বৈশাখ নিয়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হয়েছে,পয়লা বৈশাখ অর্থাৎ এই যে বাংলা সালের সূত্রপাত, এইটা কে শুরু করেছেন? দ্বিতীয় লক্ষ্মণ সেন? শশাঙ্ক ? নাকি মহামতি আকবর। এই নিয়ে প্রচুর বিতর্ক চলছে।তবে একটা কথা ঠিক, মহামতি আকবর যদি বাংলা বর্ষ শুরুর হিসেব করে থাকেন, তাহলে কোথাও না কোথাও এর একটা দলিল থাকবেই।সম্রাট আকবর এবং তাঁর নবরত্ন সভার রত্নরা ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী এবং পারঙ্গম। কিন্তু কোথাও এর উল্লেখ নেই আকবর এই বাংলা নববর্ষ শুরু করেছেন।এমনকি 'আইন-ই - আকবরি'-তেও উল্লেখ নেই। ফলে আমরা অনেকটা ধাঁধার মধ্যেই আছি। এই যে পয়লা বৈশাখ তা কোথা থেকে শুরু হয়েছে। অনেকে বিক্রম সংবতের কথা বলছেন, অনেকে বৈদিক নববর্ষের কথা বলছেন। অনেকে রাজনৈতিক ভাবে বলছেন বৈদিক নববর্ষের কথা।হিন্দু বাঙালির চৈত্র মাসই বছরের শেষ মাস।সেখানে কিন্তু বৈদিক নববর্ষের কথার উল্লেখ নেই।আমরা এইসব বিতর্কে যাচ্ছি না।

আমরা ভাবছি পয়লা বৈশাখের নতুন ভোর আসে জীবনের নতুন নতুন রূপকল্পনা নিয়ে। পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন জামাকাপড়,গুরুজনদের প্রণাম, মিষ্টিমুখ, মাছ-মাংস, মিষ্টি, দই,লুচি,পায়েস,ফলমূল এককথায় সুখাদ্য যা যা আছে সবই।সকালে উঠেই স্নান সেরে গৃহদেবতার পুজো দেওয়া,অঞ্জলি দেওয়া,মিষ্টি, ফল,দই দেবতাকে নিবেদন করা কিংবা মন্দিরে গিয়ে পুজো দেওয়া- এইসবই কিন্তু পয়লা বৈশাখের জীবনাচরণের মধ্যে রয়ে গেছে।হিন্দু বাঙালি জীবনে ত্রিপুরাতে যেমন আছে তেমনি রয়েছে পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশেও।বিভিন্ন মন্দিরে পুজোর ভীড় লেগে থাকে।তারা উপবাস করে পয়লা বৈশাখের শুভ দিনটি পালন করেন।আবার বাংলাদেশে চৈত্র মাসের শেষ দিনে নববর্ষের উদ্ভোধন হয়। সেই নিয়ে বিরাট শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।এখন মঙ্গল শোভাযাত্রা বলে একটি বর্ণিল শুভাযাত্রা হয়।সেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে শোভাযাত্রায় যোগদানের জন্যে আহবান করা হয়। কিন্তু মুশকিল হল মৌলবাদী শক্তি, যারা এই মঙ্গল শব্দটির মধ্যে হিঁদুয়ানির সুর দেখে, তারা এই মঙ্গল শোভাযাত্রার বিপক্ষে।কিন্তু মানুষের এই মিলন মেলায় সমস্ত অপশক্তি পরাজিত হয়। ফলে শুভ কাজ এগিয়ে যেতে থাকে।ইদানীং বাংলাদেশের দেখাদেখি কলকাতার যাদবপুর অঞ্চলে পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ট্যাবলো অর্থাৎ বাঙালি সংস্কৃতির যে প্রতীক তাকে সবার সম্মুখে তুলে ধরা হয় বিভিন্ন সাজ-সজ্জার মাধ্যমে। যা কলকাতা শহরের মানুষকে উদ্বেলিত করে।ত্রিপুরার বিভিন্ন জেলায়ও এই মিলন মেলা পরিলক্ষিত হয়।

মানুষের মনের ভেতর যে সাম্প্রদায়িক হানাহানির বীজ, ঘৃণার বীজ লুকিয়ে থাকে, তাকে এই ধরনের শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে,মেলামেশার মধ্য দিয়ে খানিকটা হলেও একটা সামগ্রিক সমন্বয়বাদী চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।

পয়লা বৈশাখ হিন্দু বাঙালির জীবনে এবং ইসলাম ধর্মাবলম্বী বাঙালির জীবনে- উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আগেও এই কথা বলেছি এখনও বলছি,একটা অসাম্প্রদায়িক চেহারার যে নিরিখ, যেখানে কোনো দেবমূর্তি নেই,যদিও হিন্দু বাঙালি গণেশ, লক্ষ্মী পুজো করেন।কিন্তু সার্বিকভাবে যে মনের কথা, আনন্দের কথা,এই যে নতুন বছর এল পুরনো জীর্ণ বছর চলে গেল, তার পরিপ্রেক্ষিতে একটা সম্পূর্ণ বিষয় আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। এই সামগ্রিকতা বাঙালি জাতিসত্তার বৈশিষ্ট্য। এই সামগ্রিকতা বাঙালি যে মানস, তার বৈশিষ্ট্য। পয়লা বৈশাখে বহু জায়গায় গান বাজনার আসর,খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হয়।

কলকাতায় নববর্ষকে কেন্দ্র করে কলেজ স্ট্রীটের বই পাড়ায় বই উৎসব শুরু হয়।প্রকাশকরা লেখকদের আমন্ত্রণ করেন।লেখকরা সেখানে যান।সারাদিন ধরে প্রবল দাবদাহের মধ্যে এই বৈশাখী উত্তাপ নিয়েও লেখকরা হাজির হন।কারণ সার্বিকভাবে হৃদয়ে হৃদয় মেলানর যে আবেদন সে আবেদন কিন্তু ক্রমশ ক্রমশ আরও নিবিড় হয়ে উঠে।

পয়লা বৈশাখ হিন্দু বাঙালির মেনুতে ইস্পেশাল ডে।এখানে মাংস অবধারিত।মূলত খাসির মাংস রান্না হয়।আত্মীয়-পরিজন, প্রিয় মানুষ, বন্ধুবান্ধবদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানর রীতি আছে।ভালো চালের ভাত,খাসির তেলের বড়া, অনেক রকমের তরকারি, কয়েক রকমের মাছ,মাংস, মিষ্টি, দই সহযোগে আহার সারা হয়।অনেকেই বিজয়া দশমী ও পয়লা বৈশাখে পুঁটি মাছ খাওয়ার রেওয়াজ বহু পরিবারে।
আবার এটাও বলা হয় পয়লা বৈশাখ আমরা যা করব অর্থাৎ যে ধরনের আচরণ করব, আমরা মানুষের সঙ্গে সারা বছর ধরে এই আচরণটুকু করে যাব।ফলে সেদিন ছোটোরা খানিকটা দুষ্টুমি করলেও বড়রা সেদিন তাদের চোখ রাঙান না।মারধর তো করেনই না।কারণ বলা হয় নববর্ষের দিন, 'পুজো কাঁঠাল'-এর দিন মারধর করতে নেই।এই যে খাওয়া-দাওয়া, নব বস্ত্র পরিধান করা, ভালো আতর মাখা, আগেকার দিনে নববর্ষের দিন সিনেমা দেখার প্রচলনও ছিল।যদিও এখন সেই রেওয়াজ অনেকটা কমে গেছে। যাই হোক, সবাই মিলে সমবেত হওয়া এবং আজকে শুভ পয়লা বৈশাখ, আজকে শুভ নববর্ষ, শুভ বাংলা নববর্ষ এবং মোবাইলের ভাষায় হ্যাপি পয়লা বৈশাখ, হ্যাপি বাংলা নিউইয়ার এই সবই চলতে থাকে। আগেকার দিনে চিঠি লেখার রেওয়াজ ছিল, বাড়ির যাঁরা গুরুজনেরা ছিলেন তাঁরা চিঠি লিখতেন,চিঠি পেতেন।দোকান থেকে লাল রঙের গণেশ মার্কা চিঠি আসত। এবং ধার বাকি যা থাকত দোকানে, সোনার দোকানে হোক আর মুদির দোকানেই হোক, আর কাপড়ের দোকানেই হোক,অন্যান্য যেখানেই ধার বাকি থাকত তা মিটিয়ে দেওয়া হত এবং নতুন করে খাতা চালু হত। যারা ধার বাকিতে জিনিস নিতেন না।তারা সামান্য দুটাকা পাঁচ টাকা দিয়ে আসতেন সেই মুদির দোকানে, বা কাপড়ের দোকানে বা সোনার দোকানে বা দর্জির দোকানে যেখানে তাদের নিমন্ত্রণ থাকত সেখানে।সেখানে মিষ্টি ও শরবত খাওয়ান হত।কোথাও লস্যি,কোথাও কোল্ড ড্রিংকস এর ব্যবস্থা থাকত। কোথাও কোথাও ডাবের ব্যবস্থা থাকত। সব মিলিয়ে একটা আনন্দের দিন।
দেবদারু পাতা,শোলার ফুল,আম্রপল্লব,সিঁদুরের ফোঁটা, দ্বারঘট, কলা গাছ সব মিলিয়ে বাঙালির একটা আনন্দ সেতু হল এই পয়লা বৈশাখ।