Next
Previous
0

ধারাবাহিক - মনোজ কর

Posted in






















১ম পর্ব - প্রতিকূলতাবিঘ্নিত প্রস্তুতি এবং যাত্রা




প্রস্তুতি

মিনি এখন ইটালির যে ছোট্ট শহরটাতে থাকে তার নাম রেজিও এমিলিয়া। শহরটার

সাইজ ২৩১ বর্গ কিলোমিটার। লোকসংখ্যা ১লক্ষ ৭২হাজার অর্থাৎ জনঘনত্ব

৭৫০জন প্রতি বর্গ কিলোমিটারে। তুলনামূলক ধারণা দেবার জন্য জানাই কলকাতা’র

(মেগাসিটি) আয়তন ২০৬ বর্গ কিমি এবং জনসংখ্যা ৬৫লক্ষ ৭৭হাজার। জনঘনত্বে

কলকাতা রেজিও এমিলিয়ার ৬০গুন!! মিনি যখন ইউনিভার্সিটি অফ মদেনা অ্যান্ড

রেজিও এমিলিয়াতে বৈজ্ঞানিকের কাজ নিয়ে প্রথম রেজিওতে আসে তখন আমরাও

এসেছিলাম ওর সাথে। গত দশবছরে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে থেকেছে মিনি।সেই

সুবাদে যে যে শহরে ও থেকেছে সেই সব শহরে আমরাও গেছি প্রতিবছর। যার ফলে

ইউরোপের অনেকগুলো শহর ঘোরা হয়ে গেছে আমাদের। কিন্তু উত্তর ইটালির এই

ছোট্ট শহরটাতে গত বছর প্রথম পা রেখেই ভীষণ ভালো লেগেছিল আমার। শহরটাতে

বহুতল নেই বললেই চলে। সব বাড়িগুলোই পুরনো ধাঁচের। অনেকটা আমাদের উত্তর

কলকাতার পুরনো বড় বাড়িগুলোর মত। উঁচু উঁচু চওড়া পাথরের সিঁড়ি , নক্সাকরা

কাঠের রেলিং, কাঠের সার্সি দেওয়া কাচের জানলা, সিমেন্টের লাল মেঝে, উঁচু সিলিং।

মিনি যে বাড়িটাতে থাকে ওটা সিটি সেন্টারের পাশেই। তিনতলায় দুটো শোবার ঘর,

বসার ঘর, ডাইনিং স্পেস, কিচেন ,টয়লেট। ওর একা থাকার পক্ষে বেশ বড়। বাড়ির

জানলা দিয়ে সামনের রাস্তাটা দেখা যায়। সপ্তাহান্তে রাস্তাটায় লোকের আনাগোনা

বাড়ে। রাস্তার ধারের কফির দোকান, পিজেরিয়া (পিজার দোকান) আর

রেস্টুরেন্টগুলো ভর্তি হয়ে যায়। ইউরোপের অন্যান্য শহরের মতোই রাস্তার ওপরে

চেয়ার টেবিল পাতে কফি আর খাবার দোকানগুলো। আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল

বাড়িটা। আগেরবার এই বাড়িটাতে শিফট করে, সব গোছগাছ করে, থাকতে শুরু করতে

না করতেই ফেরার সময় হয়ে গিয়েছিল। মাত্র তিনদিন ছিলাম এই বাড়িটায়। তখন

থেকেই ইচ্ছে ছিল ভিসার ভ্যালিডিটি থাকতে থাকতেই আর একবার এসে অন্তত

মাসখানেক থেকে যাব। বাড়ি ঠিক করে মিনি স্থিতু হতে না হতেই ফিরে এলাম।শুধু

সময় বের করে একদিন সকালে ফ্লোরেন্স গিয়ে রাত্রে ফিরে এসেছিলাম। আর

কোথাও যাওয়া হয়নি। মিনি বলেছিল পরের বার এলে সাত আট দিনের জন্য কোথাও

ঘুরে আসবো। আর সেজন্যই এইবার ইটালি আসা। ভিসার ভ্যালিডিটি শেষ ১৭ই মে।

তাই ঠিক হলো ১৩ই মার্চ রওনা দেব কলকাতা থেকে আর ফিরে যাব ১৮ই এপ্রিল।

মিনি এর মধ্যে স্পেন ভ্রমণের ব্যবস্থা করবে। সেই হিসাবে কলকাতা থেকে দুবাই




হয়ে বোলোনিয়া যাবার টিকিট কাটা হলো ১৩ই মার্চের জন্য। ১৩ই মার্চ রাত্রে

এমিরেটস এয়ারলাইন্সে কলকাতা থেকে দুবাই আর ১৪ই মার্চ সকালে দুবাই থেকে

বোলোনিয়া। সবই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু মার্চের গোড়ার দিকে শুরু হয়ে গেল

আমেরিকা –ইরান যুদ্ধ। যুদ্ধে জড়িয়ে গেল আমেরিকার মিত্রশক্তি সংযুক্ত আমির

আরবশাহি। আক্রান্ত হলো দুবাই। বন্ধ করে দেওয়া হলো দুবাই বিমানবন্দর ।

আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেলাম। কিন্তু মনে ভাবলাম ১৩ তারিখ আসতে

প্রায় দু’সপ্তাহ দেরি। হয়ত এরমধ্যে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসবে। শুরু হলো

অস্থির অপেক্ষা। রোজ খবর নিচ্ছি ফ্লাইট ঠিকঠাক চালু হলো কিনা। আশার আলো

দেখিয়ে এমিরেটস জানাল কিছু সীমিত সংখ্যক ফ্লাইট ৮ তারিখ থেকে যাতায়াত শুরু

করবে। তার মধ্যে কলকাতা –দুবাই-বোলোনিয়া আছে। ভাবলাম যাক বাঁচা গেল।

দ্বিগুন উৎসাহে প্যাকিং শুরু করে দিলাম। ১১ তারিখ হঠাৎ এমিরেটস জানালো যে

১৪ তারিখের দুবাই –বোলোনিয়া ফ্লাইট একদিন পরে অর্থাৎ ১৫ তারিখ ছাড়বে।

তার মানে এই দাঁড়ালো যে ১৩ তারিখ রাত্রে কলকাতা থেকে দুবাই। তারপর দুবাইতে

প্রায় দেড় দিন অপেক্ষা । তারপর দুবাই থেকে বোলোনিয়া। এমিরেটস-এ ফোন করে

জানতে চাইলাম কলকাতা-দুবাই ফ্লাইট ১৩ তারিখের বদলে ১৪ তারিখে রি-সিডিউল

করা যাবে কিনা। ওরা রাজি হয়ে গেল। তার মানে আমাদের যাওয়া পিছিয়ে গেল

একদিন। চতুর্দিকে যা চলছে তাতে একদিন পিছিয়ে যাওয়াটা এমন কিছু ব্যাপার নয়।

মনকে সান্তনা দিলাম। ভাবলাম ঠিকই আছে। একদিনেরই তো ব্যাপার।কিন্তু যুদ্ধের

যা পরিস্থিতি তা দেখে খুব একটা নিশ্চিন্ত হতে পারছিলাম না। দুবাইতে পরিচিত

বন্ধুবান্ধবদের ফোন করলাম। এক-দু’জন বাঙালি তো যুদ্ধের ইঙ্গিত পেয়েই

সপরিবারে কলকাতা ফিরে এসেছে।কিছু দক্ষিণ ভারতীয় বন্ধু তখনও দুবাইতে আছে

কিন্তু তারাও খুব একটা আশার কথা শোনালো না। অনতিবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ হবারও

কোনও লক্ষণ নেই। যে কোনও সময়ে দুবাই বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা কমিয়ে

দেওয়া বা বন্ধ করে দেবার সম্ভাবনাও ওরা একেবারে উড়িয়ে দিল না। অনেক

বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন ইত্যাদি শুভাকাঙ্খীরা পরামর্শ দিল খুব জরুরি না

হলে এখন না যাওয়াই ভাল। কিন্তু কখন যে অবস্থা ভাল হতে পারে তার উত্তর কেউ

দিতে পারলো না। । এইসব অনিশ্চয়তার মধ্যেই ১২ তারিখে এমিরেটস থেকে খবর

এলো যে অনির্দিষ্টকালের জন্য দুবাই –বোলোনিয়া ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হলো।

মাথায় হাত! এতদিনের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল! অন্য এয়ারলাইন্সে অন্য রুটে

টিকিটের দাম চেক করলাম। দ্বিগুন থেকে তিনগুন দাম। এদিকে হাতেও সময় কম।

ঠিক এইসময়েই এমিরেটস জানালো যে ৩০শে এপ্রিলের মধ্যে যাওয়ার জন্য যে

কোনও ফ্লাইটের দিন এবং রুট একাধিকবার সম্পূর্ণ বিনা অতিরিক্ত খরচায় বদল

করা যেতে পারে। কী মনে হলো এমিরেটস-এর ওয়েবসাইট চেক করে দেখলাম যারা

নতুন করে বোলোনিয়ার টিকিট কাটছে তাদের রোম অবধি প্লেনে এবং রোম থেকে




বোলোনিয়া ট্রেনের ব্যবস্থা করছে এমিরেটস। ভাবলাম আমার পুরনো টিকিট তো কী

আছে, চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী? ফোন করলাম। ওরা সব শুনে বলল ট্রেনের

ব্যবস্থা করা যাবে না কিন্তু রোম থেকে একটা কানেক্টিং আই টি এ এয়ারলাইন্সের

ফ্লাইট ব্যবস্থা করে দিতে পারে। তবে ১৪ তারিখের বদলে ১৫ তারিখ রাত্রে ৮-২৫-

এ কলকাতা থেকে রওনা হতে হবে। ১৬ তারিখ রাত্রি ১২টায় (দুবাই সময়) দুবাই

এবং সকাল ৮ টায় (দুবাই সময়) দুবাই –রোম ফ্লাইট যেটা রোমে পৌঁছবে ১৬ তারিখ

১২-৪৫ (রোম সময়) এবং দুপুর ২-২৫ (রোম সময়) মিনিটে রোম-বোলোনিয়া ফ্লাইট।

রোমে লে-ওভার মাত্র ১ ঘন্টা ৪০ মিনিট। ইমিগ্রেশন এবং সিকিউরিটি করে ২৫

মিনিট আগে অর্থাৎ ১ ঘন্টা ১৫ মিনিটের মধ্যে গেটে পৌঁছতে হবে। যথেষ্ট ঝুঁকি

আছে তবুও রাজি হয়ে গেলাম। অন্য কোনও উপায় নেই। আবার অপেক্ষা শুরু ।

প্যাকিং মোটামুটি কমপ্লিট। কিন্তু বিপদ তো একা আসে না। ১৪ তারিখ রাত ১টা

থেকে মুনমুনের ডাইরিয়া শুরু হলো। রাতটুকু ম্যানেজ করার জন্য হাতের কাছে যা

ওষুধ ছিল তাই দিয়ে ভোর প্রায় ৫টার সময় পরিস্থিতি কিছুটা আয়ত্ত্বে এলেও

একেবারে বন্ধ হলো না। সকালে গৃহ চিকিৎসক ডঃ চৌধুরীকে ফোন করলাম।

রক্ষণশীল বয়স্ক ডাক্তার। ইংল্যান্ডে থাকতেন। বললেন,’ কোনও রিস্ক নেওয়া

যাবে না। আবার রি-সিডিউল করান। ওষুধ দিচ্ছি। মিনিমাম চার-পাঁচ দিন লাগবে।‘

আবার ফোন করলাম এমিরেটসে। ওরা সব কিছু দেখে বললো সিডিউল ছ’দিন পিছিয়ে

দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ ১৫ তারিখের বদলে ২১ তারিখ কলকাতা থেকে রওনা।

বাকি টাইমিং একই রকম থাকবে। আমার অনুরোধে আমাদের ফেরার টিকিটও পিছিয়ে

১৭ই এপ্রিলের বদলে ২৩শে এপ্রিল করে দিতে রাজি হয়ে গেল এমিরেটস

এয়ারলাইন্স। মাঝখানে আর কিছু অঘটন ঘটেনি। অবশেষে ২১ তারিখ কলকাতা থেকে

রাত্রি ৮-২৫ মিনিটের কলকাতা-দুবাই ফ্লাইট ধরলাম। পরের গল্প শুরু ফ্লাইট

ছাড়ার পর।

এই গল্পের শেষে একটা কথা বলে রাখি। আমার এইবারের ইটালি যাত্রার সঙ্গে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইটালি ভ্রমণের বেশ কিছু সাদৃশ্য আছে। গুরুদেব তিনবার

ইটালি গেছেন। প্রথমবার ১৮৭৮ সালে ইংল্যান্ড যাবার পথে। দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার

যথাক্রমে ১৯২৫ সালে এবং ১৯২৬ সালে। আমারও এটি তৃতীয় ইটালি ভ্রমণ।

প্রথমটি ২০১৬ সালে –রোম ও ভেনিস। আমার প্রথম ইটালি ভ্রমণ আমার কাছে

স্মরণীয় হয়ে আছে। সেবার ভেনিসে গন্ডোলার লাইনে আমার দু’শো ইউরো পকেট

কেটে তুলে নিয়েছিল এক ইটালিয়ান সুন্দরী। তারপর ২০২৫ এবং ২০২৬।

রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ইটালি ভ্রমণের ঠিক একশো বছর পরে।

মুসোলিনি এবং রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারের শতবর্ষপূর্তি ঘটবে আর

পাঁচ সপ্তাহ পরেই -৩০শে মে। কাকতালীয় !!!




ধান ভাঙতে শিবের গীত এখানেই শেষ। এবার যাত্রা শুরু।

যাত্রা হলো শুরু।

কলকাতা থেকে ২১শে মার্চ রাত্রি ৮-২৫এর দুবাইগামী প্লেনে উঠে বসলাম। প্লেন

ছাড়লো সঠিক সময়। মুনমুনের উইন্ডো সিট, আমার মিডল আর প্যাসেজের পাশে

আইল সিটে এক বাংলাদেশি মাঝবয়সী ভদ্রলোক। প্লেন ছাড়ার খানিকক্ষণের

মধ্যেই চার-পাঁচ ক্যান বিয়র পান করে ঘুমিয়ে পড়লেন ভদ্রলোক। ঘন্টা চারেক পরে

মুনমুন টয়লেট যেতে চাইলে ভদ্রলোককে একটু উঠে দাঁড়াতে বললাম। কিন্তু কে শোনে

কার কথা! নেশাগ্রস্থ ভদ্রলোক তখন ঘুমে কাতর। আমি বারবার ডাকছি , গায়ে হাত

দিয়ে ঠেলা দিচ্ছি তবুও লোকটা নড়ছেনা চড়ছেনা দেখে একজন বিমানসেবিকা এসে

ভদ্রলোককে প্রায় ধাক্কা দিতে শুরু করলেন। অনেক চেষ্টার পর ভদ্রলোক

কোনওক্রমে সোজা হয়ে বসে নিজের পা দু’টো একটু টেনে নিয়ে আবার নিদ্রাদেবীর

কোলে ঢলে পড়লেন। অগত্যা ঐটুকু জায়গা দিয়ে অনেক কসরত করে আমি প্যাসেজে

এসে দাঁড়ালাম। এবার মুনমুনের পালা। অনেক চেষ্টা করে দুপায়ের হাঁটু যতদূর সম্ভব

ভাঁজ করে প্রচুর খেটেখুটে যখন প্যাসেজে এসে দাঁড়ালো তখন বোঝা গেল বাঁ পায়ের

হাঁটুটা আর ভাঁজ করা যাচ্ছেনা। পা সোজা হয়ে আছে কিন্তু হাঁটু মোড়া যাচ্ছে না। চাপ

দিয়ে মুড়তে গেলে প্রচন্ড ব্যাথা। ব্যাকরেস্ট ধরে ধরে কোনওক্রমে টয়লেট থেকে

ফিরে এসে সেই যে সিটে বসলো তারপর থেকে বাঁ পাটা একেবারে নট নড়ন চড়ন। সঙ্গে

রাখা পেন-কিলার খেয়ে ব্যথা একটু কমলেও পায়ের অবস্থার কোনও উন্নতি হলো

না। বিমানসেবিকা এসে বলে গেলেন ল্যান্ড করার পর সিটেই বসে থাকতে। পুরো প্লেন

খালি হয়ে গেলে হুইলচেয়ারে করে নিয়ে যাওয়া হবে। মুনমুনের এই প্রথমবার

হুইলচেয়ার আরোহণ। আইলে বসা ভদ্রলোককে বিশুদ্ধ বাংলায় অভিশাপ দিতে দিতে

হুইলচেয়ারে করে গড়িয়ে চলল মুনমুন আর পিছনে পিছনে আমি চললাম হেঁটে।

দুজনেরই মনেই গভীর উৎকণ্ঠা বাকি পথ কী করে পাড়ি দেব? মিনির বাড়িতো এখন

অনেকটা পথ। দুবাই থেকে রোম, রোম থেকে বোলোনিয়া , বোলোনিয়া থেকে রেজিও

এমিলিয়া-অনেক হাঁটা, ওঠা- নামা, অনেক ঝক্কি। যাইহোক হুইলচেয়ার মুনমুনকে

নামিয়ে দিয়ে গেল এমিরেটস-এর লাউঞ্জে। এখন দুবাই সময় রাত্রি ১২-৩০ , রোমের

ফ্লাইট সকাল ৮টায়। ৭ ঘন্টা ৩০ মিনিটের লে-ওভার। বলে গেল সকাল ৭টায় আবার

হুইলচেয়ার আসবে প্লেনে তুলে দেওয়ার জন্য। এয়ারপোর্ট অ্যাসিস্ট্যান্স

সার্ভিসের এক মহিলাকর্মী জানিয়ে গেলেন তিনি লাউঞ্জেই আছেন। টয়লেট যাবার

বা অন্য কোনও রকম দরকার হলে ওনাকে ডাকতে। এর আগে কোনওদিন

অ্যাসিস্টান্স সার্ভিসের দরকার পড়েনি তাই অভিজ্ঞতাও ছিলনা। ঐ মহিলাকর্মীর

আন্তরিক ব্যবহার এবং প্রতিটি প্রয়োজনে সযত্নে হাত বাড়িয়ে দেওয়া সত্যিই

ভোলবার নয়। কেবলমাত্র প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত বাধ্যতার বাইরেও গভীর




আন্তরিকতা এবং পরম মমত্ববোধ ব্যতিরেকে এইধরনের সহায়তা প্রদান সম্ভব

নয়। কাঁটায় কাঁটায় ৭টার সময় হুইলচেয়ার নিয়ে এলেন আরেকজন সহায়তা কর্মী।

সমস্ত লাইন অতিক্রম করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হুইলচেয়ার আরোহী যাত্রীদের

সকলের আগে প্লেনে ওঠানো হয়। এক্ষেত্রেও তার কোনও ব্যতিক্রম হলোনা।

সঠিক সময়ে আমরা উঠে বসলাম দুবাই থেকে রোম যাবার প্লেনে। দীর্ঘ উড়ান।

প্লেন যদি ঠিক সময়ে ছাড়ে তাহলে রোমে পৌঁছে পরের প্লেন ধরার জন্য সময় পাবো

১ ঘন্টা ১৫ মিনিট। তার মধ্যে সিকিউরিটি এবং ইমিগ্রেশনের গেরো। অনিশ্চয়তার

শুরু আবার। তারই মধ্যে যজ্ঞে ঘৃতাহুতি দিয়ে বিমানচালক জানালেন প্লেন ছাড়তে

৩০ মিনিট দেরি হবে। কারণ দুবাই বিমানবন্দরে রানওয়ের সংখ্যা নিরাপত্তার

কারণে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি তখন মনে মনে অঙ্ক করছি। যদি ৩০ মিনিট

দেরিতে ছাড়া মানে ৩০ মিনিট পৌঁছতে দেরি হয় তাহলে পরের প্লেন ধরা অসম্ভব।

সুতরাং হয় আজকের রাত্রি রোমে কাটিয়ে পরেরদিন সকালের বিমানে বোলোনিয়া

অথবা রোম এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেন ধরে একটা ট্রেন বদল করে বোলোনিয়া স্টেশন।

কিন্তু এতো লাগেজ এবং প্রায় চলচ্ছক্তিহীন মুনমুনকে নিয়ে মাঝখানে ট্রেন বদল

করে বোলোনিয়া যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। প্লেন ছাড়লো ৮-৩০এ। বিমানচালক

ঘোষণা করলেন যে ছাড়তে দেরি করলেও তিনি চেষ্টা করবেন যতটা সম্ভব সময়

বাঁচাতে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছে দিতে। আশা হতাশার দোলায় দুলতে

দুলতে চললাম রোমের উদ্দেশ্যে। রোমে যখন পৌঁছলাম তখন আমাদের হাতে আর

মাত্র একঘন্টা সময়। মুনমুনের যেহেতু হুইলচেয়ার লাগবে আমাদের অপেক্ষা করতে

হবে সব যাত্রীর নেমে যাওয়া অবধি। সেখানেই গেল দশ মিনিট। তারপর এলেন এক

মহিলা সহায়তা কর্মী। সঙ্গে হুইলচেয়ার। কিছু রেকর্ড চেক করে মুনমুনকে চেয়ারে

বসালেন। এই হুইলচেয়ারটি হাতে ঠেলা নয়, মোটরচালিত। বললেন,’ আমার নাম

বারবারা। আপনাদের আগেই বলে রাখি আমাদের হাতে যা সময় তাতে সিকিউরিটি,

ইমিগ্রেশন অতিক্রম করে চেক-ইন কাউন্টার থেকে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে ঠিক

সময়ে গেটে পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব।‘ আমাকে বললেন,’ দেখুন আমি হুইলচেয়ার একটু

জোরে ড্রাইভ করবো। আপনাকেও একটু জোরে আমাকে অনুসরণ করতে হবে।

মাঝখানে কোথাও দাঁড়াবেন না। অনেকটা পথ অতিক্রম করতে হবে।‘ হর্ন বাজাতে

বাজতে হুইলচেয়ার দৌড়চ্ছে ।পিছনে দৌড়চ্ছি আমি। ফার্স্ট স্টপ সিকিউরিটি।

বারবারা আমাদের দু’টো কেবিন ব্যাগ হাতে নিয়ে সিকিউরিটির লোকটাকে ওদের

ভাষায় কি একটা বলে বেল্টের ওপর রেখে দিল। সিকিউরিটি অফিসার আমাদের

লাইনের আগে আসতে বললেন। দ্রুতগতিতে সবকিছু চেক করে আমাদের সবার আগে

ছেড়ে দিলেন। শুরু হলো আবার দৌড়। সামনে হুইলচেয়ার, পিছনে আমি। সেকেন্ড স্টপ

–ইমিগ্রেশন। লাইন টপকে আমাদের নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালেন ইমিগ্রেশন কাউন্টারে

একেবারে ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনে। আমাদের হাত থেকে পাসপোর্টগুলো নিয়ে




ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে প্রায় গুঁজে দিয়ে ইতালিয়ন ভাষায় কি সব বোঝালেন

অফিসারকে। অফিসার মৃদু হেসে হাত চালিয়ে ফর্মালিটি কমপ্লিট করে পাসপোর্ট

দু’টো আমার হাতে দিয়ে হেসে বললেন -অল দি বেস্ট। ইউ আর ইন সেফ হ্যান্ডস।

আবার দৌড় । এবার হুইলচেয়ারের স্পিড আগের থেকে বেশি- লাস্ট ল্যাপ। আমিও

দৌড়চ্ছি প্রাণপণে। গেট নং –এ ৩২। গেটের উল্টোদিকে আই টি এ’র প্রায়রিটি

ট্রান্সফার সার্ভিস। আমাদের দাঁড় করিয়ে হাত থেকে পাসপোর্ট প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে

সবাইকে ঠেলে কাউন্টারের সামনে গিয়ে হাত আর মাথা নেড়ে কাউন্টারের মহিলাকে

কি বোঝালেন কিছুই শোনা গেল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম হাতে পাসপোর্ট

আর বোর্ডিং পাস নিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসতে হাসতে বারবারা এগিয়ে আসছেন

আমাদের দিকে। বোর্ডিং প্রায় চালু হয়ে গেছে ততক্ষণে। হুইলচেয়ার দেখে

কাউন্টারের মেয়েটি বারবারাকে তাড়াতাড়ি আসার ইঙ্গিত করে অন্যান্য যাত্রীদের

বোর্ডিং কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে দিল। সকলের আগে হুইলচেয়ারের যাত্রীদের

ছাড়াই নিয়ম। বারবারা সকলের আগে আমাদের নিয়ে গিয়ে প্লেনে ওঠার দরজার কাছে

ছেড়ে দিলেন। বিমানসেবিকা হাত ধরে মুনমুনকে নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে দিলেন।

কিছুক্ষণ পরে বারবারা হুইলচেয়ার রেখে এসে প্লেনের মধ্যে ঢুকে আমাদের সঙ্গে

দেখা করে গেলেন। ওঁকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাবো তার ভাষা খুঁজে পেলাম না।

অনুভব করলাম কেবলমাত্র ধন্যবাদ জানালে বারবারাকে ছোট করা হয়। বললাম

ওঁকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। হাসিমুখে বিদায় নিয়ে বারবারা

চলে গেল । ভেবে দেখলাম মুনমুনের পা যদি ঠিক থাকতো আর বারবারাকে যদি না

পেতাম তাহলে এই প্লেন ধরা আমাদের পক্ষে কোনওভাবেই সম্ভব হতোনা। এই

ঘটনা আমার চিরকাল মনে থাকবে। চরম অনিশ্চয়তা এবং বাধাবিপত্তির মধ্যে

কোথা থেকে হঠাৎ উনি এলেন আর কেনই বা আমাদের হাত ধরে ঝড়ের মতো সমস্ত

বাধাবিপত্তি দূর করে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছে দিলেন আর কী ভাবেই বা সবকিছু

সম্ভব হলো তা এখনও বুঝতে পারিনি।

মিনিকে ভিডিওতে ধরলাম। আমাদের প্লেনের মধ্যে দেখে ও তো একেবারে অবাক। ও

ভাবতেই পারেনি আমরা প্লেনটা ধরতে পারবো। ও নিশ্চিত আমরা কালকের আগে

পৌঁছব না। একমিনিট হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বললো – বোলোনিয়াতে নেমে অপেক্ষা

কোরো। আমি লাঞ্চ করে এয়ারপোর্টে আসছি।

রেজিও এমিলিয়াতে মিনির বাড়ি এসে যখন পৌঁছোলাম তখন ইতালির ঘড়িতে সন্ধ্যা

৭টা বেজে ১৫ মিনিট। এখন তিন দিন কোনও কাজ নেই। ২৬শে মার্চ সকালে আমরা

রওনা দেবো উত্তর স্পেনের এক সুন্দর শহর বিলবাও-এর উদ্দেশ্যে।

বাংলাদেশি ভদ্রলোকটিকে বাছা বাছা শব্দে অভিসম্পাতের পর্ব কিন্তু এখনও শেষ

হয়নি। খুব তাড়াতাড়ি শেষ হবে বলেও মনে হচ্ছে না।



                  বোলোনিয়া এয়ারপোর্টে






রেজিও এমিলিয়াতে আমাদের বাড়ি