ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত
Posted in ধারাবাহিকজেরাল্ডের এপার্টমেন্টের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। যদিও খুঁটিনাটি বর্ণনা দেওয়া এখনও বাকি, তবে একথা আগেই বলা হয়েছে যে এপার্টমেন্টেরও জেরাল্ডের মতই দু’খানা আলাদা সত্তা আছে এবং এই দুই সত্তার মাঝে কোথাও কোনো বিরোধ নেই। বরঞ্চ জেরাল্ডের মতই সম্পূর্ণ স্বকীয় এবং ভিন্ন পরিসর নির্মিত হয়েছে সেখানে। জেরাল্ডের সম্পর্কেও আগেই বলা হয়েছে; তার অতীত সম্পর্কে জানানো হয়েছে যে তার বাবা ছিলেন এক কৃষক এবং তার মা ছিলেন এক ইহুদি বিদ্বান পণ্ডিতের কন্যা।
সঙ্গীতশিক্ষকের বাড়িতে জেরাল্ডের সঙ্গে পিয়ানোবাদক কিশোর বের্নহার্ডের প্রথম সাক্ষাতের পরে বেশ কয়েকটা সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে গেছে। বের্নহার্ডের বাজনা এবং বাজনার মধ্যে প্রতিফলিত হওয়া ইয়োহান সেবাস্তিয়ান বাখ সম্বন্ধে পরিণত ভাবনাচিন্তা বিশেষভাবে জেরাল্ডকে স্পর্শ করেছিল। তবে জেরাল্ডের বাড়িতে যাবার আমন্ত্রণ বের্নহার্ড এখনো গ্রহণ করে উঠতে পারেনি, কারণ নানা ধরনের ঘটনাপ্রবাহে সে এই আমন্ত্রণের কথা একেবারে ভুলে গিয়েছিল।
বেটসির সঙ্গে সাক্ষাতের পর থেকে বের্নহার্ডের মনমেজাজ অনেকখানি ভাল হয়ে গিয়েছিল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিল সে যে এখানে এসেছে বলে সে বুঝতে পারছে যে কখনো কখনো বেশ সহজে পয়সা উপার্জন করা সম্ভব। ধূসর রঙের সিলিং, যেটা তার চোখে খুব বিশ্রী লাগতো, সেটা আজ হঠাৎ আর ততখানি মনখারাপ করবার মত রং বলে মনে হচ্ছে না তার। ওই রঙটা এখন তার অনেকখানি অভ্যেস হয়ে গেছে; তাছাড়া বড় শহরে বসবাস করতে হলে নিজের মেজাজমর্জির বশ্যতা স্বীকার করে গুমরে থাকার বিলাসিতা করা তার পক্ষে একেবারেই সম্ভব নয়। প্রথম দিকে এই ব্যাপারটা সে ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনি বলে খুব ভুগেছে। বিশেষ করে যখন সে ক্লান্ত থাকতো, তখন একটা বিব্রত ভাব তাকে ঘিরে ধরত। মাঝে মাঝে সকালে সে একটা দমচাপা কষ্ট নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠত। সারাদিনের কাজগুলোকে যেন মনে হত অজস্র কঠিন শাস্তি এবং সেগুলোর মধ্য দিয়ে তাকে যেতেই হবে। সে জানত যে সারাদিন যে মুখগুলোর সামনাসামনি তাকে হতে হবে, সেগুলোর অভিব্যক্তি কেমন হতে পারে… নির্বিকার, অপরিচিত, বিষণ্ণ। সারাদিন তাকে কী কী করতে হবে, সেটা ভাবলেই তার অসহ্য লাগত। এমনকি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে করিডরের অপর প্রান্তে হেঁটে গিয়ে বিশেষ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও মাদাম দুবোয়ার সঙ্গে কথা বলতেও ইচ্ছে করত না তার। অথচ মাদাম দুবোয়ার সঙ্গে কথা না বলার জন্য সেরকম যুতসই ছুতো খুঁজে বের করতে পারত না সে। বাদ্যযন্ত্রের দোকান অবধি হেঁটে যেতেও ইচ্ছে করত না তার। অতি অল্প আলোয়, শীতে ওই অপরিসর দোকানঘরের কুঠুরিতে বসে পিয়ানো অভ্যেস করতে গিয়ে তার হাতের আঙুলগুলি জমে শক্ত হয়ে যেত। এবং অবশেষে রু সান জাক অঞ্চলে একটা ছোট রেস্তরাঁয় চার্লসের সঙ্গে বসে একসঙ্গে খাবার অর্ডার করবার জন্য ওয়েটারকে ডাকা, পুরো ব্যাপারটাই ভীষণ বিরক্তিকর ছিল তার কাছে।
সম্প্রতি বের্নহার্ড নিয়মিত অনেকখানি সময় কাটাচ্ছিল চার্লসের সঙ্গে। বেলা একটা নাগাদ তাদের দেখা হত। সঙ্গে চার্লসেরও কিছু বন্ধুবান্ধব থাকত। নিয়মমাফিক সবাই মিলে শিক্ষকদের মুণ্ডপাত করতো রোজ। সবাই একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করত। গালাগালির বন্যায় রোজই একটা বিশেষ নির্দিষ্ট ধারা থাকত। তবে এই ছেলেগুলো বেশ মজার এবং প্রাণবন্ত ছিল। তাদের সঙ্গে মিশবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করবার প্রয়োজন নেই। তারাও এই তরুণ ‘বশে’*কে নিজেদের মতো করে আপন করে নিয়েছিল… মুক্তকণ্ঠে তারা বের্নহার্ডের গুণাবলীর প্রশংসা করে যেত। আবার কখনো তাকে ডাকত ‘ব্লন্ড্ কমরেড’ বলে। বের্নহার্ডকে ঘিরে ইয়ার্কি ফাজলামি করতে করতে তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠত। যদিও বের্শেন অস্বস্তি বোধ করত এসবে, কিন্তু সে লক্ষ্য করত যে তাদের কথাবার্তার মধ্যে থাকত সুচতুর বাগ্মিতা এবং অবাক করে দেওয়া বুদ্ধিমত্তার ধার। তবে বিকেলের ক্লাস করতে স্কুলে ফিরে যাবার আগে তারা বের্নহার্ডের সুস্বাস্থ্যের কামনা করে জল মিশিয়ে রেড ওয়াইন পান করে যেত।
অবশ্য এতকিছু সত্ত্বেও বের্নহার্ডের নিজেকে বহিরাগত বলে ভাবাটা বন্ধ হয়নি। যদিও চার্লস বেশির ভাগ সময়ে বিরক্ত এবং উত্তেজিত অবস্থায় থাকতো, তবুও একা চার্লসের সঙ্গ সে পছন্দ করত। স্কুলে চার্লসের অবস্থা ছিল শোচনীয়। শিক্ষকেরা তাকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। তাছাড়া কী ভাবে যেন জানাজানি হয়ে গিয়েছিল যে চার্লস রবার্টের বাড়িতে যাতায়াত আছে। চার্লস জানে না যে এই কথাটা কে শিক্ষকদের কানে তুলেছে। সে রবার্টের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করেছে বহুদিন আগেই; এখন সে সন্ধ্যায় বাড়িতে বসে পড়াশুনা করে। কিন্তু এই গুজবের হাত থেকে সে রক্ষা পাচ্ছে না। সব মিলিয়ে চার্লস রেগে আগুন হয়ে আছে; তার পরিশ্রমের কোনও সুফল ফলছে না, কারণ শিক্ষকেরা তার প্রতি বিরূপ। ফলে চার্লস আবার সব ছেড়েছুঁড়ে একা একা পথেঘাটে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে থাকে এবং মধ্যরাতে হা-ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরে।
বের্নহার্ড মাঝেমাঝে বেশ বুঝতে পারছিল যে চার্লসের বিষণ্ণতা এবং হতাশা তাকে প্রভাবিত করছে এবং এই ব্যাপারটাকে সে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। তার নিজস্ব বিষাদের সেরকম কোনও কারণ সে খুঁজে পাচ্ছিল না এবং সেই সময় চার্লসের থেকে যথাসম্ভব দুরত্ব বজায় রাখছিল সে। নিজের পরিস্থিতি নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় যুক্তিসহ ভাববার চেষ্টা করছিল আত্মবিশ্লেষণ করে। সে ভাবছিল যে বাড়ির জন্য মনখারাপ লাগছে কি না তার, নিজের কাজটা করতে ভাল লাগছে কি না… এই আবহাওয়া বা এই নতুন শহরের জল হাওয়ায় কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না, কিম্বা এই বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের মুখ দেখে বিরক্তি বোধ হচ্ছে কি না তার। কোনও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না সে। মনের জোর দিয়ে যে তাকে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, সেটা সে বুঝেছিল। সে নিজেকে হাস্যকর কিম্বা অসহনীয় ব্যক্তিত্বের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় না, কিন্তু ক্রমাগত বিষাদ ও হতাশার সামনে সে অসহায়, দুর্বল ও অবশ বোধ করছিল।
এরকম একটা অদ্ভুত পরিস্থিতিতে বেটসির সঙ্গে দেখা হওয়াটা বের্নহার্ডের কাছে সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছিল। সে নিজেই যে অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম, শুধু এই ভাবনা থেকেই যে সে আরও শক্তিশালী এবং উদ্যমী বোধ করছিল, ব্যাপারটা এতখানি সরলসোজা নয়। এই দুই আমেরিকান এবং তাদের পোষা বাঁদর ক্ন্যাগি এবং তাদের মজার কাণ্ডকারখানা দেখে সে মানসিকভাবে অনেকটা হালকা বোধ করা শুরু করেছিল। প্রতিদিনের জীবনযাত্রার রুটিন আর বোঝার মত চেপে বসছিল না তার কাঁধে। সে প্রতিদিন ব্যস্ত থাকত। সন্ধে ছটা নাগাদ সে বেটসির কাছে যেত। সেখানে চা আর কেক খেয়ে সে বেটসিকে জিজ্ঞেস করত যে আগের দিনের গানের লাইনগুলো তার মনে আছে কিনা। তারপর তার গানের কথার মধ্যে জার্মান শব্দগুলোর উচ্চারণ শুদ্ধ করে দিয়ে লক্ষ্য রাখত যে সেগুলো ভালভাবে অর্থ বুঝে বেটসি মুখস্ত করতে পারছে কিনা। অস্বস্তিকর সেই সূচনাপর্বের সময় প্রথম সেই পিয়ানোটার ঢাকনা খোলা হয়েছিল। বের্নহার্ডের ছাত্রী সেরকম প্রতিভাশালী নয়, কিন্তু পিয়ানোটা অপূর্ব সুন্দর। একটা মিষ্টি নরম সুরে বাঁধা যন্ত্রটা। বের্নহার্ড প্রতিদিন ওই যন্ত্রটার টানেও যেত এবং বাজিয়ে অভ্যেস করবার সুবর্ণসুযোগটা সে হারাতে চায়নি। বেটসি চুপ করে বসে তার বাজনা শুনতে পছন্দ করত। বিলি বেটসিকে ডিনারে যাবার জন্য কথা মনে করাবার পর, একেকদিন আটটা বেজে গেলেও সে ইশারায় তাকে চুপ করিয়ে দিত।
(চলবে)
* ‘বশে’ শব্দটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময় থেকে জার্মান সৈন্যদের উদ্দেশ্যে একটা গালি হিসেবে ব্যবহার করত ফরাসি সৈনিকেরা। মাথামোটা, মূর্খ এই ধরনের গালি দেবার জন্য ব্যবহৃত হয়।



0 comments: