0

সম্পাদকীয়

Posted in


 


















সংবাদপত্রের একেকটা খবর শেষ পর্যন্ত পড়তে ইচ্ছে করে না। যেমন, নয়ডার দুর্ঘটনায় তরুণ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর মৃত্যু। মোবাইল ফোনে একটি টগবগে তরুণের শেষ আর্তি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়ার আগে মরণপণ চেষ্টা করেও উদ্ধার করা যায়নি তাকে। ভাবনাটি মাথার মধ্যে এলে আনচান করে শরীর, শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা তরল-স্রোত নেমে যায়।প্রকৃতি এবং বিশেষ একটি উদ্ভূত পরিস্থিতির কাছে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সময়োপযোগী বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিও কি নিরুপায়, এই ঘটনাটি তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। মন অবুঝ হলেও এমন ঘটনাকে মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।

কিন্তু যখন জানা যায় একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রধান আর তাঁর স্ত্রীকে ভিত্তিহীন এবং হাস্যকর অভিযোগে অন্য একটি রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী তাঁর বাসভবন থেকে রাতের অন্ধকারে কিডন্যাপ করে আনে, তখন রাষ্ট্রপুঞ্জ নামক কোনও নীতি নির্ধারক গোষ্ঠীর অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান হওয়া ছাড়া কোনও উপায় থাকে কি? এই কুকর্মটির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা দূরভিসন্ধিটিও স্পষ্ট হয়ে যায় এক লহমায়। আর সেই 'অধিকৃত' দেশটির নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্ত মানবাধিকার কর্মী মারিয়া কোরিনা মাচাদো'র এই বিরল এই বিরল সম্মানটিও যখন 'বলশালী রাষ্ট্রপতি' নিজগুণে অধিকার করে নেন, ঘৃণায় শরীর অবশ হয়ে আসে। এই গ্রহের বাসিন্দা হিসেবে লজ্জাবোধ হয়!

এমত পরিস্থিতিতেও রাত পোহালেই বাৎসরিক নিয়ম মেনে ৪৯ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার উদ্বোধন। এখনও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে যে ক'টি বিষয় একটি সংবেদনশীল মানুষের বেঁচে থাকার কারণ হতে পারে, তার একটি বই।

সুস্থ থাকুন। দায়বদ্ধ থাকুন।

শুভেচ্ছা নিরন্তর।

0 comments:

0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - সেবিকা ধর

Posted in







অদ্বৈত মল্ল বর্মন নামটি শুনলেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে মালো পাড়া একেবারে তথাকথিত প্রান্তিক জেলে পরিবারের মানুষজন,নৌকো, মাছের আঁশ গন্ধ তিতাসের কল্লোল এবং তিতাসের স্রোত। মালো পাড়ার এই যে জীবন, জাওরা পুলার জীবন সবটা নিয়ে অদ্বৈত কলকাতার যে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী আবহ তার মধ্যে খানিকটা হয়তোবা প্রান্তিক নয়তো ব্রাত্য ছিলেন।তিনি তাঁর নিজের লেখার যোগ্যতায় লেখনীর ঐতিহ্যে এবং ধারাবাহিকতায় তৈরি করেছেন এক মহান উপন্যাস, এক মহা আখ্যান। তার নাম তিতাস একটি নদীর নাম।বাংলা ভারত তথা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটক তাঁর এই আখ্যানটি নিয়ে একটি মহৎ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন।আমরা সেই সব প্রসঙ্গেও যাচ্ছি না।কিন্তু অদ্বৈতের স্বল্পায়ু কলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনে তাঁকে খুটে খাওয়া খবরের কাগজের চাকরি, তিতাস একটি নদীর নামের পাণ্ডুলিপি দেশ পত্রিকার অফিস থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর যে প্রতিকূলতা সব ধরনের যে বাঁধা তাকে অগ্রাহ্য করে তিনি এগিয়েছেন নিজের খেয়ালে।নিজের মেজাজে,নিজস্ব ভঙ্গিতে। এই নিজস্ব ভঙ্গিমা স্থির হয়েছে ভারতীয় তথা বাংলার যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যে লোকগান,মাঝি মাল্লাদের সঙ্গীত সেই সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আকাঙ্খা, বিবাহ,যৌনতা মৃত্যু সবই অদ্বৈতকে তিতাসের কোলে বারবার নিয়ে এসেছে। এই তিতাস তরঙ্গ তার জীবনে এক আশ্চর্য অভিঘাত হয়ে দাঁড়ায়।




বাংলাভাষা বা শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কেন পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় যে নদীকেন্দ্রিক উপন্যাস লেখা হয়েছে তার মধ্যে অদ্বৈত মল্লবর্মণের 'তিতাস একটি নদীর নাম' অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আখ্যান।অদ্বৈত মল্লবর্মনের পূর্বপুরুষ মৎস শিকারী বা মৎসজীবী ছিলেন।সেই জীবনের অভিজ্ঞতা তিনি প্রতি পদে,প্রতি পাতায় বিবৃত করেছেন এই আখ্যানে। কিন্তু শুধুমাত্র তো অভিজ্ঞতা থাকলেই হয় না,তার সঙ্গে মিশে স্বপ্ন কল্পনা। লেখকের অন্যান্য অনুভব তাই।ফলে 'তিতাস একটি নদীর নাম' আখ্যান হিসাবে ভারতীয় বাংলা তথা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নদীকেন্দ্রিক আখ্যান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আমরা জানি বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের কাছে 'পদ্মা', বিভূতিভূষণের 'ইছামতী', তারাশঙ্করের 'ময়ূরাক্ষী', 'অজয়', মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি', নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে 'মহানন্দা', সমরেশ বসুর 'গঙ্গা' দেবেশ রায়ের 'তিস্তা' ঐশ্বর্যময় রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু তিতাসের চরিত্রে ঔপন্যাসিক যে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন সেটা সম্পূর্ণ অর্থে এদের থেকে আলাদা,স্বতন্ত্র। এছাড়াও আরও অনেকে চেষ্টা করেছেন নদীকে নিয়ে বাংলা ভাষায় উপন্যাস লিখতে।যেমন প্রবোধ বন্ধু অধিকারী লিখেছেন 'আবার কর্ণফুলী আবার সমুদ্র' অমরেন্দ্র ঘোষ 'চর কাশেম' লিখেছেন নদী নিয়ে উপন্যাস।এছাড়া আরও অনেকে রয়েছেন। কিন্তু তিতাস সর্ব অর্থে একটি আলাদা পরিকল্পক হিসাবে আমাদের সামনে আসে। আমরা জানি তিতাসের যে মূল পাণ্ডুলিপি তা হারিয়ে গিয়েছিল প্রথম বার এবং দ্বিতীয়বার তিনি অদ্বৈত তাঁর স্মৃতি থেকে সেই লেখাটি লিখেন এবং তা প্রকাশিত হয়।


তিতাস একটি নদীর নাম'-একটি মহৎ আখ্যান।এই লেখাটির আখ্যান কল্পনাকার অদ্বৈত মল্ল বর্মন। সাধারণভাবে কোনো চরিত্রকে ধরে এই আখ্যান এগোয় নি।চরিত্ররা এসছে, পাশে থেকেছে, হেঁটেছে কিন্তু আসল চরিত্র হচ্ছে তিতাস।যে তিতাস জলে, বৃষ্টিতে, রোদে ষড়ঋতুর কাঁপন এবং প্রবহমানতায় গ্রীষ্ম, বর্ষা,শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্তে নতুন নতুন রূপ পরিগ্রহ করে এবং আমরা দেখতে পাই যেতে সেই রূপের আন্ধার মধ্যে, আমরা 'রূপের আন্ধার' কথাটি খুব স্পষ্ট করেই বললাম কারণ নারীর রূপেও কখনো কখনো আন্ধার থাকে যখন নারী নিজেকে অন্য কোনো ভাবে মেলে ধরতে চায় পুরুষের কাছে।আন্ধার থেকেই আসে আলো।তিতাসের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রকম। অর্থাৎ তিতাসের যে আন্ধারিমা, তার যে অন্ধকার, জীবনের নানা টানাপোড়েন এবং কষ্ট, সেখানকার মানুষদের এই যে ভয়ানক দুর্দশা এবং বাঁচার জন্য যে ইতস্তত সংগ্রাম এই সবটা নিয়ে তিতাস আমাদের বুকের গভীরে হৃদয় রেখার সংলগ্ন হয়ে গভীরে এগোয়।


অদ্বৈত সম্পূর্ণ দেশজ সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে এই উপন্যাস নির্মাণ করেছেন।আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের আঙ্গিক এবং পরা আঙ্গিকের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।এখানে পরা আঙ্গিক বিষয়টি আমাদের একটু বলে দেওয়া দরকার তার কারণ আঙ্গিক তো সবাই তৈরি করে।কিন্তু আঙ্গিক ভাঙার কথা, আঙ্গিকের মধ্য থেকে নতুন আঙ্গিককে বের করে আনা যেমন নদীর স্রোতের ভেতর থেকে আরেকটি স্রোত আবিষ্কার করেন একজন মহৎ শিল্পী। ঠিক তেমনি অদ্বৈত মল্ল বর্মন তিতাস নদীর সঙ্গে, তিতাসের নৌকোর পালের সঙ্গে এগিয়ে গেছেন জীবন এবং জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে দিতে। তিনি নাইয়রের গান, বিয়ের গান,ছড়া,ধাঁধা, প্রবাদ- প্রবচন, নৌকা, কাঁথা, হুকো,জাল,আলপনা, লোকবাদ্য, লোকদেবতা, লোকক্রীড়া, লোকঔষধ, লোকগণিত,বারোমাসি গান,আম্রতত্ত্ব ইত্যাদি এইসমস্ত কিছুর কথা তিনি বলে গেছেন। আমরা জানি যে আমাদের লোকজীবনের সঙ্গে মৎসচাষ,মৎস শিকার মৎসের পেছনে ঘুরে বেড়ান একটা বড় ব্যাপার ছিল একসময়।আজকে আধুনিক পৃথিবীতে ট্রলার ইত্যাদি আবিষ্কার হওয়ার পর সেই মহিমা হয়ত খানিকটা পরিবর্তিত হয়েছে,যখন পৃথিবীতে পাল তোলা নৌকো এবং দাঁড় ও আবহাওয়া নির্ভর মাঝিরা তারা এগিয়েছেন সেই সূত্রধরে।


আমরা দেখেছি যে এক অন্যতর ভুবনের কথা অদ্বৈত যেমন বলছেন। ফলে প্রতিটি পদে এই যে বাংলার ছড়ানো প্রতিটি লোকজীবন ও সংস্কৃতি, লোকব্যবহার, লোকাচার, লোককথা,লোক যে সম্ভাষণ পরম্পরা সবটাই এসেছে শুধুমাত্র তাঁর নাগরিক ভাবনাচিন্তা থেকেই। তিতাসের যে অনুষঙ্গগুলি প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি পাতায় অদ্বৈত দেখিয়েছেন, অদ্বৈত নাগরিক মনন থেকে শুধুমাত্র অনুসরণ বা অনুশীলন করেন নি
তিনি একজন প্রকৃত প্রস্তাবে একজন ছাত্রের মতো পাঠ নিচ্ছেন লোকজীবনের আবার একইসঙ্গে ব্যাখ্যা, এবং তাঁর যে মেধা, তাঁর যে ধী শক্তি সেদিকেও তিনি প্রয়োগ করেছেন নিজস্ব মুন্সিয়ানায়। এই মুন্সিয়ানাকে আমাদের শ্রদ্ধা না জানিয়ে কোনও উপায় থাকে না।আখ্যানের গভীরে ঢুকতে ঢুকতে তিনি মালো পাড়া,মালো জীবন জাওলা জীবন ইত্যাদি প্রভৃতি যে চলন সেগুলোর যে ধারাবাহিক ছন্দ এবং পতন তাঁকে আবিষ্কার করেছেন। আমরা জানি 'ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী' আর্ণেষ্ট হেমিংওয়ের বিখ্যাত একটি আখ্যান। সেই আখ্যান নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ইত্যাদি করা হয়েছে।'ওল্ড ম্যান এণ্ড দ্য সী' আয়তনে অত্যন্ত কৃষ মানে বেশি পাতার উপন্যাস সেটি নয়। কিন্তু তার আলোচনা এবং ব্যাখ্যা হয়েছে নানাভাবে। জীবন, মৃত্যু,মৃত্যুবোধ সবটাই উঠে এসেছে সেই ব্যাখ্যাকারদের কলমে বা টাইপ রাইটারে।রুশ সাহিত্যিক মিখাইল শলোকভের 'অ্যাণ্ড কুয়াইট ফ্লোওস দ্য ডন' উপন্যাসে ডন নদী এক সুবিশাল জাতিগোষ্ঠীর প্রাণ প্রবাহ সঞ্চারিত করে ছিল।আমরা যদি অদ্বৈত মল্ল বর্মণের সৃষ্টির দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে ভারতীয় বা বাংলা উপন্যাসের যে চলন সেই চলনকে অদ্বৈত অস্বীকার করে নিজের মত করে এগিয়েছেন।অর্থাৎ অস্বীকার করা মানে ইংরেজদের একটি চাপিয়ে দেওয়া মডেল, সেই মডেলকে অস্বীকার করে,সেই মডেলকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে বিচার করে তিনি এগিয়েছেন তার নিজস্ব মুন্সিয়ানায়। ফলে তিতাস হয়ে উঠেছে চরিত্র তিতাস হয়ে উঠেছে মানুষের ক্রন্দন,বারোমেসে জীবন জেলে যারা মৎসজীবী,তাদের কষ্টের কথা তাঁদের আবহমানের দুঃখ, নির্যাতন বেঁচে থাকা, বিবাহ, আনন্দ, মৃত্যু,আহ্লাদ, যৌনতা, সার্বিকভাবে একটা গোটা নদীর ভূগোল যেন ঢুকে পড়েছে এই আখ্যান পর্বে।


নদীর যে চলন এবং ইতিহাস তা পৃথিবীর সব দেশে আপাতভাবে এক মনে হলেও মোটেই এক নয়।নদী এশিয়াতে বা ভারত উপমহাদেশে যে ব্যাপ্তি গ্রহণ করে যে রূপ পরিগ্রহ করে ইউরোপের নদী একেবারেই সেরকম নয়।ফলে মিশর চীন ভারত এবং ইরাক ইরানের যে নদী মাত্রিক জীবন তার সঙ্গে ইউরোপের নদী মাত্রিক জীবনের ফারাক রয়ে গেছে, আছে, থাকবেও। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ কোনও তত্ত্ব লিখতে বসেন নি। তিনি তাঁর মতো করে নদীকেন্দ্রিকতার এক আশ্চর্য চেহারা অন্য রূপ তুলে এনেছেন আমাদের সামনে।লেখক যেভাবে একজন প্রকৃত প্রস্তাবের ভাস্কর, তিনি যেভাবে পাথর কেটে কেটে একটি বড় মূর্তি বা স্থাপত্য তৈরি করেন সেভাবেই অদ্বৈত মল্ল বর্মণের লেখার গভীর থেকে সত্যটিকে খুঁজে বের করেছেন। লেখার এই আত্মা বা সত্য প্রকাশ করে অতীব কঠিন কর্ম।
আমরা আগেই বলেছি অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম বাংলা তথা ভারতীয় ভাষার একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নদীকেন্দ্রিক আখ্যান।অদ্বৈত জলকে যেমন নিয়ে এসেছেন মানুষের জীবন ধারার অন্যতম স্রোত হিসেবে।তিতাসের স্রোত তিতাসের নদী বহতা,বহমান তিতাস, জলে ভেসে থাকা নৌকো,জেলেদের নিদারুণ জীবন যন্ত্রণা সবটাই অদ্বৈত মল্লবর্মণ চমৎকারভাবে ফুটিয়েছেন আমাদের সামনে। এখন কথা হল যে অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নামের মধ্যে যে লোকায়ত এবং লোকায়তিক জীবন এবং পারিপার্শ্বিকতার কথা বলা হয়েছে অত্যন্ত সুনিপূনভাবে সেই সমস্ত বিষয়গুলি আমাদের সামনে তোলে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজস্ব আঙ্গিক এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী থেকে।






গান মানুষের জীবনের এক অনন্ত সম্পদ।দুঃখের সুখে আনন্দে বিষাদে হর্ষে সবেতেই গান বা সংগীত মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। গান এবং লোকগান এই দুয়ের পার্থক্য যেমন ছিল তেমনই থাকবে।আমরা জানি যে সমুদ্রের কল্লোর নদীর বহতা ধারা, পর্বতের দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, অরণ্যের পত্রমর্মর,পাখির গান সব কিছুই মানুষের জীবনে সংগীতের মূর্ছনা হিসেবে হাজির হয়েছে।মানুষ যখন প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্ন ছিল তখন সে সমুদ্রের উচ্ছ্বাস থেকে বাণ-বণ্যার ভয়াবহতা থেকে, নদীর কল্লোল এবং কলতান থেকে,পাখির কূজন থেকে কোনও হিংস্র জন্তুর হিশহিশানি থেকে বা গর্জন থেকে আবিষ্কার করেছে সংগীতের নতুন নতুন আঙ্গিক। এইভাবেই উঠে এসেছে লোকগান, লোকসংগীত বা লোকগীতি।যুগ- যুগান্তরে সেটি আস্তে আস্তে অন্যরকম হয়েছে। ধীরে ধীরে তার সংস্কার হয়েছে কিন্তু লোকগান বা লোকগীতি অনেকটাই প্রকৃতির সংলগ্ন হয়ে আছে।যেমন মাঝিদের গান তার সঙ্গে মিশে আছে ভাটিয়ালি, জারি-সারি ইত্যাদি, তারপর আছে ফসল রোপনের গান,ফসল কাটার গান, আছে বিবাহের গান,নবজাতক বা নবজাতিকা হলে তার গান, বিবাহোত্তর জীবনের যে পরিণতি সবই কিন্তু গান হয়ে আমাদের জীবনে এসেছে।এই গান এক অনাস্বাদিত অধ্যায়ের কথা,আমাদের লৌকিক জীবনের আঙ্গিক হিসাবে এসে উপস্থিত হয় আমাদের সামনে।আমরা নগর সভ্যতা বা নাগরিক চাতুরালি দিয়ে এই গানকে বুঝতে চেষ্টা করি কিন্তু বুঝতে পারি না।আসলে লোকমানসের গান হচ্ছে মানুষের বুকের ভাষা এবং মুখের ভাষা।সে বুকের ভাষা এবং মুখের ভাষা যখন সুর হয়ে এক হয়ে যায় তখন তা পরিণত হয় লোকগানে।ভাওয়াইয়া, চটকা,আলকাপ,গম্ভীরা মুর্শিদি, বাউল সবই নানাধরণের লোকগান। ফলে এই যে লোকগানের বিশাল ভুবন অদ্বৈত মল্ল বর্মণ তাঁর মহাকাব্য প্রতীম আখ্যান তিতাস একটি নদীর নাম- এ যে গানের কথা যেমন নাইয়রের গানের কথা,বিবাহের গানের কথা অন্য অন্য লোকগানের কথা অনুষঙ্গ হিসেবে সুন্দর করে তুলে এনেছেন আমাদের সামনে।


ধরা যাক লোকসঙ্গীতের ব্যবহার। অদ্বৈতের উপন্যাস মাটির রূপ-রস গ্রহণ করে জীবনকে সুর ও ছন্দে এক আশ্চর্য কথকথায় বেঁধে রাখে।তবুও এই জীবন সংগ্রাম সংস্কৃতি চর্চায় বিমুখ হয় নি। তিতাস পাড়ের অপামর মানুষের জীবন স্রোতের সুর সাঙ্গীতিকময় হয়ে উঠেছে বিচিত্র সঙ্গীত ধারায়।সেই সঙ্গীতের সুর তিতাসের বুকে মাঝি-মাল্লা,মা বোনদের কন্ঠে ভেসে বেড়ায়।এই সঙ্গীত হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা-বেদনার গান।তারা গায় দেহতত্ত্ব,বিচ্ছেদ,হরিবংশ,ভোরগান, গোষ্ঠগান,বিবাহের গান,বারমাসি গান,মিলনের গান।প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন লোকবৃত্তের মানুষেরা গায় সারি গান,গদ্যভাবের গান,গায় হোলির গান।লেখক দেখিয়েছেন কিশোর- সুবল প্রবীন তিলকচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছে, নতুন জায়গায় মাছ ধরার জন্য।নৌকায় ভেসে ভেসে কিশোর গাইছে-
"উত্তরের জমিনরে,সোনাবন্ধু হাল চষে,
লাঙ্গলে বাজিয়া উঠে খুয়া।
দক্ষিণা মলয়ার বায়,
চান্দমুখ শুকাইয়া যায়
কার ঠাঁই পাঠাইব পান গুয়া।।"
গ্রামের একটি কীর্তনের আসরে তিলক গায়,
"উঠান মাটি ঠন ঠন, পিড়া নিল সোতে, গঙ্গা মইল জল-তিরাসে,ব্রহ্মা মইল শীতে।।"
তিতাস পাড়ের লোকেদের প্রিয় বারোমাসি গান। তিতাস পাড়েএ বারোমাসির দুটি লাইন এরকম-
"জল ভর শান্তি কন্যা,জল ভর তুমি
যে ঘটে ভরিবা জল গো চৌকিদার আমি।।"




লোকক্রীড়া লোক খেলা বলতে আমরা বুঝি হাডু- ডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, ছু কিৎ কিৎ,কাবাডি, ইত্যাদি প্রভৃতি। এইগুলো কোনও রকম উপাদান ছাড়াই খেলা হয় আমরা আমাদের লেখার শুরুতে যে অনুশীলনের কথা লোকক্রীড়ায় বলেছি তার কথা অদ্বৈত মল্ল বর্মণ তাঁর এই মহাআখ্যানের মধ্যে নিয়ে এসেছেন এবং তুলে ধরেছেন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। কেননা মানুষ খেলা করে ক্রীড়া পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যায়,তার আদিম যে জীবনের তরঙ্গ তাকে স্মরণ করার জন্যে।মানুষ আগে মৃগিয়ায় নামত। আত্মরক্ষার জন্য তারা পশু শিকার করতেন কিন্তু পরবর্তী সময় যখন তথাকথিত সভ্যতার রথ আরও অনেকটাই অগ্রসর হল তখন শিকারের ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াল অনেকটা মাংস খাওয়ার থেকে বা আত্মরক্ষার থেকে যত না তার চেয়েও অনেকবেশি মানুষের ভেতরকার যে আদিম রিপু ক্রোধ এবং হিংসা তাকে পরিপুষ্ট করার জন্য।ফলে শিকার রয়ে গেল।পরবর্তী সময় মানুষের এই অমানবিক কাজের ফলে পশুকূলের বা জন্তু জানোয়ারের মধ্যে অনেক প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল বা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল মানুষের এই ভয়ানক আচরণে। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম আইন করে শিকার নিষিদ্ধ করা হল এবং সংরক্ষিত জঙ্গল তৈরি করা হল এবং সেখানে অভয়ারণ্য হিসেবে বলা হয় যাকে সেখানে পশুকূলকে যাতে তারা ঠিকঠাক করে তারা নিজেদের বংশ বৃদ্ধি করতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল।যদি আমরা ভারতের ইতিহাস আলোচনা করি তাহলে দেখব বৌদ্ধ যুগে মৃগদাব ছিল।তার আগের যুগে ছিল ব্যাপক শিকার এবং হিংসা।ময়ূর,হরিণ, কৃষ্ণসার,বাঘ,বনুশূকর সমস্ত কিছুই মানুষ নির্বিচারে হত্যা করত নেহাতই খাওয়ার জন্য বা নিজের হিংসার যে বহিঃপ্রকাশ তাকে চরিতার্থ করার জন্য।পরবর্তী সময় মৃগদাব তৈরি করা হল বুদ্ধের সময় এবং ভারত ভূমিতে অভয়ারণ্যের যে ধারণা তা কিন্তু বুদ্ধদেব এবং তার অনুগামীদের রচিত। তাঁর অনুশাসনেও শিকার প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গেল আবার শিকার ফিরে এল মুঘল যুগে,পাঠান যুগে। এবং পরবর্তী সময়ে যিখন ইংরেজরা ভারত দখল করল তখন নতুন করে এই শিকারকে আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।এই শিকারের যে অবশেষ সেটাই হল লোকক্রীড়ার অঙ্গ।আমরা যদি কাবাডি,হাডুডু বা অন্য খেলাগুলোকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব সেখানে কোনও উপাদান নেই।ব্যাট বল কিছুই নেই। যা আছে তা হল মানুষের শক্তি, মানুষের শক্তির কৌশল, পায়ের জোর,হাতের জোর,দৌড় ইত্যাদি প্রভৃতি।


তিতাস একটি নদীর নামে যে মহতি আখ্যান তাতে লেখক এই লোকক্রীড়াকে যে মালো পাড়া বা মালো জীবন বা মৎসজীবীদের যে বেঁচে থাকা তার মধ্যেই মিশিয়েছেন। সুখ-দুঃখ,আনন্দ-আহ্লাদ,বিষাদ এবং কষ্ট তার মধ্যেও মানুষ যে আনন্দের প্রদীপকে জাগ্রত করেন তার একটা অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে এই লোকক্রীড়া। এই লোকক্রীড়ার মধ্য দিয়ে শরীর এবং মন যেমন মজবুত শক্তিশালী ও দৃঢ় হয় তেমনই মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে যেহেতু খেলার আর অন্য কোনও উপাদান নেই,বল নেই,ব্যাট নেই তাই, স্টিক নেই,কিচ্ছু নেই সেইগুলো মানুষের একটা প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্নতার একটা উপাদান তৈরি করে যা যোগাযোগ তৈরি করে।এবং এর মধ্য দিয়েই লোকক্রীড়া আমাদের দেখিয়েছেন অদ্বৈত মল্ল বর্মণ।






ছড়া ও ছিকুলি আসলে আমাদের সভ্যতার গণগাঁথা।এই যে চার লাইন ছয় লাইন বা আট লাইনের যে কথাবার্তা যা অনেকটাঅ ছন্দবদ্ধ হয়ে আসে আমাদের সামনে।তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে মনুষ্য জীবনের নানা রহস্য। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ খুব স্বাভাবিকতায় তিতাস পাড়ের যে ছড়া এবং ছিকুলি ধাঁধা এবং পরণ কথা তাকে তুলে এনেছেন উপন্যাসের মধ্যে। ছড়া,ধাঁধা, ছড়া, ছিকুলি,পরণ কথা ইত্যাদি সবই হয়ে উঠেছে আমাদের যাপিত জীবনের বাইরে থেকে দেখা এক অনন্য সৌন্দর্য। যা আমরা বারবার পাঠ করলে আমাদের গভীরে নিয়ে আসতে পারি।








এবার আসা যাক ছড়া, ধাঁধা ও প্রবাদ-প্রবচনে।ছড়া হল মানুষের আদিমতম প্রয়াস।তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করেই ছড়া মানুষের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে আদিম মন্ত্র হিসাবে রূপান্তরিত হতে থাকে।তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে ব্রতের অঙ্গ হিসাবে ছড়া ব্যবহৃত হয়েছে।যেমন-
"লও লও সুরজ ঠাকুর লও ঝুটার জল
মাপিয়া জুখিয়া দিব সপ্ত আঁজল।"
গ্রামের মানুষ অনন্তবালাকে নিয়ে ছড়া কাটে-
"অনন্তবালা, সোনার বালা
যখনই পরি তখনি ভালা।"
অনন্তবালা যখন বড়ো হয়ে গেল,তখন তাকে নিয়ে ছোট মেয়েরা বিভিন্ন ছড়া কাটত,যা তার জন্য কগুব একটা স্বস্তির কারণ ছিল না।তারা বলত-
"অনন্তবালা ঘরের পালা।তারে নিয়া বিষম জ্বালা"।


লোকসাহিত্যে ধাঁধা একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।যার মধ্যে রয়েছে একটি সাহিত্যিক গুণ। তিতাস মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে রয়েছে লোকসংস্কৃতির এক বিশাল জগৎ। যা তিতাস পারের মানুষেরা যুগ যুগ ধরে লালন পালন করে বাঁচিয়ে রাখে নিজেদের সংস্কৃতিকে। সবই তাদের জীবনের অঙ্গ।যেমন উদয়তারা একটি ছড়া বলে -
"সুফল ছিট্যা রইছে, তুলবার লোক নাই,
সু-শয্যা পইরা রইছে,শুইবার লোক নাই,
ক দেখি অনন্ত এ-কথার মানতি কি?"
আকাশের বুকে অগুনতি তারার সঙ্গে মাটির পৃথিবীর ফুলের,মানুষের তৈরি শয্যার সঙ্গে এই বিশাল নদী বক্ষকে তুলনা করেছেন শিলক রচয়িতা।অনন্তের উত্তর দেওয়ার আগেই উদয়তারা উত্তর দিল।এর উত্তর হবে আকাশের তারা।
উদয়তারা আবার বলে
"হিজল গাছে বিজল ধরে
সন্ধ্যা হইলে ভাইঙ্গা পড়ে।"
এর উত্তর হাটকেই বুঝিয়েছে আসমান তারা। উদয়তারার পরের ধাঁধা-
'পানির তলের বিন্দাজী গাছ ঝিকিমিকি করে,
ইলসা মাছে ঠোকর দিলে ঝরঝরাইয়া পড়ে।'
এর উত্তর হবে কুয়াশা।
এরপর আসা যাক প্রবাদ-প্রবচনে।আমরা তিতাস পাড়ের কয়েকটি প্রবাদ প্রবচনের কথা উল্লেখ করছি।সুবলের বউ প্রবাদ বলে- 'জিভে কামড় শিরে হাত,কেমনে আইল জগন্নাথ।'
'দশ জনের কথা যেখানে,মরণ ভাল সেখানে।'
'জন্ম- মৃত্যু- বিয়ে,তিন বিধাতা নিয়ে।'
'নতুন বউ নথলী,শেওরা গেছের পেত্নী'।
'মানুষের কুটুম দিলে থুইলে,গরুর কুটুম চাটলে চুটলে'।
'পরের পাগল হাততালি, আপন পাগল বাইন্ধা রাখি।'
'তীর্থের মধ্যে কাশী,ইষ্টির মধ্যে মাসি,
ধানের মধ্যে খামা,কুটুমের মধ্যে মামা।'
'গাঙে গাঙে দেখা হয় তবু ভইনে ভইনে দেখা হয় না'।
অপমানের বাঁচন থাইক্যা সম্মানের মরণও ভালা।




বাংলা লোকসংস্কৃতিতে আজও কাঁথার শৈল্পিক ও নান্দনিক মূল্য রয়েছে। এই কাঁথা নির্মিত হয় একক বা যৌথ প্রচেষ্টায়।আর সেটা যদি নকশি কাঁথা হয় তাহলে তা লোককলার অন্যতম নিদর্শন। অদ্বৈত মল্লবর্মণ সুনিপুণভাবে 'নকশি কাঁথা'র উল্লেখ করেছেন।করমালীর স্ত্রী লোকের বাড়ির কাঁথা সেলাই করিয়া দেয় কাঁথা সেলাইয়ের ধূম পড়িয়াছে। ডান হাতের সূঁঁচের ফোঁড় বাঁ হাতের আঙ্গুলের ডগায় তুলিতে তুলিতে আঙ্গুলে হাজার কাটাকুটি দাগ পড়িয়াছে।কিন্তু নিজেদের ভাগ্যে ভালো কাঁথা জোটে না করমালী জানায়- "ছিঁড়া খাঁতায় গাও এলাইয়া" দেয় সে। নকশি কাঁথার শৈল্পিক সৌন্দর্যের কথা গবেষক ও লেখক জ্ঞাত বলেই এই কাঁথার কথা আমরা পাই।




গ্রামীন তথা ভারতীয় জীবনে এবং বঙ্গভূমি তো বটেই ঠ্যালো হুঁকো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেশা মাধ্যম হিসাবে প্রচলিত।তার ব্যবহার সময়ের ধুপে খানিকটা ফিকে হয়ে গেলেও তার প্রচলন আমরা দেখি গ্রাম বাংলার ঘরে।নারকেলের খোল দিয়ে ঘষে মেজে মসৃণ করে তৈরি হয় ঠ্যালো হুঁকো। হুঁকোর ওপর যে কলকে থাকে তাতে তামাক এবং জ্বলন্ত টিকে বসিয়ে তা থেকে ধুম্রপানের উপকরণ তৈরি করেন গ্রাম বাংলার মানুষ। শুধু গ্রাম বাংলা কেন,একসময় কলকাতাতেও ঠ্যালো হুঁকোর প্রচলন ছিল যথেষ্ট। বিবেকানন্দের জীবনে একটি কাহিনিতে আমরা দেখি তাঁর পিতার বৈঠকখানায় নানা ধরনের যাঁরা নানা ধর্মের এবং নানা বর্ণের মানুষ আছে,তাদের জন্য আলাদা আলাদা হুঁকো।তো বিবেকানন্দ সেখান থেকে একটি অন্য ধর্মের ব্যবহার করা হুঁকো টেনে দেখেছিলেন তাতে তাঁর জাত যায় কি না।অর্থাৎ বাড়ির লোকেরা যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- 'তুমি হুঁকো টানছ কেন?' না আমি টান দিয়ে দেখলুম আমার জাত যায় কি না'। এটা একটা খুবই প্রচলিত গল্প বিবেকানন্দের জীবনে।কিন্তু শহর কলকাতায় বা নাগরিক অভ্যাসে হুক্কাবার থাকলেও ঠ্যালা হুঁকো কিন্তু ক্রমশ আস্তে আস্তে পিছিয়ে গেছে।তিতাস একটি নদীর নামে এই ঠ্যালো হুঁকোর ব্যবহার যথেষ্ট পরিমাণে আমরা দেখি। কারণ মাছোয়ারা,মাল্লারা তাদের নৌকো,তাদের জলের অভিযান,নদীর ভেতর যে মাছ ধরা তার সঙ্গে নিজের জীবনকে উদ্দীপনাময় করার জন্য এই ঠ্যালো হুঁকোর ব্যবহার করেছেন এবং সেটিকে অত্যন্ত সুচারুভাবে তুলে নিয়ে এসেছেন।


তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে ঔপন্যাসিক হুঁকোতে ধূমপানের কথা বলেছেন। হুঁঁকো এবং টিকে নির্মাণ ও তামাকের ব্যবহার লোকপ্রযুক্তির সঙ্গে মিশে থাকে শৈল্পক ভাবনা।কিশোর- সুবল-তিলক মাছ ধরতে বেরিয়েছে।তাদের নৌকা এসে ভিরেছে নয়াকান্দা গ্রামে।একজন কৌতুহলী 'মালো' কিশোরদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করল।কিশোর মুগ্ধ হইয়া শুনিতে শুনিতে হাতের হুক্কা তার দিকে বাড়াইয়া দিল।আমারও হুক্কা আইতাছে।দেও আগে তোমারটা খাই।এই সময়ে একটি ছোট দিগম্বরী হৃষ্টপুষ্ট মেয়ে আসিতেছে দেখা গেল।বাড়ি থেকে হুক্কা লইয়া আসিয়াছে।শরীরের দিলানির সঙ্গে সঙ্গে হুকাটা ডাইনে বাঁয়ে দুলিতেছে- মেয়ের হাত হইতে হুক্কা লইয়া কিশোরের দিকে বাড়াইয়া লোকটি বলিল,'আমি খাই তোমার হুক্কা,তুমি খাও আমা ঝিয়ের হুক্কা।'এখানে দুজনেরই পারস্পরিক সম্পর্কের কথা রয়েছে।


মালোদের ঘরে ঘরে রয়েছে জাল বোনার সরঞ্জাম,সুতো বানানর চরকা মজুত থাকে।তাই আমরা দেখতে পাই- ঘাটে বাঁধা নৌকা,মাটিতে ছড়ানো জাল,উঠোনের কোণে গাবের মটকি,ঘরে ঘরে চরকি,টেকো,তকলি- সুতা কাটার,জাল বোনার সাজ-সরঞ্জাম। এই নিয়েই মালোদের সংসার।অনন্তর মা সুতা কাটা শিখছে।"সাতদিনে চৌদ্দ নিড়ি সুতা হইল।সাতটা মোটা সুতার,সাতটা সরু সুতার"- জাল তৈরি করতে সুতো লাগে।লেখক এখানে বিভিন্ন রকমের জালের বিবরণও দিয়েছেন।তবসী ভেসাল,মালাইয়া ভেসাল,গরমা ভেসাল, নলা, ছান্দিজাল, ফাঁস ছান্দি,ডোরা ছান্দি,কাইচ্চাল ছান্দি,জগৎ বেড়।জেলে জীবনে জাল অপরিহার্য। জাল নির্মাণের কৃতকৌশল প্রত্যেক জেলেরই জানতে হয়।বিভিন্ন জাল বিভিন্ন ঋতুতে,বিভিন্ন মাছের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই প্রয়োজন অনুসারে জেলে- বাড়ির বউ- ঝিরা জাল নির্মাণের কাজে হাত দেয়।তাই জাল লোক ঐতিহ্যের অন্যতম শিল্প।


উপন্যাসে গোকর্ণহাট গ্রামের কিশোরীদের মাঘমণ্ডল ব্রত উদযাপনের কথা রয়েছে।দীননাথ মালোর মেয়ে বাসন্তী মাঘমণ্ডলের ব্রতী।তার মা,মেয়েকে আলপনা আঁকার কাজে সাহায্য করতে চায়।কিন্তু ঘোড়া,পাখি ইত্যাদি আঁকা তার কাছে সহজ কাজ নয়।তাই সে সুবল ও কিশোরের সাহায্য চাইছে।বাসন্তীর মা বলছে," উঠানজোড়া আলিপনা আকুম,অ বাবা কিশোর,বাবা সুবল,একটা ঘোড়া আর কয়টা পক্ষী আইক্যা দেও।"বাংলার মেয়েরা যেকোনও উৎসবকে কেন্দ্র করে মাটির উঠোনে বা মাটির মেঝেতে আলপনা এঁকে থাকেন।আলপনায় আঙুলের কাজই মুখ্য।হাতের মুঠোয় ধরা থাকে রঙে ভেজান নেংড়া।হাতের চাপে ভেঁজা ন্যাকড়া থেকে পিটুলি গোলা জল নিয়ে আলপনা আঁকা হয়।


লোকজীবনে লোকবাদ্যের ব্যবহার যে 'তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাসে রয়েছে তা এড়িয়ে যান নি।গানের সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে লোকবাদ্যের প্রচলন হয়েছিল।উপন্যাসে আমরা যেসমস্ত লোকবাদ্যের উল্লেখ পাই সেগুলো হল- করতাল,গোপীযন্ত্র, ঘুঙুরা,খঞ্জনি, রসমাধুরী, সারিন্দা, কাঠের তৈরি ঢোলক, তবলা, হারমোনিয়াম, বাঁশি, বেহালা ইত্যাদি।


নদী তীরে বসবাসকারী মানুষের জীবনে লৌকিক দেব- দেবীর স্থান থাকবে সে তো স্বাভাবিক। তাই গবেষণা এই দিকটিও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।উপন্যাসের নয়াবসত অংশে রয়েছে দেবী চণ্ডীর কথা।আবার রয়েছে বাও চণ্ডী নামে লৌকিক দেবতা যনি বাতাসের সঙ্গে আসেন।তিনি অশুভ বার্তা বহন করেন।বিশেষ করে শিশুদের।সুতরাং এর জন্য ঝাড়ফুঁক, তূকতাক,জলপড়া চিকিৎসায় বাওচণ্ডীর প্রভাব কেটে যায়। আবার অন্য এক জায়গায় বাসন্তীর মা অনন্তকে লক্ষ্য করে বলছে-" শত্তুর শত্তুর, ইটা আমার শত্তুর।অখনই মরুক।সুবচনীর পূজা করুম"।সাধারণত শুভ কাজ করার জন্য 'সুবচনীর ব্রত' পালন করা হয়।এই সুবচনী হলেন লৌকিক দেবতা।




লোকক্রীড়া লোক খেলা বলতে আমরা বুঝি হাডু- ডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, ছু কিৎ কিৎ,কাবাডি, ইত্যাদি প্রভৃতি। এইগুলো কোনও রকম উপাদান ছাড়াই খেলা হয় আমরা আমাদের লেখার শুরুতে যে অনুশীলনের কথা লোকক্রীড়ায় বলেছি তার কথা অদ্বৈত মল্ল বর্মণ তাঁর এই মহাআখ্যানের মধ্যে নিয়ে এসেছেন এবং তুলে ধরেছেন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। কেননা মানুষ খেলা করে ক্রীড়া পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যায়,তার আদিম যে জীবনের তরঙ্গ তাকে স্মরণ করার জন্যে।মানুষ আগে মৃগিয়ায় নামত। আত্মরক্ষার জন্য তারা পশু শিকার করতেন কিন্তু পরবর্তী সময় যখন তথাকথিত সভ্যতার রথ আরও অনেকটাই অগ্রসর হল তখন শিকারের ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াল অনেকটা মাংস খাওয়ার থেকে বা আত্মরক্ষার থেকে যত না তার চেয়েও অনেকবেশি মানুষের ভেতরকার যে আদিম রিপু ক্রোধ এবং হিংসা তাকে পরিপুষ্ট করার জন্য।ফলে শিকার রয়ে গেল।পরবর্তী সময় মানুষের এই অমানবিক কাজের ফলে পশুকূলের বা জন্তু জানোয়ারের মধ্যে অনেক প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল বা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল মানুষের এই ভয়ানক আচরণে। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম আইন করে শিকার নিষিদ্ধ করা হল এবং সংরক্ষিত জঙ্গল তৈরি করা হল এবং সেখানে অভয়ারণ্য হিসেবে বলা হয় যাকে সেখানে পশুকূলকে যাতে তারা ঠিকঠাক করে তারা নিজেদের বংশ বৃদ্ধি করতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল।যদি আমরা ভারতের ইতিহাস আলোচনা করি তাহলে দেখব বৌদ্ধ যুগে মৃগদাব ছিল।তার আগের যুগে ছিল ব্যাপক শিকার এবং হিংসা।ময়ূর,হরিণ, কৃষ্ণসার,বাঘ,বনুশূকর সমস্ত কিছুই মানুষ নির্বিচারে হত্যা করত নেহাতই খাওয়ার জন্য বা নিজের হিংসার যে বহিঃপ্রকাশ তাকে চরিতার্থ করার জন্য।পরবর্তী সময় মৃগদাব তৈরি করা হল বুদ্ধের সময় এবং ভারত ভূমিতে অভয়ারণ্যের যে ধারণা তা কিন্তু বুদ্ধদেব এবং তার অনুগামীদের রচিত। তাঁর অনুশাসনেও শিকার প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গেল আবার শিকার ফিরে এল মুঘল যুগে,পাঠান যুগে। এবং পরবর্তী সময়ে যিখন ইংরেজরা ভারত দখল করল তখন নতুন করে এই শিকারকে আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।এই শিকারের যে অবশেষ সেটাই হল লোকক্রীড়ার অঙ্গ।আমরা যদি কাবাডি,হাডুডু বা অন্য খেলাগুলোকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব সেখানে কোনও উপাদান নেই।ব্যাট বল কিছুই নেই। যা আছে তা হল মানুষের শক্তি, মানুষের শক্তির কৌশল, পায়ের জোর,হাতের জোর,দৌড় ইত্যাদি প্রভৃতি।


তিতাস একটি নদীর নামে যে মহতি আখ্যান তাতে লেখক এই লোকক্রীড়াকে যে মালো পাড়া বা মালো জীবন বা মৎসজীবীদের যে বেঁচে থাকা তার মধ্যেই মিশিয়েছেন। সুখ-দুঃখ,আনন্দ-আহ্লাদ,বিষাদ এবং কষ্ট তার মধ্যেও মানুষ যে আনন্দের প্রদীপকে জাগ্রত করেন তার একটা অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে এই লোকক্রীড়া। এই লোকক্রীড়ার মধ্য দিয়ে শরীর এবং মন যেমন মজবুত শক্তিশালী ও দৃঢ় হয় তেমনই মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে যেহেতু খেলার আর অন্য কোনও উপাদান নেই,বল নেই,ব্যাট নেই তাই, স্টিক নেই,কিচ্ছু নেই সেইগুলো মানুষের একটা প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্নতার একটা উপাদান তৈরি করে যা যোগাযোগ তৈরি করে।এবং এর মধ্য দিয়েই লোকক্রীড়া আমাদের দেখিয়েছেন অদ্বৈত মল্ল বর্মণ।






লোকক্রিড়া হল লোকজীবনের অন্যতম অঙ্গ। 'রামধনু' অংশে লোকক্রিড়াগুলোর মধ্যে রয়েছে গোল্লাছুট,পুতুলের ঘরকান্নার খেলা।ছোটবেলা উদয়তারা নদীর পারে গাছের তলায় ছেলেদের 'গোল্লাছুট' খেলতে দেখেছে।আর উদয়তারা নিজে নয়নতারা ও উসমানতারার সঙ্গে 'পুতুলখেলা' ও 'লাইখেলা' খেলেছে।লাইখেলা হল জলকেন্দ্রিক খেলা।এই খেলায় জল ভরা নদী,পুকুর চাই। আর খেলোয়ারকে ভালো করে ডুব সাঁতার জানতে হবে।জলের মধ্যে দুই বা ততোধিক খেলোয়ার থাকে। একজন ছড়া কাটে।" লাই- ফটিক নিয়ে যাই।" এখানে মহার্ঘ বস্তুটি হল ফটিক বা স্ফটিক। ছড়া কেটেই স্ফটিকের মালিক ডুব দেয় এবার বিপক্ষ খেলোয়ারদেরও ডুব সাঁতারে স্ফটিকের অধিকারীকে স্পর্শ করতে হবে।স্পর্শ করলে স্ফটিক হস্তান্তরিত হয়।এইভাবেই খেলার প্রক্রিয়া চলতে থাকে।


লোকগণিতের ব্যবহার করেছে কাদির।সে বাজারে আলু নিয়ে এসেছে।আলুগুলো একজন পাইকারের কাছে বিক্রি করেছে সে।'কাদির বড় এক পাইকার পাইয়াছে।খুচরো বিক্রিতে ঝামেলা।অবশ্য দুই চারি পয়সা করিয়া মণেতে বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু মণামণি হিসাবের বিক্রি তার চাইতে অনেক ভালো।" মণ শব্দটি লৌকিক শব্দ এবং হিসাবের একক।মণের বহুবচনে মণামণি শব্দটির ব্যবহার ঘটান হয়েছে।


নদী বা নদ আপন সুরে বয়। তার দুপাশে গড়ে উঠে জনপদ,খেলাঘর, মন্দির,মসজিদ, গীর্জা,সমাধিক্ষেত্র, শ্মশানভূমি।নদী আপন খেয়ালে বইতে থাকে। নদীর স্রোতের সঙ্গে সঙ্গেই হয়তবা তৈরি হতে থাকে লোকজীবনের নতুন নতুন তরঙ্গ।নদী তরঙ্গের সঙ্গে তা মিশে যায় এক হয়ে।নদী তরঙ্গের যে প্রভাব তার সবটুকু এসে পড়ে লোকতরঙ্গের ওপর।এবং তার গান,তার নাচ,তার খেলা, তার পুতুল খেলা,তার পূজাআর্চা,তার নায়রী বিদায় বা নায়রী সম্ভাষণ, তার আকাশ বাতাস চর্চা সবটাই হয়ে উঠে নদী কেন্দ্রিক। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আখ্যানকার,বাংলা সাহিত্যে তো বটেই।তিনি তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের মধ্যে এই লোকচর্চার যে নানা দিগন্ত তোরণ,তার দরজা জানলা খুলে দিয়েছেন, সেটাকেই অদ্বৈত মল্ল বর্মন নিজের মতো করে গবেষণা যুক্ত নিরীক্ষা ও নিরিখ দিয়ে তুলে এনেছেন আমাদের সামনে।আমরা নতুন করে দীপ্ত হয়েছি।আমরা নতুন করে আবিষ্কার করেছি অদ্বৈত মল্ল বর্মণ- এর এই ভুবন ও ভুবন কেন্দ্রিক যাত্রাপথ।





0 comments:

0

প্রবন্ধ - মনোজিৎকুমার দাস

Posted in








বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ যখন মধ্য গগনে তখন শরৎচন্দ্রের দিব্য জ্যোতি ছড়িয়ে পড়েছিল তাদেরই উদ্দেশ্যে "সংসারে যারা শুধু দিলো, পেল না কিছুই।"

বাংলা কথাসাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের পর যে নামটি স্বাভাবিকভাবে মনে উঁকি দেয় ;তিনি আর কেউ নন, তিনি হলে অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

আপামর বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে চিরকালের জন্য উচ্চমাত্রায় প্রতিষ্ঠা। শরৎচন্দ্র বাংলা কথাসাহিত্যের অমরস্রষ্টা ,অপরাজেয় জীবন অনুসন্ধানী মনস্তাত্ত্বিক কথাশিল্পী। তার সৃষ্টিকে হৃদয়ে স্থান দিতে ব্যক্তি শরৎচন্দ্রকে জানা দরকার।
তার জীবনের কাহিনি তুলে ধরা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মতিলাল চট্টোপাধ্যায় এবং মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী। পাঁচ ভাই এবং বোনের মধ্যে শরৎচন্দ্র ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। শরৎচন্দ্র সাহিত্যসাধনার প্রেরণা লাভ করেন শৈশবকালে পিতার কাছ থেকে।

পাঁচ বছর বয়সে শরৎচন্দ্র দেবানন্দপুরের প্যারী পণ্ডিতের পাঠশালায় ভর্তি হন যেখানে তিনি দু-তিন বছর শিক্ষালাভ করেন। এরপর ভাগলপুর শহরে থাকাকালীন স্থানীয় দুর্গাচরণ বালক বিদ্যালয়ে ছাত্রবৃত্তিতে ভর্তি হন ও পরবর্তীতে ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ভাগলপুর জেলা স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৮৯ সালে শরৎচন্দ্র জেলা স্কুল ত্যাগ করে হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে ভর্তি হন, কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে স্কুলের বেতন দিতে না-পারায় তাঁকে এই বিদ্যালয় পরিত্যাগ করতে হয়। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে মতিলাল পুনরায় ভাগলপুর প্রত্যাবর্তন করলে শরৎচন্দ্র জুবিলি কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন এবং এই বিদ্যালয় থেকে ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় বিভাগে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজে অধ্যয়ন করেছিলেন । তবে দুর্ভাগ্যক্রমে এফএ পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে না-পারায় শরৎচন্দ্র পরীক্ষায় বসতে পারেননি।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন আশৈশব ভবঘুরে। যৌবনে জীবিকা অর্জনের তাগিদে বহুদিন কাটিয়েছিলেন ব্রহ্মদেশের রাজধানী রেঙ্গুনে।

রেঙ্গুনে থাকাকালীন বর্মা রেলওয়ের অডিট অফিসে তিনি একটি অস্থায়ী চাকরিতে নিযুক্ত হন। দুই বছর পর চাকরি চলে গেলে তিনি পেগু তে পাড়ি দেন ও ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে বর্মার পাবলিক ওয়ার্কস অ্যাকাউন্টস অফিসে চাকরি পান ও পরের দশটি বছর এই চাকরিতে ই নিযুক্ত ছিলেন। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ছুটি নিয়ে অশান্তি ও দ্বন্দ্বের কারণে শরৎচন্দ্র চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাংলায় ফিরে আসেন।

রেঙ্গুনের উপকণ্ঠে বোটাটং পোজনডং অঞ্চলে এক ব্রাহ্মণ মিস্ত্রির কন্যা শান্তিদেবীকে শরৎচন্দ্র বিবাহ করেন। তাদের এক পুত্র সন্তান হয় তবে দুর্ভাগ্যক্রমে রেঙ্গুনের প্লেগে আক্রান্ত হয়ে শান্তি দেবী ও তার এক বছরের সন্তানের মৃত্যু হয়। এর বেশ কিছু কাল পরে শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে কৃষ্ণদাস অধিকারীর অনুরোধে তার ১৪ বছরের কন্যা মোক্ষদাকে বিবাহ করেন। তিনি তার নাম দেন হিরন্ময়ী।

শরৎচন্দ্র ঔপন্যাসিক ,অমর কথাশিল্পী, নিপীড়িত, দরিদ্র অভাজনের ব্যথা বেদনার কাব্যকার।তিনি তাঁর সাহিত্যে অসহায় দুর্বল তথাকথিত সমাজ পতিতাদের দুঃখ দুর্গতি ও নানা সমস্যার ছবি এঁকেছেন সহানুভূতিও গভীর মমতার সঙ্গে।তাঁর উপন্যাসের একদিকে যেমন আছে সমাজের নির্মম অত্যাচার ও নিপীড়নের ছবি; অপরদিকে তেমনি আছে অসহায় নারী জাতির প্রতি তাঁর দরদীও মরমী হৃদয়ের এক অপূর্ব প্রকাশ। তাই শরৎ সাহিত্যে দেখা যায় পুরুষ চরিত্র অপেক্ষা নারীচরিত্রের স্বাভাবিক প্রাধান্য। কিরণময়ী, সাবিত্রী, রাজলক্ষ্মী, ষোড়শী, চন্দ্রমুখী নারীত্বের মহিমাই যেমন উজ্জ্বল ও বর্ণাঢ্য ; জীবনানন্দ, সতীশ, , শ্রীকান্ত তেমন বর্ণদীপ্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে শরৎচন্দ্র নারীর সতীত্বের চেয়ে তাঁর নারীত্বকে দিয়েছেন অধিক মর্যাদা । বিধবাদের প্রতি ছিল তাঁর সমবেদনা।

বিদ্যালয় পড়াকালীন শরৎচন্দ্র 'কাশীনাথ' ও 'ব্রহ্মদৈত্য' নামে দুটি গল্প লেখেন। কলেজ জীবন ত্যাগ করে ভাগলপুর থাকাকালীন তিনি বড়দিদি, দেবদাস, চন্দ্রনাথ, শুভদা ইত্যাদি উপন্যাস এবং 'অনুপমার প্রেম', আলো ও ছায়া, 'বোঝা', হরিচরণ' ইত্যাদি গল্প রচনা করেন।

'কুণ্ডলীন' পুরস্কারপ্রাপ্ত 'মন্দির' গল্পটি শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত সাহিত্যিক নিদর্শন ।ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত 'বড়দিদি' বড় গল্পে সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর প্রতিষ্ঠা। 'চরিত্রহীন' উপন্যাস প্রকাশের পর তাঁর অতুল যশ অর্জন হয়ে থাকে। তারপর 'দেবদাস' 'অরক্ষণীয়া,' 'বিপ্রদাস', 'দেনাপাওনা", 'গৃহদাহ', 'শ্রীকান্ত','বামুনের বিয়ে', 'দত্তা ','শেষ প্রশ্ন ','পথের দাবি' প্রভৃতি উপন্যাস ও উপন্যাসোপম বড়গল্প রচনা করে লাভ করেন অপরাজেয় কথাশিল্পীর অমর আসন। তাঁর রচিত, "অভাগীর স্বর্গ 'ও' মহেশ" উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প।'অনিলা দেবী', ছদ্মনাম নিয়েও তিনি বহু অচেনা সৃষ্টি করেছিলেন।

শরৎচন্দ্র নারীজাতিকে যথেষ্ট সম্মান করতেন। তাঁর লেখায় তিনি নারীজাতিকে উচ্চাসনে বসিয়েছিলেন। সমাজের কুসংস্কার, অন্যায় অবিচার ,জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি মত প্রকাশ করেছেন।

শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন হলো জনপ্রিয় উপন্যাস।
১৯০০ শতাব্দীর প্রথম দশকের বাংলা সমাজের পটভূমিকায় এই উপন্যাসটি রচিত। উপন্যাসটিতে চারটি নারী চরিত্র রয়েছে। প্রধান দুটি নারী চরিত্রের নাম সাবিত্রী ও কিরণময়ী। ছোট দুটি নারী চরিত্রের নাম সুরবালা ও সরোজিনী। সাবেক দুই চরিত্রহীন (চরিত্রহীন) হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সাবিত্রী চরিত্রটি বিশুদ্ধ, সে তার ভালবাসার মানুষ সতীশ-এর প্রতি অনুগত। সুরবালা উপেন্দ্রনাথের স্ত্রী। তিনি বয়সে তরুণ, ধর্মীয় গ্রন্থগুলিতে অন্ধবিশ্বাসের কারণে তার চরিত্রও চিত্তাকর্ষক। সরোজিনী পাশ্চাত্য শৈলীতে শিক্ষিত এবং চিন্তা-ভাবনায় অগ্রসর কিন্তু পারিবারিক পরিস্থিতিত এবং একটি জাদরেল মা দ্বারা তার জীবনযাপন অবরুদ্ধ। সরোজিনী শেষতক সতীশকে বিয়ে করেন। উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র কিরণময়ী। তরুণ এবং অত্যন্ত সুন্দরী, বুদ্ধিমতী। তবে তার আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাগুলি সর্বদা বিবাহিত বিষয়গুলির তুলনায় স্বামীকে শিক্ষাদান করার জন্য এবং স্বামী ও শাশুড়ীর দ্বারা সর্বদা দমিত হয়।

তিনজন পুরুষ চারজন নারীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কিন্তু বেশিরভাগ সময় তাদের কর্ম নারীদের জন্য ক্ষতিকর। তারা অর্পিত, অবিচ্ছেদ্য এবং তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে নয়। শেষ পর্যন্ত সারোজিনির সাথে অদ্ভুতভাবে কাজ করে, যখন তিনি উপেন্দ্রের মৃত্যুবরণে চূড়ান্ত পুনর্মিলন নিয়ে আসেন। উপেন্দ্র প্রথমে কিরণময়ীকে সাহায্য করতেন, কিন্তু দীবাকরের সাথে তার সম্পর্কের সবচেয়ে খারাপ দিকটি মনে করে এবং আসলে দীবাকরের সাথে কিরণময়ীর বাধ্যতামূলক অংশীদার হয়ে ওঠে।দীবাকর দুর্বল-নিখুঁত এবং অপ্রতিভ। একটি অনাথ, তিনি কিরণময়ী দ্বারা তার ভাই হিসাবে চিকিৎসা দ্বারা আনন্দিত হয়, এবং অবশেষে শিক্ষা । তিনি কিরণমায়িয়ের সাথে তার সমাধিস্থলের পরে সম্পূর্ণ দায়িত্বহীনভাবে কাজ করেন।সেকালের সমাজের প্রেক্ষিতে কারা চরিত্রহীন ছিল ভাববার বিষয়।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অত্যন্ত পাঠক নন্দিত একটি উপন্যাস হলো 'দেনা-পাওনা'। জনপ্রিয় এই লেখক জমিদার প্রথা, ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব এবং একজন নারীর মনের দৃঢ়তা আর কোমলতাই চিত্রায়ন করেছেন এই উপন্যাসে।

শরৎচন্দ্র নারীর সতীত্বের চেয়ে নারীত্বকে অধিক মর্যাদা দিয়েছেন তার গল্প উপন্যাসে তার পরিচয় আমরা পাই এখানে।

শরৎচন্দ্র আসলে তৎকালীন সমাজের ভালোবাসার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতাকে উপস্থাপনা করতে গিয়ে বর্তমান যুগেও ‘দত্তা’ কে ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক করে দিয়েছেন। সত্যের নগ্ন রূপ যতই কুৎসিত হোক না কেন তা একদিন সামনে আসবেই। সত্য শুধু মুখের কথা নয় এ হল অন্তরের উপলব্ধি যা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষকে দেখতে সাহায্য করে। এ প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র অনুভূতি কত প্রখর তা বোঝা যায় যখন নলিনী নরেনের কথাগুলো দয়ালবাবুকে বলছেন,

” সত্যের স্থান বুকের মধ্যে, মুখের মধ্যে নয়। কেবল মুখ দিয়ে বার হয়েছে বলেই কোনো জিনিস কখনো সত্যি হয়ে ওঠে না। তবুও তাকে যারা সকলের অগ্রে, সকলের উর্ধ্বে স্থাপন করতে চায়, তারা সত্যকে ভালোবাসে বলেই করে না, তারা সত্যভাষণের দম্ভকেই ভালোবাসে বলে করে।”

শরৎচন্দ্রের আবির্ভাবে বাংলা উপন্যাস এক বিপ্লব সৃষ্টি হল। শরৎসাহিত্য বাংলা উপন্যাসের বিষয়বৈচিত্র্য, চরিত্রের নতুনত্ব, প্রত্যক্ষ সমাজ সমস্যা। সমাজের অধিকাংশ সমস্যার মূল উৎস মানুষ ,তাই বঞ্চনাকারীর প্রতি তাঁর এত ক্ষোভ। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো নীতিবাদী অথবা রবীন্দ্রনাথের মতো উচ্চমননশীলতা ও তাঁর পছন্দ নয়।

তিনি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে গল্প উপন্যাস রচনা করেন, যেগুলোতে কল্পনা অবাস্তবতার ছোঁয়া ছিল না । সমাজে যে সব মানুষ নিন্দিত, উপেক্ষিত, শরৎচন্দ্র তাঁর দরদি মন নিয়ে তাদের পক্ষ অবলম্বন করে দেখিয়েছেন যে মনুষ্যচরিত্র, ধর্ম এবং মানব মনের সুপ্ত বাসনাগুলো কখনোই মারা যায় না। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত রাজনৈতিক উপন্যাস ,'পথের দাবি' ইংরেজ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল যা সে যুগের স্বদেশী আন্দোলনকারীদের পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের জন্য ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তার ' পথের দাবী ' উপন্যাস নি:সন্দেহ ইংরেজের কাছ থেকে পরধীনতার শৃঙ্খল উন্মোচনের জ্বলন্ত দলিল। স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা ' পথের দাবী 'কে তার লেখা মাস্টার পিস বললে অত্যুক্তি হয় না।

দেবদাস শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি প্রণয়ধর্মী বাংলা উপন্যাস। সেকালে বাঙালি পাঠকরা ' দেবদাস' উপন্যাসকে লুফে নেয়। তরুণ যুবাদের কাছে তার ' দেবদাস' অসাধারণ পাঠক প্রিয়তা লাভ করে।

দেবদাস শরৎচন্দ্রের প্রথমদিককার উপন্যাস। রচনার সমাপ্তিকাল সেপ্টেম্বর ১৯০০ সাল।কিন্তু প্রকাশনার বছর ১৯১৭। উপন্যাসটি নিয়ে শরৎচন্দ্রের দ্বিধা ছিল বলে দীর্ঘ ১৭ বছর প্রকাশ করা থেকে বিরত ছিলেন। উপন্যাসটি তিনি তার বন্ধু প্রমথনাথ ভট্টাচার্যকে ১৯১৩-তে লেখা এক চিঠিতে শরৎচন্দ্র লিখেছেন, 'ওই বইটা [দেবদাস] একেবারে মাতাল হইয়া বোতল খাইয়া লেখা।'

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান প্রধান ভাষায় উপন্যাসটি অনূদিত হয়েছে। পারুর জন্য দেবদাসের বিরহ উপজীব্য করে রচিত এই উপন্যাস অবলম্বনে ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। দেবদাস বিরহকাতর চিরায়ত প্রেমিকের ধ্রুপদি নিদর্শন হিসেবে আজও গণ্য হয়।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য-কর্মকে কেন্দ্র করে ভারতে প্রায় পঞ্চাশটি চলচ্চিত্র বিভিন্ন ভাষায় নির্মাণ করা হয়েছে যার মধ্যে 'দেবদাস' উপন্যাসটি বাংলা, হিন্দি এবং তেলেগু ভাষায় আটবার চলচ্চিত্রায়িত হয়েছিল । তাছাড়া সন্ধ্যারানি ও উত্তমকুমার অভিনীত বাংলা চলচ্চিত্র 'বড়দিদি' এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মৌসুমি চট্টোপাধ্যায় অভিনীত 'পরিণীতা' ছবি নির্মাণ করা হয়ে থাকে। 'পরিণীতা' উপন্যাসটি দু ~দুবার চলচ্চিত্রায়িত হয়ে থাকে। স্বামী' চলচ্চিত্রের জন্য 'ফিল্মফেয়ার' সেরা লেখকের পুরস্কার প্রাপ্তির সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন । 'বিন্দুর ছেলে' অবলম্বন করে বিখ্যাত চলচ্চিত্র 'ছোটি বহু' (১৯৭১) প্রভূত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এছাড়া ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত, "নববিধান" উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে চিত্রায়িত 'তুমহারি পাখি' নামে একটি দূরদর্শন ধারাবাহিক নির্মাণ করা হয়েছিল।

শরৎচন্দ্রের প্রতিভা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে 'জগত্তারিণী স্বর্ণপদক' এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'সাহিত্যাচার্য' উপাধি প্রদান করা হয় । ১৯৩৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বি.এ পরীক্ষায় বাংলা প্রশ্নপত্রের প্রশ্নকর্তা হিসেবেও তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডি .লিট উপাধিও পেয়ে থাকেন। দেশবাসী তাঁকে 'কথাশিল্পী' এবং 'সরণীশিল্পী' হিসেবেও আখ্যা দিয়ে থাকেন।

১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে শরৎচন্দ্র প্রায়শই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। দেওঘর থেকে ফিরে এসে শরৎচন্দ্রের যকৃতের ক্যান্সার ধরা পড়ে, যা তার পাকস্থলী পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জানুয়ারি বিশিষ্ট শল্য চিকিৎসক ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার করলেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি । চার দিন পর অর্থাৎ ১৬ই জানুয়ারি সকাল দশ ঘটিকায় শরৎচন্দ্র শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেএক 'অপরাজেয় কথাশিল্পী' , শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তার শিখরে তাই অধিষ্ঠিত আজ ও। এককথায় শরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন কথাসাহিত্য মর্ত্য ~অবরণের সাহায্যকারী ভগীরথ যিনি উৎসদ্বারের সবরকম বাধা দূর করে অনন্ত পথ অবারিত করে দিয়েছিলেন পাঠকদের কাছে।

0 comments:

0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















২৪.২

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জোট-নিরপেক্ষ থাকার সমস্যাগুলো আমরা কোনরকমে রয়েসয়ে পার করেছি। কারণ এই কায়দায় আমরা অনেক সমস্যা এড়াতে পেরেছি। কিন্তু রামনগরওলাদের অহংকার ছিল যে ওরা নিজেদের ভাল-মন্দ নিজেরাই বুঝে নেবে। সমস্যা এড়াবে না। দেখতে দেখতে গোটা গ্রাম দুইদলে বিভক্ত হয়ে গেল। এক দল রিপুদমনের হাত দিয়ে জমির ভাগ -বাঁটোয়ারা করাতে চায়। অন্যদলের বিশ্বাস এ’বিষয়ে শত্রুঘ্ন সিং বেশি পটু।

ভোটের দিন এগিয়ে এসেছে, মাত্র দু’দিন বাকি। দু’দলের শিবিরে সাজ-সরঞ্জাম দেখা যাচ্ছে। লোকজন গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে-‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’! আবার চলছে একে অন্যের মা-বোনের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর কথা, নিজেদের লাঠিগুলোকে তেল চুকচুকে করা, বর্শা ও বল্লমের ফলা মেজে-ঘষে চকচকে করে হাতলে লাগিয়ে নেয়া, আর সেই হাতেই গাঁজার ছিলিম কষে ধরা।

এতসব হয়ে যাওয়ার পর রিপুদমন তার ভাই সর্বদমনকে ডেকে ভালমানষের গলায় বলল—দেখ ভাই, যদি এই লড়াইয়ে আমার জান চলে যায় আর তার সঙ্গে আমার সাথী আরও জনা পঁচিশের, তখন তুমি কী করবে?

সর্বদমন সিং ওকালতি পাশ করেছে বটে, তবে একসময় অনেক বড় বড় উকিল, বিলেত ফেরত ‘বালিস্টার’ ওকালত ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। সর্বদমন তাঁদের পদচিহ্নে চলে বছর চার আগে নিজের প্র্যাকটিস ছেড়ে স্থানীয় রাজনীতির আখড়ায় নেমে পড়েছে। তফাৎ একটাই।

স্বাধীনতা সংগ্রামের যুক্ত হওয়া অনেক উকিলের ভরণপোষণ কীভাবে চলত তার হদিস আম জনতা পেত না। কিন্তু সবার ভাল ভাবে জানা আছে যে সর্বদমনের আমদানি কোত্থেকে হয় । আর তাতে লোকের চোখে ওর সম্মান বেড়ে গেছল।

যেমন, ওর কাছে দশটা হ্যাজাক বাতি আছে যা বিয়েশাদিতে ভাড়া খাটে। এছাড়া ওর রয়েছে দুটো বন্দুক, যা ডাকাতির সীজনে ভাড়া খাটে। সব মিলিয়ে সর্বদমনের যা আমদানি হত তাতে খাওয়া-পরার কষ্ট ছিল না। তাই ও নিশ্চিন্ত হয়ে গ্রামীণ রাজনীতির কলকাঠি নাড়তে পারত। গ্যাসবাতি আর বন্দুক ভাড়ায় অনেক দূর অব্দি পাঠানো হত। এভাবে সর্বদমনের কত যে বিস্তৃত এবং গভীর সামাজিক সম্পর্কের জাল ছড়িয়ে গেছল—তা বলা মুশকিল। তার আত্মবিশ্বাসের ঝলক সর্বদমনের কথাবার্তায় চালচলনে ফুটে উঠত।

ভাইয়ের কথার উত্তরে সর্বদমন মেপেজুকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল—“ভাই, যদি লড়াইয়ে তুমি ও তোমার পঁচিশ জন মারা পড়ে, তবে ওদের শিবিরেও শত্রুঘ্ন সিং এবং তার জনা পঁচিশ মরবে, এটা নিশ্চিত জেনো। তারপরে তুমি যা বলবে তাই করব’খন।

একথা শোনার পর রিপুদমন সর্বদমনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদার চেষ্টা করল। কিন্তু ইচ্ছে হলেই কেঁদে ফেলা—সেটা শুধু অভিনেতা বা নেতারা পারে। বলতে চাইছি—অভ্যাস নেই, তাই রিপুদমনের কান্নার চেষ্টা বিফল হল। সর্বদমন ধীরে ধীরে ভাইয়ের আলিঙ্গন-মুক্ত হয়ে বলল, -- এসব ছাড়ো; বলে দাও পঁচিশের বদলার হিসেব পুরো করে তারপর কী করা যায়?

রিপুদমন বলল—ধরে নাও দুদিকে লাশের সংখ্যা সমান সমান। তখন যদি ফের ভোট হয় আর তুমি গ্রামসভার প্রধান হতে চাও, তাহলে?

সর্বদমন কাগজ পেন্সিল নিয়ে বসে গেল। হিসেব টিসেব করে বলল—দাদা, তুমি আর শত্রুঘ্ন সিং যদি পঁচিশ পঁচিশজন সমেত মরে যাও, তো কিসের চিন্তা? আমার তরফের যেই দাঁড়াক, সে অন্য তরফের চেয়ে পঁচাশ ভোট বেশিই পাবে। কারণ, এতসব হওয়ার পরে গ্রাম থেকে ওদের হয়ে জানের বাজি লাগিয়ে ভোট দিতে আসা লোক খুব বেশি হলে পঁচিশ হবে। আর আমার পক্ষে ভোটার বেরোবে চল্লিশ বা তারও বেশি।

এখন ওদের পঁচিশজন মারা যাওয়ার মানে ওদের পুরো মহল্লা খালি। আর আমাদের পঁচিশ জনে চলে গেলেও বাকি খালি মাঠে আমার কম সে কম পনেরজন তো টিকে থাকবে।

ভোটের তিন দিন আগে রিপুদমন সাব -ডিভিসনাল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে এক দরখাস্ত দিল, যার সারঃ

--শত্রুঘ্ন সিং ও তার পঁচিশজন লোকের থেকে রিপুদমনের নিজের জীবন ও সম্পত্তির উপর আক্রমণের আশংকা। এছাড়া ভোটের দিন শান্তিভঙ্গ হওয়ারও সম্ভাবনা। পুলিশ দরখাস্তকে নথিবদ্ধ করল। এবার শত্রুঘ্ন রিপুদমন এবং তার লোকজনের বিরুদ্ধে পালটা নালিশ করল। পুলিশ এই নালিশও নথিবদ্ধ করল।

ভোটের একদিন আগে দুই প্রার্থী এবং তাদের পঁচিশ জন করে সমর্থকের ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে ডাক পড়ল।

ম্যাজিস্ট্রেট্‌, আইনের বই অনুযায়ী, শত্রুঘ্ন আর তার লোকজনের থেকে জামিন এবং মুচলেকা চাইল। ওরা এ বিষয়ে দেবে কিনা ভাবতে লাগল। তারপর উনি রিপুদমন আর তার দলের থেকেও ওইরকম জামিন ও মুচলেকা চাইলেন।

রিপুদমন বলল—“হুজুর, আমরা ওসব দেব না। আমার কথাটা মনে রাখবেন—কাল আমার গাঁয়ে পাইকারি হারে নরসংহার হবে। বড় বড় জমানতদাররাও শত্রুঘ্ন এবং তার গুণ্ডাদের দাঙ্গা করার থেকে আটকাতে পারবে না। আমরা হলাম সাধাসিধে চাষি। কেমন করে ওদের মোকাবিলা করব? তাই আমাদের জামিনের অভাবে কৃপা করে হাজতে আটকে রাখুন—প্রাণটা তো বাঁচবে! আর আমার বংশের যে দু’চারজন বাড়িতে থেকে যাবে ওদের রক্ষা করার বন্দোবস্ত করে দিন”।

পুলিস এই বক্তব্যও রেকর্ড করল।

শেষে ম্যাজিস্ট্রেট রায় দিলেন যে ভোটের দিন যখন রিপুদমন সিং ও সাথীরা হাজতে থাকবে, তখন শত্রুঘ্ন সিং পার্টিরও জামানত হবে না। ওরাও হাজতে থাকবে।

এই ভাবে দুই প্রার্থী ও তাদের পঁচিশ পঁচিশ জন লোক কিছুদিনের জন্য মরে গেল। আর নির্বাচন খুব শান্ত ও সভ্য বাতাবরণে অনুষ্ঠিত হল। তবে দুই দলের তুলনামূলক দক্ষতার হিসেব করে দেখা গেল শত্রুঘ্নের লোকজন কোন কাজের নয়। বোঝাই গেল না ওর সমর্থক বলতে কেউ গাঁয়ে টিকে আছে কিনা। ওদিকে রিপুদমনের পক্ষ থেকে সর্বদমন নির্বাচনে দাঁড়াল। কারণ পুলিশের খাতায় ওর নাম নেই অথচ, আইনের ডিগ্রি আছে, অতএব শান্তিপ্রিয় মানুষ। তাই ওকে হাজতে পোরা হয় নি। ও কোমর কষে ভোটে লড়ল এবং ফল ওটাই হোল যা ও কয়দিন আগে কাগজ পেন্সিলে আঁক কষে দেখিয়েছিল।

ভোটে জেতার এই কায়দা রামনগরের নামে পেটেন্ট হল।


নেবাদা কায়দাটা একটু আদর্শবাদী ধাঁচের।

ওখানে নানান জাতির লোক ভোটে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী দু’জন—যাদের ঋগ্বেদের পুরুষ সূক্তে ক্রমশঃ ব্রহ্মের মুখ এবং পাদদেশ বলা হয়েছে। আজকের ভাষায় বললে—এ হল ব্রাহ্মণ ও হরিজনের সংঘর্ষ। কিন্তু নেবাদায় এই মামলা বেশ সাংস্কৃতিক, প্রায় বৈদিক পদ্ধতিতে পেকে উঠল।

ব্রাহ্মণ ক্যান্ডিডেট সবর্ণদের মধ্যে ঋগ্বেদের পুরুষ-সূক্তটি কয়েক বার আউড়ে বুঝিয়ে দিল যে পুরুষ-ব্রহ্মের মুখ ব্রাহ্মণ ছাড়া কেউ নয়, আর শূদ্র হল পা। প্রধান পদের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলা হল এই কাজটির জন্য দরকার বুদ্ধি এবং বাণী যা মাথায় থাকে, পায়ে কদাপি নয়। আর মুখ হল সেই মাথারই অঙ্গ। অতএব, ব্রাহ্মণেরই প্রধান হওয়া উচিত, শূদ্রের নয়।

ব্রাহ্মণ প্রার্থী শূদ্রের নিন্দা করতে প্রচলিত গালিগালাজ না করে বেশ সাংস্কৃতিক কায়দায় প্রচার করতে লাগল। ও সমঝোতার ঢঙে এটাও মেনে নিল যে রোদেজলে দৌড়োদৌড়ি করতে মজবুত পায়ের দরকার। তাই পঞ্চায়েতের চাপরাশির পদ শূদ্রেরই প্রাপ্য। কিন্তু প্রধান বা মোড়লের পদের জন্য শূদ্র প্রার্থী? এটা বেদবিরুদ্ধ। কিন্তু যা হয় আর কি, এসব সাংস্কৃতিক কথাবার্তা সাধারণ গ্রামবাসী মেনে নিল না। বাধ্য হয়ে ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি প্রচারের কায়দা বদলে নিলেন—মাথার চেয়ে মুখের ব্যবহার বেশি করতে লাগলেন। আর ওনার চ্যালারা মুখটা আরও খুলে প্রচার শুরু করল। অল্প দিনেই ব্যাপারটা সেই পুরনো কায়দায় ফিরে গেল। যেমন,-- বল বিক্রম সিং, তুমি কি আমাকে ছেড়ে ওই চামার ব্যাটাকে ভোট দেবে?

দেখতে দেখতে ব্রাহ্মণ প্রার্থীর মেহনতে গ্রামে গালিগালাজের উগ্র বাতাবরণ তৈরি হল এবং হঠাৎ একদিন উনি পুরুষ-সূক্তের ওই ঋচাটির সঠিক মানে বুঝতে পারলেন—যাতে শূদ্রকে পা বলা হয়েছে।

এক জায়গায় ওঁর দলের একজন শান বাঁধানো আঙিনায় বসে ভোটের প্রচার করছিল। মানে অন্য প্রার্থীর নাম করে খোলাখুলি গাল দিচ্ছিল। ওই ধারাবাহিক গালির ফোয়ারার মাঝখান থেকে একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন বারবার উঠে আসছিলঃ “বল ঠাকুর কিসন সিং, তবে কি তুমি ওই---কে ভোট দেবে”?

ও তো ওখানে বসে লাগাতার বলেই যাচ্ছিল। হটাৎ ওর মুখে কথা আটকে গেল, পুরো হল না। ও কমরে এমন জোরে আঘাত পেল যে মুখ থেকে ‘তাত, লাত রাবণ মোহিঁ মারা’ (বাবা, রাবণ আমায় লাথি মেরেছে) বলার মত অবস্থাও রইল না। ও শান-বাঁধানো চবুতরা থেকে নীচে পড়ে গেল। তখনই আরও দশটা লাথি! যখন চোখ খুলল তখন ওর মনে হল—সংসার এক স্বপ্ন বটে, আর মোহ-নিদ্রা ভেঙে গেছে। এমন ঘটনা আরও কয়েকটি ঘটে যাবার পর ব্রাহ্মণ প্রার্থী বুঝতে পারলেন পুরুষ-ব্রহ্মের মুখ আর পায়ের দূরত্ব খুব বেশি নয়।

এর সার তত্ত্ব হলঃ যেখানে বেশি মুখ চালালে জবাবে লাথি চলতে থাকে, সেখানে মুখ না খুললেই মঙ্গল।

এই গবেষণার ফল ব্রাহ্মণ প্রার্থীকে মুশকিলে ফেলল। এমন সময় ওর বিপদতারণ কর্তায এক বাবাজীর আবির্ভাব হোল। ইনি সেই জাতের বাবাজি যাঁরা বিপদগ্রস্ত চাষি থেকে বড় থেকে বড় আধিকারিক, নেতা এবং ব্যবসায়ীর ভিড়ের মধ্যে সহজেই নিজের উপযুক্ত ভক্তটিকে চিনে নেন।

ঘটনা ঘটল ‘বত্রিশ সিংহাসন’ এবং ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ স্টাইলে।

একদিন সেই ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি, মুখের ভাষা সংযত হওয়া সত্ত্বেও, পুরুষ-ব্রহ্মের পায়ের লাথি খেয়ে মাটিতে গড়াগড়ি গেলেন। তারপর কী ভাবে গ্রামসভার মোড়লের পদটি চামার-ব্যাটার ছোঁয়া বাঁচিয়ে ব্রাহ্মণের অধীন করা যায় সে বিষয়ে ভাবছিলেন। এইসব ভাবনা চিন্তার স্থান হল গ্রামের বাইরে একটা শান বাঁধানো কুয়োর পাড়ে সাঝেঁর বেলায় ‘নীলাঞ্জনছায়া’ তলে এক বটগাছের কাছে । চোখে পড়ল গাছের নীচে আগুনের ফুলকি আর গম্ভীর আওয়াজে শোনা গেল মহাদেবের কিছু বিশেষণ।

উনি টের পেলেন নিঘঘাৎ গাছের নীচে কোন বাবাজি ধুনি জ্বালিয়ে বসেছেন।

ঠিকই বুঝেছিলেন। বাবাজী কৈলাসপতি ভোলে শংকরের নাম নিচ্ছিলেন আর গাঁজায় দম দিচ্ছিলেন। লোকে দুখী হোক না হোক, সামনে কোন বাবাজী দেখলে সোজা সাষ্টাংগ দণ্ডবৎ হয়ে যায়। এখানে তো ব্রাহ্মণ -প্রার্থীটি নিতান্ত দুঃখের সাগরে গোঁতা খাচ্ছিলেন আর সামনে এক বাবাজীর আবির্ভাব! ব্যস, উনি কিছু না ভেবেই সোজা বাবাজীর পায়ে পড়লেন আর কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন।

বাবাজীর জীবনে এমন সুযোগ বহুবার এসেছে। উনি পুরনো অনুভবের জোরে প্রার্থীকে অভয়দান করে বললান যে বেটা, ঘাবড়িও না। যদি তোমার অসুখটি স্বপ্নদোষ বা শীঘ্রপতন অথবা ছোটবেলার উল্টোপাল্টা কাজের ফলে উৎপন্ন নপুংসকতা হয়ে থাকে, তাহলে ভরসা রাখো। আমার দেয়া টোটকার জাদুতে তুমি একহাজার নারীর মান-মর্দন করতে পারবে। কিন্তু ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি দু’দিকে মাথা নেড়ে না করে দিলেন! তখন বাবাজী বললেন যে এটাএকটা গোপনীয় টোটকা। এর জোরে তুমি বাজীমাৎ করার ওস্তাদ তো হবেই, তাছাড়া এটাকে ওষুধ বানিয়ে বিক্রি শুরু করলে দেখতে দেখতে ক্রোড়পতি হয়ে যাবে।

কিন্তু কোন লাভ হোল না। প্রার্থীটি মাথা নাড়ছে আর হাপুস কান্না জুড়েছে। বাবাজি একটু অবাক হয়ে ওকে খোঁচাতে লাগলেন। তখন ও মুখ খুলল—আমি এক হাজার স্ত্রীলোকের মান-মর্দন করতে চাইনে। আমার কাজটা সহজ, শুধু এক ব্যাটা চামারের মানমর্দন করা।

বাবাজী ব্রাহ্মণ প্রার্থীটির সব কথা শুনলেন, ওকে আশ্বস্ত করলেন; তারপর গাঁজার কলকেটি ঝোলায় পুরে নকল জটায় খানিক ধুলো মাখিয়ে বসতির দিকে রওনা দিলেন। উনি গ্রামে গিয়ে এক মন্দিরের সামনে ডেরা জমিয়ে বসে গেলেন। তারপর কবীর, রামানন্দ থেকে শুরু করে গুরু গোরখনাথ থেকে এমন এমন কাহিনী শোনাতে লাগলেন যার শেষ কথা হল—লোকের জাতপাত জেনে কী হবে, হায়! যে হরিকে ভজনা করে সে হরির আপন হয়ে যায়।

এই ‘হরি’ যে কী জিনিস, সেটার পরিচয়ও লোকে সেদিন সন্ধ্যে থেকেই বুঝে ফেলল। একটা ছিলিমে গাঁজার টুকরো রাখা হোল, যার উপর আগুন ঠুঁসে দেয়া হল। ওটাকে মুখে নিয়ে গাল খিঁচে দম লাগিয়ে ক্রমাগত ফুঁয়ের জোরে আগুন জ্বলে উঠল এবং নিভল। এক নিঃশ্বাস থেকে পরের নিঃশ্বাস নেয়ার ফাঁকে ফাঁকে মহাদেবের নাম নানা ভাবে এবং নানা অর্থে নেয়ার পালা চলতে লাগল। ওই ছিলিমটি উপস্থিত ভক্তজনের মধ্যে এদিক থেকে ওদিক হাতে হাতে ঘুরতে লাগল। ভক্তগণ বুঝে গেল যে এই হল ‘হরি’!

বাবাজীর দরবারে আটচল্লিশ ঘন্টা অখন্ড নাম-সংকীর্তন চলে। যে গাঁজা খায় না, তার জন্যে ভাঙের বন্দোবস্ত আছে। যতক্ষণ কীর্তন চলে ততক্ষণ শিল নোড়াও চালু। হার্মোনিয়াম বাজতে থাকে এবং রাধাকৃষ্ণ ও সীতারামের খোসামোদ করতে এমন এমন গান গাওয়া হয়, যার সামন সিনেমার হিট গানও হার মেনে যায়।

উদাহরণঃ

“লেকে পহেলা পহেলা প্যার, ভরকে আখোঁ মেঁ খুমা র,

জাদু নগরী সে আয়া হ্যায় কোঈ জাদুগর”।

কথাগুলো বদলে নিয়ে গাওয়া হয়ঃ

“লেকে পহেলা পহেলা প্যার, ত্যাজকে গোয়ালোঁ কা সংসার,

মথুরা নগরী মেঁ আয়া হ্যায় কোঈ বংশীধর”।

এতেই বাজিমাত!


দুটো দিন কাটতেই সবার বিশ্বাস হোল যে বাবাজী হলেন কৃষ্ণের অবতার। তবে উনি যমুনার জল না খেয়ে খালি গাঁজা খেলেন আর এমন সব পিশাচ তাঁকে ঘিরে রইল যে ওনাকে কৃষ্ণ কম , শিবের অবতার বেশি মনে হল। কলকে ধকধক জ্বলছে আর প্রমাণ করছে যে—গাঁজা চুরির হোক, কি সরকারী দোকানের, গঙ্গাজল গঙ্গোত্রী থেকে আসুক, কি দুটো নোংরা নালার সঙ্গম থেকে --- দুটোরই প্রভাব সবসময় সমান।

বাবাজী মানুষটি বেশ মজার। কীর্তন খালি করান না, নিজেও করেন। যদি গাঁজা না খেতেন, তাহলে ওনার স্বর গলার বাইরে স্পষ্ট করে শোনা যেত। আর যদি হারমোনিয়ম না বাজত, তাহলে ওনার কীর্তনের সুরটাও খানিক বোঝা যেত। এইসব স্বাভাবিক বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও উনি দেখতে দেখতে গোটা গ্রামকে বশ করে ফেললেন। উনি কবীর, রুইদাস ও রামানন্দের এমন এমন ভজন শোনালেন যে লোকে মুগ্ধ হয়ে ওনাদের জয়-জয়কার করতে লাগল।

কবীর এবং অন্য সন্তেরা যদি এখানে হাজির হতেন এবং ওনাদের ভজন বলে যা সব মৌলিক কবিতা গাওয়া হচ্ছে সেসব শুনতেন, তাহলে তাঁরা বাবাজীর জয়ধ্বনি করতেন। এর ফলে বাবাজী গ্রাম থেকে জাতিবাদের নাম ভুলিতয়ে দিলেন। তারপর একদিন গাঁজা, সিদ্ধি ও কীর্তনের মাঝে ইশারা করলেন যে এই গ্রামের প্রধান বড় ধর্মাত্মা, তখন লোকজন হতভম্ব হয়ে গেল।

এক ব্যাটা সিদ্ধিখোর বলে উঠল—এখনও তো কেউ নির্বাচিত হয় নি। আর এই পদের জন্য প্রথমবার নির্বাচন হবে---। তখন বাবাজী ফের ইশারা করলেন যে আমার ভগবান তো ইতিমধ্যেই নির্বাচন সেরে ফেলেছেন।

সংক্ষেপে বললে, নেশা গায়েব হওয়ার আগেই জনতা জেনে গেল যে ব্রাহ্মণ প্রার্থীকেই ঈশ্বর প্রধান পদের জন্য নির্বাচিত করেছেন। নেশা নামার আগে প্রায় সবাই উক্ত জ্ঞানের জোয়ারে ভেসে গিয়ে মেনে নিল যে ওই আমাদের প্রধান। এইভাবে লাথির উপরে মুখের বিজয় হল।

নেবাদাওলা পদ্ধতি ভোটে যারা দাঁড়ায় তাদের খুব কাজে এল। অন্য গ্রামের লোকজনও এই পদ্ধতিকে আবশ্যক সংশোধন করে নিয়ে বড় বড় নির্বাচনে বিজয়ী হল। যেখানে গাঁজাখোর বাবাজী পাওয়া যায় নি বা অতখানি গাঁজা জোগাড় হয় নি, সেখানে লোকে কাউকে ধরে বাবা বানিয়ে কোন দেবীর পুজো শুরু করে দিত। ওখানে পাঁঠাবলি হত এবং কারণবারির ভোগ চড়ত। ফল একই—মুখের বিজয়, পদাঘাতের পরাজয়।

এইভাবে কৌশলটি পেটেন্ট হয়ে নির্বাচন সংহিতায় নেবাদাওলা পদ্ধতি নামে স্থান পেল।


মহিপালপুর পদ্ধতিটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সরল এবং বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক। এই পদ্ধতিটির উদ্ভব হয় এক নির্বাচন অধিকারীর ভুলের ফলে। পরে ওই ভুলটিকে মেনে নিয়ে অনেক জায়গায় সাফল্যের সঙ্গে রিপিট করা হয়। ভুলটা হয়েছিল একটি ঘড়ির চক্করে।

ভোট দেয়ার কথা বেলা বারোটা নাগাদ। হয়েছে কি, নির্বাচন অধিকারীর ঘড়ি শহরের ঘন্টাঘরের ঘড়ির সঙ্গে মেলানো ছিল। আর ঘন্টাঘরের ঘড়ি চুঙ্গী আদায়ের চেয়ারম্যানের ঘরের ঘড়ির সঙ্গে মিলিয়ে তাল রাখছিল। ফলে সওয়া ঘন্টা আগে চলছিল।

এবার হোল কি, নির্বাচন অধিকারী মহোদয়, বেশ কিছু প্রার্থীর আপত্তি সত্ত্বেও, পৌনে এগারটা নাগাদ যত প্রার্থী ও ভোটার এসে গেছে তাদের নিয়ে ভোট করিয়ে ফলাফল ঘোষণা করে দিলেন। যখন বাকি প্রার্থী এবং ভোটদাতারা ঘটনাস্থলে পৌঁছল, ততক্ষণে নির্বাচন অধিকারীটি নিজের বাড়িতে ওনার ঘড়ি অনুসারে সোয়া একটার খাবার খেতে ব্যস্ত।

এই নির্বাচন নিয়ে আদালতে মামলা হল। মামলা একেবারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চলল। সেখানে সমস্ত তর্ক ও যুক্তি হল ঘড়ি নিয়ে। তাতে মহামান্য আদালতের নানারকম ঘড়ির বিষয়ে মেকানিক্যাল জ্ঞান হল। ফলে মামলা চলল তিন সাল, কিন্তু তাতে নির্বাচন অধিকারীর কোন দোষত্রুটি প্রমাণিত হল না—হওয়ার কথাও ছিল না। তাই উনি যাকে বিজয়ী ঘোষণা করলেন সে নিজের ঘড়িকে বরাবরের জন্য সোয়া ঘন্টা ফাস্ট করে দাপটে রাজত্ব করল। বাকি প্রার্থীরা, খোদ ছোটে পালোয়ানের ভাষায়, ঘড়ির জায়গায় হাতে ঘন্টা ধরে বসে রইল।


মহিপালপুরের ঘটনাটি আচমকা ঘটেছিল। কিন্তু নিউটনের সামনে গাছ থেকে আপেলও আচমকাই পড়েছিল। কিন্তু তার থেকে উনি মাধ্যাকর্ষণের সূত্র আবিষ্কার করলেন। পরে ভোট-টোট গুলে খাওয়া কিছু লোক মহিপালপুরের ঘটনা থেকে এক সূত্র বের করলঃ সব ঘড়ি একসাথে তাল মিলিয়ে চলে না আর সব ভোটার একসাথে এক জায়গায় ভোট দিতে হাজির হয় না।

এই তত্ত্ব আবিষ্কার হওয়ার পর গ্রাম-পঞ্চায়েতের নির্বাচনে এর প্রয়োগ বেশ কয়েকবার নানাভাবে হচ্ছিল। ইলেকশন অফিসারের ঘড়ি মহিপালপুরের উদাহরণ মনে রেখে কখনও ঘন্টা-আধ ঘন্টা লেট বা ফাস্ট হয়ে যেত। আর ঘড়ি এক মেশিন, তার জন্য কোন লোক কেন দোষের ভাগী হবে? ফলে যে প্রার্থীটির ঘড়ি ইলেকশন অফিসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত, সেই জিতে যেত। এটা দুটো মেশিনের খেলা, তাই এর জন্য কোন মানুষের ঘাড়ে দোষ চাপানো নেহাৎ অবৈজ্ঞানিক মানসিকতা!

ভুগোলের হিসেবে শিবপালগঞ্জ থেকে মহীপালপুর অনেকটা দূর, কিন্তু নেবাদা কাছে। তাই রামাধীন ভীখমখেড়ীর ভোটে জেতার নেবাদা ফর্মূলাটা ভাল করে জানতেন। নির্বাচনের প্রচারে সেটাই আঁকড়ে ধরেছিলেন। ওদিকে শনিচরের পক্ষে বৈদ্যজী ভূগোল ছেড়ে ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরলেন। অতীত কাল থেকে জেতার যত পদ্ধতি আছে সব খুঁটিয়ে দেখে শনিচরকে বললেন মহীপালপুর পদ্ধতি প্রয়োগ করতে। ফলে ওনার পকেট থেকে খরচ বলতে সেরেফ একটা শস্তা হাতঘড়ির দাম যা হয়। সেই ঘড়িটা নির্বাচন অধিকারী ভুলে নিজের মণিবন্ধে বেঁধে বাড়ি নিয়ে গেছল। এদিকে নেবাদা ফর্মূলার লোকেরা হেরে গিয়ে এমন হতাশ হল যে এন্তার মদ গিলে মাঠে বেহুঁশ হয়ে পড়ে রইল। ওদের প্রাপ্তি বলতে নেশা করার গভীর জ্ঞান।

0 comments:

0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৫. লুইজ গ্লিক ও তাঁর কবিতা






প্রিয়বরেষু সুস্মি,

তোমাকে চিঠিটা লিখছি ব্যাঙ্গালোর থেকে। আমাকে লেখা তোমার চিঠি হয়ত বাড়ির পোষ্টবক্সে তালাবন্দি হয়ে পড়ে আছে। বেনারস থেকে ফিরেই ব্যাঙ্গালোর এসেছি। বহুবছর পরে ব্যাঙ্গালোর এলাম। আনুমানিক বিশ বছর তো হবেই নাকি? তুমি তখন ইলেকট্রনিক সিটিতে থাকতে, মনে পড়ে? সকালের ট্রেন লেট করে মধ্যরাতে যখন ব্যাঙ্গালোর পৌঁচ্ছালো তুমি তখনো আমার জন্য প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে। বাইরে অঝোর বৃষ্টি, আমরা বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম একসাথে, পরেরদিন সকালে আমাদের দুজনেরই কি ভীষন জ্বর উঠেছিল। মনে আছে তোমার? এরপর আর কখনো ব্যাঙ্গালোর আসা হয়নি। তুমি নিশ্চয় পরে আরো বহুবার এসেছো। শহরটা আমূল বদলে গেছে, মেট্রোরেল হয়েছে। ইলেকট্রনিক শহরে এখন জ্যেঠু মানে অর্ক থাকে। মেট্রো ষ্টেশনের নীচে যখন ওর সাথে দেখা করেছি তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল। ইনফোসিস, উইপ্রোর সেই চিরচেনা জায়গাগুলো বড্ড বদলে গেছে। পুরোনো জায়গাগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে তোমাকে খুব মনে পড়ছিল মনে পড়ছিল ব্যাঙ্গালোরে প্রথম পড়া লুইজ গ্লিক নিয়ে তোমার সেই কথাগুলো। তখনো লুইজ গ্লিক নোবেল পাননি। তুমি কোন এক লাইব্রেরি থেকে কিনে এনেছিলে গ্লিকের বুনো আইরিস তাঁর পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত কাব্যগ্রন্থ। আমার এখনো মনে পড়ে গ্লিকের বইটা শেষ করে তুমি বলেছিলে পড়ে দেখো আমেরিকার রাষ্ট্রীয় কবি ফুলের ভাষায় কথা বলেছেন গোটা কাব্যগ্রন্থে। ফুল বলতে হয়ত কাঁটাঝোপের ফুল, হয়ত গ্রীষ্মের সামান্য অবকাশে ফুটে ওঠা বর্ষজীবী বুনো আগাছার ফুল যারা কখনো স্রষ্টার কাছে প্রশ্ন রাখে কখনো বা ব্যঙ্গ করে তাঁকে। এবং অনিত্যতার মধ্য দিয়ে জীবনের এই যে উদযাপন তা বিষণ্ণতা বিবর্জিত নয়, কিন্তু যে পোয়েটিক এনার্জি এই বিষণ্ণতা নির্মাণে তিনি প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে সঞ্চারিত করতে পেরেছেন। তোমার মনে আছে? সেবার ব্যাঙ্গালোরে আমরা গ্লিকের কবিতাতেই ডুবেছিলাম, সম্ভবত ‘ফার্স্ট বর্ন’ বইটি আমরা পড়েছিলাম তার মাস দুয়েক পরে তারপর যখন আমেরিকা থেকে রাজীব নিয়ে এলো ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অফ অ্যাকিলিস’তখন আমাদের নেশায় পেয়েছিল গ্লিকের কবিতা! তিনটি বই পড়ে আমরা একমত হয়েছিলাম গ্লিকের কবিতায় খ্রিষ্টীয় অনুষঙ্গ খুব বেশি করে থাকলেও তার সবটাই প্রায় বিষন্নতা থেকে উৎসারিত এবং সেখানেই তাঁর কবিতার আবেদন ভাষার সীমা অতিক্রম করে যায়। গ্লিকের ফেইথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট যখন পড়ছি তুমি তখন দূরের মানুষ! তোমার সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। বইটির মূল বক্তা একজন বয়স্ক চিত্রশিল্পী, যিনি তার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন এবং জীবনকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। এটি একটি কিংবদন্তি বা রূপকথার মতো করে লেখা, যেখানে একজন নাইট একটি রাজ্যে অ্যাডভেঞ্চার করতে যায়। কি অদ্ভুত আমাদের সম্পর্কটাও তখন মৃত! এই বই যখন পড়ছিলাম আমার বারবার তোমার কথা মনে হতো, আর মনে হতো লুইজ গ্লিক যেন তোমাকে বলতে না পারা আমার কথাগুলোই তার কবিতায় লিখছেন।

তুমিও কি সেই সময় গ্লিক পড়তে? তোমারও কি মনে হতো গ্লিক আমাদের মতই আত্মজৈবনিকতা ও বিষাদময়তা লিখছেন তাঁর কবিতায়। তোমারও কি মনে হয়েছিল গ্লিকের কবিতা মৃদুপ্রবহ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হ্রস্বকায় ও চকিত অন্তমিলযুক্ত। কবিতাগুলো আপাতসরল ভাষায়, কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে জীবনের গভীর বোধ ও জটিলতা। সেখানে প্রগলভতা নেই, আছে পরিমিতিবোধ। শব্দকে তিনি ব্যবহার করেন অতি সাবধানে, অনেক চিন্তাভাবনা করে। তার কবিতার লিরিক্যাল কোয়ালিটিকে অনেকে এমিলি ডিকিনসন ও এলিজাবেথ বিশপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার নির্মেদ-সংবেদী কবিতায় অলংকারের ঘনঘটা নেই। আছে সহজ কথোপকথন ও শুভ-অশুভের বার্তা। তার কবিতা আবেগঘন, মিথ ও প্রাকৃতিক চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ। আধুনিক জীবনের নানা অনুষঙ্গকে তিনি উপজীব্য করে তোলেন তার পঙক্তিমালায়। লুইজ গ্লিক নিয়ে তোমার সাথে কোন কথা হয়নি আমাদের এই দীর্ঘ বিরতির পরে। আজ ব্যাঙ্গালোরে বৃষ্টি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে ফেলে আসা সেইসব দিনরাত। তোমাকে লিখতে বসে মনে পড়ছে গ্লিকে ডুবে থাকা সেই সময়ের কথা। তোমার মনে আছে গ্লিকের দুটো বই পড়ে তুমি বলেছিলে- গ্লিকের কবিতা যেন ‘জীবন ঘষে শিল্প’ হয়ে উপস্থিত হয় আমাদের সামনে। আবেগ ও ভাবালুতাকে সঙ্গী করে বারবার যেন যাপিত জীবনের তটেই ফিরে আসেন তিনি। স্বভাবতই তাঁর কবিতায় ফিরে ফিরে আসে আমাদের নিত্যদিনের চাওয়া-পাওয়া, ছেলেবেলা, হারানো ভালোবাসা, যৌনতা, মৃত্যু, প্রকৃতি ও প্রেম। সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে উপস্থিত হয় পুরাণও। সব মিলিয়ে এই কবির কবিতার মধ্যে আছে সাধারণ—খুবই সাধারণ এক সুর। আর এই সুরটি একই সঙ্গে আমাদের চেনা আবার অচেনাও। বোধ করি এসব কারণেই গ্লিকের কবিতা সাধারণ হয়েও ‘অসাধারণ’। তোমার এই মূল্যায়ন কতটা সত্য তা পরে গ্লিক পড়তে গিয়ে বারবার অনুভব করেছি। আমি যখনই গ্লিককে পড়তে বসেছি আমার মনে হয়েছে সাধারণ হয়েও অসাধারণ হবার চেয়েও বড় হয়ত বিষাদময়তায় বিপরীতে জীবনের আকাঙ্ক্ষারও দেখা মেলে গ্লিকের কবিতায়। প্রেমের আকাঙ্ক্ষা, অন্তর্দৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা। মাঝে মাঝে ইতি ও নেতির আকাঙ্ক্ষায় ঘটে উভয়প্রাপ্তি। এর মধ্যে হয়তো খুঁজলে বিরোধাভাসও পাওয়া যাবে। ভাষায় বিক্ষিপ্ত স্ট্যাটাস, পাওয়ার, মোরালিটি ও জেন্ডার তার সাম্পর্কিক জ্ঞানকে প্রভাবিত করে। সুইডিশ অ্যাকাডেমি লুইস গ্লিকের নোবেল সাইটেশনে উল্লেখ করেছে, গ্রিক পুরাণের ডিডো, পার্সিফোন কিংবা ইউরিডিস হয়ে তিনি যে ব্যক্তিগত উচ্চারণ করেন তার মূল্য বৈশ্বিক। আত্মকথা ও গ্রিক পুরাণ মিলেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতা আত্মজীবনীমূলক মনে হলেও তা কনফেশনাল বা দোষ স্বীকারোক্তিমূলক মনে করা যাবে না। তাঁর কবিতা নিরাভরণ কিন্তু নিরাবরণ নয়; বর্ণনার আধিক্য নেই, ইঙ্গিতের গল্প অনেক কবিতায়। কবি ক্রেইগ মর্গান টিচার মনে করেন, তাঁর কবিতায় শব্দ দুর্লভ, শব্দের কোনো অপচয় নেই, পুনরাবৃত্তি নেই। আমার তো গ্লিক পড়তে বসলে মনে হয় তিনি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলেন, নিজেকে প্রশ্ন করেন। চিন্তা ও অনুভবের মাঝপথ দিয়ে তিনি হাঁটেন। তার পা মাটিতে কিন্তু দৃষ্টি আকাশে। তিনি আবেগরসে নিত্য ও অনিত্যের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন। তার কবিতা চলমানতা ও স্থিরতার এক আত্মিক সেতুবন্ধন। তার নিমগ্নতায় চেতন ও অবচেতনের মধ্যে পার্থক্য লুপ্ত হয়ে যায়। অপার অন্তর্মুখিনতার কারণে যদি তার কবিসত্তাকে ‘স্পিরিচুয়েল’ আখ্যা দেওয়া হয়, তাহলে ভুল হবে না। প্রাত্যহিক জীবনের রূপকল্পে নির্মিত গ্লিকের কাব্যসৌধ। তাই তার দৃষ্টি ব্যক্তিমানুষের জীবনের দিকে, নাগরিক জীবনের আটপৌরে ঘটনাবলিতেও। ছোট ছোট দৃশ্য চোখের সামনে আসে, ভাসে, চলে যায়। তাদের গুরুত্বও কম নয়। ‘শিকাগো ট্রেন’, ‘দ্য এগ’, ‘থ্যাঙ্কসগিভিং’, ‘হেজিটেট টু কল’, ‘মাই কাজিন ইন এপ্রিল’, ‘লেবার ডে’, ইত্যাদি কবিতায় জীবনের ছোটখাটো ঘটনাবলি অপূর্ব তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়। ‘রেডিয়াম’ কবিতায় তিনি সময়ের ও জীবনের সহজ চলমানতাকে তুলে ধরেন। তাঁর কবিতা পড়তে গিয়ে মনে হয় এমিলি ডিকিনসন, এলিজাবেথ বিশপ, সিলভিয়া প্লাথ, জন বেরিম্যান, রবার্ট লাওয়েল এবং রাইনার মারিয়া বিল কোন না কোনভাবে তাঁর কবিতা শৈলীতে মিশে আছে। লিওনিদ অ্যাডামস এবং স্ট্যানলি কুনিৎজের কথা তিনি নিজেই বলেছেন, দুজনই তাঁর শিক্ষক। খেয়াল করলে দেখা যাবে মার্কিন কবিতার মানচিত্র যারা গঠন করেছেন, তাদের কারো সঙ্গেই এ যাবৎ বাংলা কবি মহল ও পাঠকের ঘনিষ্ঠ পরিচয় গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বের মার্কিন কবিতা সম্পর্কে সম্যক অবহিত হতে হলে কাদের কবিতা আবশ্যিকভাবে পাঠ করা দরকার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখেছি উত্তর মিলেছে সচরাচর যে ক'জনের নাম পুরস্কারপ্রাপ্তি ও সমালোচকদের আলোচনার কারণে গুরুত্ববহ তাদের নামই মনে এসেছে, তারা হলেন জন অ্যাশবেরি, অ্যান্থনি হেকট, কে রেয়ান, ডব্লিউ এস মারভিন এবং লুইজ গ্লিক। তোমার তালিকায় কি আরো কেউ আছেন? বলা হয় জন অ্যাশবেরি উত্তরাধুনিক কবিতার প্রধানতম গুরু, তিনি কবিতায় আধুনিক শিল্পসুলভ বিমূর্ততা অনুপ্রবিষ্ট করেছেন, তথাপি তার কোনো অনুরাগী বাংলায় নেই। সত্য তো এই যে, এদের কারোর সঙ্গেই আমাদের কহতব্য কোনো পরিচয় গড়ে ওঠেনি, সৃষ্টি হয়নি আদান-প্রদানের কোনোরূপ সুড়ঙ্গপথ। বাঙালি কবিকুল ও পাঠকের জন্য এ কথা স্বীকার নেওয়া সুবিধাজনক যে, একুশ শতাব্দীর উষালগ্নে লুইস গ্লিক মার্কিন কবিতারসিকদের কাছে তাঁর দৃঢ়মূল অস্তিত্ব নিয়ে উপস্থিত একজন কবি। নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউয়ে কবি স্টিফেন্স ডোবিন্স লিখেছেন, 'সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন কবিদের মধ্যে লুইজ গ্লিকের চেয়ে ভালো আর কেউ লেখে না। আমাদের স্বভাবের এত গভীরে নিয়ে যেতে পারেন এ রকম আর কেউ নেই।' কবি রবার্ট হ্যাস লিখেছেন, 'এ রকম বিশুদ্ধ, এ রকম চৌকস গীতিকবি আমেরিকায় আর নেই।' আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউয়ে অ্যানা উটেনের পর্যবেক্ষণ এ রকম, 'গ্লিক তার পাঠককে ভাবতে বাধ্য করেন, পাঠককে অভিভূত করেন।' লুইজ গ্লিকের কবিতা দাবি করে পাঠকের মমতাপূর্ণ অভিনিবেশ। তার কবিতা পাঠে মনে হয় তিনি একজন ধ্যানস্থ মানুষ, যার মগ্নচৈতন্য থেকে উঠে এসেছে কিছু পর্যবেক্ষণ, কিছু দর্শনবাক্য, জীবনের অচিহ্নিতপূর্ব কিছু অভিজ্ঞান; যা তিনি সাজিয়ে দিয়েছেন কবিতার অবয়বে। বাইরে বৃষ্টি বেড়েছে। কোথাও যাবার নেই তাই তোমাকে লিখতে লিখতেই মনে পড়লো লুইজ গ্লিকের ফ্যান্টাসি কবিতাটি, ভাবছি এই অখন্ড অবসরে তোমার জন্য কবিতাটি অনুবাদ করে ফেলি। কতটুকু হবে কতটা পারবো জানিনা। চেষ্টা করছি যদি হয় চিঠির সঙ্গে দিয়ে দেবো। নিরন্তর ভালো থেকো।

অন্তে প্রেম হোক

বাসু



পুনশ্চ: পরশু ফিরবো দিল্লি, দশ পনেরদিন দিল্লিতে থাকবো। তুমি দিল্লির ঠিকানায় লিখতে পারো।



ফ্যান্টাসি

লুইজ গ্লিক


তোমাকে বলি: প্রতিদিন মরছে যে মানুষ তাদের কথা। এটা কেবল শুরু।
শ্মশানে রোজ জন্ম নিচ্ছে নতুন বিধবা, নতুন এতিম।
হাত ভাঁজ করে তারা বসে থাকে, আর ভাবে নতুন জীবনের কথা।
তারপর তারা হাঁটতে থাকে সমাধিক্ষেত্রের দিকে, অনেকেই প্রথম এসেছে:
কেউ কান্না করতে ভয় পায়; কারো ভয় কেঁদে ফেলার।
কেউ ঝুঁকে এসে বলে দেয় এখন কী তাদের করণীয়: হয়তো
বলতে হবে কিছু; হয়তো কবরে দিতে হবে মাটি
তারপর সবাই বাড়িতে ফিরে যায়: বাড়িটা সহসা মানুষে ভরে ওঠে
বিধবা রাজকীয়ভাবে বসে থাকে, তার কাছে যাওয়ার জন্য মানুষেরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়
সে প্রত্যেককে কিছু বলে, আসবার জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে।
কিন্তু তার মন চায় সবাই চলে যাক:
সে ফিরে যেতে চায় সমাধিক্ষেত্রে অসুস্থদের ঘরে, হাসপাতালে
এটা সম্ভব নয় জেনেও এটাই তার একমাত্র আশা,
অতীতে ফেরার ইচ্ছে অতি সামান্য,
খুব দূরে নয় বিয়ে, প্রথম চুমুর কাছে।


১লা ডিসেম্বর,২০২৫

0 comments:

0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in












১৭  

জেরাল্ডের এপার্টমেন্টের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। যদিও খুঁটিনাটি বর্ণনা দেওয়া এখনও বাকি, তবে একথা আগেই বলা হয়েছে যে এপার্টমেন্টেরও জেরাল্ডের মতই দু’খানা আলাদা সত্তা আছে এবং এই দুই সত্তার মাঝে কোথাও কোনো বিরোধ নেই। বরঞ্চ জেরাল্ডের মতই সম্পূর্ণ স্বকীয় এবং ভিন্ন পরিসর নির্মিত হয়েছে সেখানে। জেরাল্ডের সম্পর্কেও আগেই বলা হয়েছে; তার অতীত সম্পর্কে জানানো হয়েছে যে তার বাবা ছিলেন এক কৃষক এবং তার মা ছিলেন এক ইহুদি বিদ্বান পণ্ডিতের কন্যা।  

 

সঙ্গীতশিক্ষকের বাড়িতে জেরাল্ডের সঙ্গে পিয়ানোবাদক কিশোর বের্নহার্ডের প্রথম সাক্ষাতের পরে বেশ কয়েকটা সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে গেছে। বের্নহার্ডের বাজনা এবং বাজনার মধ্যে প্রতিফলিত হওয়া ইয়োহান সেবাস্তিয়ান বাখ সম্বন্ধে পরিণত ভাবনাচিন্তা বিশেষভাবে জেরাল্ডকে স্পর্শ করেছিল। তবে জেরাল্ডের বাড়িতে যাবার আমন্ত্রণ বের্নহার্ড এখনো গ্রহণ করে উঠতে পারেনি, কারণ নানা ধরনের ঘটনাপ্রবাহে সে এই আমন্ত্রণের কথা একেবারে ভুলে গিয়েছিল।

 

বেটসির সঙ্গে সাক্ষাতের পর থেকে বের্নহার্ডের মনমেজাজ অনেকখানি ভাল হয়ে গিয়েছিল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিল সে যে এখানে এসেছে বলে সে বুঝতে পারছে যে কখনো কখনো বেশ সহজে পয়সা উপার্জন করা সম্ভব। ধূসর রঙের সিলিং, যেটা তার চোখে খুব বিশ্রী লাগতো, সেটা আজ হঠাৎ আর ততখানি মনখারাপ করবার মত রং বলে মনে হচ্ছে না তার। ওই রঙটা এখন তার অনেকখানি অভ্যেস হয়ে গেছে; তাছাড়া বড় শহরে বসবাস করতে হলে নিজের মেজাজমর্জির বশ্যতা স্বীকার করে গুমরে থাকার বিলাসিতা করা তার পক্ষে একেবারেই  সম্ভব নয়। প্রথম দিকে এই ব্যাপারটা সে ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনি বলে খুব ভুগেছে। বিশেষ করে যখন সে ক্লান্ত থাকতো, তখন একটা বিব্রত ভাব তাকে ঘিরে ধরত। মাঝে মাঝে সকালে সে একটা দমচাপা কষ্ট নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠত। সারাদিনের কাজগুলোকে যেন মনে হত অজস্র কঠিন শাস্তি এবং সেগুলোর মধ্য দিয়ে তাকে যেতেই হবে। সে জানত যে সারাদিন যে মুখগুলোর সামনাসামনি তাকে হতে হবে, সেগুলোর অভিব্যক্তি কেমন হতে পারে… নির্বিকার, অপরিচিত, বিষণ্ণ। সারাদিন তাকে কী কী করতে হবে, সেটা ভাবলেই তার অসহ্য লাগত। এমনকি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে করিডরের অপর প্রান্তে হেঁটে গিয়ে বিশেষ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও মাদাম দুবোয়ার সঙ্গে কথা বলতেও ইচ্ছে করত না তার। অথচ মাদাম দুবোয়ার সঙ্গে কথা না বলার জন্য সেরকম যুতসই ছুতো খুঁজে বের করতে পারত না সে। বাদ্যযন্ত্রের দোকান অবধি হেঁটে যেতেও ইচ্ছে করত না তার। অতি অল্প আলোয়, শীতে ওই অপরিসর দোকানঘরের কুঠুরিতে বসে পিয়ানো অভ্যেস করতে গিয়ে তার হাতের আঙুলগুলি জমে শক্ত হয়ে যেত। এবং অবশেষে রু সান জাক অঞ্চলে একটা ছোট রেস্তরাঁয় চার্লসের সঙ্গে বসে একসঙ্গে খাবার অর্ডার করবার জন্য ওয়েটারকে ডাকা, পুরো ব্যাপারটাই ভীষণ বিরক্তিকর ছিল তার কাছে।  

সম্প্রতি বের্নহার্ড নিয়মিত অনেকখানি সময় কাটাচ্ছিল চার্লসের সঙ্গে। বেলা একটা নাগাদ তাদের দেখা হত। সঙ্গে চার্লসেরও কিছু বন্ধুবান্ধব থাকত। নিয়মমাফিক সবাই মিলে শিক্ষকদের মুণ্ডপাত করতো রোজ। সবাই একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করত। গালাগালির বন্যায় রোজই একটা বিশেষ নির্দিষ্ট ধারা থাকত। তবে এই ছেলেগুলো বেশ মজার এবং প্রাণবন্ত ছিল। তাদের সঙ্গে মিশবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করবার প্রয়োজন নেই। তারাও এই তরুণ ‘বশে’*কে নিজেদের মতো করে আপন করে নিয়েছিল… মুক্তকণ্ঠে তারা বের্নহার্ডের গুণাবলীর প্রশংসা করে যেত। আবার কখনো তাকে ডাকত ‘ব্লন্‌ড্‌ কমরেড’ বলে। বের্নহার্ডকে ঘিরে ইয়ার্কি ফাজলামি করতে করতে তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠত। যদিও বের্শেন অস্বস্তি বোধ করত এসবে, কিন্তু সে লক্ষ্য করত যে তাদের কথাবার্তার মধ্যে থাকত সুচতুর বাগ্মিতা এবং অবাক করে দেওয়া বুদ্ধিমত্তার ধার। তবে বিকেলের ক্লাস করতে স্কুলে ফিরে যাবার আগে তারা বের্নহার্ডের সুস্বাস্থ্যের কামনা করে জল মিশিয়ে রেড ওয়াইন পান করে যেত।

 অবশ্য এতকিছু সত্ত্বেও বের্নহার্ডের নিজেকে বহিরাগত বলে ভাবাটা বন্ধ হয়নি। যদিও চার্লস বেশির ভাগ সময়ে বিরক্ত এবং উত্তেজিত অবস্থায় থাকতো, তবুও একা চার্লসের সঙ্গ সে পছন্দ করত। স্কুলে চার্লসের অবস্থা ছিল শোচনীয়। শিক্ষকেরা তাকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। তাছাড়া কী ভাবে যেন জানাজানি হয়ে গিয়েছিল যে চার্লস রবার্টের বাড়িতে যাতায়াত আছে। চার্লস জানে না যে এই কথাটা কে শিক্ষকদের কানে তুলেছে। সে রবার্টের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করেছে বহুদিন আগেই; এখন সে সন্ধ্যায় বাড়িতে বসে পড়াশুনা করে। কিন্তু এই গুজবের হাত থেকে সে রক্ষা পাচ্ছে না। সব মিলিয়ে চার্লস রেগে আগুন হয়ে আছে; তার পরিশ্রমের কোনও সুফল ফলছে না, কারণ শিক্ষকেরা তার প্রতি বিরূপ। ফলে চার্লস আবার সব ছেড়েছুঁড়ে একা একা পথেঘাটে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে থাকে এবং মধ্যরাতে হা-ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরে।

 

বের্নহার্ড মাঝেমাঝে বেশ বুঝতে পারছিল যে চার্লসের বিষণ্ণতা এবং হতাশা তাকে প্রভাবিত করছে এবং এই ব্যাপারটাকে সে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। তার নিজস্ব বিষাদের সেরকম কোনও কারণ সে খুঁজে পাচ্ছিল না এবং সেই সময় চার্লসের থেকে যথাসম্ভব দুরত্ব বজায় রাখছিল সে। নিজের পরিস্থিতি নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় যুক্তিসহ ভাববার চেষ্টা করছিল আত্মবিশ্লেষণ করে।  সে ভাবছিল যে বাড়ির জন্য মনখারাপ লাগছে কি না তার, নিজের কাজটা করতে ভাল লাগছে কি না… এই আবহাওয়া বা এই নতুন শহরের জল হাওয়ায় কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না, কিম্বা এই বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের মুখ দেখে বিরক্তি বোধ হচ্ছে কি না তার। কোনও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না সে। মনের জোর দিয়ে যে তাকে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, সেটা সে বুঝেছিল। সে নিজেকে হাস্যকর কিম্বা অসহনীয় ব্যক্তিত্বের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় না, কিন্তু ক্রমাগত বিষাদ ও হতাশার সামনে সে অসহায়, দুর্বল ও অবশ বোধ করছিল।

এরকম একটা অদ্ভুত পরিস্থিতিতে বেটসির সঙ্গে দেখা হওয়াটা বের্নহার্ডের কাছে সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছিল। সে নিজেই যে অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম, শুধু এই ভাবনা থেকেই যে সে আরও শক্তিশালী এবং উদ্যমী বোধ করছিল, ব্যাপারটা এতখানি সরলসোজা নয়। এই দুই আমেরিকান এবং তাদের পোষা বাঁদর ক্ন্যাগি এবং তাদের মজার কাণ্ডকারখানা দেখে সে মানসিকভাবে অনেকটা হালকা বোধ করা শুরু করেছিল। প্রতিদিনের জীবনযাত্রার রুটিন আর বোঝার মত চেপে বসছিল না তার কাঁধে। সে প্রতিদিন ব্যস্ত থাকত। সন্ধে ছটা নাগাদ সে বেটসির কাছে যেত। সেখানে   চা আর কেক খেয়ে সে বেটসিকে জিজ্ঞেস করত যে আগের দিনের গানের লাইনগুলো তার মনে আছে কিনা। তারপর তার গানের কথার মধ্যে জার্মান শব্দগুলোর উচ্চারণ শুদ্ধ করে দিয়ে লক্ষ্য রাখত যে সেগুলো ভালভাবে অর্থ বুঝে বেটসি মুখস্ত করতে পারছে কিনা। অস্বস্তিকর সেই সূচনাপর্বের সময় প্রথম সেই পিয়ানোটার ঢাকনা খোলা হয়েছিল। বের্নহার্ডের ছাত্রী সেরকম প্রতিভাশালী নয়, কিন্তু পিয়ানোটা অপূর্ব সুন্দর। একটা মিষ্টি নরম সুরে বাঁধা যন্ত্রটা। বের্নহার্ড প্রতিদিন ওই যন্ত্রটার টানেও যেত এবং বাজিয়ে অভ্যেস করবার সুবর্ণসুযোগটা সে হারাতে চায়নি। বেটসি চুপ করে বসে তার বাজনা শুনতে পছন্দ করত। বিলি বেটসিকে ডিনারে যাবার জন্য কথা মনে করাবার পর, একেকদিন আটটা বেজে গেলেও সে ইশারায় তাকে চুপ করিয়ে দিত।

 

(চলবে) 

                 

* ‘বশে’ শব্দটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময় থেকে জার্মান সৈন্যদের উদ্দেশ্যে একটা গালি হিসেবে ব্যবহার করত ফরাসি সৈনিকেরা। মাথামোটা, মূর্খ এই ধরনের গালি দেবার জন্য ব্যবহৃত হয়। 

0 comments:

0

গল্প - মনোজ কর

Posted in





















চতুর্দশ পর্ব

পানু রায়ের ফোন বেজে উঠলো। ফোনের ওপারে মনীষা।

-বলো মনীষা। সব ঠিকমত চলছে?

-হ্যাঁ, এখনও পর্যন্ত সব ঠিকই আছে।

-পুলিশের খোঁজাখুঁজি শেষ হলো? কিছু পেলো?

-না, কিছুই পায়নি। অনেক খোঁজাখুঁজি করলো। হতাশ হয়ে ফিরে গেল।

-এটা কোনও ফাঁদ হতে পারে। অফিসের অবস্থা কী রকম?

-অফিসের অবস্থা খুব খারাপ। সমস্ত কাগজপত্র, ফাইল এলোমেলো হয়ে আছে। এলিনা কী করে গেছে কে জানে? চিঠিপত্র, বিল সমস্ত ভুল জায়গায় ফাইল করে গেছে। টাকা পয়সাও খুব অসাবধানতার সঙ্গে দেয়া নেয়া করেছে।

-তার মানে? আমাকে আর একটু ডিটেলে বলো।

-ধরুন রাজেন্দ্র পার্কের নতুন ফ্ল্যাটটা যেটা উনি আমি ছুটিতে যাবার কয়েকদিন আগে কিনেছিলেন সেটাতে কিছু ইলেকট্রিক রিপেয়ারের কাজ হয়েছে যার জন্য বিল হয়েছে এক লক্ষ সত্তর হাজার টাকা। এটা কি সম্ভব?

-হতে পারে। হয়তো কোনও বড় টিভি লাগানো হয়েছে।

- আমি ডিটেলে দেখছি কিন্তু সবকিছু বেশ অগোছালো করে রেখে গেছে।

-মনীষা, যতটা পার ঠিক করার চেষ্টা করো। আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখো। কালীকৃষ্ণ ফোন করলে বোলো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

-অবশ্যই। পুলিশের ব্যাপারটা উনি ফোন করলে জানাব?

-নিশ্চয়ই। ডিটেলে জানাবে।

-আমি ভাবছিলাম যদি পুলিশ ওনার ফোন ট্যাপ করে।

-কিছু করার নেই। ঝুঁকি তো নিতেই হবে।

-ঠিক আছে। আমি দেখি কতদূর কী গোছানো যায়।

পানু রায় ফোন রাখতেই দরজা ঠেলে জগাই ঢুকলো। পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ কী হলো, কোনও খবর?’

-বেশ ভালোই গন্ডগোল শুরু হলো বলে মনে হচ্ছে।

-কী হয়েছে? এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেন?

-তুমি ঐ সাংবাদিক সনাতনকে চেন তো? আরে যে ‘ঈগলের চোখে’ বলে খবরের কাগজে গল্প লেখে। খুব পপুলার ওর লেখা।

-হ্যাঁ, চিনি। আমিও ওর লেখার খুব ভক্ত। কিন্তু হয়েছেটা কী?

-কেউ একজন খবর জোগাড় করেছে যে তুমি নাকি ছোটকালীর অফিসে একটা বন্দুক থেকে গুলি চালিয়ে অফিসের ফার্নিচার নষ্ট করে দিয়েছো।

-তুই কী বলছিস জগাই? এটা ওরা খবরের কাগজে ছাপাবে?

-কেন আমার তো মনে হয় তুমি তাই চাইছিলে। প্রচারের জন্য এর চেয়ে ভালো খবর আর কী হতে পারে? আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে হলেও হতে পারে।

-কিন্তু আমি অসাবধানতাবশত এটা করে ফেলেছিলাম।

-কিন্তু সনাতন এটা নিয়ে একটা মজার গল্প লিখতে চলেছে। একজন একশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি যিনি নাকি ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞদের নাকানি চোবানি খাওয়াতে পারেন তিনি নাকি একটা বন্দুকের মধ্যে গুলি ভরা আছে কিনা না জেনেই ট্রিগার টেনে একটা বিপজ্জনক কান্ড ঘটিয়ে বসলেন।

-এটা সত্যিই খুব লজ্জার ব্যাপার হবে!

-আমারও প্রথমে তাই মনে হয়েছিল।

-এখন কি তোর অন্যকিছু মনে হচ্ছে?

-দাদু, তোমার কী করে মনে হলো যে এটা করে তুমি পার পেয়ে যাবে?

-আমার মনে হয়না আমি পার পেয়ে যাব। এটা ঐ সনাতনের মত সাংবাদিকদের জন্য লেখার একটা ভালো বিষয় হবে।আর সনাতন নিশ্চয়ই এমন ভালো একটা গল্প একদিনে শেষ করবে না।

-দাদু, আমার শুধু একটাই চিন্তা। তুমি এমন কিছু করনি তো যাতে ওরা তোমাকে আইনভঙ্গকারী বলতে পারে?

-জগাই, আমার মনে হয় তুই ঠিক। আসলে যে কারণে ওরা আমায় অভিযুক্ত করতে পারে তা হলো শহর এলাকায় গুলি চালানো।

পরের দিন পানু রায় যখন অফিসে ঢুকলেন দেখলেন টেবিলে খবরের কাগজটা রাখা। সনাতনের গল্পটা যে পাতায় আছে সেই পাতাটা খুলে সামনে রেখে গেছে সুন্দরী। পানু রায় কাগজটার দিকে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গেই সুন্দরী ঘরে ঢুকলো। পানু রায় বললেন,’ সুন্দরী, আমি শেষ অবধি প্রচারের আলোয় এসে গেলাম।‘

-কাল থেকে তুমি এই শহরের সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কী লিখেছে শোনো। - শতবর্ষীয় বিস্ময়বৃদ্ধ পানু রায় যাঁর অপরিসীম জ্ঞানের কথা সর্বজনবিদিত এবং যিনি এই শহরের সবচেয়ে মূল্যবান পরামর্শদাতা এবং যাঁর কারিগরী জ্ঞান বিশেষ করে অস্ত্রসম্বন্ধিত জ্ঞান যে কোনও অস্ত্রবিশেষজ্ঞের চেয়ে বেশি বইতো কম নয় সেই পানু রায় বন্দুক হাতে নিয়ে হাস্যকর ঘটনা ঘটালেন।

রেবা কৈরালার সঙ্গে ছোটকালীর সম্পর্ক এবং তারপর থেকে কী কী ঘটেছে এমনকি আচমকা গুলির আঘাতে ছোটকালীর মেহগিনি টেবিল যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সে কথা বলেই গল্প শেষ হয়নি। একথাও লেখা হয়েছে যে শিবুলালের খুনের তদন্ত করতে গিয়ে যে বন্দুকটি রেবা কৈরালার বাড়িতে পাওয়া গেছে সেটিতেও একটা গুলি কম ছিল এবং সেই বন্দুকটিই এই বন্দুক কি না সেবিষয়ে পুলিশ আরও খোঁজখবর চালাচ্ছে। ওদিকে কালীকৃষ্ণের অফিসে ঐ টেবিলটি দেখাবার জন্য সেলসম্যানেরা সম্ভাব্য ক্রেতাদের ভিড় করে ঐ ঘরে নিয়ে যাচ্ছে এবং গাড়ি কেনার কাগজে সই করাচ্ছে। সুতরাং টেবিল পাল্টানোর পরিকল্পনা এখন বাতিল করা হয়েছে। ঐ টেবিলটিকে বিশেষ দ্রষ্টব্য জিনিস বলে প্রচার চালানো হচ্ছে এবং ঐ টেবিলের নামকরণ করা হয়েছে ‘টেবিলের শবদেহ’ বলে।

এই পর্যন্ত পড়ে সুন্দরী থামল কারণ দরজা খুলে ততক্ষণে জগাই ঘরে ঢুকে পড়েছে। জগাই বললো,’ তোমাকে বলে রাখি কাগজ পড়ে যারা ঐ টেবিল দেখতে আসছে ছোটকালীর ছেলেরা তাদের সবাইকে গাড়ি বিক্রীর চেষ্টা করছে। একদিনে গোটা দশেক গাড়ি বিক্রী হয়ে গেছে যা এক সপ্তাহেও হয়না।‘ পানু রায় হেসে সুন্দরীকে ফোনটা দিয়ে বললেন,’ রেবা কৈরালাকে ধরার চেষ্টা করো। আমি ততক্ষণ জগাইএর সঙ্গে কাজের কথা সেরে নিই। বল জগাই কী কী খবর জোগাড় করলি।‘

-শিবুলালের অপরাধী হিসাবে পুলিশের খাতায় নাম আছে। বার দুয়েক জেল খেটেছে। একবার ঠকিয়ে টাকা আদায়ের জন্য আর অন্যবার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের জন্য। লোকটা সেদিন সন্ধ্যেবেলা সাতটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে ০.৩৮ ক্যালিবারের বুলেটের ঘায়ে মারা গেছে। ওর বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে।

-তাতে শরীরের মধ্যে শুধু গুলিই ঢোকে না সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্ত গ্যাসও ঢুকে যায়। কেউ কি গুলির আওয়াজ শুনেছে?

-না। মনে হয়না। বুকে ঠেকিয়ে গুলি করলে আওয়াজ কম হয় বলেই মনে হয়।

-তার মানে কেউ কোনও আওয়াজ শোনেনি। আর কিছু খবর?

পানু রায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই জগাইএর ফোন বেজে উঠলো। জগাই ফোন ধরে ওদিকের কথা শুনে বললো,’ কী সর্বনাশ! তুমি ঠিক শুনেছো? ঠিক আছে এখন রাখছি। আর কিছু খবর পেলে আমাকে জানিও।‘ পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ কী হয়েছে?’

-পুলিশ বলছে যে বন্দুকটা রেবা কৈরালার ঘরে পাওয়া গেছে সেটাই শিবুলালকে হত্যার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

-কোন বন্দুকটা?

-কেন? ওখানে তো একটাই বন্দুক ছিল যেটা ছোটকালী রেবা কৈরালাকে দিয়েছিল। তার মানে যে বন্দুকটা শিবুলালকে হত্যার ব্যাপারে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে বলা হচ্ছে সেটা তোমার কাছে কিছুক্ষণের জন্য ছিল এবং তার থেকে একটা গুলি তুমি ব্যবহার করেছ এবং সবাই সেটা দেখেছে। পুলিশ প্রথমে ভেবেছিল তুমি কিছু একটা পরিকল্পনা করে ইচ্ছাকৃতভাবে ওদের বিপথে চালাতে চাইছিলে। ওরা ছোটকালীকে ঝাঁকাচ্ছে। ওদের ধারণা ছিল তুমি ইচ্ছে করে ঐ ঘাতক বন্দুকটা রেবার বাড়িতে রেখে এসেছিলে।

-ওদের এখন মত পরিবর্তন হয়েছে?

-হ্যাঁ, এখন ওদের মত বদলেছে। এখন ওদের সন্দেহ অন্য একজনকে। সে হচ্ছে ছোটকালীর স্ত্রী। ঐ মহিলা একসময় কাঠমান্ডুর কোনও এক হোটেলে হোস্টেস এবং গয়নার মডেল হিসাবে কাজ করত। শিবুলালের সঙ্গে ঐ মহিলার যোগাযোগ ছিল এবং ওনার ফোন ডায়েরিতে শিবুলালের ব্যক্তিগত ফোনের নম্বর পাওয়া গেছে। শিবুলাল ব্ল্যাকমেলার ছিল এবং ঐ মহিলা সদ্যবিবাহিতা। সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার করতে কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। পুলিশের কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমার ঐ বোকা বোকা গুলি ছোঁড়ার ব্যাপারটা আর তোমার ঐ ‘আমি জানিনা ওতে গুলি ভরা ছিল’ তুমি বুলেট বিশেষজ্ঞদের বিপথে চালনা করার জন্য করেছ। পুলিশ ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখছে না। ওরা সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করছে। কেলো দারোগা তোমাকে কেস দেবে বলে মুখিয়ে আছে। যদি প্রমাণ করতে পারে তুমি সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করেছ তাহলে তোমাকে জেলে ভরার জন্য যতদূর যেতে হয় যাবে।

পানু রায় চেয়ার থেকে উঠে একটু অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে জগাইএর দিকে তাকিয়ে উত্তেজিতস্বরে বললেন,’ শোন, আমি জানতে চাই পুলিশ কী করছে? এ ব্যাপারে যত খবর পাওয়া সম্ভব সব আমার চাই। ওরা সম্ভবত রেবা এবং ছোটকালী দু’জনকেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিয়েছে। ভাগ্য আমাদের প্রতি সুপ্রসন্ন যে বড়কালী দেশের বাইরে। ওকে ধরা খুব একটা সহজ হবে না। কোথাও তো একটা গন্ডগোল লাগছে।‘

-কিন্তু দাদু পুলিশ জানতে চাইছে যে কেন তুমি ছোটকালীর অফিসে গেলে, ওর কাছ থেকে বন্দুক চাইলে, ওটা থেকে টেবিলের ওপর গুলি চালালে তারপর ওটা নিয়ে রেবা কৈরালার বাড়িতে গিয়ে এমন ভাবে রেখে এলে যাতে পুলিশের ওটা খুঁজে পেতে অসুবিধে না হয়।

-জগাই, তুই আমাকে নতুন কিছু বলছিস না। এর পিছনে কী আছে তার সম্বন্ধে তোর বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। যেটা করতে বলছি সেটা কর।

জগাই মাথা নিচু করে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। পানু রায় আরও কিছুক্ষণ পায়চারি করে সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,’ এর উত্তর একটাই।‘ সুন্দরী কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলো ,’ কী?’

-বড়কালীর কাছে নিশ্চয়ই ছোটকালীর অফিসের চাবি আছে। যে বন্দুকটা দিয়ে খুন করা হয়েছিল সেটা বড়কালীর কাছে ছিল। বড়কালী জানতো যে ছোটকালীর কাছে অবিকল একই রকম একটা বন্দুক আছে। সুতরাং বড়কালী খুনী বন্দুকটাতে একটা গুলি ভরে ছোটকালীর ড্রয়ারে রেখে ছোটকালীর বন্দুকটাকে নিয়ে চলে যায়। বড়কালী ভেবেছিল খুনী বন্দুকটা পুলিশ খুঁজে পাবে না। তারপর ছোটকালীর বন্দুক থেকে একটা গুলি খরচ করে সেটা রেবাকে দিয়ে আসে। ভেবেছিল পুলিশ ঐ বন্দুকটা রেবার বাড়িতে খুঁজে পাবে। একটা গুলি নেই দেখে ভাববে রেবা খুন করেছে, তারপর যখন বুঝবে যে ঐ বন্দুকটা থেকে খুন করা হয়নি তখন রেবার প্রতি আর সন্দেহ থাকবে না। আর সেজন্যই আমাকে বলেছিল যেভাবে হোক রেবার নিরাপত্তা যেন কোনও ভাবেই বিঘ্নিত না হয়। কিন্তু আমার ভুলের জন্য বড়কালীর সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। আমি ভেবেছিলাম পুলিশ যখন রেবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তখন জানতে পারবে যে বড়কালী তাকে একটা বন্দুক দিয়েছিল এবং সেটা তারা খুঁজে বের করবে অথবা তারা রেবার বাড়িতে খুনী বন্দুকের খোঁজে তল্লাশি চালাবে । আমি ভাবলাম আমি যদি কোনওভাবে ছোটকালীর বন্দুকটাও রেবার বাড়িতে রেখে দিতে পারি এবং পুলিশ যদি ঐ বন্দুকটা সহজেই হাতে পেয়ে যায় তাহলে নিশ্চয়ই দ্বিতীয় বন্দুকের খোঁজ করবে না। আর তার আগেই যদি ওরা জেনে যায় যে বড়কালী রেবাকে একটা বন্দুক দিয়ে গেছে এবং সেটা চায় তাহলে রেবা ছোটকালীর বন্দুকটা পুলিশকে দেবে এবং যখন বোঝা যাবে যে সেটা খুনী বন্দুক নয় তখন পুরো ব্যাপারটা গুলিয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে যে বন্দুকটা বড়কালী লুকিয়ে রেখে এলো আমি সেটা নিজের অজান্তে বের করে নিয়ে এসে পুলিশের হাতে তুলে দিলাম।

-এখন তোমার কী হবে?

-জানি না।তবে এটুকু বলতে পারি পুলিশ বলতে পারবে না আমি প্রমাণ লোপাট করেছি। উল্টে আমি যে প্রমাণের জন্য পুলিশ হন্যে হয়ে ঘুরছে সেই প্রমাণ উদ্ধার করে পুলিশের মূল সন্দেহ রেবা কৈরালার বাড়িতে রেখে এসেছি। সুতরাং এই মুহূর্তে আমি আমার কী হবে তাই নিয়ে চিন্তিত নই। আমার চিন্তা বড়কালীদের নিয়ে।

-দাদু, তোমার কি মনে হয়, কে খুন করেছে?

- সেটাই তো এখন মূল প্রশ্ন। এই মুহূর্তে পুলিশের ধারণা ছোটকালীর স্ত্রী অথবা ছোটকালী খুন করেছে এবং আমি ওদের বাঁচাবার জন্য রেবাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছি। আমার মনে হয় ছোটকালী আর তার নববিবাহিতা স্ত্রীও আমার ওপর বেশ রেগে আছে। ওদের ধারণা আমি খুনী বন্দুকটা নিয়ে ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলাম। তারপর আমার ইচ্ছাকৃত হৈ হট্টগোলের মধ্যে কোনও ফাঁকে খুনী বন্দুকটাকে ছোটকালীর বন্দুকটার সঙ্গে বদলে দিই। আমার ফাঁদে পা দিয়ে ছোটকালী খুনী বন্দুকটা রেবাকে দিয়ে আসে। বড়কালী যখন কাগজে খবরটা পড়বে তখন আমাকে অভিশাপ দিতে শুরু করবে।

-আর পুলিশ তোমার সম্বন্ধে কী ভাবছে?

- পুলিশ ভাবছে আমি যা করেছি তা কেবলমাত্র পুলিশকে বিপথে চালনা করা জন্য। ওরা যে ভাবেই হোক প্রমাণ করার চেষ্টা করবে আমার কাছে ঐ খুনী বন্দুকটা ছিল। যদি একবার ওরা সেই জায়গায় পৌঁছোয় তাহলে ওরা আমাকে যতদূর পারে টেনে নামাবে।

-কিন্তু ওরা কী করে সেটা প্রমাণ করবে?

-ঐ গুলিটার থেকে যেটা আমি ছোটকালীর টেবিলে ছুঁড়েছিলাম। কিন্তু ঐ গুলিটা ছাড়া কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবে না আমার কাছে ঐ বন্দুকটা ছিল। কিন্তু একবার যদি ঐ গুলিটা পুলিশ হাতে পায় এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা যদি বলে ঐ গুলিটা আমি ছুঁড়েছিলাম পুলিশ প্রমাণ করবে যে ঐ গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। মনে রেখো আমি শিবুলালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম এবং কেলো দারোগা আপ্রাণ চেষ্টা করবে এটা প্রমাণ করতে যে আমিই খুন করেছিলাম।

-বেশ, ওরা যদি ঐ গুলিটা হাতে না পায় তাহলে ওরা নিশ্চয়ই প্রমাণ করতে পারবে না যে খুনী বন্দুকটা তোমার কাছে ছিল।

-পারতেও পারে তবে সোজাসুজি নয়।

-পুলিশের মাথায় এটা আসার আগে জগাইকে কি বলা যায় না ওখানে গিয়ে ঐ গুলিটা খুঁজে আনতে।

-না, না। সেটা সম্ভব নয়। আমি জগাইকে চিনি। এতবড় ঝুঁকির কাজ ও আগে করেনি। একবার ধরা পড়ে গেলে আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাব।

-গুলিটা টেবিল থেকে ছিটকে কোথায় গিয়েছিল তোমার মনে আছে?

-আমি এমন একটা অ্যাঙ্গেল থেকে গুলিটা ছুঁড়েছিলাম যে গুলিটা যাতে ছিটকে দেয়ালে আটকে যায়, কাউকে যেন আঘাত না করে।

- এবার সত্যি বলতো গুলিটা তুমি কেন ছুঁড়েছিলে?

-যাতে কিনা পুলিশ সহজেই একটা গুলি ছোঁড়া হয়েছে এমন একটা বন্দুক রেবার বাড়িতে পেয়ে যায়। আমি ভেবেছিলাম যদি পুলিশ একরম একটা বন্দুকের খোঁজেই রেবার কাছে আসে তাহলে ছোটকালী এবং আমার রাখা বন্দুকটা নিয়েই পুলিশ চলে যাবে।

-তাহলে আমরা এখন কী করবো?

-আমাদের কাছে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

-দাদু, সেটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ । আমার অস্থির লাগছে। আমি একটু খোলা হাওয়ায় হেঁটে আসি। আমি এখনই আসছি।

-সুন্দরী, কী হয়েছে তোমার?

-আমি কাল রাত্রে ঘুমোতে পারিনি। আমি কাল সারারাত ছোটকালী আর রেবাকে নিয়ে ভেবেছি। আমি জানিনা কেন আমি ব্যাপারটা থেকে বেরোতে পারছিনা।

-তুমি আসলে অনেক বেশি সময় অফিসে দিচ্ছ এবং অনেক বেশু দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছ। এতকাজ একসাথে করার সঙ্গে সঙ্গে তুমি আমাকেও কেসের ব্যাপারে সাহায্য করছো।

- সে কথা ঠিক, কাজের চাপ হয়ত বেড়েছে কিন্তু আগে তো কখনও এরকম হয়নি। বিশেষ করে গতরাত্রে। আমি চোখের পাতা এক করতে পারিনি। আমার মনে হয় রেবার প্রেমে আঘাত পাবার ব্যাপারটা আমাকে বেশি ভাবাচ্ছে। একবার রেবার মনের অবস্থাটা ভেবে দেখ, দাদু। একদিন সকালবেলা খবরের কাগজ খুলে দেখল তার প্রেমিক অন্য একজনকে বিয়ে করেছে যে ব্যাপারে সে কিচ্ছু জানেনা। আর তার প্রেমিকের বাবা তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চায়। আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘুম থেকে উঠে পড়েছিলাম। আর শুতে যেতে পারিনি। সারারাত অস্থিরভাবে পায়চারি করেছি।

-সুন্দরী, ভেতরে যাও। একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। আমি সবাইকে বলে দিচ্ছি কেউ যেন তোমাকে বিরক্ত না করে। যদি সেরকম কিছু ঘটে আমি তোমাকে ডেকে দেব।কালকের দিনটা ঘটনাবহুল হবে বলে মনে হয়। আজ সেরকম কিছু হবার সম্ভাবনা নেই। সবকিছু জট পাকিয়ে আছে। পুলিশকে কিছু করার আগে জট খুলতে হবে। সময় লাগবে।

-আর তারপর যখন পুলিশ সক্রিয় হয়ে উঠবে তখন তুমিই হবে তাদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য।

-একদম ঠিক। তবে যদি সে সুযোগ পুলিশ পায়। কেলো দারোগা আপ্রাণ চেষ্টা করবে আমি জানি। যাকগে, ছাড়ো ওসব। পরিস্থিতি কখনও কখনও মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, কয়েকটা ঘটনা আকস্মিকভাবে একসঙ্গে ঘটে গেলে অনেকসময় জটিলতার সৃষ্টি করে। তুমি ভেতরে যাও সুন্দরী।

-দাদু, কিছু দরকার হলে আমাকে ডেকো কিন্তু।

-ঠিক আছে, বাবা।

-আমার শরীরটা ভীষণ ম্যাজম্যাজ করছে।

- কোনও অসুখ বাধাবে মনে হচ্ছে। একটা ডাক্তার দেখিয়ে নিতে পার।

-না, না। কোনও দরকার নেই।একটু ঘুমিয়ে নিতে পারলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

- আমারও তাই মনে হয়। তবে জ্বর এলে আমাকে বোলো। ডাক্তার ডাকতে হবে।

-ঠিক আছে, আসি। দরকার পড়লে ডেকে নিও।

সুন্দরী ভেতরে চলে যায়। পানু রায় পায়চারি শুরু করেন। মাথায় নিশ্চয়ই কিছু ঘুরছে।

0 comments: