0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in




















১৮

বের্নহার্ডের বাজনার প্রভূত উন্নতি হচ্ছিল ক্রমেই। সে নিজেও উৎফুল্ল বোধ করছিল তার অগ্রগতিতে। তার সুর লাগানোর ক্ষমতা এবং চলন আরও স্বচ্ছন্দ এবং শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। বাজনার প্রতিটি স্বর আরও ভরাট অথচ কোমল হয়ে উঠছিল। গানের কথার মতো স্পষ্ট এবং পরিশুদ্ধ হয়ে সুরের টুকরোগুলি বেজে উঠছিল তার হাতের ছোঁয়ায়। শপ্যাঁ রচিত একক সঙ্গীতের বিশেষ কঠিন সংবেদী বিন্যাসগুলিও সহজে মূর্ত হয়ে উঠছিল তার নিয়মিত অভ্যাসের ফলে। বাজনার নিরবচ্ছিন্ন সুরেলা অনুরণন বজায় রেখে সে ছড়িয়ে দিতো এক নির্ভার মাদকতা।

দুর্ভাগ্যবশত, বেটসিকে শেখাতে গিয়েও সে বাধাহীনভাবে বাজাতে পারত না। কারণ তাদের অন্যান্য আমেরিকান বন্ধুরা প্রায়ই এসে ডাকাডাকি করত। ওরা বলতো বন্ধু… আসলে বেশ কিছু নির্বিকার অল্পবয়েসি ছেলেমেয়ে, যাদের দেখতে, পোশাক পরিচ্ছদে, ভাষায়, চলনে বলনে আর নামেও প্রায় অনেকটাই ওদেরই মত। বেটসির খিদে পেয়ে যেত; তার গাড়ি পথে এসে অপেক্ষা করত। অবশেষে নিজেরই বিছিয়ে দেওয়া সুরের মায়াজালে আচ্ছন্ন থাকা বের্নহার্ডকে টেনেহিঁচড়ে পিয়ানো থেকে তুলে নিয়ে ডিনারে যেত ওরা।

প্রায় প্রতিদিন এই আমেরিকান তরুণ তরুণীর দলটার সঙ্গে ডিনার খেতে যেত বের্নহার্ড, যেটা অবশ্য তার পক্ষে মঙ্গলজনক হয়েছিল। তাছাড়া সে ভালই উপার্জন করছিল। বেটসি পরের দিনের বেতনটা ডলারে হিসেব করে তাকে দিয়ে দিত, কারণ সে বুঝতে পেরেছিল যে একা নতুন শহরে একজন ইউরোপিয়ান ছাত্রের আর্থিক প্রাচুর্য নাও থাকতে পারে।

এই হল বের্নহার্ডের বর্তমান পরিস্থিতি। সে আপাতত দুই হাত ঘাড়ের নিচে রেখে নিজের বিছানায় শুয়ে আছে। বিছানার পাশে টেবিলে ছাইদানে নিঃশব্দে একটা সিগারেট পুড়ে যাচ্ছে।

সে ভাগ্যবান। তার কপালের অস্বাভাবিক জোর আছে। চারপাশে সবাই তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে। তাকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করে। তাকে "ছোট্ট বন্ধু” কিম্বা “বাচ্চা” এরকম সম্বোধনে ডাকে। পয়সা ভালই দিচ্ছে, চকলেট খাওয়াচ্ছে। বিশাল পিয়ানোটা, যেটার শব্দ অসাধারণ গমগমে অথচ নরম, সেই বাদ্যযন্ত্রে রোজ অভ্যেস করতে দিচ্ছে। এককালে গের্ট এবং ইনেস যেভাবে তাকে প্রশ্রয় দিত, সবসময় প্রচ্ছন্ন ভালবাসায় ঘিরে রাখতো, এরাও ঠিক সেভাবেই তাকে ঘিরে আছে। সে এখন বেটসির আভিজাত্যপূর্ণ কালো গাড়িটাতে চড়ে প্যারিস শহর চষে বেড়াচ্ছে এবং তার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সোয়েটার, সিগারেট, ক্ন্যাগির জন্য ছোট শক্ত কেক এসব কেনাকাটা করছে।

কিন্তু শুধুমাত্র বেটসি যে তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, ব্যাপারটা এমন নয়। মাদাম দুবোয়া যে তাকে পছন্দ করেন বেশ, সেটাও বোঝা যায়। তিনি সবসময় যাতে তার জামাকাপড়, মোজা এগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে, গুছিয়ে রাখা থাকে, এদিকে বিশেষ খেয়াল রাখেন। তার সঙ্গীতশিক্ষকও তার প্রতি অত্যন্ত সদয়। এমনকি চার্লস, তার বন্ধু যে সবসময় গোমড়ামুখে তিরিক্ষি মেজাজে অথবা অদ্ভুত উদাসীন ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়ায়, সেও তাকে বিশেষভাবে পছন্দ করে। আজ তার সঙ্গেই সে জেরাল্ডের বাড়ি যাবে। এই জেরাল্ডের সঙ্গে দেখা করবার জন্য সে সাগ্রহে অপেক্ষা করছে।

চার্লস যথারীতি বিষণ্ণ এবং গম্ভীর মুখে বের্নহার্ডের ঘরে এসে উপস্থিত হল। সে আজই জেরাল্ডের সঙ্গে হেস্তনেস্ত করতে চায়। অনেকদিন অপেক্ষা করেছে সে। তাছাড়া ওই নেকুপুষু মিকাকে নিয়ে তার মনে এখন আর কোনও বিশেষ ভাবনা নেই। জেরাল্ড মিকার কথায় পাত্তা দিলে দেবে, সেসব নিয়ে এখন আর তার কোনও মাথাব্যথা নেই। মোট কথা, সেদিন যে জেরাল্ড তাকে সবার সামনে বিশ্রীভাবে অপমান করেছিল, সেই ব্যাপারে একটা মোকাবিলা সে আজই করতে চায়। উদার ভঙ্গিতে ঘুরিয়ে মাথাটা ঘুরিয়ে কাত করে এক অদ্ভুত বিনীত স্বরে বলে ওঠে সে… ‘তুমি আগ্রহী হলে আমার সঙ্গে অন্তত আসতে পারো!’

বের্নহার্ড জানায় যে সে খুবই আগ্রহী কারণ সে জেরাল্ডকে দেখতে চায়… “কেমন ব্যক্তি, যাকে তুমি এত ভয় পাও!” যদিও চার্লস মাথা নেড়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে অস্বীকার করে তার ভীতির কথা, তবুও বের্নহার্ড লক্ষ্য করে যে যত তারা জেরাল্ডের বাড়ির দিকে এগোচ্ছে, তত মনে হচ্ছে যে চার্লস ভিতরে ভিতরে খুব ঘাবড়ে গিয়েছে। সব কথার সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছে। খুব তাড়াহুড়ো করে একগুঁয়ে ভঙ্গিতে পথে হাঁটছে। বেশ কয়েকবার বাস চাপা পড়তে পড়তে বাঁচলো চার্লস।

যাই হোক, এখানে এই কথাটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বের্নহার্ড এখনো আবিষ্কার করেনি যে এই দুই জেরাল্ড আসলে একই ব্যক্তি; তার সঙ্গীতশিক্ষকের বাড়িতে প্রথমদিন পিয়ানো বাজাতে বাজাতে শিক্ষকের যে ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেই ব্যক্তি, এবং রবার্টের কাছে যাতায়াত করা ব্যক্তি যার বিষয়ে শহরে অজস্র গুজব ভেসে বেড়ায় এবং লোকে একথাও বলে যে তার এপার্টমেন্টে সুসজ্জিত মেক-আপ করা কচি কচি বার গার্লদের যাতায়াত আছে, এই দুজন যে একই ব্যক্তি, সেটা বের্নহার্ড এখনো জানে না।

চার্লস এবং বের্নহার্ড গিয়ে জেরাল্ডের দরজায় ডোরবেল বাজানোর পর এক তরুণ বাটলার বেরিয়ে আসে, সাদা আর নীল রঙের ডোরাকাটা জ্যাকেট পরা। তাদের প্রশ্নের উত্তরে বিনীত ভঙ্গিতে সে বলে যে মঁসিয়ে জেরাল্ড বাড়িতেই আছেন এবং শীঘ্র তাদের স্বাগত জানাবেন।

হে পাঠক, এই বিন্দুতে এসে আপনি অবশেষে জেরাল্ডের এপার্টমেন্টে প্রবেশ করলেন বের্নহার্ডের সঙ্গে। ঢুকেই সামনে প্যাসেজের দিকটা কার্পেট মোড়া, যথেষ্ট জায়গা জুড়ে একটা আভিজাত্যপূর্ণ গৃহসজ্জা। কোট ঝুলিয়ে রাখার চওড়া শেলফের উপরে দুটো ছোট হালকা রঙের ল্যাম্প জ্বলছে। একটা আলো সরাসরি রাখা আছে একটা বড় আয়নার মাথায়। আয়নার সামনে একটা ছোট টেবিলের উপরে চিরুনি, ব্রাশ, ছোট তোয়ালে রাখা। একটা পর্দার পেছনে হাত ধোবার বেসিন দেখা যাচ্ছে, সেটার উপরেও একটা আলো জ্বলছে।

এপার্টমেন্টের ভিতরের প্যাসেজের অংশটির চরিত্র একেবারে নিরপেক্ষ বলা যেতে পারে। আধুনিক গৃহসজ্জা যেমন হয়, তেমনি সব সুবিধে আছে। ছেলেরা নিজেদের কোট খুলে শেলফে ঝুলিয়ে রাখে। বের্নহার্ড আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলটা একবার ব্রাশ করে নেয়। এদিকে চার্লস অধৈর্য ভঙ্গিতে কার্পেটের উপরে এসে দাঁড়ায়। প্রস্থানোদ্যত বাটলারের দিকে ভীরু অথচ সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকায় সে; তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত উত্তেজিত। বের্নহার্ডের চুল ব্রাশ করা হয়ে গেলে বাটলার ছোকরাটি সামনের অংশ থেকে আরেকটু ভেতরে এগিয়ে আরেকটা ঘরের দরজা খুলে ধরে দাঁড়ায়। সেই ঘরের আলো অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল। এই ঘরটি বসার ঘর কিম্বা অপেক্ষা করবার ঘর। একটা টেবিলের উপরে প্রচুর বই, ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ রাখা আছে। চারপাশে অজস্র চেয়ার।

হে পাঠক, আপনি এই আরামপ্রদ চেয়ারগুলির যে কোনও একটায় বসে, হাই তুলতে থাকা একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠবার জন্য, টেবিলে রাখা ম্যাগাজিনগুলিতে চোখ বোলাতে পারেন।



(চলবে)

0 comments: