Next
Previous
Showing posts with label গল্প. Show all posts
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in








শেষ পর্ব



পরের দিন সকালে অফিসে বসে এক কাপ চা খেয়ে থানার দিকে যাবার জন্য যখন

তৈরি হচ্ছেন পানু রায় এবং সুন্দরী তখন পানু রায়ের ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনের

ওপারে মনীষা।

-আপনি কোথায়, মিঃ রায়?

-অফিসে, কী হয়েছে? তোমায় এত উত্তেজিত লাগছে কেন?

-সাঙ্ঘাতিক কান্ড হয়েছে। আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেছি। আমি কি আসবো আপনার

কাছে?

-আগে শান্ত হও। কী হয়েছে বলো। তারপর বলছি। এই অবস্থায় এত দৌড়োদৌড়ি করা

ঠিক নয়।

-আমি আজ সকালে অফিসে এসেছি। একটা পুরনো ফাইল খুঁজে বের করার জন্য

একবারে নিচের একটা ড্রয়ার যেখানে অনেক পুরনো ফাইল থাকে সেটা খুলেছিলাম।

খুলে যা দেখলাম তাতে আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করেছে।

-শান্ত হও। কী দেখেছ?

-একটা রক্তমাখা তোয়ালে। রক্ত জমে কালো হয়ে গেছে। আমি এটা নিয়ে এখন কী

করবো? আপনার কাছে নিয়ে যাব? নাকি যেখানে ছিল সেখানে রেখে ড্রয়ার বন্ধ করে

দেব? আমার মাথা কাজ করছে না।

-তুমি একটু অপেক্ষা করো। তোমার কোথাও আসার দরকার নেই। দরকার হলে আমি

তোমার কাছে আসছি। শান্ত হয়ে বসো।

পানু রায় ফোন রেখে সুন্দরীকে বললেন,’আমি পেয়ে গেছি। ওরা আমার ছোঁড়া গুলিটা

পায়নি কিন্তু আমি রক্তমাখা তোয়ালে পেয়েছি। ওটাই আমার অস্ত্র।‘

-দাদু, আমি মাথামুন্ডু কিছুই বুঝছিনা।

-বোঝার দরকার নেই। মন দিয়ে শোনো। আমি এটাই বলবো যে ছোটকালী আমরা

যেটাকে ছোট বন্দুক বলছি সেটা নিয়ে রেবার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিল। ইতিমধ্যে

রেবা দেখেছে যে বড় বন্দুকটা যেটা বড়কালী তাকে দিয়েছিল সেটাতে একটা গুলি কম

আছে। এটা দেখে রেবা নিশ্চিত হয়েছিল যে বড়কালীই শিবুলালকে খুন করেছে।

সেইজন্য আমরা চলে যাবার পর রেবা ছোট বন্দুকটাকে সরিয়ে বড় বন্দুকটা একই

জায়গায় রেখে দিয়েছিল। পরের দিন পুলিশ এসে বড় বন্দুকটা দেখতে পায় এবং সেটা




পরীক্ষা করে দেখে তাতে একটা গুলি কম এবং মনের আনন্দে চলে যায়। আমি

জিজ্ঞাসা করবো আর একটা বন্দুক তাহলে কোথায় গেল?

-তারপর কী করবে দাদু? তুমি তো পুরো ব্যাপারটা গুলিয়ে দিতে চাইছো মনে হচ্ছে।

-হ্যাঁ, তাই। আমি বলতে চাইছি যে কেলো দারোগা যে তত্ত্ব খাড়া করতে চাইছে তার

মধ্যে অনেক ফাঁক আছে। এর ভিত্তিতে চার্জসিট দাখিল করা যায়না। তারপর আমি

এলিনাকে ডেকে পাঠাবো। অন্য কাউকে ডেকে পাঠালে কেলো দারোগা বলতে পারে

আমি সময় নষ্ট করছি। কিন্তু এলিনার বিরুদ্ধে ভুয়ো বিল পেমেন্ট করার অভিযোগ

আছে। ইতিমধ্যে জগাই এবং তুমি গিয়ে রক্তমাখা তোয়ালে সমেত মনীষাকে থানায়

নিয়ে আসবে। তারপর সবাই দেখবে এই বুড়োহাড়ে ভেল্কি।

-দাদু, অসাধারণ। তোমার গল্প বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে হচ্ছে। আসলে আমারও মনে

হচ্ছে তুমি যা বলছো সেটাই ঘটেছে। রেবা বড়কালীকে ভালোবাসে বলে তাকে বাঁচাতে

চাইছে এবং নিজের ঘাড়ে দোষটা চাপাতে চাইছে।

-তুমি যখন বিশ্বাস করছো, ওরাও করবে। আর একটা বন্দুকের হিসাব যদি ওরা দিতে

না পারে তবে আমার তত্ত্বকে খারিজ করার অস্ত্র ওদের কাছে নেই। ওরা রেবাকে

আবার জেরা করতে শুরু করবে কিন্তু রেবা মুখ খুলবে না আমি নিশ্চিত। রেবা নিশ্চয়ই

চাইবে না তার কোনও কথায় বড়কালীর কোনও ক্ষতি হয়। তোমরা মনীষাকে নিয়ে

এসো। আমি থানায় যাচ্ছি।

পানু রায় থানায় ঢুকে কেলো দারোগাকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ আমি এলিনাকে থানায়

নিয়ে আসার জন্য একটু আগে আপনাকে ফোন করেছিলাম সবার সামনে কারণটা না

বলার জন্য। আশা করি আপনি এলিনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।‘ কেলো দারোগা বললো,’

এলিনাকে ফোন করে জানলাম সে আশে পাশেই একটা বিউটি পার্লারে আছে। এক্ষুনি

এসে যাবে। ভাগ্যিস! না হলে চুপচাপ সবাইকে বসে থাকতে হতো। আপনার যা গোঁ!’

-দেখুন দারোগাবাবু আপনার তত্ত্বে এত ফাঁকফোকর যে একটা যুক্তিগ্রাহ্য

চার্জসিট দাখিল করা যাচ্ছে না। দেখাই যাক না কিছু পাওয়া যায় কি না।

পানু রায়ের কথা শেষ হতে না হতেই এলিনা ঘরে ঢুকলো। পানু রায় বললেন,’ আসুন

এলিনা। আপনাকে একটু বিব্রত করলাম। বসুন, দু-একটা প্রশ্ন করেই ছেড়ে দেব

আপনাকে।

-একটু তাড়াতাড়ি করুন। আমার অনেকগুলো কাজ আছে।




-বেশ, আপনি কৃষ্ণকালীর অফিসে সেক্রেটারির কাজ করার আগে অন্য কোথাও

সেক্রেটারির কাজ করেছেন? সেক্রেটারি হিসাবে আপনার একটা কাজ হচ্ছে বিল

পেমেন্ট করা এবং ভাউচার তৈরি করা। ঠিক?

-হ্যাঁ, ঠিক।

-আপনি মাঝে মধ্যেই চেক তৈরি করে কৃষ্ণকালীকে দিয়ে সই করাতেন। কিন্তু চেক

তৈরি করার আগে নিশ্চয়ই বিলগুলো পরীক্ষা করে দেখতেন যে বিলগুলো ঠিক আছে

কি না? কাজগুলো হয়েছে কি না? জিনিসগুলো পাওয়া গেছে কি না? ইত্যাদি।

-হ্যাঁ, অবশ্যই।

-তাহলে বলুন আপনি অ্যাকমে ইলেক্ট্রিকের নামে যে সব চেক তৈরি করেছিলেন সে

সব চেক কোথায় গেল? অ্যাকমে ইলেকট্রিকের ঠিকানা ভুল এবং ভুয়ো। আপনি

সেটাও পরীক্ষা করেন নি কেন?

-না, না বিশ্বাস করুন ওর থেকে আমি একটা পয়সাও পাইনি। শিবুলাল পুরোটাই…

-কে? শিবুলাল? কেন ওকে টাকা পাঠাতেন আপনি? কাঁদবেন না, বলুন। যা সত্যি তাই

বলুন।

-শিবুলাল আমাকে বলেছিল যে ওর নতুন হোটেলে আমাকে কাজ দেবে। ও আমাকে

ঠকিয়েছে। ও আমাকে বলেছিল সিনেমায় চান্স করে দেবে। কিচ্ছু করেনি। আমাকে

লোভ দেখিয়ে আমাকে দিয়ে অন্যায় কাজ করিয়েছে। আমাকে ভাঁওতা দিয়েছে।

এলিনার কথা শেষ হওয়ার আগেই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো জগাই, সুন্দরী এবং

মনীষা। মনীষার চেহারার দিকে তাকিয়ে কেলো দারোগা এবং পানু রায় শশব্যস্ত হয়ে

উঠলো। তাড়াতাড়ি সকলে মিলে ধরাধরি করে মনীষাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল।

মনীষার হাত থেকে একটা কাপড়ের প্যাকেট হাতে নিয়ে সেটা খুলতে খুলতে নাটকীয়

ভাবে পানু রায় বললেন,’ এলিনা, শিবুলালকে গুলি করার পর আপনি একটা তোয়ালে

দিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত মুছে তোয়ালেটা আপনার ব্যাগে রেখেছিলেন। তারপর

অফিসে এসে একটা পুরনো ফাইল ক্যাবিনেটে ওটা লুকিয়ে রেখেছিলেন। তারপর

কৃষ্ণকালী যখন কোট খুলে রেখে বাথরুমে গেল তখন আপনি কোটের পকেট থেকে বড়

বন্দুকটা বের করে লকারে রাখলেন আর লকার বন্দুকটা রাখলেন কৃষ্ণকালীর

কোটের পকেটে। আমি কি ঠিক বলছি?’ এলিনা খানিকক্ষণ হাঁ করে পানু রায়ের মুখের

দিকে তাকিয়ে রইলো তারপর হাউহাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলো। পানু রায় বললেন,’

আপনি নিজে বলবেন না আমি বলবো?’




-আমি লকার থেকে বন্দুকটা নিয়ে শিবুলালের কাছে গিয়েছিলাম ওকে ভয় দেখাবো

বলে। কিন্তু কথা কাটাকাটি হতে হতে ও আমার গলা চেপে ধরে। আমার দম বন্ধ হয়ে

আসছিল। নিজেকে ওর হাত থেকে ছাড়াবার আমার আর কোনও উপায় ছিল না। আমি

প্রথমে বুঝতে পারিনি ও মারা গেছে। মেঝেটা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। আমার জুতোয়

রক্তের দাগ দেখে সামনে থেকে একটা তোয়ালে নিয়ে রক্ত মুছে ওটা কোথায় ফেলবো

বুঝতে না পেরে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিই। তারপর অফিসে ফিরে তোয়ালেটা একটা পুরনো

ফাইল ক্যাবিনেটে রেখে অপেক্ষা করতে থাকি কৃষ্ণকালীবাবুর। উনি অফিসে এসে

কোটটা খুলে বাথরুমে গেলেন। আমি সেই ফাঁকে লকারের বন্দুকটা ওনার কোটের

পকেটে ঢুকিয়ে ওনার পকেটের বন্দুকটা লকারে রেখে দিই।‘ কথা শেষ করে দু’হাতে

মুখ চাপা দিয়ে বসে রইলো এলিনা। পানু রায় বললেন,’ দারোগাবাবু। বাকিটা আপনার

কাজ।‘ কেলো দারোগা হাত জোড় করে বললো,’ আপনার ধারে কাছে পৌঁছতে আমার

বহুদিন লাগবে। আদৌ পৌঁছতে পারবোনা কোনওদিন মনে হয়।‘ পানু রায় হাসতে হাসতে

বললেন,’ আমার এখন যা বয়স সেখানে পৌঁছতে আপনার আরও চুয়াল্লিশ বছর

লাগবে। ততদিনে আমি এবং আপনি দু’জনেই থাকবো না। আজ চলি ।‘

সুন্দরী কেলো দারোগার দিকে তাকিয়ে বললো,’ একে বলে বুড়োহাড়ে ভেল্কি। ঘুঘু

দেখেছেন,

ফাঁদ তো এখনও দেখেননি।‘

পানু রায়ের অফিসে সেদিন সন্ধ্যাবেলা একে একে জগাই, কৃষ্ণকালী আর রেবা এসে

জড়ো হলো। সুন্দরী অফিসেই ছিল। সকলের জন্য চা-কফি আর স্ন্যাকসের অর্ডার

দিয়ে পানু রায়ের পাশে এসে বসলো। পানু রায় রেবাকে বললেন,’ আপনি আমাকে

সত্যিটা বলতেই পারতেন।‘ রেবা বললো,’ আমি ঠিক করেছিলাম আমি কাউকেই কিছু

বলবো না। আমি সেদিন দেখেছিলাম কৃষ্ণকালী শিবুলালের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেল।

উনি আমাকে দেখেননি। পরে যখন উনি আমাকে ওনার বন্দুকটা দিয়ে গেলেন আমি

দেখলাম ওটাতে একটা গুলি কম আছে। আমি ভাবলাম কৃষ্ণকালীই কাজটা করেছে।

আমার মনে কোনও সন্দেহ রইল না। তারপরে আপনি যখন কালীকৃষ্ণকে সঙ্গে করে

নিয়ে এসে ওর বন্দুকটাও আমাকে দেবার ব্যবস্থা করলেন তখন আমার মনে হলো

যদি পুলিশ এসে কোনও কারণে যদি বড় বন্দুকটা আমার কাছে চায় আমি যাতে তখন

ছোট বন্দুকটা দিয়ে দিই। কিন্তু আমার মনে হলো ছোট বন্দুকটার জায়গায় আমি যদি

বড় বন্দুকটা একই ভাবে রেখে দিই তাহলে পুলিশ জানবে ঐ বন্দুকটা কালীকৃষ্ণ

আমাকে দিয়েছিল। কালীকৃষ্ণ সেটা মেনেও নেবে। আর যেহেতু কালীকৃষ্ণ কোনও

ভাবেই এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে যুক্ত নয় পুলিশের কিছুই করার থাকবে না। তাই

আপনারা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বড় বন্দুকটা নিয়ে এসে ঠিক যেমনভাবে

কালীকৃষ্ণ ছোট বন্দুকটা রেখে গিয়েছিল সেইভাবে রেখে দিলাম। ছোট বন্দুকটা নিয়ে




গিয়ে রান্নাঘরে আটার বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলাম। কিছুক্ষণ পরে বাইরে বেরিয়ে

একটু দূরে একটা জায়গায় যেখানে একটা নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছিল তার সামনে ডাঁই

করে রাখা সিমেন্টের স্তূপের নিচে ঢুকিয়ে রেখে এলাম।‘

কৃষ্ণকালী বললো,’ আমি জানতাম না তুমি আমাকে দেখেছ। আমি তো একটা

হেস্তনেস্ত করার প্ল্যান নিয়ে শিবুলালের ফ্ল্যাটে গেলাম। ও আমাকে দরজা না

খুলেই জানিয়ে দিল যে দশ মিনিটের মধ্যে জরুরি কাজে কেউ আসবে এবং আমার

সঙ্গে দেখা করা সম্ভব নয়। আমার মনে হচ্ছে এলিনা তখন ভিতরে ছিল। আমি বলে

এলাম আমি রাত্রে আবার আসবো। আজ একটা হেস্তনেস্ত হবেই।‘

পানু রায় বললেন,’ তার মানে আমি যখন শিবুলালের সঙ্গে কথা বলছিলাম তখন একটা

ফোন এল। ও আমাকে বললো দু মিনিটের মধ্যে কেউ আসবে এবং আমি যেন তক্ষুনি

বেরিয়ে যাই। আমি সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে লক্ষ্য রাখতে শুরু করলাম কে

আসছে। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পর্যন্ত কাউকে দেখতে না পেয়ে চলে গেলাম। আমার

মাথায় তখন আসেনি যে পিছনের সিঁড়ি দিয়ে কেউ উপরে উঠে পিছনের দরজা দিয়ে

ভেতরে ঢুকতে পারে।‘

কৃষ্ণকালী বললো,’ এখন আমি পুরো ব্যাপারটা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। এলিনা

পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকেছিল। শিবুলাল ওকে চেকগুলো দেবার জন্য চাপ দিচ্ছিল। সে

এলিনাকে বলেছিল অনেকগুলো শো দেবে। এলিনা ওর অদক্ষতার জন্য নয় শিবুলালকে

টাকা পাইয়ে দেবার জন্য সবকিছু করতে রাজি ছিল। শিবুলাল যে ওকে ঠকাচ্ছে সেটা ও

আগে বোঝেনি।‘

রেবা বললো,’ আমি ওপরে গিয়ে বেল বাজালাম।কেউ খুললো না। হ্যান্ডেলে চাপ দিতেই

দরজাটা খুলে গেল। ভিতরে গিয়ে দেখলাম শিবুলালের মৃতদেহ রক্তে ভাসছে। আমার

মাথা কাজ করছিল না। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার জুতো রক্তে মাখামখি।

বাথরুমে গিয়ে জুতো ধুলাম। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখি হাতে রক্ত। ভালো করে হাত

ধুয়ে পিছনের দরজা দিয়ে নিচে নেমে এলাম। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। কথা বলতে

পারছিলাম না। যেহেতু আমার দৃঢ় ধারণা ছিল যে কৃষ্ণকালীই খুন করেছে আমি চুপ

করে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।‘ কৃষ্ণকালী বললো,’ আর তুমি আমাকে বাঁচানোর

জন্য নিজে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে রাজি হয়ে গেলে? ‘ রেবা বললো,’ সে তো

বলবেনই। আপনার যেই মনে হলো যে আমি খুন করেছি আপনি পুরো ব্যাপারটা

এমনভাবে সাজালেন যাতে মনে হয় আপনি খুনী।‘ সকলে হো হো করে হেসে উঠলো।

কৃষ্ণকালী বললো,’ ঠিক আছে, এটা নিয়ে পরে কথা বলা যাবে। আপাতত জানাতে চাই

যে আমি মিঃ রায়কে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক দিতে চাই। আমি জানিনা ওনার ফি কত

হওয়া উচিৎ। সেটা ঠিক করার দায়িত্ব ওনাকেই দিলাম আরও অনেক দায়িত্বের




মতো।‘ পানু রায় হেসে বললেন,’ ঠিক আছে। সুবিচারের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকুন।‘ পানু

রায়ের ফোন বেজে উঠলো। কালীকৃষ্ণের ফোন।

-মিঃ রায়। অনেক অনেক অভিনন্দন। কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই। সেদিন যে

গাড়িটা নিয়ে রেবার বাড়ি গিয়েছিলাম ঐ গাড়িটার যা দাম তার অর্ধেক দামে আপনাকে

বিক্রি করতে চাই।

-ঠিক আছে এক্ষুনি আমার অফিসে আসুন। আমার কাছে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক আছে।

ওটাতে অ্যামাউন্টটা বসিয়ে নেবেন।

সুন্দরী বললো,’ দাদু, তোমার সত্যিই জবাব নেই।‘
0

গল্প - সমরেন্দ্র বিশ্বাস

Posted in




















(১)

খেয়ামতী নদীর কিনারে নতুন তৈরী হয়েছে ঈশ্বরপুর অন্ত্যেষ্টিস্থল। অতি আধুনিক তিন তিনটে ইলেকট্রিক ফার্নেসের লোকার্পণ করা হবে। আজকে এখানে উপচে পড়া মানুষদের ভীড়। এর মূল উদ্যোক্তা আসন্ন নির্বাচণে সরকারী দলের সম্ভাব্য ভোটপ্রার্থী ও মিউনিসিপ্যালিটি নেতা পবন আগরওয়াল।

শহর ও আসপাশের প্রায় হাজার খানেক লোক জড়ো হয়েছে মাঠে। মঞ্চ থেকে বেশ কিছুটা দূরে খেয়ামতী নদী। তার কিনারা ঘেসে নতুন বানানো তিন তিনটে চুল্লী। ফার্ণেসেগুলো অটোমেটিক। ওগুলোর সামনে লেখা No.-1, No.-2, No.-3! ফার্ণেসের সাইড ও পেছনের দেয়ালগুলো ঝকঝকে, স্টেনলেস স্টীলের পাতে মোড়া। বিশাল সাইনবোর্ডগুলোতে বড় বড় হরফে লেখা - “ঈশ্বরপুর আধুনিক অন্ত্যেষ্টিস্থল।” অন্ত্যেষ্টিস্থলের পাশেই বিশাল ওয়েটিং হল, সুন্দর বসবার ব্যবস্থা, স্নান করবার একাধিক বাথরুম, প্রসাধনের জন্যে সুসজ্জিত টয়লেট!

মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষক ঘোষণা করছে – ‘আপনারা সবাই সুশৃঙ্খল হয়ে বসুন। এক্ষুণিই মিনিষ্টার মহোদয় এখানে এসে পৌঁছাচ্ছেন। দেশের প্রথম অতি-আধুনিক সৎকারশালাটির উদ্বোধন হতে যাচ্ছে এই ঈশ্বরপুর অঞ্চলে! এজন্যে আমরা গর্বিত।’

– ‘এ বিষয়ে কারিগরী সাহায্য যে বিদেশী কোম্পানীটি করেছে, যার নাম ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’। তাদের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মিষ্টার রুংতাও আজকের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির আছেন। আপনারা সবাই সুশৃঙ্খল ভাবে অপেক্ষা করুন। মাননীয় মন্ত্রী এসে পৌঁছোলেই এই অন্ত্যেষ্টিস্থলের উদ্বোধন করা হবে!’

অল্পবয়েসী ছোকরা নীলমনি টিপ্পুনি কাটে – ‘জিন্দা অবস্থায় মানুষের দ্যাকভালের নাম নাই! মর্লে পরে মরা মানুষেরে দ্যাকভালের জন্যি ফারনিসের উদবোদন! হামাগো এই আজীব দুনিয়া!’


(২)

আজ সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ। মিনিষ্টার ও ভিআইপিরা আসছেন। অন্ত্যেষ্টিস্থলের উদ্বোধনের জন্যে গলাপচা ডেডবডি চলবে না! টাটকা ডেড বডি চাই। কিন্তু তা তো বললেই পাওয়া যায় না। তাই টাটকা তিনটে ডেডবডির জন্যে গতকাল থেকেই এজেন্ট ও লোকজন লাগানো হয়েছে। দালালেরা ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাছাকাছি গ্রামে - এদিকে ওদিকে, শহরের হাসপাতালে।

ইলেকট্রিক ফার্ণেসে অন্ত্যেষ্টির এই আধুনিক ব্যপারটা এখানকার মানুষজনের কাছে এখনও কিছুটা অপরিচিত। মুস্কিলটা হলো তাদের জন্মগত সংস্কার। যার সামান্যও ক্ষমতা আছে, সে চায় নিজের প্রিয়জনটিকে প্রথাগত ভাবে শ্মশানে দাহ সৎকার করবে, কিংবা মাটির নীচে কবর দেবে। সাধারণ মানুষেরা বিশ্বাস করে, দাহকার্যে খুঁত থাকলে প্রিয়জনের আত্মা মুক্তি পায় না! তারা এই আধুনিক ফার্ণেস টার্নেস বোঝে না!

অথচ এই দেশে ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’ কোম্পানীর ঈশ্বরপুর অন্ত্যেষ্টিস্থল একটা সম্মানজনক প্রোজেক্ট। আজকের ফার্ণেস-ইনাগুরেশন সাকসেসফুল হলে এ দেশে আরো অনেক বিজনেস পাওয়া যাবে। এ দেশের প্রোজেক্টটার ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিস্টার রুংতা। সে জানে, ডেড-বডি ক্রিমেশনের মার্কেট খুব ভালো! তাছাড়া তাদের কোম্পানীর সামনে থার্ড ওয়ার্ল্ডের ডেড-বডি সলিউশন-এর পুরো বাজারটাই রয়েছে!

কোম্পানীর উদ্যোগে তাই ডেডবডি খোঁজার ব্যাপারটা জোর কদমে চলছে। আজকের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একটা ডেডবডি সাপ্লাই করতে পারলে একজন এজেন্ট পাবে তিরিশ হাজার টাকা! এটা এদিনের স্পেশাল তোফা! আজকের অনুষ্ঠানের জন্যে ডেডবডির ইউনিটেক কোম্পানীই টাকাটা দিচ্ছে, এটাই তাদের বিজনেস স্ট্রাটেজি। তবে এদিনে পচাগলা মৃতদেহ চলবে না। সেগুলো হওয়া চাই তাজা, টাটকা। মরে যাবার অন্ততঃ আট-দশ ঘণ্টার মধ্যে আত্মীয় পরিজন সহ মৃতদেহ নিয়ে এখানে পৌঁছাতে হবে। লিগাল কারণে এখানে পরিজনদেরও হাজির থাকতে হবে, সই-সাবুদ ইত্যাদির জন্যে।

মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হচ্ছে, ‘বন্ধুগন, মন্ত্রীমহোদয় এয়ারপোর্ট থেকে এক্ষুনি এসে পৌঁছে যাচ্ছেন। আপনারা একটু ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করুন, প্রথম মৃতদেহটি এই জেলার ‘খুদাগ্রাম’ থেকে ইতিমধ্যেই আমাদের অন্তেষ্টিস্থলে পৌঁছে গেছে।’


(৩)

প্রথম মৃতদেহটির কাছে আজকের সকালেই এজেন্টরা সময় মতোই পৌঁছে গেছিল। ডেডবডির ব্যাপারে খবরটা ছিল পাক্কা! যেমনটা চেয়েছিল, তেমনটাই পাওয়াও গেছে!

লোকটার নাম কালোবরণ পাড়ুই, নিবাস- খুদাগ্রাম, পেশা- চাষী, সম্পত্তি- দুই বিঘা জমি ও একটা মাটির বাড়ী। পরিজন বলতে বউ, দুই আবিবাহিতা মেয়ে ও ঘরে কালোবরণের শয্যাশায়ী বাপ। ধার দেনা করে এবছর জমিতে ধান লাগিয়েছে, প্রচন্ড খরা, ক্ষেতে সেচের তেমন সুবিধে নেই। সমস্ত ধানগাছ শুকিয়ে গেছে। কালোবরণ পাড়ুই-এর নিজস্ব জমির কিনারে যেসব ফলনদার পেপে আর কলা গাছগুলো ছিলো, তাতে পঙ্গপালের ঝাঁক! পাতাগুলো সব খেয়ে ফেলে গাছগুলোকে মেরে দিয়েছে। তার উপরে ব্যাঙ্ক থেকে অনেকগুলো টাকা লোন নেয়া হয়েছে!

ক্ষোভে আর হতাশায় ভোর রাতে নিজেদের রান্না ঘরের বাঁশের সিলিং-এ কালোবরণ পাড়ুই নিজে নিজেই ঝুলে পড়েছে।

এ খবরটা বেশী রাষ্ট্র হবার আগেই দালালেরা ওই বাড়ীতে পৌঁছে গেছে। সাথে লোকটার ন্যাচারাল ডেথ সার্টিফিকেট! ওই পরিবারকে বোঝানো হয়েছে আজকে বিশেষ দিনে অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার দায় দায়িত্ব সরকারের। ওখানে দাহ করা হলে তাদের টাকা মিলবে! এতে আত্মহত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুজনিত কোনো পুলিশ কেসের ভয় নেই, অন্যান্য ঝুট ঝামেলাও নেই।

শেষমেশ মাত্র দশ হাজার টাকার বিনিময়ে মৃতদেহটি বিক্রি হয়ে গেল। কালোবরণ পাড়ুই-এর স্ত্রী ও তার অবিবাহিত ছোট মেয়েটি এজেন্টদের গাড়ীতে ঈশ্বরপুর অন্ত্যেষ্টিস্থলে যেতে রাজী হলো।


(৪)

তক্ষুনি দেখা গেল ইউনিটেক লেখা একটা সাদা গাড়ী প্রধান তোরণের ভেতরে ঢুকছে।

ঘোষকের ঘোষণা - ‘দ্বিতীয় মৃতদেহটি অন্ত্যেষ্টিস্থলে এইমাত্র ঢুকেছে। মৃতদের সম্মানে আপনারা একটু নীরব থাকবেন। আপনাদেরকে একান্ত অনুরোধ, দু মিনিট কেউ কথাবার্তা বলবেন না।’

দ্বিতীয় মৃতদেহ – রোশেনারা খাতুন ওরফে রোশনি। কিশোরী, বয়স- ১৬ বছর। ঠিকানা – ‘ভালোবাসা অনাথ আশ্রম’। ক্লাস সিক্সের ছাত্রী, আশ্রমের আবাসিক পড়ুয়া। এই অনাথ আশ্রমে কেটে গেছে তার বারো-তেরো বছর।

এক বানভাসি বন্যায় রোশেনারা খাতুনদের ঝুপড়ি ভেসে গেছিল নদীর স্রোতে। ভেসে গেছিল আম্মা আর তাদের পরিবারের বাকী সবাই। বাপ সৈয়দ মোহম্মদ তার ছোট্ট মেয়েটাকে জড়িয়ে একটা গাছের ডাল আঁকড়ে কি করে যে বেঁচে ছিল! এরপর তার বাপ- সৈয়দ মোহম্মদ- পাগল ও নিঁখোজ। সেসব কথা রোশেনারার আজ মনে না থাকাটাই স্বাভাবিক। কিছু সমাজসেবী ভলাণ্টিয়ারদের তৎপরতায় মেয়েটার জায়গা হয়েছিল ‘ভালোবাসা অনাথ আশ্রম’এ।

রোশেনারা যখন এসেছিল, তখন তার বয়স তিন। এখন সে ষোলো বছরের কিশোরী।

এই অনাথ আশ্রমের নতুন মহারাজ যিনি এসেছেন তার নজর কিছুদিন ধরে পড়েছিল এই পুরুষ্টু মেয়েটার উপর। সপ্প্রতি মহারাজ মুরারীনন্দ মহাশয় মাঝে মাঝেই এই মেয়েটাকে বিরক্ত করতো। ওর শরীরের দখল নিতে চাইতো। সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ রাত্তিরে খাবার সাথে মাদক দ্রব্য খাইয়ে নির্জন ঘরে নিয়ে গিয়ে মহারাজ মহাশয় রোশেনারাকে উপর্যুপরি রেপ করে। তার পরে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে মেয়েটাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ডোজটা বেশী ছিল। অনিচ্ছাকৃতভাবেই এই উচ্ছ্বল মেয়েটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় অনন্ত প্রভুর দিকে! মহারাজের ডাক্তারদের সাথে ঢের জানাশোনা, ওঠাবসা। খুব সহজেই স্বাভাবিক হার্টফেলে মৃত্যুর একটা সার্টিফিকেট জোগাড় হয়ে যায়।

ফুলে সাজানো ইউনিটেক লেখা একটা সুসদৃশ্য সাদা গাড়ী, সঙ্গে কোম্পানীর দালাল বা এজেন্টরা। গাড়ীতে রোশেনারা খাতুনের ডেডবডি সসম্মানে ঢুকছে ঈশ্বরপুরের অন্ত্যেষ্টি স্থলে। সেই গাড়ীতেই সাথে সাথে এসেছে আশ্রমের একজন সিস্টার অবলা দেবী। আর মুরারীনন্দ মহারাজ স্বয়ং!

এরই মধ্যে ঈশ্বরপুরের মঞ্চ থেকে ভেসে আসছে ঘোষকের কন্ঠস্বর। ‘আপনাদেরকে জানাচ্ছি, তৃতীয় মৃতদেহটি, অল্প সময়ের মধ্যেই হেলিকপ্টারে করে এখানে এসে পৌঁচ্ছাচ্ছে! আপনারা অনেকেই জানেন, এই মৃতদেহটি চেতন আগরয়ালের। দিল্লীতে একটা দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছিল।’

ধোপদুরস্ত সাদা পোষাকে মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান পবন আগরয়াল। এই ভীড়ের মধ্যে তাকে আলাদা করে চেনা যায়! তিনিই এখানে বহু আলোচিত ও সবচাইতে বেশী বিজ্ঞাপিত ‘চেতন আগরয়াল’ নামক মৃতদেহটির পিতা!


(৫)

মিঃ রুংতা এই আধুনিক সৎকারশালাটির নির্মাতা ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’-র অন্যতম ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। তিনিই এই বিদেশী কোম্পানীটির তরফে এদেশে ইনভেস্টমেন্ট ও অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সর্বময় কর্তা ।

অন্ত্যেষ্টিস্থলের একপাশে দাঁড়িয়ে পবন আগরয়াল ধীরে ধীরে থেমে থেমে কথাগুলো মিষ্টার রুংতাকে বলছিল। - ‘মাননীয় সরকার দেশের সর্বপ্রথম আধুনিক ফার্ণেসগুলো আমাদের পৌরসভাতেই বসিয়েছে। এই এলাকার মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান হিসেবে আমি অবশ্যই গর্বিত! আপনি তো জানেন, রাজধানীর একটা মর্‌চুয়ারীতে আমার ছেলের দেহটা অনেকদিন ধরে রাখা ছিল! আমার স্ত্রী আর বাড়ীর লোকেরা ছেলেটার অন্ত্যেষ্টি এভাবে এখানে করাতে রাজী ছিল নি। আমিই বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাদের রাজী করিয়েছি!’

মিঃ রুংতা – ‘উই অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড ডিসিশন পাওয়ার। আপনি ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’-এর ওয়েল-উইশার হিসেবে কাজ করছেন। আওয়ার কোম্পানী ওয়েলকাম ইউ, মিঃ আগরয়াল!’ রুংতার মনের ভাবটা এমন, তারা এই দেশে তাদের লাভজনক বিজনেসের জন্যে পবন আগরয়ালের মতো একজন যোগ্য লোক পেয়ে গেছে! ভবিষ্যতে তাকে ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’ নামক মাল্টি ন্যাশানালের কাজে লাগানো যেতেই পারে।

ঠিক তখনই একটা গাড়ীর কনভয়। কেন্দ্রীয় মিনিষ্টার আর এমএলএ গাড়ী থেকে নামলেন। পবন আগরয়াল আর মিঃ রুংতা এগিয়ে গেলেন তাদের রিসিভ করতে।

ভিআইপিদের বিশিষ্ট ও মাননীয় দলটি এগিয়ে গেলো স্টেজের দিকে। মঞ্চে বসে আছেন দেশের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী মহোদয়, এলাকার বিধায়ক, ইউনিটেক কোম্পানীর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মিস্টার রুংতা, ঈশ্বরপুর মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান পবন আগরয়াল আর এখানকার জেলা শাসক এবং আরো কয়েক জন ভিআইপি।

মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হলো,- ‘মাননীয় মন্ত্রীকে পুষ্পগুচ্ছ ও উত্তরীয় দিয়ে অভ্যর্থনা করবার জন্যে আমি ঈশ্বরপুর মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান মাননীয় পবন আগরয়ালকে অনুরোধ করছি। আমরা কৃতজ্ঞ ও গর্বিত। দেশের সর্বপ্রথম আধুনিক অন্ত্যেষ্টিস্থলটির উদ্বোধন এই ঈশ্বরপুরে সম্ভব হয়েছে, আর তা হয়েছে মাননীয় চেয়ারম্যানের অক্লান্ত উদ্যোগ ও মাননীয় সরকারের সহযোগিতাতেই! উপস্থিত বন্ধু ও মা-বোনদের অনুরোধ, আপনারা হাততালি দিন। মাননীয় ও সম্মানিত অতিথিদের স্বাগত জানান।’

উপস্থিত জনতার মধ্যে হাততালি উঠলো।


(৬)

প্রায় মাস দু-তিন আগেকার কথা। তখন দেশের রাজধানীতে চলছে ধুন্ধুমার কান্ড। কে দেশের নাগরিক, কে নয়, তা নিয়ে কিছু কানুন চালু হতে চলেছে। এই কানুনের সমর্থনে যেমন কয়েকটা সংগঠন আছে, তেমনি কানুনের বিরোধিতাতেও প্রচুর সক্রিয়তা চলছে। বিশেষত ইউনিভার্সিটি কলেজের ছেলেপুলেরা কানুনের বিপক্ষে। কিছু পুরুষ-মহিলারা রাস্তা আটকে জমায়েত করছে, ধর্ণায় বসেছে। রাজধানী জুড়ে কলেজের ছেলেপুলেরাও মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমেছে, কানুনের প্রতিবাদে।

খবরের কাগজের পাতায় সেসময় একটাই খবর। মারামারি। দাঙা - মুসলমানের হাতে হিন্দু খুন হতে যাচ্ছে। পাল্টা অভিযোগ, হিন্দুরা মুসলমানদের পাড়ায় গিয়ে পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। লোকের সম্পত্তি নষ্ট হচ্ছে। টিভি আর কাগজের সংবাদ শুনে বুড়োরা বলছে, এ কেমন ছিয়াল্লিশের রায়ট ফিরে এলো রে!

মেধাবী ছাত্র চেতন আগরয়াল দেশের রাজধানীতে, এই সময়ে একটা নামকরা ইউনিভারসিটিতে পড়াশোনা করছে। অনেক দিন ধরে সে গ্রাজুয়েট, পোষ্ট গ্রাজুয়েট ...! তারপরেও চেতনের পড়াশুনা শেষ হয় নি। একের পর এক ডিগ্রী! একাধিক বিষয় নিয়ে তার পিএইচডি - গবেষণা চলছে। বাড়ির সাথে তেমন সম্পর্ক নেই। কখনো সখনো বছরে এক আধবার নিজের বাড়ি ইশ্বরপুরে ঘুরতে আসে। যখন আসে, মা কান্না কাটি করে। বড়ভাই বোঝায় - ‘পড়াশোনা তো অনেক করলি। ঈশ্বরপুরে ফিরে আয়, আমাদের ফ্যামিলি-বিজনেসে বাবাকে হেল্প কর!’

‘তোদের এই ঘুণ-ধরা সমাজ ব্যবস্থা, এর মধ্যে মাথা গুঁজে থাকতে আমার মোটেই ভালো লাগে না!’ এরকমই চেতন-এর কাছ থেকে জবাব আসে। অগত্যা কি আর উপায়?

সেদিন রাজধানীতে একটা এন-আর-সি বিরোধী মিছিলে ছিল। চেতন আগরয়াল তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। শ্লোগান দিতে দিতে মিছিলটা এগোচ্ছিল। অনেকটা দূরে পুলিশ দাঁড়িয়ে। ঠিক তখনই রাস্তার বিপরীত দিক থেকে গোটা পাঁচ-ছয়েক জীপ আর এসইউভি এসে দাঁড়ালো। গাড়ী থেকে নামলো গোটা কুড়ি যুবক, চোখে কালো চশমা, মাথায় হলুদ পাগড়ী, মুখে রুমাল, হাতে ভোজালি, নয়তো রিভালবার।

লোকগুলো প্লান করেই এসেছিল। ওরা নেমেই মিছিলটাকে আটকালো।

‘থাম্‌। এ মিছিল আর আগে যাবে না।’

‘আমরা এন-আর-সি প্রস্তাবের বিরোধিতা করি।’

‘এন-আর-সি আইন পাশ হলে তোদের কি? বাপ তো মাসে মাসে টাকা পাঠাচ্ছে! বাপের আর সরকারের পয়সায় কলেজের হোটেলে আয়েস করছিস। মুখে বড়ো বড়ো শ্লোগান!’

ছাত্ররা মিছিল নিয়ে এগোতে চাইল।

কিছু বুঝে উঠবার আগেই বিপরীত তরফ থেকে ছুটে এলো আঘাত। গুলি চললো, ছোরা চললো। কয়েকটা লাশ পড়লো।

এর মধ্যে চেতন আগরয়াল-এর আঘাত গুরুতর। তার শরীরে মাথায় ছোরা আর গুলি দুটোই চলেছে। কিন্তু মরে নি।

আতাতায়ীরা এসেছিল, কলেজ ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের এই মিছিলটাকে উচিত শিক্ষা দিতে। যেমন করে ঝড়ের মতো তারা এসেছিল, তেমনি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে হামলাকারীর দল গাড়ী নিয়ে হাওয়া হয়ে গেল।

পুলিশেরা আক্রমণকারীদের গাড়ীর নম্বর লিখেছিল কিনা বোঝা গেল না। কিন্ত গুরুতর আহত অবস্থায় চেতন-কে তারা সরকারী হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিল। সেই সঙ্গে মিছিলের নেতা চেতন আগরয়ালের বিরুদ্ধে হামলাবাজী আর অপরাধমূলক কাজকর্মের জন্যে কেস দায়ের করা হলো।

খবরটা সংবাদ মাধ্যমে উঠতেই চারদিকে খুব হৈচৈ! প্রচুর বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনার ঝড় উঠলো!

ঈশ্বরপুর থেকে খবর পেয়ে চেতনের বাবা পবন আগরয়াল ছুটে এসেছিল রাজধানীতে। সেই সময় চেতন আই সি ইউতে! বাপের চোখে মুখে বিরিক্তি! এই অপদার্থ সন্তান তাকে আর শান্তিতে থাকতে দিল না!

প্রায় একমাস কোমায় থেকে চেতন আগরয়াল মারা গেল।

তারপরেও হয়রাণির শেষ নেই। চেতনের বডি হিমঘরে ঢুকলো। কিন্ত বডিকে তদন্তের খাতিরে সহজে ছাড়া হলো না। বডির পোষ্টমর্টেম হলো। তারপরেও বাবা পবন আগরওয়লের ইচ্ছেতেই পরিকল্পিত ভাবে চেতনের বডি অন্য আরেকটা হিমঘরে লম্বা সময়ের জন্যে সুরক্ষিত রাখা হলো!

ততদিনে তাদের গ্রাম ঈশ্বরপুরে ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’এর আধুনিক শ্মশানস্থল তৈরী হয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্যে রেডি!

নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্যে পবন আগরওয়াল দিন কয়েক আগেই ঘোষণা করলেন – নিজের এলাকা ঈশ্বরপুরেই তার নিহত পুত্রের সৎকারকার্য করা হবে। আর সেটা হবে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্ত্যেষ্টিস্থলটি উদ্বোধনের দিনেই। মাননীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর উপস্থিতিতে। পবন আগরওয়ালের গোপন ইচ্ছে কি ছিল? নিজের নাম কামাবার? শাসক দলের হয়ে আগামী নির্বাচনে ভোটে লড়বার?

তখনই আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দ। চেতন আগরয়ালের লাশ নামছে ঈশ্বরপুর শহরে। রাজধানীর একটা হিমঘর; সেখান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, চেতনের বডিটা প্রাইভেট হেলিকপ্টারে তুলে দিয়েছে পবন আগরওয়াল–এর এক আত্মীয়, ওর ইউনিভারসিটির কয়েকজন ছাত্রবন্ধু ও অনুরাগী।

তৃতীয় মৃতদেহটি হেলিকপ্টারে করে এখন ঈশ্বরপুর জনসমাবেশের পাশেই নামছে। একটা যান্ত্রিক শব্দ। তখন সমস্ত সভা ও মঞ্চ জুড়ে একধরণের সাময়িক নিস্তব্ধতা।


(৭)

মঞ্চ থেকে অনেকটা দূরে তিন তিনটে চুল্লী। উপরের জ্বলজ্বলে লেখাগুলো - “ঈশ্বরপুর আধুনিক অন্ত্যেষ্টিস্থল”।

চুল্লীগুলোর ডানধারে বিশাল সাইজের ইলেকট্রিক ট্রান্সফর্মার। খাম্বায় মোটামোটা ইলেকট্রিক কেবল। ট্রান্সফর্মার থেকে ওভারহেড ইলেকট্রিক কেবলগুলো চলে গেছে চুল্লীগুলোর দেয়ালের ভেতরে। পাম্প হাউজ থেকে ফার্নেসের গেট আর ইলেকট্রোডগুলোকে ঠান্ডা রাখার জন্যে সবুজ রঙের জলের পাইপ। পাশেই পাম্প হাউজ। অন্ত্যেষ্ঠিস্থলের ভেতরেই ঝকঝকে বিশাল ওয়েটিং হল, বাথরুম, প্রসাধন কক্ষ!

আধুনিক সৎকারশালার এক নম্বর চুল্লীতে প্রথম-প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করতে যাচ্ছে যে মৃতদেহটি, সে হলো, কালোবরণ পাড়ুই। ইতিমধ্যে এটাও রাষ্ট্র হয়ে গেছে, দীর্ঘ অসুস্থতার ফলে খুদাগ্রামে তার মৃত্যু হয়েছে গতকাল ভোর রাত পাঁচটায়। তার স্ত্রী, কন্যা ও জনৈক প্রতিবেশী-আত্মীয় এখন এই অন্ত্যেষ্টিস্থলে উপস্থিত।

মঞ্চ থেকে ঘোষক অনুরোধ জানিয়ে বললো,- ‘আমাদের নিকটবর্তী গ্রাম-অঞ্চলের বাসিন্দা কালোবরণ পাড়ুইএর অন্ত্যেষ্টি এক-নম্বর চুল্লীতে করা হবে। মাননীয় মন্ত্রী দেশমুখজীকে অনুরোধ করা হচ্ছে আপনি রিমোট টিপে ১-নম্বর চুল্লীটির উদ্বোধন করুন।’

মাননীয় মন্ত্রী উঠে দাড়ালেন। রিমোটের বাটন টিপলেন। দূর থেকে সবাই দেখলো, ১-নম্বর চুল্লীর বন্ধ দরোজাটা নিজে নিজেই অটোমেটিক খুলে যাচ্ছে। চেম্বারের ভেতর থেকে অটোমেটিক গড়িয়ে গড়িয়ে বাইরে আসছে একটা লোহার ট্রলি। চুল্লীর ভেতরটাতে গনগনে লাল!

‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’ এর ভলান্টিয়ারা কালোবরণ পাড়ুই-এর পুষ্পাচ্ছাদিত দেহটি সুসজ্জিত ট্রলিটায় শুইয়ে দিল। ধীরে ধীরে ট্রলিটা ১-নম্বর চুল্লীর ভেতরে আটোমেটিক ঢুকে গেল। তারপরে নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে গেল চুল্লীর দরোজাটা। বাইরে একটা লাল লাইট বিপ বিপ জ্বলতে নিভতে লাগলো। ইলেকট্রিক ফার্ণেসে তার দেহটা তখন পুড়তে শুরু করেছে।

কালোবরণ পাড়ুই এর স্ত্রী ও মেয়েটা তাদের শুখা চাষের জমি, গতকাল রাতে ফান্দে ঝোলা তাদের পরিবারের লোকটার কথা মনে করে হো হো করে কেঁদে উঠলো। ইউনিটেকের একজন এজেন্ট গোছের লোক ওখান থেকে স্ত্রী ও মেয়েটাকে সরিয়ে নিয়ে গেলো।

ঘোষক ঘোষণা করলেন। এরপর মাননীয় এমএলএ-র পালা। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। রিমোট–এর বোতাম টিপলেন। আগের মতোই ৩-নম্বর চুল্লীটির গেট আটোমেটিক খুলে গেল। ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’ এর ভলান্টিয়ারা দ্বিতীয় মৃতদেহটা ট্রলিটায় শুইয়ে দিল। ষোলো বছরের আবাসিক মেয়ে রোশেনারা খাতুন-এর বডিটা চুল্লীর চেম্বারে আটোমেটিক ঢুকে গেল। বাইরে বিপ বিপ করে আলো জ্বলছে। রোশেনারার শরীরটা নতুন টেকনোলজির আধুনিক আগুনে তখন ধীরে ধীরে পুড়ছে!

অনাথ আশ্রমের সিস্টারটি নিজের চোখের জল মুছলো আর হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো। অনাথ আশ্রমের মহারাজ নিজে থেকেই দূরে সরে গেলেন। ইউনিটেক এর দুজন ভলান্টিয়ার সিস্টার অবলা দেবীকে জনতার সামনে থেকে দূরে সরিয়ে নিল।


(৮)

চেতন আগরওয়াল –এর বডিটা হেলিকপ্টারে পৌঁছে গেছে। সেটাকে কাছের খালি মাঠটাতে নামানো হয়ে গেছে। প্যাকেটে মোড়া প্রায় দেড়-দুমাসের পুরানো লাশটা, একটা সুসজ্জিত গাড়ীতে করে ইউনিটেক কোম্পানীর ভলান্টিয়ারদের তৎপরতায় ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে ২-নম্বর চুল্লীর সামনে।

যেহেতু চেতন আগরওয়াল এই ঈশ্বরপুর শহরের সুযোগ্য সন্তান, যেহেতু তার পিতা এই অঞ্চলের নেতা ও মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান - তাই উপস্থিত জনতারা সবাই উঠে দাঁড়ালো। শ্রদ্ধাভরে নীরবে চেতনের মৃত আত্মাকে স্মরণ করলো।

চেতনের মা চেয়েছিল, তার ছেলের মুখটা শেষ বারের মতো একবার দেখবে। কিন্তু সবাই বাধা দিল। দুমাসের পুরাণো, মর্গে থাকা, ঠান্ডাঘর থেকে নিয়ে আসা একটা ফ্রীজার ভর্তি লাশ! হয়তো নানা রকম ভাইরাসও থাকতে পারে। এটা এখন ফ্রীজার থেকে বের করে আনা শুধু মাত্র একটা কাপড়ের প্যাকেট – লম্বা মানবাকৃতি, টেপ দিয়ে মোড়ানো। তাই এই লাশটি খোলবার বা মৃত মানুষটির মুখ দেখাবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।

মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হলো,- ‘এরপর তৃতীয় যে মৃতদেহটা আসছে, তিনি এই ঈশ্বরপুরেরই সুযোগ্য সন্তান - চেতন আগরওয়াল। তার পিতা পবন আগরয়ালের সম্মতি অনুসারে আমরা ২-নম্বর চুল্লীতে তার দাহকার্য সম্পন্ন করতে যাচ্ছি। আমার আনুরোধ, মাননীয় পবন আগরওয়াল স্যার, আপনি নিজেই দ্বিতীয় চুল্লীটির উদ্ঘাটন করবেন। আমরা এযাবৎকাল দেখেছি পুত্রই পিতার মুখাগ্নি করে থাকে! এবারে হতে যাচ্ছে স্মরণীয় ও ব্যতিক্রমী ঘটনাটি! ঈশ্বরপুরের মাননীয় চেয়ারম্যান পবন আগরওয়াল তার প্রিয় সন্তানের সৎকার করবেন রিমোট সুইচ দিয়ে, এই মঞ্চে বসেই।’

মঞ্চ থেকে ঘোষণার সাথে সাথে পবন আগরওয়াল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাকে সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা দেখাতে মঞ্চের বাকী সবাই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। অনুষ্ঠানের প্রোটোকল ও ঘোষকের অনুরোধ মতো পবন আগরওয়াল ফার্ণেসের রিমোট-বাটন টিপলো। আগের মতোই ২-নম্বর চুল্লীর গেট খুলে গেল। ইউনিটেক কোম্পানীর অ্যাপ্রণ-পরা ভলান্টিয়ারেরা কাপড়ে মোড়া একটা প্যাকেটকে ধরাধরি করে শুইয়ে দিল ২-নম্বর ফার্নেসের স্বয়ংক্রিয় ট্রলিতে। সব কিছুই অটোমেটিক। চেতন আগরওয়ালের শরীরটা ফার্নেসের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। দরোজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাইরের লাল লাল আলো বিপ বিপ করে জ্বলছে আর নিভছে!

এবার কিছু সমাপ্তিমূলক ভাষণ শুরু হবে।

মাঠের দক্ষিণ কোনে বিনা মূল্যে বোতলজাত মিষ্টি পানীয়, চা আর জলখাবারের প্যাকেট বিতরণ করা শুরু হয়েছে। অনুষ্ঠানটিকে আকর্ষনীয় করবার জন্যে সরকার আর ইউনিটেক কোম্পানীর তরফে এইসব ব্যবস্থা! কারণ বহুজাতিক কোম্পানীরা বিজনেসকে আকর্ষনীয় ভাবে পরিবেশন করতে জানে। ধীরে ঘীরে কিছু জনতা জলখাবারের লোভে মাঠের দক্ষিণ কোনের দিকেই এগোচ্ছে।


(৯)

ঠিক তক্ষুনিই প্রচন্ড বিস্ফোরণের শব্দ! লোকজনদের মধ্যে হৈহুল্লোড় শুরু হয়ে গেল! মঞ্চ থেকে তড়িঘড়ি করে নামতে গিয়ে মিনিষ্টার মহোদয় হাঁটুতে চোট পেলেন। জনগন সবাই এলোপাথারি দৌড়াচ্ছে! ফার্ণেস তিনটের মাঝখান দিয়ে আগুন গলগল করে বাইরে বেরিয়ে আসছে। বিস্ফোরণটা হয়েছে মাঝখানের ফার্ণেসটাতে। দু নম্বর চুল্লীটার ছাদ ধ্বসে গেছে। সামনের দরোজাটা বেঁকেচুরে গেছে। দরজার হা-করা ফাঁক থেকে দেখা যাচ্ছে হলদেটে আগুন, উত্তপ্ত চেম্বারের দেয়াল। ১-নম্বর ও ৩-নম্বর ফার্নেসের দেয়ালেও ফাটল ধরেছে। সেখানেও লাল গনগনে আগুনের নিশানা! চারদিকটা সাদা ধোয়ায় ধোয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে!

উপস্থিত ইউনিটেক কোম্পানীর দুজন ইঞ্জিনীয়ার ছুটে গিয়ে ট্রান্সফর্মারের বিজলি সাপ্লাই কেটে দিল। তখনো সবাই হতভম্ব! জনতারা জমায়েত ছেড়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। সবার মুখে প্রশ্ন - হলোটা কি?

ভাগ্যক্রমে ফার্নেসের কিছু ইট, স্টীলের পাত আর লোহালক্কড়গুলো বিস্ফোরণের সময়ে উড়ে গিয়ে, সামনে নয়, পেছনে দিকে নদীটার কিনারে পড়েছিল। তাই তেমন কেউ হতাহত হয় নি।

একদল পুলিশ পুরো জায়গাটাকে কর্ডন করে ঘিরে ফেলেছে।

এত বড়ো একটা আয়োজন। সরকারী আর বিদেশী কোম্পানীর একটা সম্মানজনক প্রোজেক্ট! মন্ত্রী, এমএলএ, মান্যগন্যদের নিয়ে সমস্ত আয়োজন। সবটাই এমন মাটি হলো কেন? কার জন্যে? কার জন্যে?

সেই ভাঙ্গা মেলায় কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের জটলায় একজন বললো – নিশ্চয়ই কোন উগ্রবাদী দলের কাজ!

আরেক জন কারিগরী জানা দাদা বললো, - না না এটা টেকনিক্যাল ফল্ট। ইউনিটেক কোম্পানীর সাপ্লাই আর ইরেকশনের গলতি। ফার্ণেসের গেট নয়তো হিটিং ইলেকট্রোডের কুলিং কয়েল ফেটে উত্তপ্ত ফার্নেসের গনগনে আগুনের ভেতর ঠান্ডা জল ছড়িয়ে পড়েছিল! তার জন্যেই এই ভয়ংকর বিস্ফোরণ!

- তাহলে মাঝখানের ২নম্বর ফার্নেসেই ব্লাষ্টটা হবে কেন?

আরেকজন এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, সেই অভিজ্ঞ মানুষটি হেসে বলে উঠলো – আরে বুঝলেন না? ওই ২-নম্বর ফার্নেসে চেতন আগরওয়ালের ডেডবডিতে নিশ্চয়ই কেউ বিপ্লবীমার্কা কোনো বই অথবা কোনো বিস্ফোরক-ডিটোনেটর লুকিয়ে রেখেছিল! যে ছেলেটার শব দাহ করা হচ্ছিল, সে ছিল ভোটপ্রার্থী ধান্ধাবাজদের এমনতরো লোকদেখানো অনুষ্ঠানের বিরোধী!

0

গল্প - মনোজ কর

Posted in





















২১



পরের দিন কেলো দারোগা থানায় সবাইকে ডেকে পাঠালো। এই ব্যাপারটা মেটাতে না পারলে তার ঘুম হচ্ছে না। সবাইকে উদ্দেশ্য করে কেলো দারোগা বললো,’ আমি গতকাল সারারাত ধরে একটা ছবি আঁকার চেষ্টা করেছি যা থেকে অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যাবে যে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল।‘সকলে নড়েচড়ে বসলো। কেলো দারোগা বলতে শুরু করলো,’ মেডিক্যাল পরীক্ষা থেকে বোঝা গেছে যে বন্দুকের নল শিবুলালের বুকে ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছিল। যার ফলে গুলি এবং গ্যাস দু’টোই সরাসরি শিবুলালের হৃদপিন্ড ভেদ করে শরীরের ভিতর ঢুকে যায়। রেবা কৈরালার সেদিন ঐ সময়ে শিবুলালের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। রেবা সেদিন ঐ সময় অ্যাপার্টমেন্টের সামনের দরজা দিয়ে শিবুলালের সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রবেশ করে কিন্তু অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পিছনের দরজা দিয়ে বেরোয়। আমার কাছে প্রমাণ আছে যে সে খুন করার পর শিবুলালের দেহ থেকে নির্গত রক্তের ওপর অসাবধানতাবশত পা ফেলে তারপর সেই রক্তের দাগ ধোওয়ার জন্য বাথরুমে যায়। কিন্তু রক্তের ওপর তার জুতোর ছাপ এবং বাথরুমের তোয়ালেতে রক্তের এবং জুতোর ময়লার দাগ থেকে যায়। রেবার বন্ধু কৃষ্ণকালীবাবু ঐ প্রমাণ লোপের জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। সে সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণে আমি পরে আসছি। আমার কাছে প্রমাণ আছে যে যে বন্দুক দিয়ে শিবুলালকে গুলি করা হয়েছিল তা আগে থেকেই রেবার কাছে ছিল। রেবার এবং কৃষ্ণকালীবাবুর পরম শুভাকাঙ্খী আমাদের সকলের পরিচিত এবং শ্রদ্ধেয় পানু রায় মহাশয় ব্যাপারটাকে গুলিয়ে দেবার জন্য এক অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নেন। কিন্তু খুনী বন্দুকটা শেষ অবধি রেবা কৈরালার কাছ থেকেই পাওয়া যায়। রেবাদেবী যদি এব্যাপারে আলোকপাত করেন তাহলে সুবিধা হয়। পানু রায় কেন এই খুনীকে বাঁচাবার চেষ্টা করছেন সে ব্যাপারে আমি পরে আসছি। কিন্তু আপাতত রেবা কৈরালাই যে খুন করেছে সে ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহ নেই। মিঃ রায়, আপনার কিছু বলার আছে?’

-আপনার যদি বলা শেষ হয়ে থাকে তাহলে আমি বলতে পারি। নাহলে আমি আর একটু অপেক্ষা করতে পারি। আপনি ভেবে নিয়ে আমায় বলুন।

-আচ্ছা, আমি একটা ছবি দেখাচ্ছি। ছবিটা আমার তোলা। আমি যখন রেবা কৈরালার বাড়িতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গিয়েছিলাম তখন আমি তার টেবিলে খুনী বন্দুকটা দেখেছিলাম। আমি সেটার একটা ছবি তুলে নিয়ে আসি পরে প্রমাণ হিসাবে দরকার হবে বলে।

ছবিটা পানু রায়ের হাতে দিয়ে কেলো দারোগা বললো,’ এবার আপনি বলুন।‘

-এই ছবির বন্দুকটাকেই কি আপনারা খুনী বন্দুক বলে নির্ধারিত করেছেন?

-অবশ্যই। না হলে এই ছবিটা আপনাকে দেখাচ্ছি কেন?

-বন্দুকটা যখন প্রথম দেখেন আর ছবিটা যখন তোলা হয় বন্দুকটা কি একই জায়গায় ছিল?

-হ্যাঁ, একই পোজিশনে।

-তাহলে বন্দুকটা পরীক্ষা করার আগেই ছবিটা তোলা হয়েছিল?

-হ্যাঁ, মানে ঠিক তা নয়। বন্দুকটা পরীক্ষা করার পর যেমন ছিল ঠিক তেমন করে রেখে ছবিটা তোলা হয়েছিল।

-বেশ, কী পরীক্ষা করেছিলেন?

-আমি সিলিন্ডারটা খুলে দেখেছিলাম একটা গুলি নেই। তারপর শুঁকে দেখেছিলাম কোনও গন্ধ পাওয়া যায় কি না।

-ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেবার জন্য কোনও পাউডার ছড়িয়েছিলেন?

-হ্যাঁ। তারপর বন্দুকটা যে পোজিশনে ছিল সেই পোজিশনে রেখে ছবি তোলা হয়েছিল।

-যে গুলিটা শিবুলালের শরীর থেকে পাওয়া গেছে সেটা যে এই বন্দুক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল সেটা কী করে জানা গেল? আমি জানতে চাইছি কোনও পরীক্ষা করা হয়েছিল না আন্দাজে বলছেন?

-একদম করা হয়েছিল।

-কখন করা হয়েছিল?

-কয়েক ঘন্টার মধ্যে করা হয়েছিল।

-কয়েকঘন্টা মানে কী?

-খুব একটা বেশি সময় নয়।

-কতক্ষণ? চব্বিশ ঘন্টা? আটচল্লিশ ঘন্টা?

-না, আটচল্লিশ ঘন্টা নয়।

-তাহলে চব্বিশ ঘন্টা?

-হয়তো তাই। কমও হতে পারে।

-কে বন্দুকটা আবার যে জায়গায় ছিল সেই জায়গায় রেখে দিল?

-আমিই রেখেছিলাম।

-আপনি কী করে বলছেন আপনি ঠিক সেই জায়গায় সেই অবস্থায় রেখেছিলেন?

-আমার মনে আছে।

-আপনি কি দাগ দিয়ে রেখেছিলেন?

-না, কোনও দাগ দেওয়ার দরকার ছিল না।

-যখন আপনি ঘরে ঢুকলেন এবং বন্দুকটা দেখতে পেলেন তখন বন্দুকের নলটা কোনদিকে মুখ করে রাখা ছিল? দরজার দিকে না অন্য কোনও দিকে?

-ছবিতে যেরকম দেখা যাচ্ছে সেরকম।

- ছবিটা না দেখে বলুন কোনদিকে মুখ করে রাখা ছিল? দরজার দিকে না অন্য কোনও দিকে?

- আমার এখন মনে পড়ছে না। তবে আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে বন্দুকটা রেখেছিলাম তাই তখন আমার মনে ছিল। এখন মনে পড়ছে না।

-আচ্ছা। আর একটা কথা বলুন। রেবা কৈরালা কি আপনাকে কার কাছ থেকে বন্দুকটা পেয়েছিল তার নাম বলেছিল?

- নিশ্চয়ই। সে বলেছিল মিঃ কে কে চৌধুরীর কাছ থেকে পেয়েছিল।

-ওটা নামের আদ্যক্ষর এবং পদবি। আমি জানতে চাইছি নাম বলেছিল কিনা? কেননা আপনি জানেন কৃষ্ণকালী এবং কালীকৃষ্ণ উভয়েই কে কে চৌধুরী।

- এবার বলুন রেবা কি বলেছিল যে কখন সে বন্দুকটা পেয়েছিল?

-না বলে নি। মানে ওনাকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

-আপনি রেবার অ্যাপার্টমেন্টে কখন গিয়েছিলেন?

-এগারোটা পয়ঁতাল্লিশ।

-দারোগা বাবু, আমার মনে হয় রেবার বিরুদ্ধে কেস কোর্টে পাঠানোর আগে আমরা যদি যারা এই বন্দুক, রক্তের দাগ, আঙ্গুলের ছাপ এইসব পরীক্ষা করেছিল তাদের সঙ্গে কথা বলে নিলে ভালো হয়। আমার তাই মনে হয়। আমি এবং আপনি দু’জনেই নিশ্চিত হতে পারলে কোর্টে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয়না। তা না হলে আপনি জানেন আমাদের কোর্টগুলোতে কেসের যে পরিমাণ পাহাড় জমে আছে তাতে তারিখ পেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তারপর দু’দিকের উকিলকে সবকিছু বোঝাতে আবার সময় লাগবে। দেখুন এটা আমার প্রস্তাব। সিদ্ধান্ত আপনার।

-আমাকে একটু সময় দিন। আপনারা বসুন। আমি একটু পরে এসে জানাচ্ছি।

কেলো দারোগা বেরিয়ে গেল। পানু রায় ফোনে কার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন ঠিক বোঝা গেল না। মিনিট দশেক বাদে কেলো দারোগা এসে বলে গেলেন যে উনি যারা বিভিন্ন পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের জানিয়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই এসে যাবে। একজন এলেই আবার কথাবার্তা শুরু করা যাবে। তারপর ঘুরে পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,’ আপনি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই জেলে পাঠাবো না। নিশ্চিন্তে থাকুন। তবে এবার ছাড় পাবেন না।‘পানু রায় হেসে বললেন,’ সত্যের জয় হবে। আমি বা আপনি কেউ নয়। সত্যের সন্ধানই আমাদের কাজ। কাউকে সন্দেহের বশে কোর্টে পাঠানো ঠিক নয়। তাতে যদি একটু সময় যায় সে আর কী এমন বড় ব্যাপার? ‘

কিছুক্ষণের মধ্যেই কেলো দারোগা একজন কমবয়সী সুদর্শন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকলেন। পানু রায়কে বললেন,’ ইনি সাইন্টিফিক ইনভেস্টিগেটর এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট। শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে ইনিই গিয়েছিলেন তদন্তের জন্য। যা যা পরীক্ষা হয়েছিল ইনিই সেগুলি করেছেন এবং আমাদের জানিয়েছেন। আপনি ওনাকে আপনার যা যা জিজ্ঞাসা আছে করতে পারেন।‘

পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ আপনি কি কোনও পরণের জিনিস সেদিন ওখানে পেয়েছিলেন? ‘

-হ্যাঁ, আমি একটা বাঁ পায়ের জুতো পেয়েছিলাম।যার সোল এবং হিলে রক্তের দাগ ছিল।

-আপনি কি নিশ্চিত যে ঐ দাগগুলো মানুষের রক্তের দাগ ছিল?

-না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। জুতোটা ধুয়ে ফেলা হয়েছিল। অল্প যেটুকু দাগ লেগেছিল সেটা পরীক্ষা করে বোঝা গেছে ওটা রক্তের দাগ ছিল।

-জুতোটার কোনও বৈশিষ্ট ছিল?

-ঐ জুতোর সোলটা একধরণের বিশেষ রাবার দিয়ে তৈরি। খুব দামি জুতো ছাড়া ঐ ধরণের রাবার ব্যবহার করা হয় না।

-বেশ। আপনি কি ওখানে কোনও ময়লা তোয়ালে পেয়েছিলেন?

-হ্যাঁ, আমি বলতেই যাচ্ছিলাম। ওখানে একটা তোয়ালে পেয়েছিলাম তাতে রক্তের ছাপ ছিল। বোঝা যাচ্ছিল কোনও রক্তমাখা জিনিসকে মোছার জন্য ওটা ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে খুব ভালো করে পরীক্ষা করে দেখা গেছে ঐ তোয়ালেতে জুতোর সোলে যে রাবার ছিল তার গুঁড়োও লেগেছিল।

কেলো দারোগা বললো,’ আপনি জুতোর ছাপের একটা রঙ্গীন ছবি দেখে কিছু সিদ্ধান্তে এসেছিলেন। সেটা যদি আপনি একবার মিঃ রায়কে বলেন তাহলে উনি আপনার কাছে হয়ত আরও কিছু জানতে চাইতে পারেন। ওনাকে সবদিক দিয়ে সন্তুষ্ট করার পরেই আমরা কোর্টে যাব।‘

-আমি ঐ ছবিতে দু’টো জুতোর ছাপ দেখেছি। একটা জুতোর হিল বেশ উঁচু এবং ধাতুনির্মিত। ঐ হিলের নিচে ইংরেজিতে ৩৩ লেখা আছে এবং যার ছাপ অস্পষ্ট হলেও ছবিতে দেখা যাচ্ছে। আতশ কাঁচের নিচে ধরলে লেখাটা আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ঐ জুতোটার ছাপের ওপর একটা বড় সাইজের ছেলেদের জুতোর ছাপ দেখা যাচ্ছে। এটাও বোঝা যাচ্ছে যে মেয়েদের জুতোর ছাপটার ওপরে বেশ কিছুক্ষন পরে ধরা যেতে পারে দুই থেকে তিনঘন্টা পরে। ছেলেদের জুতোর ছাপটা পড়েছে।

-আমি ধরে নিলাম আপনি দায়িত্ব নিয়েই সময়ের হিসাবটা দিচ্ছেন। আমি বলতে চাইছি কোনও এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যে ব্যাপারে আপনি একজন বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ কেবলমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে নয়।

-অবশ্যই। এটাই আমার পেশা। আমি প্রায় প্রতিদিন এই পরীক্ষা নিরীক্ষাই করে থাকি।

-বেশ, ঐ জুতোটা আপনি কোথায় পেয়েছিলেন?

