গল্প - রাহুল দাশগুপ্ত
Posted in গল্প১
ধীরে ধীরে বৃদ্ধ পার্কের ভিতর প্রবেশ করলেন। তাঁর পা দুটো যেন সিসের মতো ভারি হয়ে উঠেছে। তিনি যেন আর নিজের শরীরের ভার বহন করতে পারছেন না। নিজেকে টেনে নিয়ে যেতেও তাঁর কষ্ট হচ্ছে।
গাছের তলায় একটা ফাঁকা বেঞ্চ বেশ পছন্দ হল তাঁর। সেখানেই তিনি বসে পড়লেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, ভেতরে ভেতরে কোনো কারণে অস্থির হয়ে উঠেছেন। শ্বাস নিতেও তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। বাতাসটা কেমন যেন ভারি আর ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। একটু পরিষ্কার বাতাসের জন্য তাঁর ভেতরটা যেন আঁকুপাকু করে উঠল।
সন্ধ্যা হবো হবো করছে। গোটা আকাশে কেউ যেন মুঠো মুঠো আবির ছড়িয়ে দিয়েছে। নানা খরনের পাখির ডাকে ভরে উঠেছিল গোটা পার্ক। বিভিন্ন গাছে তারা এসে বসেছিল।
বৃদ্ধের পাশে দুটি অল্পবয়সি ছেলে–মেয়ে এসে বসেছিল। তারা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিল। তারা ভেবেছিল, বৃদ্ধ মানুষ, কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু সমস্যা হল।
বৃদ্ধ ছেলেটির পিঠে আঙুল দিয়ে দুবার টোকা মারলেন। ছেলেটি ঝুঁকে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলছিল। সে ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বৃদ্ধের দিকে তাকাল। তার কপালে ভাঁজ পড়েছে।
বৃদ্ধের মুখটা যেন এক অপার্থিব আনন্দে ভরে উঠেছে। অবশেষে তিনি একজন কথা বলার মানুষ পেয়েছেন। কেউ তাঁর পাশে এসে বসেছে। কারো সঙ্গে তাঁর কথা বলার সুযোগ হয়েছে!
বৃদ্ধের মুখের ভাব দেখে ছেলেটি আশ্চর্য হয়ে গেল। কিন্তু আশ্চর্য হওয়ার আরো অনেক বাকি ছিল। তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বৃদ্ধ বলে উঠলেন, একটা গল্প শুনবে? আমি অনেক গল্প জানি।
ছেলেটি এবার রুক্ষ স্বরে বলে উঠল, নিকুচি করেছে আপনার গল্পের! দেখছেন না, আমরা কথা বলছি! জরুরি কথা আছে আমাদের...
বৃদ্ধ যেন আমলই দিলেন না সেই কথার। তিনি যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। ওদের দিকে তাকিয়ে তিনি আবার বললেন, শুনেই দেখো না, বেশ মজার একটা গল্প। তোমাদের ভালো লাগবেই।
বৃদ্ধের আকুতি কিন্তু মেয়েটিকে স্পর্শ করেছিল। সে বৃদ্ধকে দেখে, তাঁর কথা শুনে যেন একটু কৌতুকই বোধ করছিল। এবার সে বলল, ঠিক বলছেন? আপনার গল্প শুনে আমরা মজা পাবো?
বৃদ্ধের সারা মুখ যেন খুশিতে ঝলমল করে উঠল। তিনি আর সময় নষ্ট করতে চাইলেন না। বললেন, শোনো তাহলে...
মেয়েটি কিন্তু দুম করে বলে বসল, আপনি খুব একা, তাই না?
বৃদ্ধের মুখটা হঠাৎ বিষন্ন হয়ে উঠল। তিনি প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গিয়ে বললেন, গল্পটা খুব মজার।
মেয়েটি মিষ্টি গলায় বলল, আচ্ছা, বলুন।
বৃদ্ধ গল্প বলতে শুরু করলেন। যেন ঘোরের মধ্যেই কথা বলছেন। স্থান–কাল–পাত্র সম্পর্কে বোধ লোপ পেয়ে গিয়েছে তাঁর।
মেয়েটি তাকিয়ে দেখল, ছেলেটির মুখ অসম্ভব গম্ভীর হয়ে উঠেছে। আর বৃদ্ধ একা একাই নিজের মনে হেসে চলেছেন। গল্পটা যে খুবই মজার, তা নিয়ে বৃদ্ধের কোনও সন্দেহই নেই। তিনি নিজেই নিজের গল্প শুনে সবচেয়ে বেশি মজা পাচ্ছেন।
মেয়েটি কিন্তু সতর্ক হয়ে উঠল। বৃদ্ধের গল্প শুনে মজা পাওয়ার মতো সে কিছুই পায়নি। শুধু শুধুই সময় নষ্ট। সে বৃদ্ধকে দু–একবার থামানোর চেষ্টা করল। কিন্তু বৃদ্ধ থামার মানুষ নন। তিনি বলেই চলেছেন। গল্প বলা ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে তাঁর কোনো হুঁশই নেই।
ছেলেটি যেন হিসহিসিয়ে উঠল, তুমি যাবে, না, এখানেই বসে থাকবে?
বৃদ্ধের জন্য মেয়েটির মায়া হল। কিন্তু সে যথেষ্ট করেছে। আর কেন? ছেলেটির কথাও তো ভাবতে হবে! সময় তো সত্যিই নষ্ট হচ্ছে!
মেয়েটি চুপ করে আছে দেখে ছেলেটি আবার হিসহিসিয়ে উঠল, তুমি তাহলে বসেই থাকো, আমি চললাম। লোকটা পাগল। স্থান–কাল–পাত্রের কোনো বোধই নেই। তুমি যদি একটা পাগলের সঙ্গে সময় কাটাতে চাও, কাটাও, আমার সময় নেই...
মেয়েটি বুঝতে পারল, সত্যিই আর দেরি করা ঠিক হবে না। ছেলেটা তাহলে ফসকে যাবে। সে ধৈর্যের শেষ সীমায় গিয়ে পৌঁছেছে। সে ছেলেটির হাত শক্ত করে ধরল। তারপর নিমেষের মধ্যে বৃদ্ধের চোখের আড়ালে চলে গেল।
গল্প শেষ করে গভীর তৃপ্তিতে বৃদ্ধ চোখ খুললেন। চোখ বুজেই তিনি এতক্ষণ গল্প বলে যাচ্ছিলেন। গল্পের ভেতরে, গল্পের মজায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন। চোখ খুলে প্রথমেই তিনি জানতে চাইলেন, কেমন লাগল?
কিন্তু বেঞ্চটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছে কখন। তিনি কাউকেই দেখতে পেলেন না। প্রথমটায় তিনি একটু অবাকই হলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। গল্প শোনাতে পেরে তাঁর মনটা এখন বেশ হালকা লাগছে। এতক্ষণ বুকের মধ্যে যেন একটা পাথরের ভার টের পাচ্ছিলেন। গল্প শোনাতে শোনাতে সেই পাথরটা কখন যেন নেমে গিয়েছে। মাথাটাও হালকা হয়ে গিয়েছে। বেশ ঝরঝরে লাগছে এখন। বাতাসটাও হঠাৎ যেন পাতলা হয়ে গিয়েছে। শ্বাস–প্রশ্বাসও সহজ হয়ে উঠেছে।
হালকা চালে শিস দিতে দিতে, ফুরফুরে মেজাজে, তিনি দ্রুত পায়ে পার্ক থেকে বেরিয়ে এলেন।
২
পরদিন বিকেলে পার্কে এসে বৃদ্ধ আর এক কাণ্ড করলেন। ফাঁকা একটা জায়গায় সবুজ ঘাসের ওপর কয়েকটা ছেলে–মেয়ে নিজেদের ভেতর ব্যাডমিন্টন খেলছিল। বৃদ্ধ বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাদের দেখলেন। অসম্ভব অস্থির বোধ করছিলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। প্রায় মরিয়া হয়ে সোজা তাদের কাছে গিয়ে বললেন, কিছুক্ষণের জন্য তোমরা খেলা থামাবে?
ছেলে–মেয়েরা অবাক হয়ে বৃদ্ধের দিকে তাকাল। বৃদ্ধের কিন্তু কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। তিনি যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। যেন খুব জরুরি কোনো কথা আছে, এইভাবে তিনি বললেন, তোমাদের আমি একটা মজার গল্প শোনাবো...
ছেলেমেয়েদের দেখেই বোঝা গেল, তারা দারুণ অবাক হয়ে গেছে। ওদের মধ্যে যে ছেলেটার চেহারা বেশ বড়োসড়ো, সে বলে উঠল, দেখছ না, আমরা খেলছি? এখন আমাদের বিরক্ত করতে এসেছো কেন?
বৃদ্ধ ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মিনতি করে বললেন, ঠিক পাঁচ মিনিট নেবো। একটা দারুণ মজার গল্প শোনাবো। এরকম গল্প তোমরা আগে কখনও শোনোনি...
সবচেয়ে ছোটো মেয়েটি এবার বৃদ্ধের চোখে চোখ রেখে বলে উঠল, আমি শুনবো। হ্যাঁ, ওরা কেউ না শুনুক, আমি একাই শুনবো। আমি গল্প শুনতে খুব ভালোবাসি। তুমি আমায় বলবে?
বৃদ্ধ খুব খুশি হলেন। বললেন, আমি তো বলতেই চাই। এসো, ওই বেঞ্চের ওপর আমরা দুজনে বসি। তারপর তোমায় আমার গল্প শোনাবো...
ছোট্ট মেয়েটি মাঠের একধারে নিজের র্যাকেটটি রেখে এসে বৃদ্ধের কাছে গল্প শুনতে এল। আগেরদিনের সেই বেঞ্চে গিয়ে ওরা বসল। বাকিরা আগের মতোই খেলতে লাগল।
বৃদ্ধের গল্প শুনে মেয়েটি খিলখিল করে হাসতে লাগল। সেই হাসির শব্দ বৃদ্ধের কানে যেন মধুবর্ষণ করতে লাগল। তিনি খুব উৎসাহ নিয়েই গল্প বলতে লাগলেন।
একটু পরেই মেয়েটি দেখতে পেল, তার মা তাকে হাত নেড়ে ডাকছে। সে ছুটে গেল মায়ের কাছে। মা রেগে ছিল। ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ওখানে কী করছিস? বন্ধুরা তো দিব্যি খেলছে। ওদের সঙ্গে খেলছিস না কেন?
আমি গল্প শুনছি মা। খুব মজার একটা গল্প। ছোট্টো মেয়েটি বলল।
মা বিরক্ত হয়ে বলল, তোকে কতদিন বলেছি না, কখনও কোনো অচেনা লোক ডাকলে যাবি না। তুই চিনিস ওই বুড়ো লোকটাকে?
মেয়েটি মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল, সে চেনে না।
মা বলল, তাহলে? কার কী মতলব আছে, আমরা জানি?
মেয়েটি বলল, ঠিক আছে মা। শুধু আজ শুনতে দাও, গল্পটা শেষ করে আসি। তুমি একটু লক্ষ্য রেখো, তাহলেই হবে...
সে ছুটে গেল বৃদ্ধের কাছে। বৃদ্ধ তখনও গল্প বলেই চলেছিলেন। আর নিজের মনেই মিটিমিটি হাসছিলেন। মেয়েটি যে কখন তার পাশ থেকে উঠে গেছে, সে ব্যাপারে তাঁর কোনো হুঁশই নেই। গল্পটি শেষ করে মেয়েটিকে দেখে তিনি খুবই খুশি হলেন।
মেয়েটি গল্পটির চেয়েও গল্পকথককে দেখে বেশি মজা পাচ্ছিল। গল্পটির ব্যাপারে একটু পরেই সে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু এরকম আশ্চর্য গল্পকথক সে আগে কখনও দেখেনি। এই দাদু নিজেই নিজের গল্প শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ে।
মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ হেসে জানতে চাইলেন, মজা লেগেছে?
মেয়েটি পুরো গল্পটা শোনেনি। তবু সে এই মজার লোকটির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, খুব। কিন্তু কাল থেকে আর ডেকো না। মা বকবে...
বৃদ্ধের মুখটা করুণ হয়ে গেল। কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। মেয়েটি ছুটে চলে গেল। বৃদ্ধ সেদিকে বিষন্ন চোখে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে হল, গল্প শোনানোর জন্য কাল থেকে আবার নতুন কাউকে খুঁজে নিতে হবে। গল্প না বলে তিনি থাকতে পারবেন না। তাঁর মাথা ফেটে যাবে। বুক ফেটে যাবে। গল্প তাঁকে বলতেই হবে!
তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁকে খুব ক্লান্ত আর বিষন্ন দেখাচ্ছিল। তাঁর মুখের বলিরেখাগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। একটু পরে তাঁকে আর কেউ দেখতে পেল না।
৩
গোটা পার্কে বৃদ্ধের ব্যাপারে যেন একটা ভীতি ছড়িয়ে গেছে। তাঁকে দেখলেই লোকে কৌতুক বোধ করে। কৌতূহলের চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে। কারো দিকে তাক করে তিনি এগিয়ে আসছেন দেখলেই, সে পালিয়ে যায়। বৃদ্ধকে সবাই উপদ্রব বলেই মনে করে, তাঁকে এড়িয়ে চলতে চায়।
লোকে বলাবলি করতে শুরু করেছিল, লোকটা পাগল। সবাইকে ধরে ধরে গল্প শোনাতে চায়। গল্প শোনানোর জন্য জোর করে, পীড়াপীড়ি করে। কারো সুবিধা–অসুবিধা বোঝে না। আগ্রহী–অনাগ্রহী বিচার করে না।
পার্কে যারা আসে, বৃদ্ধকে দেখলেই তারা কেমন যেন সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। একজন নিরীহ বৃদ্ধ লোক যে এতটা ত্রাস ছড়াতে পারে, তা যেন অবিশ্বাস্যই মনে হয়!
কেউ কেউ অবশ্য সহানুভূতির সুরে বলত, লোকটা বড়ো একা। তাই ওরকম করে।
কিন্তু এরকম লোক কমই ছিল। বৃদ্ধকে দেখলে বেশিরভাগ মানুষেরই অস্বস্তি হতো।
কারো কারো আবার খুবই বিশ্রী প্রতিক্রিয়া হতো। একদিন পার্কের সবুজ ঘাসে এক যুবক শুয়ে ছিল। বৃদ্ধের কেন জানি তাকে দেখে ভালো লেগে গেল। তিনি যুবকটির পাশে গিয়ে বসলেন। যুবকটি চোখ বুজে ঝিমোচ্ছিলো। বৃদ্ধকে দেখেই তার কপালে ভাঁজ পড়ল। কিছুটা রুক্ষভাবেই সে জানতে চাইল, কী চাই?
বৃদ্ধ তার রুক্ষতাকে আমলই দিলেন না। মিষ্টি করে জানতে চাইলেন, একটা গল্প শুনবে?
যুবকটি হঠাৎ উঠে বসল। তার মুখ–চোখ খুব হিংস্র দেখাচ্ছিল। তারপর সে চেঁচিয়ে উঠল, কেন আপনি এরকম করেন? এভাবে এসে সবাইকে বিরক্ত করেন? কাউকে আপনি শান্তি দেবেন না? নিজের মতো থাকতে দেবেন না? কেন আপনার এই গায়ে–পড়া ভাব?
বৃদ্ধ আহত চোখে যুবকটির দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। আস্তে আস্তে হেঁটে গিয়ে নিজের সেই প্রিয় বেঞ্চে বসলেন। ছেলেটির ব্যবহারে তিনি আঘাত পেয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু অন্য কারণটাই তাঁকে বেশি চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। কাউকে না কাউকে গল্প তাঁকে শোনাতেই হবে। তা নাহলে তাঁর মাথাটা ফেটে যাবে। বুকটা চৌচির হয়ে যাবে। তাঁর ভিতরে যেন তোলপাড় শুরু হয়েছিল।
সেই সময় হঠাৎ অল্পবয়সী কয়েকজন যুবক এসে তাঁকে ঘিরে দাঁড়াল। ছেলেগুলোকে দেখলেই বোঝা যায়, এরা সব লোকাল গুণ্ডা। এদের মধ্যে নেতা গোছের ছেলেটি পকেট থেকে ফস করে একটা ছুরি বার করে বৃদ্ধের সামনে উঁচিয়ে ধরল। তারপর তীক্ষ্ণ গলায় বলল, এক্ষুনি, এখান থেকে চলে যান। আপনার নামে অনেক কমপ্লেন। আর কখনও যেন আপনাকে এই পার্কে না দেখি...
বৃদ্ধের কানে কথাগুলো ঢুকল কিনা, ঠিক বোঝা গেল না। তিনি আদৌ কি বুঝলেন কে জানে, ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর পার্কের গেটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। যেখানে বাচ্চারা খেলে, তাঁকে দেখে খেলা থামিয়ে তারা হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠল। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাঁকে দেখতে লাগল।
বৃদ্ধ আজ কারো দিকে তাকালেন না। তাঁর ভেতরে অসম্ভব কষ্ট হচ্ছিল। কোনো অপমান–অসম্মানই তাঁর গায়ে লাগছে না। শুধু মনে হচ্ছে, কাউকে একটা তাঁকে পেতেই হবে। যে গল্পটা শোনাবেন বলে ঠিক করে এসেছেন, কাউকে না কাউকে তাঁকে শোনাতেই হবে।
৪
ঠিক সেই সময় কে যেন বৃদ্ধের দিকে ছুটে এল। তারপর রীতিমতো উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল, দাদু, আজ গল্প শোনাবেন না?
বৃদ্ধ থমকে দাঁড়ালেন। এক ঝলমলে যুবতী। মেয়েটিকে তিনি চেনেন না। তাই ঈষৎ বিস্মিত হয়ে তার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন। তারপর মৃদু স্বরে জানতে চাইলেন, কে তুমি?
মেয়েটি দূরে বাচ্চা ছেলে–মেয়েদের ভিড়টার দিকে আঙুল দেখিয়ে বিশেষ একজনকে দেখানোর চেষ্টা করল। বৃদ্ধ দেখতে পেলেন, সেই ছোট্ট মেয়েটি, যাকে তিনি গল্প শুনিয়েছিলেন।
যুবতীটি সারা মুখে ঝলমলে হাসি ছড়িয়ে বলল, আমি পূজা। ওর টিচার। ওর মায়ের বন্ধুও বটে! ওর মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। তাই আজ আপনার গল্প শুনতে এলাম।
বৃদ্ধ বিষন্ন হেসে বললেন, এখান থেকে ওরা আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি চলে যাচ্ছি...
পূজা যেন একটু ধাক্কাই খেল। তারপর মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, বেশ তো, যাওয়ার অনেক জায়গা আছে। উল্টোদিকে একটা ক্যাফে আছে। ওখানে বসেই না হয় আপনার গল্প শুনবো...
বৃদ্ধ রাজি হলেন। একটু পরে দেখা গেল, গল্প জমে উঠেছে। বৃদ্ধ বলে চলেছেন, আর মেয়েটি গালে হাত দিয়ে দারুণ আগ্রহে গল্প শুনে চলেছে। ওদের দুজনের মধ্যে রাখা আছে কফি আর পাকোড়া। কিন্তু খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। গল্পের নেশায় খাবারের কথা দুজনের কারোরই মনে নেই।
গল্প বলতে বলতে বৃদ্ধ চোখ বুজে দিচ্ছেন মাঝেমধ্যে। তিনি যেন গল্পের রঙিন, মজাদার দুনিয়ায় হারিয়ে গেছেন। নিজের গল্পে নিজেই মশগুল হয়ে কখনও বা মিটিমিটি হাসছেন, যা তাঁর স্বভাব।
হঠাৎ বৃদ্ধ গল্প থামিয়ে দিলেন। অদ্ভুত চোখে তাকালেন মেয়েটির দিকে। তারপর সংশয়াচ্ছন্ন গলায় বললেন, তোমাকে কী আগে কোথাও দেখেছি? এত চেনা লাগছে কেন?
মেয়েটি বৃদ্ধের কথাকে গ্রাহ্যই করল না। বরং তাড়া দিয়ে বলল, গল্প থামিয়ে দিলেন কেন? আমি কিন্তু গল্প শুনতেই এসেছি। আগে ওটা শেষ করুন...
