ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়
Posted in ধারাবাহিক ২৫(১)
“ ও সজনা! ওগো নিঠুর প্রিয়তম! তোমাকে আমার বড্ড মনে পড়ে। চাঁদ কি জানে - কোন চকোর ওকে
কামনা করে? তুমি কি জানো যে তুমিই আমার মন্দির, তুমিই আমার পূজা, তুমিই আমার দেবতা? হ্যাঁ,
তুমিই আমার দেবতা। তোমার কথা ভেবে আমার ঘুম আসে না, সারারাত জেগে এপাশ ওপাশ করতে থাকি।
এখন আমার অবস্থা দেখ—না সইতে পারি, না রইতে। দেখ আমার বুক কেমন ধকধক করছে, তোমাকে
দেখলেই হৃদয়ের গতি বদলে যায়। তুমি তো কখনও উড়ে যাও, কখনও মুখ ফিরিয়ে চলে যাও—আমার
হৃদয়ের গোপন কথা জানতে চাও না। তোমাকে নিয়ে আমার একটাই নালিশ—তুমি চাও ভালবাসা লুকিয়ে
রাখতে।
“কহীঁ দীপ জলে কহীঁ দিল, জরা দেখ তো আ কর পরোয়ানে”।
দেখা হলে অনেক কথা বলার আছে। বুকের এই জ্বালা কাকে বলি! মন চায় প্রেমে সব উজাড় করে দিতে
। কিন্তু আমার “নাদান বালমা না জানে জী কে বাত”। তাই তো সেদিন তোমার কাছে এসেছিলাম। “পিয়া
মিলন কো জানা”। আমার জ্যোৎস্না আমার সঙ্গে আড়ি করেছে। আমার শূন্য ঘরে আঁধার। আমি
তোমাকে দেখা করে বলতে চাইছিলাম যে আমার কিছু চাই না। শুধু আমায় তোমার “পলকো কী ছাঁও মেঁ
রহনে দো”। এটাই আমার অনেক পাওয়া। কিন্তু দুনিয়ার এটাই নিয়ম—‘কিসী কো গিরানা, কিসী কো
মিটানা’। আমি তোমার ছাতে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু তোমার বিছানায় অন্য কোন পুরুষ শুয়ে ছিল। লজ্জায়
মরে গেলাম। নিরূপায় হয়ে ঘরে ফিরে এলাম। হে ঘূর্ণি ঝড় ! হাসো, খুব হেসে নাও। আমাকে নিয়ে হাসো,
আমার ভালবাসায় কটাক্ষ করে হাসো।
পাড়ায় আমার বদনাম হচ্ছে, আর তুমি চুপটি করে মুখ বুজে বসে রয়েছ? আর কত কষ্ট দেবে? আর
কত? দাও, যন্ত্রণা দাও। আমি ব্যাথায় ছটফট করেও তোমার গান গেয়ে যাব। শিগগির দেখা করা
দরকার। আজ আসতে পারবে? তোমা বিনা আমার মন্দির আজ শূন্য। “অকেলে হ্যাঁয়, চলে আও, জহাঁ
হো তুম”। “লগ জা গলে সে ফির ইয়ে হসীঁ রাত হো ন হো”। আমায় জড়িয়ে ধর, কে জানে, এমন সুন্দর রাত
আর আসবে কি? আমার এটাই ইচ্ছে যে তোমার দ্বারে যদি আমার প্রাণ যায় তো যাক! হায়, অনেক
আশায় বুক বেঁধে বসে আছি। দেখ গো, আমার মন যেন না ভাঙে!
তোমাকে ভেবে ভেবে
কোন এক উন্মাদিনী
ছাতের পাঁচিলের কাছে একটা নোংরা কাগজের পুরিয়া পড়ে আছে, সঙ্গে একটা ঢিল বাঁধা। দেখা গেল ওটা
একটা প্রেমপত্র! রঙ্গনাথ চিঠিটা একবার পড়ল, দ্বিতীয়বার পড়ল, আরও কয়েকবার পড়ল। বুঝতে
বাকি রইল না কে লিখেছে। সেই অজানা মেয়ে যার বুকের চাপ নিজের বুকে অনুভব করে রঙ্গনাথের সারা
রাত খাজুরাহো আর কোনারকের কথা মনে পড়ছিল। এটাও বোঝা গেল যে এই প্রেমপত্র লেখা হয়েছে
রঙ্গনাথ নয়, অন্য কারও কথা ভেবে।
কে সে?
রূপ্পন?
তাহলে এই চিঠিটি বেলা লিখেছে রূপ্পনের জন্যে? তবে কি সেই রাতে ছাদে চুপচাপ চলে আসা মেয়েটিই
বেলা?
যদি ভাবা হয় যে রঙ্গনাথ তর্কশাস্ত্রের বা নব্যন্যায়ের কোন মহান পণ্ডিতের মত অনেক
ভেবেচিন্তে, দুইয়ে দুইয়ে চার করে, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পেরেছে তাহলে ভুল হবে।
আসলে ও এই প্রেমপত্রের লেখিকাকে বেলা ধরে নিয়ে রূপ্পনের লেখা চিঠির সঙ্গে মিলিয়ে ভাবছিল।
আবার আশ্চর্য হচ্ছিল যে শিবপালগঞ্জের মত অজ পাড়াগাঁয়ে কোন মেয়ে এত ফিল্মি গান জানে!
চিঠির প্রতিটি ছত্র কোন না কোন হিট বোম্বাইয়া সিনেমার গান থেকে টোকা। এমন জানলে
বিশ্ববিদ্যালয় এই লেখিকাকে বুকে জড়িয়ে না ধরলেও ‘ফিল্মি সাহিত্যের ডক্টরেট’ এর পদক ওর
গলায় ঝুলিয়ে দিত।
এইসব চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে রঙ্গনাথের ভেতর থেকে এমন একটা আবেগ জেগে উঠছিল যাকে ফিল্মি
গানের ভাষায় বলা যায়—‘কী জানি কেন এই দুনিয়া আমায় জ্বালিয়ে মারে’! যে মেয়েটি সেই রাতে
রঙ্গনাথের গলার আওয়াজ শুনে “ হায় মাঈয়া’ (ওমা) গোছের পবিত্র মন্ত্র পড়ে পালিয়ে গেছল, সে
আজ অন্য কারও উদ্দেশে লিখছে “অকেলে হ্যায়, চলে আও, জহাঁ হো তুম”! আজ আমি একা, যেখানেই
থাকো চলে এস!
এ যেন অ্যাপিল ব্রডকাস্ট করছে। এটা অসহ্য।
চিঠিটা পকেটে পুরে রঙ্গনাথ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
আজ শহরে জোগনাথের মামলার শুনানি হবে। শিবপালগঞ্জে যাদের গুণতির মধ্যে ধরা হয় তারা সবাই
আজ ওদিকে রওনা দিয়েছে। কখনও কোন গুণ্ডার মামলা এজলাসে ওঠে, ব্যস্ গ্রামবাসীদের
স্বাভাবিক ইচ্ছে জেগে ওঠে—চল, শহর ঘুরে আসি, কাছারি দেখে আসি।
গুণ্ডাকে সবার সামনে অপমানিত হতে দেখলে ওনাদের হৃদয়ে পুলক জাগে, আর গুণ্ডাও এই ভেবে খুশি
হয় যে আমার পক্ষে কতলোক হাজির! সেই রীতি রেয়াজ মেনে আজ অনেকে শহরে চলে গিয়েছে। আরও
অনেকে যাবে যাবে করছে।
রঙ্গনাথ দেখল বদ্রী পালোয়ান তার নিজস্ব ভুবনমোহন রূপ ধরে আসছেন। গায়ে মলমলের কুর্তা
ঝলমল করছে, নীচে গেঞ্জি নেই যদিও ফাল্গুন মাসের হিসেবে শীতের ভাব রয়েছে। কোমরে ল্যাঙোট
বাঁধা, কী আশ্চর্য, তার উপরে লুঙি! পায়ে পালিশ করা কালো বুটজুতো। ন্যাড়া মাথা সর্ষের তেলে
জবজবে, তার অনেক উঁচুতে নীল আকাশ।
রঙ্গনাথ প্রথমে ভেবেছিল যে প্রেমপত্রটি রূপ্পনবাবুর হাতে দিয়ে “সংস্কৃতির অবক্ষয়ে সিনেমার
ভূমিকা” গোছের বিষয় নিয়ে কিছু ডায়লগ ঝাড়বে, যাতে বেলার প্রেমে রূপ্পনের অধঃপতন ঠেকানো যায়।
কিন্তু ও জেনে গেছল যে এই বিষয়ে রূপ্পনের সঙ্গে কথা বলা মুশকিল। কিন্তু প্রেমপত্র পাওয়ার মতন
অসহ্য ঘটনাকে চুপচাপ হজম করাটাও ঠিক হবে না। কিন্তু বদ্রী পালোয়ানকে দেখে ও নিজের প্ল্যান
বদলে ফেলল। যেমন কোন আমেরিকান এক্সপার্ট এলে আমরা কখনও কখনও নিজেদের প্ল্যান বদলে
ফেলি।
বদ্রী পালোয়ান প্রেমপত্রটি দূর থেকে পড়তে লাগল। কাজটা সহজ করার জন্যে রঙ্গনাথ দেড় ফুট
দূরে দাঁড়িয়ে কাগজটাকে দু’হাতে মেলে ধরল। এক জায়গায় পালোয়ানকে চোখ ছোট করতে দেখে রঙ্গনাথ
সাহায্য করবে ভেবে পড়ে দিল—‘ ফির ইয়ে হসীঁ রাত হো ন হো”, মানে “হসীন, অর্থাৎ খুব সুন্দর”।
বদ্রী পালোয়ান ঢেঁকুর তুলল। হয়ত বলতে চাইল—বেশি বোঝাতে হবে না। এসব আমার জানা আছে। পুরো
চিঠিটা পরে পালোয়ান ওটা নিয়ে ভাঁজ করে জামার পকেটে পুরল।
রঙ্গনাথ বলল , “রূপ্পন বাবু খারাপ রাস্তায় চলছেন। আর ওই মেয়েটা! কে জানে চিঠিতে কত ফালতু
আবর্জনা ভরে দিয়েছে”।
উত্তরে বদ্রী পালোয়ান হো হো করে হেসে উঠল। “চিঠিটা তো শ্বশুড়ী ওই গ্রাম-সেবিকা লিখে দিয়েছে।
এ গাঁয়ে ও ছাড়া আর কেউ এসব জানে না”।
“ তার মানে –তার মানে রূপ্পন বাবু কোন গ্রামসেবিকার চক্করে ফেঁসেছেন”?
বদ্রী পালোয়ানের হাসি আর থামে না। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “না না। তুমি তো একেবারে
উলটা বুঝিলি রাম! ও বেচারি এসব করে না, শুধু অন্যদের হয়ে চিঠি লিখে দেয়”।
পালোয়ান নিজের রাস্তায় এগিয়ে গেল। যেতে যেতে রঙ্গনাথের হতভম্ব চেহারা দেখে বলে গেল, “এই
কাগজের টুকরো নিয়ে আর মাথা ঘামিও না। আমি সব ঠিক করে দেব”।
আদালত ভবন শহরে, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে গোটা শিবপালগঞ্জ এজলাসে হাজির। জোগনাথের বিরুদ্ধে
চুরির মামলার শুনানি অলছে। আজ সাক্ষীদের বয়ান নেয়া হচ্ছে।
আদালতের পরিবেশ একেবারে জঘন্য এবং অশ্লীল। লোকজন বারান্দায় নেড়ি কুকুরের মত শুয়ে রয়েছে।
দোলের দিন প্রায় এসে গেছে। তাই লোকের মুখে ছ্যাবলা চুটকি এবং খিস্তিখেউড় লেগেই আছে। শরীরে
ময়লা কিন্তু নানারঙের কাপড় জামা। ময়লা কাপড় পরা বাদী-প্রতিবাদী-সাক্ষীর দল বিড়ি টানতে টানতে
অথবা নোংরা দাঁতের পেছনে খৈনির গুঁড়ো চেপে রেখে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছে। এক নারী বারান্দায়
শুয়ে বাচ্চার মুখে মাই ঠুঁসে দুধ খাওয়াচ্ছে আর কিছু নাগরিক তাই হাঁ করে দেখে দাঁত বের করছে।
এতোল বেতোল হাওয়ার দাপটে ধূলো ও শুকনো পাতা উড়ে বারান্দায় ছড়িয়ে পড়ছে। পুলিসের দুই সেপাই
ইউনিফর্ম পরে আদালতের বারান্দায় খালি পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে ওদের পায়ে খাকি রঙের পট্টি
জড়ানো। ওদের মধ্যে একজনের জুতো সর্বদা অন্য কাউকে মেরামত করতে মুখিয়ে থাকে; সে জুতো
জোড়া এখন বটগাছের নীচে এক মুচির হাতে মেরামত হচ্ছে। দ্বিতীয়জন তার জুতোজোড়া এজলাসের
দরজার সামনে খুলে রেখেছে। কারণ, ও সদ্য পুলিশ হয়েছে। এই জুতো ওর পায়ের বুড়ো আঙুলে কেটে
বসেছে। উকিলের দল, কাজ থাক বা না থাক, কাজের বোঝায় আতুর হয়ে সমানে এজলাসের ভেতর বার
করছে। এজলাসের পেশকারেরা হাই তুলে গয়ং গচ্ছ ঢঙে প্রতি পনের মিনিটে একবার করে পান
দোকানের দিকে ঘুরে আসছে আর মামলাবাজ লোকদের কাউকে পেছনে কাউকে বগলে চেপে মুখ ভর্তি
পান-খয়ের-দোক্তা-চূণ ঠেসে বোঝাতে বোঝাতে ফিরে আসছে যে আজ অনেক কাজ,এবার পরশুদিন
এসো। তারপর উটের মত ঘাড় তুলে এজলাসের নিরাপদ এলাকায় ঢুকে পড়ছে।
বারান্দার এক কোণে সেই ল্যাঙড়াটাও বিচারের আশায় বসে আছে।
শনিচর এখন গ্রামসভার প্রধান। তাই আমোদগেঁড়ে লোকজনের ভীড়ে ওর থাকা জরুরি। আরও কারণ যে
আজ ছোটে পালোয়ান জোগনাথের বিরুদ্ধে পুলিসের সাক্ষী হয়ে হাজির হয়েছে। এটা একটা ঐতিহাসিক
ঘটনা। ছোটে পালোয়ান এবং জোগনাথ দুজনেই বৈদ্যজীর লোক। তাহলে হঠাৎ কী হোল যে একজনেরই
দুই চ্যালা কাঠগড়ায় দুদিকে দাঁড়িয়ে—আসামী এবং সরকারী সাক্ষী!
কিছুদিন আগে এটা নিয়েই রূপ্পনবাবু রঙ্গ করে বলেছিলেন—একডালে ফুটল দুই ফুল, কিন্তু যার যা
কপাল!
শনিচর এবং গ্রামের আরও কয়েকজন একেবারে এজলাসের ভেতরে চলে গেছে। ল্যাংড়াকে শনিচর
সেরেফ ঘুরিয়ে আনার জন্যে রিকশায় চাপিয়ে নিয়ে এসেছিল। সে এখন বারান্দার এককোণে বসে নতুন
শ্রোতাদের নিজের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা শোনাতে ব্যস্ত। ওর একটাই জীবন আর একটাই
অভিজ্ঞতা। সেটাই ও এবার ছড়িয়ে লম্বা করে শোনাচ্ছেঃ
“—তো বাপু, এতদিন পরে, মানে পুরো একবছর তিনমাস কেটে যাওয়ার পর, এখন মামলা লাইনে এসেছে।
নকল চেয়ে যে দরখাস্ত করেছিলাম তাতে আর কোন ভুলচুক নেই। ওটা এখন সদর থেকে তহসিল
অফিসে ফেরত চলে এসেছে। কাল তহসিল অফিসে গেছলাম। জানতে পেরেছি যে নকল জারি করার
কেরানী এখন আমার কাজটা নিজের হাতে নিয়েছেন। আজ সেটার জোগাড় চলছে, ফের ওর আসলের
সঙ্গে মিলান করে দেখা হবে। ব্যস, আর তিন চার দিনের মামলা”।
একজন উকিল থামের গায়ে হেলান দিয়ে সিগ্রেট ফুঁকছিল, সে ওখান থেকে গলা তুলে বলল—‘এতদিন
ধরে খামোখা ঘুরে মরছ, তারচেয়ে আমাকে বা অন্য কোন উকিলের কাছে এলে তিনচার দিনে কাজ হয়ে
যেত’।
ল্যাঙড়া এতদিনে সাধুসন্তদের মত ক্ষমাসুন্দর মধুর হাসি কাজে লাগাতে শিখে গেছে। যা দেখলে সবার
মনে হবে অন্য লোকটি বাচ্চাদের মত কথা বলছে। তেমনই এক মুচকি হাসির মুখোশ পরে ও জবাব দিল,
“ উকিলের দরকার ছিল না তো! এতো আমাদের দুজনেরই সত্যের পথে চলার লড়াই। পাঁচটাকা হাতে গুঁজে
দিলে তিন দিন কেন, তিন ঘন্টায় কাজ হয়ে যেত। কিন্তু ওভাবে না ও পয়সা নেবে, না আমি দেব”।
উকিল উবাচ, ‘কেন নিল না? তুমি টাকা বের করলে অথচ ও নেয় নি’?
ক্লান্ত ল্যাঙড়া বারান্দায় চাদর বিছিয়ে শোয়ার জোগাড় করছিল, বলল-- “ এটা সৎপথের লড়াই, তুমি
তো উকিল; তুমি বুঝবে না”।
লোকজন হেসে উঠল, কিন্তু ল্যাংড়া কোন কথা না বলে চোখ বুজে শুয়ে পড়ল। আচমকা ওর মুখ থেকে
কাতরানোর আওয়াজ! কেউ বলল, “কী হয়েছে ল্যাংড়া? ঠান্ডায় কাবু”?
ও চোখ বুঁজেই মাথা নেড়ে সায় দিল। ওর পাশে বসা লোকটি ওকে ছুঁয়ে বলল, ‘মনে হচ্ছে জ্বর হয়েছে’।
এক বুড়ি চুপচাপ বসে ঘোলাটে চোখে সংসারকে দার্শনিক চোখে দেখছিল। সে বলল, “বড় খারাপ সময়।
আমার দুই ছেলে, দুজনেই জ্বরে কাহিল। ফসল পেকেছে। কাটবে কে? ইঁদুরে ধান খেয়ে যাচ্ছে”।
অনারেরি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাস।
গয়াদীনের সাক্ষ্য নেয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। হঠাৎ জোগনাথের উকিল প্রশ্ন করল, “ তোমার
একটি মেয়ে”?
“হ্যাঁ”।
“ওর নাম বেলা”?
“হ্যাঁ”।
“বয়েস প্রায় কুড়ি”?
“হ্যাঁ”।
মাননীয় আদালত গয়াদীনের দিকে কড়া চোখে তাকালো, মানে এক বিশ বছরের অবিবাহিতা মেয়ের বাপের
দিকে যেভাবে তাকানো উচিত আর কি!
--তোমার ঘরে কোন অন্য স্ত্রী থাকে?
--হ্যাঁ, আমার বিধবা বোন।
--কিন্তু ওতো সবসময় থাকে না।
--না, ও গোড়া থেকেই আমার ঘরে আছে।
-উকিল গর্জে উঠল,-- আদালতে শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছ, মিথ্যে বললে তোমার বিরুদ্ধে মামলা হবে।
এটা কি সত্যি নয় যে বোনটি বেশিরভাগ সময় শ্বশুরবাড়িতে থাকে আর তখন মেয়ে একলা থাকে”?
গয়াদীন চুপচাপ দাঁড়িয়ে। উকিল ফের গর্জে উঠল, “চুপ করে আছ কেন? উত্তর দাও”।
--কী বলব? আপনি এত রেগেমেগে চেঁচাচ্ছেন যে কিছু বলা দুষ্কর।
উকিল সেভাবেই বলল—না, রাগ করি নি।
গয়াদীন চুপ।
উকিল এবার আওয়াজ নরম করে বলল, --উত্তর দাও।
--আমার বিধবা বোন সাবসময় আমার বাড়িতেই থাকে।
--মেয়ের বিয়ে হয়েছে?
-না।
--কবে বিয়ে দেবে?
-- বিয়ে দেওয়া তো ভগবানের কাজ।
ভগবানের নাম শোনামাত্র মহামান্য আদালত মুখ তুলে তাকালেন। এতক্ষণ উনি মন দিয়ে কিছু কাগজ
দেখছিলেন যার সঙ্গে এই মামলার কোন সম্পর্ক নেই। এবার উনি উকিলকে বললেন, “ এসব প্রশ্নের
বর্তমান মামলার সঙ্গে কোন সম্বন্ধ নেই”।
উকিল বলল—শ্রীমানজী, সম্বন্ধ আমি পরে সিদ্ধ করব।
আদালতের সমর্থন পেয়ে পাবলিক প্রসিকিউটর এবার নিজের সাক্ষীকে বাঁচাতে জেগে উঠলেন।
==শ্রীমান, এসব প্রশ্ন একদম অপ্রাসঙ্গিক।
কিন্তু আদালত কড়া চোখে পাবলিক প্রসিকিউটরকে দেখলেন।



0 comments: