
অদ্বৈত মল্ল বর্মন নামটি শুনলেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে মালো পাড়া একেবারে তথাকথিত প্রান্তিক জেলে পরিবারের মানুষজন,নৌকো, মাছের আঁশ গন্ধ তিতাসের কল্লোল এবং তিতাসের স্রোত। মালো পাড়ার এই যে জীবন, জাওরা পুলার জীবন সবটা নিয়ে অদ্বৈত কলকাতার যে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী আবহ তার মধ্যে খানিকটা হয়তোবা প্রান্তিক নয়তো ব্রাত্য ছিলেন।তিনি তাঁর নিজের লেখার যোগ্যতায় লেখনীর ঐতিহ্যে এবং ধারাবাহিকতায় তৈরি করেছেন এক মহান উপন্যাস, এক মহা আখ্যান। তার নাম তিতাস একটি নদীর নাম।বাংলা ভারত তথা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটক তাঁর এই আখ্যানটি নিয়ে একটি মহৎ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন।আমরা সেই সব প্রসঙ্গেও যাচ্ছি না।কিন্তু অদ্বৈতের স্বল্পায়ু কলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনে তাঁকে খুটে খাওয়া খবরের কাগজের চাকরি, তিতাস একটি নদীর নামের পাণ্ডুলিপি দেশ পত্রিকার অফিস থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর যে প্রতিকূলতা সব ধরনের যে বাঁধা তাকে অগ্রাহ্য করে তিনি এগিয়েছেন নিজের খেয়ালে।নিজের মেজাজে,নিজস্ব ভঙ্গিতে। এই নিজস্ব ভঙ্গিমা স্থির হয়েছে ভারতীয় তথা বাংলার যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যে লোকগান,মাঝি মাল্লাদের সঙ্গীত সেই সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আকাঙ্খা, বিবাহ,যৌনতা মৃত্যু সবই অদ্বৈতকে তিতাসের কোলে বারবার নিয়ে এসেছে। এই তিতাস তরঙ্গ তার জীবনে এক আশ্চর্য অভিঘাত হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাভাষা বা শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কেন পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় যে নদীকেন্দ্রিক উপন্যাস লেখা হয়েছে তার মধ্যে অদ্বৈত মল্লবর্মণের 'তিতাস একটি নদীর নাম' অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আখ্যান।অদ্বৈত মল্লবর্মনের পূর্বপুরুষ মৎস শিকারী বা মৎসজীবী ছিলেন।সেই জীবনের অভিজ্ঞতা তিনি প্রতি পদে,প্রতি পাতায় বিবৃত করেছেন এই আখ্যানে। কিন্তু শুধুমাত্র তো অভিজ্ঞতা থাকলেই হয় না,তার সঙ্গে মিশে স্বপ্ন কল্পনা। লেখকের অন্যান্য অনুভব তাই।ফলে 'তিতাস একটি নদীর নাম' আখ্যান হিসাবে ভারতীয় বাংলা তথা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নদীকেন্দ্রিক আখ্যান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আমরা জানি বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের কাছে 'পদ্মা', বিভূতিভূষণের 'ইছামতী', তারাশঙ্করের 'ময়ূরাক্ষী', 'অজয়', মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি', নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে 'মহানন্দা', সমরেশ বসুর 'গঙ্গা' দেবেশ রায়ের 'তিস্তা' ঐশ্বর্যময় রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু তিতাসের চরিত্রে ঔপন্যাসিক যে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন সেটা সম্পূর্ণ অর্থে এদের থেকে আলাদা,স্বতন্ত্র। এছাড়াও আরও অনেকে চেষ্টা করেছেন নদীকে নিয়ে বাংলা ভাষায় উপন্যাস লিখতে।যেমন প্রবোধ বন্ধু অধিকারী লিখেছেন 'আবার কর্ণফুলী আবার সমুদ্র' অমরেন্দ্র ঘোষ 'চর কাশেম' লিখেছেন নদী নিয়ে উপন্যাস।এছাড়া আরও অনেকে রয়েছেন। কিন্তু তিতাস সর্ব অর্থে একটি আলাদা পরিকল্পক হিসাবে আমাদের সামনে আসে। আমরা জানি তিতাসের যে মূল পাণ্ডুলিপি তা হারিয়ে গিয়েছিল প্রথম বার এবং দ্বিতীয়বার তিনি অদ্বৈত তাঁর স্মৃতি থেকে সেই লেখাটি লিখেন এবং তা প্রকাশিত হয়।
তিতাস একটি নদীর নাম'-একটি মহৎ আখ্যান।এই লেখাটির আখ্যান কল্পনাকার অদ্বৈত মল্ল বর্মন। সাধারণভাবে কোনো চরিত্রকে ধরে এই আখ্যান এগোয় নি।চরিত্ররা এসছে, পাশে থেকেছে, হেঁটেছে কিন্তু আসল চরিত্র হচ্ছে তিতাস।যে তিতাস জলে, বৃষ্টিতে, রোদে ষড়ঋতুর কাঁপন এবং প্রবহমানতায় গ্রীষ্ম, বর্ষা,শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্তে নতুন নতুন রূপ পরিগ্রহ করে এবং আমরা দেখতে পাই যেতে সেই রূপের আন্ধার মধ্যে, আমরা 'রূপের আন্ধার' কথাটি খুব স্পষ্ট করেই বললাম কারণ নারীর রূপেও কখনো কখনো আন্ধার থাকে যখন নারী নিজেকে অন্য কোনো ভাবে মেলে ধরতে চায় পুরুষের কাছে।আন্ধার থেকেই আসে আলো।তিতাসের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রকম। অর্থাৎ তিতাসের যে আন্ধারিমা, তার যে অন্ধকার, জীবনের নানা টানাপোড়েন এবং কষ্ট, সেখানকার মানুষদের এই যে ভয়ানক দুর্দশা এবং বাঁচার জন্য যে ইতস্তত সংগ্রাম এই সবটা নিয়ে তিতাস আমাদের বুকের গভীরে হৃদয় রেখার সংলগ্ন হয়ে গভীরে এগোয়।
অদ্বৈত সম্পূর্ণ দেশজ সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে এই উপন্যাস নির্মাণ করেছেন।আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের আঙ্গিক এবং পরা আঙ্গিকের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।এখানে পরা আঙ্গিক বিষয়টি আমাদের একটু বলে দেওয়া দরকার তার কারণ আঙ্গিক তো সবাই তৈরি করে।কিন্তু আঙ্গিক ভাঙার কথা, আঙ্গিকের মধ্য থেকে নতুন আঙ্গিককে বের করে আনা যেমন নদীর স্রোতের ভেতর থেকে আরেকটি স্রোত আবিষ্কার করেন একজন মহৎ শিল্পী। ঠিক তেমনি অদ্বৈত মল্ল বর্মন তিতাস নদীর সঙ্গে, তিতাসের নৌকোর পালের সঙ্গে এগিয়ে গেছেন জীবন এবং জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে দিতে। তিনি নাইয়রের গান, বিয়ের গান,ছড়া,ধাঁধা, প্রবাদ- প্রবচন, নৌকা, কাঁথা, হুকো,জাল,আলপনা, লোকবাদ্য, লোকদেবতা, লোকক্রীড়া, লোকঔষধ, লোকগণিত,বারোমাসি গান,আম্রতত্ত্ব ইত্যাদি এইসমস্ত কিছুর কথা তিনি বলে গেছেন। আমরা জানি যে আমাদের লোকজীবনের সঙ্গে মৎসচাষ,মৎস শিকার মৎসের পেছনে ঘুরে বেড়ান একটা বড় ব্যাপার ছিল একসময়।আজকে আধুনিক পৃথিবীতে ট্রলার ইত্যাদি আবিষ্কার হওয়ার পর সেই মহিমা হয়ত খানিকটা পরিবর্তিত হয়েছে,যখন পৃথিবীতে পাল তোলা নৌকো এবং দাঁড় ও আবহাওয়া নির্ভর মাঝিরা তারা এগিয়েছেন সেই সূত্রধরে।
আমরা দেখেছি যে এক অন্যতর ভুবনের কথা অদ্বৈত যেমন বলছেন। ফলে প্রতিটি পদে এই যে বাংলার ছড়ানো প্রতিটি লোকজীবন ও সংস্কৃতি, লোকব্যবহার, লোকাচার, লোককথা,লোক যে সম্ভাষণ পরম্পরা সবটাই এসেছে শুধুমাত্র তাঁর নাগরিক ভাবনাচিন্তা থেকেই। তিতাসের যে অনুষঙ্গগুলি প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি পাতায় অদ্বৈত দেখিয়েছেন, অদ্বৈত নাগরিক মনন থেকে শুধুমাত্র অনুসরণ বা অনুশীলন করেন নি
তিনি একজন প্রকৃত প্রস্তাবে একজন ছাত্রের মতো পাঠ নিচ্ছেন লোকজীবনের আবার একইসঙ্গে ব্যাখ্যা, এবং তাঁর যে মেধা, তাঁর যে ধী শক্তি সেদিকেও তিনি প্রয়োগ করেছেন নিজস্ব মুন্সিয়ানায়। এই মুন্সিয়ানাকে আমাদের শ্রদ্ধা না জানিয়ে কোনও উপায় থাকে না।আখ্যানের গভীরে ঢুকতে ঢুকতে তিনি মালো পাড়া,মালো জীবন জাওলা জীবন ইত্যাদি প্রভৃতি যে চলন সেগুলোর যে ধারাবাহিক ছন্দ এবং পতন তাঁকে আবিষ্কার করেছেন। আমরা জানি 'ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী' আর্ণেষ্ট হেমিংওয়ের বিখ্যাত একটি আখ্যান। সেই আখ্যান নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ইত্যাদি করা হয়েছে।'ওল্ড ম্যান এণ্ড দ্য সী' আয়তনে অত্যন্ত কৃষ মানে বেশি পাতার উপন্যাস সেটি নয়। কিন্তু তার আলোচনা এবং ব্যাখ্যা হয়েছে নানাভাবে। জীবন, মৃত্যু,মৃত্যুবোধ সবটাই উঠে এসেছে সেই ব্যাখ্যাকারদের কলমে বা টাইপ রাইটারে।রুশ সাহিত্যিক মিখাইল শলোকভের 'অ্যাণ্ড কুয়াইট ফ্লোওস দ্য ডন' উপন্যাসে ডন নদী এক সুবিশাল জাতিগোষ্ঠীর প্রাণ প্রবাহ সঞ্চারিত করে ছিল।আমরা যদি অদ্বৈত মল্ল বর্মণের সৃষ্টির দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে ভারতীয় বা বাংলা উপন্যাসের যে চলন সেই চলনকে অদ্বৈত অস্বীকার করে নিজের মত করে এগিয়েছেন।অর্থাৎ অস্বীকার করা মানে ইংরেজদের একটি চাপিয়ে দেওয়া মডেল, সেই মডেলকে অস্বীকার করে,সেই মডেলকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে বিচার করে তিনি এগিয়েছেন তার নিজস্ব মুন্সিয়ানায়। ফলে তিতাস হয়ে উঠেছে চরিত্র তিতাস হয়ে উঠেছে মানুষের ক্রন্দন,বারোমেসে জীবন জেলে যারা মৎসজীবী,তাদের কষ্টের কথা তাঁদের আবহমানের দুঃখ, নির্যাতন বেঁচে থাকা, বিবাহ, আনন্দ, মৃত্যু,আহ্লাদ, যৌনতা, সার্বিকভাবে একটা গোটা নদীর ভূগোল যেন ঢুকে পড়েছে এই আখ্যান পর্বে।
নদীর যে চলন এবং ইতিহাস তা পৃথিবীর সব দেশে আপাতভাবে এক মনে হলেও মোটেই এক নয়।নদী এশিয়াতে বা ভারত উপমহাদেশে যে ব্যাপ্তি গ্রহণ করে যে রূপ পরিগ্রহ করে ইউরোপের নদী একেবারেই সেরকম নয়।ফলে মিশর চীন ভারত এবং ইরাক ইরানের যে নদী মাত্রিক জীবন তার সঙ্গে ইউরোপের নদী মাত্রিক জীবনের ফারাক রয়ে গেছে, আছে, থাকবেও। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ কোনও তত্ত্ব লিখতে বসেন নি। তিনি তাঁর মতো করে নদীকেন্দ্রিকতার এক আশ্চর্য চেহারা অন্য রূপ তুলে এনেছেন আমাদের সামনে।লেখক যেভাবে একজন প্রকৃত প্রস্তাবের ভাস্কর, তিনি যেভাবে পাথর কেটে কেটে একটি বড় মূর্তি বা স্থাপত্য তৈরি করেন সেভাবেই অদ্বৈত মল্ল বর্মণের লেখার গভীর থেকে সত্যটিকে খুঁজে বের করেছেন। লেখার এই আত্মা বা সত্য প্রকাশ করে অতীব কঠিন কর্ম।
আমরা আগেই বলেছি অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম বাংলা তথা ভারতীয় ভাষার একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নদীকেন্দ্রিক আখ্যান।অদ্বৈত জলকে যেমন নিয়ে এসেছেন মানুষের জীবন ধারার অন্যতম স্রোত হিসেবে।তিতাসের স্রোত তিতাসের নদী বহতা,বহমান তিতাস, জলে ভেসে থাকা নৌকো,জেলেদের নিদারুণ জীবন যন্ত্রণা সবটাই অদ্বৈত মল্লবর্মণ চমৎকারভাবে ফুটিয়েছেন আমাদের সামনে। এখন কথা হল যে অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নামের মধ্যে যে লোকায়ত এবং লোকায়তিক জীবন এবং পারিপার্শ্বিকতার কথা বলা হয়েছে অত্যন্ত সুনিপূনভাবে সেই সমস্ত বিষয়গুলি আমাদের সামনে তোলে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজস্ব আঙ্গিক এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী থেকে।
গান মানুষের জীবনের এক অনন্ত সম্পদ।দুঃখের সুখে আনন্দে বিষাদে হর্ষে সবেতেই গান বা সংগীত মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। গান এবং লোকগান এই দুয়ের পার্থক্য যেমন ছিল তেমনই থাকবে।আমরা জানি যে সমুদ্রের কল্লোর নদীর বহতা ধারা, পর্বতের দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, অরণ্যের পত্রমর্মর,পাখির গান সব কিছুই মানুষের জীবনে সংগীতের মূর্ছনা হিসেবে হাজির হয়েছে।মানুষ যখন প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্ন ছিল তখন সে সমুদ্রের উচ্ছ্বাস থেকে বাণ-বণ্যার ভয়াবহতা থেকে, নদীর কল্লোল এবং কলতান থেকে,পাখির কূজন থেকে কোনও হিংস্র জন্তুর হিশহিশানি থেকে বা গর্জন থেকে আবিষ্কার করেছে সংগীতের নতুন নতুন আঙ্গিক। এইভাবেই উঠে এসেছে লোকগান, লোকসংগীত বা লোকগীতি।যুগ- যুগান্তরে সেটি আস্তে আস্তে অন্যরকম হয়েছে। ধীরে ধীরে তার সংস্কার হয়েছে কিন্তু লোকগান বা লোকগীতি অনেকটাই প্রকৃতির সংলগ্ন হয়ে আছে।যেমন মাঝিদের গান তার সঙ্গে মিশে আছে ভাটিয়ালি, জারি-সারি ইত্যাদি, তারপর আছে ফসল রোপনের গান,ফসল কাটার গান, আছে বিবাহের গান,নবজাতক বা নবজাতিকা হলে তার গান, বিবাহোত্তর জীবনের যে পরিণতি সবই কিন্তু গান হয়ে আমাদের জীবনে এসেছে।এই গান এক অনাস্বাদিত অধ্যায়ের কথা,আমাদের লৌকিক জীবনের আঙ্গিক হিসাবে এসে উপস্থিত হয় আমাদের সামনে।আমরা নগর সভ্যতা বা নাগরিক চাতুরালি দিয়ে এই গানকে বুঝতে চেষ্টা করি কিন্তু বুঝতে পারি না।আসলে লোকমানসের গান হচ্ছে মানুষের বুকের ভাষা এবং মুখের ভাষা।সে বুকের ভাষা এবং মুখের ভাষা যখন সুর হয়ে এক হয়ে যায় তখন তা পরিণত হয় লোকগানে।ভাওয়াইয়া, চটকা,আলকাপ,গম্ভীরা মুর্শিদি, বাউল সবই নানাধরণের লোকগান। ফলে এই যে লোকগানের বিশাল ভুবন অদ্বৈত মল্ল বর্মণ তাঁর মহাকাব্য প্রতীম আখ্যান তিতাস একটি নদীর নাম- এ যে গানের কথা যেমন নাইয়রের গানের কথা,বিবাহের গানের কথা অন্য অন্য লোকগানের কথা অনুষঙ্গ হিসেবে সুন্দর করে তুলে এনেছেন আমাদের সামনে।
ধরা যাক লোকসঙ্গীতের ব্যবহার। অদ্বৈতের উপন্যাস মাটির রূপ-রস গ্রহণ করে জীবনকে সুর ও ছন্দে এক আশ্চর্য কথকথায় বেঁধে রাখে।তবুও এই জীবন সংগ্রাম সংস্কৃতি চর্চায় বিমুখ হয় নি। তিতাস পাড়ের অপামর মানুষের জীবন স্রোতের সুর সাঙ্গীতিকময় হয়ে উঠেছে বিচিত্র সঙ্গীত ধারায়।সেই সঙ্গীতের সুর তিতাসের বুকে মাঝি-মাল্লা,মা বোনদের কন্ঠে ভেসে বেড়ায়।এই সঙ্গীত হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা-বেদনার গান।তারা গায় দেহতত্ত্ব,বিচ্ছেদ,হরিবংশ,ভোরগান, গোষ্ঠগান,বিবাহের গান,বারমাসি গান,মিলনের গান।প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন লোকবৃত্তের মানুষেরা গায় সারি গান,গদ্যভাবের গান,গায় হোলির গান।লেখক দেখিয়েছেন কিশোর- সুবল প্রবীন তিলকচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছে, নতুন জায়গায় মাছ ধরার জন্য।নৌকায় ভেসে ভেসে কিশোর গাইছে-
"উত্তরের জমিনরে,সোনাবন্ধু হাল চষে,
লাঙ্গলে বাজিয়া উঠে খুয়া।
দক্ষিণা মলয়ার বায়,
চান্দমুখ শুকাইয়া যায়
কার ঠাঁই পাঠাইব পান গুয়া।।"
গ্রামের একটি কীর্তনের আসরে তিলক গায়,
"উঠান মাটি ঠন ঠন, পিড়া নিল সোতে, গঙ্গা মইল জল-তিরাসে,ব্রহ্মা মইল শীতে।।"
তিতাস পাড়ের লোকেদের প্রিয় বারোমাসি গান। তিতাস পাড়েএ বারোমাসির দুটি লাইন এরকম-
"জল ভর শান্তি কন্যা,জল ভর তুমি
যে ঘটে ভরিবা জল গো চৌকিদার আমি।।"
লোকক্রীড়া লোক খেলা বলতে আমরা বুঝি হাডু- ডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, ছু কিৎ কিৎ,কাবাডি, ইত্যাদি প্রভৃতি। এইগুলো কোনও রকম উপাদান ছাড়াই খেলা হয় আমরা আমাদের লেখার শুরুতে যে অনুশীলনের কথা লোকক্রীড়ায় বলেছি তার কথা অদ্বৈত মল্ল বর্মণ তাঁর এই মহাআখ্যানের মধ্যে নিয়ে এসেছেন এবং তুলে ধরেছেন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। কেননা মানুষ খেলা করে ক্রীড়া পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যায়,তার আদিম যে জীবনের তরঙ্গ তাকে স্মরণ করার জন্যে।মানুষ আগে মৃগিয়ায় নামত। আত্মরক্ষার জন্য তারা পশু শিকার করতেন কিন্তু পরবর্তী সময় যখন তথাকথিত সভ্যতার রথ আরও অনেকটাই অগ্রসর হল তখন শিকারের ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াল অনেকটা মাংস খাওয়ার থেকে বা আত্মরক্ষার থেকে যত না তার চেয়েও অনেকবেশি মানুষের ভেতরকার যে আদিম রিপু ক্রোধ এবং হিংসা তাকে পরিপুষ্ট করার জন্য।ফলে শিকার রয়ে গেল।পরবর্তী সময় মানুষের এই অমানবিক কাজের ফলে পশুকূলের বা জন্তু জানোয়ারের মধ্যে অনেক প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল বা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল মানুষের এই ভয়ানক আচরণে। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম আইন করে শিকার নিষিদ্ধ করা হল এবং সংরক্ষিত জঙ্গল তৈরি করা হল এবং সেখানে অভয়ারণ্য হিসেবে বলা হয় যাকে সেখানে পশুকূলকে যাতে তারা ঠিকঠাক করে তারা নিজেদের বংশ বৃদ্ধি করতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল।যদি আমরা ভারতের ইতিহাস আলোচনা করি তাহলে দেখব বৌদ্ধ যুগে মৃগদাব ছিল।তার আগের যুগে ছিল ব্যাপক শিকার এবং হিংসা।ময়ূর,হরিণ, কৃষ্ণসার,বাঘ,বনুশূকর সমস্ত কিছুই মানুষ নির্বিচারে হত্যা করত নেহাতই খাওয়ার জন্য বা নিজের হিংসার যে বহিঃপ্রকাশ তাকে চরিতার্থ করার জন্য।পরবর্তী সময় মৃগদাব তৈরি করা হল বুদ্ধের সময় এবং ভারত ভূমিতে অভয়ারণ্যের যে ধারণা তা কিন্তু বুদ্ধদেব এবং তার অনুগামীদের রচিত। তাঁর অনুশাসনেও শিকার প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গেল আবার শিকার ফিরে এল মুঘল যুগে,পাঠান যুগে। এবং পরবর্তী সময়ে যিখন ইংরেজরা ভারত দখল করল তখন নতুন করে এই শিকারকে আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।এই শিকারের যে অবশেষ সেটাই হল লোকক্রীড়ার অঙ্গ।আমরা যদি কাবাডি,হাডুডু বা অন্য খেলাগুলোকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব সেখানে কোনও উপাদান নেই।ব্যাট বল কিছুই নেই। যা আছে তা হল মানুষের শক্তি, মানুষের শক্তির কৌশল, পায়ের জোর,হাতের জোর,দৌড় ইত্যাদি প্রভৃতি।
তিতাস একটি নদীর নামে যে মহতি আখ্যান তাতে লেখক এই লোকক্রীড়াকে যে মালো পাড়া বা মালো জীবন বা মৎসজীবীদের যে বেঁচে থাকা তার মধ্যেই মিশিয়েছেন। সুখ-দুঃখ,আনন্দ-আহ্লাদ,বিষাদ এবং কষ্ট তার মধ্যেও মানুষ যে আনন্দের প্রদীপকে জাগ্রত করেন তার একটা অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে এই লোকক্রীড়া। এই লোকক্রীড়ার মধ্য দিয়ে শরীর এবং মন যেমন মজবুত শক্তিশালী ও দৃঢ় হয় তেমনই মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে যেহেতু খেলার আর অন্য কোনও উপাদান নেই,বল নেই,ব্যাট নেই তাই, স্টিক নেই,কিচ্ছু নেই সেইগুলো মানুষের একটা প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্নতার একটা উপাদান তৈরি করে যা যোগাযোগ তৈরি করে।এবং এর মধ্য দিয়েই লোকক্রীড়া আমাদের দেখিয়েছেন অদ্বৈত মল্ল বর্মণ।
ছড়া ও ছিকুলি আসলে আমাদের সভ্যতার গণগাঁথা।এই যে চার লাইন ছয় লাইন বা আট লাইনের যে কথাবার্তা যা অনেকটাঅ ছন্দবদ্ধ হয়ে আসে আমাদের সামনে।তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে মনুষ্য জীবনের নানা রহস্য। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ খুব স্বাভাবিকতায় তিতাস পাড়ের যে ছড়া এবং ছিকুলি ধাঁধা এবং পরণ কথা তাকে তুলে এনেছেন উপন্যাসের মধ্যে। ছড়া,ধাঁধা, ছড়া, ছিকুলি,পরণ কথা ইত্যাদি সবই হয়ে উঠেছে আমাদের যাপিত জীবনের বাইরে থেকে দেখা এক অনন্য সৌন্দর্য। যা আমরা বারবার পাঠ করলে আমাদের গভীরে নিয়ে আসতে পারি।
এবার আসা যাক ছড়া, ধাঁধা ও প্রবাদ-প্রবচনে।ছড়া হল মানুষের আদিমতম প্রয়াস।তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করেই ছড়া মানুষের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে আদিম মন্ত্র হিসাবে রূপান্তরিত হতে থাকে।তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে ব্রতের অঙ্গ হিসাবে ছড়া ব্যবহৃত হয়েছে।যেমন-
"লও লও সুরজ ঠাকুর লও ঝুটার জল
মাপিয়া জুখিয়া দিব সপ্ত আঁজল।"
গ্রামের মানুষ অনন্তবালাকে নিয়ে ছড়া কাটে-
"অনন্তবালা, সোনার বালা
যখনই পরি তখনি ভালা।"
অনন্তবালা যখন বড়ো হয়ে গেল,তখন তাকে নিয়ে ছোট মেয়েরা বিভিন্ন ছড়া কাটত,যা তার জন্য কগুব একটা স্বস্তির কারণ ছিল না।তারা বলত-
"অনন্তবালা ঘরের পালা।তারে নিয়া বিষম জ্বালা"।
লোকসাহিত্যে ধাঁধা একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।যার মধ্যে রয়েছে একটি সাহিত্যিক গুণ। তিতাস মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে রয়েছে লোকসংস্কৃতির এক বিশাল জগৎ। যা তিতাস পারের মানুষেরা যুগ যুগ ধরে লালন পালন করে বাঁচিয়ে রাখে নিজেদের সংস্কৃতিকে। সবই তাদের জীবনের অঙ্গ।যেমন উদয়তারা একটি ছড়া বলে -
"সুফল ছিট্যা রইছে, তুলবার লোক নাই,
সু-শয্যা পইরা রইছে,শুইবার লোক নাই,
ক দেখি অনন্ত এ-কথার মানতি কি?"
আকাশের বুকে অগুনতি তারার সঙ্গে মাটির পৃথিবীর ফুলের,মানুষের তৈরি শয্যার সঙ্গে এই বিশাল নদী বক্ষকে তুলনা করেছেন শিলক রচয়িতা।অনন্তের উত্তর দেওয়ার আগেই উদয়তারা উত্তর দিল।এর উত্তর হবে আকাশের তারা।
উদয়তারা আবার বলে
"হিজল গাছে বিজল ধরে
সন্ধ্যা হইলে ভাইঙ্গা পড়ে।"
এর উত্তর হাটকেই বুঝিয়েছে আসমান তারা। উদয়তারার পরের ধাঁধা-
'পানির তলের বিন্দাজী গাছ ঝিকিমিকি করে,
ইলসা মাছে ঠোকর দিলে ঝরঝরাইয়া পড়ে।'
এর উত্তর হবে কুয়াশা।
এরপর আসা যাক প্রবাদ-প্রবচনে।আমরা তিতাস পাড়ের কয়েকটি প্রবাদ প্রবচনের কথা উল্লেখ করছি।সুবলের বউ প্রবাদ বলে- 'জিভে কামড় শিরে হাত,কেমনে আইল জগন্নাথ।'
'দশ জনের কথা যেখানে,মরণ ভাল সেখানে।'
'জন্ম- মৃত্যু- বিয়ে,তিন বিধাতা নিয়ে।'
'নতুন বউ নথলী,শেওরা গেছের পেত্নী'।
'মানুষের কুটুম দিলে থুইলে,গরুর কুটুম চাটলে চুটলে'।
'পরের পাগল হাততালি, আপন পাগল বাইন্ধা রাখি।'
'তীর্থের মধ্যে কাশী,ইষ্টির মধ্যে মাসি,
ধানের মধ্যে খামা,কুটুমের মধ্যে মামা।'
'গাঙে গাঙে দেখা হয় তবু ভইনে ভইনে দেখা হয় না'।
অপমানের বাঁচন থাইক্যা সম্মানের মরণও ভালা।
বাংলা লোকসংস্কৃতিতে আজও কাঁথার শৈল্পিক ও নান্দনিক মূল্য রয়েছে। এই কাঁথা নির্মিত হয় একক বা যৌথ প্রচেষ্টায়।আর সেটা যদি নকশি কাঁথা হয় তাহলে তা লোককলার অন্যতম নিদর্শন। অদ্বৈত মল্লবর্মণ সুনিপুণভাবে 'নকশি কাঁথা'র উল্লেখ করেছেন।করমালীর স্ত্রী লোকের বাড়ির কাঁথা সেলাই করিয়া দেয় কাঁথা সেলাইয়ের ধূম পড়িয়াছে। ডান হাতের সূঁঁচের ফোঁড় বাঁ হাতের আঙ্গুলের ডগায় তুলিতে তুলিতে আঙ্গুলে হাজার কাটাকুটি দাগ পড়িয়াছে।কিন্তু নিজেদের ভাগ্যে ভালো কাঁথা জোটে না করমালী জানায়- "ছিঁড়া খাঁতায় গাও এলাইয়া" দেয় সে। নকশি কাঁথার শৈল্পিক সৌন্দর্যের কথা গবেষক ও লেখক জ্ঞাত বলেই এই কাঁথার কথা আমরা পাই।
গ্রামীন তথা ভারতীয় জীবনে এবং বঙ্গভূমি তো বটেই ঠ্যালো হুঁকো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেশা মাধ্যম হিসাবে প্রচলিত।তার ব্যবহার সময়ের ধুপে খানিকটা ফিকে হয়ে গেলেও তার প্রচলন আমরা দেখি গ্রাম বাংলার ঘরে।নারকেলের খোল দিয়ে ঘষে মেজে মসৃণ করে তৈরি হয় ঠ্যালো হুঁকো। হুঁকোর ওপর যে কলকে থাকে তাতে তামাক এবং জ্বলন্ত টিকে বসিয়ে তা থেকে ধুম্রপানের উপকরণ তৈরি করেন গ্রাম বাংলার মানুষ। শুধু গ্রাম বাংলা কেন,একসময় কলকাতাতেও ঠ্যালো হুঁকোর প্রচলন ছিল যথেষ্ট। বিবেকানন্দের জীবনে একটি কাহিনিতে আমরা দেখি তাঁর পিতার বৈঠকখানায় নানা ধরনের যাঁরা নানা ধর্মের এবং নানা বর্ণের মানুষ আছে,তাদের জন্য আলাদা আলাদা হুঁকো।তো বিবেকানন্দ সেখান থেকে একটি অন্য ধর্মের ব্যবহার করা হুঁকো টেনে দেখেছিলেন তাতে তাঁর জাত যায় কি না।অর্থাৎ বাড়ির লোকেরা যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- 'তুমি হুঁকো টানছ কেন?' না আমি টান দিয়ে দেখলুম আমার জাত যায় কি না'। এটা একটা খুবই প্রচলিত গল্প বিবেকানন্দের জীবনে।কিন্তু শহর কলকাতায় বা নাগরিক অভ্যাসে হুক্কাবার থাকলেও ঠ্যালা হুঁকো কিন্তু ক্রমশ আস্তে আস্তে পিছিয়ে গেছে।তিতাস একটি নদীর নামে এই ঠ্যালো হুঁকোর ব্যবহার যথেষ্ট পরিমাণে আমরা দেখি। কারণ মাছোয়ারা,মাল্লারা তাদের নৌকো,তাদের জলের অভিযান,নদীর ভেতর যে মাছ ধরা তার সঙ্গে নিজের জীবনকে উদ্দীপনাময় করার জন্য এই ঠ্যালো হুঁকোর ব্যবহার করেছেন এবং সেটিকে অত্যন্ত সুচারুভাবে তুলে নিয়ে এসেছেন।
তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে ঔপন্যাসিক হুঁকোতে ধূমপানের কথা বলেছেন। হুঁঁকো এবং টিকে নির্মাণ ও তামাকের ব্যবহার লোকপ্রযুক্তির সঙ্গে মিশে থাকে শৈল্পক ভাবনা।কিশোর- সুবল-তিলক মাছ ধরতে বেরিয়েছে।তাদের নৌকা এসে ভিরেছে নয়াকান্দা গ্রামে।একজন কৌতুহলী 'মালো' কিশোরদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করল।কিশোর মুগ্ধ হইয়া শুনিতে শুনিতে হাতের হুক্কা তার দিকে বাড়াইয়া দিল।আমারও হুক্কা আইতাছে।দেও আগে তোমারটা খাই।এই সময়ে একটি ছোট দিগম্বরী হৃষ্টপুষ্ট মেয়ে আসিতেছে দেখা গেল।বাড়ি থেকে হুক্কা লইয়া আসিয়াছে।শরীরের দিলানির সঙ্গে সঙ্গে হুকাটা ডাইনে বাঁয়ে দুলিতেছে- মেয়ের হাত হইতে হুক্কা লইয়া কিশোরের দিকে বাড়াইয়া লোকটি বলিল,'আমি খাই তোমার হুক্কা,তুমি খাও আমা ঝিয়ের হুক্কা।'এখানে দুজনেরই পারস্পরিক সম্পর্কের কথা রয়েছে।
মালোদের ঘরে ঘরে রয়েছে জাল বোনার সরঞ্জাম,সুতো বানানর চরকা মজুত থাকে।তাই আমরা দেখতে পাই- ঘাটে বাঁধা নৌকা,মাটিতে ছড়ানো জাল,উঠোনের কোণে গাবের মটকি,ঘরে ঘরে চরকি,টেকো,তকলি- সুতা কাটার,জাল বোনার সাজ-সরঞ্জাম। এই নিয়েই মালোদের সংসার।অনন্তর মা সুতা কাটা শিখছে।"সাতদিনে চৌদ্দ নিড়ি সুতা হইল।সাতটা মোটা সুতার,সাতটা সরু সুতার"- জাল তৈরি করতে সুতো লাগে।লেখক এখানে বিভিন্ন রকমের জালের বিবরণও দিয়েছেন।তবসী ভেসাল,মালাইয়া ভেসাল,গরমা ভেসাল, নলা, ছান্দিজাল, ফাঁস ছান্দি,ডোরা ছান্দি,কাইচ্চাল ছান্দি,জগৎ বেড়।জেলে জীবনে জাল অপরিহার্য। জাল নির্মাণের কৃতকৌশল প্রত্যেক জেলেরই জানতে হয়।বিভিন্ন জাল বিভিন্ন ঋতুতে,বিভিন্ন মাছের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই প্রয়োজন অনুসারে জেলে- বাড়ির বউ- ঝিরা জাল নির্মাণের কাজে হাত দেয়।তাই জাল লোক ঐতিহ্যের অন্যতম শিল্প।
উপন্যাসে গোকর্ণহাট গ্রামের কিশোরীদের মাঘমণ্ডল ব্রত উদযাপনের কথা রয়েছে।দীননাথ মালোর মেয়ে বাসন্তী মাঘমণ্ডলের ব্রতী।তার মা,মেয়েকে আলপনা আঁকার কাজে সাহায্য করতে চায়।কিন্তু ঘোড়া,পাখি ইত্যাদি আঁকা তার কাছে সহজ কাজ নয়।তাই সে সুবল ও কিশোরের সাহায্য চাইছে।বাসন্তীর মা বলছে," উঠানজোড়া আলিপনা আকুম,অ বাবা কিশোর,বাবা সুবল,একটা ঘোড়া আর কয়টা পক্ষী আইক্যা দেও।"বাংলার মেয়েরা যেকোনও উৎসবকে কেন্দ্র করে মাটির উঠোনে বা মাটির মেঝেতে আলপনা এঁকে থাকেন।আলপনায় আঙুলের কাজই মুখ্য।হাতের মুঠোয় ধরা থাকে রঙে ভেজান নেংড়া।হাতের চাপে ভেঁজা ন্যাকড়া থেকে পিটুলি গোলা জল নিয়ে আলপনা আঁকা হয়।
লোকজীবনে লোকবাদ্যের ব্যবহার যে 'তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাসে রয়েছে তা এড়িয়ে যান নি।গানের সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে লোকবাদ্যের প্রচলন হয়েছিল।উপন্যাসে আমরা যেসমস্ত লোকবাদ্যের উল্লেখ পাই সেগুলো হল- করতাল,গোপীযন্ত্র, ঘুঙুরা,খঞ্জনি, রসমাধুরী, সারিন্দা, কাঠের তৈরি ঢোলক, তবলা, হারমোনিয়াম, বাঁশি, বেহালা ইত্যাদি।
নদী তীরে বসবাসকারী মানুষের জীবনে লৌকিক দেব- দেবীর স্থান থাকবে সে তো স্বাভাবিক। তাই গবেষণা এই দিকটিও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।উপন্যাসের নয়াবসত অংশে রয়েছে দেবী চণ্ডীর কথা।আবার রয়েছে বাও চণ্ডী নামে লৌকিক দেবতা যনি বাতাসের সঙ্গে আসেন।তিনি অশুভ বার্তা বহন করেন।বিশেষ করে শিশুদের।সুতরাং এর জন্য ঝাড়ফুঁক, তূকতাক,জলপড়া চিকিৎসায় বাওচণ্ডীর প্রভাব কেটে যায়। আবার অন্য এক জায়গায় বাসন্তীর মা অনন্তকে লক্ষ্য করে বলছে-" শত্তুর শত্তুর, ইটা আমার শত্তুর।অখনই মরুক।সুবচনীর পূজা করুম"।সাধারণত শুভ কাজ করার জন্য 'সুবচনীর ব্রত' পালন করা হয়।এই সুবচনী হলেন লৌকিক দেবতা।
লোকক্রীড়া লোক খেলা বলতে আমরা বুঝি হাডু- ডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, ছু কিৎ কিৎ,কাবাডি, ইত্যাদি প্রভৃতি। এইগুলো কোনও রকম উপাদান ছাড়াই খেলা হয় আমরা আমাদের লেখার শুরুতে যে অনুশীলনের কথা লোকক্রীড়ায় বলেছি তার কথা অদ্বৈত মল্ল বর্মণ তাঁর এই মহাআখ্যানের মধ্যে নিয়ে এসেছেন এবং তুলে ধরেছেন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। কেননা মানুষ খেলা করে ক্রীড়া পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যায়,তার আদিম যে জীবনের তরঙ্গ তাকে স্মরণ করার জন্যে।মানুষ আগে মৃগিয়ায় নামত। আত্মরক্ষার জন্য তারা পশু শিকার করতেন কিন্তু পরবর্তী সময় যখন তথাকথিত সভ্যতার রথ আরও অনেকটাই অগ্রসর হল তখন শিকারের ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াল অনেকটা মাংস খাওয়ার থেকে বা আত্মরক্ষার থেকে যত না তার চেয়েও অনেকবেশি মানুষের ভেতরকার যে আদিম রিপু ক্রোধ এবং হিংসা তাকে পরিপুষ্ট করার জন্য।ফলে শিকার রয়ে গেল।পরবর্তী সময় মানুষের এই অমানবিক কাজের ফলে পশুকূলের বা জন্তু জানোয়ারের মধ্যে অনেক প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল বা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল মানুষের এই ভয়ানক আচরণে। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম আইন করে শিকার নিষিদ্ধ করা হল এবং সংরক্ষিত জঙ্গল তৈরি করা হল এবং সেখানে অভয়ারণ্য হিসেবে বলা হয় যাকে সেখানে পশুকূলকে যাতে তারা ঠিকঠাক করে তারা নিজেদের বংশ বৃদ্ধি করতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল।যদি আমরা ভারতের ইতিহাস আলোচনা করি তাহলে দেখব বৌদ্ধ যুগে মৃগদাব ছিল।তার আগের যুগে ছিল ব্যাপক শিকার এবং হিংসা।ময়ূর,হরিণ, কৃষ্ণসার,বাঘ,বনুশূকর সমস্ত কিছুই মানুষ নির্বিচারে হত্যা করত নেহাতই খাওয়ার জন্য বা নিজের হিংসার যে বহিঃপ্রকাশ তাকে চরিতার্থ করার জন্য।পরবর্তী সময় মৃগদাব তৈরি করা হল বুদ্ধের সময় এবং ভারত ভূমিতে অভয়ারণ্যের যে ধারণা তা কিন্তু বুদ্ধদেব এবং তার অনুগামীদের রচিত। তাঁর অনুশাসনেও শিকার প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গেল আবার শিকার ফিরে এল মুঘল যুগে,পাঠান যুগে। এবং পরবর্তী সময়ে যিখন ইংরেজরা ভারত দখল করল তখন নতুন করে এই শিকারকে আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।এই শিকারের যে অবশেষ সেটাই হল লোকক্রীড়ার অঙ্গ।আমরা যদি কাবাডি,হাডুডু বা অন্য খেলাগুলোকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব সেখানে কোনও উপাদান নেই।ব্যাট বল কিছুই নেই। যা আছে তা হল মানুষের শক্তি, মানুষের শক্তির কৌশল, পায়ের জোর,হাতের জোর,দৌড় ইত্যাদি প্রভৃতি।
তিতাস একটি নদীর নামে যে মহতি আখ্যান তাতে লেখক এই লোকক্রীড়াকে যে মালো পাড়া বা মালো জীবন বা মৎসজীবীদের যে বেঁচে থাকা তার মধ্যেই মিশিয়েছেন। সুখ-দুঃখ,আনন্দ-আহ্লাদ,বিষাদ এবং কষ্ট তার মধ্যেও মানুষ যে আনন্দের প্রদীপকে জাগ্রত করেন তার একটা অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে এই লোকক্রীড়া। এই লোকক্রীড়ার মধ্য দিয়ে শরীর এবং মন যেমন মজবুত শক্তিশালী ও দৃঢ় হয় তেমনই মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে যেহেতু খেলার আর অন্য কোনও উপাদান নেই,বল নেই,ব্যাট নেই তাই, স্টিক নেই,কিচ্ছু নেই সেইগুলো মানুষের একটা প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্নতার একটা উপাদান তৈরি করে যা যোগাযোগ তৈরি করে।এবং এর মধ্য দিয়েই লোকক্রীড়া আমাদের দেখিয়েছেন অদ্বৈত মল্ল বর্মণ।
লোকক্রিড়া হল লোকজীবনের অন্যতম অঙ্গ। 'রামধনু' অংশে লোকক্রিড়াগুলোর মধ্যে রয়েছে গোল্লাছুট,পুতুলের ঘরকান্নার খেলা।ছোটবেলা উদয়তারা নদীর পারে গাছের তলায় ছেলেদের 'গোল্লাছুট' খেলতে দেখেছে।আর উদয়তারা নিজে নয়নতারা ও উসমানতারার সঙ্গে 'পুতুলখেলা' ও 'লাইখেলা' খেলেছে।লাইখেলা হল জলকেন্দ্রিক খেলা।এই খেলায় জল ভরা নদী,পুকুর চাই। আর খেলোয়ারকে ভালো করে ডুব সাঁতার জানতে হবে।জলের মধ্যে দুই বা ততোধিক খেলোয়ার থাকে। একজন ছড়া কাটে।" লাই- ফটিক নিয়ে যাই।" এখানে মহার্ঘ বস্তুটি হল ফটিক বা স্ফটিক। ছড়া কেটেই স্ফটিকের মালিক ডুব দেয় এবার বিপক্ষ খেলোয়ারদেরও ডুব সাঁতারে স্ফটিকের অধিকারীকে স্পর্শ করতে হবে।স্পর্শ করলে স্ফটিক হস্তান্তরিত হয়।এইভাবেই খেলার প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
লোকগণিতের ব্যবহার করেছে কাদির।সে বাজারে আলু নিয়ে এসেছে।আলুগুলো একজন পাইকারের কাছে বিক্রি করেছে সে।'কাদির বড় এক পাইকার পাইয়াছে।খুচরো বিক্রিতে ঝামেলা।অবশ্য দুই চারি পয়সা করিয়া মণেতে বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু মণামণি হিসাবের বিক্রি তার চাইতে অনেক ভালো।" মণ শব্দটি লৌকিক শব্দ এবং হিসাবের একক।মণের বহুবচনে মণামণি শব্দটির ব্যবহার ঘটান হয়েছে।
নদী বা নদ আপন সুরে বয়। তার দুপাশে গড়ে উঠে জনপদ,খেলাঘর, মন্দির,মসজিদ, গীর্জা,সমাধিক্ষেত্র, শ্মশানভূমি।নদী আপন খেয়ালে বইতে থাকে। নদীর স্রোতের সঙ্গে সঙ্গেই হয়তবা তৈরি হতে থাকে লোকজীবনের নতুন নতুন তরঙ্গ।নদী তরঙ্গের সঙ্গে তা মিশে যায় এক হয়ে।নদী তরঙ্গের যে প্রভাব তার সবটুকু এসে পড়ে লোকতরঙ্গের ওপর।এবং তার গান,তার নাচ,তার খেলা, তার পুতুল খেলা,তার পূজাআর্চা,তার নায়রী বিদায় বা নায়রী সম্ভাষণ, তার আকাশ বাতাস চর্চা সবটাই হয়ে উঠে নদী কেন্দ্রিক। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আখ্যানকার,বাংলা সাহিত্যে তো বটেই।তিনি তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের মধ্যে এই লোকচর্চার যে নানা দিগন্ত তোরণ,তার দরজা জানলা খুলে দিয়েছেন, সেটাকেই অদ্বৈত মল্ল বর্মন নিজের মতো করে গবেষণা যুক্ত নিরীক্ষা ও নিরিখ দিয়ে তুলে এনেছেন আমাদের সামনে।আমরা নতুন করে দীপ্ত হয়েছি।আমরা নতুন করে আবিষ্কার করেছি অদ্বৈত মল্ল বর্মণ- এর এই ভুবন ও ভুবন কেন্দ্রিক যাত্রাপথ।
0 comments: