0

প্রবন্ধ - মনোজিৎকুমার দাস

Posted in








বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ যখন মধ্য গগনে তখন শরৎচন্দ্রের দিব্য জ্যোতি ছড়িয়ে পড়েছিল তাদেরই উদ্দেশ্যে "সংসারে যারা শুধু দিলো, পেল না কিছুই।"

বাংলা কথাসাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের পর যে নামটি স্বাভাবিকভাবে মনে উঁকি দেয় ;তিনি আর কেউ নন, তিনি হলে অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

আপামর বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে চিরকালের জন্য উচ্চমাত্রায় প্রতিষ্ঠা। শরৎচন্দ্র বাংলা কথাসাহিত্যের অমরস্রষ্টা ,অপরাজেয় জীবন অনুসন্ধানী মনস্তাত্ত্বিক কথাশিল্পী। তার সৃষ্টিকে হৃদয়ে স্থান দিতে ব্যক্তি শরৎচন্দ্রকে জানা দরকার।
তার জীবনের কাহিনি তুলে ধরা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মতিলাল চট্টোপাধ্যায় এবং মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী। পাঁচ ভাই এবং বোনের মধ্যে শরৎচন্দ্র ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। শরৎচন্দ্র সাহিত্যসাধনার প্রেরণা লাভ করেন শৈশবকালে পিতার কাছ থেকে।

পাঁচ বছর বয়সে শরৎচন্দ্র দেবানন্দপুরের প্যারী পণ্ডিতের পাঠশালায় ভর্তি হন যেখানে তিনি দু-তিন বছর শিক্ষালাভ করেন। এরপর ভাগলপুর শহরে থাকাকালীন স্থানীয় দুর্গাচরণ বালক বিদ্যালয়ে ছাত্রবৃত্তিতে ভর্তি হন ও পরবর্তীতে ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ভাগলপুর জেলা স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৮৯ সালে শরৎচন্দ্র জেলা স্কুল ত্যাগ করে হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে ভর্তি হন, কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে স্কুলের বেতন দিতে না-পারায় তাঁকে এই বিদ্যালয় পরিত্যাগ করতে হয়। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে মতিলাল পুনরায় ভাগলপুর প্রত্যাবর্তন করলে শরৎচন্দ্র জুবিলি কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন এবং এই বিদ্যালয় থেকে ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় বিভাগে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজে অধ্যয়ন করেছিলেন । তবে দুর্ভাগ্যক্রমে এফএ পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে না-পারায় শরৎচন্দ্র পরীক্ষায় বসতে পারেননি।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন আশৈশব ভবঘুরে। যৌবনে জীবিকা অর্জনের তাগিদে বহুদিন কাটিয়েছিলেন ব্রহ্মদেশের রাজধানী রেঙ্গুনে।

রেঙ্গুনে থাকাকালীন বর্মা রেলওয়ের অডিট অফিসে তিনি একটি অস্থায়ী চাকরিতে নিযুক্ত হন। দুই বছর পর চাকরি চলে গেলে তিনি পেগু তে পাড়ি দেন ও ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে বর্মার পাবলিক ওয়ার্কস অ্যাকাউন্টস অফিসে চাকরি পান ও পরের দশটি বছর এই চাকরিতে ই নিযুক্ত ছিলেন। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ছুটি নিয়ে অশান্তি ও দ্বন্দ্বের কারণে শরৎচন্দ্র চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাংলায় ফিরে আসেন।

রেঙ্গুনের উপকণ্ঠে বোটাটং পোজনডং অঞ্চলে এক ব্রাহ্মণ মিস্ত্রির কন্যা শান্তিদেবীকে শরৎচন্দ্র বিবাহ করেন। তাদের এক পুত্র সন্তান হয় তবে দুর্ভাগ্যক্রমে রেঙ্গুনের প্লেগে আক্রান্ত হয়ে শান্তি দেবী ও তার এক বছরের সন্তানের মৃত্যু হয়। এর বেশ কিছু কাল পরে শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে কৃষ্ণদাস অধিকারীর অনুরোধে তার ১৪ বছরের কন্যা মোক্ষদাকে বিবাহ করেন। তিনি তার নাম দেন হিরন্ময়ী।