বৃদ্ধ যেন নিজের মধ্যে তলিয়ে গেছেন। হাবুডুবু খাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরার মতো কিছু একটা পেলেন। তাঁর গলাতেও অনিশ্চয়তার ভাবটা কেটে গেছিল।
তিনি বললেন, হ্যাঁ, এবার বুঝেছি। তোমাকে দেখতে ঠিক আমার স্ত্রী–র মতো। হঠাৎ দেখে আমার চোখে যেন ধাধা লেগে গেছিল। মনে হয়েছিল, আমার সামনে যেন সে–ই বসে আছে! অল্প বয়সে আমার স্ত্রী ঠিক তোমার মতোই দেখতে ছিল...
পূজা বলল, বেশ কাকতালীয় ব্যাপার তো!
বৃদ্ধ বলে চললেন, আমার স্ত্রী খুব গল্প শুনতে চাইত। ওর জন্য রোজ আমাকে নতুন নতুন গল্প ভাবতে হতো। রাতে পাশে শুয়ে আমার মুখে গল্প না শুনলে ওর ঘুম আসতো না। আর ঠিক তোমার মতোই গল্প শেষ করার জন্য তাড়া দিত। কতদিন পর এত আগ্রহ নিয়ে কেউ আমার গল্প শুনছে! গল্প শেষ করার জন্য তাড়া দিচ্ছে!
পূজা জানতে চাইল, আপনার স্ত্রী এখন কোথায়?
কয়েক মাস আগে আমার স্ত্রী মারা গেছে। আমরা নিঃসন্তান। ওখানে আর থাকতে পারলাম না। সবসময় ওর কথা মনে পড়ত। তারপর একদিন ঝোঁকের বশেই সব ছেড়েছুড়ে এই শহরে চলে এলাম। কিন্তু এখানে আমি কাউকেই চিনি না। কাকে এখন আমার গল্পগুলো শোনাই? কেউ যে আমার গল্পগুলো শুনতেই চায় না!
বৃদ্ধ চোখ বুজে দিলেন।
পূজা করুণামাখা চোখে বৃদ্ধের দিকে তাকাল। তারপর বলল, গল্প শোনাতে না পারলে আপনার খুব কষ্ট হয় বুঝি?
বৃদ্ধ বললেন, খুব কষ্ট হয়। শ্বাস নিতে পারি না। গল্পগুলো বাইরে বেরোতে না পেরে ভেতরে চাপ দিতে থাকে। কেউ যেন আমার ফুসফুসটাকে নিজের মুঠোয় নিয়ে পিষতে থাকে।
পূজা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বুঝেছি।
গল্পটা শেষ করার পর বৃদ্ধ দেখলেন, পূজা মিটিমিটি হাসছে। তার গালে টোল পড়েছে। সেদিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ বললেন, তোমাকে গল্প শোনাতে এত ভালো লাগল কেন বলো তো?
বৃদ্ধ খুব আস্তে আস্তে নিজের মাথাটা নাড়ছিলেন। যেন তিনি বুঝতে পেরেছেন, কেন এতক্ষণ ধরে পূজাকে গল্প শোনাতে তাঁর এত ভালো লেগেছে! আসলে সে নেহাৎ উপলক্ষ্য মাত্র। পূজাকে সামনে দেখে তিনি নিজের মৃত স্ত্রী–কেই এতক্ষণ ধরে গল্প শুনিয়ে গিয়েছেন। বহুদিন পর।
পূজার দিকে তাকিয়ে তিনি জানতে চাইলেন, তুমি রোজ আসবে? আমার গল্প শুনবে?
পূজার যেন এতক্ষণে খেয়াল হল, কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সেই ঠাণ্ডা কফিতেই চুমুক দিয়ে সে বলল, তা কি হয়?
বৃদ্ধ জানতে চাইলেন, তাহলে আজ এলে কেন?
পূজার গালে আবার টোল পড়ল। সে হেসে বলল, আবার হারিয়ে যাবো বলে!
ঠিক আমার স্ত্রী–র মতো, তাই না? বৃদ্ধের গলার স্বর গম্ভীর শোনালো।
মেয়েটি একটু দ্বিধাগ্রস্তভাবে বলল, ঠাট্টা করছিলাম। স্যরি।
বৃদ্ধ ম্লান হাসলেন। তারপর বললেন, না, না, ঠিকই তো বলেছো। কার অত সময় আছে?
কিন্তু তারপরই তিনি বিপন্ন বোধ করলেন। সত্যিই তো। একটু পরেই তো পূজা চলে যাবে। কাল তিনি কাকে গল্প শোনাবেন? কীভাবে কাটবে তাঁর দিনগুলো? এই শহরে যে তাঁর কোনও শ্রোতাই নেই! কেউ–ই তাঁর গল্প শুনতে চায় না!
৫
হঠাৎ পূজা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। তারপর বলল, দাদু, আপনার প্রবলেম আমি সলভ করে ফেলেছি।
বৃদ্ধ পূজার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে সারল্য আর বিস্ময় মিলেমিশে আছে। তিনি পূজার কথা বোঝার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পুরোপুরি যেন বুঝে উঠতে পারছেন না।
আপনাকে আমি আমাদের ক্লাবে নিয়ে যাবো। সেখানে আপনি প্রচুর শ্রোতা পাবেন। যত খুশি গল্প বলবেন।
বৃদ্ধকে দেখে মনে হল, তাঁর নিজের যেন কোনো ইচ্ছাশক্তি নেই। তিনি পূজার ওপরই নিজেকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়েছেন।
হঠাৎ তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ভাঙা গলায় বললেন, আজ বাড়ি যাই। খুব দুর্বল লাগছে।
পূজা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আমাকে ধরুন। আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি। কাল কিন্তু ঠিক বিকেল পাঁচটায় আপনাকে নিতে আসব। তৈরি থাকবেন।
পরদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই বৃদ্ধকে নিয়ে পূজা ওদের ক্লাবে পৌঁছে গেল। আধুনিক, সুসজ্জিত একটি ক্লাব। ভেতরে সবুজ লন। সেখানে ছড়ানো–ছিটানো চেয়ার। একটা ছাতার নিচে বৃদ্ধের বসার জায়গা হয়েছে।
ক্লাবে আজ বেশ ভিড়। অনেকেই এসেছে কৌতূহলী হয়ে। নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে বৃদ্ধ জানতে চাইলেন, এরা কারা?
কারা? পূজার চোখে কৌতুক খেলা করছে।
এই, এত মানুষ?
এরা সবাই আপনার শ্রোতা।
এত শ্রোতা? বৃদ্ধ অবাক হলেন। আমার তো একজন হলেই চলে যেত!
দাদু, ভিড়ে আপনার অসুবিধে হয়?
বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, মনে হয়, যেন হারিয়ে গেছি। নিজেকে খুঁজে পাচ্ছি না।
প্রায় দশ মিনিট হয়ে গেছে। শ্রোতাদের মধ্যে কোলাহল বেড়ে চলেছে। তারা একটু একটু করে অধৈর্য হয়ে উঠছে। কিন্তু বৃদ্ধ চুপ করেই আছেন। তিনি বিষন্ন চোখে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর বিহ্বল দুটো চোখ জলে ভরে গেছে। তাঁর মাথা হঠাৎ এমন ফাঁকা হয়ে গেছে কেন? তিনি কিছুই মনে করতে পারছেন না। তাঁর যেন কিছুই বলার নেই।
ভিড়ের মধ্যে থেকে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, উনি কিছু বলছেন না কেন?
আর একজন বলে উঠল, উনি কী বোবা?
কর্মকর্তাগোছের কে যেন বলে উঠল, এ কাকে ধরে আনলে পূজা?
পূজা বৃদ্ধের কাছে গিয়ে বলল, কিছু বলুন দাদু। সবাই আপনার গল্প শুনতে চাইছে...
বৃদ্ধ কিছুই বলতে পারলেন না। ফ্যালফ্যাল করে কয়েক মুহূর্ত পূজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর গাল বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে নামতে লাগল।
পূজার সারা মুখ অস্বস্তিতে ভরে উঠেছে। ভিড়ের দিকে সে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর চেঁচিয়ে উঠল, উনি অসুস্থ। আপনাদের সবাইকে এভাবে বিরক্ত করার জন্য আমি দুঃখিত।
ভিড়ের মধ্য থেকে আবার কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, গল্প বলতে এসে উনি নিজেই যে গল্প হয়ে গেলেন...
একটা হাস্যরোল ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বৃদ্ধের কথা ভুলেই গেল সবাই। সবার অলক্ষ্যে, নিঃশব্দে বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে পূজা ফিসফিস করে বলল, ভুল হয়ে গেছে দাদু। আমার বোঝা উচিত ছিল, ভিড় আপনার মতো মানুষের জন্য নয়। ওতে আপনার নিঃসঙ্গতা আরো বেড়ে যেতে পারে...
বৃদ্ধ আলতো করে পূজার হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে চাপ দিলেন। অনেকক্ষণ পর তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল। এই ক্লাবটা একটা নদীর ধারে। সেই নদীর দিকে একটা বারান্দা আছে। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে সেই বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলেন।
একটা বেতের চেয়ারে গিয়ে বসলেন তিনি। নদীর দিকে তাকালেন। এখন গোধূলির সময়। সারা আকাশে কেউ যেন আবির মাখিয়ে দিয়েছে। ক্লাবের সবাই তাঁকে ভুলে গেছে। শুধু উল্টোদিকের চেয়ারে বসে আছে পূজা। এই জায়গাটা নির্জন। দূরে হইচই হচ্ছে।
পূজা বলছিল, দাদু, যখনই কষ্ট হবে এই ক্লাবে চলে আসবেন। কেউ আপনাকে আটকাবে না। আমার বাবা এখানকার সেক্রেটারি। তাকে আপনার ব্যাপারে বলে রেখেছি। শ্রোতা হিসাবে ঠিক কাউকে পেয়ে যাবেন।
বৃদ্ধ কি কিছুই শুনতে পেলেন? নদীর দিক থেকে চোখ সরিয়ে তিনি পূজার দিকে তাকালেন। ফ্যালফ্যাল করে। কয়েক মুহূর্ত পরেই যেন আর কোনো হুঁশ রইলো না তাঁর। নদীর দিকে আবার মুখ ফিরিয়ে তিনি জলের ওপর পাখিদের ওড়াওড়ি দেখতে থাকলেন।
হঠাৎ সেই ছোট্ট মেয়েটি দৌড়ে এল। সে এক্ষুনি তার মায়ের সঙ্গে ক্লাবে এসেছে। তারপর সেই বৃদ্ধকে দেখেই ছুটে এল তাঁর কাছে। একগাল হেসে বলে উঠল, দাদু, তুমি এখানে?
বৃদ্ধের চোখ দুটো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শিশুটির দিকে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন, একটা গল্প শুনবে?
মেয়েটি দারুণ উৎসাহে বলল, সেইজন্যই তো এলাম...
বৃদ্ধের আবার সব মনে পড়ে গেছে। তিনি গল্প বলে চলেছেন। যথারীতি একটা একঘেয়ে, বিরক্তিকর গল্প। বৃদ্ধ কিন্তু মাঝেমাঝেই হেসে গড়িয়ে পড়ছেন। নিজের গল্পে তিনি নিজেই মশগুল হয়ে গেছেন।
মেয়েটিও মজে গেছে। গল্প শুনে না গল্পকথককে দেখে, বোঝা মুশকিল। কিন্তু সে অবাক চোখে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁর গলার স্বরকে, সেই স্বরের ওঠা–নামাকে অনুসরণ করে চলেছে। সেই স্বরের আকর্ষণকে এড়াতে পারছে না। তাঁর মুখের নানা কৌতুককর ভঙ্গিতে মোহাবিষ্ট হয়ে উঠেছে। তার দু–চোখে মুগ্ধতা।
মেয়েটির মা এগিয়ে আসছিল সেদিকে। তার কপালে ভাঁজ পড়েছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। মেয়ে আন্টিকে দেখে ছুটে গেল। তারপর আর ফিরছে না কেন? হঠাৎ বৃদ্ধকে এখানে, এই ক্লাবে দেখে সে রীতিমতো অবাকও হয়েছে।
পূ্জা এগিয়ে গেল তার দিকে। মেয়েটির মা কিছু বলার আগেই সে তার হাত ধরে বলল, এখন ওদের বিরক্ত করো না। ওদিকে চলো। কফি খাই...
.jpeg)


0 comments: