প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়
Posted in প্রচ্ছদ নিবন্ধ১ ভূমিকা
যারা দেশের অর্থব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ধ্বসিয়ে দেবার চেষ্টা করে তাদের দেশদ্রোহী বলবেন কি বলবেন না ভেবে নিন। ধরুণ, যারা দেশের সাধারণ মানুষের কষ্টসঞ্চিত টাকাপয়সা সরকারী ব্যাংককে বোকা বানিয়ে বা সোজাসুজি ঠকিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গিয়ে মৌজমস্তি করছে, বিলাসে ডুবে আছে, খেলার মাঠে দুই পরীকে বগলদাবা করে হাজির হয়ে আমাদের দেশের অর্থব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে তাদের কী ক্রিমিনাল মনে করবেন না? তাদের মনে মনে শাপ দেবেন না—‘হেঁটোয় কণ্টক দাও, উপরে কণ্টক” !
তবে আগে তো তার টিকির নাগাল পান, তাদের হাতকড়ি পড়িয়ে এদেশে নিয়ে আসুন, যেমনটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বে-আইনি ভাবে আমেরিকায় ঢোকা ভারতীয় “অনুপ্রবেশকারী”দের এদেশে ফেরত পাঠিয়ে ছিলেন। কিন্তু তারা যদি অনুতপ্ত হয়, ক্ষমা চায়? তখন কী করবেন? অনুতাপে মানুষ শুদ্ধ হয়, পবিত্র হয়।
শ্যামার জন্যে বজ্রসেন ক্ষমা চেয়েছিল। মানুষশিকারী অঙ্গুলিমালকে ভগবান বুদ্ধ ক্ষমা করেছিলেন। আর এরা তো খুনটুন করেনি, কেবল আর্থিক ফ্রড করেছিল। আমাদের ট্র্যাডিশন আমাদের সংস্কৃতি কী বলে?
—“-- ভালবাসো, অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো” ।
এমনই একটি ক্ষমা চাওয়া এবং পাওয়ার কেস হল সন্দেসরা ভাইদের। নীতিন ও চেতন সন্দেসরা হলেন ‘স্টারলিং বায়োটেক লোন ফ্রডের নায়ক। ওদের পুরো পরিবার মিলেমিশে আমাদের দেশের কিছু ব্যাংককে ঠকিয়েছে। কত টাকা? ১৬০০০ কোটি!
২ পলাতক সন্দেসরা পরিবারঃ এককালীন কিছু টাকা দিয়ে সমঝোতা ও সুপ্রীম কোর্ট
গত ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে সুপ্রীম কোর্টের একটি রায়ে ব্যাংক ফ্রড করে বিদেশে পলাতক দুই ভাই, নীতিন ও চেতন সন্দেসরা বড় রকম সুবিধে পেয়েছে। এককালীন কিছু টাকা জমা করার কড়ারে ওদের ক্ষমা করে সমস্ত এফ আই আর তুলে নেয়ার নির্দেশ জারি করেছে মহামান্য আদালত। সরকার পক্ষও সহমত।
ওরা কোথায়? ২০১৭ সালে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তারপর নাইজেরিয়াতে গেড়ে বসেছে। তদন্ত কে করেছে? ভারত সরকারের সিবি আই ও ইডি। সরকার মনে করে এগুলো ক্রিমিনাল কৃত্য। তাই অনেকগুলো এফ আই আর করা হয়েছিল। ওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ -- মানি লন্ডারিং (বে-আইনি ভাবে বিদেশে টাকা পাচার), বিদেশে ‘শেল কোম্পানি’ (নকল কোম্পানি) খোলা, বেনামি ফার্মের মাধ্যমে জালি লেনদেন দেখিয়ে টাকা ব্যাঙ্কের টাকার অপব্যয় করা। সেপ্টেম্বর ২০২০ নাগাদ ভারত সরকার ওদের আইনি ব্যবস্থার সংগে সহযোগিতা না করার অপরাধে “ পলাতক আর্থিক অপরাধী” (Fugitive Economic Offender) ঘোষণা করে।
লক্ষণীয় যে ২০১৮ সালের Fugitive Economic Offender আইন অনুসারে -- যাদের অমন দাগিয়ে দেয়া হয়, তারা বা তাদের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কোম্পানি কোন সিভিল আদালত বা ট্রাইব্যুনালে কোন দেওয়ানি মামলা করতে পারবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে হলে আদালতে আইনের সাহায্যে ডিফেন্ড করতে পারবে না। সন্দেসরা ভাইদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো দেওয়ানি এবং ফৌজদারি মামলা করা হয়। যেমন, PMLA, Fugitive Economic Offender Act, SFIO, Black Money Act, Income Tax আইনের বিভিন্ন ধারায়।
কিন্তু তারা অনেকটা বকায়া ঋণ শোধ করার প্রতিশ্রুতি দিলে তাদের সুপ্রীম কোর্ট নির্দিষ্ট শর্তে ক্ষমা করার এবং সব মামলা (দেওয়ানি এবং ফৌজদারি সি বি আইকোর্ট বা ইডি) তুলে নেয়ার আদেশ জারি করে।
গত ১৯ নিভেম্বর, ২০২৫ এর রায়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলে—যদি অপরাধীরা এক থোকে ৫১০০ কোটি টাকা জমা করে তবেই; নচেৎ নয়।
মাননীয় আদালতের যুক্তিঃ ওরা দুই দশক আগে ব্যাংকগুলোর থেকে লোন নিয়ে মেরে দিয়েছিল ৫৩৮৩ কোটি টাকা। যা ইডির মতে সুদে আসলে দাঁড়িয়েছে ১৬০০০ কোটি টাকা। ইডি এরমধ্যে ওদের ১৪৫২১ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। (সমঝোতা হয়ে ওদের বিরুদ্ধে কেস উঠে গেলে এই সম্পত্তি ওদের ফেরত করে দেয়া হবে)।
ইতিমধ্যে সন্দেসরা ভাইয়েরা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে দরদাম করে চুক্তি করেছে যে ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে এককালীন ৩৮২৫ কোটি টাকা এবং বিদেশি জামিন থাকা কোম্পানিগুলোকে ২৯৩৫ কোটি টাকা দিয়ে One Time Settlement করে ঝামেলা চুকিয়ে দেবে। মানে, ১৬০০০ কোটি টাকা লোন ফ্রডের ফয়সালা হবে মোট ৬৭৬১ কোটি টাকা দিয়ে। অর্থাৎ ব্যাড লোন মাফ করা হোল ৯২৩৯ কোটি (=১৬০০০-৬৭৬১) টাকায়। তাহলে অত টাকা ডুবল কার? সরকারের, মানে নাগরিকদের।
ঠিক আছে। তবে ওই ৬৭৬১ কোটি টাকার মধ্যে কত টাকা আদায় হয়েছে? আদালতের হিসেবে ৩৫০৭.৬৩ কোটি টাকা। এছাড়া ওদের দেউলিয়া ঘোষণা করে ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল এর আদালতি পদক্ষেপে স্টারলিং বায়োটেক, স্টারলিং এস ই জেড এবং পিএম টি মেশিন কোম্পানিগুলো থেকে মোট আদায় হয়েছে ১১৯২ কোটি টাকা। অতএব, আদালতের হিসেবে সমঝোতা রাশির বকায়া রয়েছে ২০৬১.৩৭ কোটি টাকা। সুপ্রীম কোর্টে সরকারের সলিসিটর জেনারেল বলেন -সব মিলিয়ে অন্ততঃ ৫১০০ কোটি টাকা জমা করলে তবে ঠিক হবে। (এতে আনুষঙ্গিক খরচা যোগ করা হয়ে থাকে)।
সরকার মনে করে সন্দেসরা পরিবার বহু বছর ধরে নাইজেরিয়া এবং আলবেনিয়ায় বসবাস করছে। ওদের বিষয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার (এক্সট্রাডিশন) আবেদন লটকে রয়েছে। ওদের বিদেশে গ্রেফতারের জন্যে জারি রেড কর্নার নোটিসও ঠান্ডা হয়ে যায় নি।
তবে সুপ্রীম কোর্ট তার রায়ে বলেছে দুটো কথাঃ
এক, অনাদায়ী পাবলিক মানি’র একটা বড় অংশ উদ্ধার হয়ে গেলে সরকারের কেস চালানোর কোন মানে হয় না। তাই সমস্ত এফ আই আর বাতিল করা হোক। সরকার আপত্তি করে নি।
দুই, তবে এই রায় একটি বিশেষ কেসে ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য হবে। একে উদ্ধৃত করে পরে কেউ অনুরূপ সুবিধে পাবে না।
কিন্তু , একজন অভিজ্ঞ সিনিয়র ইডি অফিসার বলেছেন যে সুপ্রীম কোর্ট বলেছেন বটে, কিন্তু আর যারা পালিয়েছে তাদের উকিলেরা ঠিক রাস্তা বের করে নেবে।
৩ অন্য পলাতকেরাঃ বর্তমান হাল-হকিকত
চারজন রাঘব বোয়ালের কথা বলা যাক।
৩.১ বিজয় মালিয়া
স্টেট ব্যাংক সমেত ১৭টি ব্যাংকের কনসর্টিয়াম বিজয় মালিয়ার বিরুদ্ধে কিং ফিশার এয়ারলাইনসের নামে ঠকিয়ে লোন নেয়ার এবং মানি লণ্ডারিং করার অভিযোগ করল । সি বি আই ও ইডি তদন্ত করে কেস দিল। মালিয়া ২ মার্চ, ২০১৬ সালে ইউ কে তে পালিয়ে গেল। ডেট রিকভারি ট্রাইব্যুনালের হিসেবে ২০১৩ সালে মূল ফ্রড লোন ছিল ৬০৯৭ কোটি টাকা। সুদে আসলে এখন সেটা হয়েছে ১৭৭৮১ কোটি টাকা।
আদায় হয়েছে কত? বিত্ত মন্ত্রকে ২০২৫ এর বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী ইডি ১৪০০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংকদের হস্তান্তর করেছে।
মালিয়াকে ভারত সরকার পলাতক আর্থিক অপরাধী” (Fugitive Economic Offender) ঘোষণা করেছে। যুক্তরাজ্যের একটি আদালত ওকে ভারতে বন্দী হিসেবে ফেরত পাঠানোর আদেশ দিয়েছে। তবে ব্রিটিশ সরকারের অন্তিম কদমের অপেক্ষায় সবাই। ততদিন মালিয়া ওদেশেই থাকবে।
৩.২ নীরব মোদীঃ
পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৩০০০ কোটি টাকা জালিয়াতির মুখ্য অভিযুক্ত। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হল --ওই ব্যাংকের ব্র্যাডি হাউস শাখা মুম্বাই থেকে জাল লেটার অফ আন্ডারটেকিং ইস্যু করানো, এবং সিবিআইয়ের কথায়—ব্যাংক আধিকারিকদের সঙ্গে যোগসাজশে বিদেশে টাকা পাচার ইত্যাদি।
ব্যাংককে কত টাকা ঠকানো হয়েছে? ৬৪৯৮ কোটি টাকা।
টাকা আদায়ঃ ইডি নীরব মোদীর জুয়েলারি এবং ফার্ম হাউস মিলিয়ে মোট ২৬২৬ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংককে ১০৫২ কোটি টাকার সম্পত্তির দখল দিয়েছে।
বর্তমান অবস্থা
নীরব মোদীকে পলাতক আর্থিক অপরাধী ঘোষণা করে যুক্তরাজ্যে ২০১৯ সালে গ্রেফতার করানো হয়েছিল। ও যাতে ফিরে আসতে না হয় তার জন্যে বিলেতের আদালতে আইনি লড়াই করছে। তবে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ‘প্রত্যর্পণ চুক্তি’ (extradition pact) আছে। তাই ভারত ওকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্যে আইনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
৩.৩ মেহুল চোকসি
ইনি উপরোক্ত পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক ফ্রড কেসে নীরব মোদীর সংগে সহ-অভিযুক্ত। ইনিই মাস্টারমাইন্ড। এঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ-- শেল ফার্মের মাধ্যমে জালিয়াতির সাপ্লাই চেন তৈরি করার পরিকল্পনা, বিদেশে টাকা পাচার এবং নকল হীরে বিক্রি করা।
কত টাকা আদায় করতে হবে?
এঁর সমস্ত ফার্ম মিলিয়ে ব্যাংককে দেয় টাকা ৬০৯৭ কোটি।
আদায় হয়েছেঃ
ইডি চোকসির প্রায় ২৫৬৫ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। বিত্ত মন্ত্রকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এর পাওনাদারদের ৩১০ কোটি টাকার সম্পত্তি দেয়া হয়েছে। অন্য সম্পত্তিগুলো ব্যাংককে দেয়ার আইনি কাজ এগিয়ে চলেছে।
বর্তমানেঃ ইনি ২০১৮ সালে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। আন্টিগুয়া এবং বারবুডা নামের দুটো ক্যারিবিয়ান দ্বীপের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছেন। এঁকে ডোমিনিকায় মে ২০২১ সালে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু আইনের ফাঁকে পালিয়ে যায়। এইবছরের গোড়ায় বেলজিয়াম পুলিশ গ্রেফতার করে ওকে জেলে পোরে। বেলজিয়াম কোর্ট ভারতের প্রত্যর্পণের আবেদন মঞ্জুর করে। কিন্তু ও এখন ওখানকার সুপ্রীম কোর্টে আপিল করেছে।
৩.৪ যতীন মেহতা
রাঘববোয়াল ঠগ। ভারতে হীরের ব্যবসায়ে সবচেয়ে বড় ব্যাংক জালিয়াতির নায়ক। সার্কুলার ট্রেডিং (এর টুপি ওর মাথায়) এবং বুলিয়ন সিকিউরিটির ভিত্তিতে পাওয়া ব্যাংক লোনের পয়সা নয়ছয় করার দায়ে অভিযুক্ত। সবটা এখনও টের পাওয়া যায় নি। ইডি, সিবিআই এবং ব্যাংকের তদন্ত চলছে। ওর দুটো ফার্ম—দ্য উইনসাম ডায়মন্ডস এবং ফরএভার প্রেশাস জুয়েলারি-- ২০১৩ সালে ব্যাংককে ৬৮০০ কোটি পাওনা টাকা দেয় নি যা এখন ১০০০০ কোটি টাকার অংকও ছাড়িয়ে গেছে।
আদায়
ইডি ১০০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। যুক্তরাজ্যের আদালতে ব্যাংক মাত্র ১৫৭ কোটি টাকা উদ্ধার করতে পেরেছে।
বর্তমান অবস্থাঃ
২০১৩ সালে মেহতা ভারত থেকে পালিয়ে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সেন্ট কিটস্ অ্যান্ড নেভিস রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। ভারতের বিভিন্ন এজেন্সি ওকে ফেরত আনার অনুরোধ করে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো ওকে উইলফুল ডিফল্টার ঘোষণা করেছে। এখনও তদন্ত চলছে।
৪ যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু!
সুপ্রীম কোর্টের পরিবেশ আইন নিয়ে আরেকটি সাম্প্রতিক রায়ঃ পোস্ট ফ্যাক্টো ক্লিয়ারেন্স!
কারও মাথা কেটে ফের জোড়া লাগিয়ে দেয়া যায়? যায় না। যার মাথা কাটা গেছে তার আত্মীয়-পরিজনকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিলে হারিয়ে যাওয়া মানুষটার অভাব পূরণ হয়? হয় না। বনভূমি এবং পরিবেশ সুরক্ষা আইন ভেঙে বিনা অনুমতিতে ঘন অরণ্য কেটে সাফ করে কারখানা বানিয়ে তারপর পেনাল্টি দিলে কি রাতারাতি বনভূমি গজিয়ে ওঠে? পরিবেশের যা ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ হয়?
তাহলে সুপ্রীম কোর্ট গত ১৮ নভেম্বর তারিখে সুপ্রীম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ এটা কী রায় দিলেন? বিশেষ করে যখন দিল্লির পরিবেশ দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে?
মনে রাখা দরকার, ইন্ডাস্ট্রি বা কোন বাণিজ্যিক প্রোজেক্ট শুরু করতে হলে যে environmental clearance নিতে হয় সেটা কোন কাগুজে নিয়মপালন নয়—বরং এটি নাগরিকদের সুস্থ জীবনের জন্য একটি সাংবিধানিক সুরক্ষা। আর্টিকল ২১ আমাদের যে জীবনের অধিকার দেয়, তার আবশ্যিক অঙ্গ হল বিশুদ্ধ বায়ু, বিশুদ্ধ হাওয়া এবং বিশুদ্ধ পরিবেশ।
বনশক্তি বনাম ভারত সরকার কেস
পরিবেশ মন্ত্রক বিগত ২০১৭ সালে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে এবং পরে ২০২১ সালে আর একটি মেমোরান্ডাম জারি করে। সেগুলোর মাধ্যমে কোন প্রোজেক্টের পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাবের মূল্যায়নের (ETA Rules) নিয়মগুলোকে ঢিলে করে দেয়। তাতে সোজাসুজি “ডেভেলপার” দের প্রোজেক্ট শুরু করার পরে পরিবেশ সম্বন্ধিত গ্রীন ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট পাওয়ার রাস্তা খুলে দেয়া হয়।
ওই আদেশের বিরুদ্ধে মূম্বাইয়ের এনজিও বনশক্তি সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করে। এই কেসে সুপ্রীম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি গবইয়ের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বেঞ্চ ১৬ মে তারিখে রায় দিয়ে বলল—পোস্ট ফাক্টো ক্লিয়ারেন্স বা পরিবেশ আইন ভেঙে তারপর সেটার অনুমতি পাওয়া – পুরোপুরি বে-আইনি।
তারপর কনফেডারেশন অফ রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার্স অফ ইন্ডিয়া রিভিউ চেয়ে আবেদন করল। ওদের চিন্তা, এই রায়ের রিভিউ না হলে ২০০০০ কোটি টাকার পাবলিক প্রোজেক্ট ভেঙে দিতে হবে। তাই তিন সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চকে দায়িত্ব দেয়া হল।
কিন্তু সেই বেঞ্চ গত ১৮ নভেম্বরে ২-১ বিভক্ত রায়ে আগের রায় পুরোপুরি পালটে দিয়ে বিনা অনুমতি প্রোজেক্ট শুরু করে পরে গ্রীন ক্লিয়ারেন্স প্রমাণপত্র নেয়াকে বৈধ করে দিল!
জাস্টিস উজ্জ্বল ভুঁইয়া অসহমতি জাহির করে কারণ দেখালেনঃ
সুপ্রীম কোর্ট নিয়মিত পরিবেশ রক্ষার প্রাথমিক নীতিগুলোর পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে কমন কজ বনাম ভারত সরকার কেসে বলেছে—পরিবেশ রক্ষার সার্টিফিকেট কোন যান্ত্রিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্যে নয়। আর পোস্ট ফ্যাক্টো ক্লিয়ারেন্স পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করবে।
তিন বছর পরে অ্যালেম্বিক ফার্মাসিউটিক্যাল কেসেও জোর দিয়ে বলেছে -- পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাবের মূল্যায়নের (ETA Rules) নিয়মগুলোকে কড়াভাবে পালন করা উচিত।
বনভূমি এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্বের কথা তৎকালীন প্রধান বিচারপতি গবই বলেছিলেন।
দিল্লি এখন বিশ্বের ১০০টি দূষিত পরিবেশযুক্ত শহরের তালিকায় সবার উপরে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি জাস্টিস সূর্যকান্ত সেদিন দিল্লিতে প্রাতোভ্রমণে গিয়ে দূষিত আবহাওয়ায় অসুস্থ হয়েছেন।
আমরা কি আর একবার ওই রায় পুনর্বিবেচনার আশা করতে পারি?
*ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২ ডিসেম্বর, ২০২৫



0 comments: