Next
Previous
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in





















২০


-“আপনি নিজেকে সামলে নিন!” বলে ওঠে জেরাল্ড। চার্লস চুপ করে যায়। স্থাণু হয়ে থাকে জানালার সামনে অদ্ভুত বিষণ্ণ ভঙ্গিমায়। একটুও নড়ে না।

-“এখানে এসে বসুন!” জেরাল্ড বলে যায়… “এবং আমার কথা ভালভাবে শুনুন।” একটা চেয়ার যেটা ল্যাম্পশেড থেকে একটু দূরে, সেখানে চার্লসকে বসতে ইঙ্গিত করে সে। চার্লস জানালার পাল্লার হাতলটা ছেড়ে ধীরে ধীরে এসে চেয়ারে বসে। মুখ তুলে তাকায় না সে। তার দুই হাত এখনো মুষ্টিবদ্ধ।

জেরাল্ড খুব খুঁটিয়ে লক্ষ্য করে চার্লসকে, তারপর শীতল এবং নিঃস্পৃহ স্বরে বলে যায়…

-“আমি ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলতে চাই যে কেন সেদিন রবার্টকে আমি বলেছিলাম আপনাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেবার জন্য। আপনি ছাত্র হিসেবে সাধারণ মানের এবং আপনার স্নায়ূ সব সময় চঞ্চল হয়ে থাকে। এদিকে আপনার অভ্যেস আছে সব সময় কোনও না কোনও অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়ার। আমি সচেতনভাবেই ‘অভ্যেস’ শব্দটা ব্যবহার করছি, কারণ বার বার এই ধরনের কাজ করাটা আপনার কাছে স্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনার জন্য সবচেয়ে ভাল হবে শান্তিতে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা, শান্ত হয়ে পড়াশুনা করা এবং শান্তিতে জীবন কাটানো। আপনি সহজে উত্তেজিত হয়ে যান, অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন এবং মনে করেন যে আপনার এই অভিজ্ঞতা একটা দারুণ ব্যাপার আপনার জীবনে। যেমন রবার্টের ওখানে যেতে যেতে, আপনি হঠাৎ মিকার প্রেমে পড়লেন। দয়া করে বসুন, দয়া করে… আমার পুরো কথা শুনে যাবেন। আপনি মিকার প্রেমে পড়লেন। মেয়েটি বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ, সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে জানে, কিন্তু আচার আচরণ অত্যন্ত শিশুসুলভ এবং সে নিজেই খুব বিভ্রান্তিতে ভোগে। ফলে আপনার পক্ষে তার সঙ্গে মেলামেশা করা একেবারে অর্থহীন। তাছাড়া এই ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার মত পরিপক্কতা আপনার একেবারেই নেই এবং আপনি অকারণে কষ্ট পাবেন। কষ্ট পেতে বাধ্য আপনি, চার্লস এবং এই পরিস্থিতি আপনি নিজে ডেকে আনছেন। আমি বহুবার রবার্টকে আপনাকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতে বারণ করেছি। সে আমার কথায় কর্ণপাত করেনি, সেই কারণে আমি আপনাকে সেদিন বলেছিলাম বাড়ি চলে যেতে।”

চার্লস অস্পষ্ট স্বরে কিছু একটা বলবার চেষ্টা করল। তবে এখন তার ভাবভঙ্গি বেশ নম্র। সে বুঝতে পেরেছে যে কোথাও একটা ভুল হয়েছে তার। জেরাল্ড তাকে অপমান করবার জন্য এসব বলেনি। এক সাধারণ মানের ছাত্র এবং অল্পবয়সী কিশোর যে সব ব্যাপারে অপ্রয়োজনে নাক গলিয়ে বেড়ায়, এরকম এক মানুষ হিসেবেই জেরাল্ড তাকে দেখে। পুরো ব্যাপারটা সত্যি এবং লজ্জাজনক হলেও সেদিন চার্লসকে অপমান করবার উদ্দেশ্য জেরাল্ডের কোনওমতেই ছিল না, এটা পরিষ্কার। বাড়ি পাঠিয়ে দেবার ব্যাপারটা একটা সাধারণ বাক্য হিসেবেই ধরা উচিত এক্ষেত্রে।

এখন জেরাল্ডের দিকে মুখ তুলে তাকানো কিম্বা তার ব্যাপারে অভিযোগ করবার মত কোনও সাহস চার্লসের আর অবশিষ্ট নেই। সে বলে যে জেরাল্ড যেহেতু চার্লসের দোষের ব্যাপারগুলো খোলাখুলি বলে দিয়েছে, সেহেতু তার আর বিশেষ কিছু বলবার সুযোগ নেই এই মুহূর্তে। তবে এখন চার্লসের বক্তব্য একটু ক্ষমাসূচক সুরে বাঁধা। জেরাল্ডও অনেকটা নরম সুরে কথা বলে এখন…

-“রবার্টের ওখানে যাবার আপনার কোনও প্রয়োজন নেই।” জেরাল্ড বলে যায়… “তাছাড়া ওখানে যাওয়া এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। আপনি এইসব মানুষদের বিশাল কিছু ভেবে বসে আছেন। আমার ব্যাপারেও আপনি ভেবেছেন আমি একজন কেউকেটা। আসলে আপনি হীনমন্যতায় ভুগে এইসব ফাঁকা আওয়াজে, মূল্যবোধের নকল মানকে আসল বলে ভেবে বসে আছেন। কারো সঙ্গে মতের অমিল হওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়। এইসব বার গার্ল যারা, তারা নিরীহ বার গার্ল মাত্র। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমার মিলমিশ হওয়া অসম্ভব। কারণ এরা চটপটে, চতুর আর বেশ বলিয়েকইয়ে ধরনের এবং তারা কখন কোথায় কার সঙ্গে ঝামেলা পাকাবে, কেউ জানে না।”

চার্লস আবার একগুঁয়ে ভঙ্গিতে বলে ওঠে… “কিন্তু আপনি আমায় অতি সাধারণ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন এবং ঠিক এই কারণেই মিকা আমায় অবজ্ঞা করে।”

“মিকার অবজ্ঞার সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক! চার্লস, আমি আপনাকে যতখানি বোকা ভেবেছিলাম, আপনি তার চেয়েও অনেক বেশি বোকা। যান, আপনার যদি অতই ইচ্ছে থাকে, তো রবার্টের কাছে যান। অন্তত নিজেকে দুঃখী, বিষণ্ণ, অবমানিত আত্মা ভাবা বন্ধ করুন। পারলে সঙ্গে বের্নহার্ডকেও নিয়ে যান। আমি আপনার কোনও ব্যাপারে থাকতে চাই না।”

বের্নহার্ড পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না জেরাল্ডকে। কেন সে আবার রবার্টের কাছেই যেতে বলল যদি সেখানে যাওয়াটা চার্লসের জন্য এতটাই ক্ষতিকর হয়? সে নিজেই বা কেন যায় সেখানে? সে কি রবার্টের ওখানে যারা আসে, তাদের পছন্দ করে? হঠাৎ বের্নহার্ডের সেই বাচ্চাদের ছবির কথা মনে পড়ল। সেই মহৎ, অথচ বিষণ্ণ মুখচোখ এবং তাদের হাতে এক অদ্ভুত পেলব আর্তি। সে মনে মনে বাচ্চাগুলোর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করল, তার মনে হল যেন তারা ভাইবোনের মত আপন।

…………………

হে পাঠক, এখন আমরা একটু ক্রিস্টিনার ব্যাপারে জেনে নেব। ভাস্কর্যশিল্পী ক্রিস্টিনা, সুদর্শনা এবং কল্পনাপ্রবণ এক নারী। তার প্রতিভা, তার চরিত্রের বহুমুখী গুণাবলী সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা শুধু কঠিন নয়, বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠতে পারে। প্যারিসে সে বহুদিন ধরে কাজ করছে। রদ্যাঁ মিউজিয়ামে তাকে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায়। কখনো সে একটা মূর্তির সামনেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে গালে হাত দিয়ে… সম্ভবত বুঝবার চেষ্টা করে যে মহান শিল্পীর শৈলীর গোপন রহস্য কী ছিল! তার কোনও শিক্ষক নেই, সে অতীতে কোনও স্টুডিওতে কাজ করেনি। “কে আমায় শেখাবে কী ভাবে দেখতে হয়”… সে বলেছিল… “কারণ ঠিকভাবে দেখতে পারাটাই আসল তফাৎ গড়ে দেয়।”

