Next
Previous
0

সম্পাদকীয়

Posted in




































'এমন ঘটনা তো কতই ঘটে!' একটি বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে এমনই এক মন্তব্য করেছিলেন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা ঘটলো, যাকে আলাদাভাবে মনে না রেখে উপায় নেই।

উত্তরাখণ্ডের একটি ছোট্ট জনপদ কোটদ্বার। সেখানেই এক বাজারে একটি স্কুল ইউনিফর্মের দোকান চালান এক মুসলমান ব্যবসায়ী। যার নাম 'বাবা স্কুল ড্রেস এন্ড ম্যাচিং সেন্টার।' কাহিনির এই পর্যন্ত নিস্তরঙ্গ। সহসা একটি হিন্দুবাদী সংগঠনের কিছু সদস্যের মনে হল 'বাবা' শব্দটির উপর তাঁদের পুরুষানুক্রমিক অধিকার। তাঁরা ফতোয়া জারি করলেন, হয় এই শব্দটি প্রত্যাহার করতে হবে নয়তো ব্যবসাটি বন্ধ করে দিতে হবে। এমতাবস্থায় রুখে দাঁড়ালেন স্থানীয় এক তরুণ। তাঁর পরিচয় জানতে চাওয়া হলে বললেন, তাঁর নাম মহম্মদ দীপক। মহম্মদ দীপক? এমনও নাম হয় নাকি? শেষ অবধি যখন জানা গেল, তাঁর প্রকৃত নাম দীপক কুমার, ক্ষোভে ফেটে পড়ল আক্রমণকারী জনতা। কিন্তু এই মানুষটিকে টলানো গেল না। যে জিম থেকে হত তাঁর রুটি-রুজির সংস্থান, সেই জিমটিও হল আক্রান্ত। কিন্তু বন্ধ হল না এক বৃদ্ধের সারা জীবন ধরে তিলতিল করে গড়ে তোলা এক বিপণি।

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে জন লেনন একটি গান লিখেছিলেন। বলেছিলেন, কল্পনা কর...।'

স্বপ্নের পৃথিবীকে নিয়ে লেখা অমর সেই কথাগুলি যেন ফিরে এল আজকের 'হিংসায় উন্মত্ত এই পৃথ্বী'তে - অংশত ধর্মান্ধ এই ভারতবর্ষে।

রাত পোহালেই 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'। এমন সন্ধিক্ষণে আমাদের প্রত্যেকের মানবিক মূল্যবোধগুলি জাগ্রত রাখা একান্ত জরুরি বলে মনে হয়।

সুস্থ থাকুন। দায়বদ্ধ থাকুন।

শুভেচ্ছা অফুরান।
0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়

Posted in




















১ ভূমিকা

যারা দেশের অর্থব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ধ্বসিয়ে দেবার চেষ্টা করে তাদের দেশদ্রোহী বলবেন কি বলবেন না ভেবে নিন। ধরুণ, যারা দেশের সাধারণ মানুষের কষ্টসঞ্চিত টাকাপয়সা সরকারী ব্যাংককে বোকা বানিয়ে বা সোজাসুজি ঠকিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গিয়ে মৌজমস্তি করছে, বিলাসে ডুবে আছে, খেলার মাঠে দুই পরীকে বগলদাবা করে হাজির হয়ে আমাদের দেশের অর্থব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে তাদের কী ক্রিমিনাল মনে করবেন না? তাদের মনে মনে শাপ দেবেন না—‘হেঁটোয় কণ্টক দাও, উপরে কণ্টক” !

তবে আগে তো তার টিকির নাগাল পান, তাদের হাতকড়ি পড়িয়ে এদেশে নিয়ে আসুন, যেমনটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বে-আইনি ভাবে আমেরিকায় ঢোকা ভারতীয় “অনুপ্রবেশকারী”দের এদেশে ফেরত পাঠিয়ে ছিলেন। কিন্তু তারা যদি অনুতপ্ত হয়, ক্ষমা চায়? তখন কী করবেন? অনুতাপে মানুষ শুদ্ধ হয়, পবিত্র হয়।

শ্যামার জন্যে বজ্রসেন ক্ষমা চেয়েছিল। মানুষশিকারী অঙ্গুলিমালকে ভগবান বুদ্ধ ক্ষমা করেছিলেন। আর এরা তো খুনটুন করেনি, কেবল আর্থিক ফ্রড করেছিল। আমাদের ট্র্যাডিশন আমাদের সংস্কৃতি কী বলে?

—“-- ভালবাসো, অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো” ।

এমনই একটি ক্ষমা চাওয়া এবং পাওয়ার কেস হল সন্দেসরা ভাইদের। নীতিন ও চেতন সন্দেসরা হলেন ‘স্টারলিং বায়োটেক লোন ফ্রডের নায়ক। ওদের পুরো পরিবার মিলেমিশে আমাদের দেশের কিছু ব্যাংককে ঠকিয়েছে। কত টাকা? ১৬০০০ কোটি!

২ পলাতক সন্দেসরা পরিবারঃ এককালীন কিছু টাকা দিয়ে সমঝোতা ও সুপ্রীম কোর্ট

গত ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে সুপ্রীম কোর্টের একটি রায়ে ব্যাংক ফ্রড করে বিদেশে পলাতক দুই ভাই, নীতিন ও চেতন সন্দেসরা বড় রকম সুবিধে পেয়েছে। এককালীন কিছু টাকা জমা করার কড়ারে ওদের ক্ষমা করে সমস্ত এফ আই আর তুলে নেয়ার নির্দেশ জারি করেছে মহামান্য আদালত। সরকার পক্ষও সহমত।

ওরা কোথায়? ২০১৭ সালে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তারপর নাইজেরিয়াতে গেড়ে বসেছে। তদন্ত কে করেছে? ভারত সরকারের সিবি আই ও ইডি। সরকার মনে করে এগুলো ক্রিমিনাল কৃত্য। তাই অনেকগুলো এফ আই আর করা হয়েছিল। ওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ -- মানি লন্ডারিং (বে-আইনি ভাবে বিদেশে টাকা পাচার), বিদেশে ‘শেল কোম্পানি’ (নকল কোম্পানি) খোলা, বেনামি ফার্মের মাধ্যমে জালি লেনদেন দেখিয়ে টাকা ব্যাঙ্কের টাকার অপব্যয় করা। সেপ্টেম্বর ২০২০ নাগাদ ভারত সরকার ওদের আইনি ব্যবস্থার সংগে সহযোগিতা না করার অপরাধে “ পলাতক আর্থিক অপরাধী” (Fugitive Economic Offender) ঘোষণা করে।

লক্ষণীয় যে ২০১৮ সালের Fugitive Economic Offender আইন অনুসারে -- যাদের অমন দাগিয়ে দেয়া হয়, তারা বা তাদের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কোম্পানি কোন সিভিল আদালত বা ট্রাইব্যুনালে কোন দেওয়ানি মামলা করতে পারবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে হলে আদালতে আইনের সাহায্যে ডিফেন্ড করতে পারবে না। সন্দেসরা ভাইদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো দেওয়ানি এবং ফৌজদারি মামলা করা হয়। যেমন, PMLA, Fugitive Economic Offender Act, SFIO, Black Money Act, Income Tax আইনের বিভিন্ন ধারায়।

কিন্তু তারা অনেকটা বকায়া ঋণ শোধ করার প্রতিশ্রুতি দিলে তাদের সুপ্রীম কোর্ট নির্দিষ্ট শর্তে ক্ষমা করার এবং সব মামলা (দেওয়ানি এবং ফৌজদারি সি বি আইকোর্ট বা ইডি) তুলে নেয়ার আদেশ জারি করে।

গত ১৯ নিভেম্বর, ২০২৫ এর রায়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলে—যদি অপরাধীরা এক থোকে ৫১০০ কোটি টাকা জমা করে তবেই; নচেৎ নয়।

মাননীয় আদালতের যুক্তিঃ ওরা দুই দশক আগে ব্যাংকগুলোর থেকে লোন নিয়ে মেরে দিয়েছিল ৫৩৮৩ কোটি টাকা। যা ইডির মতে সুদে আসলে দাঁড়িয়েছে ১৬০০০ কোটি টাকা। ইডি এরমধ্যে ওদের ১৪৫২১ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। (সমঝোতা হয়ে ওদের বিরুদ্ধে কেস উঠে গেলে এই সম্পত্তি ওদের ফেরত করে দেয়া হবে)।

ইতিমধ্যে সন্দেসরা ভাইয়েরা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে দরদাম করে চুক্তি করেছে যে ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে এককালীন ৩৮২৫ কোটি টাকা এবং বিদেশি জামিন থাকা কোম্পানিগুলোকে ২৯৩৫ কোটি টাকা দিয়ে One Time Settlement করে ঝামেলা চুকিয়ে দেবে। মানে, ১৬০০০ কোটি টাকা লোন ফ্রডের ফয়সালা হবে মোট ৬৭৬১ কোটি টাকা দিয়ে। অর্থাৎ ব্যাড লোন মাফ করা হোল ৯২৩৯ কোটি (=১৬০০০-৬৭৬১) টাকায়। তাহলে অত টাকা ডুবল কার? সরকারের, মানে নাগরিকদের।

ঠিক আছে। তবে ওই ৬৭৬১ কোটি টাকার মধ্যে কত টাকা আদায় হয়েছে? আদালতের হিসেবে ৩৫০৭.৬৩ কোটি টাকা। এছাড়া ওদের দেউলিয়া ঘোষণা করে ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল এর আদালতি পদক্ষেপে স্টারলিং বায়োটেক, স্টারলিং এস ই জেড এবং পিএম টি মেশিন কোম্পানিগুলো থেকে মোট আদায় হয়েছে ১১৯২ কোটি টাকা। অতএব, আদালতের হিসেবে সমঝোতা রাশির বকায়া রয়েছে ২০৬১.৩৭ কোটি টাকা। সুপ্রীম কোর্টে সরকারের সলিসিটর জেনারেল বলেন -সব মিলিয়ে অন্ততঃ ৫১০০ কোটি টাকা জমা করলে তবে ঠিক হবে। (এতে আনুষঙ্গিক খরচা যোগ করা হয়ে থাকে)।

সরকার মনে করে সন্দেসরা পরিবার বহু বছর ধরে নাইজেরিয়া এবং আলবেনিয়ায় বসবাস করছে। ওদের বিষয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার (এক্সট্রাডিশন) আবেদন লটকে রয়েছে। ওদের বিদেশে গ্রেফতারের জন্যে জারি রেড কর্নার নোটিসও ঠান্ডা হয়ে যায় নি।

তবে সুপ্রীম কোর্ট তার রায়ে বলেছে দুটো কথাঃ

এক, অনাদায়ী পাবলিক মানি’র একটা বড় অংশ উদ্ধার হয়ে গেলে সরকারের কেস চালানোর কোন মানে হয় না। তাই সমস্ত এফ আই আর বাতিল করা হোক। সরকার আপত্তি করে নি।

দুই, তবে এই রায় একটি বিশেষ কেসে ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য হবে। একে উদ্ধৃত করে পরে কেউ অনুরূপ সুবিধে পাবে না।

কিন্তু , একজন অভিজ্ঞ সিনিয়র ইডি অফিসার বলেছেন যে সুপ্রীম কোর্ট বলেছেন বটে, কিন্তু আর যারা পালিয়েছে তাদের উকিলেরা ঠিক রাস্তা বের করে নেবে।


৩ অন্য পলাতকেরাঃ বর্তমান হাল-হকিকত

চারজন রাঘব বোয়ালের কথা বলা যাক।

৩.১ বিজয় মালিয়া

স্টেট ব্যাংক সমেত ১৭টি ব্যাংকের কনসর্টিয়াম বিজয় মালিয়ার বিরুদ্ধে কিং ফিশার এয়ারলাইনসের নামে ঠকিয়ে লোন নেয়ার এবং মানি লণ্ডারিং করার অভিযোগ করল । সি বি আই ও ইডি তদন্ত করে কেস দিল। মালিয়া ২ মার্চ, ২০১৬ সালে ইউ কে তে পালিয়ে গেল। ডেট রিকভারি ট্রাইব্যুনালের হিসেবে ২০১৩ সালে মূল ফ্রড লোন ছিল ৬০৯৭ কোটি টাকা। সুদে আসলে এখন সেটা হয়েছে ১৭৭৮১ কোটি টাকা।

আদায় হয়েছে কত? বিত্ত মন্ত্রকে ২০২৫ এর বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী ইডি ১৪০০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংকদের হস্তান্তর করেছে।

মালিয়াকে ভারত সরকার পলাতক আর্থিক অপরাধী” (Fugitive Economic Offender) ঘোষণা করেছে। যুক্তরাজ্যের একটি আদালত ওকে ভারতে বন্দী হিসেবে ফেরত পাঠানোর আদেশ দিয়েছে। তবে ব্রিটিশ সরকারের অন্তিম কদমের অপেক্ষায় সবাই। ততদিন মালিয়া ওদেশেই থাকবে।




৩.২ নীরব মোদীঃ

পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৩০০০ কোটি টাকা জালিয়াতির মুখ্য অভিযুক্ত। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হল --ওই ব্যাংকের ব্র্যাডি হাউস শাখা মুম্বাই থেকে জাল লেটার অফ আন্ডারটেকিং ইস্যু করানো, এবং সিবিআইয়ের কথায়—ব্যাংক আধিকারিকদের সঙ্গে যোগসাজশে বিদেশে টাকা পাচার ইত্যাদি।

ব্যাংককে কত টাকা ঠকানো হয়েছে? ৬৪৯৮ কোটি টাকা।

টাকা আদায়ঃ ইডি নীরব মোদীর জুয়েলারি এবং ফার্ম হাউস মিলিয়ে মোট ২৬২৬ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংককে ১০৫২ কোটি টাকার সম্পত্তির দখল দিয়েছে।

বর্তমান অবস্থা

নীরব মোদীকে পলাতক আর্থিক অপরাধী ঘোষণা করে যুক্তরাজ্যে ২০১৯ সালে গ্রেফতার করানো হয়েছিল। ও যাতে ফিরে আসতে না হয় তার জন্যে বিলেতের আদালতে আইনি লড়াই করছে। তবে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ‘প্রত্যর্পণ চুক্তি’ (extradition pact) আছে। তাই ভারত ওকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্যে আইনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

৩.৩ মেহুল চোকসি

ইনি উপরোক্ত পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক ফ্রড কেসে নীরব মোদীর সংগে সহ-অভিযুক্ত। ইনিই মাস্টারমাইন্ড। এঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ-- শেল ফার্মের মাধ্যমে জালিয়াতির সাপ্লাই চেন তৈরি করার পরিকল্পনা, বিদেশে টাকা পাচার এবং নকল হীরে বিক্রি করা।

কত টাকা আদায় করতে হবে?

এঁর সমস্ত ফার্ম মিলিয়ে ব্যাংককে দেয় টাকা ৬০৯৭ কোটি।

আদায় হয়েছেঃ

ইডি চোকসির প্রায় ২৫৬৫ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। বিত্ত মন্ত্রকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এর পাওনাদারদের ৩১০ কোটি টাকার সম্পত্তি দেয়া হয়েছে। অন্য সম্পত্তিগুলো ব্যাংককে দেয়ার আইনি কাজ এগিয়ে চলেছে।

বর্তমানেঃ ইনি ২০১৮ সালে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। আন্টিগুয়া এবং বারবুডা নামের দুটো ক্যারিবিয়ান দ্বীপের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছেন। এঁকে ডোমিনিকায় মে ২০২১ সালে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু আইনের ফাঁকে পালিয়ে যায়। এইবছরের গোড়ায় বেলজিয়াম পুলিশ গ্রেফতার করে ওকে জেলে পোরে। বেলজিয়াম কোর্ট ভারতের প্রত্যর্পণের আবেদন মঞ্জুর করে। কিন্তু ও এখন ওখানকার সুপ্রীম কোর্টে আপিল করেছে।

৩.৪ যতীন মেহতা

রাঘববোয়াল ঠগ। ভারতে হীরের ব্যবসায়ে সবচেয়ে বড় ব্যাংক জালিয়াতির নায়ক। সার্কুলার ট্রেডিং (এর টুপি ওর মাথায়) এবং বুলিয়ন সিকিউরিটির ভিত্তিতে পাওয়া ব্যাংক লোনের পয়সা নয়ছয় করার দায়ে অভিযুক্ত। সবটা এখনও টের পাওয়া যায় নি। ইডি, সিবিআই এবং ব্যাংকের তদন্ত চলছে। ওর দুটো ফার্ম—দ্য উইনসাম ডায়মন্ডস এবং ফরএভার প্রেশাস জুয়েলারি-- ২০১৩ সালে ব্যাংককে ৬৮০০ কোটি পাওনা টাকা দেয় নি যা এখন ১০০০০ কোটি টাকার অংকও ছাড়িয়ে গেছে।

আদায়

ইডি ১০০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। যুক্তরাজ্যের আদালতে ব্যাংক মাত্র ১৫৭ কোটি টাকা উদ্ধার করতে পেরেছে।

বর্তমান অবস্থাঃ

২০১৩ সালে মেহতা ভারত থেকে পালিয়ে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সেন্ট কিটস্‌ অ্যান্ড নেভিস রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। ভারতের বিভিন্ন এজেন্সি ওকে ফেরত আনার অনুরোধ করে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো ওকে উইলফুল ডিফল্টার ঘোষণা করেছে। এখনও তদন্ত চলছে।

৪ যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু!

সুপ্রীম কোর্টের পরিবেশ আইন নিয়ে আরেকটি সাম্প্রতিক রায়ঃ পোস্ট ফ্যাক্টো ক্লিয়ারেন্স!

কারও মাথা কেটে ফের জোড়া লাগিয়ে দেয়া যায়? যায় না। যার মাথা কাটা গেছে তার আত্মীয়-পরিজনকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিলে হারিয়ে যাওয়া মানুষটার অভাব পূরণ হয়? হয় না। বনভূমি এবং পরিবেশ সুরক্ষা আইন ভেঙে বিনা অনুমতিতে ঘন অরণ্য কেটে সাফ করে কারখানা বানিয়ে তারপর পেনাল্টি দিলে কি রাতারাতি বনভূমি গজিয়ে ওঠে? পরিবেশের যা ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ হয়?

তাহলে সুপ্রীম কোর্ট গত ১৮ নভেম্বর তারিখে সুপ্রীম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ এটা কী রায় দিলেন? বিশেষ করে যখন দিল্লির পরিবেশ দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে?

মনে রাখা দরকার, ইন্ডাস্ট্রি বা কোন বাণিজ্যিক প্রোজেক্ট শুরু করতে হলে যে environmental clearance নিতে হয় সেটা কোন কাগুজে নিয়মপালন নয়—বরং এটি নাগরিকদের সুস্থ জীবনের জন্য একটি সাংবিধানিক সুরক্ষা। আর্টিকল ২১ আমাদের যে জীবনের অধিকার দেয়, তার আবশ্যিক অঙ্গ হল বিশুদ্ধ বায়ু, বিশুদ্ধ হাওয়া এবং বিশুদ্ধ পরিবেশ।

বনশক্তি বনাম ভারত সরকার কেস

পরিবেশ মন্ত্রক বিগত ২০১৭ সালে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে এবং পরে ২০২১ সালে আর একটি মেমোরান্ডাম জারি করে। সেগুলোর মাধ্যমে কোন প্রোজেক্টের পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাবের মূল্যায়নের (ETA Rules) নিয়মগুলোকে ঢিলে করে দেয়। তাতে সোজাসুজি “ডেভেলপার” দের প্রোজেক্ট শুরু করার পরে পরিবেশ সম্বন্ধিত গ্রীন ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট পাওয়ার রাস্তা খুলে দেয়া হয়।

ওই আদেশের বিরুদ্ধে মূম্বাইয়ের এনজিও বনশক্তি সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করে। এই কেসে সুপ্রীম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি গবইয়ের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বেঞ্চ ১৬ মে তারিখে রায় দিয়ে বলল—পোস্ট ফাক্টো ক্লিয়ারেন্স বা পরিবেশ আইন ভেঙে তারপর সেটার অনুমতি পাওয়া – পুরোপুরি বে-আইনি।

তারপর কনফেডারেশন অফ রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার্স অফ ইন্ডিয়া রিভিউ চেয়ে আবেদন করল। ওদের চিন্তা, এই রায়ের রিভিউ না হলে ২০০০০ কোটি টাকার পাবলিক প্রোজেক্ট ভেঙে দিতে হবে। তাই তিন সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চকে দায়িত্ব দেয়া হল।

কিন্তু সেই বেঞ্চ গত ১৮ নভেম্বরে ২-১ বিভক্ত রায়ে আগের রায় পুরোপুরি পালটে দিয়ে বিনা অনুমতি প্রোজেক্ট শুরু করে পরে গ্রীন ক্লিয়ারেন্স প্রমাণপত্র নেয়াকে বৈধ করে দিল!

জাস্টিস উজ্জ্বল ভুঁইয়া অসহমতি জাহির করে কারণ দেখালেনঃ

সুপ্রীম কোর্ট নিয়মিত পরিবেশ রক্ষার প্রাথমিক নীতিগুলোর পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে কমন কজ বনাম ভারত সরকার কেসে বলেছে—পরিবেশ রক্ষার সার্টিফিকেট কোন যান্ত্রিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্যে নয়। আর পোস্ট ফ্যাক্টো ক্লিয়ারেন্স পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করবে।

তিন বছর পরে অ্যালেম্বিক ফার্মাসিউটিক্যাল কেসেও জোর দিয়ে বলেছে -- পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাবের মূল্যায়নের (ETA Rules) নিয়মগুলোকে কড়াভাবে পালন করা উচিত।

বনভূমি এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্বের কথা তৎকালীন প্রধান বিচারপতি গবই বলেছিলেন।

দিল্লি এখন বিশ্বের ১০০টি দূষিত পরিবেশযুক্ত শহরের তালিকায় সবার উপরে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি জাস্টিস সূর্যকান্ত সেদিন দিল্লিতে প্রাতোভ্রমণে গিয়ে দূষিত আবহাওয়ায় অসুস্থ হয়েছেন।


আমরা কি আর একবার ওই রায় পুনর্বিবেচনার আশা করতে পারি?


 *ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২ ডিসেম্বর, ২০২৫
0

প্রবন্ধ - ইন্দ্রনীল মজুমদার

Posted in








বিজ্ঞানের জন্য শহীদ হতে হয়েছে একজন বিজ্ঞান মনস্ক ব্যক্তিকে। আমরা দেশের জন্য শহীদ হতে শুনেছি। পরাধীন আমলে বিপ্লবীদের শহীদ হতে শুনেছি। কিন্তু, বিজ্ঞানের জন্য শহীদ! বিষয়টি বেশ আশ্চর্যজনক, তাই না? হ্যাঁ, এরকমটাই ঘটেছিল আজ থেকে চারশো বছর আগে ইউরোপে। যিনি শহীদ হয়েছিলেন তিনি কোনও রাজনৈতিক বিপ্লবী নন বরং তিনি বিজ্ঞান জগতে এক আলোড়ণ সৃষ্টি করেছিলেন বা বিপ্লব এনেছিলেন। তাই, তাঁকে বিজ্ঞানের এক 'শহীদ বিপ্লবী' বলাই যায়। তাঁর নাম জিওর্দানো ব্রুনো।


জিওর্দানো ব্রুনো ছিলেন একজন ইতালীয় বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। আজ থেকে চারশো পাঁচশো বছর আগে ইউরোপীয়রা বিশেষ করে গোঁড়া খ্রিস্টান ধার্মিকেরা মনে করত যে পৃথিবী স্থির, সূর্য, চাঁদ সহ বিভিন্ন নক্ষত্র, গ্রহ ও উপগ্রহরা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। মোটের ওপর বলা যায় যে, মহাবিশ্ব সম্পর্কে চার্চ বা গির্জার ধারণা ছিল যে মহাবিশ্ব পৃথিবীকেন্দ্রীক (Geocentric)। তৎকালীন ক্যাথলিক চার্চ অ্যারিস্টটল ও টলেমির 'পৃথিবীকেন্দ্রিক' তত্ত্বকে বাইবেলের আক্ষরিক ব্যাখ্যার সাথে মিলিয়ে এক অকাট্য ধর্মীয় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল—যেহেতু মানুষ ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, তাই পৃথিবীকেই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থির থাকতে হবে। ব্রুনো যখন এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করলেন, চার্চ তাকে কেবল বৈজ্ঞানিক ভুল নয়, বরং সরাসরি 'ধর্মদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য করল। জিওর্দানো ব্রুনো এই শিক্ষার বিরোধিতা করে নিকোলাস কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক (Heliocentric) ধারণাকে সমর্থন করেছিলেন। অর্থাৎ, তিনি মনে করতেন যে সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী সহ নানান গ্রহগণ ও তাদের উগ্রহগণ আবর্তিত হচ্ছে। কোপারনিকাস ও ব্রুনোর ধারণাটি পরবর্তীকালে বিজ্ঞানের জগতে স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু, তৎকালীন সময়ে ইউরোপে চার্চের বিরুদ্ধে যাওয়া এক বিশাল অপরাধ এমনকি মৃত্যুদণ্ড ছিল। আবার, ব্রুনো বিশ্বাস করতেন যে, মহাবিশ্ব অসীম এবং সেখানে আমাদের পৃথিবীর মতো অসংখ্য বসবাসযোগ্য জগত বা গ্রহ রয়েছে। এই ধারণাটিও তৎকালীন চার্চের বিরোধী ছিল। চার্চ বা বলা ভালো ধর্মীয় গোঁড়ামি তাঁকে কি আর ছেড়ে কথা বলবে? ইনকুইজিশন (ক্যাথলিক চার্চের দ্বারা পরিচালিত একটি বিশেষ বিচার ব্যবস্থা বা তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান)-এর সামনে তাঁকে এনে তাঁর বিশ্বাস প্রত্যাহার করতে বলা হয়। কিন্তু , তিনি তাঁর বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে অনড় ছিলেন আর তাই তিনি তাঁর বিশ্বাস প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করেন। আর এর ফলে, চার্চের দ্বারা তাঁকে নানাভাবে নির্যাতন করা হয় এবং প্রকাশ্যে রাস্তায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এতটাই নৃশংস ও হিংস্র ছিল মধ্যযুগের ইউরোপীয় ধর্মীয় মৌলবাদ।

শৈশব ও প্রারম্ভিক জীবন


ফিলিপ্পো ব্রুনোর জন্ম হয়েছিল ১৫৪৮ সালে ইতালির নোলা শহরে। তাঁর পিতার নাম জিওভান্নি ব্রুনো যিনি ছিলেন একজন সৈনিক আর মাতার নাম ফ্রাউলিসা সাভোলিনো। ১৫৬১ সালে তিনি সেন্ট ডোমিনিকোর মনাস্ট্রি বা মঠ বা আশ্রমের স্কুলে ভর্তি হন। এই আশ্রমটি পরিচিত ছিল তার বিখ্যাত সদস্য থমাস অ্যাকুইনাসের জন্য। জিওর্দানো ব্রুনো ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। যদিও দার্শনিক হিসেবে তিনি ছিলেন কিছুটা ব্যতিক্রমী স্বভাবের কেননা, তাঁর মতাদর্শ প্রায়ই ক্যাথলিক চার্চের শিক্ষার সঙ্গে খাপ খেত না। তা সত্ত্বেও, তিনি ১৫৬৫ সালে নেপলসের সান ডোমিনিকো মাজিওরে কনভেন্টে প্রবেশ করেন এবং সেখানে ‘জিওর্দানো’ নাম গ্রহণ করেন। তাঁর নাম হয় ‘জিওর্দানো ব্রুনো’। তাঁর স্পষ্টবাদী ও ধর্মবিরোধী (heretical) মতামত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৫৭২ সালে তাঁকে ডোমিনিকান অর্ডারের যাজক বা পুরোহিত হিসেবে অভিষিক্ত করা হয় এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নেপলসে পাঠানো হয়।


নেপলসে থাকাকালীন তিনি প্রকাশ্যে বেশ কিছু ধর্মবিরোধী মত প্রকাশ্যে আলোচনা বা প্রকাশ করতে থাকেন। এই যেমন—এরিয়ান মতবাদ বা এরিয়ান ধর্মদ্রোহিতা (যেখানে বলা হয়েছিল খ্রিস্ট ঈশ্বরীয় নন)। এর ফলে তিনি চার্চের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন আর তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহের অভিযোগে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৫৭৬ সালে তিনি রোমে পালিয়ে যান। পরে তাঁর কিছু নিষিদ্ধ লেখা আবিষ্কৃত হলে তাঁকে আবারও পালিয়ে যেতে হয়। ঐ বছরেই তিনি ডোমিনিকান ধর্মসম্প্রদায় ত্যাগ করেন আর ইউরোপজুড়ে একজন ভ্রাম্যমাণ দার্শনিক হিসেবে ঘুরে বেড়িয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে থাকেন। স্মৃতিশক্তি উন্নতি করার জন্য তিনি ডোমিনিকান কৌশল শেখাতেন। আর এই শেখানোর জন্য তিনি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যে তাঁকে ফ্রান্সের রাজা তৃতীয় হেনরি এবং ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ প্রথমের নজরে নিয়ে আসে। নেমোনিক্সসহ স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করার জন্য তাঁর পদ্ধতিগুলো তিনি তাঁর বই 'দ্য আর্ট অফ মেমরি' বইতে বর্ণিত করে গিয়েছেন এবং আজও এই পদ্ধতিগুলো ব্যবহৃত হয়। ব্রুনো মনে করতেন মহাবিশ্বের গঠন এবং মানুষের মনের গঠন একই সূত্রে গাঁথা। তাঁর 'দ্য আর্ট অফ মেমরি' আজও গবেষকদের কাছে বিস্ময়।

চার্চের সঙ্গে সংঘাত


১৫৮৩ সালে ব্রুনো ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে যান এবং তারপরে অক্সফোর্ডে যান বক্তৃতা দিতে। অক্সফোর্ডে তিনি নিকোলাস কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর এই ধারণাগুলো যেহেতু তৎকালীন পৃথিবীকেন্দ্রীক ইউরোপীয় চার্চগুলোর বিরোধী ছিল তাই তাঁর এই বক্তৃতার ফলে তাঁকে শত্রুতাপূর্ণ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়। ফলে তিনি লন্ডনে ফিরে যান এবং রানি প্রথম এলিজাবেথের দরবারের প্রধান ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে পরিচিত হন।


লন্ডনে থাকাকালীন তিনি বেশ কয়েকটি ব্যঙ্গাত্মক রচনা লেখেন এবং ১৫৮৪ সালে 'Dell Infinito, universo e mondi (ডেল ইনফিনিতো, ইউনিভার্সো ই মন্ডি)' অর্থাৎ 'অসীমতা, মহাবিশ্ব এবং জগৎ সম্পর্কে' নামক একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইয়ে তিনি অ্যারিস্টটলের মহাবিশ্ব-দর্শনের সমালোচনা করেন। মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদ (Averroës)-এর কাজের ওপর ভিত্তি করে তিনি বলেন, ধর্ম হল "অজ্ঞ মানুষকে শিক্ষা ও শাসনের একটি উপায়, আর দর্শন হল সেসব নির্বাচিত মানুষের শাস্ত্র, যারা নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে ও অন্যদের শাসন করতে সক্ষম।" এই বিষয়টি ব্রুনোর চিন্তার অসাম্প্রদায়িক এবং বৈশ্বিক রূপটি প্রকাশ করে। তিনি কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণাকে সমর্থন করেন এবং আরও যুক্তি দেন যে “মহাবিশ্ব অসীম, এতে অসংখ্য জগত রয়েছে এবং সেগুলো সকলই বুদ্ধিমান প্রাণীতে পরিপূর্ণ।”


১৫৯১ সাল পর্যন্ত তিনি ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে ভ্রমণ, লেখালেখি এবং বক্তৃতা চালিয়ে যান। এই সময়ে তিনি স্থানীয় পণ্ডিতদের যেমন কৌতূহলী করে তুলেছিলেন তেমনি ক্ষুব্ধও করে তুলেছিলেন। হেল্মস্টেডে তাঁকে ধর্মচ্যুত (Excommunicated) করা হয় এবং ফ্রাঙ্কফুর্ট আম মেইন ছেড়ে যেতে বলা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি কার্মেলাইট মঠে আশ্রয় নেন, যেখানে মঠাধ্যক্ষ তাঁকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন যিনি “প্রধানত লেখালেখি এবং নতুনত্বের বৃথা ও অলীক কল্পনায় নিমগ্ন থাকেন।"

শেষ জীবন ও ভয়ানক মৃত্যু


১৫৯১ সালের আগস্টে জিওর্দানো ব্রুনোকে ইতালিতে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং ১৫৯২ সালে এক অসন্তুষ্ট ছাত্র তাঁকে ইনকুইজিশনের কাছে অভিযুক্ত করে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ব্রুনোকে সে বছরের ২২শে মে তারিখে গ্রেপ্তার করে অবিলম্বে ধর্মদ্রোহের অভিযোগে ইনকুইজিশনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর পরবর্তী আট বছর তাঁর কাছে নরকতূল্য ছিল। তিনি ভ্যাটিকানের কাছে কাস্তেল সান্ত’আঞ্জেলো দুর্গে শিকলবদ্ধ অবস্থায় কাটিয়েছিলেন। তাঁকে নিয়মিত নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হত। তবুও তিনি নিজের বিশ্বাসে অটল থাকতেন এবং ক্যাথলিক চার্চের বিচারক, রোমান ইনকুইজিশনের ইনকুইজিটর জেসুইট কার্ডিনাল রবার্ট বেলারমাইনের কাছে বলেন, “আমি আমার মত প্রত্যাহার করা উচিত বলে মনে করি না এবং করবও না।” ১৬০০ সালের ২০শে জানুয়ারি পোপ অষ্টম ক্লেমেন্ট ব্রুনোকে একজন ধর্মদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি করেন। মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পরেও তাঁর মনোভাব বদলায়নি; তিনি অভিযোক্তাদের উদ্দেশে বলেন, “আমার দণ্ড ঘোষণা করতে আপনাদের মনে যতটা ভয় হচ্ছে, তা শুনতে আমার মনে ততটা ভয় হচ্ছে না।” হয়তো খ্রিস্টান ধর্মীয় গোঁড়ারা ব্রুনোর চিন্তাধারাকে ভয় পেয়েছিল কেননা মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর ব্রুনোকে আরও নির্যাতন করা হত। অবশেষে এল সেই দিন। বিজ্ঞানের ও যুক্তিবাদের ইতিহাসে যাকে 'কালা দিবস' হিসেবে আখ্যায়িত করাই যায়। ১৬০০ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি। পঞ্চাশোর্ধ্ব জিওর্দানো ব্রুনোকে রোমের রাস্তায় তাঁর পোশাক কেড়ে নগ্ন করে ঘোরানো হয় এবং খুঁটির সাথে বেঁধে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ব্রুনোকে যখন পুড়িয়ে মারা হচ্ছিল, তখন তাঁর মুখে একটি লোহার গ্যাগ (মুখবন্ধনী) পরানো হয়েছিল যাতে তিনি মানুষের সামনে আর কোনো 'ধর্মবিরোধী' কথা বলতে না পারেন। আর এটাই তাঁর প্রতি চার্চের ভয়ের গভীরতা প্রমাণ করে। পুড়ে যাওয়ার পর তাঁর দেহভস্ম ছড়িয়ে দেওয়া হয় টিবের নদীতে।


আজ রোমের যেখানে তাঁকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল সেই কাম্পো দে ফিওরি (Campo de' Fiori) চত্বরে ব্রুনোর একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর এই ব্রোঞ্জের মূর্তিটি মুক্তচিন্তা এবং সত্যের প্রতি অবিচল থাকার যেন এক শক্তিশালী প্রতীক। মজার ব্যাপার হলো, ১৮৮৯ সালে যখন এই মূর্তিটি স্থাপন করা হয়, তখন ভ্যাটিকান এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি স্থাপিত হয় এবং আজ এটি বিশ্বের পর্যটকদের কাছে একটি অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান।


আমেরিকার রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যালিলিও প্রজেক্ট অনুযায়ী, “প্রায়ই বলা হয় যে ব্রুনোকে তাঁর কোপারনিকান মতবাদ ও অসীম বসবাসযোগ্য জগতের বিশ্বাসের জন্য হত্যা করা হয়েছিল। বাস্তবে, তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহ ঘোষণার সুনির্দিষ্ট কারণ আমরা জানি না, কারণ তাঁর নথিপত্র রেকর্ড থেকে হারিয়ে গেছে। গ্যালিলিও ও জোহানেস কেপলারের মতো বিজ্ঞানীরাও তাঁদের লেখায় ব্রুনোর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন না।” তবে, আমরা তো জানি মধ্যযুগে ইউরোপে বিজ্ঞান ও ধর্মের লড়াই। আর খ্রিস্টান ধর্মীয় মৌলবাদের হাতে শহীদ হয়েছেন জিওর্দানো ব্রুনোর মতো বেশ কিছু বিজ্ঞানী। 'আধুনিক বিজ্ঞানের জনক' গ্যালিলিও গ্যালিলেইকেও মৌলবাদের শিকার হতে হয়েছিল।

উত্তরাধিকার


বিশিষ্ট কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'রাস্তা কারও একার নয়' কবিতাটি খুব মনে পড়ে যখন আমরা গ্যালিলিও ও ব্রুনোর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করি। কেন বলা হল তা কবিতাটি পড়লেই বোঝা যাবে।


সেই কবিতার প্রথমের কয়েকটা লাইন এখানে তুলে ধরলামঃ–


“ধর্ম যখন বিজ্ঞানকে বলে রাস্তা ছাড়াে!’ বিজ্ঞান কি রাস্তা ছেড়ে দেয়?

পােপের ভয়ে দেশান্তরী হয়েছিলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। সারাদিন

একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে পায়চারি করতেন গ্যালিলিও গ্যালিলেই ;

তাঁকে পাহাড়া দেবার জন্য বসে থাকতাে একজন ধর্মের পেয়াদা, যার

চোখের পাতা বাতাসেও নড়তাে না।

বিজ্ঞান কি তখন থেমে ছিল? তীর্থের পাণ্ডাদের হই হই, তাদের লাল

চোখ কি পেরেছিল পৃথিকে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে, সূর্যকে

তার চারদিকে ওঠবােস করাতে?”


সত্যি তো গোঁড়া ধার্মিকেরা ব্রুনোকে হারাতে পারেনি। উল্টে বহু বছর পর তাদের মত পাল্টাতে হয়েছিল। আজ আমরা সবাই জানি যে, পৃথিবী সহ অন্যান্য গ্রহরা সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে এমনকি সূর্যও স্থির নয় সেও একটি গতি নিয়ে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা আকাশ গঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে থাকে। আর আজ বিজ্ঞানের উন্নতর গবেষণা এই গবেষণা আমাদের মতো অন্যান্য জীব আছে কি না তার খোঁজ করে চলেছে। অনেক গ্রহ পাওয়া গেছে যাদের অবস্থা পৃথিবীর মতোন। সেখানে কি প্রাণ আছে? এই প্রশ্নটাই ভাবাচ্ছে তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীদের, বিজ্ঞানপ্রেমীদের এমনকি সাধারণ মানুষদেরও। আজ জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ বিজ্ঞান মনে করে যে অসংখ্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব থাকতেও পারে। সমান্তরাল মহাবিশ্বগুলোর (Parallel Universes) অস্তিত্ব হয়তো আছে।


তাই বলাই যায় যে, চিন্তার স্বাধীনতা ও মহাজাগতিক ধারণার ক্ষেত্রে ব্রুনোর অবদান ১৭শ ও ১৮শ শতাব্দীর দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে তো বটেই এমনকি আজকের দিনেও তাঁর ধ্যান ধারণাগুলো প্রভাবিত করে চলেছে। তাঁর কিছু ধারণা যথার্থ, সুদূরপ্রসারী ও উন্নত হলেও তাঁর কিছু ধারণা ছিল জাদুবিদ্যা ও অতিপ্রাকৃত বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া তৎকালীন রাজনীতির প্রতি তাঁর অবজ্ঞাই ছিল তাঁর মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ। রাজনীতি কি তাঁকে বাঁচিয়ে দিতে পারত? মনে তো হয় না কারণ, মধ্যযুগে ইউরোপীয় রাজনীতিও ছিল চার্চ নির্ভর। সে যাই হোক, বিজ্ঞানের ইতিহাসের পাতায় একজন বিজ্ঞানের শহীদ বিপ্লবী ও বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবে এবং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া বৈজ্ঞানিক দার্শনিক হিসেবে জিওর্দানো ব্রুনোর নাম স্বর্ণাক্ষরে চিরকাল লেখা থাকবে। আর এখানেই বিজ্ঞান তথা সত্যের জয়! দেরীতে হলেও সবসময় 'সত্যমেব জয়তে'-ই হয় কেননা 'সত্যম শিবম সুন্দরম' যে।
0

প্রবন্ধ - দিলীপ মজুমদার

Posted in








নিরুচ্চারে চলে যাচ্ছে গোকুলচন্দ্র নাগের মৃত্যুশতবর্ষ । ১৯২৫ সালে মৃত্যু হয় তাঁর । মাত্র একত্রিশ বছর বয়েসে । কেউ বলতে পারেন , জন্ম বা মৃত্যুশতবর্ষ পালনের মতো বিরাট লেখক তিনি ছিলেন না । বেঠিক নয় কথাটা । তাঁর রচনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য কিছু নয় । কিন্তু বড় লেখক হবার প্রতিশ্রুতি ছিল তাঁর লেখায় । 'ঝড়ের দোলা' সংকলনের 'মাধুরী' গল্পে , 'পথিক' উপন্যাসে , 'মায়ামুকুল' সংকলনের গল্পগুলিতে তার কিছু নজির আছে । জীবিকার্জনের জন্য নানাবিধ কাজ করতে হয়েছে তাঁকে । নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্য সাধনার সময় ও সুযোগ তিনি পান নি ।

লেখক হিসেবে নয় , বাংলা সাহিত্যের পালাবদলে একজন কর্মী হিসেবে তাঁর ভূমিকা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ । সেই পালাবদলের স্বপ্ন তিনি দেখতেন , লালিত করতেন তাকে । সেই স্বপ্ন আর একজন যিনি দেখতেন , সেই দীনেশরঞ্জন দাশের সঙ্গে আলাপ হবার পরে কাজে নেমে পড়েছিলেন গোকুল । দীনেশের সঙ্গে তাঁর আলাপ হওয়ার জায়গাটাও বিচিত্র । রেস্তোরাঁ নয় , লাইব্রেরি নয় , কোন বৈঠকখানা নয় . নিউ মার্কেটের এল ফুলের দোকান ।

ফুলের দোকানটা ছিল গোকুলের মামা সুরেন বসুর । স্বাস্থ্যের কারণে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ওয়েস্টার্ন সার্কেলের চাকরি ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল গোকুলকে । মামার কথায় ফুলের দোকানে বসতে শুরু করেছিলেন। পাশেই খেলার সরঞ্জাম বিক্রেতা এস. রায়. অ্যাণ্ড কোম্পানিতে কাজ করতেন দীনেশ । ফুলের দোকানে তাঁর সঙ্গে আলাপ গোকুলের । দীনেশের স্বপ্ন মিলে গেল গোকুলের সঙ্গে । কি রকম স্বপ্ন ? --'ভাবছি একটা পান্থশালার কথা । যেখানে মানুষ এসে শ্রান্ত জীবনভার নিয়ে বিশ্রাম করতে পারবে । জাতি , sex ও position সেখানে কোন বাধা হবে না । আপন আপন কাজকে মানুষ আনন্দময় করে তুলবে ।'

এই স্বপ্ন জন্ম দিল 'ফোর আর্টস ক্লাবে'র । গোকুল আর দীনেশ দেখা করলেন অধ্যাপক বিজলীবিহারী সরকারের স্ত্রী সুনীতিদেবীর সঙ্গে । নতুন ধরনের এই ক্লাবে যোগ দিতে রাজি হয়ে গেলেন সুনীতি । একে একে জুটতে লাগলেন মণীন্দ্রলাল বসু , উমা দাশগুপ্ত , সতীপ্রসাদ সেন , মীরা সান্যাল , দ্বিজেস সেন , কিরণ দে , কান্তিচন্দ্র দে , নিরুপমা দাশগুপ্ত । সংস্কৃতির পালাবদলের বাণীবাহক ছিল 'ফোর আর্টস ক্লাব'। সাহিত্যের পাশাপাশি এখানে ছিল কারুশিল্প , সংগীত , চিত্রশিল্পের আসর ।

এই 'ফোর আর্টস ক্লাব'ই 'কল্লোলে'র অগ্রদূত । ক্লাবটা উঠে যেতেই গোকুল আর দীনেশ 'কল্লোল' পত্রিকা প্রকাশের আয়োজন শুরু করে দিলেন । সংগতি ছিল না , কিন্তু ইচ্ছাটা ছিল দৃঢ় । গোকুলের কথায় , ' আমার ব্যাগে দেড় টাকা আর দীনেশের ব্যাগে টাকা দুই--ঠিক করলাম 'কল্লোল' বের করব । সেই টাকায় কাগজ কিনে হ্যাণ্ডবিল ছাপলাম । চৈত্র সংক্রান্তির দিন রাস্তায় বেজায় ভিড় , জেলেপাড়ার সঙ দেখতে বেরিয়েছে । সেই ভিড়ের মধ্যে দুজনে আমরা হ্যাণ্ডবিল বিলোতে লাগলাম ।' ১৩৩০ সালের বৈশাখ মাসে ১০/২ পটুয়াটোলা লেন থেকে প্রকাশিত হল বাংলার প্রথম মাসিক গল্প--সাহিত্য পত্রিকা । অবশ্য গল্পের পত্রিকা হলেও এতে কবিতাও ছাপা হত । প্রথম সংখ্যাতেই ছাপা হয় দীনেশরঞ্জন দাশের কবিতা । পরবর্তীকালে নজরুল ইসলাম , বিজয়চন্দ্র মজুমদার , বুদ্ধদেব বসু , নরেন্দ্র দেব , জীবনানন্দ দাশ , অজিতকুমার দত্ত প্রভৃতির কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ।

বাংলা সাহিত্যের পালাবদলে কল্লোলের ভূমিকাটা বিদ্রোহের । ভণ্ডামি , কাপট্য , সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ । যা যৌবনের স্বাভাবিক দাবির বিরোধী তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ । গোকুলচন্দ্রের জীবৎ কালের মধ্যে, 'কল্লোলে'র প্রথম দু'বছরের প্রকাশিত রচনার মধ্যে সেই বিদ্রোহের সুর ধ্বনিত হয়েছে । যেমন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের .নারীর মন' গল্পে , সুনীতিদেবীর 'বীণা' গল্পে , জীবনময় রায়ের 'কল্লোল' কবিতায় , গোকুলচন্দ্র নাগের 'পথিক' উপন্যাসে , কালিদাস নাগের 'জীবন' কথিকায় , দীনেশরঞ্জন দাশের 'উঠ বীর' কবিতায় , সুধীরকুমার চৌধুরীর 'বিদ্রোহ' কবিতায় , ভূপতি চৌধুরীর 'নারী' গল্পে , শৈলজানন্দের 'পান্থবীণা' উপন্যাসে , সত্যেন্দ্রকুমার বসুর 'সন্ধিক্ষণ' গল্পে , অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের 'গুমোট' গল্পে , প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'কালো মেয়ে' ও 'বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে বন্দী মোর ভগবান কাঁদে' গল্প এবং 'কবি নাস্তিক' কবিতায় ।

গোকুলচন্দ্র নাগের জীবনেই ছিল এই বিদ্রোহের বীজ । নানা প্রতিকূলতা , নানা কৃত্রিমতার মধ্য দিয়ে তাঁকে অগ্রসর হতে হয়েছে । অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন , 'গোকুলের বিদ্রোহ সাহিত্যিক বিদ্রোহ । গোকুলকে থাকতে হত তার ব্রাহ্ম মামাবাড়িতে নানা রকম বিধিনিষেধের বেড়াজালে । সে বাড়িতে গোকুলকে গলা ছেড়ে কেউ ডাকতে পেত না বাইরে থেকে , কোন মুহূর্তে জামা খুলে খালি-গা হতে পারত না গোকুল । এমন যেখানে কড়া শাসন--সেখান থেকে আর্ট স্কুলে গিয়ে ভর্তি হল । তার অভিভাবকদের ধারণা আর্ট স্কুলে যায় যত বাপে-তাড়ানো মায়ে-খেদানো ছেলে , এবার আর কি , রাস্তায় রাস্তায় বিড়ি ফুঁকে বেড়াও গে । শুধু আর্ট স্কুল নয়, সেই বাড়ি থেকেই সিনেমায় যোগ দিল গোকুল । সোল অব এ স্লেভ ছবিতে নামল বিদূষকের পার্টে । সহজেই বুঝতে পারা যায় কত বড় সংঘর্ষ করতে হয়েছিল সেদিনকার পরিপার্শ্বের সঙ্গে ।'
'কল্লোল' পত্রিকার সহ সম্পাদক ছিলেন গোকুল । কিন্তু দুর্মুখ সজনীকান্ত দাশও স্বীকার করেছেন যে পত্রিকার 'আসল কর্ণধার' ছিলেন গোকুলচন্দ্র নাগ । ভূপতি চৌধুরী গোকুলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন যে প্রত্যেকটি লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়া, কাটছাঁট করে প্রকাশের উপযোগী করে তোলা, ডাকযোগে আসা প্রত্যেক লেখক-লেখিকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা , প্রত্যেক সংখ্যার রূপসজ্জা ও রচনাসূচি নির্ধারণ করা , প্রুফ দেখা , প্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়িত্ব ছিল গোকুলের । বুদ্ধদেব বসু স্বীকার করেছেন যে গল্পসর্বস্ব সিকি মূল্যের মাসিকী হিসেবে জীবন আরম্ভ করে 'কল্লোল' যে ক্রমে নতুন লেখকদের মুখপত্র হয়ে উঠল--'তার পেছনে ছিল গোকুল নাগের প্রেরণা , যিনি তাঁর হ্রস্ব জীবনের শেষ বছরগুলিতে কল্লোলের অন্যতম সম্পাদক ছিলেন।'
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















 ২৫(১)

“ ও সজনা! ওগো নিঠুর প্রিয়তম! তোমাকে আমার বড্ড মনে পড়ে। চাঁদ কি জানে - কোন চকোর ওকে

কামনা করে? তুমি কি জানো যে তুমিই আমার মন্দির, তুমিই আমার পূজা, তুমিই আমার দেবতা? হ্যাঁ,

তুমিই আমার দেবতা। তোমার কথা ভেবে আমার ঘুম আসে না, সারারাত জেগে এপাশ ওপাশ করতে থাকি।

এখন আমার অবস্থা দেখ—না সইতে পারি, না রইতে। দেখ আমার বুক কেমন ধকধক করছে, তোমাকে

দেখলেই হৃদয়ের গতি বদলে যায়। তুমি তো কখনও উড়ে যাও, কখনও মুখ ফিরিয়ে চলে যাও—আমার

হৃদয়ের গোপন কথা জানতে চাও না। তোমাকে নিয়ে আমার একটাই নালিশ—তুমি চাও ভালবাসা লুকিয়ে

রাখতে।

“কহীঁ দীপ জলে কহীঁ দিল, জরা দেখ তো আ কর পরোয়ানে”।

দেখা হলে অনেক কথা বলার আছে। বুকের এই জ্বালা কাকে বলি! মন চায় প্রেমে সব উজাড় করে দিতে

। কিন্তু আমার “নাদান বালমা না জানে জী কে বাত”। তাই তো সেদিন তোমার কাছে এসেছিলাম। “পিয়া

মিলন কো জানা”। আমার জ্যোৎস্না আমার সঙ্গে আড়ি করেছে। আমার শূন্য ঘরে আঁধার। আমি

তোমাকে দেখা করে বলতে চাইছিলাম যে আমার কিছু চাই না। শুধু আমায় তোমার “পলকো কী ছাঁও মেঁ

রহনে দো”। এটাই আমার অনেক পাওয়া। কিন্তু দুনিয়ার এটাই নিয়ম—‘কিসী কো গিরানা, কিসী কো

মিটানা’। আমি তোমার ছাতে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু তোমার বিছানায় অন্য কোন পুরুষ শুয়ে ছিল। লজ্জায়

মরে গেলাম। নিরূপায় হয়ে ঘরে ফিরে এলাম। হে ঘূর্ণি ঝড় ! হাসো, খুব হেসে নাও। আমাকে নিয়ে হাসো,

আমার ভালবাসায় কটাক্ষ করে হাসো।

পাড়ায় আমার বদনাম হচ্ছে, আর তুমি চুপটি করে মুখ বুজে বসে রয়েছ? আর কত কষ্ট দেবে? আর

কত? দাও, যন্ত্রণা দাও। আমি ব্যাথায় ছটফট করেও তোমার গান গেয়ে যাব। শিগগির দেখা করা

দরকার। আজ আসতে পারবে? তোমা বিনা আমার মন্দির আজ শূন্য। “অকেলে হ্যাঁয়, চলে আও, জহাঁ

হো তুম”। “লগ জা গলে সে ফির ইয়ে হসীঁ রাত হো ন হো”। আমায় জড়িয়ে ধর, কে জানে, এমন সুন্দর রাত

আর আসবে কি? আমার এটাই ইচ্ছে যে তোমার দ্বারে যদি আমার প্রাণ যায় তো যাক! হায়, অনেক

আশায় বুক বেঁধে বসে আছি। দেখ গো, আমার মন যেন না ভাঙে!

তোমাকে ভেবে ভেবে

কোন এক উন্মাদিনী




ছাতের পাঁচিলের কাছে একটা নোংরা কাগজের পুরিয়া পড়ে আছে, সঙ্গে একটা ঢিল বাঁধা। দেখা গেল ওটা

একটা প্রেমপত্র! রঙ্গনাথ চিঠিটা একবার পড়ল, দ্বিতীয়বার পড়ল, আরও কয়েকবার পড়ল। বুঝতে

বাকি রইল না কে লিখেছে। সেই অজানা মেয়ে যার বুকের চাপ নিজের বুকে অনুভব করে রঙ্গনাথের সারা

রাত খাজুরাহো আর কোনারকের কথা মনে পড়ছিল। এটাও বোঝা গেল যে এই প্রেমপত্র লেখা হয়েছে

রঙ্গনাথ নয়, অন্য কারও কথা ভেবে।

কে সে?

রূপ্পন?




তাহলে এই চিঠিটি বেলা লিখেছে রূপ্পনের জন্যে? তবে কি সেই রাতে ছাদে চুপচাপ চলে আসা মেয়েটিই

বেলা?

যদি ভাবা হয় যে রঙ্গনাথ তর্কশাস্ত্রের বা নব্যন্যায়ের কোন মহান পণ্ডিতের মত অনেক

ভেবেচিন্তে, দুইয়ে দুইয়ে চার করে, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পেরেছে তাহলে ভুল হবে।

আসলে ও এই প্রেমপত্রের লেখিকাকে বেলা ধরে নিয়ে রূপ্পনের লেখা চিঠির সঙ্গে মিলিয়ে ভাবছিল।

আবার আশ্চর্য হচ্ছিল যে শিবপালগঞ্জের মত অজ পাড়াগাঁয়ে কোন মেয়ে এত ফিল্মি গান জানে!

চিঠির প্রতিটি ছত্র কোন না কোন হিট বোম্বাইয়া সিনেমার গান থেকে টোকা। এমন জানলে

বিশ্ববিদ্যালয় এই লেখিকাকে বুকে জড়িয়ে না ধরলেও ‘ফিল্মি সাহিত্যের ডক্টরেট’ এর পদক ওর

গলায় ঝুলিয়ে দিত।

এইসব চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে রঙ্গনাথের ভেতর থেকে এমন একটা আবেগ জেগে উঠছিল যাকে ফিল্মি

গানের ভাষায় বলা যায়—‘কী জানি কেন এই দুনিয়া আমায় জ্বালিয়ে মারে’! যে মেয়েটি সেই রাতে

রঙ্গনাথের গলার আওয়াজ শুনে “ হায় মাঈয়া’ (ওমা) গোছের পবিত্র মন্ত্র পড়ে পালিয়ে গেছল, সে

আজ অন্য কারও উদ্দেশে লিখছে “অকেলে হ্যায়, চলে আও, জহাঁ হো তুম”! আজ আমি একা, যেখানেই

থাকো চলে এস!

এ যেন অ্যাপিল ব্রডকাস্ট করছে। এটা অসহ্য।

চিঠিটা পকেটে পুরে রঙ্গনাথ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

আজ শহরে জোগনাথের মামলার শুনানি হবে। শিবপালগঞ্জে যাদের গুণতির মধ্যে ধরা হয় তারা সবাই

আজ ওদিকে রওনা দিয়েছে। কখনও কোন গুণ্ডার মামলা এজলাসে ওঠে, ব্যস্‌ গ্রামবাসীদের

স্বাভাবিক ইচ্ছে জেগে ওঠে—চল, শহর ঘুরে আসি, কাছারি দেখে আসি।

গুণ্ডাকে সবার সামনে অপমানিত হতে দেখলে ওনাদের হৃদয়ে পুলক জাগে, আর গুণ্ডাও এই ভেবে খুশি

হয় যে আমার পক্ষে কতলোক হাজির! সেই রীতি রেয়াজ মেনে আজ অনেকে শহরে চলে গিয়েছে। আরও

অনেকে যাবে যাবে করছে।

রঙ্গনাথ দেখল বদ্রী পালোয়ান তার নিজস্ব ভুবনমোহন রূপ ধরে আসছেন। গায়ে মলমলের কুর্তা

ঝলমল করছে, নীচে গেঞ্জি নেই যদিও ফাল্গুন মাসের হিসেবে শীতের ভাব রয়েছে। কোমরে ল্যাঙোট

বাঁধা, কী আশ্চর্য, তার উপরে লুঙি! পায়ে পালিশ করা কালো বুটজুতো। ন্যাড়া মাথা সর্ষের তেলে

জবজবে, তার অনেক উঁচুতে নীল আকাশ।

রঙ্গনাথ প্রথমে ভেবেছিল যে প্রেমপত্রটি রূপ্পনবাবুর হাতে দিয়ে “সংস্কৃতির অবক্ষয়ে সিনেমার

ভূমিকা” গোছের বিষয় নিয়ে কিছু ডায়লগ ঝাড়বে, যাতে বেলার প্রেমে রূপ্পনের অধঃপতন ঠেকানো যায়।

কিন্তু ও জেনে গেছল যে এই বিষয়ে রূপ্পনের সঙ্গে কথা বলা মুশকিল। কিন্তু প্রেমপত্র পাওয়ার মতন

অসহ্য ঘটনাকে চুপচাপ হজম করাটাও ঠিক হবে না। কিন্তু বদ্রী পালোয়ানকে দেখে ও নিজের প্ল্যান

বদলে ফেলল। যেমন কোন আমেরিকান এক্সপার্ট এলে আমরা কখনও কখনও নিজেদের প্ল্যান বদলে

ফেলি।

বদ্রী পালোয়ান প্রেমপত্রটি দূর থেকে পড়তে লাগল। কাজটা সহজ করার জন্যে রঙ্গনাথ দেড় ফুট

দূরে দাঁড়িয়ে কাগজটাকে দু’হাতে মেলে ধরল। এক জায়গায় পালোয়ানকে চোখ ছোট করতে দেখে রঙ্গনাথ

সাহায্য করবে ভেবে পড়ে দিল—‘ ফির ইয়ে হসীঁ রাত হো ন হো”, মানে “হসীন, অর্থাৎ খুব সুন্দর”।




বদ্রী পালোয়ান ঢেঁকুর তুলল। হয়ত বলতে চাইল—বেশি বোঝাতে হবে না। এসব আমার জানা আছে। পুরো

চিঠিটা পরে পালোয়ান ওটা নিয়ে ভাঁজ করে জামার পকেটে পুরল।

রঙ্গনাথ বলল , “রূপ্পন বাবু খারাপ রাস্তায় চলছেন। আর ওই মেয়েটা! কে জানে চিঠিতে কত ফালতু

আবর্জনা ভরে দিয়েছে”।

উত্তরে বদ্রী পালোয়ান হো হো করে হেসে উঠল। “চিঠিটা তো শ্বশুড়ী ওই গ্রাম-সেবিকা লিখে দিয়েছে।

এ গাঁয়ে ও ছাড়া আর কেউ এসব জানে না”।

“ তার মানে –তার মানে রূপ্পন বাবু কোন গ্রামসেবিকার চক্করে ফেঁসেছেন”?

বদ্রী পালোয়ানের হাসি আর থামে না। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “না না। তুমি তো একেবারে

উলটা বুঝিলি রাম! ও বেচারি এসব করে না, শুধু অন্যদের হয়ে চিঠি লিখে দেয়”।

পালোয়ান নিজের রাস্তায় এগিয়ে গেল। যেতে যেতে রঙ্গনাথের হতভম্ব চেহারা দেখে বলে গেল, “এই

কাগজের টুকরো নিয়ে আর মাথা ঘামিও না। আমি সব ঠিক করে দেব”।




আদালত ভবন শহরে, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে গোটা শিবপালগঞ্জ এজলাসে হাজির। জোগনাথের বিরুদ্ধে

চুরির মামলার শুনানি অলছে। আজ সাক্ষীদের বয়ান নেয়া হচ্ছে।

আদালতের পরিবেশ একেবারে জঘন্য এবং অশ্লীল। লোকজন বারান্দায় নেড়ি কুকুরের মত শুয়ে রয়েছে।

দোলের দিন প্রায় এসে গেছে। তাই লোকের মুখে ছ্যাবলা চুটকি এবং খিস্তিখেউড় লেগেই আছে। শরীরে

ময়লা কিন্তু নানারঙের কাপড় জামা। ময়লা কাপড় পরা বাদী-প্রতিবাদী-সাক্ষীর দল বিড়ি টানতে টানতে

অথবা নোংরা দাঁতের পেছনে খৈনির গুঁড়ো চেপে রেখে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছে। এক নারী বারান্দায়

শুয়ে বাচ্চার মুখে মাই ঠুঁসে দুধ খাওয়াচ্ছে আর কিছু নাগরিক তাই হাঁ করে দেখে দাঁত বের করছে।

এতোল বেতোল হাওয়ার দাপটে ধূলো ও শুকনো পাতা উড়ে বারান্দায় ছড়িয়ে পড়ছে। পুলিসের দুই সেপাই

ইউনিফর্ম পরে আদালতের বারান্দায় খালি পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে ওদের পায়ে খাকি রঙের পট্টি

জড়ানো। ওদের মধ্যে একজনের জুতো সর্বদা অন্য কাউকে মেরামত করতে মুখিয়ে থাকে; সে জুতো

জোড়া এখন বটগাছের নীচে এক মুচির হাতে মেরামত হচ্ছে। দ্বিতীয়জন তার জুতোজোড়া এজলাসের

দরজার সামনে খুলে রেখেছে। কারণ, ও সদ্য পুলিশ হয়েছে। এই জুতো ওর পায়ের বুড়ো আঙুলে কেটে

বসেছে। উকিলের দল, কাজ থাক বা না থাক, কাজের বোঝায় আতুর হয়ে সমানে এজলাসের ভেতর বার

করছে। এজলাসের পেশকারেরা হাই তুলে গয়ং গচ্ছ ঢঙে প্রতি পনের মিনিটে একবার করে পান

দোকানের দিকে ঘুরে আসছে আর মামলাবাজ লোকদের কাউকে পেছনে কাউকে বগলে চেপে মুখ ভর্তি

পান-খয়ের-দোক্তা-চূণ ঠেসে বোঝাতে বোঝাতে ফিরে আসছে যে আজ অনেক কাজ,এবার পরশুদিন

এসো। তারপর উটের মত ঘাড় তুলে এজলাসের নিরাপদ এলাকায় ঢুকে পড়ছে।

বারান্দার এক কোণে সেই ল্যাঙড়াটাও বিচারের আশায় বসে আছে।

শনিচর এখন গ্রামসভার প্রধান। তাই আমোদগেঁড়ে লোকজনের ভীড়ে ওর থাকা জরুরি। আরও কারণ যে

আজ ছোটে পালোয়ান জোগনাথের বিরুদ্ধে পুলিসের সাক্ষী হয়ে হাজির হয়েছে। এটা একটা ঐতিহাসিক

ঘটনা। ছোটে পালোয়ান এবং জোগনাথ দুজনেই বৈদ্যজীর লোক। তাহলে হঠাৎ কী হোল যে একজনেরই

দুই চ্যালা কাঠগড়ায় দুদিকে দাঁড়িয়ে—আসামী এবং সরকারী সাক্ষী!




কিছুদিন আগে এটা নিয়েই রূপ্পনবাবু রঙ্গ করে বলেছিলেন—একডালে ফুটল দুই ফুল, কিন্তু যার যা

কপাল!

শনিচর এবং গ্রামের আরও কয়েকজন একেবারে এজলাসের ভেতরে চলে গেছে। ল্যাংড়াকে শনিচর

সেরেফ ঘুরিয়ে আনার জন্যে রিকশায় চাপিয়ে নিয়ে এসেছিল। সে এখন বারান্দার এককোণে বসে নতুন

শ্রোতাদের নিজের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা শোনাতে ব্যস্ত। ওর একটাই জীবন আর একটাই

অভিজ্ঞতা। সেটাই ও এবার ছড়িয়ে লম্বা করে শোনাচ্ছেঃ

“—তো বাপু, এতদিন পরে, মানে পুরো একবছর তিনমাস কেটে যাওয়ার পর, এখন মামলা লাইনে এসেছে।

নকল চেয়ে যে দরখাস্ত করেছিলাম তাতে আর কোন ভুলচুক নেই। ওটা এখন সদর থেকে তহসিল

অফিসে ফেরত চলে এসেছে। কাল তহসিল অফিসে গেছলাম। জানতে পেরেছি যে নকল জারি করার

কেরানী এখন আমার কাজটা নিজের হাতে নিয়েছেন। আজ সেটার জোগাড় চলছে, ফের ওর আসলের

সঙ্গে মিলান করে দেখা হবে। ব্যস, আর তিন চার দিনের মামলা”।

একজন উকিল থামের গায়ে হেলান দিয়ে সিগ্রেট ফুঁকছিল, সে ওখান থেকে গলা তুলে বলল—‘এতদিন

ধরে খামোখা ঘুরে মরছ, তারচেয়ে আমাকে বা অন্য কোন উকিলের কাছে এলে তিনচার দিনে কাজ হয়ে

যেত’।

ল্যাঙড়া এতদিনে সাধুসন্তদের মত ক্ষমাসুন্দর মধুর হাসি কাজে লাগাতে শিখে গেছে। যা দেখলে সবার

মনে হবে অন্য লোকটি বাচ্চাদের মত কথা বলছে। তেমনই এক মুচকি হাসির মুখোশ পরে ও জবাব দিল,

“ উকিলের দরকার ছিল না তো! এতো আমাদের দুজনেরই সত্যের পথে চলার লড়াই। পাঁচটাকা হাতে গুঁজে

দিলে তিন দিন কেন, তিন ঘন্টায় কাজ হয়ে যেত। কিন্তু ওভাবে না ও পয়সা নেবে, না আমি দেব”।

উকিল উবাচ, ‘কেন নিল না? তুমি টাকা বের করলে অথচ ও নেয় নি’?

ক্লান্ত ল্যাঙড়া বারান্দায় চাদর বিছিয়ে শোয়ার জোগাড় করছিল, বলল-- “ এটা সৎপথের লড়াই, তুমি

তো উকিল; তুমি বুঝবে না”।

লোকজন হেসে উঠল, কিন্তু ল্যাংড়া কোন কথা না বলে চোখ বুজে শুয়ে পড়ল। আচমকা ওর মুখ থেকে

কাতরানোর আওয়াজ! কেউ বলল, “কী হয়েছে ল্যাংড়া? ঠান্ডায় কাবু”?

ও চোখ বুঁজেই মাথা নেড়ে সায় দিল। ওর পাশে বসা লোকটি ওকে ছুঁয়ে বলল, ‘মনে হচ্ছে জ্বর হয়েছে’।

এক বুড়ি চুপচাপ বসে ঘোলাটে চোখে সংসারকে দার্শনিক চোখে দেখছিল। সে বলল, “বড় খারাপ সময়।

আমার দুই ছেলে, দুজনেই জ্বরে কাহিল। ফসল পেকেছে। কাটবে কে? ইঁদুরে ধান খেয়ে যাচ্ছে”।




অনারেরি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাস।

গয়াদীনের সাক্ষ্য নেয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। হঠাৎ জোগনাথের উকিল প্রশ্ন করল, “ তোমার

একটি মেয়ে”?

“হ্যাঁ”।

“ওর নাম বেলা”?




“হ্যাঁ”।

“বয়েস প্রায় কুড়ি”?

“হ্যাঁ”।

মাননীয় আদালত গয়াদীনের দিকে কড়া চোখে তাকালো, মানে এক বিশ বছরের অবিবাহিতা মেয়ের বাপের

দিকে যেভাবে তাকানো উচিত আর কি!

--তোমার ঘরে কোন অন্য স্ত্রী থাকে?

--হ্যাঁ, আমার বিধবা বোন।

--কিন্তু ওতো সবসময় থাকে না।

--না, ও গোড়া থেকেই আমার ঘরে আছে।

-উকিল গর্জে উঠল,-- আদালতে শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছ, মিথ্যে বললে তোমার বিরুদ্ধে মামলা হবে।

এটা কি সত্যি নয় যে বোনটি বেশিরভাগ সময় শ্বশুরবাড়িতে থাকে আর তখন মেয়ে একলা থাকে”?

গয়াদীন চুপচাপ দাঁড়িয়ে। উকিল ফের গর্জে উঠল, “চুপ করে আছ কেন? উত্তর দাও”।

--কী বলব? আপনি এত রেগেমেগে চেঁচাচ্ছেন যে কিছু বলা দুষ্কর।

উকিল সেভাবেই বলল—না, রাগ করি নি।

গয়াদীন চুপ।

উকিল এবার আওয়াজ নরম করে বলল, --উত্তর দাও।

--আমার বিধবা বোন সাবসময় আমার বাড়িতেই থাকে।

--মেয়ের বিয়ে হয়েছে?

-না।

--কবে বিয়ে দেবে?

-- বিয়ে দেওয়া তো ভগবানের কাজ।

ভগবানের নাম শোনামাত্র মহামান্য আদালত মুখ তুলে তাকালেন। এতক্ষণ উনি মন দিয়ে কিছু কাগজ

দেখছিলেন যার সঙ্গে এই মামলার কোন সম্পর্ক নেই। এবার উনি উকিলকে বললেন, “ এসব প্রশ্নের

বর্তমান মামলার সঙ্গে কোন সম্বন্ধ নেই”।

উকিল বলল—শ্রীমানজী, সম্বন্ধ আমি পরে সিদ্ধ করব।

আদালতের সমর্থন পেয়ে পাবলিক প্রসিকিউটর এবার নিজের সাক্ষীকে বাঁচাতে জেগে উঠলেন।

==শ্রীমান, এসব প্রশ্ন একদম অপ্রাসঙ্গিক।

কিন্তু আদালত কড়া চোখে পাবলিক প্রসিকিউটরকে দেখলেন।
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in




















১৮

বের্নহার্ডের বাজনার প্রভূত উন্নতি হচ্ছিল ক্রমেই। সে নিজেও উৎফুল্ল বোধ করছিল তার অগ্রগতিতে। তার সুর লাগানোর ক্ষমতা এবং চলন আরও স্বচ্ছন্দ এবং শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। বাজনার প্রতিটি স্বর আরও ভরাট অথচ কোমল হয়ে উঠছিল। গানের কথার মতো স্পষ্ট এবং পরিশুদ্ধ হয়ে সুরের টুকরোগুলি বেজে উঠছিল তার হাতের ছোঁয়ায়। শপ্যাঁ রচিত একক সঙ্গীতের বিশেষ কঠিন সংবেদী বিন্যাসগুলিও সহজে মূর্ত হয়ে উঠছিল তার নিয়মিত অভ্যাসের ফলে। বাজনার নিরবচ্ছিন্ন সুরেলা অনুরণন বজায় রেখে সে ছড়িয়ে দিতো এক নির্ভার মাদকতা।

দুর্ভাগ্যবশত, বেটসিকে শেখাতে গিয়েও সে বাধাহীনভাবে বাজাতে পারত না। কারণ তাদের অন্যান্য আমেরিকান বন্ধুরা প্রায়ই এসে ডাকাডাকি করত। ওরা বলতো বন্ধু… আসলে বেশ কিছু নির্বিকার অল্পবয়েসি ছেলেমেয়ে, যাদের দেখতে, পোশাক পরিচ্ছদে, ভাষায়, চলনে বলনে আর নামেও প্রায় অনেকটাই ওদেরই মত। বেটসির খিদে পেয়ে যেত; তার গাড়ি পথে এসে অপেক্ষা করত। অবশেষে নিজেরই বিছিয়ে দেওয়া সুরের মায়াজালে আচ্ছন্ন থাকা বের্নহার্ডকে টেনেহিঁচড়ে পিয়ানো থেকে তুলে নিয়ে ডিনারে যেত ওরা।

প্রায় প্রতিদিন এই আমেরিকান তরুণ তরুণীর দলটার সঙ্গে ডিনার খেতে যেত বের্নহার্ড, যেটা অবশ্য তার পক্ষে মঙ্গলজনক হয়েছিল। তাছাড়া সে ভালই উপার্জন করছিল। বেটসি পরের দিনের বেতনটা ডলারে হিসেব করে তাকে দিয়ে দিত, কারণ সে বুঝতে পেরেছিল যে একা নতুন শহরে একজন ইউরোপিয়ান ছাত্রের আর্থিক প্রাচুর্য নাও থাকতে পারে।

এই হল বের্নহার্ডের বর্তমান পরিস্থিতি। সে আপাতত দুই হাত ঘাড়ের নিচে রেখে নিজের বিছানায় শুয়ে আছে। বিছানার পাশে টেবিলে ছাইদানে নিঃশব্দে একটা সিগারেট পুড়ে যাচ্ছে।

সে ভাগ্যবান। তার কপালের অস্বাভাবিক জোর আছে। চারপাশে সবাই তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে। তাকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করে। তাকে "ছোট্ট বন্ধু” কিম্বা “বাচ্চা” এরকম সম্বোধনে ডাকে। পয়সা ভালই দিচ্ছে, চকলেট খাওয়াচ্ছে। বিশাল পিয়ানোটা, যেটার শব্দ অসাধারণ গমগমে অথচ নরম, সেই বাদ্যযন্ত্রে রোজ অভ্যেস করতে দিচ্ছে। এককালে গের্ট এবং ইনেস যেভাবে তাকে প্রশ্রয় দিত, সবসময় প্রচ্ছন্ন ভালবাসায় ঘিরে রাখতো, এরাও ঠিক সেভাবেই তাকে ঘিরে আছে। সে এখন বেটসির আভিজাত্যপূর্ণ কালো গাড়িটাতে চড়ে প্যারিস শহর চষে বেড়াচ্ছে এবং তার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সোয়েটার, সিগারেট, ক্ন্যাগির জন্য ছোট শক্ত কেক এসব কেনাকাটা করছে।

কিন্তু শুধুমাত্র বেটসি যে তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, ব্যাপারটা এমন নয়। মাদাম দুবোয়া যে তাকে পছন্দ করেন বেশ, সেটাও বোঝা যায়। তিনি সবসময় যাতে তার জামাকাপড়, মোজা এগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে, গুছিয়ে রাখা থাকে, এদিকে বিশেষ খেয়াল রাখেন। তার সঙ্গীতশিক্ষকও তার প্রতি অত্যন্ত সদয়। এমনকি চার্লস, তার বন্ধু যে সবসময় গোমড়ামুখে তিরিক্ষি মেজাজে অথবা অদ্ভুত উদাসীন ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়ায়, সেও তাকে বিশেষভাবে পছন্দ করে। আজ তার সঙ্গেই সে জেরাল্ডের বাড়ি যাবে। এই জেরাল্ডের সঙ্গে দেখা করবার জন্য সে সাগ্রহে অপেক্ষা করছে।

চার্লস যথারীতি বিষণ্ণ এবং গম্ভীর মুখে বের্নহার্ডের ঘরে এসে উপস্থিত হল। সে আজই জেরাল্ডের সঙ্গে হেস্তনেস্ত করতে চায়। অনেকদিন অপেক্ষা করেছে সে। তাছাড়া ওই নেকুপুষু মিকাকে নিয়ে তার মনে এখন আর কোনও বিশেষ ভাবনা নেই। জেরাল্ড মিকার কথায় পাত্তা দিলে দেবে, সেসব নিয়ে এখন আর তার কোনও মাথাব্যথা নেই। মোট কথা, সেদিন যে জেরাল্ড তাকে সবার সামনে বিশ্রীভাবে অপমান করেছিল, সেই ব্যাপারে একটা মোকাবিলা সে আজই করতে চায়। উদার ভঙ্গিতে ঘুরিয়ে মাথাটা ঘুরিয়ে কাত করে এক অদ্ভুত বিনীত স্বরে বলে ওঠে সে… ‘তুমি আগ্রহী হলে আমার সঙ্গে অন্তত আসতে পারো!’

বের্নহার্ড জানায় যে সে খুবই আগ্রহী কারণ সে জেরাল্ডকে দেখতে চায়… “কেমন ব্যক্তি, যাকে তুমি এত ভয় পাও!” যদিও চার্লস মাথা নেড়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে অস্বীকার করে তার ভীতির কথা, তবুও বের্নহার্ড লক্ষ্য করে যে যত তারা জেরাল্ডের বাড়ির দিকে এগোচ্ছে, তত মনে হচ্ছে যে চার্লস ভিতরে ভিতরে খুব ঘাবড়ে গিয়েছে। সব কথার সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছে। খুব তাড়াহুড়ো করে একগুঁয়ে ভঙ্গিতে পথে হাঁটছে। বেশ কয়েকবার বাস চাপা পড়তে পড়তে বাঁচলো চার্লস।

যাই হোক, এখানে এই কথাটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বের্নহার্ড এখনো আবিষ্কার করেনি যে এই দুই জেরাল্ড আসলে একই ব্যক্তি; তার সঙ্গীতশিক্ষকের বাড়িতে প্রথমদিন পিয়ানো বাজাতে বাজাতে শিক্ষকের যে ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেই ব্যক্তি, এবং রবার্টের কাছে যাতায়াত করা ব্যক্তি যার বিষয়ে শহরে অজস্র গুজব ভেসে বেড়ায় এবং লোকে একথাও বলে যে তার এপার্টমেন্টে সুসজ্জিত মেক-আপ করা কচি কচি বার গার্লদের যাতায়াত আছে, এই দুজন যে একই ব্যক্তি, সেটা বের্নহার্ড এখনো জানে না।

চার্লস এবং বের্নহার্ড গিয়ে জেরাল্ডের দরজায় ডোরবেল বাজানোর পর এক তরুণ বাটলার বেরিয়ে আসে, সাদা আর নীল রঙের ডোরাকাটা জ্যাকেট পরা। তাদের প্রশ্নের উত্তরে বিনীত ভঙ্গিতে সে বলে যে মঁসিয়ে জেরাল্ড বাড়িতেই আছেন এবং শীঘ্র তাদের স্বাগত জানাবেন।

হে পাঠক, এই বিন্দুতে এসে আপনি অবশেষে জেরাল্ডের এপার্টমেন্টে প্রবেশ করলেন বের্নহার্ডের সঙ্গে। ঢুকেই সামনে প্যাসেজের দিকটা কার্পেট মোড়া, যথেষ্ট জায়গা জুড়ে একটা আভিজাত্যপূর্ণ গৃহসজ্জা। কোট ঝুলিয়ে রাখার চওড়া শেলফের উপরে দুটো ছোট হালকা রঙের ল্যাম্প জ্বলছে। একটা আলো সরাসরি রাখা আছে একটা বড় আয়নার মাথায়। আয়নার সামনে একটা ছোট টেবিলের উপরে চিরুনি, ব্রাশ, ছোট তোয়ালে রাখা। একটা পর্দার পেছনে হাত ধোবার বেসিন দেখা যাচ্ছে, সেটার উপরেও একটা আলো জ্বলছে।

এপার্টমেন্টের ভিতরের প্যাসেজের অংশটির চরিত্র একেবারে নিরপেক্ষ বলা যেতে পারে। আধুনিক গৃহসজ্জা যেমন হয়, তেমনি সব সুবিধে আছে। ছেলেরা নিজেদের কোট খুলে শেলফে ঝুলিয়ে রাখে। বের্নহার্ড আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলটা একবার ব্রাশ করে নেয়। এদিকে চার্লস অধৈর্য ভঙ্গিতে কার্পেটের উপরে এসে দাঁড়ায়। প্রস্থানোদ্যত বাটলারের দিকে ভীরু অথচ সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকায় সে; তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত উত্তেজিত। বের্নহার্ডের চুল ব্রাশ করা হয়ে গেলে বাটলার ছোকরাটি সামনের অংশ থেকে আরেকটু ভেতরে এগিয়ে আরেকটা ঘরের দরজা খুলে ধরে দাঁড়ায়। সেই ঘরের আলো অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল। এই ঘরটি বসার ঘর কিম্বা অপেক্ষা করবার ঘর। একটা টেবিলের উপরে প্রচুর বই, ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ রাখা আছে। চারপাশে অজস্র চেয়ার।

হে পাঠক, আপনি এই আরামপ্রদ চেয়ারগুলির যে কোনও একটায় বসে, হাই তুলতে থাকা একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠবার জন্য, টেবিলে রাখা ম্যাগাজিনগুলিতে চোখ বোলাতে পারেন।



(চলবে)
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৬. তৃপ্তি মিত্র বিস্মৃত প্রতিভা





প্রিয় বাউন্ডুলেবরেষু

বাসু,

তুমি দিল্লিতেই আছো কিনা জানিনা। কদিন আগেই ব্যাঙ্গালোর থেকে লেখা তোমার চিঠি ও লুইজ গ্লিকের ফ্যান্টাসি কবিতার অনুবাদ পেলাম। অনুবাদ পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল লুইজ গ্লিককে বেশ গভীর থেকে আত্মস্থ করেছো। আজ রবিবার, ছুটির আমেজ মেখে ব্যালকনিতে বসে রোদ গায়ে লাগিয়ে তোমাকে লিখছি। এখানে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। গতরাতে অফিস থেকে ফেরার পথে খেয়ে এসেছিলাম তাই রান্না করতে হয়নি। ফ্রেশ হয়ে টিভির সামনে বসে রিমোট চাপতে চাপতে চোখ আটকে গেল একটা সিনেমায়, তৃপ্তি মিত্র অভিনীত এই সিনেমাটা আগেও বহুবার দেখেছি। ২০২৫ সালে তৃপ্তি মিত্রের জন্ম শতবর্ষ গেল অথচ গুণী এই নাট্যজন যেন জীবনে প্রাপ্য মর্যদা পেলেন না যতটুকু পাওয়া উচিত ছিল। মঞ্চে উনার অভিনয় দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি কিন্তু ছোটকার মুখে বহুবার উনার অভিনয় নিয়ে বিস্তর কথা শুনেছি, ছোটকা দুটো নাটকের কথা সবসময় বলতেন একটা বাকী ইতিহাস অন্যটা অপরাজিতার কথা। নাটক নিয়ে কথা উঠলেই ছোটকা ঘুরে ফিরে এই দুই নাটক ও তাতে তৃপ্তি মিত্রের অভিনয় নিয়ে প্রশংসা জুড়তেন। শুনেছি বাকি ইতিহাস নাটকে তৃপ্তি মিত্র আর কুমার রায় তিনটে করে চরিত্রে অভিনয় করতেন। তৃপ্তি মিত্রের তিনটি চরিত্রের একজন বাসন্তী, মাঝবয়সি মহিলা, অন্য দু’জনের নাম কণা, কম বয়সি। এই দুই কণা আবার দু’ধরনের মেয়ে, একজন উচ্ছ্বল, ছটফটে, অন্যজন শান্ত, দুঃখী, যে কোনও কিছুকে মেনে নেওয়া স্বভাবের। প্রথম কণাকে দেখে ছোটকা নাকি ভেবেছিল উনি নিশ্চয়ই শাঁওলী মিত্র। তার নাকি দুটো কারণ। এক তো অস্বাভাবিক দ্রুততায়, সেকেন্ড তিরিশের মধ্যে তৃপ্তি মিত্র বাসন্তী থেকে কণায় রূপ বদলাতেন, সেই সঙ্গে বদলাতেন কথা বলার ধরন, হাঁটাচলার ধরন, এক কথায় পুরো ব্যক্তিত্বটাই অন্য রকম হয়ে যেত। এ একটা অসম্ভব ব্যাপার! ছোটকার কথায় যাঁরা অভিনয় করেন তাঁরা জানেন, এ খুব সহজ কাজ নয়। অত দ্রুত রূপ বদলের জন্যে দরকার হয় প্রায় যান্ত্রিক নিখুঁত তৎপরতা, আর ব্যক্তিত্ব পালটে দেওয়ার জন্য নিজের কণ্ঠ আর শরীরের ওপর অসামান্য দখল। বিস্ময়করভাবে তা ছিল তৃপ্তি মিত্রের। ছোটকার সাথে নাটক নিয়ে কথা বললেই এমন সব কথা শুনতে হতো আমি মনে করতাম হয়ত তৃপ্তি মিত্র নিয়ে ছোটকার দূর্বলতা কাজ করে। পরে যখন তাঁর অভিনয় দেখেছি পুরনো ছায়াছবিতে তাকে নিয়ে পড়েছি বিস্মিত হয়েছি আর ভেবেছি ছোটকার বলা কথাগুলি। ছোটকা তৃপ্তি মিত্রের একক নাটক অপরাজিতার কথা নিয়ে বলতে গেলেই বলতেন, তৃপ্তি মিত্রের অভিনয় ঘোর আমার আজ পর্যন্ত কাটেনি। কোনও লাভ নেই জানি, যাঁরা সেইসব অভিনয় দেখেননি তাঁদের তো কথা দিয়ে তাঁর অলৌকিকতা বোঝানো যাবে না, তবু ধর নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই বলি তাঁর আর-একটি নাটক, একক অভিনয়, ‘অপরাজিতা’র কথা।



পণ্ডিতেরা বলেন প্রাচীন গ্রীসে থিয়েটারের জন্ম। ওঁরা আবার এটাও বলেন, গণতন্ত্রের সূতিকাঘরও প্রাচীন গ্রীস। প্রথম দিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকাণ্ডের সূত্রেই থিয়েটারের আত্মপ্রকাশ। পরে সেখান থেকে বিযুক্ত হয়। যে সমস্ত পরিসরে এথেন্সে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের অনুষ্ঠানগুলি আয়োজিত হত, সেই পরিসরগুলি একই সাথে ছিল নাট্যানুষ্ঠানেরও স্থল। ফলে বলা যায়, শিশুকাল থেকেই থিয়েটার ও রাজনীতি এভাবে পরস্পর সম্পৃক্ত হয়ে আছে। এই সম্পর্ক তখন থেকেই দ্বিমুখী। কখনও থিয়েটারের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিষয়ে বার্তাপ্রদান হয়েছে। আবার কখনও উল্টোদিক থেকে রাজনীতি চেয়েছে থিয়েটারকে নিয়ন্ত্রণ করতে বা তার মধ্য দিয়ে নিজের স্বার্থ পূরণ করতে। সংগঠিত ধর্মকে যদি রাজনৈতিক অভিব্যক্তিরই একটি অংশ বলে গণ্য করি, তবে থিয়েটার ও রাজনীতি ধর্মীয় পরিসরে আদি থিয়েটারের দিন থেকেই পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে আছে। অন্য পণ্ডিতেরা বলবেন, সব কিছুর সূত্রপাত গ্রীসে খুঁজতে যাওয়া কেন? অন্য কোথাও সমান্তরালে বা তার আগেই এদের আত্মপ্রকাশ হয়ে থাকতেই পারে। তর্কের খাতিরে সেই বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে নিলেও এটা অনস্বীকার্য যে থিয়েটার ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক এই একই পথরেখা ধরেই এগিয়েছে। ইংরেজীতে যাকে বলে লাভ এন্ড হেট রিলেশন, সেই যুগপৎ অনুরাগ ও বীতরাগের সম্পর্কেই থিয়েটার ও রাজনীতি সম্পর্কিত হয়ে আছে। কখনো দ্বন্দ্বে কখনো ছন্দে গাঁথা এই সম্পর্ক। সমাজে শ্রেণিশাসন আরো সংহত হওয়ার পর থিয়েটার ও রাজনীতির সম্পর্কটা বিচিত্রধর্মী হয়েছে। কখনো শাসকেরা চেয়েছে থিয়েটারকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বা ব্যবহার করতে, কখনো ভাষাহীন শোষিত থিয়েটারের মধ্য দিয়ে নিজের অবদমিত কথাকে ব্যক্ত করেছে। যারা সরাসরি রাজনৈতিক থিয়েটার না করে বিশুদ্ধ থিয়েটারের চর্চা করে বলে দাবি করে, তারাও জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে যে বিবৃতিটি রাখে সেটিও মর্মবস্তুর দিক থেকে রাজনৈতিকই। বাংলা নাটকে রাজনৈতিক প্রভাব প্রথম লক্ষ করা যায় ১৮৬০ সালে দীণবন্ধু মিত্র কর্তৃক প্রকাশিত "নীল দর্পন" নাটকে। পরবর্তীতে এটা আরও বেগবান হয় চল্লিশের দশকে গণনাট্য সংঘ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্যে দিয়ে এবং তারা বাংলা নাটকে এক বিপুল পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেন অভিনয় থেকে আলোক সজ্জা সব ক্ষেত্রে এবং তার উজ্জল দৃষ্টান্ত নবান্ন, ছেড়া তার, দুঃখীর ইমান সহ আরও অনেক নাটক। বাংলা নাটকের যারা কুশী লব তথা বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, ঋত্বিক ঘটক, তুলসী লাহিড়ী এরা সবাই ছিলেন গণ নাট্য সংঘের কর্মী। ১৯৪২ সাল। কিছুদিন আগেই দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁ গ্রাম থেকে কলকাতায় এসেছেন তৃপ্তি ভাদুড়ী। ম্যাট্রিকুলেশনের দরজা পার না করলেও নাটকে অভিনয় করা নিয়ে প্রবল আগ্রহ তাঁর। আশুতোষ কলেজে পড়ার সময় গার্লস স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভ্য হয়ে একাধিক নাটকে যুক্ত থাকার সুযোগও হয়েছে। কলকাতায় বড়োমামা সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারেরও প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল স্বভাবলাজুক মেয়েটির ভালোবাসার প্রতি। তখন অ্যাসোসিয়েশনের রিহার্সাল হত তাঁর দিদি শান্তিদেবী ও জামাইবাবু অরুণ মিত্রের সদানন্দ রোডের বাড়িতে। শিক্ষক হিসেবে আসতেন শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু ভট্টাচার্য প্রমুখ। কেউই তখন নিজস্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত নন ঠিকই, তবে ভবিষ্যতের আলোর নিশানা সুস্পষ্ট করে তুলছিল বাংলার সংস্কৃতিচেতনার নতুন পথ। তৃপ্তিও যুক্ত হয়ে পড়লেন তাঁদের সঙ্গে। কোনো এক অনুষ্ঠানে নামতে হল পুরুষের ভূমিকাতেও। অভিনয় চলাকালীন জোরে হাত নাড়তেই শার্টের হাতার ভিতর থেকে রিনিঝিনি করে বেজে উঠল একগোছা চুড়ি। অপ্রস্তুতের একশেষ! কোনোরকমে অভিনয় শেষ করে যেন ঠিক করলেন, আর কোনোদিন মঞ্চে না উঠতে পারলেই বাঁচেন। ঠিক তার পরের বছরেই তাঁকে দেখা যাবে ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘের ‘আগুন’ নাটকে। নাটককার ও পরিচালক বিজন ভট্টাচার্য। ততদিনে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েছেন এ.আর.পি-র কাজে। সময়টাও ভারতের পক্ষে অনুকূল নয়। একদিকে স্বাধীনতা আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অন্যদিকে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’-এ ছারখার হয়ে যাচ্ছে গোটা বাংলা। পড়াশোনা বন্ধ রেখে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের লড়াইয়ে। গ্রাম ফেলে চলে আসা সহায় সম্বলহীন কৃষকদের জন্য জীবন উৎসর্গ তাঁর। আসলে কোথাও যেন একটা অস্পষ্ট মিল ছিল নিজের জীবনের সঙ্গেও। পিতা আশুতোষ ভাদুড়ি যখন যক্ষারোগগ্রস্ত, পরিবাবের মুখে খাবার জোটে না, সেই অনিশ্চিত দিনগুলিতেই এক কিশোরী বালিকা চলে এসেছিলেন কলকাতার অচেনা পরিবেশে। চুপ করে সম্পূর্ণ করতেন নিজের কাজটুকু। এতটাই নীরব হয়ে থাকতেন, যাতে সত্যেন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ‘মেয়েটি কি বোবা নাকি?’ এই আশঙ্কা আর নিরাপত্তাহীনতা যেন আজীবন সঙ্গী থেকেছে তাঁর, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে অনেকে সিদ্ধান্তে। ১৯৪৪ সালে অভিনীত হল গণনাট্য সংঘ প্রযোজিত বিজন ভট্টাচার্যের নাটক ‘নবান্ন’। যুগ্ম পরিচালক বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্র। বাংলা থিয়েটারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এই নাটকে বিনোদিনীর চরিত্রে অভিনয় করেন তৃপ্তি ভাদুড়ী। আমিনপুর গ্রাম থেকে খাদ্যের সন্ধানে কলকাতায় আসা এক পরিবারের সরল বালিকা বধূ সে। সন্তানসম মাখনকে কেড়ে নিয়েছে দুর্ভিক্ষ, নিজে ভুল পথে চলেছে জনৈকের ‘টাউট’-এর পাল্লায় পড়ে। এসব কি নিছকই অভিনয়? না, বরং জীবন থেকে, অভিজ্ঞতা থেকে খুঁজে পেয়েছিলেন অভিনয়ের প্রতিটি দৃষ্টিকোণ। মন্বন্তরের কলকাতার ‘ফ্যান দাও’ ধ্বনি ক্রমাগত বেজে চলত নাটকের মঞ্চে। প্রতিটি অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের দরজার সামনে, বলা ভালো নর্দমার সামনে হাড় জিরজিরে মানুষের ভিড়। নর্দমা থেকে বেরিয়ে আসা উচ্ছিষ্ট ফ্যানের জন্য অশক্ত শরীরে নিজেদের মধ্যে লেগে যেত মারামারি। একদিন উপরের ঘরের জানলা থেকে প্রত্যক্ষ করলেন সেরকমই এক ঘটনা। সেদিন কাঁদতে পারেননি তিনি, কিন্তু পালটে গেছিল জীবনধারা। হয়তো কিছু করার নেই, সামর্থ্যই বা কতটুকু? তবু থিয়েটারকে সম্বল করে যে পথটুকু হাঁটা সম্ভব, সেই পথই বেছে নেন তিনি। থিয়েটারের মধ্যেই খুঁজে পান বাঁচার রসদ। গণনাট্যের উত্তাল দিনগুলি পার করে চলে আসেন ‘বহুরূপী’-তে। ১৯৪৫-এ শম্ভু মিত্রের সঙ্গে বিবাহসূত্রে হন তৃপ্তি মিত্র। রবীন্দ্রনাথের ‘চার অধায়’ উপন্যাসের এলা চরিত্র থেকে ‘রক্তকরবী’-র নন্দিনী হয়ে ‘পুতুল খেলা’-র বুলু—সর্বত্র সাক্ষ্য রেখেছেন অপরিসীম অভিনয় প্রতিভার। ‘বহুরূপী’ থেকে সরে এসে তৈরি করেন নিজস্ব ‘আরব্ধ নাট্যবিদ্যালয়’। আবার ‘অপরাজিতা’ নাটকে একা অভিনয় করেছিলেন আঠারোটি চরিত্রে। আসলে তৃপ্তি মিত্রের সঙ্গে হয়তো বহুভাবে জড়িয়ে যায় শম্ভু মিত্রের নাম। আশ্চর্যময়ী তৃপ্তি মিত্রের ওপরে বিশিষ্ট কবি অরুণ মিত্রের লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল শ্রী মিত্রেরই লেখা 'পথের মোড়ে' (১৯৯৬) গ্রন্থে। অরুণ মিত্র ব্যক্তিগত আত্মীয়তার সম্পর্কের নিরিখে কিশোরীবেলা থেকে দেখেছেন তৃপ্তিকে — দেখেছেন তাঁর ক্রমশ উত্তরণ। দেখেছেন গণনাট্য সংঘের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ, অভিনয় জীবনে জড়িয়ে পড়া। এই অভিনয়কে কেন্দ্র করেই বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিণয় — পরবর্তীকালে 'বহুরূপী'র এক অনন্যসাধারণ অভিনেত্রী হয়ে ওঠা। তবে তৃপ্তি মিত্রের নিজস্বতা, তাঁর বিশেষ বাচনভঙ্গি ও কণ্ঠস্বর তাঁর অভিনয়কে এক বিশেষ শৈলী দিয়েছিল। এই লেখার এক জায়গায় শ্রী মিত্র বলেছেন — "তার কণ্ঠের ও বাচনের তীব্রতা এবং শিথিলতা প্রায়ই আমার ভেতরটাকে একইভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দিত এবং আমার পাষাণ চোখেও জল টেনে আনাত।" হ্যাঁ, শ্রী মিত্রের লেখাতে আমরা এই বিশিষ্ট অভিনেত্রীর ডাকনামটি জানতে পারি — "মণি"। নামটি সার্থক, সর্ব অর্থেই। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় কবি অরুণ মিত্র আমাদের জানিয়েছেন — "অভিনয়ের অনুধ্যানে অমন সার্বিক আত্মনিয়োজন আমি আর দেখি নি।" বাস্তবিকই, নাটকের প্রতি তাঁর ভালবাসা ও নিষ্ঠা তৃপ্তি মিত্রকে তাঁর জীবনের অন্য এক সফলতার শীর্ষদেশের দিকে নিয়ে গেছে — যেখানে ব্যক্তিগত অভাববোধ বা সমস্যা তেমন ছায়া ফেলতে পারে নি। তবে জীবনের শেষ পর্যায়ে শারীরিক অসুস্থতা অভিনেত্রীকে টেনে নিয়ে গেছে যন্ত্রণা আর কষ্টের আবর্তে। স্বল্প পরিসরে সুলিখিত এই রচনা 'মণি'-আশ্চর্যময়ীদের অলঙ্কারে হীরকদ্যুতির মতো।



নবান্ন নাটকে ছোট বউ বিনোদিনী, ‘ছেঁড়া তার’এ ফুলজান বিবি, ‘বিসর্জন’এ গুণবতী, ‘ওয়াদিপাউস’এ ইয়োকান্তে,কাঞ্চনরঙ্গে তরলা, ‘বাকি ইতিহাস’এ কণা, ‘চোপ আদালত চলছে’তে বেনারে, পুতুল খেলায় বুলু ও ‘রাজা’ নাটকে রাণী সুদর্শনা প্রভৃতি স্মরণীয় চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন তৃপ্তি মিত্র। তবু তৃপ্তি মিত্র বাঙালি নাটকপ্রিয় দর্শকের কাছে নন্দিনী চরিত্রের জন্য কিংবদন্তী হয়ে আছেন। তিনি নন্দিনী চরিত্রে এতটাই আলোচিত ও প্রসংশনীয় যে পরবর্তীকালে অন্য কোনো অভিনেত্রীর পক্ষে সেই উচ্চতায় পৌঁছানো কঠিন ছিল। তাঁর অভিনয়ের মধ্যে ছিল স্নেহ, তেজ, এবং প্রাণোচ্ছল ভালোবাসা, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখতো। 'রক্তকরবী' নাটকের 'নন্দিনী' চরিত্রটি তৃপ্তি মিত্রের কিংবদন্তী অভিনয়ের প্রতীক হয়ে আছে। বহু লেখায় জেনেছি `রক্তকরবী` রচনার পর থেকে আজ পর্যন্ত যতবারই নাটকটি মঞ্চস্থ করার আয়োজন হয়েছে ততবারই বিপদে পড়তে হয়েছে। কারণ সব চরিত্রের জন্য উপযুক্ত কাউকে পাওয়া গেলেও নন্দিনী চরিত্রের জন্য খুঁজে পাওয়া ভার। কবিগুরু যেভাবে চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন তার সঙ্গে মিলিয়ে শিল্পী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নিজেই এই সমস্যায় পড়েছিলেন। রচনার পর ``রক্তকরবী`` মঞ্চায়ন করতে গিয়েছিলেন তিনি। অভিনয়ের জন্য সব চরিত্র তিনি চূড়ান্ত করেছেন। শুধু বাকি নন্দিনী। নন্দিনী চরিত্রের মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে একটি মেয়ে পাওয়া গেল, যে নন্দিনী হতে পারে। মেয়েটি সিলেটের। রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাকে নন্দিনী হিসেবে চূড়ান্ত করেছিলেন। নাম না জানা সেই মেয়েটিই আমাদের প্রথম নন্দিনী। কলকাতার বাঘা বাঘা অভিনেত্রী থাকতে সিলেটের সেই তরুণীই রবীন্দ্রনাথের চোখে প্রকৃত নন্দিনী হয়ে উঠেছিলেন। যদিও রবীন্দ্রনাথ তার জীবদ্দশায় রক্তকরবী মঞ্চস্থ করতে পারেননি। তাহলে একবার ভাবো সেই নন্দিনী হয়ে তৃপ্তি মিত্র কিংবদন্তী হয়ে গেছেন।



অভিনয়ের ক্ষেত্রে রক্তকরবী কেন অনন্যতার মর্যাদা পেয়েছিল, যদিও তার আগে রবীন্দ্রনাথের চার অধ্যায় অভিনীত হয়েছে, তবু তাতে স্বল্পসংখ্যক অভিনেতা কাজ করেছিলেন। রক্তকরবী নাটকে চরিত্রের সংখ্যা অনেক বেশি এবং প্রায় সব চরিত্রই উচ্চমানের অভিনয় দাবি করে। আর চার অধ্যায় নাটকের কাহিনির চেয়ে রক্তকরবীর কাহিনি আলাদা, তার সংলাপের ধরনও পৃথক। রক্তকরবীর মঞ্চ, আলো, আবহ, পোশাকভাবনা, অভিনয় এবং সর্বোপরি নাট্য-উপস্থাপনার অনন্যতা মানুষকে নিয়ে যেত শিল্প-অভিজ্ঞতার সেই স্তরে, যেখানে সচরাচর কেউ পৌঁছতে পারে না। রক্তকরবীর মঞ্চায়ন শুধু রবীন্দ্রনাটকেই নয়, বাংলা নাটকেও নবীন মাত্রা সঞ্চার করেছিল। বহুরূপীর প্রযোজনাটি কতটুকু বিন্যাসে রাবীন্দ্রিক আর অর্থযোজনার দিক থেকে কতটুকু রবীন্দ্রানুসারী, এ নিয়ে এক সাংস্কৃতিক ঝড়ই বয়ে গিয়েছিল, কত রকমের সমালোচনাই না হয়েছে পক্ষে আর বিপক্ষে। বিরোধিতা এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও তার সরকারের সমালোচনা করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই প্রযোজনা – এ-কথা দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছিল। এতে বহুরূপী গোষ্ঠী বিমূঢ় বোধ করলেও এর মঞ্চায়ন থেকে সরে আসেনি। বরং দিল্লিতে মঞ্চায়নকালে জওহরলাল নেহরু সংসদ অধিবেশন থেকে ছুটে এসেছিলেন বহুরূপীর রক্তকরবী দেখতে। তিনি শুধু পছন্দই করেননি, রীতিমতো প্রীতিবোধ করেছেন। বহুরূপীর এই দিল্লি বিজয়ের পর অব্যাহত ধারায় ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত এর অভিনয় হয়েছে। কলকাতা তো বটেই, দিল্লি, মুম্বাই, এলাহাবাদ এবং বিদেশ থেকে সুনাম কুড়িয়েছিল।



আমি ঠিক বুঝিনা কিন্তু প্রায়শ মনে হয় আজ তোমাকে লিখতে গিয়ে আরো বেশি করে মনে হচ্ছে তৃপ্তি মিত্র তাঁর প্রতিভা ও কাজের যথাযথ সম্মান পাননি, আলোকিত ও স্মরণীয় হবার সবরকম বিশেষত্ব থাকার পরেও তিনি বিস্মৃত কেননা তিনি প্রথমত নারী, দ্বিতীয়ত শম্ভু মিত্রের স্ত্রী, তৃতীয়ত শাঁওলি মিত্রের মা এবং সর্বোপরি তিনি নারী! শম্ভু মিত্রকে কোনভাবেই ছোট না করে আমি তৃপ্তি মিত্রকে দেখতে পাই শম্ভু মিত্রের পাশে কোন কোন ক্ষেত্রে শম্ভু মিত্রের আগেও। আমি কারো অভিনয়ই সরাসরি দেখিনি কিন্তু শম্ভু মিত্র যত ভালোই অভিনেতা হোন তিনি তৃপ্তি মিত্রকে অতিক্রম করতে পারেননি। এই প্রসংগে মনে করতে পারি দুজনের বিবাহ বিচ্ছেদ, প্রধান কারণ ছিল তাঁদের পেশাগত জীবনে সৃজনশীল মতপার্থক্য এবং মতাদর্শগত সংঘাত। তাঁদের বিচ্ছেদ ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে তাঁদের অভিনীত নাটক ও নাট্যদল 'বহুরূপী'-র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সঙ্গেই বেশি জড়িত ছিল। শিখরস্পর্শী স্ত্রী অভিনেত্রী তৃপ্তির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা। এ কি ছিল কেবল ব্যক্তিত্বের সংঘাত কিংবা পঠন-পাঠন অভিজ্ঞতা ও অভিনয়ে অনন্য দুই নাট্যব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব? এই মুহূর্তে স্পষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়। বাংলা নাটকে অভিনয়কুশলতা ও নবনাট্যের বোধ ও আদর্শ সঞ্চারিত করার জন্য এই দম্পতি জীবনের প্রারম্ভে ও মধ্যপর্যায়ে যে-অবদান রেখেছিলেন সংসারের সকল দাবিকে অগ্রাহ্য ও তুচ্ছ করে, তার বিশাল মূল্য রয়েছে। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও দেখা যায়, তৃপ্তি মিত্র যখন কর্কট রোগে ধ্বস্ত এবং মৃত্যুর অতল অন্ধকারের মুখোমুখি শম্ভু মিত্র কত না প্রেমে তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন, স্বপ্ন ও অতীতকাতরতায় প্রাণিত করতে চেয়েছেন। এই মানবিকতা প্রকাশ শম্ভু মিত্রের পক্ষে আগে সম্ভব ছিল না। কেননা তিনি তৃপ্তি মিত্রের খ্যাতি ও নাট্যজ্ঞানের কাছে হারিয়ে যাবার ভয় পেতেন এক পুরুষ হিসেবে। শম্ভু মিত্রের স্বেচ্ছানির্বাসনের যে-বিবরণ পাই তা খুবই কৌতুককর এবং নানা অনুষঙ্গভরা এক বিবরণ। তাঁর অন্তিম জীবনের খুঁটিনাটি এবং দাম্পত্য জীবনে তৃপ্তির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা বহুরূপীর নির্মাণ ও সৃষ্টির পথকে কণ্টকময় করে তুলেছিল – নির্দ্বিধায় এ-কথা তো বলাই যায়। বিনোদিনী দাসীর আত্মজীবনী 'আমার কথা'য় থিয়েটারের মালিক, পরিচালক এবং পৃষ্ঠপোষকরা প্রায়শই নারী শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবনে শোষণের এক নির্মম দলিল, যেখানে দেখা যায় পুরুষরা তাঁদের প্রতিভা ব্যবহার করলেও সামাজিক সম্মান বা স্থায়ী স্বীকৃতি দেননি। বিনোদিনী দাসী থেকে হালের নারী অভিনয় শিল্পীর জীবনে সেই অবস্থার কি খুব পরিবর্তন এসেছে? আমার তো মনে হয়না।



বেলা গড়িয়ে গেছে কখন বুঝতেই পারিনি। আজ আর লিখছিনা আচ্ছা ঋত্বিক ঘটককে তুমি কিভাবে দেখো তোমার চোখে মননে মানুষটি কেমন জানার ইচ্ছে রইলো। কখনো সময় সুযোগ হলেও জানিও।



নিরন্তর ভালো থেকো…

সুস্মি

১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in




















১৬ পর্ব

দুপুরের একটু আগে বড়কালীর ফোন এল।

- খুব ভালো করেছেন, মিঃ রায়।

-কী ভালো করলাম? কী ব্যাপারে বলছ?

-আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।

-তুমি কোথায়?

-কাঠমান্ডুতে।

-তুমি বোধহয় জানোনা এর মধ্যে অনেক কান্ড হয়ে গেছে।

-আমি সব জানি, মিঃ রায়। আমি কাঠমান্ডুতে কিন্তু আমার কাছে সব খবর আছে।

-তুমি জানো পুলিশ তোমার পুত্র এবং পুত্রবধূকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? তুমি জান যে বন্দুকটা ঘটনাচক্রে আমি …

-সব জানি বললাম তো। আপনি যা করেছেন একেবারে ঠিক করেছেন। কিন্তু দয়া করে ভুলে যাবেন না যে রেবাকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচাবার দায়িত্ব আপনার।

-তোমার পুত্র আর পুত্রবধূকে?

-যা ভালো বুঝবেন করুন। কিন্তু আমি আপনাকে বলে রাখছি পুলিশ ওদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে না। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে কপাল চাপড়াবে পুলিশ।

-আমি কী ওদের কেসটাও দেখবো? কী চাও তুমি?

-ওদেরটাও দেখুন। কিন্তু আপনার প্রথম এবং মূল দায়িত্ব রেবা।

-আর তোমার কী হবে?

- আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমার কয়েকটা জিনিস জানার ছিল। দেখুন আমি এখানে একটা হোটেলে আছি। নিজের নামেই আছি। আমি অন্য কোথাও পালানোর চেষতা করিনি। আমি প্রমাণ করতে পারি যে আমি ব্যবসার কাজে এখানে এসেছি। পুলিশ যে কোনও মুহূর্তে আমাকে খুঁজে পেতে পারে। আমি ঠিক করেছি পুলিশ যদি আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে আমি কোনও কথা বলবো না। আমি বলবো যে আমি আমার আইনি পরামর্শদাতার অনুপস্থিতিতে কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবনা।

-সেটা কিন্তু তোমার পক্ষে ভালো হবে না। বিশেষ করে তোমার সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের এবং পুলিশের সন্দেহ বেড়ে যাবে। তোমার সম্বন্ধে মানুষের এবং পুলিশের ভালো ধারণায় চিড় ধরবে। ওরা কিন্তু তোমাকে দোষী প্রমাণ করতে চাইবে।

-করুক। দেখা যাক না কী করে। চাইলে তো আর নির্দোষকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

-কিন্তু তুমি হয়ত জানোনা যে কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে যা দিয়ে তোমাকে দোষী প্রমাণ করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

- হয়ত আমার বিরুদ্ধে আরও কিছু যোগাড় করতে পারে। আপনি রেবার দিকটা দেখুন। আপনার সাহায্য ওর খুব দরকার।আমার ব্যাপারটা আমি সামলে নেব। আমি ওদের সঙ্গে কোনও কথা বলবো না। আমি বলতে বাধ্য নই বলে আমার বিশ্বাস। তাই নয় কি?

-না বাধ্য নও যদি তুমি বলো যে তুমি তোমার অ্যাটর্নির অনুপস্থিতিতে কিছু বলবে না। উনি এলে তারপর বলবে।

-ঠিক আছে। আমি বলবো যে আপনি আমার অ্যাটর্নি এবং আপনার পক্ষে এখন কাঠমান্ডু আসা অসম্ভব। আর আমারও অনেক ব্যবসাসংক্রান্ত জরুরি কাজ আছে। কিন্তু ওরা যদি বাড়াবাড়ি করে তাহলে আমি কী করবো?

-তুমি এখন বিদেশে। ওরা তোমার বিরুদ্ধে খুনে অভিযোগ এনে তোমাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারে।

-বুঝেছি। কিন্তু আমার মনে হয় আমার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ না থাকলে ওরা এত কান্ড করবে না।

-ওরা যদি নিশ্চিত না হয় যে তোমাকে নিয়ে এসে ওদের কোনও লাভ আছে তাহলে ওরা তোমার জন্য সময় নষ্ট করবে না। কিন্তু সমস্যা হলো এই যে ওরা মনে করে তোমাকে নিয়ে এসে ওদের অনেক লাভ আছে।

-সেক্ষেত্রে মুখ বন্ধ করে থাকবো। ওরা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করুক যে আমি খুন করেছি।

- কিন্তু দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারটা উড়িয়ে দিও না।

-না, না। আমি কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছিনা।

-আমার ভয় হচ্ছে এতক্ষণে পুলিশ রেবাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিয়েছে।

-আমারও তাই মনে হচ্ছে।ওরা আমার ছেলে এবং ছেলের বৌকেও জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ওরা যত কেসটার ভিতরে ঢুকবে তত গুলিয়ে যাবে। আমি জানিনা কী ভাবে তবে আপনি যেটা করেছেন সত্যিই ভাবা যায় না। আমার কাছে প্রশংসার ভাষা নেই। আপনি তো এই হোটেলের নাম্বার জানেন এবং এও জানেন আমাকে পেতে গেলে কাকে ফোন করতে হবে।

-ঠিক আছে। আর আমাকে না পেলে সুন্দরীকে ফোন কোরো। আমি কিছু লোকজনকে গোয়েন্দাগিরির জন্য লাগাচ্ছি। ওদের বিলটা কিন্তু যোগ হবে।

-কোনও সমস্যা নেই। আমি বিনা পয়সায় কোনও কাজ করিনা এবং করাইনা। আপনার যেটা ভালো মনে হয় করুন। টাকা নিয়ে ভাববেন না। আপনার বিল নিয়ে আমি আগে কোনওদিন প্রশ্ন করিনি এবং ভবিষ্যতেও করবো না। কিন্তু আপনি আর যাই করুন রেবার দিকে নজর রাখুন। রাখলাম।

বড়কালীর সঙ্গে কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা ঠেলে সুন্দরীকে ঢুকতে দেখে অবাক হলেন পানু রায়। বললেন,’ কী হলো? আমি যে তোমাকে বললাম ভেতরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে।‘

-আমি পাশের দোকান থেকে মাথাধরার একটা ট্যাবলেট কিনে খেয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে দেখলাম এখন বেশ ঝরঝরে লাগছে। আমি ভাবছিলাম ছোটকালী সেদিন গাড়ি কেনার ব্যাপারে আমাদের কী বলছিল।

-কী বলছিল?

-বলছিল যে নতুন গাড়ি কিনে দু’বছর পরে বিক্রি করতে গেলে ভালো দাম পাওয়া যায় না। তাই চেনাশোনা কোনও পুরনো গাড়ির ডিলারের থেকে গাড়ি নেওয়া অনেক বেশি লাভজনক।

-তার মানে তুমি না ঘুমোতে গিয়ে ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলে?

-কিন্তু আমি ঠিক আছি। ট্যাবলেটটা খেয়ে আমি এখন পুরোপুরি ঠিক হয়ে গেছি।

-কেন গিয়েছিলে?

-আমার গাড়িটা ঠিক চলছিল না। তাই ভাবলাম আজ যখন একটু সময় পেলাম তাহলে একবার ঘুরে আসি। ছোটকালী ওখানে ছিলনা।একজন সেলসম্যানের সঙ্গে দেখা হলো। ছেলেটা জানতো তুমি ছোটকালীর বন্ধু। আমি যখন বললাম যে ছোটকালী আমাদের বিশেষ পরিচিত এবং বলেছিলেন যতটা সম্ভব কম দামে পারবেন উনি আমাদের একজনকে বা দু’জনকেই ভালো গাড়ি ব্যবস্থা করে দেবেন। সব শুনে ছেলেটা আমাকে একটা গাড়ি দেখালো। গাড়িটা দেখে ওটার প্রেমে পড়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।

-গাড়িটা কিনলে?

-কেনার কথা ভাবছি। তোমাকে ফোন করার চেষ্টা করলাম কিন্তু পেলাম না।

পানু রায় উত্তর দেবার আগেই দরজা ঠেলে জগাই ঢুকলো। বললো,’ এবার মনে হচ্ছে যাবতীয় কাগজপত্র হাতে নিয়েই কেলো দারোগা তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে।‘

-কেন? কী হয়েছে?

-পুলিশ তো এখন নিজেদের নখ-চুল ছিঁড়ছে। কিছুতেই কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। তোমাকে একটা খবর দিতে এলাম। তোমার কাজে লাগলেও লাগতে পারে। কেলো দারোগা ছোটকালীর দেয়ালে আটকে থাকা বুলেটটাকে নিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসাবে এতক্ষণ নিয়ে আসেনি। কিছুক্ষণ আগে কেলো দারোগা অস্ত্র বিশেষজ্ঞ সমাহারে বুলেট উদ্ধার করতে গিয়ে কী দেখলো জান?

-কী দেখলো?

-কোনও উৎসাহী ব্যক্তি ওটাকে ইতিপূর্বেই ওখান থেকে নিয়ে গেছে। গুলিটা ত্যারচাভাবে টেবিলে লেগে লাফিয়ে উঠে সামনের দেয়ালে গিঁথে গিয়েছিল।কেউ গিয়ে দেয়ালে একটা ছোট গর্ত করে সযত্নে গুলিটাকে নিয়ে চলে গেছে।

পানু রায় ভুরু কুঁচকে সুন্দরীর দিকে তাকালেন। সুন্দরী বলে উঠলো,’ ভাবা যায়? কিন্তু কে এমন কান্ড করতে পারে, জগাই?’

-কে জানে? কোনও উৎসাহী লোকের কাজ হবে। কিন্তু এখন পুরো কেসটা ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে।

-কিন্তু কী করে? কেন একথা বলছো?

-একটা ঘটনা পরম্পরাকে প্রমাণের জন্য খুব দরকারী সূত্র ছিল ঐ গুলিটা। কেলো দারোগা আঙ্গুল কামড়াচ্ছে এখন। সবাই বলবে পুলিশ এতদিন ঘুমিয়েছিল।

পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ জগাই, তুই কোথা থেকে খবর পেলি?’

- অনেক ঘুরপথে খবরটা আমার কাছে এসেছে। সনাতনের লেখাটা কাগজে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে অনেক লোক ওখানে যেতে শুরু করে। ওখানে কী ঘটছে জানার জন্য সনাতন একজন সেলসম্যানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে এবং মনে হয় কিছু পয়সা-কড়ি দিয়ে ওখানে কী হচ্ছে তার খবর জোগাড় করতে থাকে। কিছুক্ষণ আগে সনাতনের কাছে কেলো দারোগার এই বুলেট খুঁজে না পাবার খবরটা সনাতনের কাছে এসে পৌঁছোয়। সনাতনের অফিসের একটা লোক আমাকে চারদিকে কী ঘটছে সেই সংক্রান্ত খবর দেয় নিয়মিত। ঐ লোকটাই একটু আগে আমাকে ফোন করে ব্যাপারটা জানালো।

- জগাই, এতো অত্যন্ত জরুরি খবর। তোর কাছ থেকে আমি এতটা আশা করিনি। আমি খুব খুশি। এরকম খবর জোগাড় করতে থাক। এই ব্যাপারে সব খবর আমার চাই।

-কিন্তু দাদু, খরচের ব্যাপারটাও দেখতে হবে তো?

-খরচের ব্যাপারে কিছু ভাবার দরকার নেই। কোনও দরকারি খবর যেন বাদ না পড়ে।

-ঠিক আছে দাদু। আমি আসছি। দেখি আর কী খবর জোগাড় করতে পারি।

জগাই বেরিয়ে যায়। পানু রায় এবার সুন্দরীর দিকে সোজা তাকিয়ে বললেন,’ সুন্দরী, এবার আসল গল্পটা আমাকে বলো।‘ পানু রায়ের কথা শেষ হবার আগেই বাইরের দরজা ঠেলে কেলো দারোগা ঢুকলো। কেলো দারোগা বললো,’ কোনও ব্যক্তিগত আলোচনার মধ্যে এসে পড়লাম?’ পানু রায় বললেন,’ হ্যাঁ, একটা ছোট ব্যক্তিগত আলোচনা শেষ করার ছিল।‘

-কোনও ব্যাপার নয়। আপনারা শেষ করে নিন। বাইরে আমাদের লোকেরা আছে। আর কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না।

- আমার অফিসটাকে নিজের বাড়ির মত ভাবার জন্য ধন্যবাদ।

-দেখুন আমি আইনের প্রতিনিধি। আইন কারুর বাড়ির বাইরের ঘরে অপেক্ষা করে না। আমাদের যখন কারুর সঙ্গে দেখা করার দরকার হয় তখন আমরা সোজাসুজি তার কাছে পৌঁছে যাই।

-আপনি যে আসছেন সে কথা জানানোর প্রয়োজন বোধ করেন না?

-কিছু কিছু বোকা পুলিশ অফিসার করে। আমি করিনা। আমি কাউকে আগাম সাবধান করিনা। আমি হঠাত পৌঁছে গিয়ে প্রথম এক-দুই সেকেন্ডে তার মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করি।

-আমার মুখ দেখে কী বুঝলেন?

-অনেক কিছু। বুঝলাম যে আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নন।

-ঠিকই বুঝেছেন। যাই হোক, এসে যখন পড়েছেন বসুন। মাথার টুপি খুলুন এবং বলুন আপনার জন্য কী করতে পারি?

-ব্যস্ত হবেন না। আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমি কী চাই।

-আমি তো গনৎকার নই।তাছাড়া আপনি কেন এসেছেন সেই নিয়ে আকাশপাতাল চিন্তা করে সময় নষ্ট করার সময় এবং ইচ্ছা কোনওটাই আমার নেই। আমার আগের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আপনি আপনার কী চাই বা কী ভাবছেন বা কী পছন্দ করেন এবং করেন না তা বেশ গুছিয়েই বলতে পারেন। সময় নষ্ট না করে বলে ফেলুন।

-আপনাকেই আগে বলতে হবে। আপনি কালীকৃষ্ণের অফিসে গিয়েছিলেন এবং ওনার টেবিলে গুলি ছুঁড়েছিলেন।

-ওটা একটা অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা ছিল। কেউ হতাহত হয়নি। আমি কালীকৃষ্ণকে টেবিল বাবদ ক্ষতিপূরণ দেব বলেছি। এতে পুলিশের কী করার আছে? পুলিশের এই ব্যাপারে কোনও আগ্রহ থাকার কথা নয়।

- কোনও আগ্রহ থাকার কথা নয় বলছেন? ধরুন যদি জানা যায় যে ঐ বন্দুকটা দিয়েই শিবুলাল রেগমিকে তার অ্যাপার্টমেন্টে খুন করা হয়েছিল তাহলে?

-আপনি কি নিশ্চিত যে ঐ বন্দুকটা দিয়েই খুন করা হয়েছিল?

-একশোবার। এবার বলুন ঐ বন্দুকটা আপনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন?

- কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে। আমি জানতে চেয়েছিলাম যে ওর কাছে বন্দুক আছে কি না। ও বললো ও আত্মরক্ষার জন্য কাছে বন্দুক রাখে। অনেক সময় গুন্ডা বদমায়েশরা মালিকদের আটকে রেখে টাকা আদায় করে। এখানে এরকম ঘটনা আকছার ঘটে। তাছাড়া কালীকৃষ্ণের লাইসেন্স আছে। আপনি এ ব্যাপারে আমার চেয়ে বেশি জানবেন নিশ্চয়ই।

-তাহলে বলছেন কালীকৃষ্ণ আপনাকে বন্দুকটা দিয়েছিল।

-হ্যাঁ, ওর হাত থেকেই আমি বন্দুকটা নিয়েছিলাম। বলা যেতে পারে ও আমাকে বন্দুকটা দেখাচ্ছিল ।আমি বন্দুকটা ওর হাত থেকে নিয়ে বন্দুকটার ভারসাম্য পরীক্ষা করছিলাম আর তখনই অসাবধানতাবশত ট্রিগারে টান লেগে একটা গুলি ছিটকে যায়। কালীকৃষ্ণ আমাকে বলেনি যে বন্দুকটায় গুলি ভরা আছে।

- আপনি কি ভেবেছিলেন যে খালি বন্দুক নিয়ে উনি আত্মরক্ষা করেন?

-আমি অত কিছু ভাবিনি। বন্দুকের ট্রিগার আমি ইচ্ছাকৃতভাবে টানিনি। বলা যেতে পারে ওটার ভারসাম্য পরীক্ষা করার সময় কোনওভাবে ট্রিগারে টান পরে একটা গুলি বেরিয়ে যায়।

-বেশ, তারপর কী হলো?

-আমি রেবা কৈরালার আইনি পরামর্শদাতা। আমার মনে হয়েছিল রেবার জীবন বিপন্ন হতে পারে। আপনি জানেন ওর বাবা খুন হয়েছিল এবং আমি যতদূর জানি খুনি এখনও অধরা।আমি কালীকৃষ্ণকে বললাম যে বন্দুকটা কয়েকদিনের জন্য রেবাকে দিয়ে রাখলে ভালো হয়। আপনি জানেন কি না জানি না যে কালীকৃষ্ণের বিয়ের আগে পর্যন্ত রেবার সঙ্গে ওর ভালো বন্ধুত্ব ছিল।

-জানি, মিঃ রায়। আর এও জানি যে আপনি খুব ভালোভাবেই জানেন কালীকৃষ্ণের যে বন্দুকটার কথা আপনি বলছেন সেটা দিয়ে শিবুলালকে খুন করা হয়নি।

-শুনে আমার ভালো লাগছে। আমি সত্যিই তাই মনে করি। কিন্তু পুলিশ এত জোর দিয়ে বলতে আরম্ভ করল যে ওটা দিয়েই খুন করা হয়েছে আমার পক্ষে অন্যকিছু বলা সম্ভব হচ্ছিল না।

-আপনি এও জানেন আমি কী বলতে চাইছি। আপনি আসলে আসল খুনী বন্দুকটার সঙ্গে এই বন্দুকটা পাল্টে দিয়েছিলেন। আপনার কাছে খুনী বন্দুকটা ছিল। সেটা আপনি আপনার এক ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। আপনি ঐ বন্দুকটা লুকিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে কালীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আপনি তারপর কালীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন তার কাছে কোনও বন্দুক আছে কি না। উনি বললেন আছে এবং ড্রয়ার থেকে বের করে টেবিলে রাখলেন। আপনি বন্দুকটা পরীক্ষা করার আছিলায় ট্রিগার টেনে দিলেন। ঐ গোলমালের মধ্যে সবার নজর এড়িয়ে আপনি আপনার বন্দুকটার সঙ্গে ঐ বন্দুকটা পাল্টে দিলেন।

-আপনি বলছেন কালীকৃষ্ণের বন্দুকটা খুনী বন্দুক নয়। খুনী বন্দুকটা আমার কাছে ছিল যেটা আমি পাল্টে দিয়েছি। আপনি একটা কাজ করতে পারেন। ঐ বন্দুকটা যেটা আপনারা পেয়েছেন সেটার নাম্বার নিয়ে ওটার রেজিস্ট্রেশন কার নামে দেখতে পারেন।

-সেটা আমরা ইতিমধ্যেই করেছি। ঐ বন্দুকটা কিনেছিলেন কালীকৃষ্ণের বাবা কৃষ্ণকালী।

-তাহলে ওটা কালীকৃষ্ণের কাছে কী করে গেল?

-কৃষ্ণকালীর অনেক দোকানের মধ্যে একটা খেলার সরঞ্জামের দোকান আছে। সেই দোকানের জন্য কৃষ্ণকালী তিনটে একই রকমের বন্দুক কেনে। তিনটেই হুবহু এক। তার মধ্যে একটা সে কালীকৃষ্ণকে দেয় আর দু’টো নিজের কাছে রাখে।

-নিজের কাছে দু’টো রাখে?

-ওনার ছেলে আমাদের তাই বলেছে, মিঃ রায়।

-তার মানে এটাই দাঁড়ায় যে বন্দুকটা আমি কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে নিয়েছিলাম সেটা আসলে কৃষ্ণকালীর এবং কৃষ্ণকালী সেটা তার ছেলে কালীকৃষ্ণকে দিয়েছিল।

-খুনী বন্দুকটা কৃষ্ণকালীর একসঙ্গে কেনা তিনটে একইরকম বন্দুকের একটা। আমরা জানি যে বন্দুকটা আপনি কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে নিয়েছিলেন সেটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-আপনি সেটা কী করে বুঝলেন, দারোগাবাবু?

-কারণ ঐ বন্দুকটা খুনের দিন সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত কখন কোথায় ছিল তার পুরোপুরি হদিশ আমরা কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে পেয়েছি।

-তাহলে আপনি নিশ্চিত যে ঐ বন্দুকটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-আশ্চর্য! সে কথাই তো আমি এসে পর্যন্ত বলে আসছি।

-আপনি একশভাগ নিশ্চিত তো? আগে আপনি বলেছিলেন যে ওটা দিয়েই খুন করা হয়েছিল এবং এখন আপনি বলছেন ওটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-মিঃ রায়, এখন আমি বলছি খুনী বন্দুকটা আপনার কাছে ছিল। ঐ বন্দুকটা কৃষ্ণকালীর বন্দুক যেটা সে কোনও কারণে রেবা কৈরালাকে দিয়েছিল। রেবা কৈরালা ঐ বন্দুকটা নিয়ে শিবুলালের কাছে যায় এবং তাকে খুন করে। রেবা কৈরালা আপনার সাহায্য চায়। আপনি খুনী বন্দুকটা নিয়ে কালীকৃষ্ণের কাছে যান এবং তার বন্দুকের সঙ্গে খুনী বন্দুকটা পাল্টে নেন। তারপর খুনী বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে আপনার সঙ্গে কালীকৃষ্ণ রেবার কাছে যায়।

-দারোগাবাবু, আপনার কেন মনে হচ্ছে যে খুনী বন্দুকটা আমি নিয়ে গিয়ে ওখানে রেখে আসব যাতে পুলিশ সেটা সহজে খুঁজে পায়? একটা কারণ তো দেখান।

- আমি জানিনা কেন।তবে আমি নিশ্চিত আপনি এটা করেছেন। আর একটা কথা বলে রাখি মিঃ রায়, এবার কিন্তু গল্প বলে আপনি পার পাবেন না। শিবুলালের মৃত্যুর সময় আর আপনার ওনার সঙ্গে দেখা করার সময় মিলে যাচ্ছে।

-তার মানে আমি শিবুলালকে খুন করেছি।

-না, আপনি করতেও পারেন। আমি বলছিনা যে আপনি শিবুলালের ফ্ল্যটে ঢুকে ঠান্ডা মাথায় তাকে খুন করেছেন। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে আপনার সঙ্গে কোনও বিষয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। শিবুলাল উত্তেজিত হয়ে বন্দুক বের করলো। তখন কোনও উপায় না দেখে আপনি বন্দুকটা ওর ওপর চেপে ধরে ট্রিগার টেনে দিলেন।

-আপনাকে আরও ভালো একটা গল্প তৈরি করতে হবে, দারোগাবাবু।আমি যখন বেরিয়ে আসি তখন শিবুলাল বেঁচে ছিল এবং ভালো ছিল। সে কোনও একজন আসার জন্য অপেক্ষা করছিল।

-ঠিক, রেবা কৈরালার জন্য।

-না, রেবা নয়। অন্য কেউ যে তাকে একটু আগেই ফোন করেছিল এবং বলেছিল যে সে এক্ষুনি আসছে।

-আপনি কী করে জানলেন?

-শিবুলাল আমাকে চলে যেতে বলেছিল । বলেছিল কেউ একজন এক্ষুনি তার কাছে আসবে এবং ব্যাপারটা বেশ জটিল। আমি যেন তক্ষুনি চলে যাই।

-তক্ষুনি আপনি চলে গেলেন এবং বাড়ির পিছনে অপেক্ষা করতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে জনৈকা মহিলা পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেন আর আপনি তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে গেলেন। তাই তো?

-আমি তাই করেছিলাম?

-একদম তাই এবং ঐ জনৈকা মহিলা সে যেই হোক সেই খুনী। আপনি তাকে বাঁচাতে চাইছেন। আপনি জানতেন সে শিবুলালের কাছে যাবে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সে আপনাকে বলে যে সে শিবুলালকে খুন করেছে। সে বন্দুকটা আপনার হাতে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে সে এখন কী করবে। আপনি তাকে নিশ্চিন্ত করেন এবং বলেন যে আপনি বন্দুকটাকে কোথাও চালান করে দেবেন এবং কেসটাকে গুলিয়ে দেবেন।

-বাঃ, গল্পটা বেশ ভালো সাজিয়েছেন। কিন্তু মুস্কিল হলো এই যে এই গল্পটা প্রমাণ করা অসম্ভব কারণ গল্পটা ভুল।

-আমাদের কাছে প্রমাণ আছে।

-তাই নাকি?

-আমাদের কাছে প্রত্যক্ষদর্শী আছে যে সাক্ষ্য দেবে যে আপনি বাইরে অপেক্ষা করছিলেন এবং ঐ মহিলা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলে আপনি তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যান। আমাদের কাছে আরও প্রত্যক্ষদর্শী আছে যে সাক্ষ্য দেবে যে আপনার কাছে খুনী বন্দুকটা ছিল এবং সেটা থেকে গুলি আপনি কালীকৃষ্ণের টেবিলে ছুঁড়েছিলেন।

-আপনি কী করে প্রমাণ করবেন যে ঐ বন্দুকটাই খুনী বন্দুক?

-ঐ গুলিটা থেকে। আমাদের অস্ত্র বিশারদ অনায়াসেই প্রমাণ করে দেবেন যে ঐ গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। সেটা যদি হয় তাহলে প্রমাণ হবে যে আপনি ঐ মহিলা যিনি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমেছিলেন তাঁর কাছ থেকে খুনী বন্দুকটা নিজের কাছে নিয়েছিলেন। আর তা যদি না হয় তাহলে প্রমাণ হবে আপনি কালীকৃষ্ণের অফিসে বন্দুক বদল করেছিলেন।

-বেশ, বেশ। তার মানে আপনার যুক্তি অনুযায়ী যাই ঘটুক আমি দোষী প্রমাণিত হবো।

-হ্যাঁ, তাতে অসুবিধের কী আছে?

- না এটা অন্যায় হবে। আমার মনে হয় গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হলে আমি দোষী আবার না ছোঁড়া হলে আমি বন্দুক বদলের জন্য দোষী এরকম একটা বিচার ন্যায়সঙ্গত নয়। আমার মনে হয় আপনার এই চিন্তাভাবনা পক্ষপাতদুষ্ট, দারোগাবাবু।

-সেই একই ঘেঁটে দেওয়ার চেষ্টা। যতবারই আমরা কোনও গুলি ছোঁড়ার তদন্তে নামি ততবারই আপনি অন্য একটা বন্দুক আমদানি করে সহজ ব্যাপারটা গুলিয়ে দেন।

-তাতে দোষের কী দেখলেন, দারোগাবাবু।

-এটা বেআইনি, ব্যস।

-তাহলে আমি অপরাধী –এটাই শেষ কথা, ব্যস?

-এবার আপনাকে আর ছাড়ছিনা। সেটা মন দিয়ে শুনে রাখুন।

-আপনি তাহলে আমার উদ্ভাবনীশক্তির প্রশংসা করবেন নিশ্চয়ই?

-আমি আপনার কায়দা ধরে ফেলেছি, মিঃ রায়। এবার কি আপনি বলবেন সেদিন ঠিক কী হয়েছিল? মানে আপনি কী করেছিলেন? যদি বলে দেন ভালো হয়। আমরা আপনাকে অযথা বিরক্ত করবো না। কিন্তু যদি না বলেন তাহলে আমরা অফিসের দেওয়াল থেকে যে গুলিটা উদ্ধার করেছি সেটা আপনার কাছে যে বন্দুকটা ছিল সেটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবো এবং তারপর কী হবে সেতো আপনার জানাই আছে।

সুন্দরী খুক খুক করে কেশে উঠলো। পানু রায় বললেন,’ এটাতো সোজাসুজি ভয় দেখানো হয়ে গেল’। কেলো দারোগা বলল,’ হ্যাঁ। এটাই ঘটবে। আপনাকে আগে থেকে বলে রাখলাম। এটাকে যদি ভয় দেখানো বলেন তবে তাই’।

-আপনি যখন মেনেই নিচ্ছেন আমার আর কিছু করার নেই। আমি আপনাকে বলতে পারি যে আমি কোনও বন্দুক বদল করিনি। আমি যে বন্দুকটা থেকে ভুলবশত গুলি ছুঁড়েছিলাম সেটা এবং কালীকৃষ্ণের ড্রয়ারে যে বন্দুকটা ছিল সে দুটো একই। ঐ বন্দুকটাই কালীকৃষ্ণ রেবার কাছে নিয়ে গিয়েছিল।

-তার মানে আপনি প্রমাণ লুকোনোর চেষ্টা করছেন এবং আততায়ী কে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন।

-আমি আপনাকে যা সত্য তাই বলছি, দারোগাবাবু।

-আপনি পরে বলবেন না যে আমি আপনাকে সু্যোগ দিইনি। আজ আসি।

কেলো দারোগা অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। পানু রায় বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যখন নিশ্চিত হলেন যে কেলো দারোগা আশেপাশে নেই তখন সুন্দরীকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ তুমি কি ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলে এবং গুলিটা দেয়াল থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলে?

-কেন? তোমার কেন মনে হলো আমি এরকম একটা কিছু ঘটাতে পারি?

-তুমি করেছো কি না বলো? আমার ধারণা কেলো দারোগা আমাকে মিথ্যা বলে কথা বের করার চেষ্টা করছিল।

-আমি যদি গুলিটাকে স্মারক হিসাবে নিয়ে এসে থাকি তবে কি সেটা কোনও গুরতর অপরাধ বলে ধরা হবে?

-সেটা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হতে পারে।

-তাহলে আমি যদি বলি যে আমি ওটা নিয়ে এসেছি তাহলে সেটা তোমার পক্ষে অস্বস্তিকর হতে পারে তাই না? আমি বলছি –‘যদি আমি বলি’।

-ঠিক আছে। তুমি যা ভালো বুঝবে।

- তুমি আমাকে অপরাধবোধের হাত থেকে বাঁচালে দাদু।




চলবে