প্রবন্ধ - মনোজিৎকুমার দাস
Posted in প্রবন্ধজগদীশ গুপ্ত বাংলাসাহিত্যের নতুন ধারার কথা সাহিত্যিক। মফস্বল শহরে থেকে জীবিকা নির্বাহের জন্য নানা পেশায় নিয়োজিত হয়ে তিনি নিজের চিন্তা চেতনা, মেধা মনন, ভাবনায় রচনা করেছে গল্প - উপন্যাস।
তিনি মূলত কথাসাহিত্যিক হলেও সাহিত্যিক জীবনের শুরুতে কবিতা লিখেছিলেন। তিনি একটি কবিতা সংকলন প্রকাশ করেছিলেন।
গল্প-উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ সংস্কারমুক্ত এক ভিন্নধারা এবং বিরল বিন্যাসের রচনাশৈলী রূপায়ণ করেন মনস্তাত্ত্বিক অনুষঙ্গে । এ জন্য এই বিশিষ্ট কথাকারকে আধুনিক বাংলা ছোটগল্পের অন্যতম পথিকৃৎ বলা হয়।
'কল্লোল যুগ’ বইতে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন, ‘জগদীশ গুপ্ত কোনোদিন কল্লোল অফিসে আসেননি। মফস্বল শহরে থাকতেন, সেখানেই থেকেছেন স্বনিষ্ঠায়। লোক- কোলাহলের মধ্যে এসে সাফল্যের সার্টিফিকেট খোঁজেননি। সাহিত্যকে ভালোবেসেছেন প্রাণ দিয়ে। প্রাণ দিয়ে সাহিত্যরচনা করেছেন। অনেকের কাছেই তিনি অদেখা, হয়তো বা অনুপস্থিত।’
আড্ডা বা সভাসমিতির প্রতি কোনও দিনই তাঁর আকর্ষণ ছিল না। কথায়, আচরণে পরিমিতিবোধ ও রুচিগত আভিজাত্যের ছাপ। পড়াশোনার ব্যাপ্তি ছিল বিস্ময়কর। শেক্সপিয়র, মলিয়ের থেকে মোপাসাঁ, ওয়াশিংটন আরভিং— বহু লেখকের উল্লেখ করেছেন।
মনোবৈকল্য ও মনোবিশ্লেষণকে জগদীশ গুপ্তই প্রথম বাংলা ছোটগল্পে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। আর এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্বসূরি।
জগৎ ও জীবন সম্পর্কে পৃথক প্রেক্ষিত ও প্রকাশভঙ্গির স্বাতন্ত্র্যই জগদীশ গুপ্তকে একজন পরাক্রমশালী লেখকের মর্যাদা দান করেছে। তাঁর কোনো গল্পেই কোনো দৃশ্যপট বা পটভূমিকা প্রাধান্য পায়নি।
তিনি তার লেখিনি দিয়ে সদ্বংশজাত সুশীল সমাজের মানুষের বাহ্যিক আবরণের ভেতরও যে অন্ত্যজ প্রবৃত্তি বিদ্যমান, সেটাই তিনি সবার আঁখিতে আঙুল দিয়ে উপস্থাপন করেছেন।
জগদীশ গুপ্তের আগে সব লেখকই রবীন্দ্র-প্রভাতকুমার রীতি অনুসরণ করতেন। এমনকি তিরিশের অনেক প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিকও সমাজের অভ্যন্তরে এবং অন্দরের অনেক অন্ধকার দিক পরিহার করে চলতেন।
কিন্তু জগদীশ গুপ্তই প্রথম পূর্ববর্তী এবং সমকালের কারও বিন্দুমাত্র পদানুবর্তী না হয়ে, কারও তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ নির্মোহ দৃষ্টিতে আখ্যানভাগ রচনা শুরু করেন। আর সেই সাহসী রচনার সূচনাকারীকে বর্তমান সমাজ ভুলতে বসেছে।
বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে তিনি আজ তেমন ততটা পরিচিতও নন। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁর প্রদর্শিত রীতিতেই বর্তমান সময়ের কথাকারগণ লিখছেন।
জগদীশ গুপ্তের অনেক রচনাই ‘কল্লোল’, ‘কালি কলম’, ‘প্রগতি’ ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, গল্প তৈরি তাঁর উদ্দেশ্য নয়। লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি শুধুমাত্র নিজের বক্তব্য পরিবেশন করেছেন।
তাঁর ছোটগল্পের সংখ্যা প্রায় একশো পঁচিশ। মানুষের যেমন হওয়া উচিত, অথবা যেমন হলে তাকে আমাদের ভালো লাগে তা নয়, মানুষ প্রকৃতই যা, তার বিশ্বস্ত ছবি একেবারে নির্মোহ দৃষ্টিতে আঁকতে চেয়েছেন তিনি।
রবীন্দ্রনাথ, প্রভাতকুমার, শরৎচন্দ্রের মিলিত প্রয়াসে, মানুষের প্রতি অপরিসীম বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে সাহিত্যরুচি গড়ে উঠেছিল, জগদীশ গুপ্ত তা থেকে সরে এলেন। প্রবেশ করলেন মানুষের অবচেতনায়, মনের গহনতম প্রদেশে; দেখালেন পাপবোধ ও কদর্যতা মেশানো তার প্রকৃত স্বরূপকে। আর এ সবই দেখালেন বাস্তবতার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে।
লেখার জন্য জীবনে কখনও আপস করেননি তিনি। এক প্রকাশক তাঁর একটি উপন্যাসকে আরও খানিকটা বাড়াতে বলে একটা চিঠি লিখেছিলেন। অগ্রিম কিছু টাকাও পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি সেই টাকা ফেরত পাঠিয়ে জানান, ‘যে উপন্যাস যেখানে যখন সমাপ্ত হওয়া প্রয়োজন এবং যে ঘটনা বিস্তারের যতটুকু ক্ষেত্র আছে, তার বেশি কোনো ফরমাসী লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
নিঃসন্তান জগদীশ গুপ্ত একটি মেয়েকে সন্তানস্নেহে পালন করেছিলেন। তার নাম দিয়েছিলেন সুকুমারী। নিয়মিত ও নিশ্চিত আয় না থাকায় শেষের দিনগুলিতে রীতিমতো অর্থাভাবে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। আর ছিল নানা রোগ-ব্যাধির নিয়ত উপদ্রব।
১৯৫৭ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
জগদীশ গুপ্ত ১৮৮৬ সালের আজকের দিনে (৫ জুলাই) বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার আমলাপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেও মানুষের মনজগতের খবর তার লেখায় উপস্থাপন করে বাংলা সাহিত্যে নিজের আসন পাকাপোক্ত করেন।









