ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত
Posted in ধারাবাহিক১৭. শম্ভু মিত্র বাংলা থিয়েটারের নতুন দিশারী
হৃদীবরেষু সুস্মি,
অনেকদিন হলো তোমার চিঠি পেয়েছি। নানা ব্যস্ততায় তোমাকে লেখা হয়নি। তোমার শেষ চিঠিতে তৃপ্তি মিত্রর কথা পড়তে পড়তে বাবু (বাবা)-র কথা খুব মনে পড়ছিল। বাবু কেমন নাটক পাগল ছিলেন তুমি জানো। আমি যদিও বাবুর কোন নাটক দেখিনি। লোক মুখে আজো শুনি বাবুর অভিনয় নিয়ে মানুষের প্রশংসা। বাবুর প্রিয় নাট্যাভিনেতা ছিলেন শম্ভু মিত্র। শম্ভু মিত্রকে সরাসরি দেখলেও তাঁর নাটক দেখার সৌভাগ্যও আমার হয়নি। তবে ছোটবেলায় তাঁর আবৃত্তি ও ফিতা ক্যাসেটে তাঁর নাটক 'ছোঁড়া তার', 'রক্তকরবী', 'বিভাব', 'রাজা অয়দিপাউস', 'দশচক্র' ও 'চাঁদ বণিকের পালা' (যা শ্রুতি-সংস্করণ হিসেবেও পরিচিত) শুনেছি বহুবার।
১৯ মে ১৯৯৭ সাল সোমবার খবর রটে গেলো হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেছে বাংলার নবনাট্যের প্রবাদপুরুষের। কিন্তু কেউ জানতেও পারল না। কোনো সম্মান, গান স্যালুট, স্মারক স্মৃতি— সুযোগই দিলেন না শম্ভু মিত্র। তিনি চলে গেছেন কাউকে কিছু না জানিয়ে। নিঃশব্দে, রাতের অন্ধকারে। তেমনই ইচ্ছে ছিল তাঁর। কন্যা শাঁওলীকে লিখেছিলেন তাঁর ‘ইচ্ছাপত্র’। এক বার নয়, বেশ কয়েক বার। ১৯৯৭ সালের ১৮ মে রাত দুটো বেজে ১৫ মিনিটে শম্ভু মিত্র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তারপর তাঁরই ইচ্ছে অনুযায়ী শাঁওলী গভীর রাতে সিরিটির শ্মশানে বৈদ্যুতিক চুল্লিতে তাঁর নশ্বর দেহটি দাহ করে ফিরে এসে বাবার মৃত্যুসংবাদ জানিয়েছিলেন। শ্মশানের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীটি মধ্যরাতের শ্মশানযাত্রীদের দেখে ও মৃত মানুষটির নাম জেনে প্রশ্ন করেছিলেন, “ইনি কি সেই শম্ভু মিত্র? যিনি নাটক করেন?” উত্তর পাননি। পাওয়ার কথা নয়। কারণ, তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন, “আমি সামান্য মানুষ, জীবনে অনেক জিনিষ এড়িয়ে চলেছি। তাই মরবার পরেও আমার দেহটা যেন তেমনি নীরবে, একটু ভদ্রতার সঙ্গে, সামান্য বেশে, বেশ একটু নির্লিপ্তির সঙ্গে পুড়ে যেতে পারে।” শাঁওলী মিত্র তাঁর তর্পণ বইয়ে শম্ভু মিত্রকে নিয়ে লিখেছেন, “জীবনভর অনেক মন্দ কথা শুনেও, নাট্যমঞ্চ নির্মাণের ক্ষেত্রে বারংবার অসফল হয়ে এবং বারংবার বিশ্বাসঘাতকতার আঘাত সহ্য করেও, নিজের শিষ্যদের কাছে চরম অপমানিত হয়েও যিনি হতাশা বা নৈরাশ্যে ভোগেননি, জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেও যিনি বলেছেন, ‘স্বপ্ন তো দেখতেই হবে। স্বপ্নগুলো সব কাঁচের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। আবার সেগুলো তো জড়ো করতে হবে।’’ তাই অসফলতা, বিশ্বাসঘাতকতা, নৈরাশ্যের কালো ছায়া সরিয়ে ফের উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা তাঁর সত্ত্বায়। বাস্তব আর অভিনেতার রঙ্গমঞ্চকে আলাদা করে না দেখার এক অনবদ্য উপাখ্যান তাঁর জীবন।
আমার এখনো হুবুহু মনে আছে, ১৯মে অফিস থেকে ফিরে বাবু এক অন্য মানুষ এমন কখনো দেখিনি বাবুকে। আমি এতবছর পরেও চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পারছি, বাবু সন্ধ্যার অনেক আগে বাড়ি ফিরে বিমর্ষ মুখে পড়ার ঘরে ঢুকে পড়েছে। অন্য দিন বাবু অফিস থেকে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করে টিভির ঘরে দুধ খৈ খেতে খেতে পত্রিকা খুলে মায়ের সাথে গল্প করে এমনটাই দেখে এসেছি চিরদিন। বাবুর এমন অস্বাভাবিক আচরণে মা অবাক হয়ে গেলো সঙ্গে আমি ও, সেদিন বাবা কিচ্ছু খায়নি, পড়ার ঘরেই ছিল সারারাত। বন্ধ দরজা পেরিয়ে ভেসে আসছিল শম্ভু মিত্রের কন্ঠে "এই মোর শেষ নিবেদন", "জীবনদেবতা"—এবং জীবনানন্দ দাশের "আট বছর আগের একদিন" ও "বোধ" কবিতা। আমরা কিছুই বুঝতে পারছিনা। মার কয়েকবার ডাকের পরে বাবু ভেতর থেকে উত্তর দেয়- শম্ভু মিত্র মারা গেছে জানো,একটু একা থাকতে দাও, আমি ঠিক আছি!
শম্ভু মিত্রকে আমি যতটা জানি তার বেশিরভাগ আমি আমার বাবুর চোখেই তাঁকে চিনি। আমার এখনো মনে আছে বাড়ির ডালিম গাছের নীচে দাঁড়িয়ে বাবু বলেছিল বাংলা নাটকে আধুনিকতার পথ নির্মাণ ও সৃজনে বহুমাত্রিকতা এবং ঐতিহ্যভাবনার কথা যখনই ওঠবে তখনই শম্ভু মিত্রকে স্মরণ করতে হবে শ্রদ্ধা ভরে। মঞ্চে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি যখন শিখরস্পর্শ করেছিলেন এবং পেশাদারি থিয়েটারের বৃত্ত ভেঙে নবনাট্য আন্দোলনে নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন, তখন কেউ ভাবেনি এই মানুষটি বাংলা নাট্যমঞ্চকে দীর্ঘদিনের ভাবনায়, পরিশ্রমে, প্রজ্ঞায়, মননে, জিজ্ঞাসায় ও অনুজদের দীক্ষাদানে নব রীতি-কৌশলে কত উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবেন। কত ভাবেই না তিনি বাংলা নাট্যমঞ্চকে করে তুলেছিলেন ঐতিহ্যিক প্রবাহের সঙ্গে ঐশ্বর্যবান ও আধুনিক। মঞ্চে প্রাণশক্তিসঞ্চারে নবধারার প্রবর্তক তিনি। বহুরূপী ও তাঁর নির্দেশিত নাটক বোধে নবীন ও দীপ্তিতে উজ্জ্বল; বাংলা মঞ্চধারায় নতুন প্রতিশ্রুতির প্রবর্তক। শুধু রবীন্দ্র-নাটকের প্রয়োগরীতি ও মঞ্চকুশলতার জন্যই নয়, নাটককে উৎকর্ষের উচ্চতায় পৌঁছোনোর সাধনায় তাঁর তুল্য ব্যক্তি নেই। সামগ্রিকভাবে তাঁর বোধ, বুদ্ধি, সাধনা ও সিদ্ধি উপলব্ধির জন্য পূর্বকালীন মঞ্চধারার রীতি ও শম্ভু মিত্র-প্রবর্তিত নাট্যধারা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি। বহুবছর পরেও বাবুর কথাগুলো আমার হুবুহু আজ মনে পড়ছে, এতবছর পরে যখন নিজের জানার সাথে বাবুর কথাগুলো মেলাতে চাইছি দেখছি সত্যিই তো শম্ভু মিত্র বাংলা নাট্যমঞ্চে আধুনিকতার পথ-প্রদর্শক। অপরিসীম সৃজন-প্রতিভার জোরে এবং নাটক ও নাট্যভাবনায় প্রতিদিন নিজেকে প্রস্ত্তত করে তিনি যে অভিনয়রীতি ও মঞ্চশৈলী নির্মাণ করে গেছেন তা উৎকর্ষে ও উচ্চতায় বাংলা আধুনিক নাটককে শম্ভু অধ্যায় বলে চিহ্নিত করা যায় অবলীলায়।
শম্ভু মিত্রকে নিজের মতন করে জানতে চিনতে শেখার সময় আমার বারবার মনে হয়েছে শৈশবে মা হারানোর পরই মানুষটি নিজের ভেতরে ডুব দিয়েছিলেন। তাই হয়ত অনেকের চোখেই তিনি দাম্ভিক, তার্কিক, একগুঁয়ে। কিন্তু শম্ভু মিত্রের মধ্যে আমি একজন অবুঝ শিশুকেও দেখি। শৈশবে মা হারানো সন্তানরা যেমন একাকীত্বে ভোগে তেমনি তার মনে বহু প্রশ্নের উদয় হয়, বহু প্রশ্নের একটি প্রশ্ন বোধ করি সবার মনেই জাগে মা নেই কেন? মৃত্যু কি? এমন প্রশ্ন সবাইকে হয়ত ভাবনার স্তরে ভাসিয়ে দেয়না। কেউ কেউ ভেসে যায় শম্ভু মিত্র তেমনই একজন কেননা যদুনাথ মিত্রর পুত্র শরৎকুমারের মেজো ছেলে শম্ভু মিত্র অনায়াসে জমিদারি করে জীবন কাটাতে পারতেন। হুগলির কলাছড়া গ্রামে ছিল ওঁর পূর্বপুরুষের জমিজিরেত। শরৎকুমার যেমন সে-পথ মাড়াননি, তাঁর পুত্র শম্ভুও না। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই অভিনয় ও আবৃত্তিতে শম্ভু মিত্রের আগ্রহ জন্মায়। তাঁর ভাগ্নে, সহপাঠী দুর্গার সঙ্গেই কখনও স্কুলে আবার কখনও বকুলবাগানের ‘গোল মাঠে’ চলত চেনা অচেনা নাটকে ঘরোয়া অভিনয়। পাশাপাশি চলত মুখস্থ করে কবিতা আবৃত্তি। আর এভাবে ছোট থেকেই শম্ভু মিত্র বই না খুলেও অবলীলায় বলে দিতে পারতেন কোথায় কোন পৃষ্ঠায় কোন কবিতা আছে। যেন এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ। স্কুল পেরিয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন শম্ভু মিত্র। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্রথাগত পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে স্বশিক্ষিত হওয়ার প্রয়াসে বাবার সঙ্গে চলে যান উত্তরপ্রদেশে। সেখান থেকে লখনউ, তারও পরে এলাহাবাদে। এলাহাবাদের পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনায় নীরবে নিজেকে তৈরি করেছিলেন শম্ভু মিত্র। সেইসময়েই একদিন শুনলেন, পাশের কোন এক বাড়িতে ‘আলমগীর’ নাটকের রেকর্ড বাজছে। নিজেই বলেছেন সে কথা, “মনে হল শ্যামের বাঁশি বাজল। নাটক ছাড়া আমার গত্যন্তর নেই”। ১৯৩৬-৩৭ সালে কলকাতায় ফিরে নানা জায়গায় থেকেছেন। জ্যোতিনাথ ঘোষের বাড়িতে থাকার সময় তার ছেলেমেয়েদের পড়াতেনও। এই জ্যোতিনাথই তাঁকে ‘শম্ভু মিত্র’ হয়ে ওঠায় দিশা দেখালেন প্রথম। তাঁকে সঙ্গে করে সিনেমা, থিয়েটার দেখানো, বিদেশি বই জোগাড় করে তাঁকে পড়ানো, এইসবই জ্যোতিনাথের কৃতিত্ব। এরপর প্রথাগত থিয়েটারে এলেন শম্ভু মিত্র ১৯৩৯-এ। যুক্ত হলেন ‘রঙমহলে’, এখানেই তিনি পেলেন তাঁর ‘গুরু’, ‘মহর্ষি’ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে। তাঁর স্নেহ, ভালবাসার আশ্রয়ে অভিনেতা, নাট্যকার শম্ভু মিত্র জীবনভর তাঁর ডালপালা বিস্তার করে গেছেন।
একজন শম্ভু মিত্র বাংলা নাটকের কেন নতুন দিশারী তা নিয়ে বহু কথা লেখা যাবে, তর্ক বিতর্ক ও হবে প্রচুর কিন্তু শম্ভু মিত্রকে অতিক্রম করা যাবে কি? মনসা মঙ্গল খ্যাত চাঁদ বনিকের সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। শম্ভু মিত্রের লেখা চাঁদ বণিকের পালা নাটকটি কখনই মঞ্চস্থ হয়নি, কিন্তু বেশ কয়েকবার শ্রুতিনাটকের আশ্রয়ে পরিবেশন করেছেন। শেষবার পরিবেশিত শ্রুতিনাটকটির একটি রেকর্ডিং আছে। নাটকের শেষে শম্ভু মিত্র শ্রোতাদের জানাচ্ছেন যে যদিও তিনি কোনোদিনও সাবেকি থিয়েটারের সাহায্যে নাটকটি উপস্থাপিত করেননি, তবুও শ্রুতিনাটকের আকারে উনি ভবিষ্যতের মানুষের জন্য নাটকটি রেখে গেলেন। যদি কারও ভাল লাগে, যদি নাটকটি মঞ্চস্থ করার ইচ্ছা জাগে, তবে হয়তো বা রেকর্ডিংটি কাজে লাগতেও পারে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী হতাশাজনক পরিস্থিতিতে মানুষের জীবনের অসহায়ত্ব, বিচ্ছিন্নতা এবং যোগাযোগের অকার্যকারিতা কে উপজীব্য করে একটি নাট্যধারার সূচনা হয় যাকে বলে অ্যাবসার্ড নাটক, যা প্রথাগত কাহিনী, চরিত্র ও যৌক্তিক সংলাপ বর্জন করে জীবনের অর্থহীনতা ও অস্তিত্বের সংকট ফুটিয়ে তোলে। ১৯৫৩-তে একইসঙ্গে প্যারিসে মঞ্চস্থ হয় এমন দুটি অ্যাবসার্ড নাটক। স্যামুয়েল বেকেট-এর ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ এবং ইউজিন ইউনেস্কোর ‘দ্য চেয়ারস’। চাঁদ বণিকের পালা তেমনি একটি এবসার্ড নাটকের ধার ঘেঁষে চলে গিয়েছে। অস্তিত্ববাদ দর্শনের পথ ধরে নাটকটি যেন জিজ্ঞাসা করছে মনুষ্য জীবনের আদৌ কোনও অর্থ আছে কি? আবার এমনও হতে পারে যে তিনি অন্য একটি বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আর তা হল আদর্শে বিশ্বাস রাখার জন্য জাগতিক অর্থে কোনও প্রতিদান নেই। বিশ্বাসের প্রতিদান বিশ্বাস নিজেই। নির্দেশনা এবং অভিনয়ের গুণে তিনি দর্শক-হৃদয়ের নানা স্তরে পরিশীলিতভাবে জীবন সম্পর্কে এমনভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন যা ছিল শুধু শম্ভু মিত্রের একক অবদান। বাবু বলতো রাজা অয়দিপাউসে তাঁর অভিনয়ের গুণে দর্শক-হৃদয়ে যে টানটান উত্তেজনা অভিনয়ে যে গ্রিক আবহের সৃষ্টি অয়দিপাউসের আর্ত হাহাকার কিংবা রাজা নাটকে স্বরের ওঠানামা, অন্ধকারের মধ্যে শুধু গলার ভেতর দিয়ে উচ্চারণ, যা বুকের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। এ-উচ্চারণ কখনো কখনো মৃদু, তীব্র ও সূক্ষ্ম অভিনয়গুণের দিক থেকে সেখানে তিনি নিঃসঙ্গ, একক ব্যক্তিত্ব, তুলনারহিত। সমকালীনদের মধ্যে সেখানেই তিনি ছিলেন ভিন্ন। যদিও আমরা জানি যে, তাঁর সমকালীন উৎপল দত্ত কিংবা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনয়গুণে ও নির্দেশনায় বহুদিক থেকে মান্য এবং তাঁরা দুজন সত্তরের ও আশির দশকে বাংলা নাট্যমঞ্চে অভিনয় ও নির্দেশনায় যে-সমৃদ্ধি এনেছিলেন তা মঞ্চ-ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে আছে। পূর্বজ নাট্যাচার্যদের মহান কীর্তি বাংলা মঞ্চের স্তম্ভকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে এবং লোকপ্রিয় করেছে বটে, তবু কথা থেকে যায়। বিনোদন, বীররস, ঐতিহাসিক বিষয় এবং জীবনের দুঃখ-বেদনাকে ধারণ করে যে-পেশাদারি মঞ্চ দর্শক-আনুকূল্য অর্জন করেছিল তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। সেই সময়ের রঙ্গালয় ও নাট্যসাধনা পরবর্তীকালের নাট্যচর্চায় গতিবেগ সঞ্চারিত করেছে কিন্তু তা কোনোভাবেই সমকালীন জীবনচর্যা ও সংকটকে প্রতিফলিত করেনি। দেশি-বিদেশি কত নাটকই তো অভিনীত হয়েছে নাট্যাচার্যদের প্রযত্নে ও পরিশীলনে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যায়ে এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে পেশাদারি রঙ্গালয় দর্শক তৈরি করেছে, নাটক ও বিনোদনে ভূমিকা রেখেছে – এ-তথ্য খুবই জরুরি আমাদের কাছে। তবু এই নাট্যচর্চাকে জীবনের সচল ধারার প্রতিচ্ছবি হয়তো বলা যায় না। সমকালীন জীবন-চেতনা এবং ঐতিহ্যিক ধারার সমন্বয়ে সেক্ষেত্রে শম্ভু মিত্র বহুরূপী নিয়ে যে-নাট্যধারার সূচনা করেছিলেন তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অসীম। শম্ভু মিত্র তিরিশ বছর বহুরূপীর প্রাণপুরুষ হিসেবে যে-নাট্যধারা প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা হয়ে উঠল বাংলা নাট্যমঞ্চের অভূতপূর্ব এক ইতিহাস। পঞ্চাশের ও ষাটের দশকের সাংস্কৃতিক কর্মপ্রবাহেও এর প্রভাব পড়েছিল।
ইতিহাস ধরে হেঁটে গেলে দেখা যাবে প্রকৃতপক্ষে বাংলা থিয়েটারের সূত্রপাত গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির হাতে। সেটা উনিশ শতকের সত্তরের দশক। তার পর পিতৃমুখী প্রতিভা দানীবাবুকে (সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ) পেরিয়ে আরও বছর পঞ্চাশেক পরে আমাদের থিয়েটার যথার্থ নতুন ও আধুনিক রূপ নিল আর এক যুগন্ধর নাট্যপুরুষ শিশিরকুমার ভাদুড়ীর হাতে। অধ্যাপনার কাজ ছেড়ে থিয়েটারে এসে, কিছু দিনের মধ্যে যোগেশ চৌধুরীর ‘সীতা’ প্রযোজনা করে তিনি আমাদের নাট্য-ইতিহাসে প্রথম সক্ষম ও সার্থক প্রযোজনার স্বীকৃতি ও আপামর জনসাধারণের আদর পেয়েছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও ছিলেন শিশিরকুমারের গুণমুগ্ধ; নিজের দু-একটি নাটক তাঁকে প্রযোজনার্থে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১৩ ভাদ্র ‘নাচঘর’ পত্রিকা লিখছে: ‘‘রসিক সমাজকে আজ আমরা আর একটি আনন্দ সংবাদ দিতে চাই। রবীন্দ্রনাথের বিশেষ অনুগ্রহে তাঁর নূতন ও অপূর্ব নাটক ‘রক্তকরবী’ অভিনয় করবার অধিকার (শিশিরকুমার) পেয়েছেন।... এ শ্রেণীর নাটক বাংলা রঙ্গালয়ে আর কখনো অভিনীত হয়নি এবং শীঘ্র হ’তও কিনা সন্দেহ, কারণ প্রকাশ্য রঙ্গালয়ে এখন এরকম নাটক অভিনয় করে সফল হবার শক্তি, সাহস ও প্রতিভা আছে, একমাত্র শিশিরকুমারেরই। পরন্তু ‘রক্তকরবী’র অভিনয়েও শিশিরকুমার যদি তাঁর অসাধারণ যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেন, তবে বাংলার নাট্যজগতে যথার্থই নবযুগের প্রবর্তন হবে। আমরা সাগ্রহে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতীক্ষায় রইলুম।’’সেই মাহেন্দ্রক্ষণ তখন আসেনি, এসেছিল তিরিশ বছর পরে আর এক জন মানুষের হাতে। তিনি শম্ভু মিত্র, ‘বহুরূপী’র স্রষ্টা। ‘বহুরূপী’র প্রথম তিরিশ বছর শম্ভু মিত্রের প্রযোজনাধন্য, এবং শুরুর প্রথম বারো বছর সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ১১এ নাসিরুদ্দিন রোডে তাঁর নিজস্ব ফ্ল্যাট। বহুরূপীর জন্মক্ষণে ফিরে গেলে জানা যায় আইপিটিএ থেকে বেরিয়ে এসে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে সঙ্গে নিয়ে শম্ভু মিত্ররা গোষ্ঠীচেতনা ও নবনাট্য আন্দোলনকে সঞ্জীবিত করার জন্য নাটক শুরু করলেন ১৯৪৮ সালে। তখনো দলের কোনো নামকরণ হয়নি। এ প্রসঙ্গে শম্ভু-কন্যা শাঁওলী মিত্র বলেন, ‘কমিউনিস্ট পার্টির সংসর্গচ্যুত এই যুবকেরা যখন বুঝে উঠতে পারছেন না কী তাঁদের করণীয়, তখন মহর্ষি [মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য] সাহস দিয়ে বলেছিলেন, Why are we eating our hearts out? আমরা কিছু করি। আমাদের সঙ্গে তো ঝগড়া নেই কারও-র। আমরা যেমন করে পারি, যেটা ভালো মনে করি, করতে শুরু করে দিই।’ এই অনুপ্রেরণা থেকেই ১৯৪৮ সালে বহুরূপীর জন্ম। কাজ শুরু হয়ে যায়। যদিও নামকরণ হয়েছিল বছর দুই পরে, ১৯৫০ সালে। দেশের এবং ব্যক্তিগত জীবনের চরম বিপর্যয়ের মধ্যেই বহুরূপীর জন্ম। বলা যেতে পারে বহুরূপী শম্ভু মিত্রের প্রথম সন্তান। যে-সন্তানটির প্রতি তাঁর একাগ্র মনোযোগ, সমস্ত যৌবন দিয়ে তাকে গড়ে তোলবার সাধনা। আর তা এতই স্বাভাবিক ছিল, সে যেন নিঃশ্বাসের মতোই। নবান্ন শম্ভু মিত্রের নাট্য-পথপরিক্রমায় নিঃসন্দেহে এক মাইলফলক। তাঁর প্রকৃত নাট্যদীক্ষা হয়েছে এ-নাটকের মাধ্যমে; দীর্ঘ প্রায় দুবছর একাদিক্রমে এ-নাটকটিতে সংলগ্ন ছিলেন তিনি। অতঃপর তাঁর অগ্রযাত্রা আমরা লক্ষ করব।’বাংলা নাটকের ইতিহাসে ১৯৫৪ সালটি বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে বহুরূপী নাট্যসংস্থা-প্রযোজিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী মঞ্চায়নের জন্য। রক্তকরবী শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জীবনচেতনায় এবং বিশেষত নাট্যপ্রয়াসের সঙ্গে যুক্ত সকলকে জিজ্ঞাসা-উন্মুখ ও নবীন পথপ্রবাহ-সৃষ্টির জন্য প্রণোদিত করেছিল। বহুগুণান্বিত শম্ভু মিত্রকেই আধুনিকতার পথিকৃৎ বলে মনে পড়ে। তাঁর ধ্যান, জ্ঞান, কল্পনা, স্বপ্ন ছিল নাটক। সেই নাটক যা দর্শককে করবে জীবন সম্পর্কে আকুল কিংবা ভাবনা ও জিজ্ঞাসাকে উন্মুখ করে তুলবে। নির্দেশনা কেবল নির্দেশনা ছিল না তাঁর কাছে। কত পরিশ্রমে, কতভাবে চরিত্রের অন্তর্নিহিত মাধুর্য, সৌন্দর্য ও বোধ তাঁকে বলীয়ান করেছিল নাট্যচর্চায় তা নানাজনের স্মৃতিকথায় উল্লিখিত হয়েছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য নাটক সম্পর্কে ব্যাপক ও গভীর জ্ঞান, পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে শম্ভু মিত্র এ কৃতি অর্জন করেছিলেন। বহুরূপীর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শম্ভু মিত্রের। বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে শিশিরকুমার ভাদুড়ীর যে-যুগ – তারপরে নবনাট্যের মধ্য দিয়ে তিনিই আরেক অধ্যায়ের সূচনা করেন। তিনটি দশক তিনি সক্রিয় ছিলেন বহুরূপীতে। ঐতিহ্যকে অস্বীকার করেননি। তাঁরই প্রবর্তনায় রবীন্দ্রনাটক পুনরাবিষ্কৃত হয়েছে।
বাঙালি নাট্যদর্শক ও নাট্যশিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ কেবল রবীন্দ্রনাটক-মঞ্চায়নের পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণের জন্যই নয়, তিনিই রবীন্দ্রনাটকের সফল নির্দেশক। রবীন্দ্রনাটকের বিন্যাসে এবং অর্থ উপলব্ধির বোধগম্যতায় তিনি এমন মাত্রা সঞ্চার করেছিলেন যা হয়ে ওঠে বাস্তবানুগ। সেজন্য রক্তকরবী প্রযোজনার কিছুদিনের মধ্যে এই নাটকের বক্তব্য এবং মঞ্চায়ন নিয়ে বহুরূপী ও শম্ভু মিত্রকে কত না তর্ক করতে হয়েছে। প্রতীক থেকে যখন বাস্তবভিত্তিক জনচেতনায় এ হয়ে উঠল অনন্য একটি মঞ্চনাটক, বুদ্ধিবাদী মহলকে প্রবলভাবে তা আলোড়িত করেছিল। এ-নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত দিতে হয়েছিল অনেককেই। বিশ্বভারতীর আমন্ত্রণে শম্ভু মিত্র ১৯৭৭ সালে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে এক বছর শান্তিনিকেতনে ছিলেন। এই সময়ে তিনি নাট্য-সম্পর্কিত যে-বক্তৃতা দেন তার মধ্যে বিশিষ্ট ছিল ‘রক্তকরবী ও রবীন্দ্রনাথ : উপলব্ধি ও আবিষ্কার’। এই বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেছেন কীভাবে নানা পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রসাহিত্যের স্বাদ আস্বাদন করে তিনি পৌঁছে যান রবীন্দ্রনাথকে মঞ্চে উপস্থাপনায়। এই উপস্থাপনায় কত না স্তর এবং অভিজ্ঞতায় নদীর মতো বাঁক রয়েছে। চার অধ্যায়, বিসর্জন আর রক্তকরবী এক ধরনের প্রযোজনা নয়। মঞ্চে বক্তব্য ও বিন্যাসে কত না পৃথক এ-তিনটি নাটক। পরিশেষে শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে নাট্যকেন্দ্র স্থাপন, মঞ্চ-নির্মাণ ও ভারতবর্ষের নানা অঞ্চলের নাট্যচর্চাকে অনুধাবন ও সম্যক পরিচয়লাভের জন্য অনুবাদ সেল গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলা নাট্যসংস্কৃতির গৌরবময় কেন্দ্র হয়ে উঠবে শান্তিনিকেতন – এ-আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি। বিশ্বভারতীর উপাচার্যকে লেখা চিঠিটি পাঠ করার পর আমাদের মনে হয়, শম্ভু মিত্র নাট্যমঞ্চ ও নাট্যকেন্দ্র নির্মাণের জন্য যে-সুপারিশ করেছিলেন তা বাস্তবায়িত হলে সত্যিকার অর্থে ভারতবর্ষের ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের নাট্যচর্চায় নবীন মাত্রা অর্জন করত। এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই, কলাভবন প্রতিষ্ঠার পর চিত্রকলার ক্ষেত্রে যে বিকল্প রীতি ও শান্তিনিকেতন স্কুল চিত্রকলার প্রয়াসে যে অবদান রেখেছে তা ভারতবর্ষের চিত্রকলা আন্দোলনে নবধারার প্রবর্তক বলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শান্তিনিকেতনে শম্ভু মিত্র-প্রস্তাবিত এই দুটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলে নাট্য চর্চা, গবেষণা ও পঠন-পাঠনের ক্ষেত্রে আরো একটি দিগন্ত উন্মোচিত হতো, আমাদের দুর্ভাগ্য তা হলো না।
শম্ভু মিত্র মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত নাটককেই লালন করেছেন। অবমানিত হয়েছেন, বহুরূপীতে। তাঁকে সত্তরের দশকের অন্তিম পর্যায়ে এড়িয়ে চলেছে বহুরূপী গোষ্ঠী। কতভাবেই না তাঁর কর্মপ্রবাহ ও প্রবর্তিত ধ্যান-ধারণাকে, শিক্ষাপদ্ধতিকে অবহেলা করা হয়েছে। দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছিন্নতাকে ভিন্ন রং দিয়ে তিনি যাতে গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে পড়েন সেদিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের ভেতর যখন অন্তর্কলহ ও বিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছে এবং তাঁর অপরিহার্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কিংবা গোষ্ঠীর প্রাণপুরুষকে অবহিত না করে নানা কর্মপ্রবাহ পরিচালিত হয়েছে তখনো শম্ভু মিত্রের ভেতর রক্তক্ষরণ হয়েছে, কিন্তু তিনি থেমে যাননি। এই সময়েও দেখি তাঁকে সৎ নাটক নিয়ে ভাবতে। পরবর্তীকালে গ্যালিলিউ প্রযোজনাকালে তাঁকে যখন প্রয়োজন হলো তিনি সেই আহবানে সাড়া না দিয়ে পারেননি। সমসাময়িক সময়ে দাঁড়িয়েও বলাই যায় শম্ভু মিত্র বাংলা নাট্যমঞ্চে সাধণায়, চর্চায় ও নাট্য প্রয়াসের কর্মে যে কত প্রাসঙ্গিক এবং তাঁর নাট্যমননচেতনার আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। শম্ভু মিত্র অন্তিম জীবনে সমাজ, রাষ্ট্র, সহযাত্রী ও আত্মজনকে কোন দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিপ্রেক্ষিত জ্ঞানে বুঝতে চাইতেন, এ-ইচ্ছাপত্র যেন তারই নিদর্শন হয়ে থাকলো। এ শুধু প্রামাণিক দলিল নয়, এ-ইচ্ছাপত্রে আমরা পর্যবেক্ষণ করি তাঁর জীবনদর্শনেরও অনুষঙ্গ। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভন্ডামি ও ক্ষুদ্রতার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ এ-ইচ্ছাপত্র।
মনটা কেন জানিনা ফাঁকা হয়ে গেলো, আজ আর লিখছি না। তোমার চিঠির অশায় রইলাম। নিরন্তর ভালো থেকো।
ভালোবাসান্তে-
বাসু
১১ জানুয়ারী, ২০২৬










