প্রবন্ধ - দিলীপ মজুমদার
Posted in প্রবন্ধভারত ভ্রমণে এসেছিলেন এক আমেরিকান যুবতী । নাম তাঁর মিস ক্যাথারিন মেয়ো । ভারত ভ্রমণ শেষ করে দেশে ফিরে তিনি লিখে ফেললেন এক বই : ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ । সে বই প্রকাশিত হল ১৯২৭ সালে । সে বই পড়ে ভারতবাসীরা ফেটে পড়ল ক্ষোভে । ইংরেজ শাসকরা লেখিকাকে মাথায় তুলে নাচতে লাগল। আর তাঁর বিবেচক দেশবাসীরা অবাক হয়ে গেল মিস মেয়োর কাণ্ড- কারখানায় ।
পেনসিলভেনিয়ার রিজওয়েতে জন্ম ক্যাথারিনের । জেমস হেনরি তাঁর বাবা আর মায়ের নাম হ্যারিয়েট এলিজাবেথ । স্নাতক হবার পরে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় অসওয়াল্ড গ্যারিসন ভিলার্ডের সঙ্গে । সে সময় দাসপ্রধা বিরোধী জন ব্রাউনের জীবনী লেখার কাজে নিযুক্ত ছিলেন ভিলার্ড । তাঁকে বই লেখার কাজে সাহায্য করেন ক্যাথারিন । বিভিন্ন সমাজসংস্কারবাদী গোষ্ঠীর ( মেফ্লাওয়ার সোসাইটি , ডটারস অব দ্য আমেরিকান রেভলিউশন ) সঙ্গে ক্যাথারিনের পরিচয় করিয়ে দেন ভিলার্ড । মেয়োর প্রথমদিকের লেখায় প্রকাশ পায় ক্যাথলিক বিরোধিতা , অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি । ফিলিপাইনের স্বাধীনতা ঘোষণার বিরোধিতা করেন তিনি । আইরিশ অভিবাসী ও আফ্রিকা-আমেরিকানদের প্রতি প্রকাশ পায় তাঁর বিরূপতা। নিগ্রোদের প্রতি তাঁর বিরূপতা ছিল তীব্র ।
ক্যাথারিন মেয়োর ‘মাদার ইণ্ডিয়া’র মূল কথা হল , ভারতবাসী নিজেদের শাসন করতে পারবে না ; ভারতে ইংরেজ শাসন তাই অপরিহার্য । কেন নিজের দেশ শাসন করতে পারবে না ভারতবাসী ? ক্যাথারিন মেয়োর মতে ভারতবাসী অকমর্ণ্য , অসহায় , উদ্যোগহীন । জন্মগতভাবে তারা দাসমনোবৃত্তিসম্পন্ন । ভারতের ধর্ম ও যৌনবিকৃতি দাসমনোবৃত্তির কারণ । ধর্ম তাদের নৈষ্কর্মের শিক্ষা দেয় , মানুষের প্রতি মানুষকে অমানবিক আচরণে অভ্যস্ত করে , মায়াবাদের শিক্ষা দেয় , জাতিভেদকে লালিত করে । মেয়োর মতে ভারতের যৌনজীবনও পূতিগন্ধময় । তার প্রমাণ বাল্যবিবাহের সমর্থনে , নারীত্বের অস্বীকৃতিতে, পুরুষের বহুবিবাহে , নারীর উপর অকথ্য নির্যাতনে ।
মেয়ো বলেছেন ভারতের ইতিহাসে কোনদিন ‘স্বর্ণযুগ’ ছিল না । দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী , মড়ক ছিল নিয়মিত , সামাজিক শৃঙ্খলা ছিল না কোথাও । এই দেশে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি আনে সভ্যতার প্রথম আলোক । কে বলল যে ইংরেজ ভারত শোষণ করেছে ? বরং ইংরেজরা এদেশে প্রগতির পথ উন্মুক্ত করেছে । ব্রিটিশ ভারত যুদ্ধ ও সংঘাত মুক্ত , চারিদিকে বিরাজিত শৃঙ্খলা , খাদ্যশস্যের উৎপাদন প্রচুর , শিশুহত্যা ও সতীদাহের বর্বরতা নিশ্চিহ্ন ।
বাংলা ও বাঙালির প্রতি মিস মেয়োর বিরূপতা গভীর । তিনি মনে করেন বাংলা হল নৈরাজ্যবাদের আঁতুড়ঘর ----‘ Bengal is the seat of bitterest political unrest , the producer of India’s main crop of anarchists, bomb throwers and assassins’ . যৌন বিকৃতিও এই রাজ্যে সবচেয়ে বেশি , পাশ্চাত্য জীবননীতি ও দর্শনের বদহজম হয়েছে বাঙালির –‘half digested dose of foreign doctrines’.
আমেরিকার অধিবাসী ক্যাথারিন মেয়ো ভারতে ব্রিটিশ শাসন কে সমর্থন করেছিলেন , কিন্তু ইংরেজ হয়েও জে টি সাণ্ডারল্যাণ্ড ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদকে বিদ্ধ করেছেন তীব্র সমালোচনায় । কোনরকম আবেগের দ্বারা তাড়িত হন নি , প্রলোভনে বশীভূত হন নি । নিরপেক্ষ গবেষকের মতো তিনি পক্ষ-বিপক্ষ সব মতামতকে বিচারের জন্য গ্রহণ করেছেন , সংগ্রহ করেছেন নানা তথ্য ও দলিল । আর সেগুলির সাহায্যে তিনি রচনা করেছেন ‘ইণ্ডিয়া ইন বণ্ডেজ : হার রাইট টু ফ্রিডাম’ । এই বইতে তাঁর আলোচ্য বিষয় হল :
১] গ্রিস ও রোমের মতো ভারত এক সুমাহান ঐতিহ্যের অধিকারী । ২] ইংরেজপূর্ব ভারতে শক-হূনদল এসেছে কিন্তু তারা সুপরিকল্পিতভাবে ভারতে লুণ্ঠন করে নি । ৩] ইংরেজশাসিত ভারতে অর্থনৈতিক বনিয়াদ বিধ্বস্ত হয়েছে , ইংরেজের স্বার্থে রক্তপাত ও যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছে । ৪] ভারতের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় পরাধীনতায় নিহিত । ৫] দেশ পরিচালনার ব্যাপারে ভারতবাসীর যোগ্যতার নানা প্রমাণ আছে ।
স্বাভাবিকভাবেই সাণ্ডারল্যাণ্ড মিস মেয়োর ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ তীব্র সমালোচনা করেছেন । প্রথমে তিনি উল্লেখ করেছেন যে চারটি সমালোচনা , সেগুলি ভারতবাসীর রচনা : ১] ধনগোপাল মুখার্জির ‘আ সন অব দ্য মাদার ইণ্ডিয়া আনসারস’ , ২] এস সি রঙ্গ আয়ারের ‘ ফাদার ইণ্ডিয়া : আ রিপ্লাই টু মিস মেয়ো’ , ৩] কে নটরাজনের ‘মিস মেয়োজ মাদার ইণ্ডিয়া : রিজয়েন্ডার’ , ৪] লালা লাজপত রায়ের ‘আনহ্যাপি ইণ্ডিয়া’ । এই বই ছাড়া বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মিস মেয়োর বক্তব্যের সমালোচনাও সাণ্ডারল্যাণ্ড সংগ্রহ করেছেন । এইসব সমালোচনা ও প্রতিবাদের সাধারণ সূত্র হল :
১] মিস মেয়োর অধিকাংশ তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয় । ২] যে অ্যাবি ডুবয়সকে প্রামাণ বলে মিস মেয়ো উল্লেখ করেছেন , তা বহু ইউরোপীয় পণ্ডিত প্রত্যাখ্যান করেছেন । ৩] ব্যতিক্রমকে তিনি সাধারণ নিয়ম বলে গ্রহণ করেছেন । ৪] রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধির সঙ্গে সাক্ষাৎকারের নামে মিস মেয়ো যা বলেছেন , তা স্বকপোলকল্পিত ।
সাণ্ডারল্যাণ্ডের মতে মিস মেয়োর মূল উদ্দেশ্য হল ভারতকে কলঙ্কিত করা , তার স্বাধীনতার দাবিকে খারিজ করা । ক্যাথারিন মেয়ো গণতন্ত্রের শত্রু , সাম্রাজ্যবাদের বন্ধু । দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ভারতপ্রেমী সাণ্ডারল্যাণ্ড বললেন :
‘ That almost every chapter of the book shows the author to be an extreme imperialist , a despiser of democracy , a believer that strong nations have a right to conquer , rule and exploit those that are not able to defend themselves by arms, and therefore that Britain has a right to hold India in bondage .’









