Next
Previous
0

প্রবন্ধ - সেবিকা ধর

Posted in





লোকসংস্কৃতি ও লোকজীবন ধারাবাহিক বসবাসের মধ্য থেকে উঠে আসে।সেই লোকসংস্কৃতিকে নিয়ে চর্চা যাঁরা করেন, তাঁরা লোকসংস্কৃতিবিদ।কিন্তু সাধারণ মানুষও নিজের জীবন ধারার গতিময় পথ ও পথের চিহ্নকে অনুসরণ করে তৈরি করতে থাকেন নানা ধরনের অনুষঙ্গ।এবং লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন ব্যাখ্যা, বিভিন্ন পর্যায়, বিভিন্ন সময়ের মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে এসে হাজির হয়।

লোকসংস্কৃতি হল এমন এক নদী, যে নদীর ধারাবাহিকতা আমরা খুঁজে পেতে হলে তার উৎসে যেতে হয়।উৎস থেকে যদি আস্তে আস্তে গড়িয়ে গড়িয়ে আমরা নীচে নামি নদীর ঘর্মে- নদীর গতিধারায়, তাহলে দেখব এর একটা অদ্ভুত প্রয়াস এবং যাপন রয়েছে, যার থেকে আমাদের সময়কে আমরা বের করে আনতে পারি এবং কখনও পারি না।বহুমাত্রিক এই লোককথা, লোকবৃত্তের কাহিনি ত্রিপুরার লোকজীবনের সঙ্গেও ওতপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে আছে।

আমরা যদি ত্রিপুরার লোকজীবন ও লোকবৃত্তকে ভালো করে অনুসন্ধান করি তাহলে গবেষণার দৃষ্টি থেকে অথবা সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে তাকে বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে বুঝব, যে সময় এবং সময়োত্তর যে প্রস্তুতি, তা ক্রমশ ক্রমশ আরও নিবিড় পাঠের দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে।এই নিয়ে যাওয়াটা লোকবৃত্তের প্রত্যেকটি ছোট গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।তা বহুমাত্রিকতার ব্যাখ্যা এবং ব্যাঞ্জনা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের জীবনে এবং জীবনোত্তর অভিঘাতে।
আমরা যারা অনেকেই শহুরে মানুষ, শহরে বসবাস করি , তাদের পক্ষে সবসময় লোকবৃত্তের‍ লোকায়তিক ধারাবাহিকতা বা উচ্চারণ তাকে স্পর্শ করা বা আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। তবুও আমরা নিজের মতো করে, নিজের চোখ দিয়ে, নিজের অনুভব দিয়ে একটু একটু করে বুঝতে পারি যে, সময় থেকে সময়ান্তরে চলে যাচ্ছে এই অভিঘাতময় কাহিনিগুলি, যাকে ধরতে ধরতে,স্পর্শ করতে করতে এক বহুমাত্রিকতার ব্যঞ্জনা তৈরি হতে থাকে আমাদের মনের মধ্যে, এই নির্মাণ বা নির্মাণ কুশলতা নিয়ে। একটি কাহিনি আমরা এখানে উপস্থাপন করছি।
সুন্দরী ত্রিপুরার প্রকৃতির কোলে বিভিন্ন ধরনের রঙ-বেরঙের পাখি বাস করে।তারা সমস্ত অরণ্যভূমিতে একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ায়।এতো স্বাধীনতার পরেও মাঝে মাঝে পাখিদের নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি হয় অশান্তি।স্বভাব ধর্মে শক্তিমান পাখিরা দুর্বল পাখিদের ওপর হামলা করে।তারা নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারেনা।একদিন তুলনায় দুর্বল পাখিরা মিলিত হয়ে শক্তিশালী বয়স্ক একপাখির কাছে মিনতি করে বলল যে-আপনি আমাদের বাঁচান।বড়সড় পাখিদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে গেছি।এভাবে যদি আমাদের ওপর অত্যাচার চলতে থাকে, তাহলে একদিন পৃথিবীতে ছোট চেহারার পাখির অস্তিত্ব বলতে কিছুই থাকবে না।

পাখিদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান বয়স্ক এবং পন্ডিত -তারা মিলিত হয়ে বলল যে-সব প্রাণীর মধ্যে রাজা বলে একজন থাকে।রাজা সমাজকে রক্ষা করে, শাসন করে,ভালো মন্দ বিচার করে।রাজার কথা মতো সবাই নিয়ম মেনে চলে।একমাত্র পাখিদের সমাজে রাজা বা প্রধান বলে কিছুই নেই।রাজা ছাড়া সমাজ সুন্দরভাবে চলতে পারে না।এমন সিদ্ধান্ত নিতে থাকে পাখিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে।সবমসময় ঝগড়া, মারামারি চলতে থাকে, যদি কোনো রাজা না থাকে।তাই আমাদের মধ্যে সুস্থ সমাজ পরিচালনা করার জন্য কী কী করা দরকার।একজনকে রাজা নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু কাকে রাজা বলে ঘোষণা করব?
রাজা নির্বাচন করতে হলে সম্মিলিত সভার আয়োজন করতে হবে।পন্ডিতমন্য পাখিরা এই কথা চিন্তা করে সব জাতের পাখিদের নিয়ে একটি বিরাট ভোজসভার আয়োজন করে।সভায় বয়োজ্যেষ্ঠ পাখিটি সকলকে ডেকে বলল- কাকে রাজা নির্বাচন করা যায়, তা তোমরা ঠিক করবে।সভা থেকে উঠে একটি পাখি বলল যে- হুতোম পেঁচা দেখতে আকারে বড়,গাম্ভীর্য আছে চেহারায়- সুতরাং তাকেই রাজা হিসাবে নির্বাচন করা হোক।অপরদিকে অন্যান্য পাখিরা বাধা দিয়ে বলে যে - হুতোম পেঁচা কোনোভাবেই রাজা হওয়ার যোগ্য নয়।কারণ কারও সঙ্গে সে ভালোভাবে মিশতেই জানে না।তাই তারা হুতোম পেঁচার নাম বাদ দিয়ে দিলে হুতোম পেঁচা মনে মনে ভীষণ রাগ করল।

কেউ বলল কাককে রাজা নিযুক্ত করলে কেমন হয়?

অন্যদল বলে, কাক রাজা না হয়ে পরামর্শদাতা বা মন্ত্রী হয়ে থাকুক।পক্ষীকূলে সারসই বুদ্ধিমান। তাই শেষ পর্যন্ত সবার সম্মতিক্রমে সারস পাখিকে রাজা হিসাবে নিযুক্ত করা হল।বুদ্ধিমান বৃদ্ধ পাখিরাও তাদের প্রস্তাব মেনে নিল।সারস সকল পাখির রাজা হিসাবে মনোনীত হল।

রাজা হয়ে সারস সকল পাখিদের ডেকে বলল যে, যে যার গোষ্ঠীকে নিয়ে মিলেমিশে একসঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা করবে।শক্তিশালী পাখিরাও দুর্বল পাখিদের ওপর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।যদি কেউ এই নিয়ম লঙ্ঘন করে, তাহলে তাকে রাজসভায় বিচার করা হবে।এবং সেই অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে।

কোকিলকে অসুস্থ পাখিদের চিকিৎসা করার দায়িত্ব দেওয়া হল।পাখিদের সমাজে কোকিল হল বৈদ্য।সে রোগীকে গণনা করে দেখে চিকিৎসা করে।কাক পাখিদের পরামর্শদাতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হল।আর হলুদ পাখি দূত বা বার্তাবাহক হিসাবে নিযুক্ত হল সবার সিদ্ধান্তে।এইভাবে বিশেষ বিশেষ পাখিকে বিশেষ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হল।সেদিন থেকে সারস রাজা সুশৃঙ্খলভাবে পাখিদের পরিচালনা করতে লাগল।পাখিরাও রাজার আদেশ মেনে সুখে, আনন্দে চলাফেরা করতে লাগল।

এই যে কাহিনি এটি আপাতভাবে খুব সহজ, সরল এবং সমতল কাহিনি মনে হলেও আসলে এর মধ্যে রয়েছে মানুষের প্রবৃত্তি এবং পাখিদের প্রবৃত্তি মিলিয়ে একটা মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা,যা আমাদের সামনে উঠে এসছে।আমরা বুঝতে পারছি শুধুমাত্র পাখিদেরই চরিত্রই নয় এরমধ্যে নিহিত আছে, মনুষ্য চরিত্রও।

এক জুমিয়া বন কেটে টিলা ভূমিতে ধান ও অন্যান্য ফসলের বীজ বুনেছিল। জুমে যখন ফসল পাকতে শুরু হল, তখন লোকটি দেখল যে, কারা যেন জুমের ফসল চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। চোরকে ধরবার জন্য দিনের পর দিন তারা পাহারা দিল।অথচ চোর আর ধরা পড়েনা।ধান ও অন্যান্য ফসল ঠিকই চুরি হয়ে যাচ্ছে।জুমিয়া ও তার ছেলে যুক্তি করে বলল যে, আমরা এবার রাত্রিবেলা পাহারা দিয়ে দেখি চোরকে ধরা যায় কি না।জুমিয়ার ছেলেটি মাটি দিয়ে খুব শক্ত করে গুলতি- গুলি তৈরি করে রোদে শুকিয়ে নিল।এরপর গুলতি (যা দিয়ে গুলি ছোঁড়া হয়)ও গুল্লি নিয়ে জুমের এক কোণায় ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পাহারা দিতে লাগল।রাত্রি ঘুটঘুটে অন্ধকার হঠাৎ কী যেন উড়ে আসার শব্দ শোনা গেল।জুমিয়া ছেলেটি গুলতি- গুলাইল নিয়ে মারবার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।একটু পরেই দেখা গেল বিরাট আকারের পাখি ক্ষেতে নেমে ফসলগুলো ছিড়ে নিচ্ছে।ছেলেটি পিছন থেকে পাখিটার দিকে তাক করে গুলতি বা গুল্লি ছুঁড়ে দিল।সঙ্গে সঙ্গে শক্ত মাটির গুলতি- গুল্লি পাখিটির গুহ্যদ্বারের ভিতর ঢুকে গেল।গুলতি-গুল্লিটি ঢুকে এমনভাবে আটকে গেল যে পাখিটার পেটের ভেতরেও ঢুকছে না, বাইরেও আসছে না।ব্যথায় ছটফট করতে করতে কাতর হয়ে সে তার নিজের বাসায় গাছের কোটরে ফিরে এল। সেদিন থেকে সে আর গাছের কোটর থেকে বাইরে আসছে না।

একদিকে চুরি করে ধরা পড়ার লজ্জা,অপরদিকে প্রচন্ড ব্যথায় ভিতরে ভিতরে ছটফট করছে।কাউকে কিছুই বলতে পারছে না।এই চোর পাখিটি আর কেউ নয়- সে হুতোম পেঁচা।রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি জুমের ফসল চুরি করতে গিয়ে সে গুলি বা গুল্লি খেয়েছে।
পাখিদের মধ্যে সবসময় নিয়ম নির্দিষ্ট সময়ে সভা করা।যখন সম্মিলিতভাবে সভা বসে তখন পাখি উঠে রাজাকে জানিয়ে দিল যে, কয়েকদিন হল পেঁচা সভায় যোগ দিচ্ছে না।মন্ত্রী কাক এই কথা শুনে বলল, পেঁচার কী হয়েছে তা খোঁজ নিয়ে দেখা দরকার।পাখিদের খবরদাতা হল হলুদ পাখি।যে বাড়িতে অতিথি আসবে সেই বাড়ির গাছের ডালে বসে রউপ্যং,রউপ্যং বলে অনবরত ডেকে সে অগ্রিম জানান দিয়ে যায়।

মগ ভাষায় রউপ্যং শব্দের অর্থ হল পৌঁছে যাবে।অর্থাৎ অতিথি পৌঁছে যাবে।সারস হলুদ পাখিকে পেঁচার খবর নেওয়ার জন্য পাঠাল।

হলুদ পাখি পেঁচার বাসায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখল যে,সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। বেশ কয়েকদিন ধরে কিছুই খেতে পারছে না। তাই প্রচন্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে। ব্যথায় কাতর হয়ে সে কথাও বলতে পারছে না।হলুদ পাখি রাজার কাছে পেঁচার দুরাবস্থার কথা বিস্তারিতভাবে জানিয়ে দিল।রাজা মন্ত্রী কাককে ডেকে বলল - পেঁচাকে সুস্থ করতে হবে।রাজা কোকিলকে আদেশ দিল যে, পেঁচাকে চিকিৎসা করার জন্য তার বাসায় যেতে।কোকিল পেঁচার বাড়ি গিয়ে তার জ্যোতিষ বিদ্যা প্রয়োগ করতে হবে।সে জ্যোতিষ বিদ্যা প্রয়োগ করে দেখল যে - পেঁচার এখন মঙ্গলের দশা। অর্থাৎ মঙ্গল গ্রহের দোষ লেগেছে। সুতরাং তাকে এখন খুব ঠান্ডা জায়গায় তিন দিন তিন রাত্রি জলে ডুবে থাকতে হবে।নিরুপায় হয়ে পেঁচা কোকিলের কথায় নেমে পড়ল।শুধু মুখটি ওপরে রেখে সমস্ত শরীর জলে ডুবিয়ে তিন দিন তিন রাত্রি কাটাল।এদিকে কোকিল মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকে।

মগ জাতির ভাষায় 'কং' শব্দের অর্থ হল 'ভালো হয়ে যাও'। তিন দিন তিন রাত্রি জলে ডুবে থাকার পর পেঁচার মলদ্বারে আটকে থাকা মাটির গুলতি- গুল্লিটি সম্পূর্ণভাবে গলে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।পেঁচাও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।

পেঁচা সুস্থ হলে কোকিল পাখিও তার স্ত্রী নিজের বাসায় ফিরে যায়।বাসায় গিয়ে দেখে তাদের ছোট্ট বাচ্চা বাসা থেকে নীচে পড়ে মারা গেছে।অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের বাচ্চাদের হারাতে হল-তাই কোকিল ভীষণ দুঃখ পেল।দু দিন পর কোকিল বৈদ্য পেঁচার কাছে চিকিৎসা করার সাম্মানিক চাইতে গেলে পেঁচা তাকে কোনো দামও দিল না।কোকিল বৈদ্যের হয়েছে ভীষণ বিপদ।একদিকে তার সন্তান মারা গেল - অন্যদিকে রোগীকে সুস্থ করে তোলার দামও ফিরে পেল না।তখন বাধ্য হয়ে কোকিল চিকিৎসক রাজার কাছে গিয়ে পেঁচার বিরুদ্ধে নালিশ করল।রাজার আদেশে হলুদ পাখি পেঁচাকে ডেকে নিয়ে এল।রাজা পেঁচাকে চিকিৎসা করার দাম না দেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে পেঁচা বিচার সভায় সব অস্বীকার করে বলে, কোকিল তাকে চিকিৎসা করে নি।সে নিজ বুদ্ধি বলে চিকিৎসা করে সুস্থ হয়েছে।তাই সে কোকিলকে চিকিৎসা করার কোনো পারিশ্রমিক বা সাম্মানিক দেবে না।

পেঁচার কথা শুনে কাক ভীষণ রেগে যায়।সভার মধ্য থেকে কিছু পাখি উঠে বলে যে- মিথ্যাবাদী পেঁচার চেহারা যেমন কুৎসিত, তেমনি মনও বিশ্রী। অন্যান্য পারিষদরাও বলে সে একটা আস্ত চোর,অকৃতজ্ঞকে মেরে ফেলা উচিত।

সবশেষে রাজা সারস বাধা দিয়ে বলে যে, না পেঁচাকে মেরে ফেলা ঠিক হবে না।তাকে সমাজচ্যুত করে দেব।যেহেতু সে সমাজের নিয়মকানুন মেনে চলছে না, সুতরাং তাকে আর পাখিদের সমাজে রাখা যাবে না।সভার মধ্যে রাজা ঘোষণা করল, হুতোম পেঁচাকে সমাজ থেকে বহিষ্কার করে দিলাম।আজ থেকে সে কোনো পাখির সঙ্গে মেলামেশা বা চলাফেরা করতে পারবে না।

পেঁচা রাগে ও অপমানে কটমট করে একবার রাজার দিকে একবার মন্ত্রী ও পারিষদদের দিকে তাকায়।কিন্তু কেউ তাকে সহানুভূতি জানাল না। সবাই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তার দিকে চেয়ে আছে।অবস্থা বেগতিক দেখে পেঁচা চুপচাপ উড়ে গেল।সেদিন থেকে সে আর কারও সঙ্গে মেলামেশা করার সুযোগ পেল না।লজ্জা ও ভয়ে সে সারাদিন লুকিয়ে থাকত।সন্ধ্যে বেলায় সব পাখিরা বাসায় ফিরে ঘুমাতে গেলে তখন চুপিচুপি খাবারের সন্ধানে বাইরে আসত।তখন থেকেই পেঁচার দিনের জীবন শেষ হল শুরু হল নৈশ যাপন।

অন্যদিকে কোকিলের দুরবস্থা দেখে সবার তার প্রতি খুব মায়া হল।কোকিল যাতে সুখে -শান্তিতে থাকতে পারে, এমন ব্যবস্থা করে দিতে হবে বলে সব পাখিরা রাজার কাছে অনুরোধ করল।রাজা সারস তখন ঘোষণা করে দিল যে, আজ থেকে যেখানে খুশি ডিম পেড়ে আসবে।যে পাখির বাসায় ডিম পেড়ে আসবে সেই বাসার পাখি কোকিলের ডিমগুলিকে ফুটিয়ে বাচ্চাগুলিকে লালন- পালন করে তুলবে।বাচ্চাগুলো বড় হয়ে স্বাবলম্বী হলে যেখানে খুশি উড়ে চলে যাবে।রাজা কোকিলকে ডেকে বলল যে - তোমার কাজ হবে সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে পাখিদের সুখ-শান্তির গান শুনিয়ে যাওয়া। কারর কোনো অসুখ হলে তাকে সুস্থ করে তুলতে হবে।শান্তি ও প্রেমের গান শুনিয়ে সবার মনে আনন্দ দেবে তুমি।এতবড় গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব নিয়ে কোকিল সঠিকভাবে সংসারের দিকে নজর দিতে পারবে না।থাকার জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করতে পারবে না।তাই সমস্ত পাখিরা কোকিলের বাচ্চাদের লালন- পালন করার দায়িত্ব নিতে হবে।রাজার আদেশ সব পাখিরা সানন্দে গ্রহণ করল।
সেদিন থেকে কোকিলরা নিশ্চিন্তে এক দেশ থেকে অন্যদেশে ঘুরে ঘুরে শান্তি ও প্রেমের গান শুনিয়ে বেড়ায়।মগ আদিবাসীদের ভাষায় কং রং মানে ভালো হয়ে যাওয়া।পাখিটি সারাদিন কংরং কংরং বলে ডাক দিয়ে যায়।অর্থাৎ সবাই ভালো হয়ে যাও,সবাই ভালো হয়ে যাও।

কোকিলের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই তার মধুর সুরে সত্যিই সব পাখিরা মনে সুখ- শান্তি ফিরে পায়।সারা বছর ঝড় বৃষ্টি, বাধা -বিপত্তির পর বসন্ত ঋতুতে সকল প্রাণীদের মনে কোকিলের গানের তালে তালে আনন্দ ও প্রেমের বন্যা নেমে আসে।সব মানুষ তার গান শুনে বেদনা ভুলে গিয়ে আনন্দে আপ্লুত হয়।কোকিলের ডাকে প্রকৃতিও সাড়া দিয়ে নতুন প্রাণ ফিরে পায়।গাছে গাছে নতুন নতুন অজস্র রঙবেরঙের ফুল ফোটে,ফুলের গন্ধে ভ্রমর ছুটে আসে।পাখিদের কূজনে, ভ্রমরের গুঞ্জনে, মানুষের মনের আনন্দে ফুলে ফুলে ভরা পৃথিবীকে তখন অপূর্ব সুন্দর দেখায়।সত্যিই কোকিলের ভালো হয়ে যাওয়ার মন্ত্রে প্রকৃতির সব কিছু ভালো হয়ে যায়।এমনি করে সে প্রতি বছর ফিরে ফিরে আসে এবং সকলকে ভালো হয়ে যাওয়ার গান শুনিয়ে যায়।সময় হলে সে যেকোনো পাখির বাসায় ডিম পেড়ে চলে যায়।আর সেই বাসার পাখি কোকিলের ডিম ফুটিয়ে বাচ্চাদের স্বাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত লালন -পালন করে।তখন থেকে আজও সেই নিয়ম চলছে।

এই যে ত্রিপুরার লোককথাটি তাতে পাখি এবং পাখিদের অনুষঙ্গ নিয়ে মনুষ্য জীবনের যে অপার রহস্য, যার কথা আমরা শুরুতেই অনেকটা বলেছি, তার বিশ্লেষণ এবং বিবরণ দেওয়া হল।কোকিল বৈদ্য হল,কোকিল প্রেমের গায়ক হল কোকিল অন্যের বাসায় ডিম পেড়ে সকলকে শান্তির গান,আনন্দের গান, প্রেমের গান শোনাতে লাগল। এরকম মানুষ বহু আছেন আমাদের সমাজে, আমাদের চারপাশে, যাঁরা এভাবেই জীবন কাটান।আবার হুতোম পেঁচার মতো স্বার্থকেই প্রধান করে, স্বার্থপর হয়ে, পরশ্রীকাতর এরকম জনেদের আমরা চারপাশে দেখতে পাই।তারাও তাদের ধর্মমতো কাজ করে যায়।উপকারির উপকার স্বীকার করে না।এবং খানিকটা যেন লজ্জা বোধই করেন, উপকারির উপকার স্বীকার করতে।এদের কৃতজ্ঞতা বোধ একেবারেই নেই।তারা তাদের মতো করে,যেই তাদের কাজটি হাসিল হয়ে যায়, নিজের কাজটি যখন সারা হয়ে যায়, তখন উপকার যিনি করেছিলেন সেই পুুুরনো মানুষটিকে আর চিনতে পারে না, মুখ ঘুরিয়ে নেয়।এদের কৃতঘ্ন বলা উচিত। এই কৃতঘ্ন এবং নীচ মনুষ্যরূপী জীবেরা আমাদের চারপাশেই বর্তমান। তাই আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন এবং সারস রাজার মতো প্রজ্ঞা এবং জ্ঞানবান বিদ্বান ধৈর্য্যশীল মানুষ তাঁরাই সমাজের নেতৃত্ব দেন এবং সকল মানুষের কথা তাঁরা বলতে পারেন,ভাবেন এবং সুষ্ঠভাবে সমাজ যাতে চলে তার কথাও তাঁরা সবসময় ভেবে থাকেন।