শরৎচন্দ্র ঔপন্যাসিক ,অমর কথাশিল্পী, নিপীড়িত, দরিদ্র অভাজনের ব্যথা বেদনার কাব্যকার।তিনি তাঁর সাহিত্যে অসহায় দুর্বল তথাকথিত সমাজ পতিতাদের দুঃখ দুর্গতি ও নানা সমস্যার ছবি এঁকেছেন সহানুভূতিও গভীর মমতার সঙ্গে।তাঁর উপন্যাসের একদিকে যেমন আছে সমাজের নির্মম অত্যাচার ও নিপীড়নের ছবি; অপরদিকে তেমনি আছে অসহায় নারী জাতির প্রতি তাঁর দরদীও মরমী হৃদয়ের এক অপূর্ব প্রকাশ। তাই শরৎ সাহিত্যে দেখা যায় পুরুষ চরিত্র অপেক্ষা নারীচরিত্রের স্বাভাবিক প্রাধান্য। কিরণময়ী, সাবিত্রী, রাজলক্ষ্মী, ষোড়শী, চন্দ্রমুখী নারীত্বের মহিমাই যেমন উজ্জ্বল ও বর্ণাঢ্য ; জীবনানন্দ, সতীশ, , শ্রীকান্ত তেমন বর্ণদীপ্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে শরৎচন্দ্র নারীর সতীত্বের চেয়ে তাঁর নারীত্বকে দিয়েছেন অধিক মর্যাদা । বিধবাদের প্রতি ছিল তাঁর সমবেদনা।

বিদ্যালয় পড়াকালীন শরৎচন্দ্র 'কাশীনাথ' ও 'ব্রহ্মদৈত্য' নামে দুটি গল্প লেখেন। কলেজ জীবন ত্যাগ করে ভাগলপুর থাকাকালীন তিনি বড়দিদি, দেবদাস, চন্দ্রনাথ, শুভদা ইত্যাদি উপন্যাস এবং 'অনুপমার প্রেম', আলো ও ছায়া, 'বোঝা', হরিচরণ' ইত্যাদি গল্প রচনা করেন।

'কুণ্ডলীন' পুরস্কারপ্রাপ্ত 'মন্দির' গল্পটি শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত সাহিত্যিক নিদর্শন ।ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত 'বড়দিদি' বড় গল্পে সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর প্রতিষ্ঠা। 'চরিত্রহীন' উপন্যাস প্রকাশের পর তাঁর অতুল যশ অর্জন হয়ে থাকে। তারপর 'দেবদাস' 'অরক্ষণীয়া,' 'বিপ্রদাস', 'দেনাপাওনা", 'গৃহদাহ', 'শ্রীকান্ত','বামুনের বিয়ে', 'দত্তা ','শেষ প্রশ্ন ','পথের দাবি' প্রভৃতি উপন্যাস ও উপন্যাসোপম বড়গল্প রচনা করে লাভ করেন অপরাজেয় কথাশিল্পীর অমর আসন। তাঁর রচিত, "অভাগীর স্বর্গ 'ও' মহেশ" উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প।'অনিলা দেবী', ছদ্মনাম নিয়েও তিনি বহু অচেনা সৃষ্টি করেছিলেন।

শরৎচন্দ্র নারীজাতিকে যথেষ্ট সম্মান করতেন। তাঁর লেখায় তিনি নারীজাতিকে উচ্চাসনে বসিয়েছিলেন। সমাজের কুসংস্কার, অন্যায় অবিচার ,জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি মত প্রকাশ করেছেন।

শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন হলো জনপ্রিয় উপন্যাস।
১৯০০ শতাব্দীর প্রথম দশকের বাংলা সমাজের পটভূমিকায় এই উপন্যাসটি রচিত। উপন্যাসটিতে চারটি নারী চরিত্র রয়েছে। প্রধান দুটি নারী চরিত্রের নাম সাবিত্রী ও কিরণময়ী। ছোট দুটি নারী চরিত্রের নাম সুরবালা ও সরোজিনী। সাবেক দুই চরিত্রহীন (চরিত্রহীন) হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সাবিত্রী চরিত্রটি বিশুদ্ধ, সে তার ভালবাসার মানুষ সতীশ-এর প্রতি অনুগত। সুরবালা উপেন্দ্রনাথের স্ত্রী। তিনি বয়সে তরুণ, ধর্মীয় গ্রন্থগুলিতে অন্ধবিশ্বাসের কারণে তার চরিত্রও চিত্তাকর্ষক। সরোজিনী পাশ্চাত্য শৈলীতে শিক্ষিত এবং চিন্তা-ভাবনায় অগ্রসর কিন্তু পারিবারিক পরিস্থিতিত এবং একটি জাদরেল মা দ্বারা তার জীবনযাপন অবরুদ্ধ। সরোজিনী শেষতক সতীশকে বিয়ে করেন। উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র কিরণময়ী। তরুণ এবং অত্যন্ত সুন্দরী, বুদ্ধিমতী। তবে তার আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাগুলি সর্বদা বিবাহিত বিষয়গুলির তুলনায় স্বামীকে শিক্ষাদান করার জন্য এবং স্বামী ও শাশুড়ীর দ্বারা সর্বদা দমিত হয়।

তিনজন পুরুষ চারজন নারীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কিন্তু বেশিরভাগ সময় তাদের কর্ম নারীদের জন্য ক্ষতিকর। তারা অর্পিত, অবিচ্ছেদ্য এবং তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে নয়। শেষ পর্যন্ত সারোজিনির সাথে অদ্ভুতভাবে কাজ করে, যখন তিনি উপেন্দ্রের মৃত্যুবরণে চূড়ান্ত পুনর্মিলন নিয়ে আসেন। উপেন্দ্র প্রথমে কিরণময়ীকে সাহায্য করতেন, কিন্তু দীবাকরের সাথে তার সম্পর্কের সবচেয়ে খারাপ দিকটি মনে করে এবং আসলে দীবাকরের সাথে কিরণময়ীর বাধ্যতামূলক অংশীদার হয়ে ওঠে।দীবাকর দুর্বল-নিখুঁত এবং অপ্রতিভ। একটি অনাথ, তিনি কিরণময়ী দ্বারা তার ভাই হিসাবে চিকিৎসা দ্বারা আনন্দিত হয়, এবং অবশেষে শিক্ষা । তিনি কিরণমায়িয়ের সাথে তার সমাধিস্থলের পরে সম্পূর্ণ দায়িত্বহীনভাবে কাজ করেন।সেকালের সমাজের প্রেক্ষিতে কারা চরিত্রহীন ছিল ভাববার বিষয়।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অত্যন্ত পাঠক নন্দিত একটি উপন্যাস হলো 'দেনা-পাওনা'। জনপ্রিয় এই লেখক জমিদার প্রথা, ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব এবং একজন নারীর মনের দৃঢ়তা আর কোমলতাই চিত্রায়ন করেছেন এই উপন্যাসে।

শরৎচন্দ্র নারীর সতীত্বের চেয়ে নারীত্বকে অধিক মর্যাদা দিয়েছেন তার গল্প উপন্যাসে তার পরিচয় আমরা পাই এখানে।

শরৎচন্দ্র আসলে তৎকালীন সমাজের ভালোবাসার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতাকে উপস্থাপনা করতে গিয়ে বর্তমান যুগেও ‘দত্তা’ কে ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক করে দিয়েছেন। সত্যের নগ্ন রূপ যতই কুৎসিত হোক না কেন তা একদিন সামনে আসবেই। সত্য শুধু মুখের কথা নয় এ হল অন্তরের উপলব্ধি যা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষকে দেখতে সাহায্য করে। এ প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র অনুভূতি কত প্রখর তা বোঝা যায় যখন নলিনী নরেনের কথাগুলো দয়ালবাবুকে বলছেন,

” সত্যের স্থান বুকের মধ্যে, মুখের মধ্যে নয়। কেবল মুখ দিয়ে বার হয়েছে বলেই কোনো জিনিস কখনো সত্যি হয়ে ওঠে না। তবুও তাকে যারা সকলের অগ্রে, সকলের উর্ধ্বে স্থাপন করতে চায়, তারা সত্যকে ভালোবাসে বলেই করে না, তারা সত্যভাষণের দম্ভকেই ভালোবাসে বলে করে।”

শরৎচন্দ্রের আবির্ভাবে বাংলা উপন্যাস এক বিপ্লব সৃষ্টি হল। শরৎসাহিত্য বাংলা উপন্যাসের বিষয়বৈচিত্র্য, চরিত্রের নতুনত্ব, প্রত্যক্ষ সমাজ সমস্যা। সমাজের অধিকাংশ সমস্যার মূল উৎস মানুষ ,তাই বঞ্চনাকারীর প্রতি তাঁর এত ক্ষোভ। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো নীতিবাদী অথবা রবীন্দ্রনাথের মতো উচ্চমননশীলতা ও তাঁর পছন্দ নয়।

তিনি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে গল্প উপন্যাস রচনা করেন, যেগুলোতে কল্পনা অবাস্তবতার ছোঁয়া ছিল না । সমাজে যে সব মানুষ নিন্দিত, উপেক্ষিত, শরৎচন্দ্র তাঁর দরদি মন নিয়ে তাদের পক্ষ অবলম্বন করে দেখিয়েছেন যে মনুষ্যচরিত্র, ধর্ম এবং মানব মনের সুপ্ত বাসনাগুলো কখনোই মারা যায় না। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত রাজনৈতিক উপন্যাস ,'পথের দাবি' ইংরেজ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল যা সে যুগের স্বদেশী আন্দোলনকারীদের পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের জন্য ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তার ' পথের দাবী ' উপন্যাস নি:সন্দেহ ইংরেজের কাছ থেকে পরধীনতার শৃঙ্খল উন্মোচনের জ্বলন্ত দলিল। স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা ' পথের দাবী 'কে তার লেখা মাস্টার পিস বললে অত্যুক্তি হয় না।

দেবদাস শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি প্রণয়ধর্মী বাংলা উপন্যাস। সেকালে বাঙালি পাঠকরা ' দেবদাস' উপন্যাসকে লুফে নেয়। তরুণ যুবাদের কাছে তার ' দেবদাস' অসাধারণ পাঠক প্রিয়তা লাভ করে।

দেবদাস শরৎচন্দ্রের প্রথমদিককার উপন্যাস। রচনার সমাপ্তিকাল সেপ্টেম্বর ১৯০০ সাল।কিন্তু প্রকাশনার বছর ১৯১৭। উপন্যাসটি নিয়ে শরৎচন্দ্রের দ্বিধা ছিল বলে দীর্ঘ ১৭ বছর প্রকাশ করা থেকে বিরত ছিলেন। উপন্যাসটি তিনি তার বন্ধু প্রমথনাথ ভট্টাচার্যকে ১৯১৩-তে লেখা এক চিঠিতে শরৎচন্দ্র লিখেছেন, 'ওই বইটা [দেবদাস] একেবারে মাতাল হইয়া বোতল খাইয়া লেখা।'

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান প্রধান ভাষায় উপন্যাসটি অনূদিত হয়েছে। পারুর জন্য দেবদাসের বিরহ উপজীব্য করে রচিত এই উপন্যাস অবলম্বনে ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। দেবদাস বিরহকাতর চিরায়ত প্রেমিকের ধ্রুপদি নিদর্শন হিসেবে আজও গণ্য হয়।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য-কর্মকে কেন্দ্র করে ভারতে প্রায় পঞ্চাশটি চলচ্চিত্র বিভিন্ন ভাষায় নির্মাণ করা হয়েছে যার মধ্যে 'দেবদাস' উপন্যাসটি বাংলা, হিন্দি এবং তেলেগু ভাষায় আটবার চলচ্চিত্রায়িত হয়েছিল । তাছাড়া সন্ধ্যারানি ও উত্তমকুমার অভিনীত বাংলা চলচ্চিত্র 'বড়দিদি' এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মৌসুমি চট্টোপাধ্যায় অভিনীত 'পরিণীতা' ছবি নির্মাণ করা হয়ে থাকে। 'পরিণীতা' উপন্যাসটি দু ~দুবার চলচ্চিত্রায়িত হয়ে থাকে। স্বামী' চলচ্চিত্রের জন্য 'ফিল্মফেয়ার' সেরা লেখকের পুরস্কার প্রাপ্তির সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন । 'বিন্দুর ছেলে' অবলম্বন করে বিখ্যাত চলচ্চিত্র 'ছোটি বহু' (১৯৭১) প্রভূত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এছাড়া ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত, "নববিধান" উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে চিত্রায়িত 'তুমহারি পাখি' নামে একটি দূরদর্শন ধারাবাহিক নির্মাণ করা হয়েছিল।

শরৎচন্দ্রের প্রতিভা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে 'জগত্তারিণী স্বর্ণপদক' এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'সাহিত্যাচার্য' উপাধি প্রদান করা হয় । ১৯৩৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বি.এ পরীক্ষায় বাংলা প্রশ্নপত্রের প্রশ্নকর্তা হিসেবেও তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডি .লিট উপাধিও পেয়ে থাকেন। দেশবাসী তাঁকে 'কথাশিল্পী' এবং 'সরণীশিল্পী' হিসেবেও আখ্যা দিয়ে থাকেন।

১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে শরৎচন্দ্র প্রায়শই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। দেওঘর থেকে ফিরে এসে শরৎচন্দ্রের যকৃতের ক্যান্সার ধরা পড়ে, যা তার পাকস্থলী পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জানুয়ারি বিশিষ্ট শল্য চিকিৎসক ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার করলেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি । চার দিন পর অর্থাৎ ১৬ই জানুয়ারি সকাল দশ ঘটিকায় শরৎচন্দ্র শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেএক 'অপরাজেয় কথাশিল্পী' , শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তার শিখরে তাই অধিষ্ঠিত আজ ও। এককথায় শরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন কথাসাহিত্য মর্ত্য ~অবরণের সাহায্যকারী ভগীরথ যিনি উৎসদ্বারের সবরকম বাধা দূর করে অনন্ত পথ অবারিত করে দিয়েছিলেন পাঠকদের কাছে।

0 comments: