গল্প - মনোজ কর
Posted in গল্পচতুর্দশ পর্ব
পানু রায়ের ফোন বেজে উঠলো। ফোনের ওপারে মনীষা।
-বলো মনীষা। সব ঠিকমত চলছে?
-হ্যাঁ, এখনও পর্যন্ত সব ঠিকই আছে।
-পুলিশের খোঁজাখুঁজি শেষ হলো? কিছু পেলো?
-না, কিছুই পায়নি। অনেক খোঁজাখুঁজি করলো। হতাশ হয়ে ফিরে গেল।
-এটা কোনও ফাঁদ হতে পারে। অফিসের অবস্থা কী রকম?
-অফিসের অবস্থা খুব খারাপ। সমস্ত কাগজপত্র, ফাইল এলোমেলো হয়ে আছে। এলিনা কী করে গেছে কে জানে? চিঠিপত্র, বিল সমস্ত ভুল জায়গায় ফাইল করে গেছে। টাকা পয়সাও খুব অসাবধানতার সঙ্গে দেয়া নেয়া করেছে।
-তার মানে? আমাকে আর একটু ডিটেলে বলো।
-ধরুন রাজেন্দ্র পার্কের নতুন ফ্ল্যাটটা যেটা উনি আমি ছুটিতে যাবার কয়েকদিন আগে কিনেছিলেন সেটাতে কিছু ইলেকট্রিক রিপেয়ারের কাজ হয়েছে যার জন্য বিল হয়েছে এক লক্ষ সত্তর হাজার টাকা। এটা কি সম্ভব?
-হতে পারে। হয়তো কোনও বড় টিভি লাগানো হয়েছে।
- আমি ডিটেলে দেখছি কিন্তু সবকিছু বেশ অগোছালো করে রেখে গেছে।
-মনীষা, যতটা পার ঠিক করার চেষ্টা করো। আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখো। কালীকৃষ্ণ ফোন করলে বোলো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে।
-অবশ্যই। পুলিশের ব্যাপারটা উনি ফোন করলে জানাব?
-নিশ্চয়ই। ডিটেলে জানাবে।
-আমি ভাবছিলাম যদি পুলিশ ওনার ফোন ট্যাপ করে।
-কিছু করার নেই। ঝুঁকি তো নিতেই হবে।
-ঠিক আছে। আমি দেখি কতদূর কী গোছানো যায়।
পানু রায় ফোন রাখতেই দরজা ঠেলে জগাই ঢুকলো। পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ কী হলো, কোনও খবর?’
-বেশ ভালোই গন্ডগোল শুরু হলো বলে মনে হচ্ছে।
-কী হয়েছে? এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেন?
-তুমি ঐ সাংবাদিক সনাতনকে চেন তো? আরে যে ‘ঈগলের চোখে’ বলে খবরের কাগজে গল্প লেখে। খুব পপুলার ওর লেখা।
-হ্যাঁ, চিনি। আমিও ওর লেখার খুব ভক্ত। কিন্তু হয়েছেটা কী?
-কেউ একজন খবর জোগাড় করেছে যে তুমি নাকি ছোটকালীর অফিসে একটা বন্দুক থেকে গুলি চালিয়ে অফিসের ফার্নিচার নষ্ট করে দিয়েছো।
-তুই কী বলছিস জগাই? এটা ওরা খবরের কাগজে ছাপাবে?
-কেন আমার তো মনে হয় তুমি তাই চাইছিলে। প্রচারের জন্য এর চেয়ে ভালো খবর আর কী হতে পারে? আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে হলেও হতে পারে।
-কিন্তু আমি অসাবধানতাবশত এটা করে ফেলেছিলাম।
-কিন্তু সনাতন এটা নিয়ে একটা মজার গল্প লিখতে চলেছে। একজন একশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি যিনি নাকি ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞদের নাকানি চোবানি খাওয়াতে পারেন তিনি নাকি একটা বন্দুকের মধ্যে গুলি ভরা আছে কিনা না জেনেই ট্রিগার টেনে একটা বিপজ্জনক কান্ড ঘটিয়ে বসলেন।
-এটা সত্যিই খুব লজ্জার ব্যাপার হবে!
-আমারও প্রথমে তাই মনে হয়েছিল।
-এখন কি তোর অন্যকিছু মনে হচ্ছে?
-দাদু, তোমার কী করে মনে হলো যে এটা করে তুমি পার পেয়ে যাবে?
-আমার মনে হয়না আমি পার পেয়ে যাব। এটা ঐ সনাতনের মত সাংবাদিকদের জন্য লেখার একটা ভালো বিষয় হবে।আর সনাতন নিশ্চয়ই এমন ভালো একটা গল্প একদিনে শেষ করবে না।
-দাদু, আমার শুধু একটাই চিন্তা। তুমি এমন কিছু করনি তো যাতে ওরা তোমাকে আইনভঙ্গকারী বলতে পারে?
-জগাই, আমার মনে হয় তুই ঠিক। আসলে যে কারণে ওরা আমায় অভিযুক্ত করতে পারে তা হলো শহর এলাকায় গুলি চালানো।
পরের দিন পানু রায় যখন অফিসে ঢুকলেন দেখলেন টেবিলে খবরের কাগজটা রাখা। সনাতনের গল্পটা যে পাতায় আছে সেই পাতাটা খুলে সামনে রেখে গেছে সুন্দরী। পানু রায় কাগজটার দিকে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গেই সুন্দরী ঘরে ঢুকলো। পানু রায় বললেন,’ সুন্দরী, আমি শেষ অবধি প্রচারের আলোয় এসে গেলাম।‘
-কাল থেকে তুমি এই শহরের সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কী লিখেছে শোনো। - শতবর্ষীয় বিস্ময়বৃদ্ধ পানু রায় যাঁর অপরিসীম জ্ঞানের কথা সর্বজনবিদিত এবং যিনি এই শহরের সবচেয়ে মূল্যবান পরামর্শদাতা এবং যাঁর কারিগরী জ্ঞান বিশেষ করে অস্ত্রসম্বন্ধিত জ্ঞান যে কোনও অস্ত্রবিশেষজ্ঞের চেয়ে বেশি বইতো কম নয় সেই পানু রায় বন্দুক হাতে নিয়ে হাস্যকর ঘটনা ঘটালেন।
রেবা কৈরালার সঙ্গে ছোটকালীর সম্পর্ক এবং তারপর থেকে কী কী ঘটেছে এমনকি আচমকা গুলির আঘাতে ছোটকালীর মেহগিনি টেবিল যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সে কথা বলেই গল্প শেষ হয়নি। একথাও লেখা হয়েছে যে শিবুলালের খুনের তদন্ত করতে গিয়ে যে বন্দুকটি রেবা কৈরালার বাড়িতে পাওয়া গেছে সেটিতেও একটা গুলি কম ছিল এবং সেই বন্দুকটিই এই বন্দুক কি না সেবিষয়ে পুলিশ আরও খোঁজখবর চালাচ্ছে। ওদিকে কালীকৃষ্ণের অফিসে ঐ টেবিলটি দেখাবার জন্য সেলসম্যানেরা সম্ভাব্য ক্রেতাদের ভিড় করে ঐ ঘরে নিয়ে যাচ্ছে এবং গাড়ি কেনার কাগজে সই করাচ্ছে। সুতরাং টেবিল পাল্টানোর পরিকল্পনা এখন বাতিল করা হয়েছে। ঐ টেবিলটিকে বিশেষ দ্রষ্টব্য জিনিস বলে প্রচার চালানো হচ্ছে এবং ঐ টেবিলের নামকরণ করা হয়েছে ‘টেবিলের শবদেহ’ বলে।
এই পর্যন্ত পড়ে সুন্দরী থামল কারণ দরজা খুলে ততক্ষণে জগাই ঘরে ঢুকে পড়েছে। জগাই বললো,’ তোমাকে বলে রাখি কাগজ পড়ে যারা ঐ টেবিল দেখতে আসছে ছোটকালীর ছেলেরা তাদের সবাইকে গাড়ি বিক্রীর চেষ্টা করছে। একদিনে গোটা দশেক গাড়ি বিক্রী হয়ে গেছে যা এক সপ্তাহেও হয়না।‘ পানু রায় হেসে সুন্দরীকে ফোনটা দিয়ে বললেন,’ রেবা কৈরালাকে ধরার চেষ্টা করো। আমি ততক্ষণ জগাইএর সঙ্গে কাজের কথা সেরে নিই। বল জগাই কী কী খবর জোগাড় করলি।‘
-শিবুলালের অপরাধী হিসাবে পুলিশের খাতায় নাম আছে। বার দুয়েক জেল খেটেছে। একবার ঠকিয়ে টাকা আদায়ের জন্য আর অন্যবার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের জন্য। লোকটা সেদিন সন্ধ্যেবেলা সাতটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে ০.৩৮ ক্যালিবারের বুলেটের ঘায়ে মারা গেছে। ওর বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে।
-তাতে শরীরের মধ্যে শুধু গুলিই ঢোকে না সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্ত গ্যাসও ঢুকে যায়। কেউ কি গুলির আওয়াজ শুনেছে?
-না। মনে হয়না। বুকে ঠেকিয়ে গুলি করলে আওয়াজ কম হয় বলেই মনে হয়।
-তার মানে কেউ কোনও আওয়াজ শোনেনি। আর কিছু খবর?
পানু রায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই জগাইএর ফোন বেজে উঠলো। জগাই ফোন ধরে ওদিকের কথা শুনে বললো,’ কী সর্বনাশ! তুমি ঠিক শুনেছো? ঠিক আছে এখন রাখছি। আর কিছু খবর পেলে আমাকে জানিও।‘ পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ কী হয়েছে?’
-পুলিশ বলছে যে বন্দুকটা রেবা কৈরালার ঘরে পাওয়া গেছে সেটাই শিবুলালকে হত্যার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
-কোন বন্দুকটা?
-কেন? ওখানে তো একটাই বন্দুক ছিল যেটা ছোটকালী রেবা কৈরালাকে দিয়েছিল। তার মানে যে বন্দুকটা শিবুলালকে হত্যার ব্যাপারে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে বলা হচ্ছে সেটা তোমার কাছে কিছুক্ষণের জন্য ছিল এবং তার থেকে একটা গুলি তুমি ব্যবহার করেছ এবং সবাই সেটা দেখেছে। পুলিশ প্রথমে ভেবেছিল তুমি কিছু একটা পরিকল্পনা করে ইচ্ছাকৃতভাবে ওদের বিপথে চালাতে চাইছিলে। ওরা ছোটকালীকে ঝাঁকাচ্ছে। ওদের ধারণা ছিল তুমি ইচ্ছে করে ঐ ঘাতক বন্দুকটা রেবার বাড়িতে রেখে এসেছিলে।
-ওদের এখন মত পরিবর্তন হয়েছে?
-হ্যাঁ, এখন ওদের মত বদলেছে। এখন ওদের সন্দেহ অন্য একজনকে। সে হচ্ছে ছোটকালীর স্ত্রী। ঐ মহিলা একসময় কাঠমান্ডুর কোনও এক হোটেলে হোস্টেস এবং গয়নার মডেল হিসাবে কাজ করত। শিবুলালের সঙ্গে ঐ মহিলার যোগাযোগ ছিল এবং ওনার ফোন ডায়েরিতে শিবুলালের ব্যক্তিগত ফোনের নম্বর পাওয়া গেছে। শিবুলাল ব্ল্যাকমেলার ছিল এবং ঐ মহিলা সদ্যবিবাহিতা। সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার করতে কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। পুলিশের কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমার ঐ বোকা বোকা গুলি ছোঁড়ার ব্যাপারটা আর তোমার ঐ ‘আমি জানিনা ওতে গুলি ভরা ছিল’ তুমি বুলেট বিশেষজ্ঞদের বিপথে চালনা করার জন্য করেছ। পুলিশ ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখছে না। ওরা সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করছে। কেলো দারোগা তোমাকে কেস দেবে বলে মুখিয়ে আছে। যদি প্রমাণ করতে পারে তুমি সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করেছ তাহলে তোমাকে জেলে ভরার জন্য যতদূর যেতে হয় যাবে।
পানু রায় চেয়ার থেকে উঠে একটু অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে জগাইএর দিকে তাকিয়ে উত্তেজিতস্বরে বললেন,’ শোন, আমি জানতে চাই পুলিশ কী করছে? এ ব্যাপারে যত খবর পাওয়া সম্ভব সব আমার চাই। ওরা সম্ভবত রেবা এবং ছোটকালী দু’জনকেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিয়েছে। ভাগ্য আমাদের প্রতি সুপ্রসন্ন যে বড়কালী দেশের বাইরে। ওকে ধরা খুব একটা সহজ হবে না। কোথাও তো একটা গন্ডগোল লাগছে।‘
-কিন্তু দাদু পুলিশ জানতে চাইছে যে কেন তুমি ছোটকালীর অফিসে গেলে, ওর কাছ থেকে বন্দুক চাইলে, ওটা থেকে টেবিলের ওপর গুলি চালালে তারপর ওটা নিয়ে রেবা কৈরালার বাড়িতে গিয়ে এমন ভাবে রেখে এলে যাতে পুলিশের ওটা খুঁজে পেতে অসুবিধে না হয়।
-জগাই, তুই আমাকে নতুন কিছু বলছিস না। এর পিছনে কী আছে তার সম্বন্ধে তোর বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। যেটা করতে বলছি সেটা কর।
জগাই মাথা নিচু করে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। পানু রায় আরও কিছুক্ষণ পায়চারি করে সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,’ এর উত্তর একটাই।‘ সুন্দরী কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলো ,’ কী?’
-বড়কালীর কাছে নিশ্চয়ই ছোটকালীর অফিসের চাবি আছে। যে বন্দুকটা দিয়ে খুন করা হয়েছিল সেটা বড়কালীর কাছে ছিল। বড়কালী জানতো যে ছোটকালীর কাছে অবিকল একই রকম একটা বন্দুক আছে। সুতরাং বড়কালী খুনী বন্দুকটাতে একটা গুলি ভরে ছোটকালীর ড্রয়ারে রেখে ছোটকালীর বন্দুকটাকে নিয়ে চলে যায়। বড়কালী ভেবেছিল খুনী বন্দুকটা পুলিশ খুঁজে পাবে না। তারপর ছোটকালীর বন্দুক থেকে একটা গুলি খরচ করে সেটা রেবাকে দিয়ে আসে। ভেবেছিল পুলিশ ঐ বন্দুকটা রেবার বাড়িতে খুঁজে পাবে। একটা গুলি নেই দেখে ভাববে রেবা খুন করেছে, তারপর যখন বুঝবে যে ঐ বন্দুকটা থেকে খুন করা হয়নি তখন রেবার প্রতি আর সন্দেহ থাকবে না। আর সেজন্যই আমাকে বলেছিল যেভাবে হোক রেবার নিরাপত্তা যেন কোনও ভাবেই বিঘ্নিত না হয়। কিন্তু আমার ভুলের জন্য বড়কালীর সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। আমি ভেবেছিলাম পুলিশ যখন রেবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তখন জানতে পারবে যে বড়কালী তাকে একটা বন্দুক দিয়েছিল এবং সেটা তারা খুঁজে বের করবে অথবা তারা রেবার বাড়িতে খুনী বন্দুকের খোঁজে তল্লাশি চালাবে । আমি ভাবলাম আমি যদি কোনওভাবে ছোটকালীর বন্দুকটাও রেবার বাড়িতে রেখে দিতে পারি এবং পুলিশ যদি ঐ বন্দুকটা সহজেই হাতে পেয়ে যায় তাহলে নিশ্চয়ই দ্বিতীয় বন্দুকের খোঁজ করবে না। আর তার আগেই যদি ওরা জেনে যায় যে বড়কালী রেবাকে একটা বন্দুক দিয়ে গেছে এবং সেটা চায় তাহলে রেবা ছোটকালীর বন্দুকটা পুলিশকে দেবে এবং যখন বোঝা যাবে যে সেটা খুনী বন্দুক নয় তখন পুরো ব্যাপারটা গুলিয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে যে বন্দুকটা বড়কালী লুকিয়ে রেখে এলো আমি সেটা নিজের অজান্তে বের করে নিয়ে এসে পুলিশের হাতে তুলে দিলাম।
-এখন তোমার কী হবে?
-জানি না।তবে এটুকু বলতে পারি পুলিশ বলতে পারবে না আমি প্রমাণ লোপাট করেছি। উল্টে আমি যে প্রমাণের জন্য পুলিশ হন্যে হয়ে ঘুরছে সেই প্রমাণ উদ্ধার করে পুলিশের মূল সন্দেহ রেবা কৈরালার বাড়িতে রেখে এসেছি। সুতরাং এই মুহূর্তে আমি আমার কী হবে তাই নিয়ে চিন্তিত নই। আমার চিন্তা বড়কালীদের নিয়ে।
-দাদু, তোমার কি মনে হয়, কে খুন করেছে?
- সেটাই তো এখন মূল প্রশ্ন। এই মুহূর্তে পুলিশের ধারণা ছোটকালীর স্ত্রী অথবা ছোটকালী খুন করেছে এবং আমি ওদের বাঁচাবার জন্য রেবাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছি। আমার মনে হয় ছোটকালী আর তার নববিবাহিতা স্ত্রীও আমার ওপর বেশ রেগে আছে। ওদের ধারণা আমি খুনী বন্দুকটা নিয়ে ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলাম। তারপর আমার ইচ্ছাকৃত হৈ হট্টগোলের মধ্যে কোনও ফাঁকে খুনী বন্দুকটাকে ছোটকালীর বন্দুকটার সঙ্গে বদলে দিই। আমার ফাঁদে পা দিয়ে ছোটকালী খুনী বন্দুকটা রেবাকে দিয়ে আসে। বড়কালী যখন কাগজে খবরটা পড়বে তখন আমাকে অভিশাপ দিতে শুরু করবে।
-আর পুলিশ তোমার সম্বন্ধে কী ভাবছে?
- পুলিশ ভাবছে আমি যা করেছি তা কেবলমাত্র পুলিশকে বিপথে চালনা করা জন্য। ওরা যে ভাবেই হোক প্রমাণ করার চেষ্টা করবে আমার কাছে ঐ খুনী বন্দুকটা ছিল। যদি একবার ওরা সেই জায়গায় পৌঁছোয় তাহলে ওরা আমাকে যতদূর পারে টেনে নামাবে।
-কিন্তু ওরা কী করে সেটা প্রমাণ করবে?
-ঐ গুলিটার থেকে যেটা আমি ছোটকালীর টেবিলে ছুঁড়েছিলাম। কিন্তু ঐ গুলিটা ছাড়া কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবে না আমার কাছে ঐ বন্দুকটা ছিল। কিন্তু একবার যদি ঐ গুলিটা পুলিশ হাতে পায় এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা যদি বলে ঐ গুলিটা আমি ছুঁড়েছিলাম পুলিশ প্রমাণ করবে যে ঐ গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। মনে রেখো আমি শিবুলালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম এবং কেলো দারোগা আপ্রাণ চেষ্টা করবে এটা প্রমাণ করতে যে আমিই খুন করেছিলাম।
-বেশ, ওরা যদি ঐ গুলিটা হাতে না পায় তাহলে ওরা নিশ্চয়ই প্রমাণ করতে পারবে না যে খুনী বন্দুকটা তোমার কাছে ছিল।
-পারতেও পারে তবে সোজাসুজি নয়।
-পুলিশের মাথায় এটা আসার আগে জগাইকে কি বলা যায় না ওখানে গিয়ে ঐ গুলিটা খুঁজে আনতে।
-না, না। সেটা সম্ভব নয়। আমি জগাইকে চিনি। এতবড় ঝুঁকির কাজ ও আগে করেনি। একবার ধরা পড়ে গেলে আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাব।
-গুলিটা টেবিল থেকে ছিটকে কোথায় গিয়েছিল তোমার মনে আছে?
-আমি এমন একটা অ্যাঙ্গেল থেকে গুলিটা ছুঁড়েছিলাম যে গুলিটা যাতে ছিটকে দেয়ালে আটকে যায়, কাউকে যেন আঘাত না করে।
- এবার সত্যি বলতো গুলিটা তুমি কেন ছুঁড়েছিলে?
-যাতে কিনা পুলিশ সহজেই একটা গুলি ছোঁড়া হয়েছে এমন একটা বন্দুক রেবার বাড়িতে পেয়ে যায়। আমি ভেবেছিলাম যদি পুলিশ একরম একটা বন্দুকের খোঁজেই রেবার কাছে আসে তাহলে ছোটকালী এবং আমার রাখা বন্দুকটা নিয়েই পুলিশ চলে যাবে।
-তাহলে আমরা এখন কী করবো?
-আমাদের কাছে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
-দাদু, সেটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ । আমার অস্থির লাগছে। আমি একটু খোলা হাওয়ায় হেঁটে আসি। আমি এখনই আসছি।
-সুন্দরী, কী হয়েছে তোমার?
-আমি কাল রাত্রে ঘুমোতে পারিনি। আমি কাল সারারাত ছোটকালী আর রেবাকে নিয়ে ভেবেছি। আমি জানিনা কেন আমি ব্যাপারটা থেকে বেরোতে পারছিনা।
-তুমি আসলে অনেক বেশি সময় অফিসে দিচ্ছ এবং অনেক বেশু দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছ। এতকাজ একসাথে করার সঙ্গে সঙ্গে তুমি আমাকেও কেসের ব্যাপারে সাহায্য করছো।
- সে কথা ঠিক, কাজের চাপ হয়ত বেড়েছে কিন্তু আগে তো কখনও এরকম হয়নি। বিশেষ করে গতরাত্রে। আমি চোখের পাতা এক করতে পারিনি। আমার মনে হয় রেবার প্রেমে আঘাত পাবার ব্যাপারটা আমাকে বেশি ভাবাচ্ছে। একবার রেবার মনের অবস্থাটা ভেবে দেখ, দাদু। একদিন সকালবেলা খবরের কাগজ খুলে দেখল তার প্রেমিক অন্য একজনকে বিয়ে করেছে যে ব্যাপারে সে কিচ্ছু জানেনা। আর তার প্রেমিকের বাবা তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চায়। আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘুম থেকে উঠে পড়েছিলাম। আর শুতে যেতে পারিনি। সারারাত অস্থিরভাবে পায়চারি করেছি।
-সুন্দরী, ভেতরে যাও। একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। আমি সবাইকে বলে দিচ্ছি কেউ যেন তোমাকে বিরক্ত না করে। যদি সেরকম কিছু ঘটে আমি তোমাকে ডেকে দেব।কালকের দিনটা ঘটনাবহুল হবে বলে মনে হয়। আজ সেরকম কিছু হবার সম্ভাবনা নেই। সবকিছু জট পাকিয়ে আছে। পুলিশকে কিছু করার আগে জট খুলতে হবে। সময় লাগবে।
-আর তারপর যখন পুলিশ সক্রিয় হয়ে উঠবে তখন তুমিই হবে তাদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য।
-একদম ঠিক। তবে যদি সে সুযোগ পুলিশ পায়। কেলো দারোগা আপ্রাণ চেষ্টা করবে আমি জানি। যাকগে, ছাড়ো ওসব। পরিস্থিতি কখনও কখনও মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, কয়েকটা ঘটনা আকস্মিকভাবে একসঙ্গে ঘটে গেলে অনেকসময় জটিলতার সৃষ্টি করে। তুমি ভেতরে যাও সুন্দরী।
-দাদু, কিছু দরকার হলে আমাকে ডেকো কিন্তু।
-ঠিক আছে, বাবা।
-আমার শরীরটা ভীষণ ম্যাজম্যাজ করছে।
- কোনও অসুখ বাধাবে মনে হচ্ছে। একটা ডাক্তার দেখিয়ে নিতে পার।
-না, না। কোনও দরকার নেই।একটু ঘুমিয়ে নিতে পারলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
- আমারও তাই মনে হয়। তবে জ্বর এলে আমাকে বোলো। ডাক্তার ডাকতে হবে।
-ঠিক আছে, আসি। দরকার পড়লে ডেকে নিও।
সুন্দরী ভেতরে চলে যায়। পানু রায় পায়চারি শুরু করেন। মাথায় নিশ্চয়ই কিছু ঘুরছে।



0 comments: