0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৬. তৃপ্তি মিত্র বিস্মৃত প্রতিভা





প্রিয় বাউন্ডুলেবরেষু

বাসু,

তুমি দিল্লিতেই আছো কিনা জানিনা। কদিন আগেই ব্যাঙ্গালোর থেকে লেখা তোমার চিঠি ও লুইজ গ্লিকের ফ্যান্টাসি কবিতার অনুবাদ পেলাম। অনুবাদ পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল লুইজ গ্লিককে বেশ গভীর থেকে আত্মস্থ করেছো। আজ রবিবার, ছুটির আমেজ মেখে ব্যালকনিতে বসে রোদ গায়ে লাগিয়ে তোমাকে লিখছি। এখানে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। গতরাতে অফিস থেকে ফেরার পথে খেয়ে এসেছিলাম তাই রান্না করতে হয়নি। ফ্রেশ হয়ে টিভির সামনে বসে রিমোট চাপতে চাপতে চোখ আটকে গেল একটা সিনেমায়, তৃপ্তি মিত্র অভিনীত এই সিনেমাটা আগেও বহুবার দেখেছি। ২০২৫ সালে তৃপ্তি মিত্রের জন্ম শতবর্ষ গেল অথচ গুণী এই নাট্যজন যেন জীবনে প্রাপ্য মর্যদা পেলেন না যতটুকু পাওয়া উচিত ছিল। মঞ্চে উনার অভিনয় দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি কিন্তু ছোটকার মুখে বহুবার উনার অভিনয় নিয়ে বিস্তর কথা শুনেছি, ছোটকা দুটো নাটকের কথা সবসময় বলতেন একটা বাকী ইতিহাস অন্যটা অপরাজিতার কথা। নাটক নিয়ে কথা উঠলেই ছোটকা ঘুরে ফিরে এই দুই নাটক ও তাতে তৃপ্তি মিত্রের অভিনয় নিয়ে প্রশংসা জুড়তেন। শুনেছি বাকি ইতিহাস নাটকে তৃপ্তি মিত্র আর কুমার রায় তিনটে করে চরিত্রে অভিনয় করতেন। তৃপ্তি মিত্রের তিনটি চরিত্রের একজন বাসন্তী, মাঝবয়সি মহিলা, অন্য দু’জনের নাম কণা, কম বয়সি। এই দুই কণা আবার দু’ধরনের মেয়ে, একজন উচ্ছ্বল, ছটফটে, অন্যজন শান্ত, দুঃখী, যে কোনও কিছুকে মেনে নেওয়া স্বভাবের। প্রথম কণাকে দেখে ছোটকা নাকি ভেবেছিল উনি নিশ্চয়ই শাঁওলী মিত্র। তার নাকি দুটো কারণ। এক তো অস্বাভাবিক দ্রুততায়, সেকেন্ড তিরিশের মধ্যে তৃপ্তি মিত্র বাসন্তী থেকে কণায় রূপ বদলাতেন, সেই সঙ্গে বদলাতেন কথা বলার ধরন, হাঁটাচলার ধরন, এক কথায় পুরো ব্যক্তিত্বটাই অন্য রকম হয়ে যেত। এ একটা অসম্ভব ব্যাপার! ছোটকার কথায় যাঁরা অভিনয় করেন তাঁরা জানেন, এ খুব সহজ কাজ নয়। অত দ্রুত রূপ বদলের জন্যে দরকার হয় প্রায় যান্ত্রিক নিখুঁত তৎপরতা, আর ব্যক্তিত্ব পালটে দেওয়ার জন্য নিজের কণ্ঠ আর শরীরের ওপর অসামান্য দখল। বিস্ময়করভাবে তা ছিল তৃপ্তি মিত্রের। ছোটকার সাথে নাটক নিয়ে কথা বললেই এমন সব কথা শুনতে হতো আমি মনে করতাম হয়ত তৃপ্তি মিত্র নিয়ে ছোটকার দূর্বলতা কাজ করে। পরে যখন তাঁর অভিনয় দেখেছি পুরনো ছায়াছবিতে তাকে নিয়ে পড়েছি বিস্মিত হয়েছি আর ভেবেছি ছোটকার বলা কথাগুলি। ছোটকা তৃপ্তি মিত্রের একক নাটক অপরাজিতার কথা নিয়ে বলতে গেলেই বলতেন, তৃপ্তি মিত্রের অভিনয় ঘোর আমার আজ পর্যন্ত কাটেনি। কোনও লাভ নেই জানি, যাঁরা সেইসব অভিনয় দেখেননি তাঁদের তো কথা দিয়ে তাঁর অলৌকিকতা বোঝানো যাবে না, তবু ধর নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই বলি তাঁর আর-একটি নাটক, একক অভিনয়, ‘অপরাজিতা’র কথা।



পণ্ডিতেরা বলেন প্রাচীন গ্রীসে থিয়েটারের জন্ম। ওঁরা আবার এটাও বলেন, গণতন্ত্রের সূতিকাঘরও প্রাচীন গ্রীস। প্রথম দিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকাণ্ডের সূত্রেই থিয়েটারের আত্মপ্রকাশ। পরে সেখান থেকে বিযুক্ত হয়। যে সমস্ত পরিসরে এথেন্সে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের অনুষ্ঠানগুলি আয়োজিত হত, সেই পরিসরগুলি একই সাথে ছিল নাট্যানুষ্ঠানেরও স্থল। ফলে বলা যায়, শিশুকাল থেকেই থিয়েটার ও রাজনীতি এভাবে পরস্পর সম্পৃক্ত হয়ে আছে। এই সম্পর্ক তখন থেকেই দ্বিমুখী। কখনও থিয়েটারের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিষয়ে বার্তাপ্রদান হয়েছে। আবার কখনও উল্টোদিক থেকে রাজনীতি চেয়েছে থিয়েটারকে নিয়ন্ত্রণ করতে বা তার মধ্য দিয়ে নিজের স্বার্থ পূরণ করতে। সংগঠিত ধর্মকে যদি রাজনৈতিক অভিব্যক্তিরই একটি অংশ বলে গণ্য করি, তবে থিয়েটার ও রাজনীতি ধর্মীয় পরিসরে আদি থিয়েটারের দিন থেকেই পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে আছে। অন্য পণ্ডিতেরা বলবেন, সব কিছুর সূত্রপাত গ্রীসে খুঁজতে যাওয়া কেন? অন্য কোথাও সমান্তরালে বা তার আগেই এদের আত্মপ্রকাশ হয়ে থাকতেই পারে। তর্কের খাতিরে সেই বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে নিলেও এটা অনস্বীকার্য যে থিয়েটার ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক এই একই পথরেখা ধরেই এগিয়েছে। ইংরেজীতে যাকে বলে লাভ এন্ড হেট রিলেশন, সেই যুগপৎ অনুরাগ ও বীতরাগের সম্পর্কেই থিয়েটার ও রাজনীতি সম্পর্কিত হয়ে আছে। কখনো দ্বন্দ্বে কখনো ছন্দে গাঁথা এই সম্পর্ক। সমাজে শ্রেণিশাসন আরো সংহত হওয়ার পর থিয়েটার ও রাজনীতির সম্পর্কটা বিচিত্রধর্মী হয়েছে। কখনো শাসকেরা চেয়েছে থিয়েটারকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বা ব্যবহার করতে, কখনো ভাষাহীন শোষিত থিয়েটারের মধ্য দিয়ে নিজের অবদমিত কথাকে ব্যক্ত করেছে। যারা সরাসরি রাজনৈতিক থিয়েটার না করে বিশুদ্ধ থিয়েটারের চর্চা করে বলে দাবি করে, তারাও জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে যে বিবৃতিটি রাখে সেটিও মর্মবস্তুর দিক থেকে রাজনৈতিকই। বাংলা নাটকে রাজনৈতিক প্রভাব প্রথম লক্ষ করা যায় ১৮৬০ সালে দীণবন্ধু মিত্র কর্তৃক প্রকাশিত "নীল দর্পন" নাটকে। পরবর্তীতে এটা আরও বেগবান হয় চল্লিশের দশকে গণনাট্য সংঘ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্যে দিয়ে এবং তারা বাংলা নাটকে এক বিপুল পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেন অভিনয় থেকে আলোক সজ্জা সব ক্ষেত্রে এবং তার উজ্জল দৃষ্টান্ত নবান্ন, ছেড়া তার, দুঃখীর ইমান সহ আরও অনেক নাটক। বাংলা নাটকের যারা কুশী লব তথা বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, ঋত্বিক ঘটক, তুলসী লাহিড়ী এরা সবাই ছিলেন গণ নাট্য সংঘের কর্মী। ১৯৪২ সাল। কিছুদিন আগেই দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁ গ্রাম থেকে কলকাতায় এসেছেন তৃপ্তি ভাদুড়ী। ম্যাট্রিকুলেশনের দরজা পার না করলেও নাটকে অভিনয় করা নিয়ে প্রবল আগ্রহ তাঁর। আশুতোষ কলেজে পড়ার সময় গার্লস স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভ্য হয়ে একাধিক নাটকে যুক্ত থাকার সুযোগও হয়েছে। কলকাতায় বড়োমামা সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারেরও প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল স্বভাবলাজুক মেয়েটির ভালোবাসার প্রতি। তখন অ্যাসোসিয়েশনের রিহার্সাল হত তাঁর দিদি শান্তিদেবী ও জামাইবাবু অরুণ মিত্রের সদানন্দ রোডের বাড়িতে। শিক্ষক হিসেবে আসতেন শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু ভট্টাচার্য প্রমুখ। কেউই তখন নিজস্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত নন ঠিকই, তবে ভবিষ্যতের আলোর নিশানা সুস্পষ্ট করে তুলছিল বাংলার সংস্কৃতিচেতনার নতুন পথ। তৃপ্তিও যুক্ত হয়ে পড়লেন তাঁদের সঙ্গে। কোনো এক অনুষ্ঠানে নামতে হল পুরুষের ভূমিকাতেও। অভিনয় চলাকালীন জোরে হাত নাড়তেই শার্টের হাতার ভিতর থেকে রিনিঝিনি করে বেজে উঠল একগোছা চুড়ি। অপ্রস্তুতের একশেষ! কোনোরকমে অভিনয় শেষ করে যেন ঠিক করলেন, আর কোনোদিন মঞ্চে না উঠতে পারলেই বাঁচেন। ঠিক তার পরের বছরেই তাঁকে দেখা যাবে ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘের ‘আগুন’ নাটকে। নাটককার ও পরিচালক বিজন ভট্টাচার্য। ততদিনে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েছেন এ.আর.পি-র কাজে। সময়টাও ভারতের পক্ষে অনুকূল নয়। একদিকে স্বাধীনতা আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অন্যদিকে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’-এ ছারখার হয়ে যাচ্ছে গোটা বাংলা। পড়াশোনা বন্ধ রেখে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের লড়াইয়ে। গ্রাম ফেলে চলে আসা সহায় সম্বলহীন কৃষকদের জন্য জীবন উৎসর্গ তাঁর। আসলে কোথাও যেন একটা অস্পষ্ট মিল ছিল নিজের জীবনের সঙ্গেও। পিতা আশুতোষ ভাদুড়ি যখন যক্ষারোগগ্রস্ত, পরিবাবের মুখে খাবার জোটে না, সেই অনিশ্চিত দিনগুলিতেই এক কিশোরী বালিকা চলে এসেছিলেন কলকাতার অচেনা পরিবেশে। চুপ করে সম্পূর্ণ করতেন নিজের কাজটুকু। এতটাই নীরব হয়ে থাকতেন, যাতে সত্যেন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ‘মেয়েটি কি বোবা নাকি?’ এই আশঙ্কা আর নিরাপত্তাহীনতা যেন আজীবন সঙ্গী থেকেছে তাঁর, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে অনেকে সিদ্ধান্তে। ১৯৪৪ সালে অভিনীত হল গণনাট্য সংঘ প্রযোজিত বিজন ভট্টাচার্যের নাটক ‘নবান্ন’। যুগ্ম পরিচালক বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্র। বাংলা থিয়েটারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এই নাটকে বিনোদিনীর চরিত্রে অভিনয় করেন তৃপ্তি ভাদুড়ী। আমিনপুর গ্রাম থেকে খাদ্যের সন্ধানে কলকাতায় আসা এক পরিবারের সরল বালিকা বধূ সে। সন্তানসম মাখনকে কেড়ে নিয়েছে দুর্ভিক্ষ, নিজে ভুল পথে চলেছে জনৈকের ‘টাউট’-এর পাল্লায় পড়ে। এসব কি নিছকই অভিনয়? না, বরং জীবন থেকে, অভিজ্ঞতা থেকে খুঁজে পেয়েছিলেন অভিনয়ের প্রতিটি দৃষ্টিকোণ। মন্বন্তরের কলকাতার ‘ফ্যান দাও’ ধ্বনি ক্রমাগত বেজে চলত নাটকের মঞ্চে। প্রতিটি অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের দরজার সামনে, বলা ভালো নর্দমার সামনে হাড় জিরজিরে মানুষের ভিড়। নর্দমা থেকে বেরিয়ে আসা উচ্ছিষ্ট ফ্যানের জন্য অশক্ত শরীরে নিজেদের মধ্যে লেগে যেত মারামারি। একদিন উপরের ঘরের জানলা থেকে প্রত্যক্ষ করলেন সেরকমই এক ঘটনা। সেদিন কাঁদতে পারেননি তিনি, কিন্তু পালটে গেছিল জীবনধারা। হয়তো কিছু করার নেই, সামর্থ্যই বা কতটুকু? তবু থিয়েটারকে সম্বল করে যে পথটুকু হাঁটা সম্ভব, সেই পথই বেছে নেন তিনি। থিয়েটারের মধ্যেই খুঁজে পান বাঁচার রসদ। গণনাট্যের উত্তাল দিনগুলি পার করে চলে আসেন ‘বহুরূপী’-তে। ১৯৪৫-এ শম্ভু মিত্রের সঙ্গে বিবাহসূত্রে হন তৃপ্তি মিত্র। রবীন্দ্রনাথের ‘চার অধায়’ উপন্যাসের এলা চরিত্র থেকে ‘রক্তকরবী’-র নন্দিনী হয়ে ‘পুতুল খেলা’-র বুলু—সর্বত্র সাক্ষ্য রেখেছেন অপরিসীম অভিনয় প্রতিভার। ‘বহুরূপী’ থেকে সরে এসে তৈরি করেন নিজস্ব ‘আরব্ধ নাট্যবিদ্যালয়’। আবার ‘অপরাজিতা’ নাটকে একা অভিনয় করেছিলেন আঠারোটি চরিত্রে। আসলে তৃপ্তি মিত্রের সঙ্গে হয়তো বহুভাবে জড়িয়ে যায় শম্ভু মিত্রের নাম। আশ্চর্যময়ী তৃপ্তি মিত্রের ওপরে বিশিষ্ট কবি অরুণ মিত্রের লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল শ্রী মিত্রেরই লেখা 'পথের মোড়ে' (১৯৯৬) গ্রন্থে। অরুণ মিত্র ব্যক্তিগত আত্মীয়তার সম্পর্কের নিরিখে কিশোরীবেলা থেকে দেখেছেন তৃপ্তিকে — দেখেছেন তাঁর ক্রমশ উত্তরণ। দেখেছেন গণনাট্য সংঘের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ, অভিনয় জীবনে জড়িয়ে পড়া। এই অভিনয়কে কেন্দ্র করেই বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিণয় — পরবর্তীকালে 'বহুরূপী'র এক অনন্যসাধারণ অভিনেত্রী হয়ে ওঠা। তবে তৃপ্তি মিত্রের নিজস্বতা, তাঁর বিশেষ বাচনভঙ্গি ও কণ্ঠস্বর তাঁর অভিনয়কে এক বিশেষ শৈলী দিয়েছিল। এই লেখার এক জায়গায় শ্রী মিত্র বলেছেন — "তার কণ্ঠের ও বাচনের তীব্রতা এবং শিথিলতা প্রায়ই আমার ভেতরটাকে একইভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দিত এবং আমার পাষাণ চোখেও জল টেনে আনাত।" হ্যাঁ, শ্রী মিত্রের লেখাতে আমরা এই বিশিষ্ট অভিনেত্রীর ডাকনামটি জানতে পারি — "মণি"। নামটি সার্থক, সর্ব অর্থেই। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় কবি অরুণ মিত্র আমাদের জানিয়েছেন — "অভিনয়ের অনুধ্যানে অমন সার্বিক আত্মনিয়োজন আমি আর দেখি নি।" বাস্তবিকই, নাটকের প্রতি তাঁর ভালবাসা ও নিষ্ঠা তৃপ্তি মিত্রকে তাঁর জীবনের অন্য এক সফলতার শীর্ষদেশের দিকে নিয়ে গেছে — যেখানে ব্যক্তিগত অভাববোধ বা সমস্যা তেমন ছায়া ফেলতে পারে নি। তবে জীবনের শেষ পর্যায়ে শারীরিক অসুস্থতা অভিনেত্রীকে টেনে নিয়ে গেছে যন্ত্রণা আর কষ্টের আবর্তে। স্বল্প পরিসরে সুলিখিত এই রচনা 'মণি'-আশ্চর্যময়ীদের অলঙ্কারে হীরকদ্যুতির মতো।



নবান্ন নাটকে ছোট বউ বিনোদিনী, ‘ছেঁড়া তার’এ ফুলজান বিবি, ‘বিসর্জন’এ গুণবতী, ‘ওয়াদিপাউস’এ ইয়োকান্তে,কাঞ্চনরঙ্গে তরলা, ‘বাকি ইতিহাস’এ কণা, ‘চোপ আদালত চলছে’তে বেনারে, পুতুল খেলায় বুলু ও ‘রাজা’ নাটকে রাণী সুদর্শনা প্রভৃতি স্মরণীয় চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন তৃপ্তি মিত্র। তবু তৃপ্তি মিত্র বাঙালি নাটকপ্রিয় দর্শকের কাছে নন্দিনী চরিত্রের জন্য কিংবদন্তী হয়ে আছেন। তিনি নন্দিনী চরিত্রে এতটাই আলোচিত ও প্রসংশনীয় যে পরবর্তীকালে অন্য কোনো অভিনেত্রীর পক্ষে সেই উচ্চতায় পৌঁছানো কঠিন ছিল। তাঁর অভিনয়ের মধ্যে ছিল স্নেহ, তেজ, এবং প্রাণোচ্ছল ভালোবাসা, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখতো। 'রক্তকরবী' নাটকের 'নন্দিনী' চরিত্রটি তৃপ্তি মিত্রের কিংবদন্তী অভিনয়ের প্রতীক হয়ে আছে। বহু লেখায় জেনেছি `রক্তকরবী` রচনার পর থেকে আজ পর্যন্ত যতবারই নাটকটি মঞ্চস্থ করার আয়োজন হয়েছে ততবারই বিপদে পড়তে হয়েছে। কারণ সব চরিত্রের জন্য উপযুক্ত কাউকে পাওয়া গেলেও নন্দিনী চরিত্রের জন্য খুঁজে পাওয়া ভার। কবিগুরু যেভাবে চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন তার সঙ্গে মিলিয়ে শিল্পী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নিজেই এই সমস্যায় পড়েছিলেন। রচনার পর ``রক্তকরবী`` মঞ্চায়ন করতে গিয়েছিলেন তিনি। অভিনয়ের জন্য সব চরিত্র তিনি চূড়ান্ত করেছেন। শুধু বাকি নন্দিনী। নন্দিনী চরিত্রের মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে একটি মেয়ে পাওয়া গেল, যে নন্দিনী হতে পারে। মেয়েটি সিলেটের। রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাকে নন্দিনী হিসেবে চূড়ান্ত করেছিলেন। নাম না জানা সেই মেয়েটিই আমাদের প্রথম নন্দিনী। কলকাতার বাঘা বাঘা অভিনেত্রী থাকতে সিলেটের সেই তরুণীই রবীন্দ্রনাথের চোখে প্রকৃত নন্দিনী হয়ে উঠেছিলেন। যদিও রবীন্দ্রনাথ তার জীবদ্দশায় রক্তকরবী মঞ্চস্থ করতে পারেননি। তাহলে একবার ভাবো সেই নন্দিনী হয়ে তৃপ্তি মিত্র কিংবদন্তী হয়ে গেছেন।



অভিনয়ের ক্ষেত্রে রক্তকরবী কেন অনন্যতার মর্যাদা পেয়েছিল, যদিও তার আগে রবীন্দ্রনাথের চার অধ্যায় অভিনীত হয়েছে, তবু তাতে স্বল্পসংখ্যক অভিনেতা কাজ করেছিলেন। রক্তকরবী নাটকে চরিত্রের সংখ্যা অনেক বেশি এবং প্রায় সব চরিত্রই উচ্চমানের অভিনয় দাবি করে। আর চার অধ্যায় নাটকের কাহিনির চেয়ে রক্তকরবীর কাহিনি আলাদা, তার সংলাপের ধরনও পৃথক। রক্তকরবীর মঞ্চ, আলো, আবহ, পোশাকভাবনা, অভিনয় এবং সর্বোপরি নাট্য-উপস্থাপনার অনন্যতা মানুষকে নিয়ে যেত শিল্প-অভিজ্ঞতার সেই স্তরে, যেখানে সচরাচর কেউ পৌঁছতে পারে না। রক্তকরবীর মঞ্চায়ন শুধু রবীন্দ্রনাটকেই নয়, বাংলা নাটকেও নবীন মাত্রা সঞ্চার করেছিল। বহুরূপীর প্রযোজনাটি কতটুকু বিন্যাসে রাবীন্দ্রিক আর অর্থযোজনার দিক থেকে কতটুকু রবীন্দ্রানুসারী, এ নিয়ে এক সাংস্কৃতিক ঝড়ই বয়ে গিয়েছিল, কত রকমের সমালোচনাই না হয়েছে পক্ষে আর বিপক্ষে। বিরোধিতা এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও তার সরকারের সমালোচনা করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই প্রযোজনা – এ-কথা দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছিল। এতে বহুরূপী গোষ্ঠী বিমূঢ় বোধ করলেও এর মঞ্চায়ন থেকে সরে আসেনি। বরং দিল্লিতে মঞ্চায়নকালে জওহরলাল নেহরু সংসদ অধিবেশন থেকে ছুটে এসেছিলেন বহুরূপীর রক্তকরবী দেখতে। তিনি শুধু পছন্দই করেননি, রীতিমতো প্রীতিবোধ করেছেন। বহুরূপীর এই দিল্লি বিজয়ের পর অব্যাহত ধারায় ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত এর অভিনয় হয়েছে। কলকাতা তো বটেই, দিল্লি, মুম্বাই, এলাহাবাদ এবং বিদেশ থেকে সুনাম কুড়িয়েছিল।



আমি ঠিক বুঝিনা কিন্তু প্রায়শ মনে হয় আজ তোমাকে লিখতে গিয়ে আরো বেশি করে মনে হচ্ছে তৃপ্তি মিত্র তাঁর প্রতিভা ও কাজের যথাযথ সম্মান পাননি, আলোকিত ও স্মরণীয় হবার সবরকম বিশেষত্ব থাকার পরেও তিনি বিস্মৃত কেননা তিনি প্রথমত নারী, দ্বিতীয়ত শম্ভু মিত্রের স্ত্রী, তৃতীয়ত শাঁওলি মিত্রের মা এবং সর্বোপরি তিনি নারী! শম্ভু মিত্রকে কোনভাবেই ছোট না করে আমি তৃপ্তি মিত্রকে দেখতে পাই শম্ভু মিত্রের পাশে কোন কোন ক্ষেত্রে শম্ভু মিত্রের আগেও। আমি কারো অভিনয়ই সরাসরি দেখিনি কিন্তু শম্ভু মিত্র যত ভালোই অভিনেতা হোন তিনি তৃপ্তি মিত্রকে অতিক্রম করতে পারেননি। এই প্রসংগে মনে করতে পারি দুজনের বিবাহ বিচ্ছেদ, প্রধান কারণ ছিল তাঁদের পেশাগত জীবনে সৃজনশীল মতপার্থক্য এবং মতাদর্শগত সংঘাত। তাঁদের বিচ্ছেদ ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে তাঁদের অভিনীত নাটক ও নাট্যদল 'বহুরূপী'-র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সঙ্গেই বেশি জড়িত ছিল। শিখরস্পর্শী স্ত্রী অভিনেত্রী তৃপ্তির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা। এ কি ছিল কেবল ব্যক্তিত্বের সংঘাত কিংবা পঠন-পাঠন অভিজ্ঞতা ও অভিনয়ে অনন্য দুই নাট্যব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব? এই মুহূর্তে স্পষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়। বাংলা নাটকে অভিনয়কুশলতা ও নবনাট্যের বোধ ও আদর্শ সঞ্চারিত করার জন্য এই দম্পতি জীবনের প্রারম্ভে ও মধ্যপর্যায়ে যে-অবদান রেখেছিলেন সংসারের সকল দাবিকে অগ্রাহ্য ও তুচ্ছ করে, তার বিশাল মূল্য রয়েছে। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও দেখা যায়, তৃপ্তি মিত্র যখন কর্কট রোগে ধ্বস্ত এবং মৃত্যুর অতল অন্ধকারের মুখোমুখি শম্ভু মিত্র কত না প্রেমে তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন, স্বপ্ন ও অতীতকাতরতায় প্রাণিত করতে চেয়েছেন। এই মানবিকতা প্রকাশ শম্ভু মিত্রের পক্ষে আগে সম্ভব ছিল না। কেননা তিনি তৃপ্তি মিত্রের খ্যাতি ও নাট্যজ্ঞানের কাছে হারিয়ে যাবার ভয় পেতেন এক পুরুষ হিসেবে। শম্ভু মিত্রের স্বেচ্ছানির্বাসনের যে-বিবরণ পাই তা খুবই কৌতুককর এবং নানা অনুষঙ্গভরা এক বিবরণ। তাঁর অন্তিম জীবনের খুঁটিনাটি এবং দাম্পত্য জীবনে তৃপ্তির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা বহুরূপীর নির্মাণ ও সৃষ্টির পথকে কণ্টকময় করে তুলেছিল – নির্দ্বিধায় এ-কথা তো বলাই যায়। বিনোদিনী দাসীর আত্মজীবনী 'আমার কথা'য় থিয়েটারের মালিক, পরিচালক এবং পৃষ্ঠপোষকরা প্রায়শই নারী শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবনে শোষণের এক নির্মম দলিল, যেখানে দেখা যায় পুরুষরা তাঁদের প্রতিভা ব্যবহার করলেও সামাজিক সম্মান বা স্থায়ী স্বীকৃতি দেননি। বিনোদিনী দাসী থেকে হালের নারী অভিনয় শিল্পীর জীবনে সেই অবস্থার কি খুব পরিবর্তন এসেছে? আমার তো মনে হয়না।



বেলা গড়িয়ে গেছে কখন বুঝতেই পারিনি। আজ আর লিখছিনা আচ্ছা ঋত্বিক ঘটককে তুমি কিভাবে দেখো তোমার চোখে মননে মানুষটি কেমন জানার ইচ্ছে রইলো। কখনো সময় সুযোগ হলেও জানিও।



নিরন্তর ভালো থেকো…

সুস্মি

১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫

0 comments: