ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়
Posted in ধারাবাহিকপর্ব ২৬.২
এবার রাস্তা একদম ফাঁকা। ফৌজি কায়দার লোকটা ওখান থেকেই চেঁচিয়ে বলল, “চলো
ছেলের দল! ডবুল মার্চ! চলো-ও-ও”!
ঝোপের পেছনে স্বাভাবিক স্বরে কথাবার্তা চলছিল।
“হাঁ ভর্ফাই, অর্ফব চর্ফলো”! অর্থাৎ হাঁ ভাই, অব চলো!
“ইস সর্ফালে কে মুঁহ মেঁ কর্ফড়া খোঁর্ফোস দেঁ কি নির্ফিকাল দেঁ”? এই শালার মুখে
কাপড় ঠুঁসে দেব, কি বের করে দেব?
“খোঁর্ফোসে রহো”। ঠুসে দাও।
জনাপাঁচেক লোক ঝোপের পেছন থেকে এসে এবার রাস্তায় উঠল। কারও পা টলছিল না।
সবাই চুপচাপ চলছিল। আর ওদের চলার ভঙ্গিতে এমন ভাব যেন ওরা কোন গেরিলা
বাহিনী যাদের উপর সীমান্তে চীন সৈন্যের হাত থেকে দেশের বেদখল জমি ছিনিয়ে আনার
ভার। ভূতওয়ালা অশত্থ গাছের তলায় আসতে আসতে ওরা রাস্তা ছেড়ে মাঠে নেমে পড়ল।
হয়ত ভূতের ভয়ে বা সামনে থেকে চোখ ধাঁধানো আলো ফেলা গাড়ির জন্যে। ওরা পা
রেখেছে এমন একটা ক্ষেতে যার চারপাশে বাবুল গাছের কাঁটাভরা ডাল পোঁতা আছে। ওই
ক্ষেতে কোন ফসল ছিল না, জমি রক্ষার জন্যে সীমানায় কাঁটাওলা ডাল পোঁতা। একজন
গলা চেপে চেঁচিয়ে উঠল, “অর্ফরে বর্ফাপ, কর্ফাট”;! আরে বাপ! কাঁটা!
আরেকজন বলল, “কির্ফিস সর্ফালে নে বর্ফহাঁ কর্ফাটেঁ গর্ফাড়ে হ্যাঁয়”? কোন শালা
এখানে কাঁটা পুঁতে রেখেছে?
প্রথম লোকটি বলল, “রর্ফমচর্ফন্না নে”। রমচন্না করেছে।
“কর্ফব”? কবে?
“তুর্ফমহারে জর্ফানে কে বর্ফাদ”। তোমার জেল যাওয়ার পরে।
“তর্ফভী! অর্ফব অর্ফা গর্ফায়া হুঁ—খের্ফত তো হর্ফমারা হ্যায়। ইঁহা কর্ফাঁটা ক্যা
অর্ফপনে বর্ফাপ কা সর্ফমঝকর গর্ফাড়া হ্যায়”? তাই! এখন এসে গেছি—খেত তো
আমার। এখানে কাঁটা পুঁতেছে কী ভেবে? ওর বাপের জমি”?
“ গুর্ফুসসা ন হোও। তুর্ফুম অর্ফা গয়ে। সর্ফব চুরেন্ট হো জর্ফায়েগা’। রেগে যেও না।
এখন তুমি এসে গেছ। সব ঠিক হয়ে যাবে।
“ঠির্ফিক হ্যায়। পর্ফর ইয়ে কর্ফাঁটা আয়া কর্ফহাঁসে? কির্ফিস নে দির্ফিয়া”? ঠিক
আছে। কিন্তু এইসব কাঁটা কোত্থেকে এল? কে দিয়েছে?
ছোট্ট দলটি এবার খেত পেরিয়ে ফের রাস্তায় উঠেছে। মদের ভাটি আর পঞ্চাশ গজ দূর।
একজন সর্ফরী বুলি ছেড়ে বলল, “একটা বাবুলের ডালও রমচন্নার নিজের খেতের নয়।
কার খেত থেকে কেটে এনেছে”?
“কার বাবুল কে জানে”?
“বলতে হবে না। আমি ঠিক জানতে পারব”।
“যদি জানতেই পারবে তো জিজ্ঞেস করছ কেন”?
“এইজন্যে যে তোমার আসল রূপও ধরা পরবে”।
অন্য লোকটি হাসতে হাসতে সবাইকে বলল, “দেখ, জোগনাথ জেল থেকে জেরা করা শিখে
এসেছে”।
“চিন্তা কোর না গেঁয়োভূত কোথাকার! তোমাকেও শিখিয়ে দেব”।
দলটা এবার ভাটিখানায় ঢুকে গেল। ওখানে জনা পাঁচ-সাত আগে থেকে বসে ছিল। একজন
উৎসাহিত হয়ে বলল, “আরে জোগনাথ! জেল থেকে ছাড়া পেলে কবে”?
“আজ, দুপুরের পর”।
শ্রোতার উৎসাহ বেড়ে গেল। “কেমন ছিলে”?
“খুব ভাল”।
“চেনাজানা কাউকে দেখলে”?
“সবার সংগে চেনাজানা হয়েছে”।
“ওখানে বোধহয় বিসেসরও ছিল। দেখা হোল”?
“না। ওখানে সবাই বিসেসরের বাপ”!
“ওখানে সিসল থেঁতো করে দড়ি পাকাতে হত”?
ঘরের কোনা থেকে একটা ভারী গলার প্রশ্ন। জোগনাথ রেগে গিয়ে বলল, “কে বলছে?
কোন ব্যাটা মুর্গির ইয়ে—“?
“ ও আমার অতিথি”।
“ওকে বল নিজের ভেঁপু বাজানো বন্ধ করে। শিবপালগঞ্জে এসব চলে না”।
“শুনেছ অতিথি? এ হল জোগনাথ। সদ্য সদ্য জেল থেকে বেরিয়েছে। তোমাকে বলছে ভেঁপু
বাজানো বন্ধ করতে”।
“আমার কথাটা আরেকবার শুনে নাও । গোড়াতেই বলে দিচ্ছি —আমি কিন্তু একনম্বর
হারামি! চুপচাপ মদ গিলতে থাক, আর ওই কোনাতেই বমি কর। ফের সিসল থেঁতোর কথা
শুরু করলে তোমায় সিসল দেখিয়ে ছাড়ব”।
“শুনেছ অতিথি”?
“শুনবে কে? ওই কোণা তো খালি”।
“অরে! কোথায় গেল অতিথি? কেটে পড়ল”?
“আরে, বাহ রে অতিথি”!
জোগনাথ একটা দশ টাকার নোট বের করে দোকানদারকে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “সবাইকে
এক এক চুগগড় (পেগ) দাও। কেউ যেন ছাড়া না পায়! অনেক দিন পর নিজভূমে এসেছি”।
“অনেক টাকাপয়সা এনেছ দেখচি”।
“শনিচরা পঞ্চায়েত প্রধান হয়েছে। ওর হুকুম—আজ সবাই মনের সুখে মদ খাবে”।
“কিন্তু শনিচরার ট্যাঁকে পয়সা কই”?
“আরে এখন শনিচর আর সেই শনিচর নেই। ও এখন পঞ্চায়েত প্রধান। কিছু বুঝলে”?
সবাই এক এক চুগগড় হাতে নিয়ে বসে আছে। এটা ভাটিখানার বাইরের বারান্দা। এটাকে
দরমার দেয়াল তুলে রাস্তা থেকে আলাদা করা হয়েছে। ভেতরের ঘরে দোকানদারি।
বারান্দায় একটা লালটিন জ্বলছে যাতে যারা মদ খাচ্ছে তাদের চেহারা দেখা যায়। কিন্তু
ভেতরে জ্বলছে এক টেমি। তার আলোয় মদ যে বেচছে তার চেহারা দেখা যায় না।
বারান্দায় একটা বেঞ্চ, তাতে দু’জন বসে আছে। জোগনাথও ওখানে বসে পড়ল। কিছু
লোক মাটিতে পাতা চাটাইয়ে বসেছে। কয়েকজন কাঁচা মেজেতে বসে খাচ্ছে।
সাকী, মদের কলসি ও পেয়ালা—সব এখানে যা আছে তাই। দেশি মদের গন্ধ রাস্তায়
অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। মহাভারতের রাজা শান্তনু যেমন যোজনগন্ধার সুগন্ধ
নাকে আসলে টের পেতেন নারীটি কতদূরে, তেমনিই গন্ধ থেকেই লোকে বুঝতে পারে
এখানে দেশি মদের আড্ডা। আমাদের এখানে গন্ধই দেশি মদের বিজ্ঞাপনের কাজ করে।
তাই নামজাদা সংবাদপত্রে বিলিতি মদের বিজ্ঞাপন দেখতে পাবেন, দেশি মদের নয়। ওর
বিজ্ঞাপনের দরকার নেই।
দু’তিন চুমুকের পর জোগনাথ এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। তারপর বলল, “এতে জল
মেশানো হয়েছে”।
“কী বললে”?
“জল। মদে জল মিশিয়ে বেচা হচ্ছে”।
“আমারও মনে হচ্ছে”।
“আমারও”।
“আমারও। বেশ কিছুদিন ধরে এমন মনে হচ্ছিল। এখন তো জল মেশানো দারু আসলের
মতই লাগছে”।
দোকানদার নিজের গদি থেকে উঠে জোগনাথের কাছে এল। শীতল কন্ঠস্বরে
বলল—“ফুর্তি করে খাও। তোমার হাওয়া তো প্রথম পেগ থেকেই ফুস্ হয়ে গেছে। পোয়া-
আধপোয়া ফোকটে খেতে চাও তো ঝেড়ে কাশো, খাইয়ে দেব। কিন্তু জল মেশানো ওঁছা
লোকের কাজ। এখানে ওসব হয় না”।
জোগনাথের উপর এই লেকচারের সঠিক প্রতিক্রিয়া হল। পকেট থেকে দশ আর পাঁচ
টাকার কয়েকটা নোট বের করে বলল, “যেদিন ফোকটে মদ গেলার ইচ্ছে হবে, তাই করব।
কিন্তু ঘাবড়ে যেও না। এই দেখ, এতগুলো টাকা একসঙ্গে কখনও দেখেছ”?
দোকানদারটি রোগাপাতলা, কিন্তু ত্যাড়া আদমি, মুখের ভাব বেশ জেদী। যেতে যেতে
শুনিয়ে দিল,” আমার দেখার দিন চলে গেছে। এখন তোমার দেখার দিন। দেখতে থাকো”।
দুটো পেগ হয়ে গেছে। একজন প্রশ্ন করল, “এবার কী ভাবছ জোগনাথ”?
“টাকার অবস্থা বেশ টাইট”। বলার ঢং এমনি যেন কেউ কথাটা বিশ্বাস না করে। “আগে
দারোগাজীর সঙ্গে দু-দু হাত হয়ে যাক। বদলি হয়েছে তো কী? আমি ওকে ছাড়ার পাত্র
নই। এখানে আসার আগে শহরে ওনার বিরুদ্ধে একটা মোকদ্দমা দায়ের করে এসেছি। দশ
বার এজলাসে হাজির হলে ওনার পলেস্তারা খসে পড়বে”।
“কীসের মোকদ্দমা”?
“দেওয়ানি মোকদ্দমা। কেন, তুমি জানতে না? আমার উপর চুরির মিথ্যে মামলা করে উনি
আমাকে দু’তিন মাস হাজত বাস করিয়েছেন”।
“বৈদ্যজী জামিন করান নি”?
“উনি করাতে চাইছিলেন, কিন্তু আমি জিদ ধরলাম। বললাম, দারোগার নাম নিয়ে এখানেই
থাকব। ভাড়া দিতে হবে না”।
“ফের”?
“ আবার ফের কিসের? আমার মান-ইজ্জত গেল, চাষের ক্ষতি হল। একটা খেত রমচন্না
কব্জা করে নিল। সব মিলিয়ে আট হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়েছি। ডিক্রি পেয়ে গেলে
দারোগাজির ঘটিবাটি চাটি হয়ে যাবে”।
“কিন্তু কোর্ট ফীস? দেওয়ানি মামলায় খর্চা কম নয়”।
“সব ভগবান দেবে”।
“শোন ভাই জোগনাথ! বামুন ঘরে জন্মেছ, এদিক সেদিকের বাতেলাবাজি বন্ধ কর। সচ
সচ বাতাও”।
“হাঁ ভাই, আমিও তাই বলি। মাঝখানে ভগবানকে নিয়ে টানাটানি কেন? কোর্ট ফীস কে
দেবে”?
“একবার বলেছি না—ভগবান দেবে”?
“বিগড়ে গেছে, আর মুখ খুলবে না। আচ্ছা, নাই বললে। এটা বল -- মোকদ্দমা করবে?
নাকি লাগিয়ে এসেছ”?
“লাগিয়ে দিয়েছি”।
“কবে”?
“আজকে”।
ঝোপের পেছন থেকে একজন মানুষ টলতে টলতে বেরিয়ে এল। তারপর ব্যথায় কাতর
আর্তনাদ করতে করতে রাস্তায় উঠে চলতে শুরু করল। ওর মাথায় ভর করেছে আত্ম-
করুণা, আক্রোশ আদি সাহিত্যিক গুণ। ভাটিখানায় ওর কথা ঘুরে ফিরে যেভাবে পৌঁছে
গেল তার সারতত্ত্ব হলঃ
একটু আগে ভূতের ঘরওলা অশত্থ গাছের একটু আগে সড়কের কিনারে একটা রাহাজানি
হয়েছে। কয়েকজন লোক লুঠপাট করেছে। এখন ও থানায় রিপোর্ট লেখাতে যাচ্ছে। এবার
এক এক করে সবক’টা বদমাশের হিসেব চুকিয়ে দেবে।
মেজেতে জোগনাথের পায়ের কাছে বসে এক ব্যাটা বেশ ডাঁটের সঙ্গে গেলাসের পর
গেলাস খালি করছিল। সে বলল, “তোমার গাঁয়ের এই বাপারটা বড় খারাপ। লোকজন লেফট
রাইট করতে করতে সূয্যি ডুবতেই রাহাজানি করে বসে! এটা একদম ফালতু কাজ!
জওয়ান, তুমি কি বলবে বল”।
জোগনাথ স্রেফ মাথা নারল আর দোকানদারকে চেঁচিয়ে বলল—আরও এক পো (পাঁইট)
দিয়ে যাও ভাই। চাইলে এটাকে ‘ফোকট’ খাতায় ধরে নাও”।
খানিক পরে ওরা যখন টলতে টলতে দরমার আড়াল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় উঠল তখন
ওদের সামনে খালি সড়ক আর দু’একটা হাড়জিরজিরে কুকুর।
যে লোকটা ব্যথায় কাতরে কাতরে ঝোপের পেছন থেকে বেরিয়েছিল সে এখন স্বাভাবিক
ভাবে ওদের সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। কিন্তু এদের টের পাওয়ার অবস্থা ছিল না। ঘরে
ফেরার সময় চলতে চলতে লোকটার মনের কলুষ সাফ হয়ে গেল। ধর্মে আস্থা বেড়ে গেল।
কারণ থানায় যাওয়ার পথে একজন জ্ঞানী ওকে বুঝিয়ে দিলঃ “কী হবে থানায় রিপোর্ট
লিখিয়ে? যা গেছে, তা গেছে। লুঠের মাল কখনও ফেরত পাওয়া যায়?
“বল, তুমি হিন্দু না মুসলমান? হিন্দু হলে ভাগ্য মানতে হবে। তোমার কপালে এই
পঁয়তাল্লিশ টাকা লেখা নেই। এখন দৌড়োদৌড়ি করে কী হবে? ভগবানের যখন এটাই
ইচ্ছে।
“যাও, প্রাণে বেঁচেছ তাই ঢের। গত বছর ঠিক ওই জায়গাতেই একটা লোককে পাঁঠার মত
কেটে ফেলেছিল।
“রামনাম কর, আর ঘরে ফিরে সত্যনারায়ণের কথা পাঠ করাও। মামলা-মোকদ্দমায় যা
টাকা লাগত, সেটা ধর্মকর্মে খরচ কর।
“গরম দুধে হলদি মিশিয়ে খেয়ে নাও আর পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়। কাল সকাল নাগাদ সব
ভুলে যাবে”।
(চলবে)










