প্রচ্ছদ নিবন্ধ - অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়
Posted in প্রচ্ছদ নিবন্ধএক বিশ্ব উষ্ণায়নে রক্ষে নেই তায় আবার সুপার এল নিনো! তারই মাঝে খেলাধুলার বড় আসর। গত পনেরো হাজার বছর ধরে যে উষ্ণ যুগ চলছে তার মধ্যে আবার গরমের প্রকোপ কখনও কমে কখনও বাড়ে। গত কয়েকবছর ধরে যে আবহাওয়া তেতে উঠছে তার অন্যতম ইন্ধন যোগাচ্ছে নগরোন্নয়ন, যুদ্ধ। প্রখর রৌদ্রতাপে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে জল অত্যধিক উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বলে বিশ্বের আবহবিদেরা পরীক্ষায় জেনেছেন। তার জন্যে এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এবং এই উত্তাপ যদি বাড়তে থাকে তাহলে মনে করা হচ্ছে ১৮৭৫ সালের মত সুপার এল নিনো হতে পারে, এবং অনুমান, ঘটনা সেই দিকেই এগোচ্ছে। ইতিমধ্যে ক্রান্তীয় দেশগুলো গরমে হাঁসফাঁস করতে শুরু করে দিয়েছে। ভারতের অনেক জায়গায় তাপমাত্রা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে, কিছু অংশে পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। কলকাতায় তাপমাত্রা পঁয়ত্রিশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করলেও জলীয় বাষ্প যবে থেকে ঢুকতে শুরু করেছে ভ্যাপসা গরমে ত্রাহি রব বেরোতে শুরু করেছে। রাস্তায় অবশ্য ‘হিট’ খুব বেশি লাগে। শুধু তাই নয় ইউরোপেও আবহাওয়া তপ্ত। ফ্রান্সে তাপমাত্রা বত্রিশ ডিগ্রি এবং তার মধ্যেই প্যারিসে লন টেনিস খেলা সবে শেষ হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে জুনেই সুপার এল নিনো তার খেল দেখাতে শুরু করে দেবে যার প্রভাব আমেরিকা-মেক্সিকো-কানাডায় চলা বিশ্বকাপ ফুটবলে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে যেমন হঠাত শুকনো আবহাওয়া বা প্রবল বৃষ্টি বা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস এরকম অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছাড়াও কিছু এলাকা উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
এবছর জুন মাস বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক খেলাধুলা নিয়েই মেতে আছে। তবে তার মধ্যে যে যুদ্ধ ও হুমকির মতো দৈনন্দিন ঘটনাগুলো ঘটছে না তা নয়। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ যুদ্ধের মতো হয়ে যাচ্ছে, শান্তির নামে বৈঠকও চলছে মাসাধিককাল ধরে। সম্প্রতি শান্তি চুক্তি হয়েছে কিন্তু তার মেয়াদ কতদিনের তাতে সন্দেহ আছে। আর ইউরোপে তো যেদিন রাশিয়া বা ইউক্রেনের মনে হল যাই কয়েকটা ড্রোন পাঠিয়ে দিই সেদিন কিছু বাড়িঘর ভাঙল, মানুষ মরল। এরই মধ্যে নানা দেশে আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক প্রতিযোগিতা শেষ হল। প্যারিসে রোল্যান্ড গারোসে লন টেনিসের শেষ পর্যায়ের খেলাগুলো হল। আর এবার তো ফুটবলে বিশ্বকাপ জেতার লড়াই শুরু হয়ে গেছে, চলবে জুলাই অবধি। সেই নিয়েই এখন মেতে আছে দুনিয়া।
প্যারিসে এবারের টেনিসে কিছু উদ্ভট ঘটনা ঘটে গেল। অথচ টেনিস এমন একটা খেলা যেখানে জেতা-হারার সম্ভাবনার পাল্লা ভারি। একগুচ্ছ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হেরে গেল শুরুর কয়েক রাউন্ডের মধ্যেই। সাধারণত পেশাদার বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড়েরা কয়েকবছর স্থিতিশীল থাকে, তাদের মান ও বিজয় ধরে রাখে। যেমন গত কয়েকবছর ধরে ইটালির জানিক সিনার এবং স্পেনের কার্লোজ আলকারাজ চারটে বড় গ্রান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্টে রাজত্ব করে আসছে। তর্কের খাতিরে ধরলেও উনচল্লিশ বছর বয়সেও নোভাক জোকোভিচ সব সময়ের সেরা টেনিস খেলোয়াড় এবং এখনও স্রেফ মনের জোরে খেলে যাচ্ছেন। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চারটে গ্রান্ড স্ল্যামে সিঙ্গলসে খেলে মোট চব্বিশটা গেম জেতার সর্বকালীন রেকর্ড তাঁর আছে। মহিলাদের মধ্যে এই চারটে গ্রান্ড স্ল্যামে অবশ্য শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের মধ্যে কিছু রদবদল হতে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দশজন খেলোয়াড় ভাগাভাগি করে জিতেছেন। তবুও বেলারুসের সাবালেঙ্কা বর্তমানে শ্রেষ্ঠর শিরোপা নিয়ে বসে আছেন। এবছরে ফরাসি ওপেনে কিন্তু সব ওলটপালট হয়ে গেল। এবছর বেশ কিছু খ্যাতনামা খেলোয়াড় আসেননি, সম্ভবত প্যারিসে বত্রিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড গরমের জন্য।
কব্জির আঘাতের জন্য খেলাতে যোগই দিলেন না আলকারাজ। বিজিত হওয়ার লক্ষ্যের দ্বার থেকে ফিরে গেলেন সিনার প্রচণ্ড গরমে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে। বিশ্বে ছাপ্পান্নতম স্থানাধিকারী আর্জেন্টিনার সেরুন্ডোলোর কাছে বিচ্ছিরিভাবে পাঁচ সেটে হেরে আঠারো পয়েন্ট খুইয়ে বিদায় নিলেন। টেনিস ইতিহাসে আরও ভূমিকম্প। অস্বাভাবিকভাবে জোকোভিচ একটা বিরাট জয়ের মুখ থেকে ছিটকে গেলেন এবং ব্রাজিলের কিশোর ফনসেকার কাছে হার স্বীকার করলেন। খ্যাতনামাদের মধ্যে রইলেন শুধু জার্মানির আলেক্সান্ডার জভেরেভ, বর্তমানে বিশ্বে তিন নম্বরে আছেন। এর আগে একটাও গ্রান্ড স্ল্যাম জেতেননি। সেমিফাইনালে আর বাকি তিন খেলোয়াড় আগে কখনও সেমিফাইনাল পর্যন্তও পৌঁছননি। শেষ হাসিটা হাসলেন জভেরেভই, বিশ্বে দশ নম্বর স্থানাধিকারী ইটালির কোবোলিকে পাঁচ সেটে হারান।
মহিলাদের ক্ষেত্রেও একই অঘটনের সমাপতন। সাবালেঙ্কা বিপজ্জনকভাবে রাশিয়ার শ্নাইডারের কাছে হার মানলেন, সৌজন্যে অস্বাভাবিক এলোমেলো হাওয়ায় খেলতে গিয়ে ক্লান্তি। চার বারের ফরাসি ওপেন জয়ী ইগা সোয়াইটেক এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কোকো গাউফ দুজনেই খেলার শুরুতেই পরাজিত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে ছিটকে যান। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত বিশ্বে সর্বিনিম্ন স্থানে থাকা পোল্যান্ডের মায়া চোয়ালিন্সকা সেমিফাইনালে শ্নাইডারকে পরাস্ত করেন। এবছর ফরাসি ওপেন জয়ী হলেন রাশিয়ার উনিশ বছর বয়সী মীরা আনদ্রীভা। ১৯৯২ সালে মণিকা সেলেসের পর এত কম বয়সে কোনও মহিলা ফরাসি ওপেন জিতলেন।
গত অর্ধ শতকে ফরাসি ওপেনে এত বড় বিপর্যয় আগে হয়নি। দর্শকেরা কিছু কড়া প্রতিদ্বন্দ্বীমূলক খেলা দেখার আনন্দ হয়তো পেয়েছেন কিন্তু মনে মনে সবারই একটা ইচ্ছে থাকে নামী খেলোয়াড়ের খেলা দেখার। তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বয়স্কদের অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়ায় নবীনদের জয়ের সম্ভাবনা প্রবল প্রমাণ হয়ে গেল।
টেনিসের মতোই বিশ্বের নামী ফুটবলারদের খেলা দেখার অপ্রতিরোধ্য আগ্রহ বিশ্বকাপ ফুটবলে। ফরাসি ওপেন শেষ হতেই শুরু হয়ে গেল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শক্তির খেলা বিশ্বকাপ ফুটবল। এবছর উত্তর আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকো এই তিনটে দেশে খেলা হচ্ছে। ৩৯ দিনে ৪৮টা দেশ, ১০৪টে খেলা খেলবে। শুরুতেই চাপা মনোমালিন্য কারণ প্রথমত কানাডা এবং মেক্সিকো দুজনেরই আমেরিকার সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক একেবারেই ভাল নয়। তার ওপর বেশিরভাগ খেলা এবং বিশেষ করে শেষের খেলাগুলোর অধিকাংশ উত্তর আমেরিকায়। বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বের এক মহাবাণিজ্যিক অনুষ্ঠান যার উদ্বোধন অনুষ্ঠান এবং শেষ ষোলো থেকে ফাইনাল অবধি অর্থের আগমন সবচেয়ে বেশি। উদ্বোধন অনুষ্ঠান অবশ্য মেক্সিকোয় হয়েছে। সারা বছর ধরে মহাদেশগুলোয় এত প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলা হয় এবং টিভি ও সংবাদমাধ্যমে তাদের দেখা ও পড়া হয় যে নামী খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপে দেখার জন্য সারা পৃথিবীর লোক আগ্রহে থাকে। চার বছর অন্তর হয়ে চলা ১২২ বছরের এই খেলায় কত খ্যাতনামা খেলোয়াড় খেলে গেছেন এবং এখনও কত খেলছেন, এ যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মত। একদল যায় তো আর একদল উঠে আসে। গত শতকের ষাট-সত্তর দশকের খ্যাতনামা ফুটবলার পেলের সাথে গারিঞ্চা, অ্যালবার্তো, জেয়ারজিনহো, রিভেলিনো, এউসেবিও, বেস্ট, জোহান ক্রায়ফ, পুসকাস, স্তেফানো যুগের খেলোয়াড়দের পর আশির দশকে এল মারাদোনা, গুলিত, প্লাতিনি, ম্যাথাউস, জিকো, মার্কো ভন বাস্তেন, ভালদানো, জিদানের মত বিখ্যাত খেলোয়াড় আর এখন মাঠ কাঁপাচ্ছে রোনাল্ডো, মেসি, এমবাপে এবং এরকম আরও অনেক খ্যাতনামা। প্রত্যেকে তাদের শ্রেষ্ঠ খেলা উপহার দিতে চায় এই প্রতিযোগিতায়। দর্শকেরাও চায় সেটা। যারা মাঠে খেলা দেখার সৌভাগ্য অর্জন করে তারা ছাড়াও পৃথিবীর এক বিরাট সংখ্যক মানুষ যে যার বাড়িতে, ক্লাবে, হোটেলে, পাবে বসে, প্রয়োজনে রাত জেগেও, টেলিভিশনের পর্দায় এই খেলা দেখার আগ্রহ ধরে রাখে। যেসব দেশ খেলায় অংশগ্রহণ করে তাদের লোকেদের উৎসাহ তো থাকবেই নিজের দেশের খেলোয়াড়ের খেলা দেখার কিন্তু তার থেকে কিছু কম উৎসাহ পোষণ করে না বাকি দেশের লোকেরা।
বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস জুড়ে রয়েছে বিতর্ক, রাজনৈতিক কৌতূহল, পরিকাঠামোগত সমস্যা ও হিংস্রতা। এবছর শুরুর অনেক আগে থেকেই ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বিদ্বেষপূর্ণ। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে প্রথমে ইরান খেলতে আপত্তি করলেও পরে মানিয়ে নেয়, মেক্সিকোতে তারা প্রধান ঘাঁটি করে। এমনকি আমেরিকাও ইরানের খেলোয়াড়দের দেশে খেলার অনুমতি দেয় তবে শর্ত আরোপ করে যে খেলা শেষ হওয়ার পরের দিনই চলে যেতে হবে। আমেরিকা ভিন্ন দেশের ফুটবলার, সাংবাদিক এবং দর্শকদেরও সদা সন্দেহের আওতায় রেখেছে। বেশ কয়েকটা আফ্রিকার দেশের আগত খেলোয়াড়দের টারম্যাকেই সম্পূর্ণ সিকিওরটি চেক করে ঢুকতে দিয়েছে। কয়েকজনকে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রেখে তারপর অনুমতি দিয়েছে। খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক এবং বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত রেফারিকে বিমানবন্দর থেকেই পত্রপাঠ বিদায় দিয়েছে অনুমতি না মেলায়। বর্ণবিদ্বেষী ভাব ফুটে বেরিয়েছে আমেরিকার তরফে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের নিয়ামক ফিফা খেলা থেকে লাভের অঙ্কের প্রতি নজর আগে রেখেছে। দর্শকদের টিকিটের দাম খেলার গুরুত্ব অনুযায়ী ওঠানামা করার পথ খোলা রেখেছে। টিকিটের দাম কয়েক হাজার ডলার থেকে কয়েক-দশ হাজার ডলার। এবারের অন্যতম আকর্ষণ মেসি এবং রোনাল্ডো, দুজনেই চল্লিশের দোরগোড়ায় এবং এবছরই হয়তো তাদের শেষ বিশ্বকাপ খেলা। তাই তাদের নিয়ে উৎসাহ অনেক বেশি।
এবছরের খেলার বল উন্নত প্রযুক্তি মেশানো, তৈরি করেছে আডিডাস ট্রিওনডা। সংযুক্ত বল প্রযুক্তি দ্বারা নির্মিত। বলের ভেতরে কাজ করছে গতি সেন্সর যা বলের গতি, দিক এবং প্রতি সেকেন্ডে ৫০০টা স্পর্শ রেকর্ড করবে যার থেকে রেফারি অফ-সাইড এবং হ্যান্ডবলের সঠিক সময় নির্ধারণ করতে পারবে। বলের ভেতর ব্যাটারিকে ৯০ মিনিট চার্জ দিলে অতিরিক্ত সময় সমেত একটা খেলা সম্পূর্ণ করানো যাবে।
ভারতীয় সময়ানুসার ১১ জুন শেষ রাতে এই বিশ্ব মহোৎসব উদ্বোধন হয়ে যাওয়ার পর ১২ জুন রাতসকাল সাড়ে বারোটায় বল গড়াতে শুরু করেছে। প্রথম দিনই রেফারির বাঁশি খেলোয়াড় এবং দর্শক উভয়েই প্রশ্ন তুলে দ্বন্দ্বের সূচনা করেছে। জুলাইয়ের উনিশ তারিখ ফাইনাল। দেখা যাক, কোথাকার বল কতদূর গড়ায়।
এল নিনো যদি তার সুপার ফর্ম শুরুতেই খেলা চালু করে দেয় তাহলে ফুটবলের গতিবেগ চঞ্চল হওয়া অস্বাভাবিক নয়।










