0

প্রবন্ধ - ইন্দ্রনীল মজুমদার

Posted in








বিজ্ঞানের জন্য শহীদ হতে হয়েছে একজন বিজ্ঞান মনস্ক ব্যক্তিকে। আমরা দেশের জন্য শহীদ হতে শুনেছি। পরাধীন আমলে বিপ্লবীদের শহীদ হতে শুনেছি। কিন্তু, বিজ্ঞানের জন্য শহীদ! বিষয়টি বেশ আশ্চর্যজনক, তাই না? হ্যাঁ, এরকমটাই ঘটেছিল আজ থেকে চারশো বছর আগে ইউরোপে। যিনি শহীদ হয়েছিলেন তিনি কোনও রাজনৈতিক বিপ্লবী নন বরং তিনি বিজ্ঞান জগতে এক আলোড়ণ সৃষ্টি করেছিলেন বা বিপ্লব এনেছিলেন। তাই, তাঁকে বিজ্ঞানের এক 'শহীদ বিপ্লবী' বলাই যায়। তাঁর নাম জিওর্দানো ব্রুনো।


জিওর্দানো ব্রুনো ছিলেন একজন ইতালীয় বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। আজ থেকে চারশো পাঁচশো বছর আগে ইউরোপীয়রা বিশেষ করে গোঁড়া খ্রিস্টান ধার্মিকেরা মনে করত যে পৃথিবী স্থির, সূর্য, চাঁদ সহ বিভিন্ন নক্ষত্র, গ্রহ ও উপগ্রহরা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। মোটের ওপর বলা যায় যে, মহাবিশ্ব সম্পর্কে চার্চ বা গির্জার ধারণা ছিল যে মহাবিশ্ব পৃথিবীকেন্দ্রীক (Geocentric)। তৎকালীন ক্যাথলিক চার্চ অ্যারিস্টটল ও টলেমির 'পৃথিবীকেন্দ্রিক' তত্ত্বকে বাইবেলের আক্ষরিক ব্যাখ্যার সাথে মিলিয়ে এক অকাট্য ধর্মীয় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল—যেহেতু মানুষ ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, তাই পৃথিবীকেই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থির থাকতে হবে। ব্রুনো যখন এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করলেন, চার্চ তাকে কেবল বৈজ্ঞানিক ভুল নয়, বরং সরাসরি 'ধর্মদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য করল। জিওর্দানো ব্রুনো এই শিক্ষার বিরোধিতা করে নিকোলাস কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক (Heliocentric) ধারণাকে সমর্থন করেছিলেন। অর্থাৎ, তিনি মনে করতেন যে সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী সহ নানান গ্রহগণ ও তাদের উগ্রহগণ আবর্তিত হচ্ছে। কোপারনিকাস ও ব্রুনোর ধারণাটি পরবর্তীকালে বিজ্ঞানের জগতে স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু, তৎকালীন সময়ে ইউরোপে চার্চের বিরুদ্ধে যাওয়া এক বিশাল অপরাধ এমনকি মৃত্যুদণ্ড ছিল। আবার, ব্রুনো বিশ্বাস করতেন যে, মহাবিশ্ব অসীম এবং সেখানে আমাদের পৃথিবীর মতো অসংখ্য বসবাসযোগ্য জগত বা গ্রহ রয়েছে। এই ধারণাটিও তৎকালীন চার্চের বিরোধী ছিল। চার্চ বা বলা ভালো ধর্মীয় গোঁড়ামি তাঁকে কি আর ছেড়ে কথা বলবে? ইনকুইজিশন (ক্যাথলিক চার্চের দ্বারা পরিচালিত একটি বিশেষ বিচার ব্যবস্থা বা তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান)-এর সামনে তাঁকে এনে তাঁর বিশ্বাস প্রত্যাহার করতে বলা হয়। কিন্তু , তিনি তাঁর বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে অনড় ছিলেন আর তাই তিনি তাঁর বিশ্বাস প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করেন। আর এর ফলে, চার্চের দ্বারা তাঁকে নানাভাবে নির্যাতন করা হয় এবং প্রকাশ্যে রাস্তায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এতটাই নৃশংস ও হিংস্র ছিল মধ্যযুগের ইউরোপীয় ধর্মীয় মৌলবাদ।

শৈশব ও প্রারম্ভিক জীবন


ফিলিপ্পো ব্রুনোর জন্ম হয়েছিল ১৫৪৮ সালে ইতালির নোলা শহরে। তাঁর পিতার নাম জিওভান্নি ব্রুনো যিনি ছিলেন একজন সৈনিক আর মাতার নাম ফ্রাউলিসা সাভোলিনো। ১৫৬১ সালে তিনি সেন্ট ডোমিনিকোর মনাস্ট্রি বা মঠ বা আশ্রমের স্কুলে ভর্তি হন। এই আশ্রমটি পরিচিত ছিল তার বিখ্যাত সদস্য থমাস অ্যাকুইনাসের জন্য। জিওর্দানো ব্রুনো ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। যদিও দার্শনিক হিসেবে তিনি ছিলেন কিছুটা ব্যতিক্রমী স্বভাবের কেননা, তাঁর মতাদর্শ প্রায়ই ক্যাথলিক চার্চের শিক্ষার সঙ্গে খাপ খেত না। তা সত্ত্বেও, তিনি ১৫৬৫ সালে নেপলসের সান ডোমিনিকো মাজিওরে কনভেন্টে প্রবেশ করেন এবং সেখানে ‘জিওর্দানো’ নাম গ্রহণ করেন। তাঁর নাম হয় ‘জিওর্দানো ব্রুনো’। তাঁর স্পষ্টবাদী ও ধর্মবিরোধী (heretical) মতামত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৫৭২ সালে তাঁকে ডোমিনিকান অর্ডারের যাজক বা পুরোহিত হিসেবে অভিষিক্ত করা হয় এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নেপলসে পাঠানো হয়।


নেপলসে থাকাকালীন তিনি প্রকাশ্যে বেশ কিছু ধর্মবিরোধী মত প্রকাশ্যে আলোচনা বা প্রকাশ করতে থাকেন। এই যেমন—এরিয়ান মতবাদ বা এরিয়ান ধর্মদ্রোহিতা (যেখানে বলা হয়েছিল খ্রিস্ট ঈশ্বরীয় নন)। এর ফলে তিনি চার্চের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন আর তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহের অভিযোগে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৫৭৬ সালে তিনি রোমে পালিয়ে যান। পরে তাঁর কিছু নিষিদ্ধ লেখা আবিষ্কৃত হলে তাঁকে আবারও পালিয়ে যেতে হয়। ঐ বছরেই তিনি ডোমিনিকান ধর্মসম্প্রদায় ত্যাগ করেন আর ইউরোপজুড়ে একজন ভ্রাম্যমাণ দার্শনিক হিসেবে ঘুরে বেড়িয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে থাকেন। স্মৃতিশক্তি উন্নতি করার জন্য তিনি ডোমিনিকান কৌশল শেখাতেন। আর এই শেখানোর জন্য তিনি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যে তাঁকে ফ্রান্সের রাজা তৃতীয় হেনরি এবং ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ প্রথমের নজরে নিয়ে আসে। নেমোনিক্সসহ স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করার জন্য তাঁর পদ্ধতিগুলো তিনি তাঁর বই 'দ্য আর্ট অফ মেমরি' বইতে বর্ণিত করে গিয়েছেন এবং আজও এই পদ্ধতিগুলো ব্যবহৃত হয়। ব্রুনো মনে করতেন মহাবিশ্বের গঠন এবং মানুষের মনের গঠন একই সূত্রে গাঁথা। তাঁর 'দ্য আর্ট অফ মেমরি' আজও গবেষকদের কাছে বিস্ময়।

চার্চের সঙ্গে সংঘাত


১৫৮৩ সালে ব্রুনো ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে যান এবং তারপরে অক্সফোর্ডে যান বক্তৃতা দিতে। অক্সফোর্ডে তিনি নিকোলাস কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর এই ধারণাগুলো যেহেতু তৎকালীন পৃথিবীকেন্দ্রীক ইউরোপীয় চার্চগুলোর বিরোধী ছিল তাই তাঁর এই বক্তৃতার ফলে তাঁকে শত্রুতাপূর্ণ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়। ফলে তিনি লন্ডনে ফিরে যান এবং রানি প্রথম এলিজাবেথের দরবারের প্রধান ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে পরিচিত হন।


লন্ডনে থাকাকালীন তিনি বেশ কয়েকটি ব্যঙ্গাত্মক রচনা লেখেন এবং ১৫৮৪ সালে 'Dell Infinito, universo e mondi (ডেল ইনফিনিতো, ইউনিভার্সো ই মন্ডি)' অর্থাৎ 'অসীমতা, মহাবিশ্ব এবং জগৎ সম্পর্কে' নামক একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইয়ে তিনি অ্যারিস্টটলের মহাবিশ্ব-দর্শনের সমালোচনা করেন। মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদ (Averroës)-এর কাজের ওপর ভিত্তি করে তিনি বলেন, ধর্ম হল "অজ্ঞ মানুষকে শিক্ষা ও শাসনের একটি উপায়, আর দর্শন হল সেসব নির্বাচিত মানুষের শাস্ত্র, যারা নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে ও অন্যদের শাসন করতে সক্ষম।" এই বিষয়টি ব্রুনোর চিন্তার অসাম্প্রদায়িক এবং বৈশ্বিক রূপটি প্রকাশ করে। তিনি কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণাকে সমর্থন করেন এবং আরও যুক্তি দেন যে “মহাবিশ্ব অসীম, এতে অসংখ্য জগত রয়েছে এবং সেগুলো সকলই বুদ্ধিমান প্রাণীতে পরিপূর্ণ।”


১৫৯১ সাল পর্যন্ত তিনি ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে ভ্রমণ, লেখালেখি এবং বক্তৃতা চালিয়ে যান। এই সময়ে তিনি স্থানীয় পণ্ডিতদের যেমন কৌতূহলী করে তুলেছিলেন তেমনি ক্ষুব্ধও করে তুলেছিলেন। হেল্মস্টেডে তাঁকে ধর্মচ্যুত (Excommunicated) করা হয় এবং ফ্রাঙ্কফুর্ট আম মেইন ছেড়ে যেতে বলা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি কার্মেলাইট মঠে আশ্রয় নেন, যেখানে মঠাধ্যক্ষ তাঁকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন যিনি “প্রধানত লেখালেখি এবং নতুনত্বের বৃথা ও অলীক কল্পনায় নিমগ্ন থাকেন।"

শেষ জীবন ও ভয়ানক মৃত্যু


১৫৯১ সালের আগস্টে জিওর্দানো ব্রুনোকে ইতালিতে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং ১৫৯২ সালে এক অসন্তুষ্ট ছাত্র তাঁকে ইনকুইজিশনের কাছে অভিযুক্ত করে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ব্রুনোকে সে বছরের ২২শে মে তারিখে গ্রেপ্তার করে অবিলম্বে ধর্মদ্রোহের অভিযোগে ইনকুইজিশনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর পরবর্তী আট বছর তাঁর কাছে নরকতূল্য ছিল। তিনি ভ্যাটিকানের কাছে কাস্তেল সান্ত’আঞ্জেলো দুর্গে শিকলবদ্ধ অবস্থায় কাটিয়েছিলেন। তাঁকে নিয়মিত নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হত। তবুও তিনি নিজের বিশ্বাসে অটল থাকতেন এবং ক্যাথলিক চার্চের বিচারক, রোমান ইনকুইজিশনের ইনকুইজিটর জেসুইট কার্ডিনাল রবার্ট বেলারমাইনের কাছে বলেন, “আমি আমার মত প্রত্যাহার করা উচিত বলে মনে করি না এবং করবও না।” ১৬০০ সালের ২০শে জানুয়ারি পোপ অষ্টম ক্লেমেন্ট ব্রুনোকে একজন ধর্মদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি করেন। মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পরেও তাঁর মনোভাব বদলায়নি; তিনি অভিযোক্তাদের উদ্দেশে বলেন, “আমার দণ্ড ঘোষণা করতে আপনাদের মনে যতটা ভয় হচ্ছে, তা শুনতে আমার মনে ততটা ভয় হচ্ছে না।” হয়তো খ্রিস্টান ধর্মীয় গোঁড়ারা ব্রুনোর চিন্তাধারাকে ভয় পেয়েছিল কেননা মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর ব্রুনোকে আরও নির্যাতন করা হত। অবশেষে এল সেই দিন। বিজ্ঞানের ও যুক্তিবাদের ইতিহাসে যাকে 'কালা দিবস' হিসেবে আখ্যায়িত করাই যায়। ১৬০০ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি। পঞ্চাশোর্ধ্ব জিওর্দানো ব্রুনোকে রোমের রাস্তায় তাঁর পোশাক কেড়ে নগ্ন করে ঘোরানো হয় এবং খুঁটির সাথে বেঁধে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ব্রুনোকে যখন পুড়িয়ে মারা হচ্ছিল, তখন তাঁর মুখে একটি লোহার গ্যাগ (মুখবন্ধনী) পরানো হয়েছিল যাতে তিনি মানুষের সামনে আর কোনো 'ধর্মবিরোধী' কথা বলতে না পারেন। আর এটাই তাঁর প্রতি চার্চের ভয়ের গভীরতা প্রমাণ করে। পুড়ে যাওয়ার পর তাঁর দেহভস্ম ছড়িয়ে দেওয়া হয় টিবের নদীতে।


আজ রোমের যেখানে তাঁকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল সেই কাম্পো দে ফিওরি (Campo de' Fiori) চত্বরে ব্রুনোর একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর এই ব্রোঞ্জের মূর্তিটি মুক্তচিন্তা এবং সত্যের প্রতি অবিচল থাকার যেন এক শক্তিশালী প্রতীক। মজার ব্যাপার হলো, ১৮৮৯ সালে যখন এই মূর্তিটি স্থাপন করা হয়, তখন ভ্যাটিকান এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি স্থাপিত হয় এবং আজ এটি বিশ্বের পর্যটকদের কাছে একটি অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান।


আমেরিকার রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যালিলিও প্রজেক্ট অনুযায়ী, “প্রায়ই বলা হয় যে ব্রুনোকে তাঁর কোপারনিকান মতবাদ ও অসীম বসবাসযোগ্য জগতের বিশ্বাসের জন্য হত্যা করা হয়েছিল। বাস্তবে, তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহ ঘোষণার সুনির্দিষ্ট কারণ আমরা জানি না, কারণ তাঁর নথিপত্র রেকর্ড থেকে হারিয়ে গেছে। গ্যালিলিও ও জোহানেস কেপলারের মতো বিজ্ঞানীরাও তাঁদের লেখায় ব্রুনোর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন না।” তবে, আমরা তো জানি মধ্যযুগে ইউরোপে বিজ্ঞান ও ধর্মের লড়াই। আর খ্রিস্টান ধর্মীয় মৌলবাদের হাতে শহীদ হয়েছেন জিওর্দানো ব্রুনোর মতো বেশ কিছু বিজ্ঞানী। 'আধুনিক বিজ্ঞানের জনক' গ্যালিলিও গ্যালিলেইকেও মৌলবাদের শিকার হতে হয়েছিল।

উত্তরাধিকার


বিশিষ্ট কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'রাস্তা কারও একার নয়' কবিতাটি খুব মনে পড়ে যখন আমরা গ্যালিলিও ও ব্রুনোর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করি। কেন বলা হল তা কবিতাটি পড়লেই বোঝা যাবে।


সেই কবিতার প্রথমের কয়েকটা লাইন এখানে তুলে ধরলামঃ–


“ধর্ম যখন বিজ্ঞানকে বলে রাস্তা ছাড়াে!’ বিজ্ঞান কি রাস্তা ছেড়ে দেয়?

পােপের ভয়ে দেশান্তরী হয়েছিলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। সারাদিন

একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে পায়চারি করতেন গ্যালিলিও গ্যালিলেই ;

তাঁকে পাহাড়া দেবার জন্য বসে থাকতাে একজন ধর্মের পেয়াদা, যার

চোখের পাতা বাতাসেও নড়তাে না।

বিজ্ঞান কি তখন থেমে ছিল? তীর্থের পাণ্ডাদের হই হই, তাদের লাল

চোখ কি পেরেছিল পৃথিকে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে, সূর্যকে

তার চারদিকে ওঠবােস করাতে?”


সত্যি তো গোঁড়া ধার্মিকেরা ব্রুনোকে হারাতে পারেনি। উল্টে বহু বছর পর তাদের মত পাল্টাতে হয়েছিল। আজ আমরা সবাই জানি যে, পৃথিবী সহ অন্যান্য গ্রহরা সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে এমনকি সূর্যও স্থির নয় সেও একটি গতি নিয়ে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা আকাশ গঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে থাকে। আর আজ বিজ্ঞানের উন্নতর গবেষণা এই গবেষণা আমাদের মতো অন্যান্য জীব আছে কি না তার খোঁজ করে চলেছে। অনেক গ্রহ পাওয়া গেছে যাদের অবস্থা পৃথিবীর মতোন। সেখানে কি প্রাণ আছে? এই প্রশ্নটাই ভাবাচ্ছে তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীদের, বিজ্ঞানপ্রেমীদের এমনকি সাধারণ মানুষদেরও। আজ জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ বিজ্ঞান মনে করে যে অসংখ্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব থাকতেও পারে। সমান্তরাল মহাবিশ্বগুলোর (Parallel Universes) অস্তিত্ব হয়তো আছে।


তাই বলাই যায় যে, চিন্তার স্বাধীনতা ও মহাজাগতিক ধারণার ক্ষেত্রে ব্রুনোর অবদান ১৭শ ও ১৮শ শতাব্দীর দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে তো বটেই এমনকি আজকের দিনেও তাঁর ধ্যান ধারণাগুলো প্রভাবিত করে চলেছে। তাঁর কিছু ধারণা যথার্থ, সুদূরপ্রসারী ও উন্নত হলেও তাঁর কিছু ধারণা ছিল জাদুবিদ্যা ও অতিপ্রাকৃত বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া তৎকালীন রাজনীতির প্রতি তাঁর অবজ্ঞাই ছিল তাঁর মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ। রাজনীতি কি তাঁকে বাঁচিয়ে দিতে পারত? মনে তো হয় না কারণ, মধ্যযুগে ইউরোপীয় রাজনীতিও ছিল চার্চ নির্ভর। সে যাই হোক, বিজ্ঞানের ইতিহাসের পাতায় একজন বিজ্ঞানের শহীদ বিপ্লবী ও বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবে এবং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া বৈজ্ঞানিক দার্শনিক হিসেবে জিওর্দানো ব্রুনোর নাম স্বর্ণাক্ষরে চিরকাল লেখা থাকবে। আর এখানেই বিজ্ঞান তথা সত্যের জয়! দেরীতে হলেও সবসময় 'সত্যমেব জয়তে'-ই হয় কেননা 'সত্যম শিবম সুন্দরম' যে।

0 comments: