ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়
Posted in ধারাবাহিকপর্ব ২৫(২)
এদিকে জোগনাথের উকিল দেখল মহামহিমের মুড খারাপ। তাই গয়ারামের মেয়েকে নিয়ে প্রশ্ন করা বন্ধ করল। এবার আরেক সাক্ষী কাঠগড়ায় উঠল।
এ হোল সেই লোক জোগনাথের ঘরে খানাতল্লাসির সময় যার গিয়ে আবির্ভাব হয়েছিল এবং তখনই দৌড়ে পুলিশকে বলেছিল—চিন্তা করবেন না। সাক্ষীর দরকার হলে যে কোন দিন আমায় ডাকতে পারেন।
ওর নাম বৈজনাথ, শিবপালগঞ্জের পণ্ডিত রাধেলালের চ্যালা। এ সেই রাধেলাল যার মিথ্যে সাক্ষী দেবার দক্ষতা প্রবাদের পর্যায়ে। আজ পর্যন্ত কোন ঘাগু উকিল ওকে জেরা করে ঘায়েল করতে পারেনি। ্মিথ্যেকে সত্যি প্রমাণ করার বিশেষ ক্ষমতার জেরে রাধেলাল আজ গোটা জেলাতেই নাম করেছেন।
ইদানীং, কিছুদিন ধরে ওনার পূরবওয়ালী প্রেয়সীর প্রেম ওনাকে খানিকটা ঘরমুখো বানিয়েছে। তাই সাক্ষীদেবার প্রাইভেট প্র্যাকটিসের জন্যে সময় দিতে পারছেন না। আগের চেয়ে অনেক কম কেস হাতে নিচ্ছেন। বড় উকিল এবং ডাক্তারেরা যেমন জেনারেল প্র্যাকটিস ছেড়ে কিছু বিশেষ কেস হাতে নেন, তেমনই রাধেলালও সেরেফ দেওয়ানি কেস নিচ্ছেন, তারমধ্যেও শুধু উত্তরাধিকারের মামলা। তবে ফৌজিদারী মামলায় মিথ্যে আমলা ধান্ধা চালু রাখতে উনি কিছু শিষ্য তৈরি করেছেন। বৈজনাথ ওদের মধ্যে সবচেয়ে তুখোড়।
বৈজনাথ ভীখমখেড়া গ্রামের নিবাসী। কিন্তু আশপাশের সব গাঁয়ে কোন ক্রাইম হওয়ার সময় ও আগে থেকে ওই গ্রামে ছিল এটা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ। এইভাবে ওর প্র্যাকটিস শুধু ভীখমখেড়া নয়, কাছাকাছি সব গ্রামে জমে গেছল। ওটা আকস্মিক ঘটনা যে জোগনাথের ঘরে তল্লাসির সময় ও শিবপালগঞ্জেই ছিল। অবশ্য সাক্ষী দেবার জন্য বাস্তবে ও হাজির ছিল কিনা সে কথা প্রাসংগিক নয়।
বৈজনাথ মামলার পুরো প্রমাণ আদালতে উগরে দিল। বলল-- জোগনাথের ঘরের তল্লাশি আমার সামনে হয়েছে। হ্যাঁ, এই তিনটে গয়না যখন পাওয়া গেল তখন আমি হাজির ছিলাম। আমার সামনে বাজেয়াপ্ত করে সীল লাগানো হয়। সেই রিপোর্ট আমার সামনে লেখা হয়, তাতে আমার দস্তখত ওখানেই নেয়া হয়—এই সব।
এবার জোগনাথের উকিল ক্রস এগজামিনেশন শুরু করল।
--তুমি ভীখমখেড়া গ্রামে থাকো?
--হ্যাঁ।
--ভীখমখেড়া শিবপালগঞ্জ থেকে দু’মাইল দূরে?
--তা জানি না।
--কত দূরে?
--শিবপালগঞ্জে নৌটংকী বা যাত্রাপালা হলে ভীখমখেড়ায় শোনা যায়।
---এক মাইল হবে?
--বলতে পারব না।
---আধা ক্রোশ?
--জানি না।
--কুড়ি মাইল?
--কী করে বলব? মেপে দেখিনি।
এবার মহামহিম সাক্ষীকে কটমটিয়ে দেখে বললেন—দুটো গ্রামের মাঝখানে কী আছে?
---কয়েকটা ধানের ক্ষেত।
--ক’টা ক্ষেত?
--এই দশ-বিশ-পঞ্চাশ হবে।
--ঠিক করে ভেবে বল, ক’টা?
--বলতে পারব না, গুণে দেখিনি।
জজ এবার কটমটিয়ে পাবলিক প্রসিকিউটরকে দেখলেন। তিনি বললেন—শ্রীমানজী, সাক্ষী ঠিক বলছে। ও ক্ষেত গোণে নি। তবে গ্রাম দুটো পাশাপাশি, এক মাইলের দূরত্ব—দারোগার এজাহারে রেকর্ডে এসে গেছে।
মহামহিম জোগনাথের উকিলকে বললেন—তাহলে দূরত্ব নিয়ে জেরা করার কী দরকার? আপনি কি দারোগার বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করছেন?
--না, চ্যালেঞ্জ করছি না মহোদয়। তবু জেরা করা দরকার।
--কেন?
--দেখাতে চাই সাক্ষীর বুদ্ধিসুদ্ধি কেমন?
--নাকি দেখাতে চান আপনার বুদ্ধিসুদ্ধি কেমন, তাই তো?
মহামহিমের মুখে এই বাক্য শুনে আসামী পক্ষের উকিলের চেহারা তেতে উঠল। কিন্তু মহামহিম হেসে দিলেন যাতে বোঝা গেল উনি ঠাট্টা করছেন, অপমান নয়। এবার ধীরে ধীরে যারা ঠাট্টা বুঝতে পারল, তারা সবাই হাসতে লাগল। সবার শেষে জোগনাথের উকিলও হেসে উঠলেন।
আদালতের অলিখিত নিয়ম হোল বিচারক এবং উকিল কখনও কখনও নিজেদের মধ্যে আকবর-বীরবল স্টাইলে হাসিঠাট্টা করবেন এবং উপস্থিত-বুদ্ধির পরিচয় দেবেন। এই অনাবশ্যক রসচর্চা শেষ হলে ভীখমখেড়া ও শিবপালগঞ্জের দূরত্ব নিয়ে যত জেরা ছিল সব খারিজ করা হল। কিন্তু তার আগে ওসব আদালতের রেকর্ডে লেখা হয়ে গেছল।
বৈজনাথকে নতুন করে জেরা করা শুরু হোল।
--তুমি আজ পর্যন্ত ক’টা মামলায় পুলিশের সাক্ষী হয়েছ?
--- মনে নেই।
--আমি বলছি, অন্ততঃ আজ অব্দি ষাট মামলায়।
--বলতে থাকুন, আমার তো মনে নেই।
--- এর আগে কখনও পুলিশের সাক্ষী হয়ে আদালতে এসেছিলে?
--পুলিশের সাক্ষী! সেটা আবার কী?
--তুমি পালটা প্রশ্ন না করে সিধে উত্তর দাও।
-- আমার সঙ্গে বেশি তুমি তুমি বা তুইতোকারি করবেন না। আমি কোন এলেবেলে লোক নই।
এটা শোনার পর আসামী পক্ষের উকিল নিজের আব্রু রক্ষায় মহামহিমের শরণ নিল। তিনি সাক্ষীকে বললেন—প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর দাও।
বৈজনাথ মাথা ঝুঁকিয়ে বলল—আগে ঠিক ঠিক প্রশ্ন করা হোক গরীবের ঈশ্বর! এ জানতে চায় পুলিশের জন্যে কতবার সাক্ষী হয়েছি? আমি পুলিশ-টুলিশের কী জানি! আমি হুজুর সত্যের সাক্ষী দিই। যা জানি তা বলতে কোন সংকোচ নেই। সে পুলিশের জমাদার কি ঝাড়ুদার—যেই ডেকে পাঠাক।
মহামহিম কিছু বলার আগেই জোগনাথের উকিলের রাগ হোল। উনি আবার রেগে যাওয়ার জন্য প্রসিদ্ধ। দালালেরা নতুন মামলা করতে আসা লোককে ওনার রাগ দেখাতেই এজলাসে ধরে ধরে নিয়ে আসত। রাগই ওনার বিদ্যা বুদ্ধি, ওনার আইনের জ্ঞান, ওনার অস্ত্রশস্ত্র এবং রক্ষা কবচ। রাগ ওনার সাইনবোর্ড, ওনার বিজ্ঞাপন। রাগ ওনার পিতা-মাতা-সহকারী, রাগ হল প্রভু ও সখা। রাগ হলে উনি থর থর কাঁপতে থাকেন, অন্যেরা কেঁপে উঠুক, না উঠুক। বুদ্ধিমান আদালত ওনার রাগকে উপেক্ষা করে চুপচাপ কাজ চালিয়ে যায়। এসব ওনার হাঁচি কাশি ধরে নিয়ে না দেখার ভান করে। যদি কোন কোর্ট তাঁর রেগে যাওয়ায় আপত্তি করে তাহলে বার অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠকে ওই কোর্টের নিন্দে করে বক্তৃতা ঝাড়েন এবং অ্যাসোসিয়েশন নিন্দা প্রস্তাব পাশ করে।
আজকের আদালত বুদ্ধিমান, তাই রাগকে পাত্তা দেয় নি। উকিল সাহেব গর্জন করলেন—আমার সোজাসুজি জিজ্ঞেস করছি, বেশি এঁড়েপনা না দেখিয়ে জবাব দাও। সরকারি মামলায় পুলিশের হয়ে কতবার সাক্ষী দিয়েছ?
বৈজনাথ বলল,--তাহলে আমিও সোজাসুজি জিজ্ঞেস করি--- উকিল সাহেব, ডাকাত আর খুনিদের বাঁচাতে তুমি আজ পর্যন্ত কত মামলায় জেরা করেছ? নাও্ বলে ফেল।
উকিল এতদিন রাগ দেখালে লোকজনকে ভয় পেতে দেখেছেন, এঁড়ে যেতে দেখেছেন। কিন্তু এমন ঠান্ডা মাথায় অসভ্যতা করতে দেখেন নি। এমন জবাব শুনে ওঁর গোঁসা হার মেনে লেজ নাড়তে লাগল। ফের চিত হয়ে শূন্যে চার পা তুলে সাহায্যের আশায় মহামহিমের দিকে তাকালো।
--শ্রীমানজী , দেখছেন সাক্ষীর বেয়াড়াপনা! কেমন অসভ্যের মত কথা বলছে! এতে আদালতের মানহানি হচ্ছে।
বৈজনাথ চতুর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছিল, যেন উকিল দৌড়ুতে থাকা উকিলকে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়েছে। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, --নিজে যা খুশি বলে যাচ্ছ উকিল সাহেব, আমি দুটো প্রশ্ন করলাম কিনা আদালতের কাছে নালিশ!
কিন্তু মহামহিম কোন দরকারি কাগজ পড়ায় ব্যস্ত; অতএব এই গর্তের থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরোতে উকিলের নিজের প্রতিভাই সম্বল। উনি দাঁতে দাঁত চেপে বললেন—কথায় কথায় পুলিশের হয়ে মিথ্যে সাক্ষী দিয়ে যাচ্ছ ব্যাটা! উলটো আমাকেই জেরা করতে চাও?
বৈজনাথ চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল। তারপর উকিলের দিকে তাচ্ছিলের সঙ্গে তাকিয়ে সবাইকে শুনিয়ে বলল—যার যেমন ধান্ধা!
মহামহিমের দরকারি কাগজে সই করা হয়ে গেল। এখন উনি শিশুর সারল্যে বললেন—নিজেদের মধ্যে কথাবলা ঠিক নয়। হ্যাঁ, উকিল সাহেব। জেরা করতে থাকুন।
--শ্রীমানজী, এই সাক্ষীকে জেরা করা মুশকিল। এ সব প্রশ্নের জবাবে কেবল প্যাঁচ কষে। এটা নোট করা হোক।
মহামহিম বৈজনাথের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। বৈজনাথ পাব্লিক প্রসিকিউটরের দিকে তাকালো। প্রসিকিউটর মহামহিমের দিকে চেয়ে রইলেন।
আদালত বিপক্ষের উকিলকে বলল—এগিয়ে চলুন।
উকিল সারসের মত এক পা থেকে অন্য পায়ে ভর বদলে নিল। যেন জেরা করার এক ঐতিহাসিক যুগ শেষ করে অন্য যুগে পা রাখল।
--তুমি সরকার বনাম চুরই, ধারা ৩৭৯, মামলায় সরকারের সাক্ষী ছিলে?
--মনে নেই।
--এর শুনানি তো এই মাসেই হয়েছে।
বৈজনাথ খানিক ভেবে বলল—হুম, এ মাসে একটা মামলায় সাক্ষী দিয়েছিলাম বটে। আমার বাগানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ল একটা লোক বগলে একটা পোটলা নিয়ে যাচ্ছে—
--এজলাসে কী বলেছিলে সেটা ফের এখানে শোনাতে হবে না। এটা বল,শুধু এমাসে নয়, গত মাসেও একটা কেসে সাক্ষী দিয়েছিলে?
--দিয়েছিলাম, কিন্তু মামলার নাম মনে নেই।
এবার আদালত রেগে গেলেন।
--এটা কী কথা, সাক্ষী দিয়েছিলে আর মামলার নাম মনে নেই?
--ধর্মাবতার, আমরা গেঁয়ো লোক, লেখাপড়া শিখি নি।
উকিল বলল—শ্রীমানজী, এর এসব চালাকিও নোট করা হোক।
বৈজনাথ বলল—উনি আর কত নোট করবেন, আপনিই নোট করুন। আপনার মুনশীকে বলুন, ও সব লিখে নেবে।
মহামহিম এবার বৈজনাথকে ঝাড়লেন, বেশ ভাল করে। এত বকুনি দিলেন যে খানিকক্ষণ ও ঘাবড়ে গিয়ে চুপসে রইল। ওর চেহারা ফ্যাকাশে। কিন্তু মহামহিমের বকুনি যখন দু’মিনিট ছাড়িয়ে তিন মিনিটেও থামল না, তখন বৈজনাথ সামলে উঠল। ওস্তাদ পণ্ডিত রাধেলালের কথা মনে পড়ে গেল। গুরু ওকে শিখিয়েছিল –বেটা, সাক্ষী দেবার সময় দেখবি কখনও কখনও উকিল বা আদালতের মহামান্য বিগড়ে গেছে। তাতে ঘাবড়াতে নেই। ওরা বেচারা, সারাদিন মগজমারি করে ক্লান্ত হয়। ওদের পেট খারাপ হয়। ওরা হরদম বুকজ্বালা, অগ্নিমান্দ্য এবং অর্শ-ভগন্দরের রোগী হয়। তাই ওরা খিটখিটে। ওদের বকুনি চেঁচামেচিতে ঘাবড়াতে নেই। মনে করবে, ওরা তোমাকে নয়, নিজের পেটের রোগকে বকছে। এছাড়া এটাও খেয়াল রাখবে যে ওরা বড় মানুষ, লেখাপড়া জানা লোক। ওদের সাধ্যি কি যে তোমার মামলা বোঝে? তাই ওরা বিগড়ে গেলে নিজের মন শান্ত রেখে বুদ্ধি খাটিয়ে ভাববে কী করে ফের শান্ত করা যায়।
মহামহিম ওকে শেষবারের মত সতর্ক করলেন –জেরার জবাবে সেরেফ ‘হাঁ’ বা ‘না’ বলবে!
এবার জেরার ট্যাংক সমতল ভূমিতে গড়গড়িয়ে চলতে লাগল।
--আজ থেকে ছয়মাস আগে তুমি সরকার বনাম বিসেসর মামলায় সরকারি সাক্ষী হয়েছিলে? বয়ান দিয়েছিলে?
--না, (কথাটা সত্যি, কারণ বৈজনাথের সাক্ষ্য ছয় না, সাত মাস আগে হয়েছিল)।
--বছরখানেক আগে তুমি সরকার বনাম ছুন্নু মামলায় সরকার পক্ষের সাক্ষী হয়েছিলে?
--না। (এটাও সত্যি, ওই মামলায় চোদ্দমাস আগে ও আদালতে হাজির হয়েছিল)।
-- -----?
--না।
--- --?
--না।
---?
--না।
---?
--হাঁ।
----?
--হাঁ।
--দেখা যাচ্ছে তুমি একগাদা মামলায় সরকারের সাক্ষী ছিলে।
--না, আপনি তো শুধু দুটো মামলা গুনলেন।
--এতসব মামলায় তুমিই সর্বদা পুলিশের হয়ে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। তুমি সবসময় অপরাধ ঘটার জায়গায় হাজির। এর কোন বিশেষ কারণ?
বৈজনাথ হাকিমের দিকে তাকিয়ে শহীদ হওয়ার গলার স্বরে বলল—কারণ আমি এক জোয়ান মরদ। বদমাশদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে আমাদের এলাকায় সবাই ভয় পায়। আমার কোন চিন্তা নেই আর আমি গুন্ডাগিরির কড়া দুশমন। তাই চোখে কিছু পড়লে বিনা ঘাবড়ে খোলাখুলি বলে দিই, কারও পরোয়া করি না।
বলতে বলতে গর্বে ওর বুকের ছাতি ফুলে উঠল। উকিল ওকে আটকাতে বৃথা চেষ্টা করল, মহামহিম ওকে কাঠগড়া থেকে নেমে যেতে আদেশ দিল। কিন্তু বৈজনাথের লেকচার বন্ধ হোল না। ও বলতে থাকল—আমি শপথ নিয়েছি যে আমাদের এলাকায় সব গুন্ডাকে পাড়াছাড়া করে তবে দম নেব। আমি এক কথার মানুষ, নিজের প্রতিজ্ঞায় অটল। এর জন্যে প্রাণ যায় তো যাক।
(চলবে)



0 comments: