Next
Previous
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















২৪.২

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জোট-নিরপেক্ষ থাকার সমস্যাগুলো আমরা কোনরকমে রয়েসয়ে পার করেছি। কারণ এই কায়দায় আমরা অনেক সমস্যা এড়াতে পেরেছি। কিন্তু রামনগরওলাদের অহংকার ছিল যে ওরা নিজেদের ভাল-মন্দ নিজেরাই বুঝে নেবে। সমস্যা এড়াবে না। দেখতে দেখতে গোটা গ্রাম দুইদলে বিভক্ত হয়ে গেল। এক দল রিপুদমনের হাত দিয়ে জমির ভাগ -বাঁটোয়ারা করাতে চায়। অন্যদলের বিশ্বাস এ’বিষয়ে শত্রুঘ্ন সিং বেশি পটু।

ভোটের দিন এগিয়ে এসেছে, মাত্র দু’দিন বাকি। দু’দলের শিবিরে সাজ-সরঞ্জাম দেখা যাচ্ছে। লোকজন গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে-‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’! আবার চলছে একে অন্যের মা-বোনের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর কথা, নিজেদের লাঠিগুলোকে তেল চুকচুকে করা, বর্শা ও বল্লমের ফলা মেজে-ঘষে চকচকে করে হাতলে লাগিয়ে নেয়া, আর সেই হাতেই গাঁজার ছিলিম কষে ধরা।

এতসব হয়ে যাওয়ার পর রিপুদমন তার ভাই সর্বদমনকে ডেকে ভালমানষের গলায় বলল—দেখ ভাই, যদি এই লড়াইয়ে আমার জান চলে যায় আর তার সঙ্গে আমার সাথী আরও জনা পঁচিশের, তখন তুমি কী করবে?

সর্বদমন সিং ওকালতি পাশ করেছে বটে, তবে একসময় অনেক বড় বড় উকিল, বিলেত ফেরত ‘বালিস্টার’ ওকালত ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। সর্বদমন তাঁদের পদচিহ্নে চলে বছর চার আগে নিজের প্র্যাকটিস ছেড়ে স্থানীয় রাজনীতির আখড়ায় নেমে পড়েছে। তফাৎ একটাই।

স্বাধীনতা সংগ্রামের যুক্ত হওয়া অনেক উকিলের ভরণপোষণ কীভাবে চলত তার হদিস আম জনতা পেত না। কিন্তু সবার ভাল ভাবে জানা আছে যে সর্বদমনের আমদানি কোত্থেকে হয় । আর তাতে লোকের চোখে ওর সম্মান বেড়ে গেছল।

যেমন, ওর কাছে দশটা হ্যাজাক বাতি আছে যা বিয়েশাদিতে ভাড়া খাটে। এছাড়া ওর রয়েছে দুটো বন্দুক, যা ডাকাতির সীজনে ভাড়া খাটে। সব মিলিয়ে সর্বদমনের যা আমদানি হত তাতে খাওয়া-পরার কষ্ট ছিল না। তাই ও নিশ্চিন্ত হয়ে গ্রামীণ রাজনীতির কলকাঠি নাড়তে পারত। গ্যাসবাতি আর বন্দুক ভাড়ায় অনেক দূর অব্দি পাঠানো হত। এভাবে সর্বদমনের কত যে বিস্তৃত এবং গভীর সামাজিক সম্পর্কের জাল ছড়িয়ে গেছল—তা বলা মুশকিল। তার আত্মবিশ্বাসের ঝলক সর্বদমনের কথাবার্তায় চালচলনে ফুটে উঠত।

ভাইয়ের কথার উত্তরে সর্বদমন মেপেজুকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল—“ভাই, যদি লড়াইয়ে তুমি ও তোমার পঁচিশ জন মারা পড়ে, তবে ওদের শিবিরেও শত্রুঘ্ন সিং এবং তার জনা পঁচিশ মরবে, এটা নিশ্চিত জেনো। তারপরে তুমি যা বলবে তাই করব’খন।

একথা শোনার পর রিপুদমন সর্বদমনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদার চেষ্টা করল। কিন্তু ইচ্ছে হলেই কেঁদে ফেলা—সেটা শুধু অভিনেতা বা নেতারা পারে। বলতে চাইছি—অভ্যাস নেই, তাই রিপুদমনের কান্নার চেষ্টা বিফল হল। সর্বদমন ধীরে ধীরে ভাইয়ের আলিঙ্গন-মুক্ত হয়ে বলল, -- এসব ছাড়ো; বলে দাও পঁচিশের বদলার হিসেব পুরো করে তারপর কী করা যায়?

রিপুদমন বলল—ধরে নাও দুদিকে লাশের সংখ্যা সমান সমান। তখন যদি ফের ভোট হয় আর তুমি গ্রামসভার প্রধান হতে চাও, তাহলে?

সর্বদমন কাগজ পেন্সিল নিয়ে বসে গেল। হিসেব টিসেব করে বলল—দাদা, তুমি আর শত্রুঘ্ন সিং যদি পঁচিশ পঁচিশজন সমেত মরে যাও, তো কিসের চিন্তা? আমার তরফের যেই দাঁড়াক, সে অন্য তরফের চেয়ে পঁচাশ ভোট বেশিই পাবে। কারণ, এতসব হওয়ার পরে গ্রাম থেকে ওদের হয়ে জানের বাজি লাগিয়ে ভোট দিতে আসা লোক খুব বেশি হলে পঁচিশ হবে। আর আমার পক্ষে ভোটার বেরোবে চল্লিশ বা তারও বেশি।

এখন ওদের পঁচিশজন মারা যাওয়ার মানে ওদের পুরো মহল্লা খালি। আর আমাদের পঁচিশ জনে চলে গেলেও বাকি খালি মাঠে আমার কম সে কম পনেরজন তো টিকে থাকবে।

ভোটের তিন দিন আগে রিপুদমন সাব -ডিভিসনাল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে এক দরখাস্ত দিল, যার সারঃ

--শত্রুঘ্ন সিং ও তার পঁচিশজন লোকের থেকে রিপুদমনের নিজের জীবন ও সম্পত্তির উপর আক্রমণের আশংকা। এছাড়া ভোটের দিন শান্তিভঙ্গ হওয়ারও সম্ভাবনা। পুলিশ দরখাস্তকে নথিবদ্ধ করল। এবার শত্রুঘ্ন রিপুদমন এবং তার লোকজনের বিরুদ্ধে পালটা নালিশ করল। পুলিশ এই নালিশও নথিবদ্ধ করল।

ভোটের একদিন আগে দুই প্রার্থী এবং তাদের পঁচিশ জন করে সমর্থকের ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে ডাক পড়ল।

ম্যাজিস্ট্রেট্‌, আইনের বই অনুযায়ী, শত্রুঘ্ন আর তার লোকজনের থেকে জামিন এবং মুচলেকা চাইল। ওরা এ বিষয়ে দেবে কিনা ভাবতে লাগল। তারপর উনি রিপুদমন আর তার দলের থেকেও ওইরকম জামিন ও মুচলেকা চাইলেন।

রিপুদমন বলল—“হুজুর, আমরা ওসব দেব না। আমার কথাটা মনে রাখবেন—কাল আমার গাঁয়ে পাইকারি হারে নরসংহার হবে। বড় বড় জমানতদাররাও শত্রুঘ্ন এবং তার গুণ্ডাদের দাঙ্গা করার থেকে আটকাতে পারবে না। আমরা হলাম সাধাসিধে চাষি। কেমন করে ওদের মোকাবিলা করব? তাই আমাদের জামিনের অভাবে কৃপা করে হাজতে আটকে রাখুন—প্রাণটা তো বাঁচবে! আর আমার বংশের যে দু’চারজন বাড়িতে থেকে যাবে ওদের রক্ষা করার বন্দোবস্ত করে দিন”।

পুলিস এই বক্তব্যও রেকর্ড করল।

শেষে ম্যাজিস্ট্রেট রায় দিলেন যে ভোটের দিন যখন রিপুদমন সিং ও সাথীরা হাজতে থাকবে, তখন শত্রুঘ্ন সিং পার্টিরও জামানত হবে না। ওরাও হাজতে থাকবে।

এই ভাবে দুই প্রার্থী ও তাদের পঁচিশ পঁচিশ জন লোক কিছুদিনের জন্য মরে গেল। আর নির্বাচন খুব শান্ত ও সভ্য বাতাবরণে অনুষ্ঠিত হল। তবে দুই দলের তুলনামূলক দক্ষতার হিসেব করে দেখা গেল শত্রুঘ্নের লোকজন কোন কাজের নয়। বোঝাই গেল না ওর সমর্থক বলতে কেউ গাঁয়ে টিকে আছে কিনা। ওদিকে রিপুদমনের পক্ষ থেকে সর্বদমন নির্বাচনে দাঁড়াল। কারণ পুলিশের খাতায় ওর নাম নেই অথচ, আইনের ডিগ্রি আছে, অতএব শান্তিপ্রিয় মানুষ। তাই ওকে হাজতে পোরা হয় নি। ও কোমর কষে ভোটে লড়ল এবং ফল ওটাই হোল যা ও কয়দিন আগে কাগজ পেন্সিলে আঁক কষে দেখিয়েছিল।

ভোটে জেতার এই কায়দা রামনগরের নামে পেটেন্ট হল।


নেবাদা কায়দাটা একটু আদর্শবাদী ধাঁচের।

ওখানে নানান জাতির লোক ভোটে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী দু’জন—যাদের ঋগ্বেদের পুরুষ সূক্তে ক্রমশঃ ব্রহ্মের মুখ এবং পাদদেশ বলা হয়েছে। আজকের ভাষায় বললে—এ হল ব্রাহ্মণ ও হরিজনের সংঘর্ষ। কিন্তু নেবাদায় এই মামলা বেশ সাংস্কৃতিক, প্রায় বৈদিক পদ্ধতিতে পেকে উঠল।

ব্রাহ্মণ ক্যান্ডিডেট সবর্ণদের মধ্যে ঋগ্বেদের পুরুষ-সূক্তটি কয়েক বার আউড়ে বুঝিয়ে দিল যে পুরুষ-ব্রহ্মের মুখ ব্রাহ্মণ ছাড়া কেউ নয়, আর শূদ্র হল পা। প্রধান পদের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলা হল এই কাজটির জন্য দরকার বুদ্ধি এবং বাণী যা মাথায় থাকে, পায়ে কদাপি নয়। আর মুখ হল সেই মাথারই অঙ্গ। অতএব, ব্রাহ্মণেরই প্রধান হওয়া উচিত, শূদ্রের নয়।

ব্রাহ্মণ প্রার্থী শূদ্রের নিন্দা করতে প্রচলিত গালিগালাজ না করে বেশ সাংস্কৃতিক কায়দায় প্রচার করতে লাগল। ও সমঝোতার ঢঙে এটাও মেনে নিল যে রোদেজলে দৌড়োদৌড়ি করতে মজবুত পায়ের দরকার। তাই পঞ্চায়েতের চাপরাশির পদ শূদ্রেরই প্রাপ্য। কিন্তু প্রধান বা মোড়লের পদের জন্য শূদ্র প্রার্থী? এটা বেদবিরুদ্ধ। কিন্তু যা হয় আর কি, এসব সাংস্কৃতিক কথাবার্তা সাধারণ গ্রামবাসী মেনে নিল না। বাধ্য হয়ে ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি প্রচারের কায়দা বদলে নিলেন—মাথার চেয়ে মুখের ব্যবহার বেশি করতে লাগলেন। আর ওনার চ্যালারা মুখটা আরও খুলে প্রচার শুরু করল। অল্প দিনেই ব্যাপারটা সেই পুরনো কায়দায় ফিরে গেল। যেমন,-- বল বিক্রম সিং, তুমি কি আমাকে ছেড়ে ওই চামার ব্যাটাকে ভোট দেবে?

দেখতে দেখতে ব্রাহ্মণ প্রার্থীর মেহনতে গ্রামে গালিগালাজের উগ্র বাতাবরণ তৈরি হল এবং হঠাৎ একদিন উনি পুরুষ-সূক্তের ওই ঋচাটির সঠিক মানে বুঝতে পারলেন—যাতে শূদ্রকে পা বলা হয়েছে।

এক জায়গায় ওঁর দলের একজন শান বাঁধানো আঙিনায় বসে ভোটের প্রচার করছিল। মানে অন্য প্রার্থীর নাম করে খোলাখুলি গাল দিচ্ছিল। ওই ধারাবাহিক গালির ফোয়ারার মাঝখান থেকে একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন বারবার উঠে আসছিলঃ “বল ঠাকুর কিসন সিং, তবে কি তুমি ওই---কে ভোট দেবে”?

ও তো ওখানে বসে লাগাতার বলেই যাচ্ছিল। হটাৎ ওর মুখে কথা আটকে গেল, পুরো হল না। ও কমরে এমন জোরে আঘাত পেল যে মুখ থেকে ‘তাত, লাত রাবণ মোহিঁ মারা’ (বাবা, রাবণ আমায় লাথি মেরেছে) বলার মত অবস্থাও রইল না। ও শান-বাঁধানো চবুতরা থেকে নীচে পড়ে গেল। তখনই আরও দশটা লাথি! যখন চোখ খুলল তখন ওর মনে হল—সংসার এক স্বপ্ন বটে, আর মোহ-নিদ্রা ভেঙে গেছে। এমন ঘটনা আরও কয়েকটি ঘটে যাবার পর ব্রাহ্মণ প্রার্থী বুঝতে পারলেন পুরুষ-ব্রহ্মের মুখ আর পায়ের দূরত্ব খুব বেশি নয়।

এর সার তত্ত্ব হলঃ যেখানে বেশি মুখ চালালে জবাবে লাথি চলতে থাকে, সেখানে মুখ না খুললেই মঙ্গল।

এই গবেষণার ফল ব্রাহ্মণ প্রার্থীকে মুশকিলে ফেলল। এমন সময় ওর বিপদতারণ কর্তায এক বাবাজীর আবির্ভাব হোল। ইনি সেই জাতের বাবাজি যাঁরা বিপদগ্রস্ত চাষি থেকে বড় থেকে বড় আধিকারিক, নেতা এবং ব্যবসায়ীর ভিড়ের মধ্যে সহজেই নিজের উপযুক্ত ভক্তটিকে চিনে নেন।

ঘটনা ঘটল ‘বত্রিশ সিংহাসন’ এবং ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ স্টাইলে।

একদিন সেই ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি, মুখের ভাষা সংযত হওয়া সত্ত্বেও, পুরুষ-ব্রহ্মের পায়ের লাথি খেয়ে মাটিতে গড়াগড়ি গেলেন। তারপর কী ভাবে গ্রামসভার মোড়লের পদটি চামার-ব্যাটার ছোঁয়া বাঁচিয়ে ব্রাহ্মণের অধীন করা যায় সে বিষয়ে ভাবছিলেন। এইসব ভাবনা চিন্তার স্থান হল গ্রামের বাইরে একটা শান বাঁধানো কুয়োর পাড়ে সাঝেঁর বেলায় ‘নীলাঞ্জনছায়া’ তলে এক বটগাছের কাছে । চোখে পড়ল গাছের নীচে আগুনের ফুলকি আর গম্ভীর আওয়াজে শোনা গেল মহাদেবের কিছু বিশেষণ।

উনি টের পেলেন নিঘঘাৎ গাছের নীচে কোন বাবাজি ধুনি জ্বালিয়ে বসেছেন।

ঠিকই বুঝেছিলেন। বাবাজী কৈলাসপতি ভোলে শংকরের নাম নিচ্ছিলেন আর গাঁজায় দম দিচ্ছিলেন। লোকে দুখী হোক না হোক, সামনে কোন বাবাজী দেখলে সোজা সাষ্টাংগ দণ্ডবৎ হয়ে যায়। এখানে তো ব্রাহ্মণ -প্রার্থীটি নিতান্ত দুঃখের সাগরে গোঁতা খাচ্ছিলেন আর সামনে এক বাবাজীর আবির্ভাব! ব্যস, উনি কিছু না ভেবেই সোজা বাবাজীর পায়ে পড়লেন আর কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন।

বাবাজীর জীবনে এমন সুযোগ বহুবার এসেছে। উনি পুরনো অনুভবের জোরে প্রার্থীকে অভয়দান করে বললান যে বেটা, ঘাবড়িও না। যদি তোমার অসুখটি স্বপ্নদোষ বা শীঘ্রপতন অথবা ছোটবেলার উল্টোপাল্টা কাজের ফলে উৎপন্ন নপুংসকতা হয়ে থাকে, তাহলে ভরসা রাখো। আমার দেয়া টোটকার জাদুতে তুমি একহাজার নারীর মান-মর্দন করতে পারবে। কিন্তু ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি দু’দিকে মাথা নেড়ে না করে দিলেন! তখন বাবাজী বললেন যে এটাএকটা গোপনীয় টোটকা। এর জোরে তুমি বাজীমাৎ করার ওস্তাদ তো হবেই, তাছাড়া এটাকে ওষুধ বানিয়ে বিক্রি শুরু করলে দেখতে দেখতে ক্রোড়পতি হয়ে যাবে।

কিন্তু কোন লাভ হোল না। প্রার্থীটি মাথা নাড়ছে আর হাপুস কান্না জুড়েছে। বাবাজি একটু অবাক হয়ে ওকে খোঁচাতে লাগলেন। তখন ও মুখ খুলল—আমি এক হাজার স্ত্রীলোকের মান-মর্দন করতে চাইনে। আমার কাজটা সহজ, শুধু এক ব্যাটা চামারের মানমর্দন করা।

বাবাজী ব্রাহ্মণ প্রার্থীটির সব কথা শুনলেন, ওকে আশ্বস্ত করলেন; তারপর গাঁজার কলকেটি ঝোলায় পুরে নকল জটায় খানিক ধুলো মাখিয়ে বসতির দিকে রওনা দিলেন। উনি গ্রামে গিয়ে এক মন্দিরের সামনে ডেরা জমিয়ে বসে গেলেন। তারপর কবীর, রামানন্দ থেকে শুরু করে গুরু গোরখনাথ থেকে এমন এমন কাহিনী শোনাতে লাগলেন যার শেষ কথা হল—লোকের জাতপাত জেনে কী হবে, হায়! যে হরিকে ভজনা করে সে হরির আপন হয়ে যায়।

এই ‘হরি’ যে কী জিনিস, সেটার পরিচয়ও লোকে সেদিন সন্ধ্যে থেকেই বুঝে ফেলল। একটা ছিলিমে গাঁজার টুকরো রাখা হোল, যার উপর আগুন ঠুঁসে দেয়া হল। ওটাকে মুখে নিয়ে গাল খিঁচে দম লাগিয়ে ক্রমাগত ফুঁয়ের জোরে আগুন জ্বলে উঠল এবং নিভল। এক নিঃশ্বাস থেকে পরের নিঃশ্বাস নেয়ার ফাঁকে ফাঁকে মহাদেবের নাম নানা ভাবে এবং নানা অর্থে নেয়ার পালা চলতে লাগল। ওই ছিলিমটি উপস্থিত ভক্তজনের মধ্যে এদিক থেকে ওদিক হাতে হাতে ঘুরতে লাগল। ভক্তগণ বুঝে গেল যে এই হল ‘হরি’!

বাবাজীর দরবারে আটচল্লিশ ঘন্টা অখন্ড নাম-সংকীর্তন চলে। যে গাঁজা খায় না, তার জন্যে ভাঙের বন্দোবস্ত আছে। যতক্ষণ কীর্তন চলে ততক্ষণ শিল নোড়াও চালু। হার্মোনিয়াম বাজতে থাকে এবং রাধাকৃষ্ণ ও সীতারামের খোসামোদ করতে এমন এমন গান গাওয়া হয়, যার সামন সিনেমার হিট গানও হার মেনে যায়।

উদাহরণঃ

“লেকে পহেলা পহেলা প্যার, ভরকে আখোঁ মেঁ খুমা র,

জাদু নগরী সে আয়া হ্যায় কোঈ জাদুগর”।

কথাগুলো বদলে নিয়ে গাওয়া হয়ঃ

“লেকে পহেলা পহেলা প্যার, ত্যাজকে গোয়ালোঁ কা সংসার,

মথুরা নগরী মেঁ আয়া হ্যায় কোঈ বংশীধর”।

এতেই বাজিমাত!


দুটো দিন কাটতেই সবার বিশ্বাস হোল যে বাবাজী হলেন কৃষ্ণের অবতার। তবে উনি যমুনার জল না খেয়ে খালি গাঁজা খেলেন আর এমন সব পিশাচ তাঁকে ঘিরে রইল যে ওনাকে কৃষ্ণ কম , শিবের অবতার বেশি মনে হল। কলকে ধকধক জ্বলছে আর প্রমাণ করছে যে—গাঁজা চুরির হোক, কি সরকারী দোকানের, গঙ্গাজল গঙ্গোত্রী থেকে আসুক, কি দুটো নোংরা নালার সঙ্গম থেকে --- দুটোরই প্রভাব সবসময় সমান।

বাবাজী মানুষটি বেশ মজার। কীর্তন খালি করান না, নিজেও করেন। যদি গাঁজা না খেতেন, তাহলে ওনার স্বর গলার বাইরে স্পষ্ট করে শোনা যেত। আর যদি হারমোনিয়ম না বাজত, তাহলে ওনার কীর্তনের সুরটাও খানিক বোঝা যেত। এইসব স্বাভাবিক বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও উনি দেখতে দেখতে গোটা গ্রামকে বশ করে ফেললেন। উনি কবীর, রুইদাস ও রামানন্দের এমন এমন ভজন শোনালেন যে লোকে মুগ্ধ হয়ে ওনাদের জয়-জয়কার করতে লাগল।

কবীর এবং অন্য সন্তেরা যদি এখানে হাজির হতেন এবং ওনাদের ভজন বলে যা সব মৌলিক কবিতা গাওয়া হচ্ছে সেসব শুনতেন, তাহলে তাঁরা বাবাজীর জয়ধ্বনি করতেন। এর ফলে বাবাজী গ্রাম থেকে জাতিবাদের নাম ভুলিতয়ে দিলেন। তারপর একদিন গাঁজা, সিদ্ধি ও কীর্তনের মাঝে ইশারা করলেন যে এই গ্রামের প্রধান বড় ধর্মাত্মা, তখন লোকজন হতভম্ব হয়ে গেল।

এক ব্যাটা সিদ্ধিখোর বলে উঠল—এখনও তো কেউ নির্বাচিত হয় নি। আর এই পদের জন্য প্রথমবার নির্বাচন হবে---। তখন বাবাজী ফের ইশারা করলেন যে আমার ভগবান তো ইতিমধ্যেই নির্বাচন সেরে ফেলেছেন।

সংক্ষেপে বললে, নেশা গায়েব হওয়ার আগেই জনতা জেনে গেল যে ব্রাহ্মণ প্রার্থীকেই ঈশ্বর প্রধান পদের জন্য নির্বাচিত করেছেন। নেশা নামার আগে প্রায় সবাই উক্ত জ্ঞানের জোয়ারে ভেসে গিয়ে মেনে নিল যে ওই আমাদের প্রধান। এইভাবে লাথির উপরে মুখের বিজয় হল।

নেবাদাওলা পদ্ধতি ভোটে যারা দাঁড়ায় তাদের খুব কাজে এল। অন্য গ্রামের লোকজনও এই পদ্ধতিকে আবশ্যক সংশোধন করে নিয়ে বড় বড় নির্বাচনে বিজয়ী হল। যেখানে গাঁজাখোর বাবাজী পাওয়া যায় নি বা অতখানি গাঁজা জোগাড় হয় নি, সেখানে লোকে কাউকে ধরে বাবা বানিয়ে কোন দেবীর পুজো শুরু করে দিত। ওখানে পাঁঠাবলি হত এবং কারণবারির ভোগ চড়ত। ফল একই—মুখের বিজয়, পদাঘাতের পরাজয়।

এইভাবে কৌশলটি পেটেন্ট হয়ে নির্বাচন সংহিতায় নেবাদাওলা পদ্ধতি নামে স্থান পেল।


মহিপালপুর পদ্ধতিটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সরল এবং বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক। এই পদ্ধতিটির উদ্ভব হয় এক নির্বাচন অধিকারীর ভুলের ফলে। পরে ওই ভুলটিকে মেনে নিয়ে অনেক জায়গায় সাফল্যের সঙ্গে রিপিট করা হয়। ভুলটা হয়েছিল একটি ঘড়ির চক্করে।

ভোট দেয়ার কথা বেলা বারোটা নাগাদ। হয়েছে কি, নির্বাচন অধিকারীর ঘড়ি শহরের ঘন্টাঘরের ঘড়ির সঙ্গে মেলানো ছিল। আর ঘন্টাঘরের ঘড়ি চুঙ্গী আদায়ের চেয়ারম্যানের ঘরের ঘড়ির সঙ্গে মিলিয়ে তাল রাখছিল। ফলে সওয়া ঘন্টা আগে চলছিল।

এবার হোল কি, নির্বাচন অধিকারী মহোদয়, বেশ কিছু প্রার্থীর আপত্তি সত্ত্বেও, পৌনে এগারটা নাগাদ যত প্রার্থী ও ভোটার এসে গেছে তাদের নিয়ে ভোট করিয়ে ফলাফল ঘোষণা করে দিলেন। যখন বাকি প্রার্থী এবং ভোটদাতারা ঘটনাস্থলে পৌঁছল, ততক্ষণে নির্বাচন অধিকারীটি নিজের বাড়িতে ওনার ঘড়ি অনুসারে সোয়া একটার খাবার খেতে ব্যস্ত।

এই নির্বাচন নিয়ে আদালতে মামলা হল। মামলা একেবারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চলল। সেখানে সমস্ত তর্ক ও যুক্তি হল ঘড়ি নিয়ে। তাতে মহামান্য আদালতের নানারকম ঘড়ির বিষয়ে মেকানিক্যাল জ্ঞান হল। ফলে মামলা চলল তিন সাল, কিন্তু তাতে নির্বাচন অধিকারীর কোন দোষত্রুটি প্রমাণিত হল না—হওয়ার কথাও ছিল না। তাই উনি যাকে বিজয়ী ঘোষণা করলেন সে নিজের ঘড়িকে বরাবরের জন্য সোয়া ঘন্টা ফাস্ট করে দাপটে রাজত্ব করল। বাকি প্রার্থীরা, খোদ ছোটে পালোয়ানের ভাষায়, ঘড়ির জায়গায় হাতে ঘন্টা ধরে বসে রইল।


মহিপালপুরের ঘটনাটি আচমকা ঘটেছিল। কিন্তু নিউটনের সামনে গাছ থেকে আপেলও আচমকাই পড়েছিল। কিন্তু তার থেকে উনি মাধ্যাকর্ষণের সূত্র আবিষ্কার করলেন। পরে ভোট-টোট গুলে খাওয়া কিছু লোক মহিপালপুরের ঘটনা থেকে এক সূত্র বের করলঃ সব ঘড়ি একসাথে তাল মিলিয়ে চলে না আর সব ভোটার একসাথে এক জায়গায় ভোট দিতে হাজির হয় না।

এই তত্ত্ব আবিষ্কার হওয়ার পর গ্রাম-পঞ্চায়েতের নির্বাচনে এর প্রয়োগ বেশ কয়েকবার নানাভাবে হচ্ছিল। ইলেকশন অফিসারের ঘড়ি মহিপালপুরের উদাহরণ মনে রেখে কখনও ঘন্টা-আধ ঘন্টা লেট বা ফাস্ট হয়ে যেত। আর ঘড়ি এক মেশিন, তার জন্য কোন লোক কেন দোষের ভাগী হবে? ফলে যে প্রার্থীটির ঘড়ি ইলেকশন অফিসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত, সেই জিতে যেত। এটা দুটো মেশিনের খেলা, তাই এর জন্য কোন মানুষের ঘাড়ে দোষ চাপানো নেহাৎ অবৈজ্ঞানিক মানসিকতা!

ভুগোলের হিসেবে শিবপালগঞ্জ থেকে মহীপালপুর অনেকটা দূর, কিন্তু নেবাদা কাছে। তাই রামাধীন ভীখমখেড়ীর ভোটে জেতার নেবাদা ফর্মূলাটা ভাল করে জানতেন। নির্বাচনের প্রচারে সেটাই আঁকড়ে ধরেছিলেন। ওদিকে শনিচরের পক্ষে বৈদ্যজী ভূগোল ছেড়ে ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরলেন। অতীত কাল থেকে জেতার যত পদ্ধতি আছে সব খুঁটিয়ে দেখে শনিচরকে বললেন মহীপালপুর পদ্ধতি প্রয়োগ করতে। ফলে ওনার পকেট থেকে খরচ বলতে সেরেফ একটা শস্তা হাতঘড়ির দাম যা হয়। সেই ঘড়িটা নির্বাচন অধিকারী ভুলে নিজের মণিবন্ধে বেঁধে বাড়ি নিয়ে গেছল। এদিকে নেবাদা ফর্মূলার লোকেরা হেরে গিয়ে এমন হতাশ হল যে এন্তার মদ গিলে মাঠে বেহুঁশ হয়ে পড়ে রইল। ওদের প্রাপ্তি বলতে নেশা করার গভীর জ্ঞান।