0

অনুবাদ সাহিত্য - মনোজিৎকুমার দাস

Posted in







মেয়েটি অনিন্দ্যসুন্দরী। মেয়েটি জন্মেছিল কেরানির ঘরে। সুন্দরী মেয়ের বিয়ের জন্য গরিব কেরানি বাবা ভাবিত না। সে জানতো তার সুন্দরী মেয়েটির বিয়ে ধনী পাত্রের সাথে দিতে পারবে না।

ঘটনাক্রমে শিক্ষাবিভাবের এক গরীব কেরানি সাথে তার বিয়ে হল। এতে মেয়ের বাবা আপত্তি করল না। তবে তার মনোকষ্ট হল । তার মেয়ে রূপসী,সৌন্দর্যময়ী।সে বুদ্ধিমতী, রুচি সম্মত স্বভাবের অধিকারী। সে সবকাজে পারদর্শী। তার সৌন্দর্য ও গুনের জন্য বড়ঘরে বিয়ে হতে পারত।মেয়েটির বাবা জানে, কমনীয় চেহারা কর্মদক্ষতার জন্য এমন মেয়েও দেশে সেরা নারী হতে পারে।

মেয়েটির মনে কষ্টের সীমা ছিল না। সে শুধু ভাবতো, যদি তার জন্ম হত কোন বড় লোকের ঘরে তবে বিলাসের মাঝে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতো। তার বাড়িতে ছড়িয়ে আছে দারিদ্রতা তার অভাব অনটন। তার ঘরের চারিদিকে অভাবের চিহ্ন। ভাঙাচোরা চেয়ার টেবিল, শ্রীহীন নোংরা দেওয়াল, জানলা দরজার পর্দাগুলো ছেড়া। এগুলো দেখে তার মোটেই ভালো লাগে না। তার পাড়াপড়শীর বউ মেয়েরা এর মধ্যেই স্বাচ্ছন্দে বসবাস করে। তারা অভাব অনটনের মধ্যে বসবাস করতে অভ্যস্ত। কিন্তু এই অনিন্দ্য সুন্দরী বউটির অভাব অনটনের মধ্যে বসবাস করতে ভালো লাগে না। তার মনে অনেক আশা। তার বাসায় একটা ছোট্ট মেয়েটি তার ঘরে কাজ করতে আসে। তার হতশ্রী দেখলে মনে বড়ই কষ্ট লাগে। একদিন সে গরিব গ্রামের মেয়ে ছিল। বাবা গরীব হওয়ায় শিক্ষাবিভাগের ছাপোষা কেরানি সাথে তাকে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়। মেয়েটির অনেক স্বপ্ন ছিল । কিন্তু সে আজ গরিব কেরানির বউ হয়ে সে তার স্বপ্নগুলোকে পূরণ না করতে পারায় মনে কষ্টে আছে। তার স্বপ্ন ছিল একটা ছোট্ট নিরিবিলি ঘর, দামী আসবাবপত্র, রঙিন আলোকবাতিতে সজ্জিত থাকবে তার ছোট্টঘরটি।রঙিন বাতিগুলো থেকে আলোয় উদ্ভাসিত হবে চারিদিক। তার স্বামী গরিব! , তাই তার স্বপ্নপূরণ হয় না, স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।
রাতে তারা লাঞ্চ খেতে বসে, টেবিল খানায় পাতা পুরনো টেবিল ক্লথ। তার উল্টোদিকে বসে তার স্বামী। সুপের পাত্র থেকে ঢাকনাটা তুললে তার স্বামী খুশি মনে বলে, "ওহ! স্কচ ব্রোথ!এর চেয়ে ভালো খাবার হতে পারে না। "
স্বামীর কথা শুনে তার বউয়ের মনে ভাবনা জেগে ওঠে। এভাবে , রুপোর থালা বাটিতে উপদেয় খাবার যদি সে পরিবেশন করতে পারতো তবে কত না ভালো হত। সে ভাবে, তার ভালো কাপড়চোপড় নেই, নেই গয়নাগাটি,
আসলে তার ভালো কিছু নেই। সুন্দর সুন্দর কাপড়চোপড়, গয়নাগাটি পাবার জন্য তার মনে আকাঙ্ক্ষা জাগে।সবকিছু পেলে সুন্দর হবে সব এটাই তার ভাবনা। এসব থাকলে তার জীবন মোহময় ও আকর্ষণীয় হত, এগুলো পাবার জন্য সে আকাঙ্ক্ষা করে ।
তার বেশ কিছু বড়লোক বান্ধবী আছে । তারা ইস্কুলের পুরনো বান্ধবী। সে তাদের বাড়িতে যেতে চায় না, তাদের বাড়িতে যাওয়ার কথা ভাবলে বড় কষ্ট হয়। তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েও সে ফিরে আসে, তখন তার মনে কষ্ট হয় বড়ই। দুঃখ বেদনায় সে সারাদিন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে।
একদিন সন্ধ্যায় তার স্বামী খোশ মেজাজে বাড়ি ফিরে। সে তার হাতের খামটি দেখিয়ে বউকে বলে, "তোমার জন্য একটা ভালো জিনিস আছে এর মাঝে । "
স্বামীর হাত থেকে খামটি নিয়ে ছিড়ে ফেলে একটি ছাপানো কার্ড দেখতে পায়। তাতে লেখা আছে --
“শিক্ষা মন্ত্রীও মাদাম জর্জেস রামপোন্যু আগামী ১৮ জানুয়ারি সোমবার সন্ধ্যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠানে মঁসিয়ে ও মাদাম লোইজেলের উপস্থিত হওয়ার জন্য আনন্দচিত্তে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।"
স্বামীকে আশা করেছিল এই আমন্ত্রণে তার স্ত্রী খুশি হবে। সে ওটাতে চোখ বুলিয়ে টেবিলের উপর তাচ্ছিল্য ভরে রেখে বলল, "এটা নিয়ে আমি কি করব। "
"কেন প্রিয়তমা,এমনটা বলছো? আমি ভেবেছিলাম , এই আমন্ত্রণে তুমি খুশি হবে। তারা তো বড় পোষ্টের লোকদেরকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করে থাকে। কেরানীদের ভাগ্যে এ ধরনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ খুব কমই জোটে। অনেক তাগাদা তদবির করে আমি এই আমন্ত্রণ পত্রটি এনেছি । তুমি ওখানে গেলে বড় মাপের জ্ঞানী গুণীদের দেখতে পাবে। "
স্বামীর দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বলে, " এমন ধরনের বড়সড় অনুষ্ঠানে আমি কি পরে যাব, নিজেই বল?
একথা স্বামী বেচারা মোটেই ভাবেনি, তাই তাকে একটু হতবাক হতে হলো। সে একটু সাহস সঞ্চয় করে স্ত্রীকে বলল, " তুমি যে পোশাক পরে থিয়েটার দেখতে যাও,ওই পোশাকগুলো তো আমার ভালই লাগে। " তার কথা শুনে বউটি কান্না শুরু করলো। দুচোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। তা দেখে স্বামীটি বলল, " কাঁদছো কেন? চোখ মুছে ফেলো।"
বউটি চোখ মুছে বলল, " ও কিছু না, আমার এমন কোন পোশাক নেই যা পরে আমি পার্টিতে যেতে পারি। তুমি নিমন্ত্রণ পত্রটি অন্য কাউকে দিয়ে দাও। যাকে দেবে তার স্ত্রী সুন্দর কাপড়চোপড় ও গয়নাগাটি পরে পার্টিতে যেতে পারবে। "
স্বামী বেচারা বড়ই দুঃখ পেয়ে বলল, " ওগো প্রিয়তমা, একটা ভালো পোশাকের দাম কত পড়বে?নতুন পোশাক কিনে ফেললে তুমি অন্য অনুষ্ঠানেও যেতে পারবে। "
বউটি ভাবলো , একজন কেরানি কত অর্থ দিয়ে পোশাক কিনতে পারবে? বেশি দামী পোশাকের কথা বললে তার স্বামী ভয় পেয়ে নতুন পোশাক কিনতে অপারগতা দেখাতে পারে। তাই সে ভেবেচিন্তে বলল, "আমি জানিনা কত লাগবে। তবে মনে হয় চারশ’ ফ্রাঁয় হয়ে যাবে।”
এ কথা শুনে স্বামী বেচারার চিন্তিত হয়ে পড়ল। এখন তো তার হাতে চারশ’ ফ্রাঁয়ই আছে। তা দিয়ে সে একটা বন্দুক কিনতে চেয়েছিল।
নাঁতেরির গ্রামের দিকে গরমকালে বন্ধুদের সাথে শিকারে যাওয়ার কথা ভেবেছিল সে। বন্ধুরা ওখানে প্রতি রোববারই পাখি শিকারে যায়।
একথা বৌকে না জানিয়ে সে বলল, “ ভাল কথা! তোমাকে চারশ’ ফ্রাঁই দিচ্ছি। একটা ভালো পোশাক কিনতে পারবে।”
পার্টির দিন প্রায় এসে গেল। আর মাদাম লোইজেলের মনে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগও বেড়ে যেতে লাগলো। তার দামী পোশাক কেনা হয়েছে। তার স্বামী ভাবলো তার তো আর এখন ভাবনার কোন কারণ নেই। কিন্তু কেন তার বউটি গত তিনদিন মুখ গোমড়া করে আছে। সে তার বউকে জিজ্ঞেস করল, " তোমার মনটা ভারী কেন, তোমার কি হয়েছে? " স্বামীর কথা শুনে বউটি বলল, "আমার কোন জড়োয়া গয়না নেই , আমি কি পড়ে পার্টিতে যাব! তাই একটুও ভালো লাগছেনা। জড়োয়া গয়না ছাড়া পার্টিতে গেলে সম্মান থাকবে! তাই আমি পার্টিতে যাব না। "
বউকে শান্ত করার জন্য স্বামীটি বলল, "আর একটা উপায় আছে, দশ ফ্রাঁ দিয়ে দু তিনটা বড় বড় দেখে গোলাপ কিনে তুমি মাথায় পরে যাবে। তোমাকে খুব ভালো দেখাবে। " স্বামীর একথায় মেয়েটি রাজি না হয়ে বলল, " বিত্তবৈভাবে সুসজ্জিত নারীদের মাঝে এতে আমার দৈন্যতাই প্রকাশ করবে, আর তা হবে বড়ই লজ্জার ব্যাপার। ":কেরানী স্বামীটি বউকে বলল, "মাদাম ফরেস্তিয়ে তোমার একজন ধনী বান্ধবী আছে না? তুমি তো তার কাছ থেকে কয়েকটা গয়না ধার করেও আনতে পারো। "
স্বামীর কথা শুনে বউটি আনন্দে চিৎকার করে উঠে বলল, "তার কথা তো আমার মাথায় আসেনি । "
পরদিন অনেক আশা নিয়ে বান্ধবীর বাড়িতে গেল। সে তার বড়লোক বান্ধবীর কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল।
মাদাম ফোরেস্তিয়ার তার আলমারি থেকে বড় একটা গয়নার বাক্স এনে মাদাম লোজিয়ের সামনে খুলে দিয়ে বলল," প্রিয় বান্ধবী, তোমার যেটি পছন্দ হয় থেকে বেছে নাও ।
সে একটা ব্রেসলেট, একটি মুক্তোর নেকলেস, এরপর দেখল স্বর্ণ ও রত্নখচিত একটি ভেনিসীয় ক্রুস যাতে অসাধারণ কারুকাজ। ওগুলো পরে আয়নায় নিজেকে বার বার দেখছিল । এগুলো দেখে তার জন্য মতিভ্রম হল, সে কোনটা রেখে কোনটা নেবে তা স্থির করতে পারছিল না। সে বান্ধবীকে বলল," তোমার কি আরো গহনা আছে?
“আছেই তো বটেই ! নিজে বেছে নাও। আমি তো জানি না, তোমার কোনটা ভালো লাগবে।”
তারপর তার বান্ধবী আর একটা গহনার বাক্স এনে দিল।
একটি বাক্সের ভেতর সে দেখতে পেল সুন্দর একটা হীরার নেকলেস। সেটা দেখে তার আনন্দে মনটা ভরে গেল।
সেই হীরের নেকলেসটা তুলতে হাত দুখানা কাঁপছিল তার। হাত দিয়ে তা তুলে লম্বা ড্রেসের উপর গলায় পরে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে থাকল অনেকক্ষণ ।
তারপর সে অনেকটা ইতস্তত ভাব করে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে জানতে চাইল,
“তুমি কি এটা আমায় ধার দেবে? শুধু এটাই চাই, আর কিছু নয়!”
“হ্যাঁ, কেনো নয়! অবশ্যই দেব।”
সে আনন্দের চোটে বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরল। শেষ পর্যন্ত সেই মূল্যবান হীরের হারটি নিয়ে বাড়ি ফিরল।

তারপর একদিন এল সেই পার্টির দিনটি। মাদাম লোইজেল ছিল অনিন্দসুন্দরী, তারপর গলায় এই হীরের হারটি পরে সেদিন সবাইকে বিমোহিত করল । সে ছিল সেই পার্টির সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর, লাস্যময়ী ও হাস্যময়ী নারী। আনন্দের চেয়ে আত্মহারা! পার্টিতে উপস্থিত পুরুষদের চোখের মনে হয়ে ওঠে ক্ষনিকের মধ্যে। সবাই পরিচয় জানতে চাইছিল। এই অনিন্দ্যসুন্দরী হাস্যময়ী, লাস্যময়ী এই নারীটি কে? পার্টিতে উপস্থিত সকল সেক্রেটারি তার সাথে নাচার জন্য উদগীব হয়ে উঠে নাচলেনও। মন্ত্রীদেরও চোখ পড়ল এই সুন্দরী নারীটির উপর ।
রাতের পার্টিতে সুন্দরী বউটি আনন্দে আত্মহারা হয়ে পাগলের মত নেচেছিল। সে জীবনে এমন আনন্দ উপভোগ করেনি। সে যেন উত্তাল আনন্দে উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। কোন দিকেই তার কোন খেয়াল ছিল না। আনন্দে উদ্বেলিত হৃদয় যেন যেন বাহ্যিকজ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছিল।
পার্টি ভোর চারটার দিকে শেষ হওয়ার আগে তার স্বামী বেচারা একটি ছোট রুমে ছিল। সে তার সুন্দরী বউয়ের বেহাল্লাপনা দেখতে যায়নি। তার সাথে তিনজন ছিল তাদের পার্টিতে নাচতে গিয়েছিল ।
বউটি পার্টির কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসায় স্বামী বেচার আটপৌরে একটি কাপড় স্ত্রীর কাঁধের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। সে ভাবল, তার তার সৌন্দর্যময়ী বউয়ের গায়ের পার্টিতে পরা চোখ ঝলসানো ড্রেস পরে বাইরে যাওয়া উচিত নয়। এ ব্যাপারে সচেতন ছিল তাই সে দ্রুত অন্য নারীদের চোখ এড়িয়ে বাইরে বাইরে এল।
তার স্বামী বেচারা মঁসিয়ে লোইজেল বউকে থামার জন্য বলল, "সামান্য একটু থাম , আমি একটা ক্যাব ম্যানেজ করার চেষ্টা করছি। "
সে স্বামীর কথা কানে না তুলে দ্রুত শরীরের নিচে নেমে এল। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কোন ক্যাব ধরতে পারল না।
অবশেষে তারা নদীর দিকে এগিয়ে গেলে একটা পুরনো জীপ দেখতে পেল। তারা জরাজীর্ণ একটি জিপে চড়ে তাদের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে গেল। বউটি ভাবলো এখন ঘুমাতে হবে, কিন্তু সকাল দশটায় অফিস আছে।
সে তার কাঁধের উপরে দেওয়া পার্টির ড্রেস ঢেকে রাখা কাপড়টি খুলে ফেলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আলো ঝলমলে রূপটা দেখার চেষ্টা করল। সে চিৎকার করে বলে উঠল আমার গলার সেই নেকলেসটা তো নেই। ব্যাপার কি কোথায় গেল তা!
তার স্বামী এতক্ষণ তার পোশাক খুলছিল বউয়ের চিৎকার শুনে হে বলে উঠল, "ছেচিয়ে উঠলে কেন কি হয়েছে বলোত?
বউটি বিষন্ন চোখে স্বামীর দিকে তাকাল, তার মুখটা বিবর্ণ কথা বলার শক্তি নেই। আধো আধো ভাষায় সে বলল, " আমার গলায় মাদাম ফোরেস্তিয়ারের হীরের নেকলেসটি নেই।"
" বল কী!" স্বামীটি হতবাক কণ্ঠে বলল।
তখন তারা দুজনে খুঁজিতে শুরু করে দিল, পোশাকটি খুলে ফেলে তন্ন তন্ন করে খুঁজল তারা দুজনে। স্বামীটি জামা প্যান্টের পকেটে খুজে দেখল কিন্তু কোথায়ও সেই নেকলেসের হদিস নেই।
বউটি স্বামীর কাছে জানতে চাইল," পার্টির রুম থেকে বল ডান্স শেষ করে আসার সময় আমার গলায় তুমি তা কি দেখেছিলে? "
"আমি লক্ষ্য করিনি , রাস্তায় পড়লে তো আমি শব্দ শুনতে পেতাম । "
" তা ঠিক।তুমি কি ক্যাবের নাম্বার জান? "
" ক্যাবের নাম্বার আমি জানি না। "
দুজন একে অপরের প্রতি হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকল। মসিয়েঁ লোইজেল পরিশেষে জামা কাপড় পরে নিয়ে বলল," যে পথটা আমরা হেঁটে এসেছি, সেই পথটা তে আমরা খুঁজে দেখতে পারি নেকলেসটা পড়ে গেছে কিনা । " স্বামী বেচারা এই কথা বলে বের হয়ে গেল।
পার্টিতে পোশাক পড়েছিল সেই পোশাকেই চেয়ারে বসে রইল নিশ্চুপে।
সকাল সাতটার দিকে আমি বেচারা ফিরে এল। তারপর সে পুলিশ স্টেশন, খবরে কাগজের অফিস ও ক্যাবের অফিসে গেল। সে সব জায়গায় ঘোষণা দিয়ে এল যে নেকলেস উদ্ধার করে দিতে পারবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে । বউয়ের বান্ধবীর কাছ থেকে ধার করে আনা হীরের নেকলেসটা উদ্ধারের জন্য চারদিক চষে বাড়াতে লাগল সারাদিন ধরে।
রাতের সে বাড়িতে ফিরল বিফল মনোরথ হয়ে। একটু বিশ্রাম ও খাওয়া-দাওয়া করে লোইজেল বউকে বলল, " তোমার বান্ধবীকে একটা চিঠি লিখে দেওয়া উচিত। তবে সত্যি কথাটা তাকে বলা যাবে না। "
স্বামীর কথা শুনে বউটি তার দিকে তাকিয়ে থাকলে সে বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, " হীরের নেকলেসের একটা এক অংশ খুলে গেছে, ওটা সারানোর জন্য সেকরার বাড়িতে পাঠাচ্ছি। আর এর মাঝে আমরা ওটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে পারব। "
অনেক খোঁজাখুঁজি করে তারা হীরের নেকলেসের হদিস পেল না। এর মাঝে সপ্তাহ কেটে গেল।মঁসিয়ে লোইজেলের বয়স যেন পাঁচ বছর বেড়ে গেল দুঃচিন্তা আর খাটাখাটিতে। সে তার বৌকে বলল," আমাদেরকে জুয়েলারির দোকান থেকে হীরের নেকলেস কিনে আনা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। "
পরদিন হীরের নেকলেসের বাক্সটি থেকে জুয়েলারি দোকানের নামটি জেনে নিল। তারপর তারা সেই দোকান গেল। তাদের রেজিস্টার ঘুটে দেখা গেল সেখান থেকে হীরের নেকলেস কেনা হয়নি । তারপর তারা বিভিন্ন জুয়েলারিতে গিয়ে হীরের নেকলেস কেনার জন্য খুঁজতে লাগল ।
প্যালাইজ রয়্যাল জুয়েলারি দোকান থেকে তারা অবিকল আগের হীরের নেকলেস এর মত একটি নেকলেস পেল। তারা দাম চাইলো চল্লিশ হাজার ফ্রাঁ। দরাদরি করার পর তারা ৩৬ হাজার ফ্রাঁয় দিতে হল।
দোকানিকে তিন দিনের মধ্যে ওটি বিক্রি না করার জন্য তারা অনুরোধ জানাল। আর একমত হল, যদি ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদও হারিয়ে যাওয়া নেকলেসটি পাওয়া যায় দোকানি পরে ওটি ৩৪ হাজার ফ্রাঁয় ফেরত নেবেন।
স্বামী লোইজেলের কাছে ছিলো ১৮ হাজার ফ্রাঁ। বাকিটা তারা ধার করবে বলেই মনোস্থির করল।
আর ধার করেও ফেলল। এক জনের কাছ থেকে এক হাজার ফ্রাঁ, আরেক জনের কাছ থেকে পাঁচশ’ ফ্রাঁ। এখান থেকে পাঁচ ফ্রাঁ, ওখান থেকে তিন এভাবে। ভয়াবহ সব শর্তে ও চুক্তিতে সে অর্থ কর্য নিল। তার যা কিছু ছিল তা আজীবনের জন্য মর্টগেজ দিল, বুঝে না বুঝে নানা শর্তে সুদে ধার নিল। ভবিষ্যতে তাদের ভাগ্যে দুর্ভোগ নেমে আসবে সে কথা ভাবল না। স্বামী স্ত্রী মিলে মানসিক দুশ্চিন্তা ও ক্লান্তি ভোগ করে পরিশেষে জোগাড় করে ৩৬ হাজার ফ্রাঁ নিয়ে জুয়েলার্সের কাউন্টারে গেল। সেখান থেকে তারা নেকলেস টা কিনে মাদাম লোইজেল একাই মাদাম ফোরেস্তিয়ারের কাছে গেল,। নেকলেসটি পেয়ে মাদাম ফোরেস্তিয়া ঠাণ্ডা স্বরে বলল, " আরো আগে তোমার এটি নিয়ে আসা উচিত ছিল। আমার খুব দরকার ছিল । কিনে আনা নেকলেসটি ফেরত দিয়ে গিয়ে মাদাম লোইজেল খুবই দুশ্চিন্তায় ছিল। ওটা খুলে দেখে তার বান্ধবী এটাই তার চিন্তা ছিল। কিন্তু মাদাম ফোরেস্তিয়ার বাক্সটি খুলেও দেখল না।
তারপর থেকে মাদাম লোইজেল বুঝতে থাকল দারিদ্রতা কাকে বলে। কে যে মেয়েটি কাজ করত তাকে ছাড়িয়ে দিল। তাদের ভাড়া করা ফ্ল্যাটটিও ছেড়ে দিয়ে একটা চিলেকোঠা ভাড়া নিয়ে দুজনে বসবাস করতে লাগল। তারা সিদ্ধান্ত নিল কৃচ্ছ্য সাধনা করে তাদের ঋণ পরিশোধ করবে।খরচ পাতি কমিয়ে দিয়ে টাকা সঞ্চয় করে মাসে মাসে ঋণ পরিশোধ করতে লাগল। এটা ওটা করে বউটি আয় উপার্জন করতে লাগল। স্বামী বেচার না একবেলায় একটা ব্যবসায়ীর দোকানে হিসাব-নিকাশ দেখার কাজ নিল। রাতে দলিল দস্তা বেশ নকল করে কিছু আয় করতে লাগল।
এভাবে দশটি বছর কেটে গেল। দশ বছরের মাথায় ঋণ পরিশোধ করে ফেলল। কঠোর পরিশ্রম ও চিন্তা ভাবনায় বউটির দশ বছর আগের সেই অনিন্দ্যসুন্দরী চেহারা তখন আর স্বাস্থ্য নেই। চেহারায় মালিন্য দেখা দিয়েছে। আগেকার কোকড়ানো চুলগুলো আজ শ্রীহীন। গায়ের ও পরনের জামা কাপড় সেলাই করা।
স্বামী বেচারা বাইরে থাকলে জানলার ধারে বসে আগেকার দিনের কথা ভাবে। একদিন সে ছিল যৌবনবতী আনন্দময়ী এক মেয়ে যাকে দেখে এ পার্টির মন্ত্রী মিনিস্টার থেকে সবাই বিমোহিত হয়েছিল। হীরের নেকলেস হারিয়ে সে সর্বহারা , যৌবনবতী শরীর ও সৌন্দর্য আজ আর তার নেই। একদিন রবিবারে খাটুনির পরে সে একটু বেড়াতে বের হল।
রাস্তার ফুটপাতে দেখতে পেল একজন মহিলা একজন শিশুর সঙ্গে এ কথা বলছে। সে বুঝতে পারলো মহিলাটি হচ্ছে মাদাম ফোরেস্তিয়ার। এখনও সে যুবতী, সুন্দরী আর আকর্ষণীয়া।
মাদাম লোইজেল তাকে দেখে তার মনে বিশেষ অনুভূতির সৃষ্টি হল। সে ভাবল, তার সমস্ত ঋণ এখন পরিশোধ করে দিয়েছে। তারা এখন কোন কিছু ভাবনা নেই।
সে সাহসে ভর করে এগিয়ে গিয়ে বলল, " সুপ্রভাত , জিনি।"মাদাম ফোরেস্তিয়ার ডাক নাম জিনি। সে মাদাম লোইজেলকে চিনতে পারল না।
দরিদ্র চেহারার নারীর মুখে সরাসরি নিজের নামে সম্ভাষণ শুনে অবাক হয়ে বলল,
“কিন্তু... মাদাম.....” সে বলল। “আমি ঠিক চিনলাম না.... আপনি নিশ্চয়ই কোনও ভুল করছেন।
“না ভুল ... আমি মাথিলদে লোইজেল।”
শুনে তার বান্ধবী চিৎকার করে উঠল।
“ওহ!... আমার বেচারী মাথিলদে, এ কী তোমার শরীরের দশা । কিভাবে বদলে গিয়ে তুমি এমন হতশ্রী হয়েছ !....”
“হ্যাঁ... তোমার সাথে সেই শেষ দেখার পর এক কঠিন সময় আমি ও আমার স্বামী পার করেছি। অনেক দুঃখ কষ্টে গেছে আমাদের দিন... আর তার সবটাই তোমার কারণে।”
“আমার কারণে!... সেটা কীভাবে সম্ভব?”
“তোমার সেই হীরার নেকলেসটির কথা মনে আছে। সেই যে ধার নিয়েছিলাম মন্ত্রণালয়ের বল নাচের অনুষ্ঠানে পরব বলে?”
“হ্যাঁ, ভালই মনে আছে।”
“বেশ! তাহলে শোন, সেদিন আমি তোমার নেকলেসটি হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
“সেটা কী কথা? আর তাই যদি হয়, তাহলে সেটা ফেরত দিলেই কী করে?”
“আমি তোমাকে ঠিক একই রকমের আরেকটি হীরার নেকলেস ধার দেনা করে কিনে দিয়েছিলাম । আর গত দশটি বছর ধরে আমরা কেবল সেই দেনা শোধ করেছি। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পার আমাদের জন্য কাজটি সহজ ছিল না। আমাদের কাছে কোনই অর্থ ছিল না...। যাই হোক, অবশেষে সব দেনা শোধ হয়েছে। এখন আমি বেশ খুশি।”
হতভাগী বান্ধবীর এই কথা শুনে মাদাম ফোরেস্তিয়ার হতবাক হয়ে বলল, “তুমি বলছ আমার হারিয়ে যাওয়া নেকলেসটির বদলে তুমি একটি হীরার নেকলেস কিনেছ?”
“হ্যাঁ। কেনো তুমি ওটা দ্যাখনি? অনেকটাই একই রকম দেখতে হয়েছে।”
কথাটি বলে, আনন্দের হাসি হাসল সে।
মাদাম ফোরেস্তিয়ার আবেগতাড়িত হয়ে মাদাম লোইজেলকে জড়িয়ে ধরল।
“ওহ! আমার হতভাগী মাথিলদে! আমার নেকলেসটিতো ছিল আসলে ইমিটেশন গয়না । ওর দাম ছিল বড় জোর পাঁচ শ’ ফ্রাঁ...”




(লেখক পরিচিতঃ গী দ্য মোপাসাঁ ঊনিশ শতকের ফরাসী ভাষার একজন সৃষ্টিশীল লেখক। তাকে আধুনিক ছোটগল্পের জনকও বলা হয়। তিনি প্রায় তিনশোরও বেশি ছোটগল্প লিখেছেন ।
গী দ্য মোপাসাঁ ছোটগল্প ছাড়াও উপন্যাস, কবিতা এবং ট্রাভেলিং বই লিখেছেন।
১৮৫০ সালের ৫ আগস্ট তিনি ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গুস্তাভ দ্য মোপাসাঁ, আর মায়ের নাম লরা লি পয়টিভিন।
১৯৮০ সালে ‘ব্যুল দ্য সুইফ’ নামে তার একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়, সেটাই তাকে লেখক হিসেবে বৃহৎ পরিণতি প্রদান করে। আজও এই গল্পটিকে মোপাসাঁর সেরা একটি গল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৮৮০ সাল থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে মোপাসাঁ ছয়টি উপন্যাস প্রকাশ করেছিলেন। যদিও লেখালেখির এই স্বচ্ছন্দ্য-ধারাবাহিকতা আরো দীর্ঘকাল বজায় থাকতে পারত, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি হয়নি। ১৮৯২ সালের জুলাই মাসের ৬ তারিখে তিনি মাত্র ৪২ বছর বয়সে মারা যান। তার লেখা Necklace গল্পটিকে নেকলেস নামে বঙ্গানুবাদ করা হল।)

0 comments: