Next
Previous
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in




















২৫

ব্যারাকের গার্ডরুমে ক্যাম্পের চিফ টেবিলে উপুড় হয়ে মাথা রেখে একদম ঘুমিয়ে পড়েছিল। দু’ জনে গিয়ে দাঁড়াল তার সামনে। ক্লান্ত হাসি হেসে বলে উঠল তারা… ‘আমরা এসে গিয়েছি।‘

চিফ মাথা তুলে আড়মোড়া ভাঙে। হাই তুলে বলে … ‘বেশ!’ তারপর ঝিমোতে ঝিমোতেই একটা সিগারেট ধরায়। মাথার চুলের মধ্য দিয়ে আঙুল চালায়। মাথায় পরে নেয় টুপিটা। কোমরের বেল্টটা আঁটসাঁট বেঁধে নেয়। আয়নায় দেখে নেয় একবার নিজের মুখটা। চোখের কোণ থেকে পিচুটি সাফ করে ফেলে।

-‘কত?’ প্রশ্ন করে সে।

-‘সাতষট্টি’ উত্তর দেয় শ্র্যোডার… এক তাড়া কাগজ টেবিলে রাখে।

-‘এগুলো কি? বাকিগুলো?’

-হ্যাঁ, বাকিগুলো।

-তারপর, আর সব খবর কি?

-আমরা আজ রাতেই বেরিয়ে যাব।

-আজই? নিশ্চিত?

-একদম। হাওয়া গরম হয়ে উঠছে।

-কোনদিকে?

-গ্রেটার জার্মানি। ওস্‌টমার্ক ডিভিশন।

-ঘুমোতে যান। --- বলে চিফ হাসেন…

-‘আরেকটা কঠিন রাত আসছে। আমরা ঠিক সন্ধে সাতটা নাগাদ বেরব।’

-‘ক্যাম্পের কী খবর?’ প্রশ্ন করে প্লোরিন।

চিফ মাথার টুপি খুলে মাথার এলোমেলো চুল সাবধানে আঁচড়ে নিলেন। ডান হাত দিয়ে কপালের উপরে তার বাদামি রঙের চুলের টেরি ঠিকঠাক করলেন। তিনি বেশ সুদর্শন, সুঠাম চেহারার যুবক। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন…

-ক্যাম্প? আর কোনো ক্যাম্প নেই। আজ সন্ধের মধ্যে আর কোনো ক্যাম্প থাকবে না--- সব খালি হয়ে যাবে।‘

-‘খালি?’ প্রশ্ন করে প্লোরিন। সে বসে পড়ে। জামার হাতা দিয়ে বন্দুকের উপরে হালকা হালকা টোকা দেয় সে। বন্দুকটা কেমন যেন ভেজা স্যাঁতসেঁতে ঠেকছে।

-‘খালি’ -চিফ মুচকি হাসবার চেষ্টা করেন। কাঁধ ঝাঁকান… ‘আমি আপনাকে বলছি খালি- সেটাই যথেষ্ট নয় কি?’

-‘অন্য কোথাও পাঠানো হয়েছে?’ শ্র্যোডার প্রশ্ন করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। সে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত।

‘দুচ্ছাই!’… বলেন চিফ… ‘আমায় একলা থাকতে দিন দয়া করে। আমি বলেছি খালি। ব্যস। কোথাও পাঠানো হয়নি। সব খালি। কেবল ওই কয়ারের গানের ক্ষ্যাপামিটা ছাড়া।’ মুচকি হাসেন চিফ… ‘যেখানে পাঠাও, যেখানে টেনে নিয়ে যাও… সঙ্গে যাবে।’

‘ওহ!’ দুজনে সমস্বরে বলে ওঠে। শ্র্যোডার বলে… ‘বুড়ো সত্যিই গান নিয়ে একদম ক্ষ্যাপা!’ তিনজনে সমস্বরে হেসে ওঠে।

‘চলি তাহলে’ বলে ওঠে প্লোরিন… ‘আমাদের বাক্স তাহলে ওখানেই থাকুক। আর নেওয়া যাচ্ছে না।’

‘হ্যাঁ, ওখানে রেখে দিন। উইলি ব্যবস্থা করবে।’

‘বেশ, আমরা এগোলাম’… দুজন ড্রাইভার বেরিয়ে যায়।

চিফ মাথা নেড়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। সবুজ ফার্নিচার ট্রাকের দিকে তাকায়। সেটা ক্যাম্পের রাস্তায় পার্ক করা আছে। ক্যাম্পটা একদম সুনসান। ওই ট্রাকের পেছনের দরজাটা এখনও খোলা হয়নি। একঘণ্টা পরে প্রধান ফিল্ড অফিসার ফিল্‌স্‌কাইট এলে তবে খোলা হবে।

ফিল্‌স্‌কাইটের চুল কালো। মাঝারি উচ্চতা। তার ফ্যাকাসে এবং বুদ্ধিমান চোখমুখ দেখলেই মনে হয় যে একজন দায়িত্বশীল মানুষ। খুব নিয়মানুবর্তী, আইন মেনে চলা মানুষ সে; কোথাও কোনো রকম ঢিলেমি সে বরদাস্ত করে না। শৃঙ্খলা ছাড়া আর কিচ্ছুটি সে বোঝে না।

ফিল্‌স্‌কাইট ক্যাম্পে ঢুকে সবুজ ট্রাকটার দিকে একঝলক তাকায়। দরজায় প্রহরী তাকে অভিবাদন জানায়। সে সোজা গার্ডরুমের দিকে যায়। চিফ তাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট করে।

‘কত?’ প্রশ্ন করে ফিলসকাইট।

‘সাতষট্টি, হের অফিসার!’

‘বেশ! এক ঘণ্টার মধ্যেই গানের ব্যবস্থা করতে হবে।’… বলে উদাসীন ভঙ্গিতে ফিল্‌স্‌কাইট কাঁধ ঝাঁকায়। গার্ডরুম থেকে বেরিয়ে ক্যাম্পের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে থাকে সে। ক্যাম্পটা বর্গক্ষেত্রের আকারের। চার দিকে চারটে ব্যারাক। দক্ষিণের ব্যারাকে একটা ছোট ফাঁক আছে। সেখানেই ক্যাম্পের প্রধান প্রবেশপথ। চার কোণে চারটে নজরমিনার আছে। একদম মাঝখানে রান্নাঘরের ব্যারাক। তারপরে পায়খানা। তারপর ক্যাম্পের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে চানঘর। চানঘরের পাশেই শ্মশানের চুল্লিঘর। ক্যাম্পটা একদম সুনসান। শুধু উত্তরপূর্ব কোণের নজরমিনারে যে দাঁড়িয়ে আছে, সেই প্রহরী নিজের মনে নরম সুরে গান গেয়ে যাচ্ছে। ওই গানের শব্দটা ছাড়া ক্যাম্পটা একেবারে নিস্তব্ধ।

হালকা নীলচে ধোঁয়া উঠছে রান্নাঘরের ব্যারাকের চিমনি থেকে এবং মেঘের মত বিশাল পুঞ্জ পুঞ্জ কালো ধোঁয়া উঠছে শ্মশানের চুল্লিঘরের চিমনি থেকে। ভাগ্য ভালো যে দক্ষিণে বেশ জোর বাতাস দিচ্ছে। বাতাসের বেগে ধোঁয়াটা সরে যাচ্ছে দক্ষিণে। অনেকক্ষণ ধরেই চুল্লিঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে মেঘের মত… বেশ ঘন কালো মেঘ, চতুর্দিক অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। ফিল্‌স্‌কাইট সবকিছুর তদারক করে দেখে একবার। তারপর সে নিজের অফিসে ঢুকে পড়ে। রান্নাঘরের পাশেই তার অফিস। টেবিলে নিজের টুপিটা রেখে সন্তোষজনক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। সব কাজ ঠিকঠাক চলছে। সব কাজ সুসম্পন্ন হচ্ছে, এই চিন্তায় তার মুখে একটু হাসি খেলে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ফিল্‌স্‌কাইট হাসে না। সে কখনই হাসে না। সে জীবনকে খুব গুরুগম্ভীর দৃষ্টিকোণে দেখে। নিজের কাজকে জীবনের থেকেও বেশি গুরুত্ব দেয় এবং শিল্প সংস্কৃতি নিয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবে চিন্তাভাবনা করে থাকে।

প্রধান ফিল্ড অফিসার ফিল্‌স্‌কাইট সংস্কৃতি এবং সঙ্গীত অত্যন্ত ভালবাসে। তার মাঝারি উচ্চতা, কালো চুল, ফ্যাকাসে এবং বুদ্ধিদীপ্ত চোখমুখ দেখে তাকে কেউ কেউ সুদর্শন মনে করতেই পারে; কিন্তু তার বেশ বড় এবং চৌকো চোয়ালের জন্য তার মুখটা অতিরিক্ত বড় দেখায়, এবং এই চোয়ালের জন্যই তার বুদ্ধিদীপ্ত চোখে মুখে একটা অদ্ভুত ভীতিপ্রদ হিংস্র অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা যায়। ফিল্‌স্‌কাইট এককালে সঙ্গীতের ছাত্র ছিল। সে সঙ্গীত অত্যন্ত ভালোবাসতো, অথচ তার মধ্যে ধৈর্য, স্থিরতা, প্রশান্তি এবং পরিতৃপ্তির লেশমাত্র ছিল না। সেই গুণগুলো আবার একজন সঙ্গীত পেশাদারের ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয়। অবশেষে সে ব্যাঙ্কের কেরানি এবং সঙ্গীতের এক বিদদ্ধ সমঝদার বনে যায়। কয়ার গাওয়া তার বিশেষ প্রিয় ছিল। সে অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ, বেশ ভরসাযোগ্য। অচিরেই কেরানি থেকে থেকে বিভাগীয় প্রধান হয়ে উঠল। কিন্তু তার আসল প্রেম ছিল সঙ্গীত, কয়ার গাওয়া এবং শুধুমাত্র পুরুষপ্রধান কণ্ঠের সমবেত সঙ্গীত। বহুকাল আগে সে এমজিভি কনকর্ডিয়া প্রতিষ্ঠানে কয়ার পরিচালক ছিল। তখন তার বয়স মোটে আঠাশ। কিন্তু সেসব পনেরো বছর আগের কথা। তার বিশেষ অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আসলে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যপূরণের জন্য তার মত এরকম নিবেদিতপ্রাণ মানুষ পাওয়া মুশকিল। কোনো সঙ্গীত পেশাদার রাজি হয়না এত দায়িত্ব নিতে। কনসার্টের সময় তার সরু হাতের চলন এবং আর ফ্যাকাসে মুখের কুঞ্চন, ঠোঁটের নড়াচড়া… এসব ভঙ্গি একদম দর্শনীয় ছিল। স্বরলিপি পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করত সে। কারো এতটুকু ভুলচুক তার নজর এড়িয়ে যেত না। সে একেবারে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধাত মহড়ার সময়ে। শোনা যায় যে ভালো ভালো গায়করা তার উপরে ক্ষেপে ওঠে দুর্ব্যবহারের কারণে এবং সবাই একজোট হয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানায়। অবশেষে কম্পানি তাকে বরখাস্ত করে আরেকজন পরিচালক নিয়োগ করে। একই সময়ে সে আবার গির্জার কয়ারও পরিচালনা করত, যদিও বিধিবদ্ধ ধর্ম উপাসনা, স্তোত্রগান এসব বিষয়ে তার বিশেষ ভক্তিভাব ছিল না। কিন্তু কয়ার ভালোবাসত বলে সে গির্জার গানের দলের পরিচালনার ভার নিয়েছিল।

গির্জার প্রধান পাদ্রি যিনি ছিলেন, তাকে মানুষ ‘সন্ত’ বলে মান্য করত। তিনি একটু সরল, শান্তশিষ্ট গোছের মানুষ ছিলেন। কালেভদ্রে তাকে রুষ্ট হতে দেখা যেত। বৃদ্ধ, সাদা চুল এই মানুষটির সঙ্গীতের ব্যাকরণ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান না থাকলেও কয়ারের রিহার্সালে সব সময় উপস্থিত থাকতেন, কখনো কখনো মুচকি হাসি লেগে থাকত তার মুখে। ফিল্‌স্‌কাইট ওই হাসিটা দুচক্ষে দেখতে পারত না। এক অদ্ভুত প্রীতিময় হাসি, সমবেদনার হাসি, ব্যথাতুর হাসি হাসতেন ওই পাদ্রি। মাঝেমধ্যে অবশ্য তার মুখটা থেকেও হাসি উধাও হয়ে এক গম্ভীর ভাব চলে আসত। ক্রমে ফিল্‌স্‌কাইটের ধর্মীয় স্তোত্র, উপাসনার প্রতি বিরাগ এবং ওই পাদ্রির হাসির প্রতি ঘৃণা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। পাদ্রির ওই হাসিটা যেন বলছে- ‘কোনো কারণ নেই, তবুও আমি তোমায় ভালবাসি!’

দরকার নেই অমন ভালোবাসার। সময়ের সংগে সঙ্গে ফিলসকাইটের বিরাগ এবং ঘৃণা বাড়তে লাগল। কনকর্ডিয়ার কাজটা চলে যাওয়ার পরে একই সঙ্গে সে গির্জার কাজটাও ছেড়ে দিল। সে বহুবার ভেবে দেখেছে পাদ্রির ওই হাসিটা নিয়ে। কেমন যেন ছায়াময় কঠোর ভাব, কেমন যেন অহেতুক পিরিতি ‘ইহুদী’ মার্কা হাসি। হ্যাঁ, সে মনে মনে ওই হাসিটাকে ‘ইহুদী’ মার্কা হাসি বলে নামকরণ করেছে। প্রেম একেবারে চুয়ে চুয়ে পড়ছে। কী প্রশান্তি ভাব! হাসিটা তার বুকের ভেতরে ছুরির মত ছিঁড়েখুঁড়ে ফালাফালা করে দিত।

কনকর্ডিয়াতে তার পরে যে লোকটা এসেছিল পরিচালক হয়ে, সে বিয়ার খেত, সিগার খেত, নোংরা ঠাট্টাইয়ার্কি করত। ফিলসকাইট এই সবকিছুকে ঘেন্না করত। সে ধূমপান করত না। মদ্যপান করত না। মহিলাদের সম্পর্কে কিচ্ছুটি ভাবত না। জাতির উৎকর্ষ বিষয়ে হিটলারের আদর্শ তাকে অনুপ্রাণিত করল। তার গোপন ভাবনাচিন্তার সঙ্গে এই আদর্শের অনেক মিল খুঁজে পেল সে। সে শীঘ্রই যোগ দিল হিটলারের যুব বাহিনীতে। খুব তাড়াতাড়ি সে অঞ্চলের নেতা হয়ে উঠল। সেখানে গিয়ে সে আবার সুযোগ পেল তার সঙ্গীতপ্রীতি ঝালিয়ে নেওয়ার। তৈরি করে ফেলল গানের দল।

সে ডুসেলডর্ফের শহরতলির ব্যারাকের মত একটা সাধারণ ছোট বাসায় থাকত। বাড়িতে সময় পেলেই, সঙ্গীত এবং জাতিগত উৎকর্ষের বিষয়ে পড়াশুনায় সে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিল। তার এই দীর্ঘ গবেষণামূলক পড়াশুনার পরে তার সব ভাবনা একটা পেপারের আকারে লিপিবদ্ধ করেছিল সে। শিরোনাম দিয়েছিল ‘সমবেত সঙ্গীত ও জাতির পারস্পরিক সম্পর্ক’। পেপারটা পাঠিয়ে দিয়েছিল রাজ্যের সঙ্গীত বিভাগে। কিন্তু কিছু বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যের সঙ্গে সেই গবেষণামূলক কাজটি একেবারে প্রত্যাখ্যাত হয়। অনেক পরে ফিলসকাইট জানতে পারে যে সেই বিভাগের প্রধানের নাম নয়মান, আর সে ছিল এক ইহুদী।

(চলবে)