ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়
Posted in ধারাবাহিক২৮.১
শিবপালগঞ্জ গাঁয়ের এক দুঃখী ছেলে, নাম রুপ্পন বাবু। কিছু দিন আগে ওনার খুব দাপট ছিল আর লোকে বেশ সম্ভ্রমের চোখে দেখত। কারণ ওনার বাপের নাম বৈদ্যজী তবে ওনার নিজেরও কিছু নাম ছিল। উনি ক্লাস টেনে বেশ কয়েক বছর ধরে পড়ছেন এবং উনি ওখানকার ছাত্রনেতা। তহসীলদার ওনার ইয়ার, দারোগা ওনার চামচা এবং প্রিন্সিপাল ওনার অধীনস্থ কর্মচারী। উনি সারাক্ষণ কলেজের মাস্টারদের ব্যবহার চালচলন এসব নিয়ে অসন্তুষ্ট। আর মাস্টারের দল ওনাকে “ভয়ানাং ভয়ং ভীষণং” এবং পরমপিতা মেনে চলে।
ঘরের মধ্যে ওনার ছবি লাফালাফি করতে থাকা এঁড়ে বাছুরের মত। এটাও নিশ্চিত যে দেশের রাজনীতির খোলা মাঠে স্বচ্ছন্দে চরে বেড়ানো অনেক প্রতিভাশালী সন্তানের মত ইনিও একদিন চরে খাবার কৌশল শিখে নেবেন। এবং বাপ পটল তুললে কিছুদিন –বছর বা ছ’মাস—এদিক সেদিক ঘুরে একদিন বাপের ছেড়ে যাওয়া আসনে বসে খড় চিবুতে শুরু করবেন।
পাঁচ মাস আগে আরেকটি ছেলে এই গাঁয়ে এসেছিল। ওর নাম রঙ্গনাথ। লোকজন ওর বড়মানুষী চাল, উদার স্বভাব—সবই চিনতে পেরেছে। কারণ, ওর মামার নাম বৈদ্যজী। তবে ওর নিজেরও কিছু বড়মানুষী গুণ ছিল। ও ইতিহাসে এম এ করেছে। দেখতে সরল ভালমানুষটি, কিন্তু দরকারে বেশ বাঁকা কথা বলতে পারে। প্রতিটি লেখাপড়া জানা ভারতীয়ের মত ও নিজের সংগে সম্পর্ক নেই এমন সব ঘটনাকে ঘটনা হিসেবেই দেখত আর ভুলে যেত, --এ’নিয়ে কোন চাপ নিত না।
ইতিহাসের ছাত্র হওয়ায় ওর অনেক রাজনৈতিক এবং সামাজিক শোষণ ও উৎপীড়নের ঘটনার কথা জানা ছিল। কিন্তু কখনও ভাবে নি যে ও নিজেও ইতিহাসের অংশ, এবং চাইলে ইতিহাসের চেহারা বদলে দিতে পারে। ও দেশের সেই পঁচানব্বই প্রতিশত বুদ্ধিজীবীদের একজন যাদের বুদ্ধি দেয় আত্মসন্তোষ এবং তর্ক করার কৌশল। বুদ্ধির প্রেরণায় ওরা অন্যদের কী করা উচিত, বা কী করা উচিত নয় সে নিয়ে লম্বা লম্বা লেকচার দেয়, কিন্তু অন্যদের না করার পেছনে যে নিজেরও কিছু দায়িত্ব আছে—সেইসব বেহায়া যুক্তির থেকে কয়েক ক্রোশ সরে থাকে।
তবে যে ছেলেটার নাম রুপ্পন বাবু তার সমস্যা অন্য। কিছুদিন ধরে ও রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের মধ্যিখানে নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ, রুচি এসব এনে ফেলেছে। ফলে আগে যেসব ভালোমন্দ, ন্যায়-অন্যায় ওর চোখে ধরা পড়ত না, সেগুল এখন ফুটবলের আকার নিয়ে যেন ওর চোখের পাতায় লটকে রয়েছে। আগে ও কলেজের প্রিন্সিপালকে নিজের বাবার চাকর ভাবত। এখন মনে হচ্ছে ব্যাটা গণ্ডমূর্খ এবং জেদি; আর অন্য মাস্টারদের দেখে জ্বলতে থাকে। সেই জ্বলুনির চোটে রূপ্পনের পিতাঠাকুরকে নিজের দলাদলির মধ্যে টেনে এনেছে। কয়েকজন মাস্টারকে আগে মনে হত মূর্খ এবং ছিটেল। এখন দেখা যাছে ওরা ছিটেল হলেও বদমাশ নয়—ওদের রক্ষা করা কর্তব্য। কিছুদিন আগেও বড়ভাই বদ্রী পালোয়ানকে মনে হত শক্তিচর্চার অন্তিম উদাহরণ, এবং বদ্রীকে নিয়ে রুপ্পনের গর্ববোধ হত। কিন্তু এখন ও দেখেছে আশপাশের জেলার কিছু গুণ্ডাকে—যারা মাঝে মাঝে শিবপালগঞ্জে এসে বদ্রীর সংগে কথা বলে চলে যায়।
অর্থাৎ এখন ছেলেটার মনে সেই ছটফটানি শুরু হয়েছে যার ঠেলায় কেউ বিভীষণ, ট্রটস্কি বা সুভাষচন্দ্র বোস হয়ে জগতকে কিছু করে দেখাতে চায়। কিন্তু যাত্রা শেষ হয় ফাঁসিকাঠে চড়ে, জেলে গিয়ে অথবা জয়প্রকাশ নারায়ণ বা অচ্যুত পটবর্ধনের মত সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে।
অন্য ছেলেটার অবস্থাও তথৈবচ। কারণ, পাঁচ মাস এখানে কাটিয়ে ও দেখেছে যে তামাশা খেলাচ্ছলে শুরু হয়েছিল এখন তার চোটে লোকের হাত-পা ভাঙা হচ্ছে। আর হাসতে হাসতে যে ধূলো অন্যের গায়ে ছিটিয়ে দেয়া হোল। তাতে লোকটার চোখ নষ্ট হল। যখন শনিচরকে পঞ্চায়েত প্রধান পদে দাঁড় করানোর কথা উঠল বা যখন ছোটে পালোয়ান জোগনাথের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে গেল তখন ওর মনে হয়েছিল এসব ইয়ার্কি হচ্ছে। কিন্তু যখন শনিচর সত্যি সত্যি পঞ্চায়েতের প্রধান হল বা ছোটে পালোয়ান জোগনাথকে সত্যিই জেল থেকে ছাড়িয়ে আনল, তখন রঙ্গনাথের বুকে জোর ধাক্কা লাগল। শনিচরের ভোটে জেতার বিজয় উৎসবের দিন ও অনেক কিছু ভাবল। ও জ্ঞানচক্ষুতে দেখতে পেল—বিভিন্ন রাজ্যের রাজধানীতে কত কত বৈদ্যজী, মন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর লাইনে না জানি কত শনিচর ঢুকে গেছে!
যে ছেলেটার নাম রূপ্পন বাবু ওর মন অশান্ত হওয়ার দিন আরও একটা ঘটনা ঘটেছিল—যার সংগে মনের এই অশান্তির কোন সম্পর্ক নেই। অনেকদিন থেকে ছেলেটা টের পাচ্ছিল যে ওর দরকার একটা মেয়েমানুষের। এত বুঝেও ওর ভুল হচ্ছিল যে ওর স্রেফ বেলাকে চাই। তারপর, এই যে ইচ্ছে—যা কীটপতঙ্গ, পশুপাখির মধ্যে বিশেষ বিশেষ মরশুমে আর মানুষের মধ্যে সময়ে অসময়ে জেগে ওঠে-- সেটাকে ও ‘প্রেম’ নাম দিল। এটা অবশ্যি কবিতার জালিয়াতিতে আমাদের অভিধানে ঢুকে পড়েছে। ও ভাবতে লাগল যে ও বেলাকে ভালবাসে; আর পুরো খবর ওর কাছে না থাকায় ধরে নিল যে বেলাও ওকে ভালবাসে! ফের ও বেলাকে একটা প্রেমপত্র পাঠালো, যার জবাব বেলা দেয় নি। তবে সেটার ঠ্যালায় রুপ্পনকেই নানা জায়গায় অনেকবার কৈফিয়ত দিতে হল। এসব বলার সময় ও নিজের জিদ ও ঠ্যাঁটামি বজায় রাখল বটে, তবে মনে মনে ঝাড় খাচ্ছিল। শেষে যেদিন খান্না মাস্টারের মুখে শুনল যে বেলা ও বদ্রী পালোয়ানের ভেতরে ভেতরে ইন্টুমিন্টু চলছে এবং বদ্রী ওকে বিয়ে করবে সেদিন ওর মনের ছাটফটানি খুব বেড়ে গেল। আর কী করে যেন, সেই ছটফটানি ওকে প্রিন্সিপাল, বৈদ্যজী, বদ্রী পালোয়ান, শনিচর—সবার বিরুদ্ধে নানারকম উল্টো সিধে ভাবতে আতুর করে দিল।
এতদিন ও বাস্তবতা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল, এবার ও নিজের জীবনের বাস্তবতা কী সেটা দেখতে পেল।
একই সময় অন্য ছেলেটারও জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল। বুঝল খালি শোষণ ও অত্যাচারের ইতিহাস মুখস্থ করে কিছু হবে না। গাধার পিঠে সমস্ত বেদ, উপনিষদ, আর পুরাণের বোঝা চাপিয়ে দিলে সে বড়জোর আন্তর্জাতিক বিদ্বান পরিষদের সভাপতি হবে, তবুও মনুষ্য পদবাচ্য হবে না। তার জন্যে দরকার বিদ্যার ভার বহন না করে অন্য কিছু করা। খান্না মাস্টার রূপ্পনবাবুকে বদ্রী পালোয়ানের প্রেমকাণ্ড শোনানোর আগে আরও একটা কথা বলেছিল। এসব হয়েছিল হোলির তিন দিন পরে চাঁদ উঠলে এবং রাস্তার ধারের পুলিয়ায় বসে—সেই পুলিয়া, যেখানে বসে একদিন রঙ্গনাথ ওকে ছাতে একা শোনার বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা বলেছিল।
সেদিন খান্না মাস্টারের সংগে মালবীয়ও ছিল। ওরা আগে থেকেই পুলিয়ায় বসে ছিল। রুপ্পন বাবু হোলি উৎসবের দিন থেকে সমানে ভাঙ খেয়ে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। তাই শরীরের ক্লান্তি দূর করতে আবার ভাঙ খেয়ে রঙ্গনাথের সংগে একটু পায়চারি করতে বেরিয়েছেন। পুলিয়ায় দুটো লোককে বসে থাকতে দেখে স্বাভাবিক অভ্যাসে হাঁক দিলেন—“কৌন হ্যায় বে”? কে রে ব্যাটাচ্ছেলে?
“কে রুপ্পন বাবু? নমস্কার রঙ্গনাথজী, আমি খান্না”।
“আরেকজন কে”?
“মালবীয়। নমস্কার রূপ্পন বাবু! আসুন, বসে পড়ুন”।
মাস্টারদের অভিবাদনের উত্তরে রূপ্পন একটা যেমন তেমন জবাব দিয়ে পুলিয়ার উপর বসে পড়লেন। ‘বিগ ফোর’ এর বৈঠক শুরু হল।
রাত ন’টা; কিন্তু কোথাও কোন শান্তি নেই। তহসীল অফিসের সামনের পান দোকানের রেডিও বেজেই চলেছে। আর ফিল্মি গানের নল থেকে ভর ভর করে বেরিয়ে আসছে ‘অরমান, সাজনা, হসীন, জাদুগর, মঞ্জিল, নজর, তু কঁহা, সীনা, গলে লগা লো, গলে লগ যা, মচল -মচলকর, আঁধিয়া, গুম, তমন্না, পরদেশী, শরাব, মুস্কান, আগ, জিন্দগী, মৌত, বেরহম, তসবির, চাঁদনী, আসমাঁ, সুহানা সপন, জোবন, মস্তি, উভার, ইন্তজার, বেজার, ইসরার, ইনকার, ইকরার”---- গোছের শব্দাবলী আর রাস্তায় ঝরে পড়ছে। এসব না খেতে পাওয়া দেশের নবজাগরণের খবর দেয়ার জন্যে সর্বথা উপযুক্ত। এই কলকল করে ঝরতে থাকা গানের আওয়াজ দিক দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ছে। এদের পুলিয়াতেও হাওয়ার ঢেউয়ে কিছু ভেসে আসছে। আশপাশে শোনা যাছে শেয়ালের ডাক।
এটাই প্রমাণ হচ্ছে যে ওদের দলবেঁধে থাকার প্রবৃত্তি বেশ জোরদার। গ্রামের চারপাশের জঙ্গল কেটে সাফ করা হলেও—নিজের বাসভুমি থেকে বিতাড়িত ইহুদীদের মত—এরাও কোন একটা জায়গায় বসতি স্থাপনের জন্যে আন্দোলন গোছের কিছু করতে উৎসুক। কিন্তু এই সম্মিলিত শিবারব ছাপিয়ে শোনা যায় আরেকটা আওয়াজ-- হর্ন বাজাতে বাজাতে ঘন্টায় সত্তর মাইল বেগে শহরের দিকে ধাবমান ট্রাকের সারি।
রাত বাড়ছে। শহরের কোন শস্তা বারে রামের বোতল গড়াগড়ি যাচ্ছে, কোন ঢাবায় গোস্ত ও গরম তন্দুরী রুটি তৈরি হচ্ছে, আর কোথাও কোন ছুঁড়ি বিড়ি টানতে টানতে আমার অপেক্ষায় আছে---এইসব কল্পনা শ’ দু’শ মাইল দূর থেকে ট্রাক চালিয়ে আসা ড্রাইভারকে উত্তেজিত করতে এবং প্রাণপণে অ্যাকসিলেটরে পায়ের চাপ বাড়াতে যথেষ্ট। ফলে, প্রত্যেক পাঁচ মিনিটে কোন ট্রাক ঘরঘরিয়ে রাস্তা দিয়ে যায় আর সেই সময় পুলিয়ায় বসে থাকা আমাদের পরিচিত চার মহাপুরুষ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যান। ট্রাক চলে গেলে ‘জোর বাঁচা বেঁচেছি’ ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে ফের নিজেদের অসমাপ্ত আলোচনা চালিয়ে যান।
এতসব বাধাবিপত্তির মধ্যেও আলোচনা এগিয়ে যায়। খান্না মাস্টার দুখী স্বরে রুপ্পন ও রঙ্গনাথের কাছে সাহায্যের আবেদন করতে থাকেন। পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে রুপ্পন বাবুকে বলেন—‘এই দেখুন, আপনার প্রিন্সিপাল কীসব লিখেছে’।
রুপ্পন ,” আমি অন্ধকারে পড়তে পারি না। আপনি পারেন তো শুনিয়ে দিন”।
খান্না মাস্টার মুখে মুখে চিরকুটের সারাংশ শোনাতে লাগলেন। কথা উঠেছে মালবীয় স্যারের চালচলন নিয়ে। চিরকুটের কথা বিশ্বাস করলে মেনে নিতে হবে যে মালবীয় মাস্টার ছাত্রদের খুব ভালবাসেন। সেই ভালবাসা কোন কোন ছাত্রের সংগে একেবারে শারীরিক স্তরে প্রকাশ পায়। ওতে বেশ কিছু ঘটনার বর্ণনা আছে। যেমন, মালবীয় একটি ছাত্রকে শহরে নিয়ে সিনেমা দেখিয়ে ওর সংগে রাত কাটিয়ে ওকে আগামী পরীক্ষায় কেমন প্রশ্নপত্র হবে তার নমুনা দিয়ে তবে শিবপালগঞ্জে ফিরেছেন। চিরকুটের উদ্দেশ্য আদৌ সাহিত্যচর্চা নয়, বরং জনতাকে সত্যের সংগে পরিচয় করিয়ে দেয়া। তাই বর্ণনা শৈলী স্পষ্ট, সোজা সাপটা এবং কোথাও কোথাও একেবারে ক্যাওড়ামার্কা। এতে প্রিন্সিপাল এবং ম্যানেজারকে নিবেদন করা হয়েছে –যেন ওইরকম মাস্টারকে কান ধরে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হোয়া
খান্না মাস্টার সংক্ষিপ্ত সংবাদ শুনিয়ে রূপ্পনকে বললেন—“এরপরেও বলবেন আমরা মুখ বন্ধ করে থাকব? প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে কিছু বলব না”?
রুপ্পন বাবু ভাঙের নেশায় বললেন, “কী করার ইচ্ছে”?
“আমাদের কাছে পাক্কা প্রমাণ আছে যে কাগজটা প্রিন্সিপালই ছাপিয়েছে। আমরা ওর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করব”।
রঙ্গনাথ বলল, “কী লজ্জার কথা”!
রুপ্পনবাবু বেপরোয়া ভাবে বললেন, “দেখুন, সত্যি কথা হল মালবীয়ের সম্বন্ধে এরকম কিছু কথা আগেও শুনেছি। একটা ছেলে আমাকেই জানিয়েছিল যে মালবীয় স্যার আমাকে সিনেমা দেখাবেন বলছেন”---।
ওনার কথার মাঝে এক অদ্ভুত আওয়াজে বাধা পড়ল। মালবীয় জোরে জোরে নাক ঝাড়ছেন। এবার সবাই জানতে পারল যে উনি এতক্ষণ চুপটি করে মুখটি বুজে বসেছিলেন।
খান্না মাস্টার গরম হয়ে বললেন, “এই, এটাই! ক্যারেকটার অ্যাসেসিনেশন। একজন ভালমানুষকে এভাবে বদনাম করা। আপনার থেকে সহানুভুতি পাব ভেবেছিলাম। আর আপনিও এ’রকম উল্টোপালটা বলছেন”।
রূপ্পনবাবু নির্দয়, “আমি যা শুনেছি তাই বললাম। মাস্টাররা এসব করেই থাকেন। নালিশটা সত্যি হলেও বলব কোন নতুন কিছু নয়। তবে আমি এই নিয়ে চিরকুট ছাপানো পছন্দ করি না। আপনারা নিশ্চিন্ত হোন, আমি এর খোলাখুলি প্রতিবাদ করব”।
খান্না আরও উত্তেজিত হয়ে বললেন, “রুপ্পন বাবু, আপনি একই কথা বলে যাচ্ছেন—আমি এর প্রতিবাদ করি। এটা মালবীয়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচার। চরিত্রহনন! কেউ কিছু একটা বললেই হল? এটা কোন কথা হল”?
উনি বলতে থাকেন, “লোকের কথা যদি ধরতেই হয়, সে তো বদ্রী পালোয়ানের বিষয়েও বলা হয়। কত কী আবোলতাবোল! কই, আমি তো বিশ্বাস করি নি”!
এবার রঙ্গনাথ প্রশ্ন করে, “বদ্রীদাদা! ওনার সম্বন্ধে কে কী ফালতু কথা বলছে”?
খান্না মাস্টার এবার এদিক সেদিক করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বদ্রী পালোয়ানের প্রেমকান্ড শোনাতে থাকে। এসব ও কোন ছাত্রের থেকে শুনেছে। সেই ছাত্র আখড়ার কোন পালোয়ানের থেকে শুনেছে। আর সেই পালোয়ানো কারও না কারও মুখ থেকে শুনেছে---। খান্না মাস্টার যা বলল তাতে দুটো আরও লেজুড় যোগ করে দিল। যেমন, গয়াদীন মেয়ের বিয়ে না দিয়েও সাত আট মাস পরে দাদু হতে চলেছে এবং রুপ্পনবাবু উপহার হিসেবে এক ভাইপো পাবেন।
খবরের ঝটকা এমন জোরদার যে রুপ্পন পুলিয়া থেকে নালায় পড়ে যাচ্ছিলেন। রঙ্গনাথ চাপা দিতে গিয়ে বলল—এসব কিছু না। ভাঙের নেশা। কিন্তু সবার কাছে এটা স্পষ্ট –রুপ্পন বাবু হড়বড়িয়ে গেছেন। একেবারে হতভম্ব। একটু পরে সামলে উঠে মানস্ নেত্রে এমন অনেক কিছু দেখলেন যা আগে খেয়াল করেন নি। মনে পড়ল, বদ্রী পালোয়ান ইদানীং ছাতে গিয়ে ব্যায়াম করার নামে অনেকক্ষণ লাগায় এবং ছাতের দরজা বন্ধ করে রাখে। এবার ওনার কাছে স্পষ্ট হল কে সেই মেয়ে যে সেদিন রাতে রঙ্গনাথের খাটিয়ায় কে এসেছিল।
রুপ্পন বাবুর এবার ভাঙের গরম অসহ্য বোধ হল। অস্থির হয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। রঙ্গনাথ এবং খান্না মাস্টার প্রিন্সিপাল এবং তার চ্যালা-চামুন্ডার বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১০৭ ধারায় মামলা করার ব্যাপারে চর্চায় মগ্ন। খান্না আত্মকরুণার মহাকাব্যের এক নতুন অধ্যায় রচনা করতে শুরু করল। রুপ্পন বাবু খানিকক্ষণ চুপ করে সঙ্গীসাথীদের মন দিয়ে দেখছেন। চোখে পড়ল খান্না মাস্টার আগের চেয়ে রোগা হয়েছেন। আর মালবীয়, মনে হচ্ছিল চুপ করে বসে আছেন, আসলে চুপ নয়—ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।
রুপ্পনের খুব রাগ হল, তবে কার উপরে সেটা স্পষ্ট নয়। তার সংগে এই মাস্টারদের উপর এবং নিজের উপরেও বড় দয়া হল। উনি এবার প্রিন্সিপালকে তেড়ে গাল দিতে শুরু করলেন। রঙ্গনাথ মাস্টারদের বোঝাতে চাইল যে –কিছু না, ভাঙের প্রভাব। কিন্তু রুপ্পন ওকে এক ধমকে থামিয়ে দিলেন।
শহরের এক কোণায় উঁচু পাঁচিলে ঘেরা একটি লম্বা-চওড়া বাংলো। ওর আকার প্রকার দেখে মনে হয় কোন তালুকদারকে ভাড়ায় থাকতে দেয়া হয়েছে। বাংলোর এক কোণায় একটি কামরায় জেলা বিদ্যালয়- পরিদর্শকের অফিস, বাকি অংশে ওনার আবাস। অফিসের পুরো ভাড়া আধিকারিক মহোদয় নিজের বাড়ির নামে দেখাতেন। এইরকম ‘মৈত্রীপূর্ণ-সমঝোতা’কে ইংরেজিতে বলে ‘অফিস-কাম-রেসিডেন্স’। হিন্দিতে বলে ‘ অফিস-কম-রেজিডেন্স-জ্যাদা’।
ওই দপ্তর থেকে, মানে কোণের কামরাটি থেকে বৈদ্যজী, প্রিন্সিপাল সাহেব এবং রুপ্পন বাবু বেরিয়ে এলেন। বাইরে থেকে দেখলে লোকে ভাববে তিনটে চোর বাংলোর ভেতর কিছু কম্মো সেরে বাথরুমের দরজা দিয়ে কেটে পড়ছে। পাঁচ দশ পা হাঁটার পর ওদের চলার গতি মন্থর হল। ওঁরা এদিক ওদিক তাকিয়ে লনের মাপজোক এবং বাগানের শোভা দেখতে লাগলেন। পোর্টিকো দেখে রুপ্পন বললেন, “মনে হচ্ছে ইন্সপেক্টর সাহেবের গাড়িটার একেবারে জর্জর অবস্থা”। প্রিন্সিপাল একনজর বুলিয়ে মন্তব্য করলেন,”হয়ত গাড়ি র ভাতা আটকে গেছে”।
“তাই”, রুপ্পন বললেন, “যাই হোক, খুব ঠাট। সবকিছু ফোকটে”।
ফটকের কাছে চাপরাশি দেখা দিল। প্রিন্সিপালকে দেখে ও এক বিশেষ কায়দায় মুখ বাঁকালো। প্রিন্সিপাল আর এক ধরণের ভেঙচি কেটে মাথা গোল গোল ঘোরালেন। চাপরাশি তৃতীয় কায়দায় মুখ বাঁকালো। প্রিন্সিপাল এবার পকেট হাতড়ে একটা আধুলি বের করে ওকে দেবার সময় বললেন, “ভাই, প্রত্যেক বার যদি এমনি করে—“।
চাপরাশি নরম গলায় বলল, “আপনাদের দয়াতেই করে খাচ্ছি”।
রুপ্পন বাবু বললেন, “এতে কোন সন্দেহ আছে”?
বৈদ্যজী এসব কড়া চোখে দেখলেন এবং রাস্তায় নামলেন। রুপ্পনবাবুর ফুর্তিতে কোন ফারাক হয় নি। বরং প্রিন্সিপালকে হালকা মেজাজে জ্ঞান দিলেন, “এসবের জন্যে দু’আনা দিলেই হয়। আট আনায় দুটো পান খাওয়া যেত”।
এটা শহরের সেই এলাকা যাকে ইংরেজ সিভিল লাইনস্ নাম দিয়ে উত্তরাধিকারী ও মানসপুত্রদের জন্যে ছেড়ে গেছে। রাস্তায় লোকের চলাফেরা খুব কম। কখনও সখনও দু’একটা ঝকঝকে মোটরগাড়ি—সে সরকারি হোক, ধারে পাওয়া হোক, অথবা ফোকটে—ঝাঁ করে চলে যায়। পথচারীরা ভাগ্য ও ভগবানের দয়ায় বেঁচে গেলে খুশি মনে একধারে সিঁটিয়ে যায়। কখনও কোন জর্জর চেহারার প্রাইভেট কার খড়খড়িয়ে ধীরে ধীরে চলতে থাকে। দেখলেই মনে হয় ভাতা-টাতা না পেয়ে রোগা, অসুস্থ, অ্যানিমিয়াগ্রস্ত।
বিকেল হয়েছে, চারটে বাজে। চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি আদমি উঁচু পদের সরকারি অফিসারের বাচ্চাদের নিজের সাইকেলে বসিয়ে কির কির করে ঘন্টি বাজিয়ে চলছে। বাচ্চারা ইংরেজি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে। সবারই তাড়া যে বাড়ি গিয়ে কোন মহান বার্তা পৌঁছাতে হবে। দুটো বাচ্চা তর্ক জুড়েছে, বিতর্কের বিষয় একটি বার্তা—“কাল যদি তোমার মাম্মি তোমায় দ্বিতীয় ড্রইংকপি কিনে না দেয় তাহলে তুমি পনিশ পাবে’। ওদের একজন সাইকেলের বসেছে সামনের ডান্ডাতে, অন্যজন পেছনের ক্যারিয়ারে। ওদের মাঝখানে সাইকেলের সীটের উপর একজন উর্দি পরা চাপরাশি।
প্রিন্সিপাল সাহেবের দুটো হাত ওনার পকেটে ঢুকে গেল। মানে উনি ছোট মুখে কোন বড় কথা বলার জন্যে তৈরি হচ্ছেন। বললেন, “ভাবছি আগামী জুলাই থেকেই আমাদের কলেজে ছেলেগুলোর জন্যে ইউনিফর্মের চলন শুরু করলে কেমন হয়”?
“উত্তম প্রস্তাব”, বৈদ্যজী সায় দিলেন।
একটু পেছনে চলতে চলতে রুপ্পন বাবু প্রিন্সিপালকে বললেন, “কোন ইউনিফর্ম চালাতে চাইছেন—চাপরাশির উর্দি? নাকি বাচ্চাগুলোর”?
‘রুপ্পনবাবু, আমি পুরোদস্তুর সোশ্যালিস্ট। আমার চোখে দু’য়ে কোন ভেদ নেই”।
“আমি তো আপনাকে জুড়ে দিচ্ছি। তিনেও কোন ভেদ নেই”।
ওরা খানিকক্ষণ চুপচাপ হাঁটছিলেন। হঠাৎ প্রিন্সিপাল বৈদ্যজীকে বললেন, “ইনস্পেক্টর সাহেবের ঘর থেকে ঘিয়ের খালি টিন ফেরত আসে নি”।
বৈদ্যজীর চলার ভঙ্গি বেশ গম্ভীর। কিছু ভেবে নিয়ে বললেন, “তা দশ সের ঘি হবে। যখন এতখানি ঘি দিয়েছ, খালি টিন নিয়ে কিসের দুঃখ”!
প্রিন্সিপাল হেসে ফেললেন, “যেতে দিন। যখন গরুটাই চলে গেছে তখন বাঁধার দড়ি নিয়ে কেন আফশোস”!
“সেটাই তো কথা”, বৈদ্যজী আরও গম্ভীর। এবার কথক ঠাকুর হয়ে কথা ফেনাতে লাগলেন। “ যখন হাতি দান হয়ে গেছে, অংকুশ নিয়ে কিসের চুলোচুলি! রাম যখন বিভীষণের রাজতিলক করলেন, তখন জাম্বুবান বললে—মহারাজ, গোটা রাজপাট দিয়ে দিলেন? নিজের জন্যে একটা ভবন তো রেখে দিতেন?
তাতে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রজী মহারাজ বললেন—‘হে জাম্ববন্ত, বিক্রীতে করিণি কিমঁকুশে বিবাদঃ’? হাতি বেচার পর অংকুশ নিয়ে কেন ঝগড়া করা”?
প্রিন্সিপালের মন থেকে একটা কাঁটা বেরিয়ে গেল। কোন উঁচুদরের ভাগ্যবাদীর মত মাথা নাড়িয়ে বাহাদুরি দেখিয়ে বললেন, “তাহলে এটাই ঠিক। যেতে দিন। একটা খালি টিন পেয়ে হবেটা কী”?
রুপ্পন বাবু বললেন, “তবে কথাটা নীতি হিসেবে ভুল। ওনার উচিত ছিল খালি টিন ফেরত দেয়া। প্রত্যেকবার একটা করে নতুন টিন! আসবে কোত্থেকে”? উনি বেশ উৎসাহ দেখিয়ে প্রিন্সিপালকে বললেন, “দেখুন, আপনার যদি ফেরত চাইতে সংকোচ হচ্ছে, আমাকে হুকুম দিন। আমি গিয়ে ফেরত নিয়ে আসব”।
কিন্তু ওনাকে কেউ হুকুম দিল না।
(চলবে)










