Next
Previous
0

প্রবন্ধ - দিলীপ মজুমদার

Posted in








নিরুচ্চারে চলে যাচ্ছে গোকুলচন্দ্র নাগের মৃত্যুশতবর্ষ । ১৯২৫ সালে মৃত্যু হয় তাঁর । মাত্র একত্রিশ বছর বয়েসে । কেউ বলতে পারেন , জন্ম বা মৃত্যুশতবর্ষ পালনের মতো বিরাট লেখক তিনি ছিলেন না । বেঠিক নয় কথাটা । তাঁর রচনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য কিছু নয় । কিন্তু বড় লেখক হবার প্রতিশ্রুতি ছিল তাঁর লেখায় । 'ঝড়ের দোলা' সংকলনের 'মাধুরী' গল্পে , 'পথিক' উপন্যাসে , 'মায়ামুকুল' সংকলনের গল্পগুলিতে তার কিছু নজির আছে । জীবিকার্জনের জন্য নানাবিধ কাজ করতে হয়েছে তাঁকে । নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্য সাধনার সময় ও সুযোগ তিনি পান নি ।

লেখক হিসেবে নয় , বাংলা সাহিত্যের পালাবদলে একজন কর্মী হিসেবে তাঁর ভূমিকা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ । সেই পালাবদলের স্বপ্ন তিনি দেখতেন , লালিত করতেন তাকে । সেই স্বপ্ন আর একজন যিনি দেখতেন , সেই দীনেশরঞ্জন দাশের সঙ্গে আলাপ হবার পরে কাজে নেমে পড়েছিলেন গোকুল । দীনেশের সঙ্গে তাঁর আলাপ হওয়ার জায়গাটাও বিচিত্র । রেস্তোরাঁ নয় , লাইব্রেরি নয় , কোন বৈঠকখানা নয় . নিউ মার্কেটের এল ফুলের দোকান ।

ফুলের দোকানটা ছিল গোকুলের মামা সুরেন বসুর । স্বাস্থ্যের কারণে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ওয়েস্টার্ন সার্কেলের চাকরি ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল গোকুলকে । মামার কথায় ফুলের দোকানে বসতে শুরু করেছিলেন। পাশেই খেলার সরঞ্জাম বিক্রেতা এস. রায়. অ্যাণ্ড কোম্পানিতে কাজ করতেন দীনেশ । ফুলের দোকানে তাঁর সঙ্গে আলাপ গোকুলের । দীনেশের স্বপ্ন মিলে গেল গোকুলের সঙ্গে । কি রকম স্বপ্ন ? --'ভাবছি একটা পান্থশালার কথা । যেখানে মানুষ এসে শ্রান্ত জীবনভার নিয়ে বিশ্রাম করতে পারবে । জাতি , sex ও position সেখানে কোন বাধা হবে না । আপন আপন কাজকে মানুষ আনন্দময় করে তুলবে ।'

এই স্বপ্ন জন্ম দিল 'ফোর আর্টস ক্লাবে'র । গোকুল আর দীনেশ দেখা করলেন অধ্যাপক বিজলীবিহারী সরকারের স্ত্রী সুনীতিদেবীর সঙ্গে । নতুন ধরনের এই ক্লাবে যোগ দিতে রাজি হয়ে গেলেন সুনীতি । একে একে জুটতে লাগলেন মণীন্দ্রলাল বসু , উমা দাশগুপ্ত , সতীপ্রসাদ সেন , মীরা সান্যাল , দ্বিজেস সেন , কিরণ দে , কান্তিচন্দ্র দে , নিরুপমা দাশগুপ্ত । সংস্কৃতির পালাবদলের বাণীবাহক ছিল 'ফোর আর্টস ক্লাব'। সাহিত্যের পাশাপাশি এখানে ছিল কারুশিল্প , সংগীত , চিত্রশিল্পের আসর ।

এই 'ফোর আর্টস ক্লাব'ই 'কল্লোলে'র অগ্রদূত । ক্লাবটা উঠে যেতেই গোকুল আর দীনেশ 'কল্লোল' পত্রিকা প্রকাশের আয়োজন শুরু করে দিলেন । সংগতি ছিল না , কিন্তু ইচ্ছাটা ছিল দৃঢ় । গোকুলের কথায় , ' আমার ব্যাগে দেড় টাকা আর দীনেশের ব্যাগে টাকা দুই--ঠিক করলাম 'কল্লোল' বের করব । সেই টাকায় কাগজ কিনে হ্যাণ্ডবিল ছাপলাম । চৈত্র সংক্রান্তির দিন রাস্তায় বেজায় ভিড় , জেলেপাড়ার সঙ দেখতে বেরিয়েছে । সেই ভিড়ের মধ্যে দুজনে আমরা হ্যাণ্ডবিল বিলোতে লাগলাম ।' ১৩৩০ সালের বৈশাখ মাসে ১০/২ পটুয়াটোলা লেন থেকে প্রকাশিত হল বাংলার প্রথম মাসিক গল্প--সাহিত্য পত্রিকা । অবশ্য গল্পের পত্রিকা হলেও এতে কবিতাও ছাপা হত । প্রথম সংখ্যাতেই ছাপা হয় দীনেশরঞ্জন দাশের কবিতা । পরবর্তীকালে নজরুল ইসলাম , বিজয়চন্দ্র মজুমদার , বুদ্ধদেব বসু , নরেন্দ্র দেব , জীবনানন্দ দাশ , অজিতকুমার দত্ত প্রভৃতির কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ।

বাংলা সাহিত্যের পালাবদলে কল্লোলের ভূমিকাটা বিদ্রোহের । ভণ্ডামি , কাপট্য , সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ । যা যৌবনের স্বাভাবিক দাবির বিরোধী তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ । গোকুলচন্দ্রের জীবৎ কালের মধ্যে, 'কল্লোলে'র প্রথম দু'বছরের প্রকাশিত রচনার মধ্যে সেই বিদ্রোহের সুর ধ্বনিত হয়েছে । যেমন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের .নারীর মন' গল্পে , সুনীতিদেবীর 'বীণা' গল্পে , জীবনময় রায়ের 'কল্লোল' কবিতায় , গোকুলচন্দ্র নাগের 'পথিক' উপন্যাসে , কালিদাস নাগের 'জীবন' কথিকায় , দীনেশরঞ্জন দাশের 'উঠ বীর' কবিতায় , সুধীরকুমার চৌধুরীর 'বিদ্রোহ' কবিতায় , ভূপতি চৌধুরীর 'নারী' গল্পে , শৈলজানন্দের 'পান্থবীণা' উপন্যাসে , সত্যেন্দ্রকুমার বসুর 'সন্ধিক্ষণ' গল্পে , অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের 'গুমোট' গল্পে , প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'কালো মেয়ে' ও 'বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে বন্দী মোর ভগবান কাঁদে' গল্প এবং 'কবি নাস্তিক' কবিতায় ।

গোকুলচন্দ্র নাগের জীবনেই ছিল এই বিদ্রোহের বীজ । নানা প্রতিকূলতা , নানা কৃত্রিমতার মধ্য দিয়ে তাঁকে অগ্রসর হতে হয়েছে । অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন , 'গোকুলের বিদ্রোহ সাহিত্যিক বিদ্রোহ । গোকুলকে থাকতে হত তার ব্রাহ্ম মামাবাড়িতে নানা রকম বিধিনিষেধের বেড়াজালে । সে বাড়িতে গোকুলকে গলা ছেড়ে কেউ ডাকতে পেত না বাইরে থেকে , কোন মুহূর্তে জামা খুলে খালি-গা হতে পারত না গোকুল । এমন যেখানে কড়া শাসন--সেখান থেকে আর্ট স্কুলে গিয়ে ভর্তি হল । তার অভিভাবকদের ধারণা আর্ট স্কুলে যায় যত বাপে-তাড়ানো মায়ে-খেদানো ছেলে , এবার আর কি , রাস্তায় রাস্তায় বিড়ি ফুঁকে বেড়াও গে । শুধু আর্ট স্কুল নয়, সেই বাড়ি থেকেই সিনেমায় যোগ দিল গোকুল । সোল অব এ স্লেভ ছবিতে নামল বিদূষকের পার্টে । সহজেই বুঝতে পারা যায় কত বড় সংঘর্ষ করতে হয়েছিল সেদিনকার পরিপার্শ্বের সঙ্গে ।'
'কল্লোল' পত্রিকার সহ সম্পাদক ছিলেন গোকুল । কিন্তু দুর্মুখ সজনীকান্ত দাশও স্বীকার করেছেন যে পত্রিকার 'আসল কর্ণধার' ছিলেন গোকুলচন্দ্র নাগ । ভূপতি চৌধুরী গোকুলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন যে প্রত্যেকটি লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়া, কাটছাঁট করে প্রকাশের উপযোগী করে তোলা, ডাকযোগে আসা প্রত্যেক লেখক-লেখিকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা , প্রত্যেক সংখ্যার রূপসজ্জা ও রচনাসূচি নির্ধারণ করা , প্রুফ দেখা , প্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়িত্ব ছিল গোকুলের । বুদ্ধদেব বসু স্বীকার করেছেন যে গল্পসর্বস্ব সিকি মূল্যের মাসিকী হিসেবে জীবন আরম্ভ করে 'কল্লোল' যে ক্রমে নতুন লেখকদের মুখপত্র হয়ে উঠল--'তার পেছনে ছিল গোকুল নাগের প্রেরণা , যিনি তাঁর হ্রস্ব জীবনের শেষ বছরগুলিতে কল্লোলের অন্যতম সম্পাদক ছিলেন।'