Next
Previous
0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়

Posted in

(১.১) মহাপুরুষদের জীবনী

আমাদের ছোটবেলায় একজাতের বই বাড়িতে এবং স্কুলে অবশ্য পাঠ্য ছিল –

মহাপুরুষদের জীবনী। তাতে ক্ষুদিরাম, নেতাজি ও সূর্য সেনের মত স্বাধীনতা

সংগ্রামী, রামমোহন, বিদ্যাসাগর ও আম্বেদকরের মত সমাজসংস্কারক,

রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্রের মত সাহিত্যিক এবং চৈতন্য, রামকৃষ্ণ

ও বিবেকানন্দের মত ধর্ম সংস্কারক সকলেই একসারিতে জায়গা পেতেন।

এঁদের জীবনীর একটি ছাঁচ আছে। এঁরা কোন বিশেষ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে

প্রেরিত। এঁদের জন্মসূত্রেই প্রতিভার স্ফুরণ দেখা যায়। এঁরা কখনও ভুল করেন

না। কাজেই ভুল স্বীকার করার প্রশ্ন ওঠে না।

এঁরা মহাপুরুষ কেন? দুটো কারণে।

এক, এঁদের রাস্তা কখনোই মসৃণ নয়, বরং কাঁটায় ভরা। কিন্তু সব প্রতিকূলতা সব

বাধা দু’হাতে সরিয়ে এঁরা এগিয়ে চলেন।

দুই, এঁরা কখনও ক্ষুদ্র স্বার্থে আদর্শের সঙ্গে আপস করেন না। তাই আর্থিক

কষ্ট এঁদের নিত্যসঙ্গী আর পরিবার, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সবাই এঁদের ভুল

বোঝে। ফলে অধিকাংশ সময় এঁরা বড় নিঃসঙ্গ।

আমরা এঁদের আদর্শ জীবনী পড়তে পড়তে বড় হই। এবং বড় হতে হতে বুঝে যাই

ওই আদর্শ চরিত্র ঠিক আমাদের মত অকিঞ্চনের মডেল নয়। ওঁরা অনেক উঁচুতে

বসে আছেন। হাত বাড়িয়ে নাগাল পাওয়া দুষ্কর। তাঁদের আমরা পুজো করি, কিন্তু

তাঁদের মত হওয়া? সে বড় কঠিন। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদেরও অমন আদর্শ

মানব বা মহামানব হতে বলি না। জানি, ওঁরা ক্ষণজন্মা, সবাই চাইলেও অমন হতে

পারবে না। আমরা পদে পদে আপস করি। আমাদের জীবন বৈপরীত্যে ভরা। ওঁদের

জীবন সোজা সপাট, কোন ধূসর এলাকা নেই।




আজও অধিকাংশ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তীতে

তাঁদের প্রণাম জানিয়ে ইতিকর্তব্য সারে। তাঁদের কর্মজীবন বা লেখাপত্রকে

অনুধাবন করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে না। তাই ওঁদের মাথার পাশের

জ্যোতির্মণ্ডল অপরিবর্তিত থাকে। তাঁরা পূজনীয়, তাই তাঁদের যাপিত জীবন বা

তাঁদের উত্তরসূরীদের জন্যে বাতলে দেয়া পথ নিয়ে ঠিক বা ভুল কোন প্রশ্ন

তুললেই ভক্তকুল রে রে করে ওঠেন। কার সম্বন্ধে কথা বলছে, জান? সাহস তো

কম নয়! এ তো মহাপুরুষদের স্ট্যাচুতে কালি লেপে দেয়া!

সে গান্ধীজির নোয়াখালি যাত্রায় যৌনশক্তি নিয়ে অসংবেদনশীল পরীক্ষা-

নিরীক্ষাই হোক, বা নেতাজির প্রেমপত্র। খেয়াল করি না প্রথমটির উৎস

যাত্রাসঙ্গী নির্মল কুমার বসুর দিনলিপি যা তিনি লিখেছিলেন গান্ধীজিকে

জানিয়েই। দ্বিতীয়টির সমর্থন মেলে সুভাষের জার্মান স্ত্রীর কন্যা অনীতা বসুর

থেকে।

এতসব সাতকাহনের একটাই কারণ। সদ্য পড়ে শেষ করেছি একটি বই যা আমাকে

বিচলিত করেছে। বইটির নাম “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের

আখ্যান”। লেখক দেবোত্তম চক্রবর্তী, এটি সম্ভবত তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ

প্রকাশিত বই। চারশ ছত্রিশ পাতার রুচিসম্মত অলংকরণ করা হার্ডকভার

বইটির দাম ৬২০/- টাকা, প্রকাশক - কলাবতী মুদ্রা।

(১.২) আমি কেন বিচলিত?

আমি বড় হয়েছি বিদ্যাসাগরকে প্রায় বীরপুজো করে। উনি বীরসিংহের সিংহশিশু;

মার সঙ্গে দেখা করতে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দামোদর সাঁতরে পার হয়েছেন।স্কুলের

পাঠ্যবইয়ে পড়েছি তিনি নারীজাতির প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব করেন। তাই

বহুবিবাহ বন্ধ করানো, বিধবার বিয়ে দেয়ার জন্যে গোঁড়াদের সঙ্গে লড়ে আইন

পাশ করানো -সব করেছেন। এঁর জন্যে তাঁর উপর শারীরিক হামলাও হয়েছে। তারপর

জেনেছি বাংলাভাষাকে দাঁড় করানোর জন্যে উনি প্রাইমার লিখেছেন। তাতে ‘জল

পড়ে, পাতা নড়ে’র সহজ চিত্রময়তা ও সংগীতে রবীন্দ্রনাথও মুগ্ধ। শুধু এটুকুই

নয়, কলেজ স্তরে বাংলা শেখানোর যে পাঠ্যবই লিখেছেন তাতে ইতিহাস,

মহাপুরুষদের লাইফ স্কেচ, সীতার বনবাস বা অভিজ্ঞান শকুন্তলম থেকে অনুবাদ

সবই আছে। এবং তাঁর হাত ধরে বাংলা ভাষাও ক্রমশ ‘এই সেই জনস্থানমধ্যবর্তী




প্রস্রবণ গিরি। ইহার শিখরদেশ সততসঞ্চরমাণ জলধরপটলসংযোগে’ থেকে সরল

এবং প্রসাদগুণ সম্পন্ন হয়েছে, বিশেষ করে ‘প্রভাবতী সম্ভাষণে’।

তারপর জেনেছি উনি ব্যালান্টাইন সায়েবকে চিঠি লিখে সাংখ্য ও বেদান্তকে ভুল

দর্শন বলে তার অ্যান্টিডোট হিসেবে মিলের লজিক পড়াতে রেকমেন্ড করেছেন।

আমার যৌবনের বামপন্থী মন উড়ুনি গায়ে দেয়া তালতলার চটি পরা ব্রাহ্মণ

পণ্ডিতের মধ্যে এক ব্যতিক্রমী প্রায় অজ্ঞেয়বাদী বা সংশয়বাদী আধুনিক

মানসকে দেখতে পেল।

এখানেই শেষ নয়। অবধারিত ভাবে আসবে তাঁর চরিত্রের দার্ঢ্য ও ধারাবাহিকতার

প্রসঙ্গ। সেই ঔপনিবেশিক সমাজে ইংরেজি শিক্ষায় দীক্ষিত মানুষজন যখন

শাসক ইংরেজের সায়েবদের মোসায়েবি করতে ব্যস্ত, তখন এই ইংরেজি জানা

মানুষটি কখনই বুট-হ্যাট-কোটে সায়েব হওয়ার চেষ্টা করেননি। বরং এক সায়েবের

বুটজুতো ট্রেনের জানলা গলিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন! দরকার পড়লে সদর্পে দেশের

রাজন্যদের নাকে চটিজুতো পরে টক করে লাথি মারতে পারেন!

ফলে আমার কৈশোরপরবর্তী মানসে উনি একাধারে কলোনিয়াল প্রভু এবং দেশি

সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে এক আপসহীন প্রতিবাদী চরিত্র। আর প্রথম বিধবা

বিবাহ দিলেন ছেলে নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে। একেবারে আপনি আচরি ধর্ম!

তারপরে শেষ জীবনে পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছেদ। ‘আপনজনে ছাড়বে তোরে তা বলে

ভাবনা করা চলবে না’। কলকাতা ছেড় কার্মাটারে সাঁওতালদের মধ্যে জীবন

কাটানো! একাকী বিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ ট্র্যাজিক নায়ক। আমার পছন্দের মহাপুরুষ।

যাঁর কথায় কাজে ফাঁক নেই, ফাঁকি নেই। কিন্তু উপরের বইটি আমার সযত্নে

লালিত এতদিনের বিশ্বাসের গোড়া ধরে টান দিয়েছে। বিভিন্ন তথ্য ও বিশ্লেষণ

দিয়ে দেখাতে চাইছে যে উপরের অনেকগুলো আখ্যান ভক্তজনের তৈরি মিথ,

অতিকথন বা প্রেক্ষিত থেকে আলাদা করে টেনে মানে করা, চটজলদি সিদ্ধান্ত

নেয়া। আমার প্রাথমিক মনস্থিতি হোল বিরক্তি। বিদ্যাসাগরকে নিয়ে টানাটানি

কেন? লোক কি কিছু কম পড়িয়াছে?

(১.৩) ‘তুমহারা পলিটিক্স ক্যা হ্যায় পার্টনার’?

কিন্তু ইদানীং ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে খোদ

আমেরিকাতেও যখন অনেক মহাপুরুষের মূর্তি ধরা টানা হচ্ছে তাহলে পরাধীন




ভারতের মহাপুরুষরা কেন বাদ যাবেন? বিদ্যাসাগর, রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্র ও

রবীন্দ্রনাথ? নতুন তথ্যের আলোকে ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন অবশ্যই কাম্য।

ইতিহাস সব সময়েই ক্ষমতার ইতিহাস, বিজয়ীরা লেখে। অন্য স্বর চাপা পড়ে যায়।

তাহলে সব ইতিহাস লেখনেরই অ্যাজেন্ডা থাকে। ভিন্সেন্ট স্মিথ আর রমেশচন্দ্র

দত্ত, যদুনাথ সরকার বা রমেশচন্দ্র মজুমদারের লেখা একরকম হতে পারেনা।

দু’দলেরই নিজস্ব অ্যাজেন্ডা (কলোনিয়াল বনাম অতীত গৌরবগাথা) অনুযায়ী

নিজস্ব অতিকথনের ঝোঁক থাকে। তাহলে চক্রবর্তী মশায়ের অ্যাজেন্ডাটি কী?