নিয়মিত কাজ করে না সে। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ হয়তো সে কোনও কাজই করল না। এদিক ওদিক উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল, দেখতে লাগল অনেক কিছু। কারণ সে সারা পৃথিবীটাকেই বিশেষ ভাবে দর্শন করতে চায়। সেই সময় সচেতনভাবে নিজের মনের ভাবনাগুলো বিশ্লেষণ করে না, অনুভবগুলো নিয়মমাফিক সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে চায় না সে। এই সময়গুলো সে একটা ঘোরের মধ্যে বাস করে। বহির্জগতে ভাবনাগুলো প্রকাশ করে না সে। অবচেতনে পাওয়া আকার, রূপ এবং রেখার মধ্যে আধোজাগা অবস্থায় বিচরণ করে ক্রিস্টিনা।

কিন্তু এই সমস্ত আকার তার মনে অদ্ভুত তীব্রতা নিয়ে স্পষ্টভাবে জেগে থাকে। তার ইন্দ্রিয়ানুভূতি একত্রিত করে সে বাস্তবে দেখা বাড়িঘরদোর, জন্তুজানোয়ার এসবের মধ্য থেকেই নতুন আকার নির্মাণের সাধনা করে। মানুষজনের মুখ বিষণ্ণ কিম্বা আনন্দিত, যেরকমই হোক না কেন, তার স্মৃতিতে ধরা থাকে একেকটা মুখোশের মত। প্রাথমিকভাবে সে ওই মুখগুলোর অভিব্যক্তি বোঝবার চেষ্টা করে না। কিন্তু দ্বিতীয়বার যখন ওই মুখগুলি হানা দেয় তার মনে, তখন যেন পাথর কুঁদে কুঁদে তৈরি করা নিষ্প্রাণ মূর্তির মত সে দেখতে পায় ওই মানুষদের। পুরো প্রক্রিয়া সে কখনোই সজ্ঞানে চালনা করে না। আপনা থেকেই, তার মনের অবচেতনে ঘটে এমন রূপান্তর। ক্রিস্টিনা একথা একেবারেই সচেতনভাবে লক্ষ্য করে না যে তার স্মৃতির প্রকোষ্ঠের ভেতরেই ঘটে গিয়েছে এই প্রক্রিয়া। নিজেরই অজান্তে মুখাবয়বগুলির ভাস্কর্যের মধ্যে সঞ্চার করে সে নতুন আত্মার স্পর্শ।

অতএব, অনেক সময় এমন হত যে ওই মুখাবয়বগুলির মধ্যে একটা বিশেষ সাদৃশ্য দেখা যেত; অবশ্য যদি কেউ খুব খুঁটিয়ে দেখে তাহলে সেটা অনুভব করবে। কিন্তু যদি সেই দর্শককে প্রশ্ন করা হয় যে সাদৃশ্য ঠিক কোন জায়গায়, তাহলে সে সেটা সঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে পারবে না। তবে এই সাদৃশ্যের ব্যাপারটা ক্রিস্টিনা গঠনমূলক সমালোচনা হিসেবেই গ্রহণ করে। কারণ সে কিছুতেই নিজের কাজে একঘেয়েমি দ্বারা আক্রান্ত হতে চায় না। ফলে সে বিশেষ নজর রাখে যাতে একটা কাজ আরেকটা দ্বারা প্রভাবিত না হয়। প্রতিটি কাজই তার কাছে প্রথম। সে অবশ্য নিজের প্রতিভার ব্যাপারে সচেতন, এবং তার অনেক কারণ আছে। তরুণ প্রজন্মের অতি প্রতিভাবান ভাস্করদের মধ্যে ক্রিস্টিনা অন্যতম।



(চলবে)