3

বইঘর - যশোধরা রায়চৌধুরী

Posted in







এই ভূগোল বস্তুত অনেক বেশি বিস্তৃত

যশোধরা রায়চৌধুরী






একটি নদী অনেক মানুষ - সতেরো গল্প
মৃদুল কান্তি দে
ঋতবাক প্রকাশনা
মূল্য ৪০০


২০০৯ -১১ , তিনটি বছর আমি গৌহাটিতে বসবাস করতাম। সরকারি চাকরির সূত্রে। সেখানে গিয়ে জানলাম গুয়াহাটি বলতে হয়। জানলাম সেখানে দুটি গ্রীষ্মকাল। বর্ষার অব্যবহিত পরে আগস্ট সেপ্টেম্বর তীক্ষ্ণ ও ঘর্মাক্ত এক গ্রীষ্ম পড়ে। জানলাম ভিজে ভিজে শীত সেখানে, জানলাম বাত দাঁত এই দুই সমস্যায় সে অঞ্চলে সবাই জর্জরিত। গুয়াহাটি আর ব্রহ্মপুত্র একাঙ্গী। অঙ্গাঙ্গী জড়িত । আমার আশৈশবের শোনা "ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন" গানটির মূলে পল রোবসনের "ওল ম্যান রিভার" আছে তা যেমন জানতাম, অহমিয়া গান "বড়া লুইত তুমি বড়া লুইত বোবা কিয়োঁ"র কথাও জানতাম। ব্রহ্মপুত্রকে নিয়ে রচিত, ভূপেন হাজরিকার কন্ঠে সে গানটি বহুবার শোনার পর, একদিন সত্যিই অসমে গিয়ে দাঁড়ালাম ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। সত্যি সত্যিই ব্রহ্মপুত্রের সুবিশাল সুগভীর ঘোলা জলের কূল তল হীন গাম্ভীর্যের সামনে মনে হয়েছিল গানটির এই বড়া লুইত ভার্শনটিই যেন বেশি সুপ্রযুক্ত। দু কূল প্লাবী, বন্যাদায়ী, ব্রহ্মপুত্র শুধু নদ নয়, ভৈরব মূর্তি আছে তার।

এই সময়েই আমার আলাপ হয় শ্রী মৃদুল দে-র সঙ্গে। তিনি রেল অডিটের কর্মী ছিলেন। মৃদুলের গল্প পড়ার অভিজ্ঞতা সে সময় থেকেই, এবং রীতিমতো চমক দেওয়া নানা লেখা তাঁর।

এইবার হাতে এল তাঁর এক পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। "একটি নদী অনেক মানুষ", সতেরো গল্প। এই বইয়ের প্রচ্ছদে ব্রহ্মপুত্রের শতজল ঝর্ণার ধ্বনি শোনা যায়। এবং লেখা থাকে, "ব্রহ্মপুত্র জেগে থাকে আঁতুড় ঘরে মা। নানা জাতি নানা ভাষার তুমি বন্দনা"।

শুরুতেই মালুম, এই বই একটি ব্রহ্মপুত্র নদকে ঘিরে ঘিরে বুনে তোলা গল্পের ভান্ডার। এ গ্রন্থের কনটেন্ট ঠিক কী তা বলতে গেলে দুভাবে বলা যায়। এক, গল্পসংগ্রহ । দুই, ফিক্স আপ নভেল। আসলে বিদেশের রে ব্রাডবেরি আদি বহু লেখক, লিখেছেন ফিক্স আপ নভেল। উপন্যাসোপম গল্পসংগ্রহ। যেখানে একেকটি গল্প নিটোল হয়েও, একে অপরের গায়ে হেলান দিয়ে আছে।

লেখক সূচনা কথায় লিখেছেন ঃ

"গল্প লেখার পটভূমি স্বভাবত সজীবতার আত্মপ্রকাশে নিজের নৈপুণ্যে বিচিত্রগামী। এই অনুভূতি মনের ভাবনায় উত্তর- পূর্বের অনন্য সাধারণ মানুষের ভালোবাসার স্পর্শে সচল অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে, যা চোখে দেখা সীমানার মধ্যে কেবল আটকে থাকে না, হৃদয়বৃত্ত ছুঁয়ে রাখে শাশ্বত সুর-ধ্বনির মতো। এটাই আত্মসন্ধানের পরম্পরা। উপলব্ধির এই প্রবাহে বহুমান ব্ৰহ্মপুত্র নদ আমাকে নব নব ঐশ্বর্য দিয়েছে সৃষ্টির উপাদান পেতে। সেখানে কোনো প্রাচীর নেই, দেখতে শেখায় প্রকৃতির গাছপালার ডাল একইরকমভাবে আলোছায়ার একই দিকে শুধু ছড়ায় না। নানা দিকেই তার শাখা প্রশাখা।

এই সংকলনে সতেরোটি গল্প। লেখার সময়কাল ১৯৯৫ থেকে ২০২১। এই বিস্তৃত সময় পর্বে লেখালেখির সংসার থেকে নির্বাচন করে নিলাম সেই সব গল্প যার ভরকেন্দ্র ব্রহ্মপুত্র নদের জনপদ। এবং শাখা প্রশাখায় উপস্থিত এপার- ওপার বাংলা। তবে সামাজিক-রাজনৈতিক দেশপ্রসিদ্ধ পরিসর এমনই, এই ভরকেন্দ্র সঞ্চরণশীল হয়েই যায় এবং ক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে যে-কোনো নদ-নদীর অববাহিকা মনোনীত স্থান ও লোকালয়ের ঘরে বাইরে।"

একের পর এক গল্প। সবকটির প্রেক্ষিত ব্রহ্মপুত্রপাড়, গুয়াহাটি বা তার আশেপাশের অঞ্চল। সময় যানে চেপে কখনো আশির দশক কখনো নব্বইয়ের দশকে যাতায়াত। এই গোটা চলাচল অত্যন্ত স্বচ্ছলভাবে করেন ঝরঝরে এক গদ্য ভঙ্গিতে মৃদুল দে। বোঝা যায় বাংলা কথাকারদের মধ্যে অন্যতম তিনি, যাঁর কলমে সময় সমাজ ফুটে ওঠে অতি সহজে, ছোট ছোট বাক্যে, অতীত বর্তমানের চলাচল হয় অবলীলায়।

মৃদুলের কলমে আছে মানবিকতা, জীবন বোধ, রাজনীতি সচেতনতা, সময় সচেতনতা। বলা হচ্ছে গুয়াহাটিকে ভূগোল করে। অন্তঃসারে আছে রাজনীতি সাম্প্রদায়িকতা হানাহানি অনিশ্চিতি, আর অনেক খেটে খাওয়া মানুষ। অঞ্চলের সারাৎসার না জানলে লেখা যায়না এভাবে ধুলোর গন্ধ আর হাই ওয়ের কথা।

চরিত্রগুলি বাস্তব, অতিবাস্তব, কখনো বা পরাবাস্তবের ধার ঘেঁষে যায়। যেমন তুহিন, যে আশির দশকে বুট পালিশ করেছে। ছাত্র আন্দোলন করেছে। বুটপালিসের টাকা ছাত্র সংগ্রাম তহবিলে জমা দিয়েছে। তাকে নিয়ে গল্প বুটপালিশ একদিন প্রতিদিন। বার বার কাব্যিক মোচড়ে ঘুরে এসেছে একটি কথা। নানা আকারে উৎকন্ঠা ফণা তুলে আছে।

প্রতি গল্পে মৃদুল এঁকে রেখে যাচ্ছেন নিরাপত্তাহীনতা। সমকালীন চোরা ঠান্ডা ভয়ের স্রোত। পূর্বের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের চেয়ে আলাদা। কিন্তু তবু উৎকন্ঠাগুলো সত্য। ঝাঁ চকচকে অফিস বা এরোপ্লেন আছে। তথাপি ভয়ের চোরা স্রোত। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে লিখেছেন মৃদুল এই গল্পগুলি । স্পষ্ট বোঝা যায়।

"অমরেন্দ্র একবার বলেছিলো, গণতান্ত্রিক দেশে কারিয়াপ্পার প্রভুত্ব বা শাসন কাম্য নয়। নরেন্দ্রনাথ তখনই চেপে ধরেছিলো ভাগ্নেকে, তুই গণতান্ত্রিক মহকুমাধিপতিকে ধরে কয়েনের বস্তা ফিরিয়ে দিস আমাকে! ক’বস্তা চুরি হয়েছে জানিস! চোর ডাকাতদের বাড়বাড়ন্ত, আর তুই নাকে তেল দিয়ে সুশ্রাব্য কথা বলে যাচ্ছিস।

পাঁচ মিনিট হাঁটলে হাইওয়ে। এই দিকে যাও, গুয়াহাটি। ওই দিকে, তেজপুর। আর কী চাই! ধান ভাঙার কল যন্ত্রনির্ভর শব্দের উৎস। এই শব্দ রামায়ণের মতো মিশে আছে মাংস-মজ্জায়। হৃৎপিণ্ডের শব্দ এখন ধানকলের শব্দপুঞ্জের একটি শাখা বটে।

ভালো লাগে রান্নাঘরের দীর্ঘ করিডোরে রাখা বেঞ্চে বসে, সুবিস্তৃত উঠোনের মুখোমুখি, গরম ভাত আর নানা সবজি বিভূষিত গরম ডাল খেতে। রুদ্র ধানকলের পাশ দিয়ে রাস্তা ধরে চলে এল মফস্বলের একমাত্র সিনেমা হলের কাছে। পাশে একটি ছোটো মাঠ। সেখানে মাইক, চোঙা, কয়েকটি চেয়ার আর কয়েক জন যুবক। বেলা তখন এগারোটা। খানিকটা গেলে হাইওয়ে, দোকানপাট।"

চলনে শৈল্পিক কাব্যিক। কথাসাহিত্যের এই ঢং বড় পছন্দের।

ক্ষেত্রহরির ক্ষেত্রভূমি। গল্পটি বিদেশি ভগনিয়া মানে শরণার্থীর । মা বাবার কাগজ না থাকা নিয়ে গল্প। এন আর সি -র কথা সোচ্চারে বলা নেই শুরুতে। গল্পের ভেতরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। হালকা ঢঙে। নিরাপত্তাহীনতার গল্প শুরু হয় মুরগি নিয়ে বাসে ওঠার খন্ডচিত্র দিয়ে, মুরগির বাসভাড়া হাফটিকেট না ফুল টিকেট তাই দিয়ে। তারপর গল্পটা এসে পড়ে দুরন্ত এক সন্ত্রাসের ভেতর। আপাদমস্তক শোষিত মানুষের বিষয়ে।

বরং বলা যায়, বাধ্য হত। বাঁশের মাচান পায়ের আঙুলে চেপে উপরে উঠতে হত। এক তলা, দুই তলা, তিন তলা। খুব কষ্ট হত নারা শরীরে। ক্ষিধে জর্জর মনে।

একপাশে মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র, অপার তার বিস্তার। একপাশে স্তব্ধ সারবদ্ধ গাড়ির জট। বাঁচার তাগিদে ক্ষেত্রহরির হঠাৎ মনে হলো, নির্বাক সহস্র ইঞ্জিন গর্জন করে উঠুক এক্ষুনি। এই শ্রমজীবী মানুষ স্বেচ্ছাচারিতার দাস নয়। ভয়শূন্য স্বাধীন চিত্তে ও শ্বাস নিক। অথবা বহমান ব্ৰহ্মপুত্র তেজস্বী ঢেউয়ের কলরবে বলে উঠুক, এই শ্রমিক এই ভূখণ্ডে এসেছে সত্তরের কুড়ি ফেব্রুয়ারি। তারপর গা-গতরে খেটে কত নির্মাণ শিল্পে বা উৎপাদন বলয়ে অহর্নিশ কাজ করেছে। খাঁচায় আটকে রেখো না ওকে। মুক্ত স্কুল বালকের মতো ও গাছতলার ছায়ায় বিশ্রাম চায়।

ঠা ঠা রোদ্দুরে ক্ষেত্রহরি হাঁটছে। কোথায় যাবে, সে জানে না। তাকে নজরবন্দি অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে দুই অচেনা যুবক। ধরণীর নির্দেশ, সস্তায় শ্রম দিতে হবে। মাথায় ষোলো বা কুড়িখানা ইট তুলে বহুতল দালানে কাজ। তবু কি রেহাই আছে! রাজনৈতিক পরিস্থিতির গঠন কৌশল এমন যে ক্ষেত্রহরিকে অস্তিত্বহীন করা কিছুই না।

এরপর চলচ্চিত্রের মত একটা ঘটনাপ্রবাহ, হাতে প্রাণ রেখে মানুষের পলায়নের বর্ণনা। দ্রুতগামী শটে শটে ।

যানজট আকার নিয়েছে এমন। আগুন আগুন। লেলিহান শিখা ট্রাক বাস মোটর গাড়ির ছাদ টপকে এগিয়ে আসছে। নিশ্চল গাড়িগুলো থেকে প্রাণ বাঁচাতে ঝটপট দরজা খুলে নেমে পড়লে লোকজন। চরম বিশৃঙ্খলার অন্তর্গত ধোঁয়াধূসর সে ওই যুবকদের থেকে বিচ্ছিন্ন।

একাকী ক্ষেত্রহরি পলাতক, এসে পৌঁছায় একটি বাড়িতে। আশ্রয় পায়।

পুত্রবধূ জানতে চাইলেন, ‘দেউতা, আপনি কি ওকে চেনেন? ‘ভালো করে চিনি। ক্ষেত্রহরি। বিল্ডিং-এর লেবার। বঙালি মানুহ ।

এইবার সমস্যা খোলসা করে বলা হল। তারপরও কোন পরিত্রাণ পেল না ক্ষেত্র হরি । তাকে এই সমৃদ্ধ মানুষটি নিজের খামারের কাজে পাঠিয়ে দিলেন, বন্দীসম! ঘেটো থেকে আরেক ঘেটোতে চলে যায় ক্ষেত্রহরি।

মৃদুল দের কলমে সুর আছে গান আছে ছবি আছে। আছে দীর্ঘকাল অসমে থাকার , অসমের সংস্কৃতি জগতকে কাছের থেকে দেখার প্রমাণ। অজস্র সুন্দর মানুষ, শিল্পী তাঁর গল্পে আনাগোণা করে। তবু একেবারে সাধারণ মানুষের অনিরাপত্তা পাশাপাশি তিনি লিপিবদ্ধ করেই চলেন।

যেমন ঠোক্কর গল্পের নকুল মন্ডল। যাকে পরিত্রাণ করে এক রহস্যময় পুরুষ। নকুলের সঙ্গে তার অহি নকুল সম্পর্ক হবার কথা। কিন্তু মানবিকতার কারণে সে পুরনো কৃতজ্ঞতা ভোলেনি।

অথবা দেওয়াল গল্পে বাস স্ট্যান্ড যার জমি গ্রাস করে নেবে সেই ভীত ধনেশ্বর থেকে ফুলেফেঁপে ওঠা ব্যবসায়ীতে পরিণত ধনেশ্বর। উল্টোদিকে নিতুল। যার কিছু না থাকলেও আত্মমর্যাদা আছে। শোষককে ভয় পায় না যে।

গল্পে গল্পে বাস্তবকে পরাবাস্তবের দিকে হাত ধরে এগিয়ে দিয়েছেন মৃদুল। একটি গল্পে ( পোশাক) ধাবমান নগ্ন মেয়েকে পাঞ্জাবি খুলে দেওয়া যোগব্রতর ছবি ভাইরাল হয়ে যাওয়া। সংবাদ পত্রে পত্রে ছড়িয়ে যাওয়া একটি নগ্ন মেয়ের ছুটে যাওয়ার কাহিনি , তাকে বাঁচাতে চেয়ে পাঞ্জাবি খুলে দেওয়া ... এই কাহিনির মূলে আছে সত্যি ঘটনা... আমার নিজ চোখে দেখা সেই ফুটেজ। সেই জায়গা থেকে মৃদুল বুনলেন গল্প। এনে দিলেন ভিয়েতনামে মার্কিন বোমার তান্ডবে পোশাক পুড়ে যাওয়া উলঙ্গ মেয়ের ছুটের কথা। সেই ছবিও লাইফ ম্যাগাজিনের পাতায় ষাটের দশকের শেষে আমরা দেখেছিলাম... জুড়ে গেল আন্তর্জাতিক বৃত্ত। ধ্বংস আর সন্ত্রাসের।

এই বইয়ের গল্প পড়ার পাঠক সেই সমাজ ও রাজনীতি সচেতন, ভাষামুখী পাঠক। এ বই একটা তীক্ষ্ণ শলাকার মত। ফিলগুডের পরত ছিঁড়ে ছিঁড়ে, লাতিন আমেরিকার ছায়াছবির মত আমাদের ছন্নছাড়া, নষ্ট সময়কে দেখায়। ভূগোল হতে পারে ব্রহ্মপুত্র। কিন্তু এ কাহিনি কি গঙ্গা যমুনা অথবা নর্মদার অববাহিকা থেকে আদৌ আলাদা? একেবারেই নয়।

কাব্যিক ভাষার এই বইটির ছাপাই বাঁধাই কাগজের মান, মুদ্রণের মান সবই অতি উৎকৃষ্ট। তবে প্রচ্ছদে ব্যবহৃত ফন্ট একটু পুরনো বলে মনে হয়েছে।

3 comments:

  1. খুব সুন্দর আলোচনা করেছেন যশোধরা। মৃদুলবাবু দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই উত্তর পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাংলা গল্পকার।

    ReplyDelete
  2. ব্যক্তিগত ভাবে কাজের সূত্রেই মৃদুলদাকে চিনি। চমৎকার মানবিক দিক শুধু লেখায় নয় জীবন যাপনেও। অনুচ্চ গলায় কথ

    ReplyDelete
  3. দারুণ লাগলো পড়তে।

    ReplyDelete