ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত
Posted in ধারাবাহিক১৫. লুইজ গ্লিক ও তাঁর কবিতা
প্রিয়বরেষু সুস্মি,
তোমাকে চিঠিটা লিখছি ব্যাঙ্গালোর থেকে। আমাকে লেখা তোমার চিঠি হয়ত বাড়ির পোষ্টবক্সে তালাবন্দি হয়ে পড়ে আছে। বেনারস থেকে ফিরেই ব্যাঙ্গালোর এসেছি। বহুবছর পরে ব্যাঙ্গালোর এলাম। আনুমানিক বিশ বছর তো হবেই নাকি? তুমি তখন ইলেকট্রনিক সিটিতে থাকতে, মনে পড়ে? সকালের ট্রেন লেট করে মধ্যরাতে যখন ব্যাঙ্গালোর পৌঁচ্ছালো তুমি তখনো আমার জন্য প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে। বাইরে অঝোর বৃষ্টি, আমরা বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম একসাথে, পরেরদিন সকালে আমাদের দুজনেরই কি ভীষন জ্বর উঠেছিল। মনে আছে তোমার? এরপর আর কখনো ব্যাঙ্গালোর আসা হয়নি। তুমি নিশ্চয় পরে আরো বহুবার এসেছো। শহরটা আমূল বদলে গেছে, মেট্রোরেল হয়েছে। ইলেকট্রনিক শহরে এখন জ্যেঠু মানে অর্ক থাকে। মেট্রো ষ্টেশনের নীচে যখন ওর সাথে দেখা করেছি তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল। ইনফোসিস, উইপ্রোর সেই চিরচেনা জায়গাগুলো বড্ড বদলে গেছে। পুরোনো জায়গাগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে তোমাকে খুব মনে পড়ছিল মনে পড়ছিল ব্যাঙ্গালোরে প্রথম পড়া লুইজ গ্লিক নিয়ে তোমার সেই কথাগুলো। তখনো লুইজ গ্লিক নোবেল পাননি। তুমি কোন এক লাইব্রেরি থেকে কিনে এনেছিলে গ্লিকের বুনো আইরিস তাঁর পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত কাব্যগ্রন্থ। আমার এখনো মনে পড়ে গ্লিকের বইটা শেষ করে তুমি বলেছিলে পড়ে দেখো আমেরিকার রাষ্ট্রীয় কবি ফুলের ভাষায় কথা বলেছেন গোটা কাব্যগ্রন্থে। ফুল বলতে হয়ত কাঁটাঝোপের ফুল, হয়ত গ্রীষ্মের সামান্য অবকাশে ফুটে ওঠা বর্ষজীবী বুনো আগাছার ফুল যারা কখনো স্রষ্টার কাছে প্রশ্ন রাখে কখনো বা ব্যঙ্গ করে তাঁকে। এবং অনিত্যতার মধ্য দিয়ে জীবনের এই যে উদযাপন তা বিষণ্ণতা বিবর্জিত নয়, কিন্তু যে পোয়েটিক এনার্জি এই বিষণ্ণতা নির্মাণে তিনি প্রতিটি পঙ্ক্তিতে সঞ্চারিত করতে পেরেছেন। তোমার মনে আছে? সেবার ব্যাঙ্গালোরে আমরা গ্লিকের কবিতাতেই ডুবেছিলাম, সম্ভবত ‘ফার্স্ট বর্ন’ বইটি আমরা পড়েছিলাম তার মাস দুয়েক পরে তারপর যখন আমেরিকা থেকে রাজীব নিয়ে এলো ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অফ অ্যাকিলিস’তখন আমাদের নেশায় পেয়েছিল গ্লিকের কবিতা! তিনটি বই পড়ে আমরা একমত হয়েছিলাম গ্লিকের কবিতায় খ্রিষ্টীয় অনুষঙ্গ খুব বেশি করে থাকলেও তার সবটাই প্রায় বিষন্নতা থেকে উৎসারিত এবং সেখানেই তাঁর কবিতার আবেদন ভাষার সীমা অতিক্রম করে যায়। গ্লিকের ফেইথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট যখন পড়ছি তুমি তখন দূরের মানুষ! তোমার সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। বইটির মূল বক্তা একজন বয়স্ক চিত্রশিল্পী, যিনি তার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন এবং জীবনকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। এটি একটি কিংবদন্তি বা রূপকথার মতো করে লেখা, যেখানে একজন নাইট একটি রাজ্যে অ্যাডভেঞ্চার করতে যায়। কি অদ্ভুত আমাদের সম্পর্কটাও তখন মৃত! এই বই যখন পড়ছিলাম আমার বারবার তোমার কথা মনে হতো, আর মনে হতো লুইজ গ্লিক যেন তোমাকে বলতে না পারা আমার কথাগুলোই তার কবিতায় লিখছেন।
তুমিও কি সেই সময় গ্লিক পড়তে? তোমারও কি মনে হতো গ্লিক আমাদের মতই আত্মজৈবনিকতা ও বিষাদময়তা লিখছেন তাঁর কবিতায়। তোমারও কি মনে হয়েছিল গ্লিকের কবিতা মৃদুপ্রবহ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হ্রস্বকায় ও চকিত অন্তমিলযুক্ত। কবিতাগুলো আপাতসরল ভাষায়, কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে জীবনের গভীর বোধ ও জটিলতা। সেখানে প্রগলভতা নেই, আছে পরিমিতিবোধ। শব্দকে তিনি ব্যবহার করেন অতি সাবধানে, অনেক চিন্তাভাবনা করে। তার কবিতার লিরিক্যাল কোয়ালিটিকে অনেকে এমিলি ডিকিনসন ও এলিজাবেথ বিশপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার নির্মেদ-সংবেদী কবিতায় অলংকারের ঘনঘটা নেই। আছে সহজ কথোপকথন ও শুভ-অশুভের বার্তা। তার কবিতা আবেগঘন, মিথ ও প্রাকৃতিক চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ। আধুনিক জীবনের নানা অনুষঙ্গকে তিনি উপজীব্য করে তোলেন তার পঙক্তিমালায়। লুইজ গ্লিক নিয়ে তোমার সাথে কোন কথা হয়নি আমাদের এই দীর্ঘ বিরতির পরে। আজ ব্যাঙ্গালোরে বৃষ্টি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে ফেলে আসা সেইসব দিনরাত। তোমাকে লিখতে বসে মনে পড়ছে গ্লিকে ডুবে থাকা সেই সময়ের কথা। তোমার মনে আছে গ্লিকের দুটো বই পড়ে তুমি বলেছিলে- গ্লিকের কবিতা যেন ‘জীবন ঘষে শিল্প’ হয়ে উপস্থিত হয় আমাদের সামনে। আবেগ ও ভাবালুতাকে সঙ্গী করে বারবার যেন যাপিত জীবনের তটেই ফিরে আসেন তিনি। স্বভাবতই তাঁর কবিতায় ফিরে ফিরে আসে আমাদের নিত্যদিনের চাওয়া-পাওয়া, ছেলেবেলা, হারানো ভালোবাসা, যৌনতা, মৃত্যু, প্রকৃতি ও প্রেম। সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে উপস্থিত হয় পুরাণও। সব মিলিয়ে এই কবির কবিতার মধ্যে আছে সাধারণ—খুবই সাধারণ এক সুর। আর এই সুরটি একই সঙ্গে আমাদের চেনা আবার অচেনাও। বোধ করি এসব কারণেই গ্লিকের কবিতা সাধারণ হয়েও ‘অসাধারণ’। তোমার এই মূল্যায়ন কতটা সত্য তা পরে গ্লিক পড়তে গিয়ে বারবার অনুভব করেছি। আমি যখনই গ্লিককে পড়তে বসেছি আমার মনে হয়েছে সাধারণ হয়েও অসাধারণ হবার চেয়েও বড় হয়ত বিষাদময়তায় বিপরীতে জীবনের আকাঙ্ক্ষারও দেখা মেলে গ্লিকের কবিতায়। প্রেমের আকাঙ্ক্ষা, অন্তর্দৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা। মাঝে মাঝে ইতি ও নেতির আকাঙ্ক্ষায় ঘটে উভয়প্রাপ্তি। এর মধ্যে হয়তো খুঁজলে বিরোধাভাসও পাওয়া যাবে। ভাষায় বিক্ষিপ্ত স্ট্যাটাস, পাওয়ার, মোরালিটি ও জেন্ডার তার সাম্পর্কিক জ্ঞানকে প্রভাবিত করে। সুইডিশ অ্যাকাডেমি লুইস গ্লিকের নোবেল সাইটেশনে উল্লেখ করেছে, গ্রিক পুরাণের ডিডো, পার্সিফোন কিংবা ইউরিডিস হয়ে তিনি যে ব্যক্তিগত উচ্চারণ করেন তার মূল্য বৈশ্বিক। আত্মকথা ও গ্রিক পুরাণ মিলেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতা আত্মজীবনীমূলক মনে হলেও তা কনফেশনাল বা দোষ স্বীকারোক্তিমূলক মনে করা যাবে না। তাঁর কবিতা নিরাভরণ কিন্তু নিরাবরণ নয়; বর্ণনার আধিক্য নেই, ইঙ্গিতের গল্প অনেক কবিতায়। কবি ক্রেইগ মর্গান টিচার মনে করেন, তাঁর কবিতায় শব্দ দুর্লভ, শব্দের কোনো অপচয় নেই, পুনরাবৃত্তি নেই। আমার তো গ্লিক পড়তে বসলে মনে হয় তিনি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলেন, নিজেকে প্রশ্ন করেন। চিন্তা ও অনুভবের মাঝপথ দিয়ে তিনি হাঁটেন। তার পা মাটিতে কিন্তু দৃষ্টি আকাশে। তিনি আবেগরসে নিত্য ও অনিত্যের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন। তার কবিতা চলমানতা ও স্থিরতার এক আত্মিক সেতুবন্ধন। তার নিমগ্নতায় চেতন ও অবচেতনের মধ্যে পার্থক্য লুপ্ত হয়ে যায়। অপার অন্তর্মুখিনতার কারণে যদি তার কবিসত্তাকে ‘স্পিরিচুয়েল’ আখ্যা দেওয়া হয়, তাহলে ভুল হবে না। প্রাত্যহিক জীবনের রূপকল্পে নির্মিত গ্লিকের কাব্যসৌধ। তাই তার দৃষ্টি ব্যক্তিমানুষের জীবনের দিকে, নাগরিক জীবনের আটপৌরে ঘটনাবলিতেও। ছোট ছোট দৃশ্য চোখের সামনে আসে, ভাসে, চলে যায়। তাদের গুরুত্বও কম নয়। ‘শিকাগো ট্রেন’, ‘দ্য এগ’, ‘থ্যাঙ্কসগিভিং’, ‘হেজিটেট টু কল’, ‘মাই কাজিন ইন এপ্রিল’, ‘লেবার ডে’, ইত্যাদি কবিতায় জীবনের ছোটখাটো ঘটনাবলি অপূর্ব তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়। ‘রেডিয়াম’ কবিতায় তিনি সময়ের ও জীবনের সহজ চলমানতাকে তুলে ধরেন। তাঁর কবিতা পড়তে গিয়ে মনে হয় এমিলি ডিকিনসন, এলিজাবেথ বিশপ, সিলভিয়া প্লাথ, জন বেরিম্যান, রবার্ট লাওয়েল এবং রাইনার মারিয়া বিল কোন না কোনভাবে তাঁর কবিতা শৈলীতে মিশে আছে। লিওনিদ অ্যাডামস এবং স্ট্যানলি কুনিৎজের কথা তিনি নিজেই বলেছেন, দুজনই তাঁর শিক্ষক। খেয়াল করলে দেখা যাবে মার্কিন কবিতার মানচিত্র যারা গঠন করেছেন, তাদের কারো সঙ্গেই এ যাবৎ বাংলা কবি মহল ও পাঠকের ঘনিষ্ঠ পরিচয় গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বের মার্কিন কবিতা সম্পর্কে সম্যক অবহিত হতে হলে কাদের কবিতা আবশ্যিকভাবে পাঠ করা দরকার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখেছি উত্তর মিলেছে সচরাচর যে ক'জনের নাম পুরস্কারপ্রাপ্তি ও সমালোচকদের আলোচনার কারণে গুরুত্ববহ তাদের নামই মনে এসেছে, তারা হলেন জন অ্যাশবেরি, অ্যান্থনি হেকট, কে রেয়ান, ডব্লিউ এস মারভিন এবং লুইজ গ্লিক। তোমার তালিকায় কি আরো কেউ আছেন? বলা হয় জন অ্যাশবেরি উত্তরাধুনিক কবিতার প্রধানতম গুরু, তিনি কবিতায় আধুনিক শিল্পসুলভ বিমূর্ততা অনুপ্রবিষ্ট করেছেন, তথাপি তার কোনো অনুরাগী বাংলায় নেই। সত্য তো এই যে, এদের কারোর সঙ্গেই আমাদের কহতব্য কোনো পরিচয় গড়ে ওঠেনি, সৃষ্টি হয়নি আদান-প্রদানের কোনোরূপ সুড়ঙ্গপথ। বাঙালি কবিকুল ও পাঠকের জন্য এ কথা স্বীকার নেওয়া সুবিধাজনক যে, একুশ শতাব্দীর উষালগ্নে লুইস গ্লিক মার্কিন কবিতারসিকদের কাছে তাঁর দৃঢ়মূল অস্তিত্ব নিয়ে উপস্থিত একজন কবি। নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউয়ে কবি স্টিফেন্স ডোবিন্স লিখেছেন, 'সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন কবিদের মধ্যে লুইজ গ্লিকের চেয়ে ভালো আর কেউ লেখে না। আমাদের স্বভাবের এত গভীরে নিয়ে যেতে পারেন এ রকম আর কেউ নেই।' কবি রবার্ট হ্যাস লিখেছেন, 'এ রকম বিশুদ্ধ, এ রকম চৌকস গীতিকবি আমেরিকায় আর নেই।' আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউয়ে অ্যানা উটেনের পর্যবেক্ষণ এ রকম, 'গ্লিক তার পাঠককে ভাবতে বাধ্য করেন, পাঠককে অভিভূত করেন।' লুইজ গ্লিকের কবিতা দাবি করে পাঠকের মমতাপূর্ণ অভিনিবেশ। তার কবিতা পাঠে মনে হয় তিনি একজন ধ্যানস্থ মানুষ, যার মগ্নচৈতন্য থেকে উঠে এসেছে কিছু পর্যবেক্ষণ, কিছু দর্শনবাক্য, জীবনের অচিহ্নিতপূর্ব কিছু অভিজ্ঞান; যা তিনি সাজিয়ে দিয়েছেন কবিতার অবয়বে। বাইরে বৃষ্টি বেড়েছে। কোথাও যাবার নেই তাই তোমাকে লিখতে লিখতেই মনে পড়লো লুইজ গ্লিকের ফ্যান্টাসি কবিতাটি, ভাবছি এই অখন্ড অবসরে তোমার জন্য কবিতাটি অনুবাদ করে ফেলি। কতটুকু হবে কতটা পারবো জানিনা। চেষ্টা করছি যদি হয় চিঠির সঙ্গে দিয়ে দেবো। নিরন্তর ভালো থেকো।
অন্তে প্রেম হোক
বাসু
পুনশ্চ: পরশু ফিরবো দিল্লি, দশ পনেরদিন দিল্লিতে থাকবো। তুমি দিল্লির ঠিকানায় লিখতে পারো।
ফ্যান্টাসি
লুইজ গ্লিক
তোমাকে বলি: প্রতিদিন মরছে যে মানুষ তাদের কথা। এটা কেবল শুরু।
শ্মশানে রোজ জন্ম নিচ্ছে নতুন বিধবা, নতুন এতিম।
হাত ভাঁজ করে তারা বসে থাকে, আর ভাবে নতুন জীবনের কথা।
তারপর তারা হাঁটতে থাকে সমাধিক্ষেত্রের দিকে, অনেকেই প্রথম এসেছে:
কেউ কান্না করতে ভয় পায়; কারো ভয় কেঁদে ফেলার।
কেউ ঝুঁকে এসে বলে দেয় এখন কী তাদের করণীয়: হয়তো
বলতে হবে কিছু; হয়তো কবরে দিতে হবে মাটি
তারপর সবাই বাড়িতে ফিরে যায়: বাড়িটা সহসা মানুষে ভরে ওঠে
বিধবা রাজকীয়ভাবে বসে থাকে, তার কাছে যাওয়ার জন্য মানুষেরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়
সে প্রত্যেককে কিছু বলে, আসবার জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে।
কিন্তু তার মন চায় সবাই চলে যাক:
সে ফিরে যেতে চায় সমাধিক্ষেত্রে অসুস্থদের ঘরে, হাসপাতালে
এটা সম্ভব নয় জেনেও এটাই তার একমাত্র আশা,
অতীতে ফেরার ইচ্ছে অতি সামান্য,
খুব দূরে নয় বিয়ে, প্রথম চুমুর কাছে।
১লা ডিসেম্বর,২০২৫



0 comments: