Next
Previous
0

সম্পাদকীয়

Posted in






স্বাধীনতার পর থেকে ভারতবর্ষ সময়ের অনেক জটিল বাঁক পেরিয়ে এসেছে। যুদ্ধ, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংকটকে কেন্দ্র করে শিকড়ছেঁড়া মানুষের ঢল, জাতিদাঙ্গা - কী নেই সেই দীর্ঘ তালিকায়?

নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সেই সূত্রে একাধিক ছাত্রের আত্মহনন যুবসমাজের মধ্যে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, তিন সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া সোনম ওয়াংচুকের অনশন-অবস্থান সেই ক্ষোভকে একটি গণ-আন্দোলনের চেহারা দিয়েছে। এজাতীয় ঘটনা স্বাধীনতার পরে এই প্রথম। কারণ রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন সময়ে কোনও বিশেষ দাবি নিয়ে অনশন পালন করলেও, সোনম ওয়াংচুকের এই পদক্ষেপের গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী। ছাত্রসমাজ সোনমের মধ্যে এমন একজনকে খুঁজে পেয়েছে, যাঁর সঙ্গে সহজেই আত্মীকরণ ঘটছে, তাঁকে একান্ত আপনজন মনে হচ্ছে, এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। তরুণরা সোনমের মধ্যে সম্ভবত দেখতে পেয়েছে একজন প্রকৃত মানুষকে, যে সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে নিজের জীবনকেও বাজি রাখতে প্রস্তুত। তাঁর এই অদম্য মনোবল অসংখ্য পড়ুয়ার মধ্যে জাগিয়ে তুলেছে এমন এক শক্তি, যা আমরা আগে কখনও দেখিনি। এই ভারত অন্য ভারত। অনন্য ভারত।

সতর্ক থাকুন। দায়বদ্ধ থাকুন।

শুভেচ্ছা নিরন্তর।
0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়

Posted in




















দু’মাস আগে কবি নজরুলের জন্মদিন পালন হয়ে গেছে। কিন্তু তাঁকে নিয়ে বিতর্ক এবং টানাটানি এখনও চলছে। জন্মেছিলেন রাঢ় বাংলার চুরুলিয়া গ্রামে। কিন্তু হয়ে উঠেছেন পড়শি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। আহা, তাতে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল? কোলকাতার জোড়াসাঁকোর রবীন্দ্রনাথের লেখা গান “আমার সোনার বাংলা” কি পদ্মাপারের জাতীয় সংগীত নয়? তাহলে নজরুল কী দোষ করলেন? বাংলাদেশ ওনার শ্বশুরবাড়ি বটে!

কিন্তু নজরুলের মত নেওয়া হয়েছিল কি? কী মুশকিল, রবীন্দ্রনাথেরও নেয়া হয় নি। তাতে কী?


কেউ ভোলে না কেউ ভোলে

পঞ্চাশের দশক। প্রাইমারি ক্লাসে পড়ছি। নজরুলের নাম শুনেছি শুধু, কবিতা টবিতা পড়া হয় নি। গান? নাঃ। একটা চূণের ডাব্বামার্কা রেডিও। তাতে ভক্তিমূলক গান, পল্লীগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত এই সব শোনা হয়। বেশিরভাগ সময় ওটা দাদু ঠাকুমার দখলে। আমরা শুনতাম শনি-রোববারে অনুরোধের আসর। ওই গানগুলো বিভিন্ন উৎসবের সময় চারদিকে ঝমঝমিয়ে বাজে। লাইনগুলো মুখস্থ হয়ে যায়। নজরুলগীতিকে ভীড়ের মধ্যে আলাদা করে চেনার মত সুযোগ ও কান তৈরি হয় নি।

তবে কাকাদের ব্যাচেলর্স ডেনের দেয়ালে অনেক ফটো টাঙানো। প্রথমে চুলদাড়িওলা কজন—দেখলে কীরকম সাধুবাবা সাধুবাবা ফীলিং হয়। এঁদের মধ্যে শুধু রবি ঠাকুরকে চিনি। দেখলেই গড় হয়ে ‘ঠাকুর নম’ বলতে ইচ্ছে হয়। তারপরে লেনিন দাদু, স্তালিন দাদু, পাগড়ি মাথায় ঋষি বঙ্কিমের পর আলাদা করে দু’জন।

একজন গালে হাত দিয়ে ঘুম ঘুম চোখে কিছু ভাবছেন। ঠিক করে গোঁফ ওঠেনি। দেখলে একডাকে কবি বলে চেনা যায়। উনি রানার বলে হেমন্তের গাওয়া হিট গানটার পদ্য লিখেছেন। পাশে আরেকজনের গোঁফদাড়ি নেই, কিন্তু মাথায় বাবরি চুল। বড় বড় টানা টানা চোখ, কেমন গল্পের রঘু ডাকাতের মত।

কাকাদের ধমক খাই। উনিও বড় কবি। ছোটকা একটা সুন্দরমত বই ধরিয়ে দেয়—গাঢ় সবুজ ডাঁটি ও পাতার উপর রক্তলাল পপি ফুল। বইটির নাম সঞ্চিতা। মায়ের বিয়েতে পাওয়া কালো রঙে বাঁধানো ‘সঞ্চয়িতা’ থেকে দাদু অনেক কবিতা পড়ে শোনায়। ওটা রবি ঠাকুরের বই। তা ইনি সঞ্চিতা নাম রাখলেন কেন? রবি ঠাকুরের নকল করে কবিতা লেখেন? ফের কানমলা।

--বোকার মত কথা না বলে পড়ে দেখ।

হুঁ, পাতা ওল্টালাম—“বাতায়ন পথে গুবাক তরুর সারি”! বাতায়ন মানে জানি, কিন্তু গুবাক? শব্দটা বিচ্ছিরি। বইটা রেখে দিলাম। দেখি ছোটকা কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। ফের তুলে নিলাম।

“সেদিন দেখিনু রেলে

কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে।

চোখ ফেটে এল জল।

এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল”?


আরে, এ তো সত্যি কথা! আরো ছোট বয়সে কাকাদের কোলে উঠে হাওড়া স্টেশনে গিয়েছিলাম। ঠিক এমন ঘটনা দেখেছি। লাল কুর্তা ও ময়লা ধুতি পরা, হাতে নম্বর লেখা পেতলের চাকতি বাঁধা হিন্দি বলা কুলিকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হোল। যা কানে এল—চার আনায় রফা হয়েছিল। কিন্তু মাল তোলার পর বাবুসাহেব একটা হলদেটে দু’আনি ছুঁড়ে দিলেন। কুলি নেবে না।

প্ল্যাটফর্মে উঠে দাঁড়িয়ে মানুষটা গায়ের ধূলো ঝেড়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে কু--ঝিক ঝিক করে এগোতে থাকা রেলগাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর চোখে জল ছিল না, আগুনও না। কেমন যেন গরুর মত বোবা দৃষ্টি।

নজরুল যেন আমার মনের কথা, ওর বোবা চোখের ভাষা নিয়ে লাইনটি লিখেছেন-- এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল? কিন্তু তারপরে ঘ্যান ঘ্যান করেন নি।

গর্জে উঠেছেন—“বেতন দিয়াছ? চোপরও যত মিথ্যাবাদীর দল!

                            কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোড় পেলি বল”!

আহা, বুকের মধ্যে দুর্গাপূজোর ঢাক বেজে উঠল। আকাশে গুর গুর করে মেঘ ডাকল।

খোলাখুলি বাবুসাহেবদের মিথ্যেবাদী বলা! চোপরও বলে ধমক দেয়া! এমন তো দেখিনি শুনিনি।

আর “এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল”? এই লাইনটা উনি লিখেছেন আমার জন্যে। আমি একা নই, আমার মত দুর্বলদের জন্যে। মানে যারা গায়ে গতরে রোগা প্যাংলা, খ্যাংরাকাঠি আলুর দম গোছের। যারা হাতাহাতিতে কখনই পেরে ওঠে না। শুধু মার খায়।

মার খায় স্কুলে, মার খায় খেলার মাঠে। আমাদের দেখলেই অন্যেরা চিনতে পারে—সহজ শিকার। এদের পেটানো যায়। এরা মাস্টারমশাইয়ের কাছে নালিশ করবে না। বাড়ি গিয়ে কেঁদে কেটে বাবা কাকাদের ডেকে আনবে না। মুখ বুজে মার খাবে।

কোন কোন টিম যেমনি ওপেনিং জুড়ি আউট হলেই দান ছেড়ে দেয়। ব্যাট বগলে প্যাভিলিয়ন থেকে এক এক করে আসে আর ফিরে যায়। তেমনই এরা মারামারি শুরু হলেই অপেক্ষা করে কখন মার খেয়ে মাটিতে পড়ে যাবে।

কিন্তু ভগবান আছেন। উনি কি একদিন এইসব অন্যায়ের বিচার করবেন না? নজরুল কিছু বলেন নি? ‘সঞ্চিতা’ ‘সঞ্চয়িতা’র কবিতার বৈচিত্র্যের ঢেউয়ে কয়েক বছর চাপা পড়ে গেল।

কিন্তু কয়েক বছর পরে ক্লাসের পাঠ্য বইয়ের সংকলনে পেলাম মনের মত উত্তর—“ফরিয়াদ”। শব্দটা আগে কখনও শুনিনি। উকিল দাদু বললেন—আসামী ও ফরিয়াদী। এখানে ফরিয়াদ মানে নালিশ। কার কাছে? ভগবানের কাছে।

বুকের পাটা আছে নজরুলের। সোজা ভগবানের কাছে নালিশ! কোন “ও অনাথের নাথ, ও অগতির গতি” বলে কান্নাকাটি, ভালভাবে বললে করুণ আর্তি, করা নয়। সোজা নালিশ।

“মাগে প্রতিকার, উত্তর দাও, আদিপিতা ভগবান”।

দারুণ লাগল। এই হোল কবিতা। হ্যাঁ, আগে রবি ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতা পড়েছি। সেটা অসাধারণ। কিন্তু উনি ভগবানকে প্রশ্ন করেছেন –তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো”?

কিন্তু নজরুল করেছেন নালিশ।

সে নালিশের বিশাল ফিরিস্তি, পাতার পর পাতা জুড়ে। ভগবানের রাজ্যে কত অবিচার, কত অন্যায়। তো ভগবান করেন কি! নিজের ডিউটি ঠিকমত করেন না?

পড়তে লাগলামঃ

“শ্বেত-পীত-কালো করিয়া সৃজিলে মানবে সে তব সাধ,

আমরা যে কালো তুমি ভালো জান নহে তাহা অপরাধ”।

আরে! এটাও আমার কথা। হরদম কালো বলে ব্যঙ্গবিদ্রূপ শুনি, --কালোভূত! কেলটে। জন্মেছি কালো হয়ে যদিও মা ফরসা—কিন্তু সেটা কি আমার দোষ! কিন্তু নজরুল কী করে টের পেলেন আমার কষ্ট? উনিও কি কালো?

কিন্তু শেষের দিকে এসে থমকে যাই। খানিক ভাবি, তারপর উল্লাসে ফেটে পড়ি।
“ওই দিকে দিকে বেজেছে ডংকা, শংকা নাহিক আর,

মরিয়ার মুখে মরণের বাণী উঠিতেছে মার! মার!”

নজরুল খোলাখুলি মারতে বলেছেন। উদোম ক্যালাতে বলছেন, কাদের? ওই যারা এতদিন ধরে তোমাদের মারছে তাদের। শুনতে বেশ ভাল লাগে। মারের পালটা মার!

তারপর ঘাবড়ে যাই। না, আমি কাউকে মারতে পারব না। তাহলে কী করব? পালিয়ে যাব, টেনে দৌড়? ওসব কিছু নয়। দলবেঁধে মার মার করে পকেটমারকে ক্যালাও? না, ওর মধ্যে আমি নেই। ভগবান ফরিয়াদ শুনছেন। একদিন তাঁর ন্যায়ের দণ্ড নেমে আসবে। সব ধর্মই এই আশ্বাস দেয়। আপাত আশ্বস্ত হওয়া যাক।

আচ্ছা, নজরুল নিজে কখনও কাউকে মেরেছেন? মারামারি করেছেন?

মনে পড়ল দেশ পত্রিকায় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ধারাবাহিক লিখতেন “কেউ ভোলে না কেউ ভোলে”।

বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের ছেলেবেলার স্মৃতি, বিশেষ করে বাল্যবন্ধু কোন এক দুখু মিঞার কথা।

--ছোটকা উনি কে?

-- উনি কল্লোল যুগের তিন মহারথী। কল্লোল পত্রিকার থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের অন্যতম—শৈলজানন্দ, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও অচিন্ত্যকুমার।

--মানে ঘনাদা ও পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ?

--দূর গাধা! তোর কথাটা ভুল নয়, আদ্দেক সত্যি।

--আর দুখু মিঞা?

--আরে উনিই তো বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম।

--বিদ্রোহী কবি কেন?

--উনি একটা কান্ড করেছিলেন। সারারাত জেগে লিখলেন একটা অন্যরকম কবিতা –বিদ্রোহী। তারপর সাত সকালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সামনে গিয়ে রাস্তা থেকে পাড়াজাগানো চিৎকার।

রবি ঠাকুর অবাক হয়ে দোতলার বারান্দা থেকে জিজ্ঞেস করলেন—কী ব্যাপার কাজী?

“গুরুদেব! আমি তোমায় হত্যা করব”!

সে কী! উনি পুলিশ ডাকেন নি?

--আরে বোকারাম! এ হত্যা সে হত্যা নয়। উনি চেয়েছিলেন বাংলা কবিতার ধারা বদলে দিতে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সেই কাজটা করেছিল। ছন্দে, মাত্রা বদলে, শব্দ চয়নে ও পুরাণকথার রূপক মিলে সে এক কাণ্ড। বাংলা কবিতায় বাঁধা পথের বাইরে পা ফেলা। প্রথম লাইনেই চমকঃ

“বল বীর

চির উন্নত মম শির।

শির নেহারি আমারি নতশির ওই

শিখর হিমাদ্রীর”।

আরও শোনঃ

আমি পিণাকপাণির ডমরুত্রিশূল ধর্মরাজের দণ্ড

আমি চক্র, মহাশংখ, প্রলয়নাদ প্রচণ্ড।

আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,

আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ।

আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,

আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুংকার”।

ছোটকার আবৃত্তি চলতে থাকে। আমি ভেসে যাই অনুপ্রাসের ঝংকার আর নতুন ধরণের শব্দের ছবির সারি দেখতে দেখতে। সাইক্লোন, ধ্বংস, পেরিয়ে সমস্ত নিয়মের শৃংখল ভেঙে টর্পেডো ভাসমান মাইন সব হয়ে বিদ্রোহী হঠাৎ মহর্ষি ভৃগু হয়ে ভগবান বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিচ্ছেন। কিন্তু আচমকা একি?

“আমি চিত-চুম্বন-চোর কম্পন

আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!

আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর”!

এবার কেমন কেমন লাগছে। উনি কোন কুমারী মেয়েকে স্পর্শ করেছেন! মরেছে! আর গ্রামের মেয়ের কাঁচলি নিয়ে চিন্তা করা, কল্পনা করা! এই কবি নির্ঘাৎ--

ছোটকাকে কবিতার নেশায় পেয়েছে। আবৃত্তি চলছেঃ

--“একি উন্মাদ ! আমি উন্মাদ! আমি সহসা আমারে চিনেছি আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ”।

বুঝেছি, এমন অকপট সত্যি বলতে উনিই পারেন। কিন্তু দুর্বলের পক্ষ নিয়ে কথা বলা সেই কবি কোথায় গেলেন? না, না। এই তো উনি পরশুরামের কুঠার হতে চাইছেন। কেন রে বাবা!

“যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না-

অত্যাচারীর খড়গকৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না,

বিদ্রোহী রণক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত”।

ভাল লাগে। একটা অন্যরকম অনুভূতি। যেমন শরতের ভোরে মহালয়ার পাঠে মহিষাসুর বধের পর বুকের ভেতরে হয়।

‘আমি সেইদিন হব শান্ত’।

বাঃ, কিন্তু উনিই কি শৈলজানন্দের বাল্যবন্ধু দুখু মিঞা। অবাক লাগে। আরে ছোটবেলায় কিছু না কিছু টের পাওয়া যায়। যেমন সাভারকর ছোটবেলায় তাঁর জন্মভূমি ভাগুর গাঁয়ে বাচ্চাদের দলবল জুটিয়ে রাতের অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে একটা পুরনো মসজিদের কাঁচ ভেঙে ছিলেন।

কিন্তু দুখু মিঞার বিদ্রোহ কোথায়? বরং বেশ কোমল কবি কবি ভাব। একটা চড়াই পাখির ছানা ওড়ার চেষ্টা করে পড়ে যাওয়ায় মা-চড়াইয়ের কষ্ট নিয়ে কবিতা লিখলেন। ওদিকে রবি ঠাকুরকে ছোটবেলায় দেখুন।

“আমসত্ত্ব দুধে ফেলি তাহাতে কদলী দলি

সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে।

হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ

পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে”।

বেশ, বামুন বাড়ির ফলার খাওয়া পেটুক ছেলের ছবি।


ভুল ভেঙে গেল। দুখু মিঞা কোন ব্যতিক্রম নন। ছোটবেলা থেকেই রোমান্টিক। বন্ধু শৈলজানন্দের সংগে পাল্লা দিয়ে লিখে ফেললেন কোন রাণীমার গড় নিয়ে আবেগঘন কবিতাঃ



“ওই ঝাউয়ের পাহাড়ে নীরব চিতাটি রাণীমার,

ও যে দপদপ জ্বলে লোকে বলে আলো আঁধিয়ার।

এই নিভে যায়, ওই জ্বলে ওঠে

থমকি চমকি পছি দিকে ছোটে

মিশে যায় শেষে রাজগড়ে উঠে

আবার তেমনই আঁধিয়ার।

বাচ্চা দুখু মিঞার শব্দচয়নে রবি ঠাকুরের প্রভাব স্পষ্ট। আহা, তাতে কী? বড় কবি অচিন্ত্য কুমারের রচনায় নেই? করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায়? কিন্তু আবেগ ও ছন্দের হাত? ওটা সবার হয় না, যার হয় তার হয়।

যেমন গলায় সুর ও কানে তালের বোধ--সবার থাকে না, যার আছে তার আছে।

দুখু মিঞা বড় হয়ে যখন নজরুল হলেন, তাঁর ছন্দ, অন্ত্যমিল এবং অনুপ্রাস অলংকার নিয়ে মারকাটারি নৈপুণ্যে ঘায়েল হয়ে কবিশেখর কালিদাস রায় লিখলেন –“নজরুল আমাদের কবিতা লিখতে দেবে না দেখছি। ও ‘অলস বৈশাখে’র সংগে ‘কলস কই কাঁখে’ মিলিয়েছে”।

বটেই তো।

“জল আনতে চললি যে তুই অলস বৈশাখে,

-----কলস কই কাঁখে”।

কিন্তু দুখু মিঞা যে মহা আড্ডাবাজ, ইয়ার্কিদেনেওয়ালা। এক বন্ধুর পাঠশালা পেরোনো হয় নি, কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা সফল ব্যবসায়ী। কনেবৌ বাপের বাড়ি থেকে স্বামীকে চিঠি লিখেছে।

ভাষাটা এইরকমঃ

“তুমি ভাল আছ। আমি কেমন আছি। ইতি-“।

সেই চিঠি পড়ে বন্ধুটি প্রেমে উলুত পুলুত। চিঠির জবাব লিখলেন শৈলজানন্দ। গোলাপি রঙের দামি কাগজের উপর বাঁদিকে ছোট করে ঠোঁটে চিঠি বয়ে নিয়ে যাওয়া পাখির মনোগ্রাম ছাপা।

দুখু মিঞা খুব হাসল। দেখল পাখির ছবির নীচে ছাপা রয়েছেঃ

“যাও পাখি, বোল তারে

সে যেন ভোলে না মোরে”।

বলল—“আর বোল এ চিঠিটি

লিখে দেছে শৈল।

বোল না বোল না যেন,

এ দিব্যি রইল”।

তো দুখু যে নজরুল হয়ে ঢাকায় আশু সোমের বাড়িতে কিশোরী রাণু সোমের (প্রতিভা বসু) পরিবেশন করা চা দেখে গেয়ে উঠবে “এত চা ওইটুকু কাপে, পাষাণী আনলে বল কে”—সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুখু যে নজরুল হয়ে গেছে। তাই দু’লাইনের চটজলদি ছড়ার রূপান্তর ঘটল চমৎকার এক গানে—“ এত জল ওই কালো চোখে, পাষাণী আনলে বল কে”।

আর ফক্কুড়ি? হো হো করে হাসির সংগে “দে গরুর গা ধুইয়ে”!

কিন্তু দুখু বিদ্রোহী নজরুল হলেন কী করে? বা ঠিক করে বললে কবে? সেই যে পেটের দায়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ফৌজে যোগ দিয়ে আফগানিস্তান ঘুরে এলেন, তখন উনি হাবিলদার দুখু মিঞা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে। অটোমানের সুলতানের বা খলিফার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শাসন তথা ধার্মিক নিদানের অধিকার টলটলায়মান। কারণ, ব্রিটিশ সরকারের হুকুম এবং তুরস্কে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আধুনিকতার জয়গান। উনি আইন করে খলিফাগিরি বন্ধ করে দিলেন।

কিন্তু সহজে কেউ ক্ষমতা ছাড়ে? তার আগে ভারতে মুসলমানদের মধ্যে শুরু হোল খিলাফত আন্দোলন, যার উদ্দেশ্য অটোমান সুলতানের খলিফাগিরি বহাল রাখা।

গান্ধীজি ভাবলেন—ইংরেজের বিরুদ্ধে হিন্দুদের সংগে মুসলিমদের একসাথে আনার সুবর্ণ সুযোগ। উনি খিলাফতের সমর্থন করলেন। কিন্তু ভারতীয় মুসলিম, কাজী পরিবারের নজরুল ইসলাম, উলটোপথে হাঁটলেন।

সংস্কারের সমর্থনে লিখে ফেললেন—“কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই”!

তাহলে কি উনি মুসলিম নন? কে বলল নন? তাহলে “মোহম্মদী” পত্রিকায় কেন প্রবন্ধ লিখতেন? কী করে লিখলেন ঈদের গান, আর এই গানটাঃ

“সাহারাতে ফুটল যে ফুল,

সেই ফুলেরই জ্বালা।

কেউ বলে হজরত মোহম্মদ

কেউ বা কমলিওয়ালা”।

আর কী প্রমাণ চাই?

বেশ, কিন্তু এদিকে মালকোষে এইরকম গান লিখেছেন যে!

“গরজে গম্ভীর গগনে কম্বু

নাচে শংকর নাচে স্বয়ম্ভু”।

আবার “মহাকালের কোলে এসে গৌরী হল মহাকালী”।

থামো, থামো; আরও আছে।

কতগুলো আগমনী গান আর দেবী দুর্গাকে নিয়ে বন্দনা গান বল দিকি?

গুনতে শুরু করঃ

“এলো রে শ্রীদুর্গা শ্রী আদ্যাশক্তি”, “জয় দুর্গা দুর্গতিনাশিনী”, “আয় মা উমা রাখো এবার”---

ব্যস্‌ ব্যস, এতেই হবে। তাহলে নজরুল কী? হিন্দু না মুসলমান? প্রতিমা পূজা বা ‘বুত-পরস্তি’ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়?

নজরুল নিজেই উত্তর দিয়ে গেছেনঃ

“হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?

কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার”।

তবু লোকের জিভ নড়ে, আজও নড়ে।

তাই লিখতে হয়ঃ

“সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন ‘আড়ি চাচা’!

যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা”।



খেয়াল করি, নজরুলের কবিতা ও গানে দুর্গা আনন্দময়ী দেশমাতৃকা হয়ে যান। যুদ্ধ থেকে ফিরে ইংরেজ তাড়ানোর ইচ্ছে ওর মনে প্রবল। ওঁর আগুন ঝরানো সম্পাদকীয়ের চোটে একের পর এক পত্রিকা নিষিদ্ধ হচ্ছে। আর নামগুলো কী—লাঙল, ধূমকেতু, নবযুগ আরও অনেক।

মিনার্ভা থিয়েটারে মহাষষ্ঠীর দিন অভিনীত “দেবী দুর্গা” নাটকের জন্যে গান লিখলেন নজরুল। মন্মথ রায়ের “কারাগার” নাটকের জন্যেও। “আগমনী” কবিতায় উনি দুর্গার বন্দনা করলেন ‘রণরঙ্গিনী’ রূপে। “দশদিকে তাঁর দশ হাতে বাজে

বাজে দশ প্রহরণ”।

দুর্গাকে ‘বেটি’ বলে আদর করে ডেকে আহ্বান করছেন লড়াইয়ের ময়দানে নামতে-- ‘ঢাল-তরবার’ নিয়ে ধ্বংস করতে ‘অত্যাচারী শক্ত চাঁড়াল’—স্পষ্টতই ইংরেজদের। এরপর কারাগারে যেতেই হয়।

তাতে কি! গেয়ে উঠলেনঃ

“কারারই লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট”।

আর একটি লাইনে ধরা পড়ল শুধু বঙ্গ বা ভারত নয় , গোটা বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা—“ আমরা ধরি মৃত্যুরাজার যজ্ঞ ঘোড়ার রাশ”।

উনি কোন একটি দলের সমর্থনে বদ্ধ ছিলেন না। দেশ স্বাধীন করতে হবে—যিনিই করুন, নেতাজি বা গান্ধীজি—সবাই তাঁর শ্রদ্ধেয়।

“আনকোরা যত নন-ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন খুশি,

‘ভায়োলেন্সের ভায়োলিন’ নাকি আমি বিপ্লবী -মন-তুষি।

‘এটা অহিংস’ বিপ্লবী ভাবে

নয় চরকার গান কেন গাবে?

গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতিরাম ভাবে কন্‌ফুসি”।

কিন্তু হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি কখনই আমাদের বঙ্গে স্থায়ী হয় নি। আপাত শান্তির তলায় বিদ্বেষের তুষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে , আজও নেভেনি। তাতে ধুনো দেয়ার লোকের অভাব কোন কালেই ছিল না।

দাঙ্গার আগুনে মানবিক বোধ পুড়তে দেখে ব্যথিত নজরুল লেখেন—“খালেদ আবার ধরিয়াছে অসি, অর্জুন ছোঁড়ে বাণ”। জাতের নামে বজ্জাতি সব তাঁর কাছে গোপন ছিল না।

তবে মুজফফর আহমেদের সংগে ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে থাকা ও বন্ধুত্ব তাঁকে আগ্রহী করে সাম্যবাদী আন্দোলনে। (এখন সেই বাড়ির সামনে একগাদা দোকানপাট, পেছনে সরকার পরিবারের পুরনো বাড়ি)।

‘গাহি সাম্যের গান” শুধু একটি বিচ্ছিন্ন কবিতা নয়, শুধু কুলি-মজুরের কথা নয়—তিনি চেয়েছিলেন সার্বিক সাম্য। বিশেষ করে পুরুষ ও নারীর সাম্য। বলেছেন সৃষ্টির যা কিছু তার অর্ধেক নারীর সৃষ্টি। নজরুল বললে কী হবে? আমরা সংসদে নারীর জন্যে অর্ধেক আসন বরাদ্দ করার কথা এখনও ভাবতে পারিনি। এক-তৃতীয়াংশ দেব কিনা, কবে দেব—সেই নিয়ে কামড়াকামড়ি চলছে।

“মিথ্যে শুনিনি ভাই,

এই হৃদয়ের থেকে বড় কোন মন্দির-কাবা নাই”।

তারপরেও নজরুল কতখানি হিন্দু বা কতখানি মুসলিম—আদৌ কোনটা কিনা, সে নিয়ে আজও তরজা চলে। আজ জীবিত থাকলে লাভ-জিহাদের অপবাদ শুনতে হত হিন্দু মেয়ে বিয়ে করার অপরাধে।

এক ফাঁকে টুক করে বলে দিই—বিশ্বে সাম্যবাদী আন্দোলনের বিখ্যাত গান, পারি কমিউনের শ্রমিকের লেখা দ্য ইন্টারন্যাশনালের লিরিক রাশিয়া থেকে গোপনে ভারতে এনেছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা অনুবাদ নজরুলের-‘অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত’ নামে। একজন সত্যিকারের কবির কলমে ধরা পড়েছে গানটির আত্মা।

“যত অত্যাচারের শিরে বজ্র হানি, হাঁকে লাঞ্ছিত-জনমন-মথিত বাণীঃ

নব জনম লভি অভিনব ধরণী ওরে ওই আগত”।

কিন্তু এতসব বিদ্রোহ-বিপ্লবের ভীড়ে হারিয়ে যায় নি দুখু মিঞা নামের নটখট ছেলেটা। ছোটদের জন্যে লিখেছে একগাদা কবিতা!

দেখুন, বর্ণপরিচয়ে কোন রস নেই। খালি এটা করিও না। ওটা করিও না। খালি পড়তে বস, নো খেলাধূলো, নো হৈ -হুল্লোড়।

রবি ঠাকুরের সহজ পাঠ? শিশু? শিশু ভোলানাথ? দারুণ সব কবিতা। আমাদের অন্য জগতে নিয়ে যায়। কিন্তু “ আমি আজ কানাই মাস্টার” বা “খুকি তোমার কিচ্ছু বোঝে না মা” গোছের তিন চারটে ব্যতিক্রম বাদ দিলে সবগুলো আসলে বড়দের জন্য। বাচ্চার বাবা-মায়ের জন্য।

সবচেয়ে ভাল মদনমোহন তর্কালংকারের “রাত পোহালো ফর্সা হোলো, ফুটলো কত ফুল”। কিন্তু যাকে বলে মজা বা Fun, তার দেখা পাওয়া গেল নজরুলের লিচুচোর, খাঁদুদাদু, কাঠবেড়ালিতে।

“ওমা তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং” দুখু মিঞা ছাড়া কে লিখতে পারতেন?

রবি ঠাকুরের প্রেমের গান ধূপের ধোঁয়ার মত, পূজা ও প্রেম মিশে যায়। নজরুল অনেক মাটির কাছাকাছি, অগুরু নয় দেহের গন্ধ পাই তাঁর প্রেমের গানে। পসন্দ আপনি আপনি!

তবে মিনমিনে গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত যদি বা বান্ধবীকে শোনাতে পারেন, নজরুলের গান গাইতে একটু গলার চর্চা দরকার।

এটা আমার মত হরিদাস পালের ব্যক্তিগত মত; রে রে করে উঠবেন না প্লীজ!


রবি ঠাকুর লিখলেন—“আজি হতে শতবর্ষ পরে,

                                        কে তুমি পড়িছ আজি আমার কবিতাখানি

                                            কৌতুহল ভরে”?

নজরুল অন্য ধাতুর। কোন কালজয়ী কবি হবার অমর হবার লোভ নেই।

“পরোয়া করিনা বাঁচি বা না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,

মাথার উপর জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।

প্রার্থনা কর যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,

যেন লেখা হয় মোর রক্তলেখায় তাদের সর্বনাশ”।।


উনি বললে কী হবে? একশ সাতাশ বছর হয়ে গেল। তবু নজরুলের গান কবিতা কিছুই আমরা ভুলি নি। কারণ, অনেক কিছু এখনও সেইরকম রয়ে গেছে। যেমনটি ছিল নজরুল বেঁচে থাকতে।
0

প্রবন্ধ - অম্লান রায় চৌধুরী

Posted in







যে জাতির তরুণ তরুণীর মেজরিটি অংশ পলিটিকাল ভিউতে লেখে—

"I hate politics" / "No interest" /"Firmly apolitical" /"Politics is dirty"

এসব শুনে মনে হয় বলি, হতভাগারা পলিটিক্সটাও বোঝে না। আরে পৃথিবীর সব চাইতে সহজ হলো রাজনীতি। সমাজ মানেই রাজনীতি।

তবে রাজনীতির প্রতি উদাসীনতার কথা ইদানীং খুব শোনা যায়। এর একাধিক চলিত কারণও আছে, যেমন, নেতারা সৎ নয়, গণপ্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্রমাগত ব্যর্থতা। জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গিকারসমূহ বারবার ভঙ্গ করা। ইত্যাদি নানান রকমের। এগুলোকে বড়ই ক্লীশে লাগে আজকাল ।

কারণ যে সমাজে বড় হওয়া, সেখানে খুব ছোট বেলা থেকেই দেখে আসা নানা প্রকারের অসাম্য, ক্ষমতার কেন্দ্রীভুত অবস্থা - পয়সা বেশী যার, তার হাতেই ক্ষমতার চাবিকাঠি ।

হ্যাঁ মেধা বা স্কীল জায়গা পায় ঠিকই – তবে প্রাধান্য সেভাবে আসে কী? এসব সকলেরই দেখা। এই অসম দিকগুলো সারা জীবন মেনে নেওয়াটা কষ্টকর, মানলে নিজেকে কেমন যেন হীন বলে মনে হয়- ব্যাক্তিত্ত্বহীন বলে মনে হয়- ক্ষমতা, দীক্ষা, শিক্ষাকে কেমন যেন অকেজো বলে মনে হয় ।

এই প্রশ্ন জাগাটাকেই বলে সমাজ সচেতনতা । যেটা সমাজবদ্ধ মানুষ মাত্রেরই থাকে । আমরা সমাজবদ্ধ, তবে এই প্রশ্ন মনে আসবেনা কেন । এর কথা ভাবা, একে নিয়ে না চলার বার্তা দেওয়া, অন্যকে বলা, সমাধান চাওয়া – সবটাই এক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া – অর্থাত রাজনীতি এই নিয়েই চলে – আলাদা কিছু নয় ।

বাবা মার মতানৈক্য, বাবা জ্যঠার মতানৈক্য, সুষ্ঠু সমাধান আলোচনার মাধ্যমে – সবাইকে সন্তুষ্ট করে, কাউকে ডিপ্রাইভ না করে – এটাই তো রাজনীতি । এটা তো চলছে আমাদের জীবনে । আমরা রাজনীতির বাইরে কোথায় । এর থেকেই উঠবে অসন্তুষ্টি, হবে প্রতিবাদ, আবার হবে আলোচনা- মীমাংসা – বলতেই পারি এ এক রাজনৈতিক প্রসেস।

এগুলো আমাদের দৈনন্দিন ঘটনা । আমরা প্রতিদিন এরকম কত সমস্যা সমাধান করি । কখনও আলোচনার মাধ্যমে, কখনও দাবিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে, সবই রাজনৈতিক প্রসেস।

এটা বুঝতে হবে, উদাসীনতা মনে করার জায়গাই নেই – কেননা আমার সমাজ আমাকে জড়িয়ে নিয়েছে রাজনীতির নানান রসে। আমি বুঝি বা না বুঝি প্রতিনিয়তই আমি রাজনীতির বেড়াজালে জড়িয়ে চলেছি । এখানে বোঝা দরকার যে শুধু ঝান্ডা নিয়ে মিছিল মানেই রাজনীতি নয় বা রাজনীতির প্রতি আগ্রহ দেখান নয়, এর নানান অঙ্গ আছে – সমাজ সেটা বাতলে দেয় প্রতিনিয়ত। উপায় নেই এড়িয়ে যাবার – আসামাজিক মানুষ ছাড়া ।

নিয়ম মাফিক ঠেকে এসেই ভুতো দা’রও ঐ এক বিশাল আওয়াজ রাজনীতির কলকব্জা নিয়ে – অসীমকে চা দিতে বলেই শুরু করল রোজকার কীর্তন । তবে আজকে যেন বেশ প্রাণোচ্ছল , কথা বলতে ভাবতে হচ্ছেনা – রাজনীতির কথা যেন অবলীলায় বেড়িয়ে আসছে।

এসব দেখে , সন্তু বল্ল, আরে ভুতো দা , তুমি হঠাত রাজনীতির ব্যাপারটা নিয়ে পড়লে কেন ? তুমি তো সেই কবে থেকেই এই নাগপাশ থেকে মুক্ত ।

ভুতো দা বলে উঠল , আরে মুক্ত কীরে , আমি তো আরও জড়িয়ে ফেলেছি নিজেকে । বুঝিনি এভাবেও থাকা যায় । ভেবেছিলাম জীবনে কিছু লেখা পড়া করেছি , নিজের ক্ষমতায় চাকরী করেছি , সারা বিশ্বে ঘুরেছি নিজের নিজের এলেমে । এখন যে কাজগুলো করি সেখানেও নিজেরই ক্ষমতার প্রদর্শন ।

নির্ভরশীলতা কোথাও নেই , রাজনীতির বেড়াজালে আটকাবো কেন ।

হলো না রে , কিছুতেই পারলামনা। নিজের বিবেকটা বেশ বাঁধা পড়ে গেলো ।

বুঝলাম সদিচ্ছার পাল্লাটা বেশ ভারী হয়ে উঠেছে জীবনে। তারই ফলশ্রুতি এখনও তাদের কথাই মনে পড়ে , তাদের কথাই লিখি , তাদের সমস্যার সমাধানই খুঁজি , যারা বঞ্চিত ছিলো , এবং সত্যি বলতে কী এখনও আছে ।

খোকন বলে উঠল, আচ্ছা ভুতো দা তুমি তো মার্কা মারা রাজনীতিবিদ নয় - ঐ যেমন নটবর দা, স্বপন দা, যাদের পরিচিতিই রাজনীতির জলসাঘরে, তাদের চলন বলন কোনো কিছুর মধ্যেই তাদের নিজস্বতা খুঁজে পাওয়া যায়না, রাজনীতির রঙ্গীন আলোতে ঝলমল করছে । এই তফাতটা কেন ।

ভুতোদা, আর একটা চায়ের অর্ডার দিয়ে বলল, দেখ, রাজনৈতিক স্থানাঙ্ক,সামাজিক স্থানাঙ্ক আর ধর্মীয় স্থানাঙ্ক ছাড়া নিজের উপস্থিতির সঠিক বিচার কী হয় আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থায় ।

ভুতো দা বুঝল স্থানাঙ্কটা বোধ হয় একটু কঠিন হয়ে গেল, তাই সহজ করে বলল, এই ধর, যদি বলি নিজের স্থানের উপর জোড়, দুপা দিয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বা ইচ্ছা, এই সবই হলো গিয়ে নিজস্বতা, এগুলো হলেই নিজেকে অন্য কারুর কাজে লাগান যায় । না হলেই বিপদ, সব কিছুকেই মানতে হবে বলে মনে হবে, সব নীতিই আদর্শ নীতি মনে হবে, কারণ নিজের কাছে নিজের কিছু দেখে শেখার বা জেনে শেখার অবসর হয়নি – ফলে ভালো মন্দর তফাতটাই উঠে আসেনি ।

কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ওগুলো যে খাটেনা, তাই তো ভাবনা, কেন এ ভাবে জড়িয়ে পড়লাম ।

যত দোষ আমার শিক্ষার, তার থেকেও বেশী আমার দীক্ষার–সাথে অবশ্যই আমার বেড়ে ওঠার অঙ্গনটা – যেটা আমাকে এই অবস্থায় আনতে খুব সাহায্য করেছে । এরপরে আমার আচরণে যদি কিছু গলদ দেখিস, বুঝবি নিজের ইচ্ছাতেই, অথবা, কাউকে বোঝাতে, কিংবা বড় কিছু ভালোর উদ্যোগে । সবশেষে অবশ্যই থাকবে নিজের ফায়দার জন্য করা।

এটাই হলো গিয়ে তফাত । কিছু বোঝা গেলো কী । নাকি আরও ভেঙ্গে বলবো ।

জানিস, আমি পারতাম নিজেকে নিউট্রাল প্রমাণ করতে – যা এখন একটা স্টাইলে পরিণত হয়েছে । প্রায়ই বলতে শোনা যায়, আমি কোনও দলীয় রাজনীতি করিনা, তবে আমি চাই দেশের মানুষের ভালো হোক ।

এই ধরণের পলিটিকাল কারেক্টনেস ধরে রাখা, অন্যায়কে অন্যায় না বলতে পারা, নিজের অধিকার ভূলুন্ঠিত হবার সময়ে চুপ থাকা, ব্যাংকগুলা লুটপাট করে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবার সময়ে না দেখার ভান করা, ধর্মের নামে বিভেদকে প্রকারান্তরে সমর্থন করা – সবই ঐ নিউট্রালেরই নমুনা।

আসলে প্রতিটা নিউট্রাল ব্যাক্তিই এক একটি দলের প্রতিভূ, পরোক্ষ ভাবে ।

কিছু করা যেমন প্রত্যক্ষ সাপোর্ট, তেমনিই কিছু না করাও। যেখানে কিছু করার প্রয়োজনীয়তা আছে, এক ধরণের পরোক্ষ সাপোর্ট – শাসকের কাছে থাকা । বিপ্লবের আঙ্গিনায় এদেরকেই প্রতিবিপ্লবী বলা হয় ।

এর সাথে সাথে এটাও বলা যায় যে প্রিভিলেজড ছাড়া আর কেউ নিউট্রাল হতে পারেনা ।

জানি প্রশ্ন করবি, কেমন ভাবে একটু দেখাই তোদের। ঐ সেই অমল বাবুর কথা দিয়েই শুরু করি । সেই লোকটা সারা জীবন একই অফিসে কাটিয়ে গেলো । বদলীর চাকরী কিন্তু বদলী হলোনা । ফলে মৌরসীপাট্টা, প্রচুর উপরি আয়ের ব্যবস্থা – সব বেশ পাকাপাকি বন্দোব্যস্ত । দায়িত্ব তার বাড়ল ঠিকই, অফিসের রাজনীতিটাকে সামলানোর দায়িত্ব আর নেতা মন্ত্রীদের নিজেদের পাওয়া সুযোগ সুবিধার বেশ কিছু অংশ ভাগ বটোয়ারাকে নিশ্চিত করা । মোটামুটি একটা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে ।

লোকের কাছে, পাড়ায়, আত্মীয় স্বজনের কাছে সে একটি নিউট্রাল ছেলে, যার কোনও রাজনৈতিক পরিচিতি নেই, সবাই মানল, কারণ সে মিছিলে যায়না, সভা সমিতিতে উপস্থিত থাকতে হয়না, নিদেন পক্ষে পাড়ার কোনো সামাজিক সমস্যাকেও এড়িয়ে চলে – ভেড়েনা – এই যে প্রিভিলেজড মানুষটি, এরাই তো নিউট্রালের আসল ভাগীদার ।

এটা জানা । দেখা – ঘুরে বেড়াচ্ছে পাড়ায় পাড়ায় ।

খোকন বুঝে বলল, ভুতোদা তুমি একটা ব্যাপার বাদ দিয়ে গেছো ।

কোন ব্যাপার টা – ভুতো দা বলল,

আরে সেই ব্যাপার গুলো যে গুলো পাড়ার বেকার ছেলেগুলোকে আয়ের ব্যবস্থা করে দেয়, বিনিময়ে যা নয় তাই করিয়ে নেয় । শাসক সমর্থক বলে, ঝান্ডা তোলে, মিছিলে লোক জড়ো করে --একটা আলাদা শ্রেণী ।

বেশ কিছু মানুষ ঐ সিভিক ভলান্টিয়ারদের মতন দিন গুজরান করে এই ভাবেই ।

একটা বিষয়ে অবশ্য এখানে নিশ্চিন্ততা আছে সেটা হলো, প্রতিবাদহীন এক ব্যবস্থা, যেখানে কিছু মানুষের কাছ থেকে প্রতিবাদ উঠে আসেনা, নিশ্চিন্ত, প্রতিরোধহীন এক ব্যবস্থা, যেটা সব শাসকদেরই কাম্য ।

ভুতো দা এবারে ঘুরে বসলো, অসীমকে বলল একটা ডিমের অমলেট দেতো, সাথে চাও দিস ।

বেশ গুছিয়ে বসল । অনেক্ষুণ থাকার একটা ব্যবস্থা হলো বলে মনে হচ্ছে ।

শুরু করল, খোকন শোন তোর বলার প্রতিটা শব্দের সাথে আমি সহমত । কিন্তু আমার প্রশ্নটা হচ্ছে যে এই যে শাসকদের আচরণ, যেটা কে আমরা প্রায় চিনেই ফেলেছি কিন্তু পাশ কাটিয়ে বেড়িয়ে যেতে পারছিনা বা প্রলোভন এড়াতে পারছিনা কেন?

কারণগুলো বেশ সহজ । আসলে আমাদের দেশে চাহিদা প্রচুর, কিন্তু যোগানের অভাব প্রায় সব ক্ষেত্রেই । বাজারে চাহিদা বেশী, তাই দাম উর্ধমুখী । বাজারে চাকরীর চাহিদা বেশী, যোগানের অভাব, তাই এত দামী, দেখা পাওয়া দুস্কর।

এরকম একটা অবস্থাতে শাসকের কাছে মানুষকে আঁকরে রাখার মন্ত্রটা হতে হবে বেশ জনমোহিনী গোছের।

সেটা একমাত্র সম্ভব কিছু দলদাস তৈরি করা, অল্প অল্প করে টাকার যোগান দিয়ে একটা ক্যাডারকুল তৈরি করা-- যাদের কাছে সেই টাকাটাই বেশী কারণ এর বেশী পাওয়ার অউকাত তাদের নেই ।

এই ব্যবস্থাতেই আমরা অভ্যস্ত এখন । দেখছিও তাই ।

বর্তমানে দেশের মানুষের মধ্যে মধ্য মেধারই চলন বেশী । কাজেই তাদের যেটকু মেধা আছে সেগুলোকে সাময়িক ভাবে বন্ধ করার রাস্তাটাই শাসকের কাম্য। করছেও তাই ।

এছাড়া যে মানুষ গুলো কোনও সুবিধাও নেয়নি, আবার অবস্থাটাকে মানতেও পারছেনা, কিন্তু সরাসরি কিছু বলতেও পারছেনা, শারীরিক ভয় এবং অসম্মানের ভয় – দুটোই তাড়া করে বেড়াচ্ছে । তাদের কাছে জীবনটা বড়ই অসহায় অবস্থায় আছে। একটা বুদ্বুদের মধ্যে থাকা যেন— সমসময়ের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে চুপ করে, কোনও যোগদান না করে থাকা। এ ভাবে থাকতে থাকতে তাদের মননের স্পর্শকাতরতা, অনুভবের ক্ষমতা কমে যায়, তখন আর মনে কোনও প্রভাব পড়ে না পারিপার্শ্বিকের।

দক্ষিণ আফ্রিকার বৈষম্যমূলক সমাজ প্রসঙ্গে প্রথম এই গবেষণা করেন জোসেফ ওলফে। এই ভাবে ছোঁয়া বাঁচিয়ে থাকতে ভারী আরাম— বালিতে মুখ গুঁজে থাকা উটপাখির মতোই।

শাসকের উদ্দেশ্যই কেবল মন থেকে রাজনীতির বোধ মুছে দেওয়া-- বস্তুত, সে বোধ কখনও তৈরিই হতে না দিয়ে— শেখানো, দিতে থাকা ঘৃণার সহজ পাঠ।

বিদ্বেষের বর্ণপরিচয়। শাসক যখন অভিভাবক হিসাবে, শিক্ষক হিসাবে, গুরুজন হিসাবে ক্রমাগত শিখিয়ে যায় ভাল-মন্দ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট না করে আত্মকেন্দ্রিক হওয়ার মন্ত্র।

এখন বুঝি, উদাসীন বালি ঢাকবে না পদরেখা।

শাসকের কাছে দুটোই মন্ত্র, আবার আসিব ফিরে এই জলসায়, কী ভাবে সেটাই বিবেচ্য। যাদের দাপট প্রতিষ্ঠিত তারা পড়োয়া করেনা কোনও কিছুকেই, তাদের ঐ ক্যাডার তৈরি করারও তেমন ভাবে প্রয়োজন হয়না । আর যারা খুব বেশী নিশ্চিত নয়, তাদের কাছে উপরের সমস্ত পথগুলোই কাম্য।

কাজেই বিরোধীতার যে রুপ, যে আবহ দরকার, মানুষের রাজনৈতিক বোধ যে কতটা জরুরী, সেটার উপলব্ধ হয় যখন পাশের বাড়ির খোকন দা কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হয়, যে কি না স্কুলের গন্ডীও পার হয়নি । দেখতে হয় এ সমস্ত, সইতে হয় এসব । তখনও কী মুখ গুঁজে রাখব বালীতে ।

কাজেই এই ধ্বংসের দায়ভাগে আমরা সবাই সমান অংশীদার যদি না এখনও নিজেদেরকে একটু দেখি – সমাজ নিয়ে একটু না ভাবি ।

অন্য পন্থায় বলতে হয় ,রাজনীতিটা বোঝো , অ্যাদ্দিন গায়ে আঁচড়টি লাগেনি, সরকারি হাসপাতালে যেতে হয়নি বলে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে কবিতা লিখেছো ফুল- পাখি- লতা- পাতা নিয়ে, স্বার্থপর ।

তোমাকে গড অলমাইটি মেধা দিয়েছে মানুষের অধিকার নিয়ে দু’চার লাইন হলেও লিখতে। তুমি লিখেছ বলদা মার্কা উপন্যাস...

রাজনীতি টা ঠিকঠাক বুঝতে পারলে, হাসপাতালের আইসিইউ বেডও পেতে, অক্সিজেনও পেতে।

এখনো সময় আছে। পড়াশোনা করো। রাজনীতি বোঝ। অর্থনীতি বোঝ। পুরুত-ইমাম-জ্যোতিষ দিয়ে দেশ চলেনা । দেশ চলে রাজনৈতিক সিস্টেমে।

ভেন্টিলেটর বা অক্সিজেন , সব ব্যবস্থাও রাজনৈতিক সিস্টেমই করে। বাস্তবটা হলো ডাক্তার তোমাকে অক্সিজেন যোগাতে পারেনা। হাসপাতালে বেড দিতে পারেনা। কেবলমাত্র রাজনীতিই এটা ইচ্ছে করলে পারে বা ইচ্ছে করেই করে না!

বুঝতে শেখো তোমার জীবন রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত । রাজনীতিই ঠিক করে দেয় যে তুমি সরকারি হাসপাতালেই জীবনের নিশ্চয়তা পাবে , নাকি নিশ্চয়তার স্বপ্ন দেখানো বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে, পরিবারকে অসহায় করে দিয়ে চিরঘুমে যাবার পথ প্রশস্ত করবে। তাদেরকে প্রশ্ন করো, তোমার অক্সিজেন নেই কেন? হাসপাতালের বেড নেই কেন?

ফলে প্রশ্ন তোলার সাহস কর ।

না হলে রাজা তুমি ল্যাংটা বলতেও দ্বিধা করোনা ।
0

প্রবন্ধ - দিলীপ মজুমদার

Posted in







ভারত ভ্রমণে এসেছিলেন এক আমেরিকান যুবতী । নাম তাঁর মিস ক্যাথারিন মেয়ো । ভারত ভ্রমণ শেষ করে দেশে ফিরে তিনি লিখে ফেললেন এক বই : ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ । সে বই প্রকাশিত হল ১৯২৭ সালে । সে বই পড়ে ভারতবাসীরা ফেটে পড়ল ক্ষোভে । ইংরেজ শাসকরা লেখিকাকে মাথায় তুলে নাচতে লাগল। আর তাঁর বিবেচক দেশবাসীরা অবাক হয়ে গেল মিস মেয়োর কাণ্ড- কারখানায় ।

পেনসিলভেনিয়ার রিজওয়েতে জন্ম ক্যাথারিনের । জেমস হেনরি তাঁর বাবা আর মায়ের নাম হ্যারিয়েট এলিজাবেথ । স্নাতক হবার পরে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় অসওয়াল্ড গ্যারিসন ভিলার্ডের সঙ্গে । সে সময় দাসপ্রধা বিরোধী জন ব্রাউনের জীবনী লেখার কাজে নিযুক্ত ছিলেন ভিলার্ড । তাঁকে বই লেখার কাজে সাহায্য করেন ক্যাথারিন । বিভিন্ন সমাজসংস্কারবাদী গোষ্ঠীর ( মেফ্লাওয়ার সোসাইটি , ডটারস অব দ্য আমেরিকান রেভলিউশন ) সঙ্গে ক্যাথারিনের পরিচয় করিয়ে দেন ভিলার্ড । মেয়োর প্রথমদিকের লেখায় প্রকাশ পায় ক্যাথলিক বিরোধিতা , অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি । ফিলিপাইনের স্বাধীনতা ঘোষণার বিরোধিতা করেন তিনি । আইরিশ অভিবাসী ও আফ্রিকা-আমেরিকানদের প্রতি প্রকাশ পায় তাঁর বিরূপতা। নিগ্রোদের প্রতি তাঁর বিরূপতা ছিল তীব্র ।

ক্যাথারিন মেয়োর ‘মাদার ইণ্ডিয়া’র মূল কথা হল , ভারতবাসী নিজেদের শাসন করতে পারবে না ; ভারতে ইংরেজ শাসন তাই অপরিহার্য । কেন নিজের দেশ শাসন করতে পারবে না ভারতবাসী ? ক্যাথারিন মেয়োর মতে ভারতবাসী অকমর্ণ্য , অসহায় , উদ্যোগহীন । জন্মগতভাবে তারা দাসমনোবৃত্তিসম্পন্ন । ভারতের ধর্ম ও যৌনবিকৃতি দাসমনোবৃত্তির কারণ । ধর্ম তাদের নৈষ্কর্মের শিক্ষা দেয় , মানুষের প্রতি মানুষকে অমানবিক আচরণে অভ্যস্ত করে , মায়াবাদের শিক্ষা দেয় , জাতিভেদকে লালিত করে । মেয়োর মতে ভারতের যৌনজীবনও পূতিগন্ধময় । তার প্রমাণ বাল্যবিবাহের সমর্থনে , নারীত্বের অস্বীকৃতিতে, পুরুষের বহুবিবাহে , নারীর উপর অকথ্য নির্যাতনে ।

মেয়ো বলেছেন ভারতের ইতিহাসে কোনদিন ‘স্বর্ণযুগ’ ছিল না । দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী , মড়ক ছিল নিয়মিত , সামাজিক শৃঙ্খলা ছিল না কোথাও । এই দেশে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি আনে সভ্যতার প্রথম আলোক । কে বলল যে ইংরেজ ভারত শোষণ করেছে ? বরং ইংরেজরা এদেশে প্রগতির পথ উন্মুক্ত করেছে । ব্রিটিশ ভারত যুদ্ধ ও সংঘাত মুক্ত , চারিদিকে বিরাজিত শৃঙ্খলা , খাদ্যশস্যের উৎপাদন প্রচুর , শিশুহত্যা ও সতীদাহের বর্বরতা নিশ্চিহ্ন ।

বাংলা ও বাঙালির প্রতি মিস মেয়োর বিরূপতা গভীর । তিনি মনে করেন বাংলা হল নৈরাজ্যবাদের আঁতুড়ঘর ----‘ Bengal is the seat of bitterest political unrest , the producer of India’s main crop of anarchists, bomb throwers and assassins’ . যৌন বিকৃতিও এই রাজ্যে সবচেয়ে বেশি , পাশ্চাত্য জীবননীতি ও দর্শনের বদহজম হয়েছে বাঙালির –‘half digested dose of foreign doctrines’.

আমেরিকার অধিবাসী ক্যাথারিন মেয়ো ভারতে ব্রিটিশ শাসন কে সমর্থন করেছিলেন , কিন্তু ইংরেজ হয়েও জে টি সাণ্ডারল্যাণ্ড ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদকে বিদ্ধ করেছেন তীব্র সমালোচনায় । কোনরকম আবেগের দ্বারা তাড়িত হন নি , প্রলোভনে বশীভূত হন নি । নিরপেক্ষ গবেষকের মতো তিনি পক্ষ-বিপক্ষ সব মতামতকে বিচারের জন্য গ্রহণ করেছেন , সংগ্রহ করেছেন নানা তথ্য ও দলিল । আর সেগুলির সাহায্যে তিনি রচনা করেছেন ‘ইণ্ডিয়া ইন বণ্ডেজ : হার রাইট টু ফ্রিডাম’ । এই বইতে তাঁর আলোচ্য বিষয় হল :

১] গ্রিস ও রোমের মতো ভারত এক সুমাহান ঐতিহ্যের অধিকারী । ২] ইংরেজপূর্ব ভারতে শক-হূনদল এসেছে কিন্তু তারা সুপরিকল্পিতভাবে ভারতে লুণ্ঠন করে নি । ৩] ইংরেজশাসিত ভারতে অর্থনৈতিক বনিয়াদ বিধ্বস্ত হয়েছে , ইংরেজের স্বার্থে রক্তপাত ও যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছে । ৪] ভারতের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় পরাধীনতায় নিহিত । ৫] দেশ পরিচালনার ব্যাপারে ভারতবাসীর যোগ্যতার নানা প্রমাণ আছে ।

স্বাভাবিকভাবেই সাণ্ডারল্যাণ্ড মিস মেয়োর ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ তীব্র সমালোচনা করেছেন । প্রথমে তিনি উল্লেখ করেছেন যে চারটি সমালোচনা , সেগুলি ভারতবাসীর রচনা : ১] ধনগোপাল মুখার্জির ‘আ সন অব দ্য মাদার ইণ্ডিয়া আনসারস’ , ২] এস সি রঙ্গ আয়ারের ‘ ফাদার ইণ্ডিয়া : আ রিপ্লাই টু মিস মেয়ো’ , ৩] কে নটরাজনের ‘মিস মেয়োজ মাদার ইণ্ডিয়া : রিজয়েন্ডার’ , ৪] লালা লাজপত রায়ের ‘আনহ্যাপি ইণ্ডিয়া’ । এই বই ছাড়া বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মিস মেয়োর বক্তব্যের সমালোচনাও সাণ্ডারল্যাণ্ড সংগ্রহ করেছেন । এইসব সমালোচনা ও প্রতিবাদের সাধারণ সূত্র হল :

১] মিস মেয়োর অধিকাংশ তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয় । ২] যে অ্যাবি ডুবয়সকে প্রামাণ বলে মিস মেয়ো উল্লেখ করেছেন , তা বহু ইউরোপীয় পণ্ডিত প্রত্যাখ্যান করেছেন । ৩] ব্যতিক্রমকে তিনি সাধারণ নিয়ম বলে গ্রহণ করেছেন । ৪] রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধির সঙ্গে সাক্ষাৎকারের নামে মিস মেয়ো যা বলেছেন , তা স্বকপোলকল্পিত ।

সাণ্ডারল্যাণ্ডের মতে মিস মেয়োর মূল উদ্দেশ্য হল ভারতকে কলঙ্কিত করা , তার স্বাধীনতার দাবিকে খারিজ করা । ক্যাথারিন মেয়ো গণতন্ত্রের শত্রু , সাম্রাজ্যবাদের বন্ধু । দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ভারতপ্রেমী সাণ্ডারল্যাণ্ড বললেন :

‘ That almost every chapter of the book shows the author to be an extreme imperialist , a despiser of democracy , a believer that strong nations have a right to conquer , rule and exploit those that are not able to defend themselves by arms, and therefore that Britain has a right to hold India in bondage .’
0

প্রবন্ধ - মনোজিৎকুমার দাস

Posted in






জগদীশ গুপ্ত বাংলাসাহিত্যের নতুন ধারার কথা সাহিত্যিক। মফস্বল শহরে থেকে জীবিকা নির্বাহের জন্য নানা পেশায় নিয়োজিত হয়ে তিনি নিজের চিন্তা চেতনা, মেধা মনন, ভাবনায় রচনা করেছে গল্প - উপন্যাস।

তিনি মূলত কথাসাহিত্যিক হলেও সাহিত্যিক জীবনের শুরুতে কবিতা লিখেছিলেন। তিনি একটি কবিতা সংকলন প্রকাশ করেছিলেন।

গল্প-উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ সংস্কারমুক্ত এক ভিন্নধারা এবং বিরল বিন্যাসের রচনাশৈলী রূপায়ণ করেন মনস্তাত্ত্বিক অনুষঙ্গে । এ জন্য এই বিশিষ্ট কথাকারকে আধুনিক বাংলা ছোটগল্পের অন্যতম পথিকৃৎ বলা হয়।

'কল্লোল যুগ’ বইতে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন, ‘জগদীশ গুপ্ত কোনোদিন কল্লোল অফিসে আসেননি। মফস্বল শহরে থাকতেন, সেখানেই থেকেছেন স্বনিষ্ঠায়। লোক- কোলাহলের মধ্যে এসে সাফল্যের সার্টিফিকেট খোঁজেননি। সাহিত্যকে ভালোবেসেছেন প্রাণ দিয়ে। প্রাণ দিয়ে সাহিত্যরচনা করেছেন। অনেকের কাছেই তিনি অদেখা, হয়তো বা অনুপস্থিত।’

আড্ডা বা সভাসমিতির প্রতি কোনও দিনই তাঁর আকর্ষণ ছিল না। কথায়, আচরণে পরিমিতিবোধ ও রুচিগত আভিজাত্যের ছাপ। পড়াশোনার ব্যাপ্তি ছিল বিস্ময়কর। শেক্সপিয়র, মলিয়ের থেকে মোপাসাঁ, ওয়াশিংটন আরভিং— বহু লেখকের উল্লেখ করেছেন।

মনোবৈকল্য ও মনোবিশ্লেষণকে জগদীশ গুপ্তই প্রথম বাংলা ছোটগল্পে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। আর এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্বসূরি।

জগৎ ও জীবন সম্পর্কে পৃথক প্রেক্ষিত ও প্রকাশভঙ্গির স্বাতন্ত্র্যই জগদীশ গুপ্তকে একজন পরাক্রমশালী লেখকের মর্যাদা দান করেছে। তাঁর কোনো গল্পেই কোনো দৃশ্যপট বা পটভূমিকা প্রাধান্য পায়নি।

তিনি তার লেখিনি দিয়ে সদ্বংশজাত সুশীল সমাজের মানুষের বাহ্যিক আবরণের ভেতরও যে অন্ত্যজ প্রবৃত্তি বিদ্যমান, সেটাই তিনি সবার আঁখিতে আঙুল দিয়ে উপস্থাপন করেছেন।

জগদীশ গুপ্তের আগে সব লেখকই রবীন্দ্র-প্রভাতকুমার রীতি অনুসরণ করতেন। এমনকি তিরিশের অনেক প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিকও সমাজের অভ্যন্তরে এবং অন্দরের অনেক অন্ধকার দিক পরিহার করে চলতেন।

কিন্তু জগদীশ গুপ্তই প্রথম পূর্ববর্তী এবং সমকালের কারও বিন্দুমাত্র পদানুবর্তী না হয়ে, কারও তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ নির্মোহ দৃষ্টিতে আখ্যানভাগ রচনা শুরু করেন। আর সেই সাহসী রচনার সূচনাকারীকে বর্তমান সমাজ ভুলতে বসেছে।

বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে তিনি আজ তেমন ততটা পরিচিতও নন। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁর প্রদর্শিত রীতিতেই বর্তমান সময়ের কথাকারগণ লিখছেন।

জগদীশ গুপ্তের অনেক রচনাই ‘কল্লোল’, ‘কালি কলম’, ‘প্রগতি’ ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, গল্প তৈরি তাঁর উদ্দেশ্য নয়। লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি শুধুমাত্র নিজের বক্তব্য পরিবেশন করেছেন।

তাঁর ছোটগল্পের সংখ্যা প্রায় একশো পঁচিশ। মানুষের যেমন হওয়া উচিত, অথবা যেমন হলে তাকে আমাদের ভালো লাগে তা নয়, মানুষ প্রকৃতই যা, তার বিশ্বস্ত ছবি একেবারে নির্মোহ দৃষ্টিতে আঁকতে চেয়েছেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ, প্রভাতকুমার, শরৎচন্দ্রের মিলিত প্রয়াসে, মানুষের প্রতি অপরিসীম বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে সাহিত্যরুচি গড়ে উঠেছিল, জগদীশ গুপ্ত তা থেকে সরে এলেন। প্রবেশ করলেন মানুষের অবচেতনায়, মনের গহনতম প্রদেশে; দেখালেন পাপবোধ ও কদর্যতা মেশানো তার প্রকৃত স্বরূপকে। আর এ সবই দেখালেন বাস্তবতার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে।

লেখার জন্য জীবনে কখনও আপস করেননি তিনি। এক প্রকাশক তাঁর একটি উপন্যাসকে আরও খানিকটা বাড়াতে বলে একটা চিঠি লিখেছিলেন। অগ্রিম কিছু টাকাও পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি সেই টাকা ফেরত পাঠিয়ে জানান, ‘যে উপন্যাস যেখানে যখন সমাপ্ত হওয়া প্রয়োজন এবং যে ঘটনা বিস্তারের যতটুকু ক্ষেত্র আছে, তার বেশি কোনো ফরমাসী লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

নিঃসন্তান জগদীশ গুপ্ত একটি মেয়েকে সন্তানস্নেহে পালন করেছিলেন। তার নাম দিয়েছিলেন সুকুমারী। নিয়মিত ও নিশ্চিত আয় না থাকায় শেষের দিনগুলিতে রীতিমতো অর্থাভাবে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। আর ছিল নানা রোগ-ব্যাধির নিয়ত উপদ্রব।

১৯৫৭ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

জগদীশ গুপ্ত ১৮৮৬ সালের আজকের দিনে (৫ জুলাই) বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার আমলাপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেও মানুষের মনজগতের খবর তার লেখায় উপস্থাপন করে বাংলা সাহিত্যে নিজের আসন পাকাপোক্ত করেন।
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















পর্ব ২৬.২

এবার রাস্তা একদম ফাঁকা। ফৌজি কায়দার লোকটা ওখান থেকেই চেঁচিয়ে বলল, “চলো

ছেলের দল! ডবুল মার্চ! চলো-ও-ও”!

ঝোপের পেছনে স্বাভাবিক স্বরে কথাবার্তা চলছিল।

“হাঁ ভর্ফাই, অর্ফব চর্ফলো”! অর্থাৎ হাঁ ভাই, অব চলো!




“ইস সর্ফালে কে মুঁহ মেঁ কর্ফড়া খোঁর্ফোস দেঁ কি নির্ফিকাল দেঁ”? এই শালার মুখে

কাপড় ঠুঁসে দেব, কি বের করে দেব?

“খোঁর্ফোসে রহো”। ঠুসে দাও।

জনাপাঁচেক লোক ঝোপের পেছন থেকে এসে এবার রাস্তায় উঠল। কারও পা টলছিল না।

সবাই চুপচাপ চলছিল। আর ওদের চলার ভঙ্গিতে এমন ভাব যেন ওরা কোন গেরিলা

বাহিনী যাদের উপর সীমান্তে চীন সৈন্যের হাত থেকে দেশের বেদখল জমি ছিনিয়ে আনার

ভার। ভূতওয়ালা অশত্থ গাছের তলায় আসতে আসতে ওরা রাস্তা ছেড়ে মাঠে নেমে পড়ল।

হয়ত ভূতের ভয়ে বা সামনে থেকে চোখ ধাঁধানো আলো ফেলা গাড়ির জন্যে। ওরা পা

রেখেছে এমন একটা ক্ষেতে যার চারপাশে বাবুল গাছের কাঁটাভরা ডাল পোঁতা আছে। ওই

ক্ষেতে কোন ফসল ছিল না, জমি রক্ষার জন্যে সীমানায় কাঁটাওলা ডাল পোঁতা। একজন

গলা চেপে চেঁচিয়ে উঠল, “অর্ফরে বর্ফাপ, কর্ফাট”;! আরে বাপ! কাঁটা!

আরেকজন বলল, “কির্ফিস সর্ফালে নে বর্ফহাঁ কর্ফাটেঁ গর্ফাড়ে হ্যাঁয়”? কোন শালা

এখানে কাঁটা পুঁতে রেখেছে?

প্রথম লোকটি বলল, “রর্ফমচর্ফন্না নে”। রমচন্না করেছে।

“কর্ফব”? কবে?

“তুর্ফমহারে জর্ফানে কে বর্ফাদ”। তোমার জেল যাওয়ার পরে।

“তর্ফভী! অর্ফব অর্ফা গর্ফায়া হুঁ—খের্ফত তো হর্ফমারা হ্যায়। ইঁহা কর্ফাঁটা ক্যা

অর্ফপনে বর্ফাপ কা সর্ফমঝকর গর্ফাড়া হ্যায়”? তাই! এখন এসে গেছি—খেত তো

আমার। এখানে কাঁটা পুঁতেছে কী ভেবে? ওর বাপের জমি”?

“ গুর্ফুসসা ন হোও। তুর্ফুম অর্ফা গয়ে। সর্ফব চুরেন্ট হো জর্ফায়েগা’। রেগে যেও না।

এখন তুমি এসে গেছ। সব ঠিক হয়ে যাবে।

“ঠির্ফিক হ্যায়। পর্ফর ইয়ে কর্ফাঁটা আয়া কর্ফহাঁসে? কির্ফিস নে দির্ফিয়া”? ঠিক

আছে। কিন্তু এইসব কাঁটা কোত্থেকে এল? কে দিয়েছে?

ছোট্ট দলটি এবার খেত পেরিয়ে ফের রাস্তায় উঠেছে। মদের ভাটি আর পঞ্চাশ গজ দূর।

একজন সর্ফরী বুলি ছেড়ে বলল, “একটা বাবুলের ডালও রমচন্নার নিজের খেতের নয়।

কার খেত থেকে কেটে এনেছে”?

“কার বাবুল কে জানে”?

“বলতে হবে না। আমি ঠিক জানতে পারব”।

“যদি জানতেই পারবে তো জিজ্ঞেস করছ কেন”?




“এইজন্যে যে তোমার আসল রূপও ধরা পরবে”।

অন্য লোকটি হাসতে হাসতে সবাইকে বলল, “দেখ, জোগনাথ জেল থেকে জেরা করা শিখে

এসেছে”।

“চিন্তা কোর না গেঁয়োভূত কোথাকার! তোমাকেও শিখিয়ে দেব”।

দলটা এবার ভাটিখানায় ঢুকে গেল। ওখানে জনা পাঁচ-সাত আগে থেকে বসে ছিল। একজন

উৎসাহিত হয়ে বলল, “আরে জোগনাথ! জেল থেকে ছাড়া পেলে কবে”?

“আজ, দুপুরের পর”।

শ্রোতার উৎসাহ বেড়ে গেল। “কেমন ছিলে”?

“খুব ভাল”।

“চেনাজানা কাউকে দেখলে”?

“সবার সংগে চেনাজানা হয়েছে”।

“ওখানে বোধহয় বিসেসরও ছিল। দেখা হোল”?

“না। ওখানে সবাই বিসেসরের বাপ”!

“ওখানে সিসল থেঁতো করে দড়ি পাকাতে হত”?

ঘরের কোনা থেকে একটা ভারী গলার প্রশ্ন। জোগনাথ রেগে গিয়ে বলল, “কে বলছে?

কোন ব্যাটা মুর্গির ইয়ে—“?

“ ও আমার অতিথি”।

“ওকে বল নিজের ভেঁপু বাজানো বন্ধ করে। শিবপালগঞ্জে এসব চলে না”।

“শুনেছ অতিথি? এ হল জোগনাথ। সদ্য সদ্য জেল থেকে বেরিয়েছে। তোমাকে বলছে ভেঁপু

বাজানো বন্ধ করতে”।

“আমার কথাটা আরেকবার শুনে নাও । গোড়াতেই বলে দিচ্ছি —আমি কিন্তু একনম্বর

হারামি! চুপচাপ মদ গিলতে থাক, আর ওই কোনাতেই বমি কর। ফের সিসল থেঁতোর কথা

শুরু করলে তোমায় সিসল দেখিয়ে ছাড়ব”।

“শুনেছ অতিথি”?

“শুনবে কে? ওই কোণা তো খালি”।

“অরে! কোথায় গেল অতিথি? কেটে পড়ল”?




“আরে, বাহ রে অতিথি”!

জোগনাথ একটা দশ টাকার নোট বের করে দোকানদারকে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “সবাইকে

এক এক চুগগড় (পেগ) দাও। কেউ যেন ছাড়া না পায়! অনেক দিন পর নিজভূমে এসেছি”।

“অনেক টাকাপয়সা এনেছ দেখচি”।

“শনিচরা পঞ্চায়েত প্রধান হয়েছে। ওর হুকুম—আজ সবাই মনের সুখে মদ খাবে”।

“কিন্তু শনিচরার ট্যাঁকে পয়সা কই”?

“আরে এখন শনিচর আর সেই শনিচর নেই। ও এখন পঞ্চায়েত প্রধান। কিছু বুঝলে”?

সবাই এক এক চুগগড় হাতে নিয়ে বসে আছে। এটা ভাটিখানার বাইরের বারান্দা। এটাকে

দরমার দেয়াল তুলে রাস্তা থেকে আলাদা করা হয়েছে। ভেতরের ঘরে দোকানদারি।

বারান্দায় একটা লালটিন জ্বলছে যাতে যারা মদ খাচ্ছে তাদের চেহারা দেখা যায়। কিন্তু

ভেতরে জ্বলছে এক টেমি। তার আলোয় মদ যে বেচছে তার চেহারা দেখা যায় না।

বারান্দায় একটা বেঞ্চ, তাতে দু’জন বসে আছে। জোগনাথও ওখানে বসে পড়ল। কিছু

লোক মাটিতে পাতা চাটাইয়ে বসেছে। কয়েকজন কাঁচা মেজেতে বসে খাচ্ছে।

সাকী, মদের কলসি ও পেয়ালা—সব এখানে যা আছে তাই। দেশি মদের গন্ধ রাস্তায়

অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। মহাভারতের রাজা শান্তনু যেমন যোজনগন্ধার সুগন্ধ

নাকে আসলে টের পেতেন নারীটি কতদূরে, তেমনিই গন্ধ থেকেই লোকে বুঝতে পারে

এখানে দেশি মদের আড্ডা। আমাদের এখানে গন্ধই দেশি মদের বিজ্ঞাপনের কাজ করে।

তাই নামজাদা সংবাদপত্রে বিলিতি মদের বিজ্ঞাপন দেখতে পাবেন, দেশি মদের নয়। ওর

বিজ্ঞাপনের দরকার নেই।

দু’তিন চুমুকের পর জোগনাথ এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। তারপর বলল, “এতে জল

মেশানো হয়েছে”।

“কী বললে”?

“জল। মদে জল মিশিয়ে বেচা হচ্ছে”।

“আমারও মনে হচ্ছে”।

“আমারও”।

“আমারও। বেশ কিছুদিন ধরে এমন মনে হচ্ছিল। এখন তো জল মেশানো দারু আসলের

মতই লাগছে”।




দোকানদার নিজের গদি থেকে উঠে জোগনাথের কাছে এল। শীতল কন্ঠস্বরে

বলল—“ফুর্তি করে খাও। তোমার হাওয়া তো প্রথম পেগ থেকেই ফুস্‌ হয়ে গেছে। পোয়া-

আধপোয়া ফোকটে খেতে চাও তো ঝেড়ে কাশো, খাইয়ে দেব। কিন্তু জল মেশানো ওঁছা

লোকের কাজ। এখানে ওসব হয় না”।

জোগনাথের উপর এই লেকচারের সঠিক প্রতিক্রিয়া হল। পকেট থেকে দশ আর পাঁচ

টাকার কয়েকটা নোট বের করে বলল, “যেদিন ফোকটে মদ গেলার ইচ্ছে হবে, তাই করব।

কিন্তু ঘাবড়ে যেও না। এই দেখ, এতগুলো টাকা একসঙ্গে কখনও দেখেছ”?

দোকানদারটি রোগাপাতলা, কিন্তু ত্যাড়া আদমি, মুখের ভাব বেশ জেদী। যেতে যেতে

শুনিয়ে দিল,” আমার দেখার দিন চলে গেছে। এখন তোমার দেখার দিন। দেখতে থাকো”।

দুটো পেগ হয়ে গেছে। একজন প্রশ্ন করল, “এবার কী ভাবছ জোগনাথ”?

“টাকার অবস্থা বেশ টাইট”। বলার ঢং এমনি যেন কেউ কথাটা বিশ্বাস না করে। “আগে

দারোগাজীর সঙ্গে দু-দু হাত হয়ে যাক। বদলি হয়েছে তো কী? আমি ওকে ছাড়ার পাত্র

নই। এখানে আসার আগে শহরে ওনার বিরুদ্ধে একটা মোকদ্দমা দায়ের করে এসেছি। দশ

বার এজলাসে হাজির হলে ওনার পলেস্তারা খসে পড়বে”।

“কীসের মোকদ্দমা”?

“দেওয়ানি মোকদ্দমা। কেন, তুমি জানতে না? আমার উপর চুরির মিথ্যে মামলা করে উনি

আমাকে দু’তিন মাস হাজত বাস করিয়েছেন”।

“বৈদ্যজী জামিন করান নি”?

“উনি করাতে চাইছিলেন, কিন্তু আমি জিদ ধরলাম। বললাম, দারোগার নাম নিয়ে এখানেই

থাকব। ভাড়া দিতে হবে না”।

“ফের”?

“ আবার ফের কিসের? আমার মান-ইজ্জত গেল, চাষের ক্ষতি হল। একটা খেত রমচন্না

কব্জা করে নিল। সব মিলিয়ে আট হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়েছি। ডিক্রি পেয়ে গেলে

দারোগাজির ঘটিবাটি চাটি হয়ে যাবে”।

“কিন্তু কোর্ট ফীস? দেওয়ানি মামলায় খর্চা কম নয়”।

“সব ভগবান দেবে”।

“শোন ভাই জোগনাথ! বামুন ঘরে জন্মেছ, এদিক সেদিকের বাতেলাবাজি বন্ধ কর। সচ

সচ বাতাও”।




“হাঁ ভাই, আমিও তাই বলি। মাঝখানে ভগবানকে নিয়ে টানাটানি কেন? কোর্ট ফীস কে

দেবে”?

“একবার বলেছি না—ভগবান দেবে”?

“বিগড়ে গেছে, আর মুখ খুলবে না। আচ্ছা, নাই বললে। এটা বল -- মোকদ্দমা করবে?

নাকি লাগিয়ে এসেছ”?

“লাগিয়ে দিয়েছি”।

“কবে”?

“আজকে”।

ঝোপের পেছন থেকে একজন মানুষ টলতে টলতে বেরিয়ে এল। তারপর ব্যথায় কাতর

আর্তনাদ করতে করতে রাস্তায় উঠে চলতে শুরু করল। ওর মাথায় ভর করেছে আত্ম-

করুণা, আক্রোশ আদি সাহিত্যিক গুণ। ভাটিখানায় ওর কথা ঘুরে ফিরে যেভাবে পৌঁছে

গেল তার সারতত্ত্ব হলঃ

একটু আগে ভূতের ঘরওলা অশত্থ গাছের একটু আগে সড়কের কিনারে একটা রাহাজানি

হয়েছে। কয়েকজন লোক লুঠপাট করেছে। এখন ও থানায় রিপোর্ট লেখাতে যাচ্ছে। এবার

এক এক করে সবক’টা বদমাশের হিসেব চুকিয়ে দেবে।

মেজেতে জোগনাথের পায়ের কাছে বসে এক ব্যাটা বেশ ডাঁটের সঙ্গে গেলাসের পর

গেলাস খালি করছিল। সে বলল, “তোমার গাঁয়ের এই বাপারটা বড় খারাপ। লোকজন লেফট

রাইট করতে করতে সূয্যি ডুবতেই রাহাজানি করে বসে! এটা একদম ফালতু কাজ!

জওয়ান, তুমি কি বলবে বল”।

জোগনাথ স্রেফ মাথা নারল আর দোকানদারকে চেঁচিয়ে বলল—আরও এক পো (পাঁইট)

দিয়ে যাও ভাই। চাইলে এটাকে ‘ফোকট’ খাতায় ধরে নাও”।

খানিক পরে ওরা যখন টলতে টলতে দরমার আড়াল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় উঠল তখন

ওদের সামনে খালি সড়ক আর দু’একটা হাড়জিরজিরে কুকুর।

যে লোকটা ব্যথায় কাতরে কাতরে ঝোপের পেছন থেকে বেরিয়েছিল সে এখন স্বাভাবিক

ভাবে ওদের সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। কিন্তু এদের টের পাওয়ার অবস্থা ছিল না। ঘরে

ফেরার সময় চলতে চলতে লোকটার মনের কলুষ সাফ হয়ে গেল। ধর্মে আস্থা বেড়ে গেল।

কারণ থানায় যাওয়ার পথে একজন জ্ঞানী ওকে বুঝিয়ে দিলঃ “কী হবে থানায় রিপোর্ট

লিখিয়ে? যা গেছে, তা গেছে। লুঠের মাল কখনও ফেরত পাওয়া যায়?




“বল, তুমি হিন্দু না মুসলমান? হিন্দু হলে ভাগ্য মানতে হবে। তোমার কপালে এই

পঁয়তাল্লিশ টাকা লেখা নেই। এখন দৌড়োদৌড়ি করে কী হবে? ভগবানের যখন এটাই

ইচ্ছে।

“যাও, প্রাণে বেঁচেছ তাই ঢের। গত বছর ঠিক ওই জায়গাতেই একটা লোককে পাঁঠার মত

কেটে ফেলেছিল।

“রামনাম কর, আর ঘরে ফিরে সত্যনারায়ণের কথা পাঠ করাও। মামলা-মোকদ্দমায় যা

টাকা লাগত, সেটা ধর্মকর্মে খরচ কর।

“গরম দুধে হলদি মিশিয়ে খেয়ে নাও আর পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়। কাল সকাল নাগাদ সব

ভুলে যাবে”।

(চলবে)
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















২১. বঙ্গভঙ্গ থেকে বিশ্ববাংলা কেবল বিশ্বাসঘাতকতা





সুপরিচিতাসু সুস্মি,



তোমার চিঠি যখন পেলাম বাংলার মসদে তখন শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ২০২৬ ফলাফল প্রকাশের পরেই একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে প্রায় সবখানে বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা কবে সাম্প্রদায়িক হয়ে গেলো? তিনদশক শাসন করা কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বহুযুগ ধরে নামেই টিকে আছে, চৌত্রিশ বছরের সাম্রাজ্য পতনের পরে বামফ্রন্টের অবস্থাও একই বলতে গেলে। তৃণমূল ও বাম ঘরানার লোকজন পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে বিজেপিকে প্রতিহত করতে চেয়েছে বারবার। আমার মনে হয় বাংলার রাজনীতিতে এই বিজেপির এই ভূমিধস বিজয় "প্যারাডাইম শিফট" বা কাঠামোগত পরিবর্তন। এটি কেবল একটি দলের পরিবর্তন নয়, বরং স্বাধীনতার পর থেকে বাংলার রাজনীতিতে যে বাম-উদারপন্থী বা সেক্যুলার ঘরানার একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, তার ওপর এক বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আঘাত। এই বিশাল বিজয়ে একটা ব্যাপার নিশ্চিত কাজ করেছে বলেই আমার বিশ্বাস, বিজেপির দ্বারা তৈরি একটি 'কাউন্টার-হেজিমনি' বা পাল্টা-আধিপত্যের সফল রূপায়ণ। তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোষণ রাজনীতির যে অভিযোগ দীর্ঘ বছর ধরে বিজেপি তুলেছিল, তা বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মনে এই ধারণা তৈরি করতে সফল হয়েছে যে—প্রচলিত 'সেক্যুলারিজম' আসলে সংখ্যাগুরুদের অধিকারকে খর্ব করছে। ফলে, মানুষ ঐতিহ্যগত সেক্যুলার কাঠামো ভেঙে বিজেপির 'সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ' বা 'হিন্দুত্ব'-এর ন্যারেটিভকে গ্রহণ করেছে। ভুলে গেলে চলবে না এই পশ্চিমবঙ্গের রয়েছে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ইতিহাস। ছেচল্লিশের দাঙ্গা। দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস। দেশভাগের সময় ও পরে দাঙ্গার ক্ষত। সুপ্ত সেই সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকেই উসকে দিয়েছে মমতার রাজনীতি। প্রতিযোগিতার সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের আবহে পুরো ফায়দা তুলছে বিজেপি। সাতচল্লিশে স্বাধীনতা। দেশভাগ। বাংলা ভাগ। কোটি মানুষের জীবন–জীবিকায় কাঁটাতার। ভিটে হারানোর যন্ত্রণা। স্বদেশ, স্বজন হারানোর হাহাকার। ছিন্নমূল উদ্বাস্তু। বাংলার জনগণ যে সিদ্ধান্ত নিলো তার সুফল কুফল জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে কয়েক বছর। তোমার চিঠি পড়তে পড়তে মনে পড়ছিল একটি কথা যা বুঝতে শেখার কাল থেকেই শুনছি,বাঙালি সবসময় বড়াই করে বাঙালি খুব বুদ্ধিমান ও সংস্কৃতিবান। কিন্তু সারা ভারত যা করে বাঙালি ঠিক তার উল্টোটা করে। তার মানে, হয় বাঙালি বুদ্ধিমান আর সারা ভারত বুদ্ধিহীন। তাই বুদ্ধিমান বাঙ্গালী বাবুরা ছেলেমেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পরে চেয়ে থাকেন ব্যাঙ্গালোর, পুনে বা হায়দরাবাদ এর দিকে। চিকিৎসা করতে গেলে প্রাধান্য দেন ব্যাঙ্গালোর, মনিপাল,হায়দ্রাবাদ,মুম্বাই আর ভেলোরকে। ৪২ লক্ষ বাঙালি শ্রমিক পেটের দায়ে অন্য রাজ্যে কাজ করেন। এখানে কত পলিটেকনিক কলেজ আছে আর কর্নাটকে কত আছে এর তথ্য গুগলে সার্চ করলেই জানা যাবে। লজ্জা হয় না আমাদের, কোন বাঙালিকে ভাবতে দেখিনিনা একবারও এত পিছিয়ে পড়লাম কেন? ১৯৭৭ সালের পরে পশ্চিমবঙ্গ কোনোদিন কেন্দ্র রাজ্যে এক সরকার পায়নি। তার ফল হয়ত আমরা ভোগ করছি। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বঙ্গদেশে প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলমানরা ঢেলে ভোট দিল মুসলিম লীগকে আর বুদ্ধিমান হিন্দু বাঙ্গালী ভোট দিল ধর্ম নিরপেক্ষ কংগ্রেসকে। হিন্দুমহাসভা ভোটে হেরে গেল। কি আনন্দ। বছর ঘুরতে না ঘুরতে পুঁটুলি হাতে বউ বাচ্চা নিয়ে কোটি কোটি বাঙালি হিন্দু ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে এলো এ বঙ্গে ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্তরা আঁকড়ে ধরল কংগ্রেস আর মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবিরা বামপন্থাকে। তাও লজ্জা নেই। গর্ব করে বলে আমা-গো এত বিঘা জমি ছিল, এত বিঘা পুকুর ছিল, এত বড় বাড়ী- সব মনে আছে। মনে নেই কেবল কারা লাথি মেরে তাড়িয়ে ছিল। কারা আপনার বাড়ির মেয়েদের ধর্ষন করেছিল! প্রশান্ত সুর, প্রমোদ দাশগুপ্ত, অশোক মিত্র তাড়া খেয়ে এখানে এসে কমিউনিস্ট পার্টি করেছেন। প্রফুল্ল সেন বরিশাল ছেড়ে গান্ধীবাদ প্রচার করেছেন। আজ তোমাকে লিখতে লিখতে মনে হলো ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ আদতে বিদেশি মত ও পথের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং দেশীয় ইতিহাস ও বাস্তবতা সম্পর্কে উদাসীনতা। বামপন্থী ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিজীবীরা ভারতের শাসকশ্রেণীকে "৫,০০০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস" রচনা করে দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো: ভারত স্বাধীন হওয়ার ২০০ বছর আগে কি কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী বা বেলুচিস্তান থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত উপমহাদেশের মানুষ নিজেদের "ভারতীয়" বলে পরিচয় দিতেন? এই কৃত্রিম "ভারতীয় সভ্যতা" তত্ত্বকে রক্ষা করতে গিয়ে বামেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) হিন্দু সভ্যতার ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয় গঠনের প্রকল্পকে তাত্ত্বিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ তারা নিজেরাই সেই একই "সভ্যতা" তত্ত্বের বাহক। বাঙালি চিরকাল আত্মঘাতী, মনে পড়ছে নীরদ সি চৌধুরীর কথা ছিলেন যিনি আপাদমস্তক ব্রিটিশ ভক্ত। ভারতীয়ত্ব সম্পর্কে একটা নাকউঁচু মনোভাব। আর বাঙালি! বাঙালি সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন ‘বাঙালী থাকিব নাকি মানুষ হইব’। শশাঙ্কের আমল থেকে শুরু করে ইংরেজ আমলে এসে দেখবো দেড়শো বছরের ব্রিটিশ রাজধানী কলকাতায় নিজেদের করণিকের যোগানের স্বার্থে ব্রিটিশেরা কোম্পানির আমল থেকেই কলকাতা শহরে পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারে উদ্যোগী হয়। যার ফলে, ব্রিটিশদের অধীনে চাকরি করে স্থায়ী উপার্জন করতে ও ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার তাগিদ থেকে উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজের প্রতিনিধিরা কলকাতা কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে আবার ঔপনিবেশিক অর্থনীতির স্বার্থে, ব্রিটিশ শাসনের স্বার্থেই হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতা ভাঙার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর ফলে বঙ্গীয় রেনেসাঁ জন্ম নেয়, যা মূলত কলকাতার সাবর্ণ হিন্দু উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই সাবর্ণ সমাজই উনিশ শতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। এরাই ‘ভারত’ দর্শনের প্রবক্তা হয়। এরাই চরম ইসলাম বিদ্বেষ থেকে চালিত হয়ে ব্রিটিশ শাসকদের কাছাকাছি থেকে সমস্ত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভাগিদারী চাইলো। প্রথমে নতজানু হয়ে, তারপর কংগ্রেসের মতন প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে আর শেষ পর্যন্ত হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে। এই সম্প্রদায়ই কিন্তু উত্তর আর পশ্চিম ভারতে হিন্দুত্বের জিগির ওঠার অনেক আগেই "আনন্দমঠ" লিখে হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতে এক আদিম সভ্যতার জয়গান শুরু করে। এই সম্প্রদায়ই কিন্তু ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিল। বঙ্গ ভঙ্গ করার ব্রিটিশ অভিপ্রায় নিয়ে এরাই প্রশ্ন তোলে, জানতে চায় হিন্দু পশ্চিমের সাথে মুসলিম পূর্বের বিচ্ছেদ ঘটানোই কি এই বিভাজনের আসল কারণ? ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে শুধু প্রতিবাদে কাজ না হওয়ায়, বঙ্গ ভঙ্গ আটকাতে তারা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। কিন্তু সেটা কি সত্যিই স্বাধীনতার জন্যে? কোন দেশের স্বাধীনতার জন্যে? বঙ্গের না পঞ্জাবের? ১৯০৫ সালের আন্দোলনে সাবর্ণ ভদ্রলোকদের যোগদানের মূলে ছিল পূর্ববঙ্গে তাদের জমিদারি হাতছাড়া হওয়ার ভয়। এই জমিদারিগুলো পূর্ব বাংলায় হলেও, জমিদারেরা অধিকাংশই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে থাকতেন। আর এই জমিদারি রক্ষার তাগিদ থেকে যে ভদ্রলোকেরা একদিন বঙ্গ ভঙ্গের বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলে ধরলেন, ৪২ বছর পরেই তারা কিন্তু বঙ্গ ভঙ্গ নিয়ে টু শব্দটিও করেনি। বর্তমান বিজেপির প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী যখন বাংলা ভাগের পক্ষে, হিন্দু বাঙালি হোমল্যান্ড বানানোর দাবি নিয়ে হৈচৈ শুরু করেন, হিন্দু মহাসভার খুবই স্বল্প সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে, কমিউনিস্ট পার্টির ভদ্রলোক নেতৃত্ব কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে না। তাঁরা সেই সময়ে, যখন বাংলার অধিকাংশ দলিত, আদিবাসী, শূদ্র-নমঃশুদ্র মানুষ এবং মুসলিমের লেখা পড়া জানতেন না, নিজেদের সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজনীতিকে আবদ্ধ রাখেন দিস্তা দিস্তা কাগজ ছাপানো ও মধ্যবিত্ত কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে, যা সাধারণ হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে অবিশ্বাস কে ভাঙার কাজ করতে ব্যর্থ হয়। কংগ্রেস, লীগ আর মহাসভা যখন বিভেদের রাজনীতি করছে, হিন্দু সাবর্ণ জমিদারদের একটা অংশ আর মাড়োয়ারি পুঁজিপতিরা যখন মুখার্জীকে চাঁদা দিচ্ছে কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গ কে ইন্ডিয়ার অধীনে রাখার, তখন কমিউনিস্ট পার্টির কাছে ছিল এক সুবর্ণ সুযোগ। তাঁরা লেনিনীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে স্বাধীন, ঐক্যবদ্ধ বাংলার সমর্থনে দাঁড়াতে পারতেন, কিন্তু সেটা তাঁরা করেননি।



দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সুভাষ চন্দ্র বসুর অনুজ শরৎ চন্দ্র বসু, হুসেইন সোহরাওয়ার্দী ও কিরণ শঙ্কর রায় সেই বিভেদের দিনে, ১৯৪৬ সালের হানাহানির পরেও, এক সাথে বসে তৈরি করলেন স্বাধীন বাংলার রূপরেখা। যে বাংলার নাম তাঁরা দিলেন ঐক্যবদ্ধ, সমাজতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক বাংলা। যে বাংলায় কৃষকের-শ্রমিকের অধিকারের কথা তাঁরা বললেন, সেই বাংলার প্রস্তাব কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও মেনে নিয়েছিলেন। যখন তিনি বুঝেছিলেন যে পাকিস্তান বানানো মানে একই দেশে দুই ব্যবস্থা চালানো কোনো মতেই সম্ভব না আর পূর্ব পাকিস্তান গড়লে তাতে শিল্পোন্নত কলকাতা ও তার পার্শবর্তী অঞ্চলকে কংগ্রেস বা মাড়োয়ারি পুঁজি কোনো ভাবেই হাত ছাড়া করবে না, তখন জিন্নাহ বলেছিলেন যে ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন বাংলা হলে তিনি খুশি হবেন এবং সেই বাংলা পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আবদ্ধ থাকবে বলেও তিনি জানান। কিন্তু এই প্রস্তাবে কংগ্রেসের ভিতরে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সেই আলোড়ন সৃষ্টি হয় কারণ মাড়োয়ারি আর হিন্দু জমিদারদের প্রতিনিধি মুখার্জীর মহাসভা এই বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ করে। মুখার্জী বড়লাট কে লেখেন যে ভারত ভাগ হোক বা না হোক, বাংলা ভাগ চাই। এই সময়ে দাঁড়িয়ে, বাংলার শ্রমিক কৃষকের ঐক্যের স্বার্থে, মাড়োয়ারি আর হিন্দি পুঁজির থেকে বাংলার শিল্প ও বাণিজ্যের মুক্তির প্রশ্নে কমিউনিস্টদের কাছে সুবর্ণ সুযোগ ছিল ঐক্যবদ্ধ বাংলার স্বার্থে লড়াই গড়ে তোলার, লীগকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার ও কংগ্রেসের দেশপ্রেমী অংশ কে নিজের দিকে টেনে নেওয়ার।কিন্তু সেই কাজ না করে কমিউনিস্টরা পাকিস্তান তৈরির পিছনে তত্ত্বের জাল বোনা শুরু করেন। কমিউনিস্ট পার্টির সাবর্ণ ভদ্রলোক নেতৃত্বের কাছে সেদিন অসুবিধার ব্যাপার ছিল যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশে তাঁদের পক্ষে থাকা ও রাজনীতি করা সম্ভব হবে না। তাঁরা সেই “ভারতীয় দর্শনের” তাড়নায় সেদিনও বাংলার জায়গায় ভারতকে রাখলেন। ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় তথাকথিত ভদ্রলোক-চালিত বামপন্থী শক্তি এক লহমায় তেভাগা আন্দোলনকে শিকেয় তুলে হিন্দুত্বের, হিন্দি আধিপত্যের পতাকা তুলে ধরে।



উদ্বাস্তু বাঙালির কাছে কংগ্রেস ও কমিউনিষ্ট পার্টি আশ্রয়ের নাম হয় উঠলে একান্নতে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জনসংঘ। জওহরলাল নেহরু বললেন, ‘আরএসএসের জারজ সন্তান’। বাহান্নতে নির্বাচন। হাজারে হাজারে মানুষ আসছে ওপার থেকে। এপার থেকেও যাচ্ছে অনেকে। সেই নির্বাচনে আজকের বিজেপির পূর্বসূরি জনসংঘ লোকসভায় এ রাজ্য থেকে পেয়েছিল সাকল্যে দুটি আসন। কলকাতা দক্ষিণ–পূর্ব কেন্দ্র থেকে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। মেদিনীপুর থেকে দুর্গাচরণ ব্যানার্জি। সমর্থনের হার ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। রাজ্য বিধানসভায় পায় ৯টি আসন। সমর্থনের হার ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে, জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি পায় ২৮টি আসন। সমর্থনের হার ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পাঁচ বছর পর সাতান্নর নির্বাচন। লোকসভায় এ রাজ্য থেকে জনসংঘ জিততে পারেনি একটি আসনেও। সমর্থনের হার নেমে আসে দেড় শতাংশে। বিধানসভাতেও শূন্য, সমর্থনের হার কমে ১ শতাংশের নিচে, শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ। বিপরীতে কমিউনিস্ট পার্টির আসনসংখ্যা বেড়ে ৪৬। সমর্থনের হার বেড়ে ১৭ দশমিক ৮১ শতাংশ। সেদিন এহেন সহায়ক পরিস্থিতি পেয়েও দাঁত ফোটাতে পারেনি সাম্প্রদায়িক শক্তি। কিন্তু ভারত আর পাকিস্তান সৃষ্টি করার পরে দুই দেশের শাসকের কাছেই জরুরী হয়ে ওঠে ভাষার প্রশ্নটি। হিন্দুস্তানী ভাষার থেকে সৃষ্ট উর্দু আর হিন্দিকে তারা আরও বেশি করে ধর্মীয় ভাবে ঘষে মেজে নিতে থাকে। এরই ফল স্বরূপ ভাষা আন্দোলন তীব্র হয় পূর্ব পাকিস্তানে। অন্যদিকে ভারতে হিন্দি কে রাষ্ট্র ভাষা করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পরে দ্রাবিড় জনগণ, বিশেষ করে তামিল নাড়ুর জনগণ। অসংখ্য মানুষের রক্তের বিনিময়ে আটকানো হয় কংগ্রেসের হিন্দি চাপানোর ষড়যন্ত্র। এই লড়াইয়েও বাংলার কমিউনিস্ট নেতৃত্ব কে দেখতে পাওয়া যায়নি। যদিও ভারত সরকার হিন্দি চাপানোর সিদ্ধান্ত কে গত শতকের ছয়ের দশকে স্থগিত করে, সংবিধানের হিসাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ধীরে ধীরে ইংরাজি কে অবলুপ্ত করে হিন্দি কে চাপাতে বাধ্য, যদি না সংবিধান সংশোধন হয়। হিন্দি বা উর্দুর মতন কৃত্রিম ভাষাগুলো যে শুধুই ভাষাগত হামলা করে তাই নয় বরং সাংষ্কৃতিক হামলাও চালায়, ক্ষুদ্র ভাষা গোষ্ঠীগুলোকে, জাতিগুলোকে সাংস্কৃতিক ভাবে উপনিবেশে পরিণত করে, সেই ব্যাপারেও কমিউনিস্ট পার্টি কোথাও জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলেনি। ভদ্রলোক শ্রেণীও আসামের বরাক উপত্যকায় অহমীয় চাপানোর বিরোধিতা করে গুলি খায় কিন্তু কোথাও, পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলিমেরা যে ভাবে উর্দুর বিরুদ্ধে লড়ে গুলি খেয়ে প্রাণ দিলেন, সেভাবে হিন্দির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে থাকেননি। বরং হিন্দি সাম্রাজ্যের তিনটি থাবাকে—সেনা বাহিনী, বলিউড ও ক্রিকেট দলের প্রতি সে আনুগত্য দেখিয়েছে এবং এদের মধ্যে ঢোকার আপ্রাণ চেষ্টা করে এসেছে। কিন্তু এই ভদ্রলোক বামেদের মুখে ঝামা ঘষে দেয় তাদেরই স্বজাতির এক কমিউনিস্ট নেতা। ওপার বাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তু হিন্দু পরিবার কিংবা রাজ্যের হিন্দুদের মধ্যে তৈরি করতে পারেনি সমর্থনের এতটুকু ভিত। কারণ, বামপন্থী প্রগতিশীল শক্তি সেদিন গ্রাম-শহরে চ্যাম্পিয়ন করতে পেরেছিল শ্রেণির ইস্যু। দেশভাগের পরেই শহরে খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন, ট্রামের দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন, ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের জমির অধিকার, পুনর্বাসনের আন্দোলন, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন। আর গ্রামে জমিদার-জোতদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, গরিবদের খাদ্যনিরাপত্তার আন্দোলন। এই আন্দোলনগুলোর যোগফলেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বামপন্থীদের পথচলা শুরু। বামপন্থীদের উত্থান। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিকল্প নীতির লড়াই। যার কেন্দ্রে ছিল শ্রেণির ইস্যু। যা পেছনে ঠেলে দেয় পরিচিতি সত্তার রাজনীতিকে, যা পরাধীন ভারতে অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন দাপট চালিয়ে এসেছিল। শ্রেণির ইস্যুতে এই শ্রেণি ঐক্যেই ২০১১ পর্যন্ত ঘটেনি কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনা। ‘পঞ্চাশের দশকে প্রায় প্রতিবছরই কোনো না কোনো গণ-আন্দোলনের ডাক আমরা দিয়েছি এবং প্রতিটি আন্দোলনেই হাজার হাজার মানুষ কারাবরণ করেছে, লাখ লাখ মানুষ মিছিল ও সভায় অংশ নিয়েছে এবং বিভিন্ন দলমতের মানুষের সমর্থন আমরা পেয়েছি’, বলেছেন জ্যোতি বসু। প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের মাঝামাঝি সময়। ১৯৮১–এর সেপ্টেম্বরে। ‘গত তিন দশকের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা’ নিবন্ধে। ‘১৯৫২ সালের গণ–আন্দোলন ছিল দুর্ভিক্ষের অবস্থার বিরুদ্ধে। ১৯৫৩ সালের আন্দোলনের বিষয়বস্তু ছিল ব্রিটিশচালিত ট্রাম কোম্পানির ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে। ১৯৫৪ সালে শিক্ষকেরা প্রথম রাজভবনের সামনে রাস্তায় এসে বসলেন দাবি আদায়ের জন্য এবং অন্যান্য কর্মচারী মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন পেলেন। ১৯৫৬ সালের আন্দোলন ছিল বঙ্গ-বিহার সংযুক্তির সরকারি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। ১৯৫৮ সালে আবার খাদ্য আন্দোলন। ১৯৫৯ সালে খাদ্য আন্দোলনে ৮০ জন শহীদের কথা এখনো অনেকে ভোলেননি। ১৯৬০ সালে হলো সরকারি কর্মচারীদের ধর্মঘট। ১৯৬০-৬৫, চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ এবং পার্টির অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বের জন্য তেমন বড় কোনো আন্দোলন সংগঠিত করা না গেলেও ১৯৬৬-তে খাদ্য ও বন্দীমুক্তি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। এই ব্যাপক গণ-আন্দোলনগুলোর মধ্যে হয়েছে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে অসংখ্য আংশিক সংগ্রাম। কারখানায়, অফিসে, গ্রামে, স্কুল-কলেজে।’



বাংলা ও বাঙালি জাতিসত্ত্বার রয়েছে দীর্ঘ এক ইতিহাস, যা নির্মিতি দিয়েছে সমন্বয়বাদী এক সংস্কৃতির। যাতে যোগ রয়েছে আত্তীকরণ ও সাঙ্গীকরণের দুর্লভ গুণ। যাপিত জীবন এবং চৌদিকের প্রাণ ও প্রকৃতির সমন্বয়ে উদ্ভূত এই সংস্কৃতি কয়েক হাজার বছরের প্রবহমানতায় ঋদ্ধ। আপন ও অপরের যূথবদ্ধ পরিশীলন তাকে করেছে সমগ্র জাতির বেঁচে থাকার জন্য প্রাণ বায়ু বিশেষ। ১৯২০ দশকে যদিও কংগ্রেস ভারতবর্ষে অবিসংবাদিত রাজনৈতিক দল হিসেবে উঠে এসেছিল এবং তার অস্তিত্ব জাহির করার মতো সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানও খানিকটা অর্জন করেছিল; কিন্তু অদ্ভুতভাবে ব্রিটিশ নীতির প্রকৃত স্বরূপ বোঝার পরেও, মুসলমান সম্প্রদায়কে কখনই তারা দলের এক আবশ্যিক অঙ্গ করার জন্য, বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। যে কারণে ব্রিটিশ সরকার সবসময় ভাবার সুযোগ পেয়েছিল যে, কংগ্রেস আসলে, ‘representative of only a microscopic minority’। এর ফলস্বরূপ স্বভাবত সামাজিক দিক থেকে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মনের দূরত্ব বাড়ছিল। ঐতিহাসিক মুশিরুল মন্তব্য করেছেন, ‘The definition of‘Muslim identity’ was integrally related with relevant issues like economic discontent, escalating violence, projection of the political area, new social groups with higher levels of consciousness and greater stakes in power structures, which led to ‘community based strategies’। আবার ঐতিহাসিক অসীম রায়ের মতে, ‘The entire process of identity formation’ of the Bengal Muslims ‘on one hand underlines the seminal role of the elite, spurred into action by the changed historical circumstances of their position, their inner divergences and conflicts underlying their differential response, their manipulation of symbols of group identification for the optimal participation and mobilization of the masses’। মুসলিম লীগ সে সময়ে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিল যে, মুসলমান সম্প্রদায় অবশ্যই যৌথ সমস্যার এক সমাধানসূত্র খুঁজতে চায়; কিন্তু তা অবশ্যই সেই সময়ে তারা যে বিশেষ সুযোগ সুবিধাগুলো শাসকজাতির কাছ থেকে পাচ্ছিল, সেগুলোকে বর্জন করে নয়। সেসময় অনেক মুসলমান দ্বারা পরিচালিত পত্রিকায় এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় লেখা হয়, ‘The Hindu authors were sowing the seeds of distrust and hatred. If the Hindus were not aware of its consequences, the cordial relationships between the two communities would never be possible’। আবার শেখ ওসমান আলী মন্তব্য করেছিলেন, ‘Hindus might be advanced and cultured, but not all of them were. Similarly, though many Muslims might be backward and illiterate, not all of them were. Therefore there is no reason to regard Muslims as contemptible inferiors; I hope every Hindu brother, instead of regarding us with contempt or dislike, will embrace us with genuine brotherly love’। তাই, ১৯২০-এর দশকের পারস্পরিক বিশ্বাসহীনতা এবং সম্প্রদায়গত সহনশীলতা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসার এক ধারা যে পরবর্তী দশকের সম্প্রদায়গত ঘটনাক্রমকে বেশ জোরালোভাবে প্রভাবিত করেছিল, তা বলাবাহুল্য। সেই বঙ্গভঙ্গ ও দেশভাগের দগদগে দাগের সাথে অবজ্ঞা ও অবহেলার সাথে ক্ষত হয়ে জেগে থাকলো ভাষা আন্দোলন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নতুন দেশের স্বপ্ন দেখছে ওপার বাংলা আর এপার বাংলায় ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা সিপিআই (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি যে সব জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার, স্বীকার করে। সিপিআই (এম-এল) প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি যার কর্মসূচী হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার, হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। আর এর মূল কান্ডারি হন বাংলার কৃষক নেতা চারু মজুমদার। তাঁর তিন বছরের নেতৃত্বে চারু মজুমদার শুধু সিপিআই (এম-এল) কে ভারতের শাসক শ্রেণীর এন্টিডোট হিসাবেই গড়ে তোলেননি, এই দলটিকে তিনি ভারতের শোষিত জাতির মানুষের কাছেও একটি বন্ধু হিসাবে উপস্থাপন করেন। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট বিপ্লবীরাও এর ফলে সাহস পান। কিন্তু চারু মজুমদার পরবর্তী সময়ে নানা রাজ্যে বেড়ে ওঠার স্বার্থে, বিশেষ করে হিন্দি বেল্টে সংগঠন বাড়ানোর তাগিদে, সিপিআই(এম-এল) দলের বিভিন্ন গোষ্ঠী হিন্দির বিরুদ্ধে অবস্থান থেকে সরে আসে ধীরে ধীরে। বাংলা আবার প্রতারিত। এবং মজার বিষয় "মুক্তিযুদ্ধ" চলাকালীন কমিউনিস্টদের হাতে অস্ত্র দেওয়া হয়নি মস্কো আর দিল্লির হুকুমে। কমিউনিস্টরা আওয়ামীদের হয়ে প্রচার করেছে, মেডিক্যাল ক্যাম্প করেছে আর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করেছে, কিন্তু যুদ্ধ করেনি। বাংলাদেশ গঠনের সাথেই সিংহ যে শেখের সাথে ঐক্য করে মস্কোর হুকুমে নিজের দল কে আওয়ামী লীগে বিলীন করে বাকশাল গঠন করেন ও যে ভাবে কমিউনিস্ট পার্টি শেখের সমস্ত অপকর্মের সময় তার জোটসঙ্গী হিসাবে নীরব থাকে তার ফল দলটিকে আজও বাংলাদেশে ভুগতে হচ্ছে। একটি বৃহৎ সংগ্রামী দল থেকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আজ শুধুই বিবৃতি প্রকাশ করার পার্টিতে পরিণত হয়েছে। এই ১৯৭১ সালে যখন চারু মজুমদার ও সিপিআই(এম-এল) কংগ্রেসি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ সহ নানা জায়গায় লড়ছে, তখনই কিন্তু কংগ্রেসীদের সাথে হাত মিলিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির ভদ্রলোক নেতৃত্ব শ্রীমতি গান্ধীকে এশিয়ার মুক্তি সূর্য আখ্যা দেন। ভাঙ্গা বাংলার পাশে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ জন্ম নিল। দুই বাংলাতেই খেতে-পরতে পারা ভদ্রলোকের সন্তানদের মধ্যেই বাম মনোভাব বেশি দেখা যায়, আর তারা বঙ্গীয় আত্মপরিচয় নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদ ভাবলেই তারা শিউরে ওঠে পারিবারিকভাবে লালিত-পালিত ইসলাম বিদ্বেষের কারণে। তারা মনে করে হিন্দি ভারতের রাষ্ট্র ভাষা। তাই মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় থেকে সেলিম সাহেব, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের মতন তাঁরাও যে কোনো সময় হঠাৎ হিন্দি সংলাপ বলে আসর গরম করার চেষ্টা করেন। তাঁরাও বলিউড, ক্রিকেট আর সেনাবাহিনীর সম্মিলিত প্রয়াসে তৈরি ভারত দর্শনে বিশ্বাসী। অথচ তারা জানে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসাম পর্যন্ত বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার ততদিন থাকবে যতদিন বাঙালি মুসলিম থাকবে। কারণ শেষ পর্যন্ত রাস্তায় নেমে বিজেপির সাথে লড়াই করার কাজ এই সম্প্রদায়ই করবে। এই সম্প্রদায়কেই নিজেকে বাঁচানোর জন্যে বাংলা ভাষা ও নিজের অস্তিত্ব কে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু তবুও তারা বাংলার আপামর দলিত, আদিবাসী ও মুসলিমদের থেকে নিজেকে বাঁচিয়েই রাখবে।



মনে রাখা জরুরি শুধু সংস্কৃতি দিয়ে একটা জাতি বাঁচে না তার শ্রী বা সমৃদ্ধি প্রয়োজন। সংস্কৃতি মনের খোরাক কিন্তু পেটের খোরাক না জুটলে মানুষ সাধের সংস্কৃতিও জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য। এগারোতে পালা বদলের পর মানুষের আশা ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে এমন কিছু গুণগত পরিবর্তন আনবেন, যা স্বাধীনতা পরবর্তী কংগ্রেস সরকার বা ৩৪ বছরে বামেরা আনতে পারে নি। কিন্তু পরিবর্তনের পনের বছর পর পশ্চিমবঙ্গবাসী দেখছে, তারা মধ্যম থেকে অধমে পরিণত হয়েছে। আলিমুদ্দিনে বসে অনিল বিশ্বাসেরা তবু মধ্যমেধায় সার-জল দিতেন কিন্তু কালীঘাটের পাল্লায় পড়ে বাঙালির মেধাশূন্য হ‌ওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা- সব গোল্লায় গেছে। কমপক্ষে তিরিশ শতাংশ সরকারি বাংলামাধ্যম হাইস্কুল পড়ুয়া শূন্য হ‌ওয়ার মুখে। মধ্যবিত্তের বাংলামাধ্যম থেকে আস্থা উঠে গেছে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে রাজ্যের শহরাঞ্চলে সব সরকারি হাইস্কুল বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারি স্কুলগুলিতে ছেলেমেয়েদের বছরভর ‘সাব-স্ট্যান্ডার্ড’ শিক্ষা দিয়ে পরীক্ষায় ভুরি ভুরি নম্বর পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার অবস্থাও তদ্রুপ। অধিকাংশ কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। কোনও দিন নিয়োগ হবে‌ বলেও মনে হয় না। বহু কলেজে ক্লাস নেওয়ার পাট উঠে গেছে। রাজ্যের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলি দক্ষতাহীন, জ্ঞানবর্জিত ডিগ্রিধারী শিক্ষিত-উচ্চশিক্ষিত যুবক-যুবতীর সংখ্যাই কেবল বাড়িয়ে চলেছে বছর বছর। এমনকি ভাল পড়ালেখা করেও লাভ নেই। নামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দারুণ নম্বর নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের সাত-আট বছর পরেও বেকার থাকতে হচ্ছে ছেলেমেয়েদের। রাজ্যে এমন একটা দল সরকারে, যার কোনও ‘ভিশন’ নেই, ‘মিশন’ একটাই- চুরি করা। দলটা হরেক কিসিমের ধান্ধাবাজদের একটা বৃহৎ ছাতা, ছত্রিশ দল থেকে যেখানে এসে জুটেছে সবাই। দলের যিনি মাথা, তাঁর নিয়ন্ত্রণহীন আত্মপ্রেম ইতিমধ্যেই ‘মেগালোম্যানিয়ায়’ পরিণত হয়েছে এবং রাজ্যের মানুষকে সেই যাতনা দিবানিশি সহ্য করতে‌ হচ্ছে দাঁতে দাঁত চেপে। বাঙালির দরকার প্রভূত সম্পদ ও সমৃদ্ধি। কিন্তু বাঙালিকে বানানো হচ্ছে ভাতাজীবী। বাঙালি ছেলেমেয়েদের দরকার ভাল রোজগার। অথচ ‘তোলাবাজি’ ছাড়া তাদের সামনে কোন‌ও ‘অপশন’ এখন নাক পর্যন্ত ঋণে ডুবে থাকা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজস্বের সবথেকে নির্ভরযোগ্য উৎসের নাম আবগারি।‌ লোকজন ঠাট্টা করে বলে, বাংলায় সরকার চলে ‘মালের’ পয়সায়। মদের দোকানের লাইসেন্স চাওয়া মাত্রই পাওয়া যায়। বাংলার গা গঞ্জেও তিন-চারটি করে অনুমোদিত বিলিতি মদের দোকান। দারু খেয়ে যুবকদের বেকারত্বের জ্বালা ভোলার ভাল ব্যবস্থা করেছে সরকার। বাঙালির বিধিই বুঝি বাম! বছর পনের আগে কত সাধ করে ঘরে ডেকে এনেছিল ঘাস। আশা একটাই- মধ্যম থেকে অধমে নামার পর উত্তম হ‌ওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোন‌ও রাস্তা নেই। অধমের অনিবার্য পরিণতি পতন। পতনের মুখ থেকে বাঙালি কি ঘুরে দাঁড়াবে না? বাঙালি জাতি নিশ্চয় পতনের দুয়ার থেকে ফিরবে। ফিরবেই। তবে ভুলে গেলে চলবে না বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদকে বাদ দিয়ে আজ বাঙালির কথা বলা ধৃষ্টতা। আবার বঙ্গের নানা শোষিত জাতি—গোর্খা, কামতাপুরি, রাভা, সাঁওতাল, চাকমাদের কথা বাদ দিয়ে শুধু বাঙালি জাতীয়তার কথা বলাও উচ্চবিত্তের বিলাসিতার জাতীয়তাবাদ। আজ নানা রাজ্যে বাঙালির উপর হওয়া উৎপীড়নের বীজ লুকানো আছে এই মাটির তলায়। সেই বীজ একা মুখার্জী রোপন করেননি। বিংশ শতকে বিশেষ করে সুভাষকে বের করে দেওয়ার পর থেকে বাংলার বুকে মূলধারার কংগ্রেসি রাজনীতির লুম্পেনীকরণ ঘটেছে যেটা বিধান রায় সামনে থাকার জন্য সেভাবে স্পষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু বাঙালি ভদ্রলোকের একটা ক্রমান্বয়ে নেগেটিভ ফিল্টারিং ঘটেছে কংগ্রেসি রাজনীতিতে। বাঙালি প্রধানত বিপ্লবী, এবং সে বিপ্লবী চিন্তাধারা বিংশ শতকে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের হাত থেকে ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক বামপন্থার একচেটিয়া হয়ে যাবে। কমিউনিস্ট নেতাদেরও দায় আছে। যদিও সিপিআই(এম-এল) একবার চেষ্টা করেছিল, তবুও ব্যাপক ভাবে ভারতে আগ্রাসী হিন্দির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারাও বর্তমানে রাজনৈতিক বাধ্যকতার কারণে পিছিয়ে গেছে।বাঙালি নিপীড়ণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বাঙালি ভদ্রলোক সম্প্রদায় বিশ্বাসের অযোগ্য তাদের ইসলাম বিদ্বেষের কারণে। বাংলার কমিউনিস্টরাও ভরসার অযোগ্য তাদের দিল্লী প্রীতির কারণে। তবুও বঙ্গীয় জাতির মুসলিমরা ধর্মীয় মৌলবাদ ও দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবেন। তাঁরা উর্দুর বিরুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, হিন্দির বিরুদ্ধেও দেবেন। ভদ্রলোক সম্প্রদায় দেবে না।



বিংশ শতকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক প্রকাশ সঠিকভাবে ঘটে নি। কংগ্রেস সর্বভারতীয় আর সিপিএম আন্তর্জাতিক। আনন্দমার্গ বা আমরা বাঙালি কেউই বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠন নয়। সুনীলরা বাংলাদেশ থেকে ভাষাবাদ আমদানি করেছিলেন, সেটার উত্তরাধিকার বহন করে আজকে তৃণমূল সমর্থিত একাধিক ভাষাবাদী সংগঠন। বলা দরকার নব্বই দশকের শেষেও বিজেপির একটা ছোটখাট উত্থান ঘটেছিল, তপন শিকদার দমদমে এবং জলু মুখার্জি কৃষ্ণনগর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কাজেই সিপিএমের জন্য ভাষাবাদ কেবল আমরা বাঙালি নয়, ওই বিজেপি আটকাতেও স্ট্র্যাটেজিক প্রয়োজনে এসে থাকবে। এবারও আমরা দেখেছি যে মমতা ব্যানার্জি ভাষাবাদী কয়েকটি সংগঠনকে দিয়ে বিজেপির বিরোধিতা করিয়েছেন। তবে তাতে নির্বাচনে কতটা লাভ হয়েছে, আর গ্রেটার বাংলাদেশের আশঙ্কা কতটা বেড়েছে সাধারণ হিন্দু ভোটারের কাছে, সেটা আলোচনাসাপেক্ষ। যে ভোটার বিজেপির দিকে চলে গেছে, সে তৃণমূলের মদতে চলা এই সব সংগঠনের ভাষাবাদ দেখে আকৃষ্ট হয়নি? নব্বই দশকে সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, মূলধারার একাডেমিয়া ও মিডিয়া বাংলাদেশে হিন্দুর এথনিক ক্লিনজিং-সংক্রান্ত তথ্য সবটাই সেন্সর করত। আজকের বাংলায় দাঁড়িয়ে প্রতিটি বাঙালিকে বুঝতে হবে কংগ্রেস বাঙালির প্রতিষ্ঠান নয়। যার বীজ বপন শুরু হয়েছিল রাধাকান্ত দেব আর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে এককালে, চরমপন্থী আর নরমপন্থী, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি আর চিত্তরঞ্জন দাশ পরস্পর লড়াই করে সেদিন গান্ধীর হাতে ভারতকে তুলে না দিলে আজ কংগ্রেস নামধারী আদ্যোপান্ত লুম্পেন দল তৃণমূল আর আদ্যোপান্ত অবাঙালি দল বিজেপির মল্লযুদ্ধের এই অলীক কুনাট্য রঙ্গে বাঙালির অস্তিত্বকে ডোডোপাখির মত এত বিপন্ন দেখাত না। এই পরিস্থিতে দাঁড়িয়ে মেকি বাম-হিন্দুত্ব চক্রান্ত ব্যর্থ করা একটি গুরু দায়িত্ব। বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সাম্য আন্দোলন গড়ে তোলাও আজ জরুরী। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন ইতিহাসের এই বিশ্বাসঘাতকতার মুখোমুখি হওয়া এবং সত্যিকারের গণমুখী রাজনীতি গড়ে তোলা।



বহুবছর পর তোমাকে ছাতামাথা কি যে লিখলাম পড়তে বিরক্ত লাগলে পড়ার প্রযোজন নেই, আসলে এইসব কথা আজকাল আর প্রকাশ্যে বলা যায় না, বললেই কিছু অন্ধ মানুষ তেড়ে আসে নয়ত দলকানার মতন কথা জুড়ে তাই এইসব আজকাল বলতেই চাইনা। তুমি বুঝবে বলেই এত বড় চিঠি তোমাকে লিখে ফেললাম। নিরন্তর ভালো থেকো। এখানে এখন ভীষণ গরমের পরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। ভেসে যাচ্ছে চরাচর, কাগজের নৌকা বানিয়ে তোমার কাছে পৌঁছে যাওয়া যেত যদি এইরাতে বেশ হতো বলো…





হারিয়ে যাওয়া সময়ের আনন্দটুকু নিয়ে

বাসু

২৬ মে, ২০২৬