Next
Previous
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in




















১৬ পর্ব

দুপুরের একটু আগে বড়কালীর ফোন এল।

- খুব ভালো করেছেন, মিঃ রায়।

-কী ভালো করলাম? কী ব্যাপারে বলছ?

-আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।

-তুমি কোথায়?

-কাঠমান্ডুতে।

-তুমি বোধহয় জানোনা এর মধ্যে অনেক কান্ড হয়ে গেছে।

-আমি সব জানি, মিঃ রায়। আমি কাঠমান্ডুতে কিন্তু আমার কাছে সব খবর আছে।

-তুমি জানো পুলিশ তোমার পুত্র এবং পুত্রবধূকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? তুমি জান যে বন্দুকটা ঘটনাচক্রে আমি …

-সব জানি বললাম তো। আপনি যা করেছেন একেবারে ঠিক করেছেন। কিন্তু দয়া করে ভুলে যাবেন না যে রেবাকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচাবার দায়িত্ব আপনার।

-তোমার পুত্র আর পুত্রবধূকে?

-যা ভালো বুঝবেন করুন। কিন্তু আমি আপনাকে বলে রাখছি পুলিশ ওদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে না। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে কপাল চাপড়াবে পুলিশ।

-আমি কী ওদের কেসটাও দেখবো? কী চাও তুমি?

-ওদেরটাও দেখুন। কিন্তু আপনার প্রথম এবং মূল দায়িত্ব রেবা।

-আর তোমার কী হবে?

- আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমার কয়েকটা জিনিস জানার ছিল। দেখুন আমি এখানে একটা হোটেলে আছি। নিজের নামেই আছি। আমি অন্য কোথাও পালানোর চেষতা করিনি। আমি প্রমাণ করতে পারি যে আমি ব্যবসার কাজে এখানে এসেছি। পুলিশ যে কোনও মুহূর্তে আমাকে খুঁজে পেতে পারে। আমি ঠিক করেছি পুলিশ যদি আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে আমি কোনও কথা বলবো না। আমি বলবো যে আমি আমার আইনি পরামর্শদাতার অনুপস্থিতিতে কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবনা।

-সেটা কিন্তু তোমার পক্ষে ভালো হবে না। বিশেষ করে তোমার সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের এবং পুলিশের সন্দেহ বেড়ে যাবে। তোমার সম্বন্ধে মানুষের এবং পুলিশের ভালো ধারণায় চিড় ধরবে। ওরা কিন্তু তোমাকে দোষী প্রমাণ করতে চাইবে।

-করুক। দেখা যাক না কী করে। চাইলে তো আর নির্দোষকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

-কিন্তু তুমি হয়ত জানোনা যে কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে যা দিয়ে তোমাকে দোষী প্রমাণ করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

- হয়ত আমার বিরুদ্ধে আরও কিছু যোগাড় করতে পারে। আপনি রেবার দিকটা দেখুন। আপনার সাহায্য ওর খুব দরকার।আমার ব্যাপারটা আমি সামলে নেব। আমি ওদের সঙ্গে কোনও কথা বলবো না। আমি বলতে বাধ্য নই বলে আমার বিশ্বাস। তাই নয় কি?

-না বাধ্য নও যদি তুমি বলো যে তুমি তোমার অ্যাটর্নির অনুপস্থিতিতে কিছু বলবে না। উনি এলে তারপর বলবে।

-ঠিক আছে। আমি বলবো যে আপনি আমার অ্যাটর্নি এবং আপনার পক্ষে এখন কাঠমান্ডু আসা অসম্ভব। আর আমারও অনেক ব্যবসাসংক্রান্ত জরুরি কাজ আছে। কিন্তু ওরা যদি বাড়াবাড়ি করে তাহলে আমি কী করবো?

-তুমি এখন বিদেশে। ওরা তোমার বিরুদ্ধে খুনে অভিযোগ এনে তোমাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারে।

-বুঝেছি। কিন্তু আমার মনে হয় আমার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ না থাকলে ওরা এত কান্ড করবে না।

-ওরা যদি নিশ্চিত না হয় যে তোমাকে নিয়ে এসে ওদের কোনও লাভ আছে তাহলে ওরা তোমার জন্য সময় নষ্ট করবে না। কিন্তু সমস্যা হলো এই যে ওরা মনে করে তোমাকে নিয়ে এসে ওদের অনেক লাভ আছে।

-সেক্ষেত্রে মুখ বন্ধ করে থাকবো। ওরা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করুক যে আমি খুন করেছি।

- কিন্তু দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারটা উড়িয়ে দিও না।

-না, না। আমি কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছিনা।

-আমার ভয় হচ্ছে এতক্ষণে পুলিশ রেবাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিয়েছে।

-আমারও তাই মনে হচ্ছে।ওরা আমার ছেলে এবং ছেলের বৌকেও জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ওরা যত কেসটার ভিতরে ঢুকবে তত গুলিয়ে যাবে। আমি জানিনা কী ভাবে তবে আপনি যেটা করেছেন সত্যিই ভাবা যায় না। আমার কাছে প্রশংসার ভাষা নেই। আপনি তো এই হোটেলের নাম্বার জানেন এবং এও জানেন আমাকে পেতে গেলে কাকে ফোন করতে হবে।

-ঠিক আছে। আর আমাকে না পেলে সুন্দরীকে ফোন কোরো। আমি কিছু লোকজনকে গোয়েন্দাগিরির জন্য লাগাচ্ছি। ওদের বিলটা কিন্তু যোগ হবে।

-কোনও সমস্যা নেই। আমি বিনা পয়সায় কোনও কাজ করিনা এবং করাইনা। আপনার যেটা ভালো মনে হয় করুন। টাকা নিয়ে ভাববেন না। আপনার বিল নিয়ে আমি আগে কোনওদিন প্রশ্ন করিনি এবং ভবিষ্যতেও করবো না। কিন্তু আপনি আর যাই করুন রেবার দিকে নজর রাখুন। রাখলাম।

বড়কালীর সঙ্গে কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা ঠেলে সুন্দরীকে ঢুকতে দেখে অবাক হলেন পানু রায়। বললেন,’ কী হলো? আমি যে তোমাকে বললাম ভেতরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে।‘

-আমি পাশের দোকান থেকে মাথাধরার একটা ট্যাবলেট কিনে খেয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে দেখলাম এখন বেশ ঝরঝরে লাগছে। আমি ভাবছিলাম ছোটকালী সেদিন গাড়ি কেনার ব্যাপারে আমাদের কী বলছিল।

-কী বলছিল?

-বলছিল যে নতুন গাড়ি কিনে দু’বছর পরে বিক্রি করতে গেলে ভালো দাম পাওয়া যায় না। তাই চেনাশোনা কোনও পুরনো গাড়ির ডিলারের থেকে গাড়ি নেওয়া অনেক বেশি লাভজনক।

-তার মানে তুমি না ঘুমোতে গিয়ে ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলে?

-কিন্তু আমি ঠিক আছি। ট্যাবলেটটা খেয়ে আমি এখন পুরোপুরি ঠিক হয়ে গেছি।

-কেন গিয়েছিলে?

-আমার গাড়িটা ঠিক চলছিল না। তাই ভাবলাম আজ যখন একটু সময় পেলাম তাহলে একবার ঘুরে আসি। ছোটকালী ওখানে ছিলনা।একজন সেলসম্যানের সঙ্গে দেখা হলো। ছেলেটা জানতো তুমি ছোটকালীর বন্ধু। আমি যখন বললাম যে ছোটকালী আমাদের বিশেষ পরিচিত এবং বলেছিলেন যতটা সম্ভব কম দামে পারবেন উনি আমাদের একজনকে বা দু’জনকেই ভালো গাড়ি ব্যবস্থা করে দেবেন। সব শুনে ছেলেটা আমাকে একটা গাড়ি দেখালো। গাড়িটা দেখে ওটার প্রেমে পড়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।

-গাড়িটা কিনলে?

-কেনার কথা ভাবছি। তোমাকে ফোন করার চেষ্টা করলাম কিন্তু পেলাম না।

পানু রায় উত্তর দেবার আগেই দরজা ঠেলে জগাই ঢুকলো। বললো,’ এবার মনে হচ্ছে যাবতীয় কাগজপত্র হাতে নিয়েই কেলো দারোগা তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে।‘

-কেন? কী হয়েছে?

-পুলিশ তো এখন নিজেদের নখ-চুল ছিঁড়ছে। কিছুতেই কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। তোমাকে একটা খবর দিতে এলাম। তোমার কাজে লাগলেও লাগতে পারে। কেলো দারোগা ছোটকালীর দেয়ালে আটকে থাকা বুলেটটাকে নিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসাবে এতক্ষণ নিয়ে আসেনি। কিছুক্ষণ আগে কেলো দারোগা অস্ত্র বিশেষজ্ঞ সমাহারে বুলেট উদ্ধার করতে গিয়ে কী দেখলো জান?

-কী দেখলো?

-কোনও উৎসাহী ব্যক্তি ওটাকে ইতিপূর্বেই ওখান থেকে নিয়ে গেছে। গুলিটা ত্যারচাভাবে টেবিলে লেগে লাফিয়ে উঠে সামনের দেয়ালে গিঁথে গিয়েছিল।কেউ গিয়ে দেয়ালে একটা ছোট গর্ত করে সযত্নে গুলিটাকে নিয়ে চলে গেছে।

পানু রায় ভুরু কুঁচকে সুন্দরীর দিকে তাকালেন। সুন্দরী বলে উঠলো,’ ভাবা যায়? কিন্তু কে এমন কান্ড করতে পারে, জগাই?’

-কে জানে? কোনও উৎসাহী লোকের কাজ হবে। কিন্তু এখন পুরো কেসটা ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে।

-কিন্তু কী করে? কেন একথা বলছো?

-একটা ঘটনা পরম্পরাকে প্রমাণের জন্য খুব দরকারী সূত্র ছিল ঐ গুলিটা। কেলো দারোগা আঙ্গুল কামড়াচ্ছে এখন। সবাই বলবে পুলিশ এতদিন ঘুমিয়েছিল।

পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ জগাই, তুই কোথা থেকে খবর পেলি?’

- অনেক ঘুরপথে খবরটা আমার কাছে এসেছে। সনাতনের লেখাটা কাগজে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে অনেক লোক ওখানে যেতে শুরু করে। ওখানে কী ঘটছে জানার জন্য সনাতন একজন সেলসম্যানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে এবং মনে হয় কিছু পয়সা-কড়ি দিয়ে ওখানে কী হচ্ছে তার খবর জোগাড় করতে থাকে। কিছুক্ষণ আগে সনাতনের কাছে কেলো দারোগার এই বুলেট খুঁজে না পাবার খবরটা সনাতনের কাছে এসে পৌঁছোয়। সনাতনের অফিসের একটা লোক আমাকে চারদিকে কী ঘটছে সেই সংক্রান্ত খবর দেয় নিয়মিত। ঐ লোকটাই একটু আগে আমাকে ফোন করে ব্যাপারটা জানালো।

- জগাই, এতো অত্যন্ত জরুরি খবর। তোর কাছ থেকে আমি এতটা আশা করিনি। আমি খুব খুশি। এরকম খবর জোগাড় করতে থাক। এই ব্যাপারে সব খবর আমার চাই।

-কিন্তু দাদু, খরচের ব্যাপারটাও দেখতে হবে তো?

-খরচের ব্যাপারে কিছু ভাবার দরকার নেই। কোনও দরকারি খবর যেন বাদ না পড়ে।

-ঠিক আছে দাদু। আমি আসছি। দেখি আর কী খবর জোগাড় করতে পারি।

জগাই বেরিয়ে যায়। পানু রায় এবার সুন্দরীর দিকে সোজা তাকিয়ে বললেন,’ সুন্দরী, এবার আসল গল্পটা আমাকে বলো।‘ পানু রায়ের কথা শেষ হবার আগেই বাইরের দরজা ঠেলে কেলো দারোগা ঢুকলো। কেলো দারোগা বললো,’ কোনও ব্যক্তিগত আলোচনার মধ্যে এসে পড়লাম?’ পানু রায় বললেন,’ হ্যাঁ, একটা ছোট ব্যক্তিগত আলোচনা শেষ করার ছিল।‘

-কোনও ব্যাপার নয়। আপনারা শেষ করে নিন। বাইরে আমাদের লোকেরা আছে। আর কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না।

- আমার অফিসটাকে নিজের বাড়ির মত ভাবার জন্য ধন্যবাদ।

-দেখুন আমি আইনের প্রতিনিধি। আইন কারুর বাড়ির বাইরের ঘরে অপেক্ষা করে না। আমাদের যখন কারুর সঙ্গে দেখা করার দরকার হয় তখন আমরা সোজাসুজি তার কাছে পৌঁছে যাই।

-আপনি যে আসছেন সে কথা জানানোর প্রয়োজন বোধ করেন না?

-কিছু কিছু বোকা পুলিশ অফিসার করে। আমি করিনা। আমি কাউকে আগাম সাবধান করিনা। আমি হঠাত পৌঁছে গিয়ে প্রথম এক-দুই সেকেন্ডে তার মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করি।

-আমার মুখ দেখে কী বুঝলেন?

-অনেক কিছু। বুঝলাম যে আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নন।

-ঠিকই বুঝেছেন। যাই হোক, এসে যখন পড়েছেন বসুন। মাথার টুপি খুলুন এবং বলুন আপনার জন্য কী করতে পারি?

-ব্যস্ত হবেন না। আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমি কী চাই।

-আমি তো গনৎকার নই।তাছাড়া আপনি কেন এসেছেন সেই নিয়ে আকাশপাতাল চিন্তা করে সময় নষ্ট করার সময় এবং ইচ্ছা কোনওটাই আমার নেই। আমার আগের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আপনি আপনার কী চাই বা কী ভাবছেন বা কী পছন্দ করেন এবং করেন না তা বেশ গুছিয়েই বলতে পারেন। সময় নষ্ট না করে বলে ফেলুন।

-আপনাকেই আগে বলতে হবে। আপনি কালীকৃষ্ণের অফিসে গিয়েছিলেন এবং ওনার টেবিলে গুলি ছুঁড়েছিলেন।

-ওটা একটা অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা ছিল। কেউ হতাহত হয়নি। আমি কালীকৃষ্ণকে টেবিল বাবদ ক্ষতিপূরণ দেব বলেছি। এতে পুলিশের কী করার আছে? পুলিশের এই ব্যাপারে কোনও আগ্রহ থাকার কথা নয়।

- কোনও আগ্রহ থাকার কথা নয় বলছেন? ধরুন যদি জানা যায় যে ঐ বন্দুকটা দিয়েই শিবুলাল রেগমিকে তার অ্যাপার্টমেন্টে খুন করা হয়েছিল তাহলে?

-আপনি কি নিশ্চিত যে ঐ বন্দুকটা দিয়েই খুন করা হয়েছিল?

-একশোবার। এবার বলুন ঐ বন্দুকটা আপনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন?

- কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে। আমি জানতে চেয়েছিলাম যে ওর কাছে বন্দুক আছে কি না। ও বললো ও আত্মরক্ষার জন্য কাছে বন্দুক রাখে। অনেক সময় গুন্ডা বদমায়েশরা মালিকদের আটকে রেখে টাকা আদায় করে। এখানে এরকম ঘটনা আকছার ঘটে। তাছাড়া কালীকৃষ্ণের লাইসেন্স আছে। আপনি এ ব্যাপারে আমার চেয়ে বেশি জানবেন নিশ্চয়ই।

-তাহলে বলছেন কালীকৃষ্ণ আপনাকে বন্দুকটা দিয়েছিল।

-হ্যাঁ, ওর হাত থেকেই আমি বন্দুকটা নিয়েছিলাম। বলা যেতে পারে ও আমাকে বন্দুকটা দেখাচ্ছিল ।আমি বন্দুকটা ওর হাত থেকে নিয়ে বন্দুকটার ভারসাম্য পরীক্ষা করছিলাম আর তখনই অসাবধানতাবশত ট্রিগারে টান লেগে একটা গুলি ছিটকে যায়। কালীকৃষ্ণ আমাকে বলেনি যে বন্দুকটায় গুলি ভরা আছে।

- আপনি কি ভেবেছিলেন যে খালি বন্দুক নিয়ে উনি আত্মরক্ষা করেন?

-আমি অত কিছু ভাবিনি। বন্দুকের ট্রিগার আমি ইচ্ছাকৃতভাবে টানিনি। বলা যেতে পারে ওটার ভারসাম্য পরীক্ষা করার সময় কোনওভাবে ট্রিগারে টান পরে একটা গুলি বেরিয়ে যায়।

-বেশ, তারপর কী হলো?

-আমি রেবা কৈরালার আইনি পরামর্শদাতা। আমার মনে হয়েছিল রেবার জীবন বিপন্ন হতে পারে। আপনি জানেন ওর বাবা খুন হয়েছিল এবং আমি যতদূর জানি খুনি এখনও অধরা।আমি কালীকৃষ্ণকে বললাম যে বন্দুকটা কয়েকদিনের জন্য রেবাকে দিয়ে রাখলে ভালো হয়। আপনি জানেন কি না জানি না যে কালীকৃষ্ণের বিয়ের আগে পর্যন্ত রেবার সঙ্গে ওর ভালো বন্ধুত্ব ছিল।

-জানি, মিঃ রায়। আর এও জানি যে আপনি খুব ভালোভাবেই জানেন কালীকৃষ্ণের যে বন্দুকটার কথা আপনি বলছেন সেটা দিয়ে শিবুলালকে খুন করা হয়নি।

-শুনে আমার ভালো লাগছে। আমি সত্যিই তাই মনে করি। কিন্তু পুলিশ এত জোর দিয়ে বলতে আরম্ভ করল যে ওটা দিয়েই খুন করা হয়েছে আমার পক্ষে অন্যকিছু বলা সম্ভব হচ্ছিল না।

-আপনি এও জানেন আমি কী বলতে চাইছি। আপনি আসলে আসল খুনী বন্দুকটার সঙ্গে এই বন্দুকটা পাল্টে দিয়েছিলেন। আপনার কাছে খুনী বন্দুকটা ছিল। সেটা আপনি আপনার এক ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। আপনি ঐ বন্দুকটা লুকিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে কালীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আপনি তারপর কালীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন তার কাছে কোনও বন্দুক আছে কি না। উনি বললেন আছে এবং ড্রয়ার থেকে বের করে টেবিলে রাখলেন। আপনি বন্দুকটা পরীক্ষা করার আছিলায় ট্রিগার টেনে দিলেন। ঐ গোলমালের মধ্যে সবার নজর এড়িয়ে আপনি আপনার বন্দুকটার সঙ্গে ঐ বন্দুকটা পাল্টে দিলেন।

-আপনি বলছেন কালীকৃষ্ণের বন্দুকটা খুনী বন্দুক নয়। খুনী বন্দুকটা আমার কাছে ছিল যেটা আমি পাল্টে দিয়েছি। আপনি একটা কাজ করতে পারেন। ঐ বন্দুকটা যেটা আপনারা পেয়েছেন সেটার নাম্বার নিয়ে ওটার রেজিস্ট্রেশন কার নামে দেখতে পারেন।

-সেটা আমরা ইতিমধ্যেই করেছি। ঐ বন্দুকটা কিনেছিলেন কালীকৃষ্ণের বাবা কৃষ্ণকালী।

-তাহলে ওটা কালীকৃষ্ণের কাছে কী করে গেল?

-কৃষ্ণকালীর অনেক দোকানের মধ্যে একটা খেলার সরঞ্জামের দোকান আছে। সেই দোকানের জন্য কৃষ্ণকালী তিনটে একই রকমের বন্দুক কেনে। তিনটেই হুবহু এক। তার মধ্যে একটা সে কালীকৃষ্ণকে দেয় আর দু’টো নিজের কাছে রাখে।

-নিজের কাছে দু’টো রাখে?

-ওনার ছেলে আমাদের তাই বলেছে, মিঃ রায়।

-তার মানে এটাই দাঁড়ায় যে বন্দুকটা আমি কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে নিয়েছিলাম সেটা আসলে কৃষ্ণকালীর এবং কৃষ্ণকালী সেটা তার ছেলে কালীকৃষ্ণকে দিয়েছিল।

-খুনী বন্দুকটা কৃষ্ণকালীর একসঙ্গে কেনা তিনটে একইরকম বন্দুকের একটা। আমরা জানি যে বন্দুকটা আপনি কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে নিয়েছিলেন সেটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-আপনি সেটা কী করে বুঝলেন, দারোগাবাবু?

-কারণ ঐ বন্দুকটা খুনের দিন সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত কখন কোথায় ছিল তার পুরোপুরি হদিশ আমরা কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে পেয়েছি।

-তাহলে আপনি নিশ্চিত যে ঐ বন্দুকটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-আশ্চর্য! সে কথাই তো আমি এসে পর্যন্ত বলে আসছি।

-আপনি একশভাগ নিশ্চিত তো? আগে আপনি বলেছিলেন যে ওটা দিয়েই খুন করা হয়েছিল এবং এখন আপনি বলছেন ওটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-মিঃ রায়, এখন আমি বলছি খুনী বন্দুকটা আপনার কাছে ছিল। ঐ বন্দুকটা কৃষ্ণকালীর বন্দুক যেটা সে কোনও কারণে রেবা কৈরালাকে দিয়েছিল। রেবা কৈরালা ঐ বন্দুকটা নিয়ে শিবুলালের কাছে যায় এবং তাকে খুন করে। রেবা কৈরালা আপনার সাহায্য চায়। আপনি খুনী বন্দুকটা নিয়ে কালীকৃষ্ণের কাছে যান এবং তার বন্দুকের সঙ্গে খুনী বন্দুকটা পাল্টে নেন। তারপর খুনী বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে আপনার সঙ্গে কালীকৃষ্ণ রেবার কাছে যায়।

-দারোগাবাবু, আপনার কেন মনে হচ্ছে যে খুনী বন্দুকটা আমি নিয়ে গিয়ে ওখানে রেখে আসব যাতে পুলিশ সেটা সহজে খুঁজে পায়? একটা কারণ তো দেখান।

- আমি জানিনা কেন।তবে আমি নিশ্চিত আপনি এটা করেছেন। আর একটা কথা বলে রাখি মিঃ রায়, এবার কিন্তু গল্প বলে আপনি পার পাবেন না। শিবুলালের মৃত্যুর সময় আর আপনার ওনার সঙ্গে দেখা করার সময় মিলে যাচ্ছে।

-তার মানে আমি শিবুলালকে খুন করেছি।

-না, আপনি করতেও পারেন। আমি বলছিনা যে আপনি শিবুলালের ফ্ল্যটে ঢুকে ঠান্ডা মাথায় তাকে খুন করেছেন। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে আপনার সঙ্গে কোনও বিষয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। শিবুলাল উত্তেজিত হয়ে বন্দুক বের করলো। তখন কোনও উপায় না দেখে আপনি বন্দুকটা ওর ওপর চেপে ধরে ট্রিগার টেনে দিলেন।

-আপনাকে আরও ভালো একটা গল্প তৈরি করতে হবে, দারোগাবাবু।আমি যখন বেরিয়ে আসি তখন শিবুলাল বেঁচে ছিল এবং ভালো ছিল। সে কোনও একজন আসার জন্য অপেক্ষা করছিল।

-ঠিক, রেবা কৈরালার জন্য।

-না, রেবা নয়। অন্য কেউ যে তাকে একটু আগেই ফোন করেছিল এবং বলেছিল যে সে এক্ষুনি আসছে।

-আপনি কী করে জানলেন?

-শিবুলাল আমাকে চলে যেতে বলেছিল । বলেছিল কেউ একজন এক্ষুনি তার কাছে আসবে এবং ব্যাপারটা বেশ জটিল। আমি যেন তক্ষুনি চলে যাই।

-তক্ষুনি আপনি চলে গেলেন এবং বাড়ির পিছনে অপেক্ষা করতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে জনৈকা মহিলা পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেন আর আপনি তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে গেলেন। তাই তো?

-আমি তাই করেছিলাম?

-একদম তাই এবং ঐ জনৈকা মহিলা সে যেই হোক সেই খুনী। আপনি তাকে বাঁচাতে চাইছেন। আপনি জানতেন সে শিবুলালের কাছে যাবে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সে আপনাকে বলে যে সে শিবুলালকে খুন করেছে। সে বন্দুকটা আপনার হাতে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে সে এখন কী করবে। আপনি তাকে নিশ্চিন্ত করেন এবং বলেন যে আপনি বন্দুকটাকে কোথাও চালান করে দেবেন এবং কেসটাকে গুলিয়ে দেবেন।

-বাঃ, গল্পটা বেশ ভালো সাজিয়েছেন। কিন্তু মুস্কিল হলো এই যে এই গল্পটা প্রমাণ করা অসম্ভব কারণ গল্পটা ভুল।

-আমাদের কাছে প্রমাণ আছে।

-তাই নাকি?

-আমাদের কাছে প্রত্যক্ষদর্শী আছে যে সাক্ষ্য দেবে যে আপনি বাইরে অপেক্ষা করছিলেন এবং ঐ মহিলা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলে আপনি তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যান। আমাদের কাছে আরও প্রত্যক্ষদর্শী আছে যে সাক্ষ্য দেবে যে আপনার কাছে খুনী বন্দুকটা ছিল এবং সেটা থেকে গুলি আপনি কালীকৃষ্ণের টেবিলে ছুঁড়েছিলেন।

-আপনি কী করে প্রমাণ করবেন যে ঐ বন্দুকটাই খুনী বন্দুক?

-ঐ গুলিটা থেকে। আমাদের অস্ত্র বিশারদ অনায়াসেই প্রমাণ করে দেবেন যে ঐ গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। সেটা যদি হয় তাহলে প্রমাণ হবে যে আপনি ঐ মহিলা যিনি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমেছিলেন তাঁর কাছ থেকে খুনী বন্দুকটা নিজের কাছে নিয়েছিলেন। আর তা যদি না হয় তাহলে প্রমাণ হবে আপনি কালীকৃষ্ণের অফিসে বন্দুক বদল করেছিলেন।

-বেশ, বেশ। তার মানে আপনার যুক্তি অনুযায়ী যাই ঘটুক আমি দোষী প্রমাণিত হবো।

-হ্যাঁ, তাতে অসুবিধের কী আছে?

- না এটা অন্যায় হবে। আমার মনে হয় গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হলে আমি দোষী আবার না ছোঁড়া হলে আমি বন্দুক বদলের জন্য দোষী এরকম একটা বিচার ন্যায়সঙ্গত নয়। আমার মনে হয় আপনার এই চিন্তাভাবনা পক্ষপাতদুষ্ট, দারোগাবাবু।

-সেই একই ঘেঁটে দেওয়ার চেষ্টা। যতবারই আমরা কোনও গুলি ছোঁড়ার তদন্তে নামি ততবারই আপনি অন্য একটা বন্দুক আমদানি করে সহজ ব্যাপারটা গুলিয়ে দেন।

-তাতে দোষের কী দেখলেন, দারোগাবাবু।

-এটা বেআইনি, ব্যস।

-তাহলে আমি অপরাধী –এটাই শেষ কথা, ব্যস?

-এবার আপনাকে আর ছাড়ছিনা। সেটা মন দিয়ে শুনে রাখুন।

-আপনি তাহলে আমার উদ্ভাবনীশক্তির প্রশংসা করবেন নিশ্চয়ই?

-আমি আপনার কায়দা ধরে ফেলেছি, মিঃ রায়। এবার কি আপনি বলবেন সেদিন ঠিক কী হয়েছিল? মানে আপনি কী করেছিলেন? যদি বলে দেন ভালো হয়। আমরা আপনাকে অযথা বিরক্ত করবো না। কিন্তু যদি না বলেন তাহলে আমরা অফিসের দেওয়াল থেকে যে গুলিটা উদ্ধার করেছি সেটা আপনার কাছে যে বন্দুকটা ছিল সেটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবো এবং তারপর কী হবে সেতো আপনার জানাই আছে।

সুন্দরী খুক খুক করে কেশে উঠলো। পানু রায় বললেন,’ এটাতো সোজাসুজি ভয় দেখানো হয়ে গেল’। কেলো দারোগা বলল,’ হ্যাঁ। এটাই ঘটবে। আপনাকে আগে থেকে বলে রাখলাম। এটাকে যদি ভয় দেখানো বলেন তবে তাই’।

-আপনি যখন মেনেই নিচ্ছেন আমার আর কিছু করার নেই। আমি আপনাকে বলতে পারি যে আমি কোনও বন্দুক বদল করিনি। আমি যে বন্দুকটা থেকে ভুলবশত গুলি ছুঁড়েছিলাম সেটা এবং কালীকৃষ্ণের ড্রয়ারে যে বন্দুকটা ছিল সে দুটো একই। ঐ বন্দুকটাই কালীকৃষ্ণ রেবার কাছে নিয়ে গিয়েছিল।

-তার মানে আপনি প্রমাণ লুকোনোর চেষ্টা করছেন এবং আততায়ী কে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন।

-আমি আপনাকে যা সত্য তাই বলছি, দারোগাবাবু।

-আপনি পরে বলবেন না যে আমি আপনাকে সু্যোগ দিইনি। আজ আসি।

কেলো দারোগা অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। পানু রায় বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যখন নিশ্চিত হলেন যে কেলো দারোগা আশেপাশে নেই তখন সুন্দরীকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ তুমি কি ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলে এবং গুলিটা দেয়াল থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলে?

-কেন? তোমার কেন মনে হলো আমি এরকম একটা কিছু ঘটাতে পারি?

-তুমি করেছো কি না বলো? আমার ধারণা কেলো দারোগা আমাকে মিথ্যা বলে কথা বের করার চেষ্টা করছিল।

-আমি যদি গুলিটাকে স্মারক হিসাবে নিয়ে এসে থাকি তবে কি সেটা কোনও গুরতর অপরাধ বলে ধরা হবে?

-সেটা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হতে পারে।

-তাহলে আমি যদি বলি যে আমি ওটা নিয়ে এসেছি তাহলে সেটা তোমার পক্ষে অস্বস্তিকর হতে পারে তাই না? আমি বলছি –‘যদি আমি বলি’।

-ঠিক আছে। তুমি যা ভালো বুঝবে।

- তুমি আমাকে অপরাধবোধের হাত থেকে বাঁচালে দাদু।




চলবে