আধুনিক হিন্দি কবিতার সবচেয়ে উঁচু আসনে যাকে অকাদমিক দুনিয়া বসিয়ে

রেখেছে তিনি হলেন ছত্তিশগড়ের গজানন মাধব মুক্তিবোধ। রাজনৈতিক বিশ্বাসে

সাম্যবাদী কিন্তু কবিতার আঙ্গিকে সুকান্ত-সুভাষ নয়, বরং বিষ্ণু দে-অরুণ মিত্র

ঘরানার।

বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তাঁর বহু উচ্চারিত একটি বাক্য হল -

‘তুমহারা পলিটিক্স ক্যা হ্যায় পার্টনার’? একই প্রশ্ন ছিল আমারও, তবে গোটা

বইটি বার দুই পড়ার পর আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে ইনি বাংলার কলোনিয়াল

হিস্ট্রির অপর স্বরের নির্মাণে ব্যস্ত। এঁদের প্রেমিসগুলো মোটামুটি এইরকম:

১) বৃটিশ কলোনিপ্রভুরা বাণিজ্যিক লুঠের স্বার্থে যেমন ভারত তথা বাংলাদেশের

কৃষি ও হস্তশিল্পের বারোটা বাজিয়েছে, তেমনই পরম্পরাগত শিক্ষা, সমাজনীতি

ইত্যাদিকেও নিজেদের স্বার্থে ঢেলে সাজিয়েছে।

২) আমরা, মানে কলোনিয়াল রুলের বাইপ্রোডাক্ট মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালিরা,

ওদের প্রবর্তিত রেল, ডাক, যাতায়াত, আধুনিক শিক্ষার ফল পেয়েছি ভেবে ধরে

নিই, ওদের হাত না পড়লে আমাদের উন্নতি হত না, আমরা অন্ধকার যুগে পড়ে

থাকতাম। ফলে উন্নতির বিকল্প সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তাই করি নি।

৩) তাই আমরা সতীদাহ ও বহুবিবাহ রদ, হিন্দু কোড এসব নিয়ে খুব খুশি। কিন্তু

একবারও ভেবে দেখি না এরা মাথাব্যথা সারাতে মাথাই কেটে ফেলল কিনা।

৪) কলোনিয়াল অ্যাজেন্ডায় যেমন হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিভাজন বেড়ে

গেল, তেমনই ওদের ভাষা সংস্কারে বাংলা থেকে আরবি, ফার্সি ও অন্যান্য

প্রাকৃত শব্দ ছেঁটে দিয়ে এক কৃত্রিম উচ্চবর্গীয় সংস্কৃত ঘেঁষা বাংলা ভাষা তৈরি

হল তার ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণ ও মুসলমানেরা অবহেলিত হয়ে রইল।




আমাদের কবিতা ও গল্পে এরা হয় অনুপস্থিত, নয় প্রান্তিক চরিত্র। এরা

আমাদের ‘অপর’ হয়েই রইল। আর সেই বিষবৃক্ষের ফল আজ পেকেছে।

বেশ, এতে বিদ্যাসাগর, রামমোহন আদি চরিত্রের কী দোষ? সেটা হল এঁরা এই

গ্র্যান্ড ডিজাইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এঁরা সমাজসংস্কার, শিক্ষাসংস্কারের

নামে যা করেছেন তা কলোনিয়াল প্রভুদের তালে তাল দিতে। সুফল বলতে আমরা যা

পেয়েছি কুফলগুলো পাল্লায় তুললে ওজনে ভারি।

এই হল আমার পূর্বপক্ষ বা লেখকের বক্তব্যের সার - আমি যেমন বুঝেছি।

(২.০) আমার উত্তরপক্ষ

(২.১) লেখকের পদ্ধতি

প্রথমেই বলতে চাই লেখক চিরাচরিত মহাপুরুষের জীবনীর নামে একরৈখিক

মাহাত্ম্য বা কুৎসা রটনার শৈলীটি পরিত্যাগ করে এঁদের একটি নির্দিষ্ট

ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও কালখণ্ডের উপজ হিসেবে দেখেছেন। তাই প্রথমে যত্ন

করে কোম্পানির রাজত্বে খাজনা আদায়ের পদ্ধতি , চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও তার

ফল এবং কীভাবে নব্য জমিদার ও মুৎসুদ্দি বানিয়া শ্রেণির জন্ম ও বিকাশ হল

তা পর্যাপ্ত দস্তাবেজ ও দলিলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। এই প্রারম্ভিক

পরিচ্ছেদগুলি বইটির সম্পদ।

লেখক এই বইটিতে গোপাল হালদারের সম্পাদিত “বিদ্যাসাগর রচনাসংগ্রহ”কে

প্রামাণ্য ধরে তাঁরই অনুসরণে বইটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন -

শিক্ষাসংস্কার, সমাজসংস্কার ও বাংলা ভাষা সংস্কার।

আমরাও পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় ওই ছকটিই অনুসরণ করব।

(২.২) আমার পদ্ধতি

তথ্য -

এই বইয়ে তথ্য এবং তথ্যসূত্র বিস্তারিত ভাবে দেয়া হয়েছে এবং লেখক পরস্পর

বিরোধী তথ্যের মুখোমুখি হলে যা গ্রহণ বা বর্জন করেছেন তার ভিত্তিটুকুও

স্পষ্ট করেছেন। এখানে তথ্যের স্বল্পতা নয় বরং বহু আয়াসে সংগৃহীত তথ্য এত




বেশি রয়েছে যে খেই হারিয়ে যাবার যোগাড়। এর থেকে ছেনে তথ্যের তুল্যমূল্য

বিচার অনেক পরিশ্রম সাপেক্ষ। তাই আমার সীমিত সাধ্যে তথ্য নিয়ে কথা বলা

উচিত হবে না। অতএব, আমি আমার লেখায় উদ্ধৃতি দিলে আলোচ্য লেখকের

বইটিরই পৃষ্ঠা সংখ্যার উল্লেখ করব। এর দুটো দিক। পাঠপ্রতিক্রিয়ায়

বিশ্লেষণ বা যুক্তির ভুল হলে তার দায় নির্দ্বিধায় আমার। কিন্তু তথ্যসূত্রে বা

উদ্ধৃতিতে কোন ভুল থাকলে তার দায়িত্ব লেখক চক্রবর্তী মশায়ের।

আমার কাজ -

আমি দেখব তথ্যের ভিত্তিতে লেখক যে হাইপোথেসিস দাঁড় করাচ্ছেন তার

বিশ্লেষণ, যুক্তিপ্রয়োগ এবং অন্য বিপরীত ব্যাখ্যার সম্ভাবনাগুলো। দেখব

লেখক নিজের অ্যান্টি-কলোনিয়াল অ্যাজেন্ডার জোরে কোথাও কোথাও এমন

সিদ্ধান্ত টানছেন কিনা যাকে স্ট্যাটিসটিক্সের লোকেরা বলেন ‘প্রসিকিউটর’স

বায়াস’।

আমরা দামোদর সাঁতরে পার হওয়ার গল্প নিয়ে মাথা ঘামাব না। বিদ্যাসাগরের

আপন ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের সাক্ষ্যই এসব গালগল্পকে খারিজ করার

জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু দেখব নারীশিক্ষার জন্যে বেথুন ও বিদ্যাসাগরের মডেলের

সাফল্য ও বিফলতা নিয়ে তুলনা। দেখব সেই সময়ে ইংরেজ প্রভুদের আনুকূল্যেই

সই, উত্তরভারতে এবং মহারাষ্ট্রে নারীশিক্ষার জন্যে কী কাজ হচ্ছিল এবং

ব্যালান্টাইন-বিদ্যাসাগর বিবাদে সত্যিই বিদ্যাসাগর বেদান্তের বিরুদ্ধে

পাশ্চাত্যের এনলাইটেনমেন্টের প্রতীক মিলের লজিক পড়াতে চাইতেন কিনা।

দেখব শুধু উচ্চবর্ণের ছাত্রদের জন্যে শিক্ষার দ্বার খুলে দেয়া বিদ্যাসাগরের

জাতিঘৃণার লক্ষণ, নাকি নতুন কোন উদ্যোগ শুরু করার জন্যে আবশ্যক

সমঝোতা।

মধুকবিকে বিদ্যাসাগর জেলে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে টাকা ধার দিয়েছেন।

অমিত্রাক্ষর ছন্দ নিয়ে বিদ্রূপ করলেও একটা স্নেহের টান ছিলই। পরেও

অনেকবার টাকা দিয়েছেন - মধুকবির কবিতায় যার স্বীকৃতি রয়েছে। কখনও

কখনও প্রশ্ন জাগত - কত টাকা ছিল বিদ্যাসাগরের? এবং এই অগাধ আয়ের

উৎস কী?

এ নিয়ে অনেক অজানা তথ্য দিয়েছেন লেখক। তাতে এক ব্যবসাবুদ্ধি সম্পন্ন




সুচতুর ব্যক্তির ছবি ফুটে উঠেছে যা আপাত বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলন এবং

শিক্ষার মশাল জ্বালিয়ে এগিয়ে চলা বাঙালির ছবির সঙ্গে একেকবারেই খাপ খায়

না। আমরা জানি যে বাঙালি ব্যবসাবিমুখ এবং ব্যবসায়ীদের সততাকে সন্দেহের

চোখে দেখে। অতএব এই নির্মাণটিকেও দেখা দরকার যে বিদ্যাসাগর ব্যবসার

ডুবজলে নেমে নিজের কোন সযত্নলালিত মূল্যবোধ ও নীতির সঙ্গে আপস

করেছেন কিনা।

সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে দেখতে হবে নিজের ছেলেকে দিয়ে বিধবাবিবাহ

আন্দোলনের শুরু করেও কী কারণে পিছিয়ে এলেন? এছাড়া লেখক ইংরেজদের

মনুকে কেটে ছেঁটে হিন্দু কোড বিল বানানোয় নারীদের আগের চেয়ে ক্ষতি হয়েছে

বলে অভিযোগ করেছেন — এটা গুরুত্বপূর্ণ, কাজেই নেড়েচেড়ে দেখতে হবে এতে

বিদ্যাসাগরের দায়িত্ব কতটুকু।

সাহিত্য পর্যায়ে দেখব সমসাময়িক মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার, মদনমোহন

তর্কালংকারের তুলনায় বিদ্যাসাগরের সাহিত্যকর্ম ও ভাষার সৌকর্য

নিম্নমানের ছিল কিনা। রচনায় নারীচরিত্র ও প্রান্তিক মানুষেরা কেন অনুপস্থিত

ইত্যাদি।

তাহলে এবার বিসমিল্লা বলে শুরু করা যাক।

(৩.০) কোম্পানিরাজ, চিরস্থায়ী বন্ডোবস্ত এবং শিক্ষা সংস্কার

(৩.১) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

মোঘল আমল থেকে কোম্পানির আমলে, মানে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’র আগে,

জমির খাজনার ব্যাপারটা কেমন ছিল?

লেখক সঠিকভাবে বলছেন - কৃষক এবং রাজা বা রাষ্ট্রের মাঝখানে কোন জমিদার

বা মধ্যস্বত্বভোগী ছিল না। সমগ্র গ্রামের উপর রাজস্ব ধার্য হত, এবং

গ্রামসমাজগুলি রাজস্ব আদায়কারী ‘জমিদারে’র মারফত সমবেতভাবে রাজস্ব

প্রদান করত। ‘রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জমিদার নির্দিষ্ট দিনে গ্রামে উপস্থিত

হয়ে রাজস্ব হিসেবে সমগ্র ফসলের এক-তৃতীয়াংশ আদায় করত এবং এই

আদায়ীকৃত ফসলের এক-দশমাংশ নিজের কাছে পারিশ্রমিক হিসেবে রেখে বাকি

ফসল রাষ্ট্রকে দিতে বাধ্য থাকত’। [1] এর মানে তো দাঁড়াল যে আদায়ীকৃত




ফসলের বাকি নয়/দশমাংশ রাষ্ট্রকে দিতে হবে। উনি ব্যাখ্যা করে বলছেন যে

তখন জমিদাররা জমির মালিক ছিল না, তারা ছিল নিছক সরকারের রাজস্ব

আদায়ের প্রতিনিধি। তাদের নবাব ইত্যাদিরা নিযুক্ত করতেন। এ যেন ডাকু গব্বর

সিংহের প্রতিনিধি এসে গোটা গাঁয়ের থেকে নির্ধারিত আনাজ আদায় করছে!

কিন্তু এরপরেই লেখক বলছেন, ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ঠিক হয় যে,

জমিদারেরা আদায়ীকৃত রাজস্বের নয়-দশমাংশ কোম্পানির কাছে হস্তান্তরিত

করবে। বছরের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই নির্দিষ্ট রাজস্ব কোম্পানির ঘরে

জমা দিলে, জমিদাররা বংশানুক্রমে জমির স্বত্বাধিকারী থাকবে, ভবিষ্যতে জমির

মূল্য যাই হোক না কেন, তাতে তাদের সঙ্গে কোম্পানির রাজস্ব বন্দোবস্তের

কোনও পরিবর্তন হবে না’। [2]

তাহলে কী দাঁড়াল? আগের ও পরের দুটো নিয়মেই জমিদারেরা ‘আদায়ীকৃত ফসলে’র

এক/দশমাংশ নিজের কাছে রেখে বাকি নয়/দশমাংশ রাষ্ট্রকে দেবেন?

তফাৎ কোথায়? চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদাররা স্থায়ী ভাবে জমির মালিক

হলেন। আগে গ্রামে উৎপন্ন ফসলের এক-তৃতীয়াংশ খাজনা হিসেবে আদায় করে

তার ভাগাভাগি হত। এখন জমির মূল্য হিসেব করে তার (ফসলের নয়, জমির

মালিকানা স্বত্বের) স্থায়ী খাজনা নির্ধারিত হলে জমিদারেরা প্রতিবছর

নির্দিষ্ট সময়ে তা কোষাগারে জমা দেবেন, নাহলে মালিকানা হাতছাড়া হয়ে যাবে।

অর্থাৎ আগে রাষ্ট্র আদায় করত ফসলের ভাগ, এখন আদায় করছে জমির

মালিকানার খাজনা জমিদারদের থেকে। সেই খাজনা আবার জমিদারেরা আগেই উশুল

করছে চাষিদের থেকে, তাতে যুক্ত করছে নিজের একটা অংশ।

এটা একভাবে দেখলে এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রামীণ সমাজের উপর ইউরোপিয়

সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো চাপিয়ে দেয়া।

আমরা কী ভাবে দেখছি? কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ? কৃষকদের দিক থেকে দেখলে

দুটোই খারাপ। তাহলে মন্দের ভাল কোনটা? লেখকের মতে আগের ব্যবস্থা-তাতে

যে গাঁয়ে থেকে চাষ করে তারই জমির মালিকানা স্বত্ব ছিল। কী চাষ করবে নাকি

করবে না সেটা সেই ঠিক করত। কিন্তু নতুন নিয়মে জমির মালিক জমিদার, সে

উলটে চাষির থেকে খাজনা আদায় করবে।




আমার মতে দুটো খারাপের মধ্যে ১৭৯৩ সালের ২২শে মার্চে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী

বন্দোবস্ত কম খারাপ। কেন?

এক, এতে ফসলের হিসেবে প্রতি বছর নতুন নতুন খাজনা ধার্য করার বদলে একটা

ফিক্সড খাজনা। জমিদার ও কৃষক উভয়েই জানে কত দিতে হবে, তাতে অ্যানার্কির

বদলে শৃংখলা আসে, অ্যানার্কির দিনে গরিবের ভোগান্তি বেশি হয়।

দুই, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারের খানিকটা দায়িত্ব বা ইনভল্ভমেন্ট থাকে

যাতে চাষটা ভাল ভাবে হয়। ফলে হাল-বলদ-বীজধান ইত্যাদির যোগান এবং

দরকারমত আর্থিক সাহায্য (অবশ্যই চড়া সুদে) দিতে একরকম বাধ্য থাকে।

আগের ব্যবস্থায় এসবই অনিশ্চিত।

লেখক সহমত নন। উনি দেখাচ্ছেন যে ‘কোম্পানি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে

নতুন জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির সৃষ্টি করে, তেমনই তাদের অত্যাচার

ও শোষণ থেকে পরিত্রাণের জন্য অসংখ্য কৃষক সংগ্রামের সৃষ্টি হয়’(নজরটান

আমার)। উদাহরণ হিসেবে লেখক উল্লেখ করেছেন সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ

(১৭৬৩-৭৮), মেদিনীপুরের বিদ্রোহ (১৭৬৬-৮৩), ত্রিপুরায় সমশের গাজির

বিদ্রোহ ( ১৭৬৭-৬৮), সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ (১৭৬৯), কৃষক-তন্তুবায়দের

লড়াই (১৭৭০-৮০), চাকমা বিদ্রোহ (১৭৭৬-৮৭), এবং রংপুর বিদ্রোহ (১৭৮৩)।

[3]

দেখুন, সবক’টি কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

প্রবর্তনের অনেক আগে। বরং এই নতুন ব্যবস্থা শুরু হওয়ার পরে কোন বড়

কৃষক বিদ্রোহের নজির দেখছি না।তাহলে লেখকের যুক্তি পরম্পরা অনুসরণ

করলে কোন সিস্টেমকে মন্দের ভাল বলব?

(৩.২) নতুন মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার ও মুৎসুদ্দিদের উদ্ভব

কেন নতুন করে বড় বিদ্রোহ হল না? এখানে লেখক সঠিক ভাবে আঙুল তুলেছেন

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার ও

মুৎসুদ্দিদের দিকে।

১৭৯৩ সালের ২২শে মার্চ তারিখে লর্ড কর্নওয়ালিশ ‘চিরস্থায়ী বদোবস্তে’র

প্রবর্তন করেন। ঠিক তার আগে ৬ই মার্চ কোম্পানির ডিরেক্টরদের একটি




চিঠিতে লেখেন- ‘ভূমিস্বত্বকে নিরাপদ ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই এদেশীয়দের

হাতে যে বিরাট বিত্ত আছে, তা তারা অন্য কোনও ভাবে নিয়োগ করার উপায় না

পেয়ে ভূসম্পত্তি ক্রয়ের উদ্দেশ্যেই ব্যয় করবে’। [4]

লেখক চমৎকার ভাবে দেখিয়েছেন যে ৪০ বছর পরে লর্ড বেন্টিংক মন্তব্য

করছেন -

‘আমি মানতে বাধ্য যে ব্যাপক গণবিক্ষোভ বা বিপ্লব থেকে নিরাপত্তার প্রশ্নে

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটা বিরাট সুবিধে আছে। অন্ততপক্ষে এর বদান্যতায়

এমন এক বিপুলসংখ্যক ধনী জমিদারশ্রেণী উদ্ভূত হয়েছে যারা বৃটিশ শাসনকে

টিকিয়ে রাখতে প্রচণ্ড আগ্রহী, জনসাধারণের ওপরও তাদের সম্পূর্ণ আধিপত্য

আছে’। [5]

এই সমর্থকদের শ্রেণিবিন্যাসের বিশ্লেষণ করেছেন বিনয় ঘোষ -

‘গ্রাম্যসমাজে নতুন জমিদারশ্রেণী, বৃহৎ একটি জমিদারি-নির্ভর মধ্যসত্বভোগী

ও গ্রাম্য মধ্যশ্রেণী, এবং নাগরিক সমাজে নতুন অর্বাচীন অভিজাত-ধনিকশ্রেণী,

খুদে-ব্যবসায়ী দোকানদার চাকরিজীবী প্রভৃতিদের নিয়ে বড় একটি নাগরিক

মধ্যশ্রেণী এবং তার মধ্যে সোনার চাঁদের মতো একদল ইংরেজিশিক্ষিত ‘elite’।

[6]

(৩.৩) কৃষি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, বঙ্কিম ও বিদ্যাসাগর

মন্বন্তর: ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ(বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর) হয়েছিল

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত্রের প্রায় আড়াই দশক আগে, যার ভয়াবহ বর্ণনা

বঙ্কিমের দেবী চৌধুরাণী ও আনন্দমঠে রয়েছে। এরপরে বাঙালি পেল সোজা

পঞ্চাশের মন্বন্তর যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, ১৯৪২-৪৩ সালে ঘটেছিল।

এর মধ্যে কোন বড় দুর্ভিক্ষ উনবিংশ শতাব্দীতে ঘটেনি। কাজেই আমার মনে হয়

কর্নওয়ালিশ স্থায়ী বৃটিশ স্বার্থে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বংগের

কৃষিতে যে স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন আনেন, কিন্তু তার আপাত সুফল বাংলার

কৃষক পেয়েছে। তাই বড় দুর্ভিক্ষ বা বিদ্রোহ কোনটাই হয়নি।

এই আলোচনাটা জরুরি কেন? এইজন্যে যে এখানে লেখক আঙুল তুলেছেন বঙ্কিম

ও বিদ্যাসাগরের দিকে, তাঁদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গুণকীর্তন করার দোষে।

তার প্রেক্ষাপটে লেখক বলছেন -




‘উনিশ শতকের প্রথম থেকে এদেশে যে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়, তার

সুযোগ প্রধানত গ্রহণ করে এই জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির

প্রতিনিধিরাই। ভুমিরাজস্ব থেকে প্রাপ্ত বিপুল আর্থিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে

পরবর্তীকালে তারা শিক্ষাদীক্ষা, সরকারি চাকরি এবং ডাক্তার-ওকালতি ইত্যাদি

কাজে নিযুক্ত থেকে এক নতুন বুদ্ধিজীবী শ্রেণির সৃষ্টি করে। চাকরি-নির্ভর এই

শিক্ষিত সম্প্রদায়ও স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ অনুরাগী হিসেবে গড়ে ওঠে। তারা

এমন একটি সামাজিক শ্রেণির রূপ গ্রহণ করে, যাদের শ্রেণিস্বার্থ বাঁধা থাকে

ভুমিব্যবস্থার স্রষ্টা, পালক ও রক্ষক ব্রিটিশদের সঙ্গে’। [7]

এইটাই আসল কথা। গোটা গবেষণার ধ্রুবপদ হোল যে বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর,

রামমোহন এবং রবীন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বতন দুই পুরুষ হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের

উপজ নব্য জমিদার বা নব্য মুৎসুদ্দি ধনিক অথবা ইংরেজের চাকরিনির্ভর নব্য

মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ইতিহাসের সাক্ষ্য কী বলে?

অভিযোগ অনেকটাই সত্যি। জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা

রবীন্দ্রনাথের পিতামহ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত দ্বারকানাথ ইউনিয়ন ব্যাংক

স্থাপন করেছিলেন, রানিগঞ্জের কয়লাখনি, জুটমিল,আসামের চা বাগান

কিনেছিলেন, বিমা কোম্পানি, জাহাজ কোম্পানি খুলেছিলেন। এসব আমরা জানি,

কিন্তু সবই ব্রিটিশদের হাত ধরে, তাদের ছোট তরফ হয়ে। ওড়িশা ও পূর্ব বাংলার

জমিদারি ওঁর পালকপিতা রামলোচন পেয়েছিলেন ওই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের

আইনের সুবিধেয়। তথ্য ঘাঁটলে পাওয়া যায় খাজনা আদায়ে দ্বারকানাথ ‘রুথলেস’

ছিলেন।

আবার প্রিন্স দ্বারকানাথের তৈরি দেশের প্রথম অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ম্যানেজিং

এজেন্সির নাম ‘কার, টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি’। কিন্তু যেটা বলা হয় না সেটা

হোল এঁদের প্রধান কাজ ছিল আফিমের ব্যবসা। বঙ্গে তৈরি আফিম লুকিয়ে চিনে

জোগান দেওয়া। আর বঙ্কিমচন্দ্র ও বিদ্যাসাগর ছিলেন অবশ্যই ইংরেজ

সরকারের চাকুরিজীবা - একজন ম্যাজিস্ট্রেট, অন্য জন শিক্ষাবিভাগে বিভিন্ন

পদে।

এরপর লেখক বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে দেখাচ্ছেন

বঙ্কিমচন্দ্র তৎকালীন কৃষিব্যবস্থায় কৃষকদের দুর্দশা সম্বন্ধে সম্যক

অবহিত, লেখনীতে ফুটে উঠেছে হাসিম শেখ-রামা কৈবর্ত-পরাণ মণ্ডলদের দুর্দশা।




কিন্তু লেখকের চোখে এ’সবই কুম্ভীরাশ্রু; কেননা এরপর বঙ্কিম দুটো বক্তব্য

রেখেছেন।

এক, ভাল জমিদার ও মন্দ জমিদারের মধ্যে ফারাক করেছেন, ‘সিস্টেম -অ্যাজ এ

হোল’কে কাঠগড়ায় দাঁড় করান নি।

দুই, চাষির দুঃখকষ্ট দেখেও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পক্ষে কথা বলেছেন।

“চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ধ্বংসে বঙ্গসমাজে ঘোরতর বিশৃংখলা উপস্থিত হইবার

সম্ভাবনা। আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নহি”।

আরও,

“যে দিন ইংরাজের অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হইব, সেদিন সমাজের অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী

হইব, সেইদিন সে পরামর্শ দিব। --- আমরা কেবল ইহাই চাহি যে সেই

বন্দোবস্তের ফলে যে সকল অনিষ্ট ঘটিতেছে, এখন সুনিয়ম করিলে তাহার যত

দুর প্রতীকার হইতে পারে, তাহাই হউক”। [8]

লেখক এবার দেখাচ্ছেন বিদ্যাসাগর কীভাবে দেখেছিলেন চিরস্থায়ী

বন্দোবস্তকে। “চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হওয়াতে, বাঙ্গালা দেশের যে সবিশেষ

উপকার দর্শিয়াছে, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। এরূপ না হইয়া যদি পূর্বের ন্যায়,

রাজস্ব বিষয়ে নিত্যনতুন পরিবর্তের প্রথা থাকিত, তাহা হইলে, এদেশের কখনই

মঙ্গল হইত না”। [9]

গ্রন্থটির প্রথম ভাগের এই দ্বিতীয় অধ্যায়টির শীর্ষক ছিল “হেস্টিংস থেকে

কর্নওয়ালিস, সাহেব ও মোসাহেবদের লুঠ কিসসা”। বিদ্যাসাগরের উপরোক্ত

উদ্ধৃতিটি দিয়ে লেখক ধরে নিয়েছেন তাঁর উপপাদ্যটি প্রমাণিত। তাই শেষ করেছেন

এই বলে - ‘বুঝ লোক যে জান সন্ধান’!

অর্থাৎ,

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ভারতে ইংরাজদের লুঠের ভিত্তি।

বঙ্কিম ও বিদ্যাসাগর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থক।

অতএব, ওঁরা দু’জন ইংরেজের মোসাহেব এবং ওদের লুঠের ভাগীদার।

একেবারে অবরোহ তর্কপদ্ধতির হদ্দমুদ্দ।




আমার উত্তরপক্ষ:

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মোঘল আমল থেকে চলে আসা কৃষি রাজস্বের পদ্ধতির

চেয়ে মন্দের ভাল। লেখকের বর্ণনা থেকেই দেখা গেছে পুরনো ব্যবস্থায়

কোম্পানির রাজস্ব আদায়কারী প্রতিনিধিরা (পড়ুন জমিদারেরা) একেকবছর

একেক রকম দাবি নিয়ে সোজা মাৎসন্যায় শুরু করেছিল। ফলে ছিয়াত্তরের

মন্বন্তর ও একগাদা কৃষক বিদ্রোহ। নতুন ব্যবস্থায় একবার যা খাজনা ধার্য

হয়েছে তাই প্রতি বছর কোম্পানিকে দিতে হবে। ফলে একধরনের অরাজকতা বন্ধ

হোল। মন্বন্তর ও কৃষক বিদ্রোহ হল না। বিদ্যাসাগর সঠিক বলেছেন - ‘যদি

পূর্বের ন্যায়, রাজস্ব বিষয়ে নিত্যনতুন পরিবর্তের প্রথা থাকিত, তাহা হইলে,

এদেশের কখনই মঙ্গল হইত না”।

কিন্তু যে কোন ব্যবস্থারই অন্ধকার দিক থাকে। দেখাই যাচ্ছে বঙ্কিম সে বিষয়ে

যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন যা তাঁর ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ লেখাটির ছত্রে ছত্রে

আছে। তাই সংস্কারের দাবি রেখেছেন। নইলে ইংরেজ সরকারের ডেপুটি

ম্যাজিস্ট্রেটের কী দায় পড়েছিল ওই অন্ধকার দিকের প্রতি আঙুল তোলার?

‘মোসাহেব’ হলে শুধু গুণ গাইতেন, অন্ধকার দিকের কথা তুলতেন না।

লেখকের আপত্তি যে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’ আইন বানিয়েছে বঙ্কিম কেন তার

কাছেই কিছু সংস্কারের আবেদন করছেন?

আমার প্রতিপ্রশ্ন - তা নইলে আর কার কাছে করতেন? অন্য কোন বিকল্প ছিল

কি? থাকলে সেটা কী?

একটা তিনঠেঙে তুলনা টানছি। আজ যে বামপন্থীরা ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলেছেন,

তাঁরাই মমতা সরকারকে বলছেন নিজেদের ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ করতে, ভোট

পরবর্তী হিংসা বন্ধ করতে। এটাই তো স্বাভাবিক। আর কার কাছে এই দাবি করা

যায়?

আজকে ২১ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যেসব বিকল্প ভাবনা আমরা ভাবতে পারি দুশো

বছর আগের কলোনিয়াল ভারতে, তখনও হয়ত দিল্লির তখতে মোগল সম্রাট বা

মাত্র ভিক্টোরিয়া হাতে ক্ষমতা নিয়েছেন — কতদূর সম্ভব ছিল?




বিদ্যাসাগরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থনের কোন বিষময় প্রভাব তাঁর

শিক্ষা সংস্কারে পড়েছিল কিনা তা আমরা দেখব পরের অধ্যায়ে।

(৩.৪) ইতিহাসের আয়রনি

আমার কথা হল সমাজ বা রাষ্ট্র পরিবর্তন খাপে খাপে আপনার আমার কেতাবি

ফরমুলা মেনে হয় না। বিকাশ ও উত্তরণের সর্পিল গতি অনেক ছোট ছোট

সমঝোতার মধ্যে দিয়ে এগোয়। আমাদের ফর্মূলা তার approximation মাত্র।

তাই আয়রনির ছড়াছড়ি। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি।

এক, মজদুরের মুক্তির তত্ত্ব কোন মজদুরের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়, বরং এসেছে

মার্ক্স নামের এক প্রুশিয়ান উচ্চবর্গীয় অভিজাত শিক্ষিত পরিবারের ব্যক্তির

থেকে।

দুই, স্বাধীনতা আন্দোলনের ‘বন্দে মাতরম' নামের ব্যাটল ক্রাই এল ইংরেজের

চাকর এক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের থেকে, যিনি নিজেকে ওপরের প্রবন্ধে বলেছেন

‘ইংরেজের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী’ বলে।

তিন, যিনি জীবনভর পরিশ্রম করলেন শ্রমিকের শোষণের ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের’

তত্ত্বকে দাঁড় করাতে, তাঁকেই ওই ক্যাপিটাল বইটি লেখার সময় খাওয়াপরার

জন্যে বন্ধু এংগেলসের কাপড়ের কলের শেয়ারের ডিভিডেন্ড হিসেবে শ্রমিকের

শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্যের উপর নির্ভর করতে হল।

চার, যে মোহনদাস গান্ধী বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় নিজেকে ব্রিটিশ এম্পায়ারের

মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সাবজেক্ট বলে লিখছেন তিনিই আর দুটো দশক পরে তাকে

বলছেন ‘দ্য ডেভিল’স এম্পায়ার’ এবং ‘কুইট ইন্ডিয়া’র ডাক দিচ্ছেন।

পাঁচ, রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা লেনিনের ‘ইস্ক্রা’ পত্রিকা

প্রকাশের খরচাটি সম্ভব হত প্রধানত সাশা মরোজভ বলে এক পুঁজিপতির

দাক্ষিণ্যে।

এ নিয়ে আমরা আবার কথা বলব লেখাটির সমাপ্তির সময়। আপাতত লেখকের

সমস্ত মূল্যবান পরিশ্রমী সাক্ষ্যের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেও তাঁর সিদ্ধান্তের




সঙ্গে — চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রশংসা করা বঙ্কিম বিদ্যাসাগরেরা ইংরেজের

মোসাহেব - এ নিয়ে একমত হতে পারছি না।