গল্প - মনোজ কর
Posted in গল্পআঠারো পর্ব
ছোটকালী বেরিয়ে যাবার এক ঘন্টার মধ্যে মনীষার ফোন এল পানু রায়ের কাছে।
-মিঃ রায়, মনীষা বলছি।
-বলো। কী হয়েছে?
-আমি আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনা। কিন্তু একটা বেশ বড় গন্ডগোল দেখে মনে হলো আপনাকে এক্ষুণি জানানো দরকার।
- কী গন্ডগোল?
- কয়েকটা বিল পেমেন্টের জন্য চেক কাটা হয়েছে কিন্তু চেকগুলো কাটা হয়েছে যে সব কোম্পানির নামে সেই কোম্পানিগুলো কেউ কোনও কাজ করেনি। আমি একটা বিলের কথা বললে হয়ত আপনার বুঝতে সুবিধে হবে। যেমন ধরুন বেশ কয়েকটা বিল এবং রসিদ দেখলাম তেওয়ারি ইলেকট্রিকের। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ হবে। খাতায় চেক নম্বর, অ্যামাউন্ট,কাজের বিবরণ ইত্যাদি সব ঠিক লেখা আছে কিন্তু কোম্পানির নাম লেখা নেই।
-একটা কাজ করো। তুমি অ্যাকমে ইলেকট্রিককে ফোন করে বলো যে বিলগুলো একটু পাল্টাতে হবে এবং অর্ডারের কপিটা নিয়ে দেখা করতে।
- করেছি। কিন্তু কেউ ফোন ধরলো না।
-ওদের বিলে ঠিকানা লেখা নেই?
-আছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জেনেছি ওখানে ঐ নামে কোনও অফিস নেই।
-বিলগুলো কি ছাপানো বিল?
-হ্যাঁ। বিলগুলো তো ঠিকই লাগছে। রাবার স্ট্যাম্প মেরে চেক-এর প্রাপ্তি স্বীকার করা আছে। তার চেয়েও বড় কথা খোঁজ নিয়ে দেখেছি এরকম কোনও কাজই হয়নি। এখন ব্যাঙ্ক বন্ধ। কাল সকালে ব্যাঙ্কে গিয়ে দেখবো আর কিছু জানা যায় কি না।
-ঠিক আছে। দেখ আর কিছু জানা যায় কি না। আরও কিছু ডিটেল না পেলে আগে কিছু করা যাবে না। তোমার কী মনে হয়? কী হতে পারে?
-আমার মনে হয় কেউ খবর পেয়েছিল যে নতুন সেক্রেটারি কাজে জয়েন করেছে। কিছু কাজ না করে একটা ভুয়ো বিল ছাপিয়ে এলিনাকে পাঠিয়ে দেখতে চেয়েছিল সে কী করে। প্রথম বিলটা ছিল ছোট অঙ্কের, কুড়িহাজার টাকার কাছাকাছি।
- বিলটা পেয়ে এলিনা কী করেছিল?
- কোনওরকম চেক না করে পেমেন্ট পাঠিয়ে দিয়েছিল।
- চেক পোস্টে পাঠিয়েছিল?
- হ্যাঁ, বিয়ারার চেক কেটে পোস্টে পাঠিয়ে দিয়েছিল।
-আচ্ছা, তারপর কী হলো?
-তারপর একমাস সব চুপচাপ। একমাস পরে আবার একটা ভুয়ো বিল এলো। এবার অঙ্কটা পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি। একই ভাবে পেমেন্ট পাঠানো হলো। পরের বিলটা এলো তিনটে কাজের জন্য। আলাদা আলাদা তিনটে বিল। সব মিলিয়ে প্রায় দু লক্ষ টাকার কাছাকাছি।
-আর কিছু?
-অ্যাকমে ইলেকট্রিকের আর কোনও বিল আসেনি। তবে আমার সন্দেহ যে যদি অন্য কেউ এলিনার এইভাবে পেমেন্ট দেওয়ার কথা জানতে পারে তাহলে ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়নি।
-চেকগুলো কে সই করেছিল?
-কৃষ্ণকালী নিজেই। আপনি নিশ্চয়ই জানেন ওনার চেক সই করার পদ্ধতি। ওনার সেক্রেটারি সমস্ত চেক লিখে রেডি করে রাখে। উনি মাসের আট তারিখে সব চেক সই করে দেন যাতে ক্যাশ ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। সাধারণত সব বিলেই লেখা থাকে দশ তারিখের মধ্যে পেমেন্ট করলে দুই শতাংশ ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। কিন্তু এলিনা কোনও চেকেই ডিসকাউন্টের টাকা কাটেনি। পুরো বিলের অ্যামাউন্টই পেমেন্ট করেছে।
-আমাকে খবর দিয়ে ভালোই করলে। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখে জানাব। আমাকে ঠিকানাটা বলো।
- ১৬, রাজেন্দ্রনগর।
-ঠিক আছে। আর সব কী খবর? কেমন আছো তুমি?
- খুবই অগোছালো সব কিছু। দেখি কতটা গোছাতে পারি।
-বেশি চাপ নিও না এখন। কালকে আসবে?
-হ্যাঁ, কাল আসবো।
-তাহলে আমি কাল আসবো একবার। নিজের চোখে কাগজপত্রগুলো দেখে আসবো।
- তাহলে তো খুবই ভালো হয়।
-ঠিক আছে রাখলাম এখন।
ফোন রেখে পানু রায় সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বললেন,’ কিছু তো একটা ঘটছে। জগাই কে বলো রাজেন্দ্রনগরের ঐ ঠিকানায় অ্যাকমে ইলেক্ট্রিকের ব্যাপারে একটু খোঁজখবর করতে। খুব অদ্ভুত ব্যাপার। কেউ না কেউ তো লাভবান হচ্ছে নিশ্চয়ই।‘ সুন্দরী বললো,’ অন্তত একজন তো হচ্ছেই।‘ সুন্দরীর কথা শেষ না হতেই কাঠমান্ডুর হোটেল থেকে সেই মেয়েটার ফোন যার সঙ্গে বড়কালী দরকার হলে যোগাযোগ করতে বলেছিল।
-আমি কে বলছি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, মিঃ রায়।
-হ্যাঁ, বলুন। কোনও জরুরি দরকার?
- কৃষ্ণকালী একটা জরুরি বিষয়ে এক্ষুণি ওনার ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চান।
-বেশ, তাতে আমার কী করার আছে?
-না, ফোনে নয়। উনি ফ্লাইটে রওনা হয়ে গেছেন। উনি বলেছেন যে উনি যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করেছেন যাতে কেউ না জানতে পারে উনি কোথায় যাচ্ছেন এবং কখন যাচ্ছেন। উনি আমাকে বলেছিলেন উনি ঠিক তিনটের সময়, ছ’টার সময়, আটটার সময় এবং দশটার সময় আমাকে ফোন করবেন। যদি কোনও কারণে কোনও একটা ফোন না আসে শুধুমাত্র তাহলেই আপনাকে জানাতে।
-আপনি ফোন করেছেন কারণ তিনটের ফোন আসেনি?
-একদম ঠিক। সেজন্য ওনার নির্দেশমতো আপনাকে জানালাম।
-ধন্যবাদ। তার মানে ওনাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। কেস লেখা না হলে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা অবশ্যই খবর রাখবো।‘
পানু রায় ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গেই সুন্দরী সান্ধ্য দৈনিকের দু এর পাতাটা পানু রায়ের সামনে ধরে বললো,’ শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পুলিশ রক্তমাখা পায়ের ছাপ পেয়েছে। ছবিটাও ছেপেছে কাগজে।‘ পানু রায় কাগজটা সুন্দরীর হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে গভীরভাবে ছবিটা নিরীক্ষণ করে বললেন,’ এটা একটা লোকের পায়ের জুতোর ছাপ। জুতোটা নতুন। গোড়ালির লেখাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে- ‘রাদু’। পানু রায় অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে কী যেন ভাবতে লাগলেন। তারপর পায়চারি থামিয়ে সুন্দরীকে বললেন,’ আমার মনে হয়না আমি যদি কোনও সাক্ষীর সঙ্গে কেসটা অপব্যখ্যা সমেত কোর্টে ওঠার এবং জট পাকিয়ে যাওয়ার আগে কাজে নেমে পড়ি এবং কোনওরকম সাক্ষ্যপ্রমাণলোপের চেষ্টা না করি তাহলে অন্যায় করা হবে না। ওরা থানায় নিয়ে গিয়ে সাক্ষীকে গুলিয়ে দেবার আগেই আমাকে একটা কিছু করতে হবে।আরও একটা ব্যাপার তুমি লক্ষ্য করেছো কি না জানিনা। সাধারণত পুলিশ মূল অভিযুক্তকে চিহ্নিত করতে পারলেও খুনী অস্ত্রের সন্ধান সহজে পায়না। কিন্তু এক্ষেত্রে তার উল্টো। পুলিশ অস্ত্রের সন্ধান পেয়েছে কিন্তু কে খুন করেছে বুঝতে পারছেনা।
-দাদু, তাহলে তুমি পুলিশের থেকে এ ব্যাপারে একটু এগিয়ে রয়েছো। তুমি জানো যে তুমি বন্দুক বদল কর নি। আর তুমি এও জানো যে খুনী বন্দুকটা ছোটকালীর ড্রয়ারেই ছিল।
-সুন্দরী, আসল সমস্যাটা হচ্ছে আমি এখনও জানিনা যে বন্দুকটা ওখানে কে রেখেছিল? জানতেও পারবনা যতক্ষণ না আমি বড়কালীর সঙ্গে কথা বলতে পারছি।
-আর যদি বড়কালী না রেখে থাকে?
-তাহলে যে খুন করেছে সে রেখেছিল। আমাদের এখন অনেক কাজ। পুলিশ রেবা কৈরালাকে ধরে রেখেছে। এখন ওরা বড়কালীকে অ্যারেস্ট করবে। পুলিশকে পাত্তা না দিয়ে বড়কালী ঠিক করেনি। জগাইকে বলতে হবে বড়কালীর অফিসের ঐ নকল বিলগুলো কোথা থেকে ছাপা হয়েছিল খুঁজে বের করতে। দরকার হলে এই এলাকার সবকটা প্রেসে গিয়ে খবর নিতে হবে। তোমার মাথার যন্ত্রণা এখন কেমন?
-অনেক ভালো।
পানু রায় এবং সুন্দরী পাশেই একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে দুটো মোজিটো অর্ডার দিয়ে বসলো। পানু রায় বললেন,’ সুন্দরী, কী খাবে বলো? অনেকদিন গুছিয়ে খাওয়া হয়নি। চাপে না থাকলে আমার ক্ষিদে পায়না।‘
-আমার ক্ষিদে সে রকম নেই। কিন্তু জায়গাটা বেশ আরামদায়ক। কাজের ঝুটঝামেলা থেকে একটু ছুটি মন্দ নয়।
-আমার জন্য চিকেন রোস্ট আর স্ম্যাসড পোটাটো অর্ডার করো। তুমি দেখ কী খাবে। ততক্ষণে আমি জগাই কে ফোন করে বলি যে আমরা এখানে আছি। ও আসতে পারলে ভালোই হবে।
পানু রায় জগাইকে ফোন করে বললেন,’ তুমি কোথায়? শোন আমরা অফিসের পাশে যে রেস্টুরেন্টে আমরা মাঝে মাঝে বসি ওখানে আছি। সুন্দরীও আছে।তুমিও চলে এসো।‘ জগাই উত্তরে বললো,’ আমিও তোমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছি। অফিসে তোমাদের দেখতে না পেয়ে ফোন করতে যাচ্ছিলাম। সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই। ‘
-কী হয়েছে জগাই?
-কেলো দারোগা হন্যে হয়ে তোমাদের খুঁজছে। একটু আগে পুলিশের লোক তোমার খোঁজে অফিসে গিয়েছিল।
-কেন?
-বড়কালীকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। বড়কালী কোনও প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। বলেছে তুমি না আসা পর্যন্ত একটা কথাও উচ্চারণ করবে না। আমি খবর পেলাম কেলো দারোগা বড়কালীকে বলেছে ঠিকঠাক উত্তর না দিলে ওর গ্রেপ্তার হওয়ার খবর কাগজওয়ালাদের জানিয়ে দেবে।
-বড়কালী এখন কোথায়? তুমি কোথায়?
-আমি সব শুনে থানায় চলে এসেছি। বড়কালী কেলো দারোগার সামনে বসে আছে।
-ভেতরে গিয়ে বলে দাও আমি আসছি।