-কৃষ্ণকালীবাবুর অফিসে একটা স্যুটকেসের ভিতর থেকে।

-ঠিক আছে।এবার আঙ্গুলের ছাপের প্রসঙ্গে আসা যাক। আপনি কি দেখেছিলেন এবং কোথায় দেখেছিলেন?

-শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টের সবকটা দরজার হাতলের সব ছাপ যত্নসহকারে মুছে ফেলা হয়েছিল।কেবলমাত্র একটা ছাড়া।

-কোথায় আঙ্গুলের ছাপ মোছা হয়নি? সেখানে কী দেখা গেল?

-পিছনের দরজায়। কেউ একজন সযত্নে হাতলটা মুছে তার ওপর একটা বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুলের ছাপ বসিয়ে দিয়েছে।

-ওটা কার আঙ্গুলের ছাপ ছিল?

-কৃষ্ণকালী চৌধুরীর।

-আঙ্গুলের ছাপটা কোন সময়ের বলা যেতে পারে? খুনের আগের না পরের?

- সেটা বলতে পারবো না। তবে এটা বলতে পারি যে ঐ ছাপটা বসানো হয়েছিল সমস্ত দরজার হাতল থেকে ছাপ মুছে দেওয়ার পর। যেহেতু ঐ একটি মাত্র ছাপই পাওয়া গেছে সুতরাং বলা যেতে পারে ঐ ছাপগুলো মোছা হয়েছিল উনি যখন ভিতরে ছিলেন।

-এমনও তো হতে পারে কেউ একজন সব দাগগুলো মুছে পিছনের দরজার কাছে এসে বুঝতে পারলো যে কৃষ্ণকালীবাবু পিছনের দরজা দিয়ে আসছেন তখন দরজাটা অল্প খুলে রেখে অপেক্ষা করতে থাকলো। কৃষ্ণকালীবাবু পিছনের দরজা দিয়ে ভিতরে এসে ভিতরের হাতলটা বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ঠেলে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

-না, কেননা ছাপটা ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে ওটা যত্ন করে বসানো হয়েছে। সাধারণভাবে হাতলে আঙ্গুল দিয়ে ঠেললে ঐ রকম স্পষ্ট দাগ হয় না।

-আচ্ছা, কেউতো বাইরের হাতলটা ভিতরে এবং ভিতরের হাতলটা বাইরে করে দিতে পারে?

-আপনি ঠিক বুঝিয়ে বলুন কী বলতে চাইছেন আপনি।

-দেখুন যে হাতলটা কথা আপনি বলছেন সেটা গোলাকার এবং একটা চৌকো পিনের ওপর স্ক্রু দিয়ে আটকানো। যে হাতলটা আপনি দরজার ভিতরের দিকে দেখেছেন সেটা কিছুক্ষণ আগে হয়ত বাইরের দিকে ছিল। কৃষ্ণকালীর আঙ্গুলের ছাপ হয়ত বাইরের হাতলে ছিল। কেউ পরে হাতে গ্লাভস পরে বাইরেরটা ভিতরে আর ভিতরেরটা বাইরে করে দিতে পারে। এমন সম্ভাবনা অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়ে যায় কি?

-না, উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু আপনার কল্পনাশক্তি অসাধারণ।

-কল্পনাশক্তি না সত্যকে দেখতে পাওয়ার শক্তি তা বলা মুস্কিল।

কেলো দারোগা এতক্ষণ শুনছিল। ব্যাপারটা গুলিয়ে গেল দেখে কথাটা ঘুরিয়ে বড়কালীকে জিজ্ঞাসা করলো,’ আচ্ছা, স্যুটকেসে পাওয়া জুতোজোড়া আপনার? ‘ বড়কালী বললো,’হ্যাঁ, আমার’।

-ঐ জুতোটা কি শিবুলালের মৃত্যুর দিন আপনার পায়ে ছিল?

-হ্যাঁ, ছিল।

-আপনি কি ঐ জুতোটা শিবুলালের বাড়িতে রক্তের ওপর রেখে তারপর জুতোটার রক্তমাখা সোল আর একটা মহিলার জুতোর ছাপের ওপর রেখেছিলেন?

-আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবো না।

-কেন দেবেন না?

- আমাকে ফাঁসানোর জন্য এই প্রশ্নটা করা হচ্ছে। আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবো না।

-বেশ, আপনি কি ঐ দিন শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন?

-হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।

-কখন গিয়েছিলেন?

-রাত্রি ১১টা বা ১১-৩০।

-আপনি কি ওখানে পৌঁছে একটা কাপড় বা ঐ জাতীয় কিছু দিয়ে দরজার হাতলগুলো থেকে আঙ্গুলের ছাপ মুছেছিলেন?

-এই প্রশ্নটাও আমাকে ফাঁসানোর জন্য করা হচ্ছে। আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবো না।

-আচ্ছা, ঐ দিন আপনি কি রেবা কৈরালাকে একটা বন্দুক দিয়ে বলেছিলেন যে আত্মরক্ষার জন্য বন্দুকটা তার কাজে লাগতে পারে?

-হ্যাঁ, দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম।

কেলো দারোগা একটা বন্দুক বড়কালীর হাতে দিয়ে বললো,’ দেখুন তো এটাই সেই বন্দুকটা কি না?’ বড়কালী বললো,’ মনে হচ্ছে এটাই।‘

-এবার বলুন সেদিন আপনি কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং কখন?

-আমি কাঠমান্ডু থেকে ফিরে অফিসে যাই। অফিসে গিয়ে স্নান করে, পোশাক পরিবর্তন করি।‘

পানু রায় বড়কালীকে ইঙ্গিতে চুপ করতে বলে বললেন,’ কৃষ্ণকালী আপনার আর কিছু বলার দরকার নেই।‘ তারপর কেলো দারোগার দিকে তাকিয়ে বললেন,’ আপনি এত কথা জানতে চাইছেন কেন? এটা তো ওনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনি যা জানতে চেয়েছিলেন উনি তো বলেছেন। উনি বলেছেন সেদিন ১১টা বা ১১-৩০এর সময় উনি শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন। আর বলেছেন উনি সেদিন রেবা কৈরালাকে বন্দুক দিয়েছিলেন। আর কী জানতে চান?’

-ঐ বন্দুকটা আপনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন বা কিনেছিলেন?

-আমার একটা খেলার এবং নিরাপত্তার সরঞ্জামের দোকান আছে। ঐ দোকানের স্টক থেকে আমি তিনটে একই রকমের বন্দুক নিজের কাছে রেখেছিলাম।

-কোথায় রেখেছিলেন?

-একটা আমার ছেলেকে দিয়েছিলাম। বাকি দুটোর একটা আমার কাছে সবসময় থাকে।আর একটা থাকে আমার অফিসের লকারে।

-বেশ। যে বন্দুকটা আপনি আপনার ছেলেকে দিয়েছিলেন সেটাকে আমরা বলবো ‘ছোট বন্দুক’, যেটা আপনি নিজের কাছে রাখেন সেটাকে আমরা বলব ‘বড় বন্দুক’ আর যেটা লকারে থাকে সেটা ‘লকার বন্দুক’। এবার আমি একটা নির্দিষ্ট প্রশ্ন করতে চাই। আপনি রেবাকে বড় বন্দুকটা দিয়ে অফিসে এসে লকার বন্দুকটা নিজের কাছে রেখেছিলেন? আপনার এই প্রশ্নের ব্যাপারে কোনও আপত্তি আছে , মিঃ রায়?

পানু রায় বললেন,’ না, আমার কোনও আপত্তি নেই।‘ বড়কালী বললো,’ হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলছেন।‘

-সেদিন সন্ধ্যাতেই? কটার সময়?

-হ্যাঁ, সেদিন সন্ধ্যাতেই। ১১টা বাজার মিনিট পাঁচেক আগে।

-তারপর আপনি রেবার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে যান?

-হ্যাঁ, আমি আবার রেবার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলাম।

-আপনি কি রেবার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে গিয়ে বড় বন্দুকটা দেখতে পেয়েছিলেন?

-হ্যাঁ, দেখতে পেয়েছিলাম।

-কোথায় দেখতে পেয়েছিলেন?

-বিছানায়, বালিশের নিচে।

-আপনি কি বন্দুকটা পরীক্ষা করেছিলেন?

-হ্যাঁ, আমি নিজের হাতে পরীক্ষা করেছিলাম।

-পরীক্ষা করে কী দেখলেন?

-আমি বন্দুকটা দিয়েছিলাম গুলিভর্তি অবস্থায় কিন্তু তখন দেখলাম এর ভিতরে একটা গুলি ব্যবহার করা হয়েছে।

-আপনি কি নিশ্চিত যে বন্দুকটা আপনি গুলিভর্তি অবস্থায় দিয়েছিলেন।

-হ্যাঁ, আমি কাঠমান্ডু থেকে আসার আগে বন্দুকটায় গুলি ভরেছিলাম কারণ আমি জানতাম যে আমি আক্রান্ত হতে পারি।

-আর সেদিন আপনি শিবুলালের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন কারণ আপনি ভেবেছিলেন যে আপনি যে বন্দুকটা রেবাকে দিয়েছিলেন সেটা শিবুলালের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।

এবার পানু রায় উঠে দাঁড়ালেন, বললেন,’ দারোগাবাবু, এই মামলাটা রেবা কৈরালার বিরুদ্ধে। কৃষ্ণকালী মনে মনে কী ভেবেছিল তার সঙ্গে এই হত্যাকান্ড এবং রেবার কোনও যোগ নেই। আপনি এধরণের প্রশ্ন কী করে করতে পারেন? আপনি অন্য কোনও প্রশ্ন করুন।‘ কেলো দারোগা বিরক্তি দেখিয়ে বললো,’ আমার কিছু জিজ্ঞাসা করার নেই।‘ পানু রায় বললেন,’ বেশ । তাহলে আমি একটা প্রশ্ন করি? ‘ উত্তরের অপেক্ষা না করে পানু রায় বড়কালীকে জজ্ঞাসা করলেন,’ আপনি বড় বন্দুকটা রেবাকে কেন দিয়েছিলেন?’

-কারণ রেবা একসময় আমার ছেলে কালীকৃষ্ণের প্রেমিকা ছিল। আমি চেয়েছিলাম রেবা আমার পুত্রবধূ হিসাবে আমাদের বাড়ি আসুক। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা হলো না। আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম যে আমি রেবাকে ভালোবেসে ফেলেছি।

-আমি আপনাকে আর একটা প্রশ্ন করতে চাই।এই হত্যাকান্ড যেদিন ঘটে তার আগের দিন বা আরও আগে আপনি কি কিছু খবর পেয়েছিলেন যার থেকে আপনার মনে হয়েছিল যে এই শিবুলালই রেবার বাবাকে হত্যা করেছিল?

-হ্যাঁ। আমার তাই মনে হয়েছিল এবং আমি রেবাকে বলেছিলাম যে আমার ধারণা শিবুলালই রেবার বাবার হত্যাকারী এবং শিবুলাল সুযোগ পেলে রেবাকেও হত্যা করতে পারে। সেইজন্যই আমি সবসময়ে কাছে রাখার জন্য বড় বন্দুকটা রেবাকে দিই। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি প্রমাণ করতে পারবো যে শিবুলালই খুনী এবং কয়েকদিনের মধ্যেই পুলিশ ওকে অ্যারেস্ট করবে।

পানু রায় বললেন,’দারোগা বাবু, এর থেকে কী প্রমাণ হলো? ধরা যাক কোনও অজ্ঞাতকারণে কৃষ্ণকালীর মনে হলো আমি শিবুলালকে হত্যা করেছি। আমাকে বাঁচাবার জন্য সে শিবুলালের ফ্ল্যাটে গেল। গিয়ে দেখলো এমন কোনও তথ্য প্রমাণ সেখানে নেই যার থেকে বলা যেতে পারে আমি খুন করেছি। আমি নিজে সে কথা তাকে বলিনি। আমি তাকে সেখানে যেতেও বলিনি। তা সত্ত্বেও সে আমাকে বাঁচাবার জন্য কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করে ফেললো। এই পুরো ব্যাপারটা কী ভাবে প্রমাণ করতে পারে যে কে খুনী।

-তাহলে আপনি বলতে চাইছেন যে এতক্ষণ যে কথাবার্তা হলো সেগুলো অর্থহীন? আমরা মিছিমিছি সময় নষ্ট করলাম?

-দেখুন দারোগাবাবু, আমি বলছি এই দীর্ঘ আলোচনা থেকে মাত্র দুটি সত্য এই খুনের তদন্তে সাহায্য করতে পারে। প্রথমটি হলো কৃষ্ণকালী গুলিভর্তি বন্দুকটা রেবাকে দিয়েছিল এবং সেদিনই পরে এসে দেখেছিল যে সিলিন্ডারে একটা গুলি কম। দ্বিতীয়টি হলো ঐ জুতোর ছাপটি যেটি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই জুতোটি রেবার।

-বেশ, এবার আমি কালীকৃষ্ণ অর্থাৎ কৃষ্ণকালীবাবুর ছেলেকে কিছু জিগ্যেস করতে পারি?

-অবশ্যই। আমি আপনার সঙ্গে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করবো।

ছোটকালী পিছনের সারির চেয়ার থেকে উঠে এসে সামনে বসলো। কেলো দারোগা এবার ছোটকালীকে জিজ্ঞাসা করলো,’ আপনি বলুন যে যেদিন হত্যাকান্ড ঘটে সেদিন আপনি আপনার বন্দুকটি অর্থাৎ যেটিকে আমরা ছোট বন্দুক বলছি সেটি মিঃ রায়কে দিয়েছিলেন?’

-হ্যাঁ, দিয়েছিলাম।

-মিঃ রায় বন্দুকটি নিয়ে কী করেছিলেন?

পানু রায় বললেন,’ এই প্রশ্নের কোনও সম্বন্ধ নেই এই কেসের সঙ্গে। যেহেতু বড় বন্দুকটি খুনী বন্দুক হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে সেখানে অন্য বন্দুক নিয়ে কে কী করেছিল এই কেসের সঙ্গে তার কী সম্বন্ধ? ‘ কেলো দারোগা ছোটকালীকে বড় বন্দুকটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,’ এই বন্দুকটা আপনি আগে দেখেছেন?’

-হ্যাঁ, এটা আমি আগে দেখেছি।

-কখন দেখেছেন?

-যেদিন খুনের ঘটনাটি ঘটে সেদিন পানু রায় এই বন্দুকটি আমার হাতে দিয়েছিল।

পানু রায় বললেন,’ আমি কী করেছি না করেছি তার সঙ্গে এই হত্যার সম্পর্ক কী?’ কেলো দারোগা বললো,’ আপনি চুপ করুন। আমাকে কথা বলতে দিন। কালীকৃষ্ণবাবু আপনি বলুন মিঃ রায়ের থেকে বন্দুকটা নিয়ে আপনি কী করলেন?’

-আমি এটা নিয়ে রেবা কৈরালার অ্যাপার্টমেন্টে গেলাম।তারপর পানু রায় কী সব বলে গেলেন যার মানে হচ্ছে রেবা খব বিপদের মধ্যে আছে এবং আমি তাকে একটা বন্দুক দেবার জন্য এসেছি যেটা তার কাজে লাগবে। আমি স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়ে রইলাম।

-যাই হোক, বন্দুকটা মিঃ রায় আপনাকে কোথায় দিয়েছিলেন?

-আমার অফিসে।

-এই বন্দুকটা ওনার কাছ থেকে নেবার আগে আপনি কি ওনাকে একটা বন্দুক দিয়েছিলেন?

-হ্যাঁ,দিয়েছিলাম আর সেই বন্দুকটা হাতে নিয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে পানু রায় আমার টেবিলের দিকে তাক করে ট্রিগার টিপে দিলেন।টেবিলটা ফেটে চৌচির হয়ে গেল। ঘরটা ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় ভরে গেল। এই গন্ডগোলের মাঝখানে সবার নজর এড়িয়ে ছোট বন্দুকটা নিজের কাছে রেখে বড় বন্দুকটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিলেন পানু রায়।আমি সেটা বুঝতে পারিনি। আমি ভাবলাম আমি ছোট বন্দুকটাই রেবাকে দিয়ে এলাম।

-আর এইভাবেই মিঃ রায় প্রমাণ তৈরি করলেন যে খুনী বন্দুকটা হত্যাকান্ডের সময় আপনার কাছেই ছিল। ঘটনাচক্রে দু’টি বন্দুকেই একটা করে গুলি কম ছিল।একেবারে জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল। মিঃ রায়, আপনার কিছু বলার আছে?

পানু রায় বললেন,’ কালীকৃষ্ণ , তুমি কি আমাকে বন্দুকটা পাল্টাতে দেখেছ?

-অবশ্যই না।আপনি যা কান্ড করলেন তাতে কারুর পক্ষেই কিছু দেখা সম্ভব ছিলনা। আপনি ইচ্ছে করেই এই কান্ড ঘটিয়েছিলেন যাতে আপনার আসল কাজটা কেউ দেখতে না পায়।এতো দুয়ে দুয়ে চার।

-তার মানে এটা তোমার অনুমান। তুমি নিজের চোখে এটা ঘটতে দেখোনি। তুমি আন্দাজে বলছো।

- হ্যাঁ তাই। আপনি যে এই কাজ করেছেন তা তো সহজেই অনুমান করা যায়।

-বেশ, দারোগাবাবু যদি মনে করেন এতে প্রমাণিত হলো যে আমি এই কাজ করেছি তাহলে আমার কিছু বলার নেই। বাকি কথা আদালতে হবে।

কেলো দারোগা বললো ,’ আপনি অযথা উত্তেজিত হচ্ছেন, মিঃ রায়। আপনাকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। আমাকে একটু কথা বলতে দিন। আচ্ছা কালীকৃষ্ণবাবু আপনি বলছেন যে আপনি একটা বন্দুক মিঃ রায়কে দিয়েছিলেন।তাই তো?’

-হ্যাঁ, যেটাকে ছোট বন্দুক বলা হচ্ছে সেই বন্দুকটা আমি ওনাকে দিয়েছিলাম।

-বন্দুকটা কোথায় ছিল?

-আমার টেবিলের ড্রয়ারে।

-আপনি বন্দুকটা কোথা থেকে পেয়েছিলেন?

-আমার বাবা আমাকে বন্দুকটি দিয়েছিলেন।

-যেদিন খুনের ঘটনাটি ঘটে সেদিন বন্দুকটা কোথায় ছিল?

-আমার কাছেই ছিল।

-সারাদিনই আপনার কাছে ছিল?

হ্যাঁ, সারাদিনই আমার কাছে ছিল।

-আপনি কবে বন্দুকটা মিঃ রায়ের হাতে দিয়েছিলেন?

-পরের দিন বেলার দিকে।

-তারপর কী হলো?

-পানু রায় বন্দুকটা থেকে একটা গুলি টেবিলের উপর ছুঁড়লেন।

-তারপর?

-তারপর উনি বন্দুকটা আমার হাতে দিয়ে বললেন ওটা নিয়ে ওনার সঙ্গে রেবার কাছে যেতে।

-ঐ বন্দুকটা যেটা আপনি রেবার কাছে নিয়ে গেলেন আর যেটা আপনি মিঃ রায়কে দিয়েছিলেন সে’দুটি কি একই বন্দুক?

-না।

এবার পানু রায় বিরক্ত হয়ে বললেন,’ দারোগাবাবু, আপনি কোনও প্রমাণ ছাড়াই এই একই কথা বারবার কেন ওকে দিয়ে বলাচ্ছেন? এটা ওর ব্যক্তিগত মত। এটা কোনও প্রমাণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়।‘কেলো দারোগা বললো,’ ঠিক আছে বন্দুকদু’টো একই না আলাদা সেটা প্রমাণসাপেক্ষ। কালীকৃষ্ণবাবু, আপনি বলুন রেবাদেবী বন্দুকটা নিয়ে কী করলেন? ‘

-রেবা ওটা টেবিলের ওপর রেখে দিল। তারপর কী হলো জানিনা। আমি এবং পানু রায় তারপর ওখান থেকে চলে গেলাম। যাওয়ার সময় দেখলাম আপনি এবং আর একজন পুলিশ অফিসার ওপরে যাওয়ার লিফটের দিকে যাচ্ছেন।

-আপনার কিছু বলার আছে মিঃ রায়?

পানু রায় বললেন,’কালীকৃষ্ণ, তুমি বললে যে ছোট বন্দুকটা যেদিন খুনের ঘটনাটা ঘটে সেদিন সারাক্ষণ তোমার কাছেই ছিল। তুমি যখন লাঞ্চ করতে গিয়েছিলে তখন কি বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে?

-না, তখন ওটা ড্রয়ারে ছিল।

-ড্রয়ারে চাবি দেওয়া ছিল?

-না, আমি ঐ ড্রয়ারটায় চাবি দিইনা। কারণ তাহলে দরকারের সময় চাবি খুলে বন্দুকটা বের করতে দেরি হয়ে যাবে।

-বেশ, তা সত্ত্বেও তুমি মনে করো যে বন্দুকটা সারাক্ষণ তোমার কাছেই ছিল। সেদিন সন্ধ্যাবেলা তুমি কোথায় ছিলে?

-আমি এক ডিলারের সঙ্গে মিটিং এর জন্য গিয়েছিলাম।

-বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে?

-না, ওটা ড্রয়ারেই ছিল। আমি অফিসে ফিরে ওটা পকেটে নিয়ে বাড়ি যাই।

-তারপর বাড়ি গিয়ে বন্দুকটা কোথায় রাখলে?

-আমার বেডরুমের কাবার্ডে।

-রাত্রে কি তোমার অফিস তালাবন্ধ থাকে?

-হ্যাঁ, অফিস তালাবন্ধ থাকে। তবে গেটে দারোয়ান থাকে। গাড়ি পাহারা দেবার জন্য।

-অফিসের চাবি কার কার কাছে থাকে?

-আমার বাবার কাছে, আমার সেক্রেটারির কাছে আর আমার স্ত্রীর কাছে।

-পরেরদিন অফিস যাবার সময় বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে?

-না, আমি নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম। পরে আমার স্ত্রী ওটা কাবার্ডে দেখতে পেয়ে আমায় ফোন করে জানায়। আমি ওকে বন্দুকটা নিয়ে অফিসে আসতে বলি। ও বন্দুকটা নিয়ে অফিসে এসে আমাকে দেয়। আমি সেটা ড্রয়ারে রাখি।

-তুমি কী করে নিশ্চিত হচ্ছো যে তোমার স্ত্রী তোমাকে যে বন্দুকটা দিয়েছিল সেটাই খুনী বন্দুকটা নয় যেটা তুমি আমাকে দিয়েছিলে? কী? হতেও পারে তাই না?

-না, না, তা কী করে হবে? এরকম হতেই পারে না।

-আমি বলছিনা যে এরকমই হয়েছিল। আমি বলছি যে এরকম হতেই পারে। তুমি কিছুতেই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বলতে পারোনা যে আমি বন্দুকটা পাল্টে দিয়েছিলাম। কি দারোগাবাবু, আমি ঠিক বলছি তো?

কেলো দারোগা বললো,’ এটাই তো মুস্কিল, মিঃ রায়। আপনি এমন একটা গল্পের ফাঁদে জড়িয়ে দেন যা কেটে বেরিয়ে আসা যায় না।‘পানু রায় বললেন,’ গল্প কেবন সম্ভাবনার কথা বলে। প্রমাণ সত্য প্রতিষ্ঠা করে। প্রমাণহীন গল্প অর্থহীন। প্রমাণের কথা যখন উঠলো তখন আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। যে গুলিটা আমি সেদিন ছুঁড়েছিলাম সেটা পরীক্ষা করলেই তো পরিষ্কার হয়ে যাবে সেটা কোন বন্দুকটা থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। ঐ গুলিটা কি পরীক্ষা করা হয়েছিল?

-না, মানে ঐ গুলিটা খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ ঐ গুলিটা ওখান থেকে সরিয়ে নিয়েছে।

-সেকি? পুলিশ গুলিটা খুঁজে পায়নি। পুলিশের অকর্মন্যতার জন্য একজন নির্দোষ মহিলাকে আটকে রাখা হয়েছে? দারোগাবাবু, কোর্টে আপনার কী অবস্থা হতে চলেছে বুঝছেন?’

কেলো দারোগা বেগতিক দেখে চুপ করে থাকে। ছোটকালী উঠে এসে পানু রায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে কিছু একটা বলার সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন পানু রায়। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বললেন,’ কী বলছো তুমি? আবার বলো। সবার সামনে বলো। জোরে বলো যাতে সবাই শুনতে পায়।‘ ছোটকালী চুপ করে থাকে। পানু রায় ঝাঁঝিয়ে ওঠেন,’ সাহস থাকে সবার সামনে বলো। চুপ করে আছো কেন?’ কেলো দারোগা ছোটকালীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে,’ কী বলেছেন আপনি? বলুন। সময় নষ্ট করবেন না।‘ ছোটকালী ঘাবড়ে গিয়ে বলে,’ আমি বলেছি আমি ওনাকে থানার বাইরে বেরোলে গুলি করে দেব।‘ পানু রায় চেঁচিয়ে বলে ওঠেন,’ তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো ? তাও আবার থানার মধ্যে? তুমি জানো আমি চাইলে আমি তোমাকে হাতকড়া পরিয়ে লকআপে ঢোকাতে পারি।‘ কেলো দারোগা ছোটকালীকে বলে,’শুনুন, থানাটা গুন্ডাগিরির জায়গা নয়। বেরিয়ে যান। না হলে সোজা লকআপে চালান করে দেব।‘ ছোটকালী মাথা নিচু করে চুপচাপ বেরিয়ে যায়।

মিনিট পাঁচেক পরেই থানায় ঢুকলো এলিনা। পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে কেলো দারোগা বললো ,’ আমি ওনাকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। আপনি নিশ্চয়ই চেনেন ওনাকে।‘ পানু রায় বললেন,’ বিলক্ষণ। আমি ভেবেছিলাম আপনাকে বলবো ওনাকে ডাকতে। যাই হোক, আপনি যখন নিজেই ডেকেছেন শোনা যাক উনি কী বলেন?’

কেলো দারোগা বললো,’ এলিনাদেবী, আপনি এখন কী করেন?’

-আমি একজন মডেল এবং অভিনেত্রী।

-যেদিন খুনের ঘটনাটা ঘটে সেদিন আপনি কী করছিলেন মানে আপনি কি সেদিনও কোনও মডেলিং বা অভিনয়ের কাজে ব্যস্ত ছিলেন?

-না, না, আমি তখন দুর্ভাগ্যবশত কৃষ্ণকালীবাবুর অফিসে ওনার সেক্রেটারির কাজ করতাম।

-যেদিন খুনের ঘটনাটা ঘটে সেদিন আপনার অফিসে কি অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছিল?

-অস্বাভাবিক বলা যাবে কি না জানিনা। তবে সেদিন কৃষ্ণকালীবাবু আমাকে কাঠমান্ডু থেকে ফোন করে বলেছিলেন উনি না আসা পর্যন্ত আমি যেন অফিসে অপেক্ষা করি। ওনার আসতে সাড়ে ন’টা বা দশটা হতে পারে।

-উনি কখন এলেন?

-উনি তার অনেক আগেই এসে যান। পৌনে ন’টা নাগাদ।ওনাকে খুব নার্ভাস লাগছিল।

-উনি কি আপনাকে শিবুলালের ব্যাপারে কিছু বলেছিলেন?

-হ্যাঁ, উনি বললেন যে যে রেবা কৈরালার বাবাকে খুন করেছিল তার সঙ্গে আজ আমার কথা হয়েছে। আমি এগারোটা নাগাদ লোকটার সঙ্গে দেখা করবো।‘

-তারপর কী হলো?

-উনি কোটটা খুলে স্ট্যান্ডে রাখলেন। ভেতরের পকেট থেকে বন্দুকটা বের করে টেবিলের ওপর রেখে বাথরুমে চলে গেলেন।

কেলো দারোগা একটা বন্দুক দেখিয়ে বললো,’আপনি কি বলতে পারবেন এইটাই সেই বন্দুকটা কি না?’

-না,আমি ভীষণ ভয় পাই। বন্দুকের ধারে কাছে যাইনা। তবে অনেকটা একই রকম দেখতে বলে মনে হচ্ছে।

কেলো দারোগা পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,’ আপনি কিছু জানতে চান?’

পানু রায় বললেন,’ উনি আপনাকে বলেছিলেন যে ওনার সঙ্গে শিবুলালের কথা হয়েছে? ‘

-না, উনি বলেছিলেন ‘যে রেবা কৈরালার বাবাকে খুন করেছিল তার সঙ্গে আজ আমার কথা হয়েছে। আমি এগারোটা নাগাদ লোকটার সঙ্গে দেখা করবো।‘

- উনি শিবুলালের নাম বলেন নি?

-না শিবুলালের নাম বলেন নি। তবে আমার মনে হয় উনি শিবুলালের কথাই বলছিলেন।

-আপনার মনে হওয়া না হওয়ায় কিছু এসে যায় না। আমার আর কিছু জানার নেই।

কেলো দারোগা এলিনাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে বেরিয়ে গেলেন। একটু পরে এক সুন্দরী মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকলেন। বললেন, ‘ ইনি কালীকৃষ্ণবাবুর সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী। আমরা এনার সঙ্গেও কথা বলবো।‘ ওনাকে বসতে বলে কেলো দারোগা বড় বন্দুকটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,’ আপনি এই বন্দুকটা আগে দেখেছেন? ‘

- জানিনা এটাই দেখেছি কি না। তবে এরকমই দেখতে একটা বন্দুক আমি কাবার্ডে দেখেছিলাম যেটা কালীকৃষ্ণ ভুল করে ফেলে রেখে অফিসে চলে গিয়েছিল।

-কবে এবং কখন উনি ঐ বন্দুকটা কাবার্ডে রেখেছিলেন।

-যেদিন শিবুলাল খুন হয় সেদিন রাত সাড়ে দশটা হবে।

- আপনি বন্দুকটা পরের দিন দেখেছিলেন?

-হ্যাঁ, দেখেছিলাম।

-তারপর কী করলেন?

-আমি কালীকৃষ্ণকে ফোন করে জানালাম যে সে বন্দুকটা ফেলে রেখে গেছে।

-কখন ফোন করেছিলেন? কালীকৃষ্ণবাবু অফিস পৌঁছনোর পর?

-আমি সদ্যবিবাহিতা। আমি এখন আমার স্বামী অর্থাৎ কালীকৃষ্ণকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি কী ভাবে নিজের ব্রেকফাস্ট নিজে তৈরি করতে হয়। আমি সেজন্য সকাল সাড়ে ন’টা পর্যন্ত ঘুমোই।হ্যাঁ, আমার চোখে যখন পড়লো যে বন্দুকটা কাবার্ডে পড়ে আছে ততক্ষণে কালীকৃষ্ণ অফিস পৌঁছে গেছে।

-তারপর কী হলো?

- কালীকৃষ্ণ আমাকে বললো বন্দুকটা নিয়ে অফিসে পৌঁছে যেতে। আমি সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ অফিসে গিয়ে ওকে বন্দুকটা দিয়ে দিই।

-কালীকৃষ্ণ যখন বাড়ি ফিরেছিল আর পরের দিন যখন আপনি বন্দুকটা ওনাকে ফেরত দিয়েছিলেন সেই সময়ের মধ্যে বন্দুকটা থেকে কি কোনও গুলি ছোঁড়া হয়েছিল?

-অসম্ভব। বন্দুকটা যখন রাখা হয় আর আমি যখন ওটা ফেরত দেবার জন্য নিই তারমধ্যে আমার বেডরুমে কেউ ঢোকেনি। বন্দুকটা একই অবস্থায় ছিল।

-আমার আর কিছু জানার নেই। মিঃ রায় আপনি কিছু জানতে চান?

পানু রায় মহিলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,’ আপনি কি ঐদিন সারাসন্ধ্যে বাড়িতে ছিলেন?’

-হ্যাঁ, অবশ্যই।

-আপনি জানেন কালীকৃষ্ণ আপনাকে দু’বার ফোন করেছিল সেদিন সন্ধ্যায় কিন্তু আপনি ফোন ধরেননি?

-কালীকৃষ্ণ আমাকে একই কথা বলেছে।

-আপনি কি ইচ্ছা করে ধরেননি?

-না, না। আসলে আমি মাঝখানে একঘন্টা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

-আপনি কি কালীকৃষ্ণকে সেকথা বলেছেন?

-না,এটা কখনও বলা যায়? আপনি সিচুয়েশনটা বুঝুন। আমরা মধুচন্দ্রিমা যাপন করছি। আমার স্বামী ব্যবসার কাজে সারাসন্ধ্যে বাড়ির বাইরে এমনকি ডিনারেও আসেনি। আমি ওকে বোঝাতে চাই যে এটা ঠিক নয়, আমি রাগান্বিত এবং মর্মাহত। আমি যদি ওকে বলি যে আমি ওর জন্যে অপেক্ষা করিনি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাহলে ও ব্যাপারটার গুরুত্বটাকে লঘু করে দেখতে পারে। সেইজন্য আমি ওকে বলেছিলাম ও হয়তো ভুল নাম্বারে ডায়াল করেছিল।

-আপনি বলছেন আপনি ওকে বুঝিয়েছিলেন যে ও দু-দুবার ভুল নাম্বার ডায়াল করেছিল। এতো বড় শক্ত কাজ করলেন কী করে?

-বিবাহের অব্যবহিত পরেই একজন স্ত্রী অনেক সহজে তার স্বামীকে অনেক কিছু বোঝাতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজটা কঠিনতর হয়ে ওঠে।

-তার মানে আপনি ওনাকে মিথ্যা কথা বলেছিলেন?

-মিথ্যা কোথায় বললাম। আমি বলেছিলাম অনেক সম্ভাবনার মধ্যে ভুল নাম্বার ডাইয়াল করাও একটা সম্ভাবনা। তাছাড়া ও আমাকে জিজ্ঞাসা করেনি যে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কি না? তাই আমিও কিছু বলিনি।

-বেশ। এবার বলুন যখন বন্দুকটা নিয়ে আপনি কালীকৃষ্ণের কাছে যান আপনি কি তখন জানতেন যে বন্দুকটায় একটা গুলি কম আছে।

-তাহলে আপনি টেবিলে গুলি ছোঁড়ার পর বন্দুকে দুটি গুলি কম থাকতো। তাই না?

-হ্যাঁ, সেটা যদি যে বন্দুকটা আপনি কালীকৃষ্ণকে দিয়েছিলেন সেই বন্দুকটাই কালীকৃষ্ণ আমাকে দিয়ে থাকে।

-একজন স্ত্রীর উচিৎ তার স্বামীকে বিশ্বাস করা। তাই নয় কি, মিঃ রায়?

-ঠিক আছে, আমার আর কিছু জানার নেই।

-তাহলে আমি আসতে পারি, দারোগাবাবু?

কেলো দারোগা বললেন,’ চলুন আপনাকে এগিয়ে দিই।‘ কেলো দারোগা সকলকে বিশেষ করে পানু রায়কে বলে গেল,’ একটু অপেক্ষা করুন। আর একজনকে আমি ডেকেছিলাম। উনি এসেছেন।আমি ওনাকে নিয়ে আসছি।‘ একটু পরেই কেলো দারোগা এক বয়স্কা, স্থূলকায়া মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। বললো,’ ইনি গীতাদেবী। শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টের নিচের তলায় ইনি থাকেন। হত্যার দিন সন্ধ্যাবেলা উনি কিছু দেখেছিলেন যা আমাদের এই হত্যার কিনারা করতে সাহায্য করবে বলে আমার বিশ্বাস অর্থাৎ যা থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে রেবা কৈরালাই খুনী। এবার গীতাদেবী, আপনি বলুন। বসে বসেই বলুন।‘ গীতাদেবী বলতে শুরু করলো,’ সেদিন সন্ধ্যে পৌনে ন’টা নাগাদ আমি একজন মহিলাকে পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখি।আমি ভাবলাম চোর-ছ্যাঁচোর হবে তাই একটা কাছাকাছি দূরত্ব রেখে পিছু নিলাম যাতে বুঝতে না পারে আমি ওকেই অনুসরণ করছি।‘ কেলো দারোগা জিজ্ঞাসা করলো,’ আপনি কি মহিলাকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন?’ গীতাদেবী উত্তর দিল,’ হ্যাঁ, আমি তাকে এই ঘরেও দেখতে পাচ্ছি।‘ গীতাদেবী আঙ্গুল দিয়ে রেবা কৈরালাকে দেখালো।

-উনি তারপর কী করলেন?

-উনি রাস্তায় বেরিয়ে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে শুরু করলেন । তার কিছুক্ষণ পরে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক গাড়ি নিয়ে এসে ওনার পাশে দাঁড়ালেন। ঐ মহিলা গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

-আপনি ঐ বৃদ্ধ ভদ্রলোককে কাছ থেকে দেখেছিলেন?

গীতাদেবী পানু রায়ের দিকে দেখিয়ে বললো,’ইনিই সেই ভদ্রলোক।‘ পানু রায় বললেন,’ আপনি পিছনের সেদিন পিছনের সিঁড়িতে নজর রেখেছিলেন?’

-হ্যাঁ, প্রায়ই আমি পিছনের সিঁড়ি দিয়ে কমবয়সী অপরিচিত মেয়েদের উঠতে নামতে দেখি। সেদিন ঠিক করেছিলাম আজ হাতেনাতে ধরবো এবং জানতে চাইবো তারা কার কাছে আসে এবং কেন আসে?

-তার মানে আপনি বলছেন ঐ মহিলাকে অর্থাৎ রেবাকে আপনি আগে ওখানে যেতে দেখেছেন?

-মানে ওনাকেই দেখেছি কিনা সেটা হলফ করে বলতে পারছিনা।

-আপনি বলছেন ঐ দিনের আগে আপনি ওনাকে দেখেছেন কি না জানেন না। সেদিন আর কোনও অপরিচিত কমবয়সী মহিলাকে দেখেছিলেন?

-না, শুধু ওনাকেই দেখেছিলাম।

-ওনাকে অনুসরণ করলেন কেন?

-আমি দেখতে চাইছিলাম ঐ মহিলা কে?

- শুধু সেইজন্যই অনুসরণ করছিলেন?

-হ্যাঁ, আসলে ওকে ভালো করে দেখার জন্য পিছন পিছন যাচ্ছিলাম।

-ভালো করে দেখা হয়ে গেলেই ফিরে যাবেন ভেবেছিলেন?

-হ্যাঁ, ভেবেছিলাম ভালো করে মুখটা দেখেই ফিরে যাব।

-যখন উনি গাড়িতে উঠছিলেন তখনও আপনি ওনাকে দেখবার চেষ্টা করছিলেন?

-হ্যাঁ আমি তখনও ওনাকে দেখার চেষ্টা করছিলাম।

-তাহলে আপনার নিজের কথা অনুযায়ী আপনি তখনও ওনাকে ভালো করে দেখতে পাননি। তাই না?

-না মানে হ্যাঁ, আমি ওনাকে ভালো করেই দেখতে পেয়েছিলাম। আরও ভালো করে দেখতে চাইছিলাম। কিন্তু আমার মনে হয় আমি ওনাকেই দেখেছিলাম।

-বেশ, উনি যদি গাড়িতে না উঠে আরও খানিকটা হেঁটে যেতেন তাহলে কি আপনি তখনও ওনাকে অনুসরণ করতেন?

-অবশ্যই করতাম। যতক্ষণ না পর্যন্ত ভালো করে মানে আরও ভালো করে ওনাকে না দেখতে পেতাম ততক্ষণ অনুসরণ করতাম।

-ঠিক আছে। আমার আর কিছু জানার নেই। দারোগাবাবু, আমরা কিন্তু যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি। এখনও পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ পাওয়া গেল না। রেবাকে কেবলমাত্র সন্দেহের বশে আটকে রাখার কোনও মানে হয়না।

-আপনার ভরসায় আমি ওনাকে ছেড়ে দিচ্ছি। উনি বাড়ি যেতে পারেন কিন্তু নজরবন্দি থাকবেন আজ। ওনার দরজার সামনে দু’জন কনস্টেবল থাকবে সর্বক্ষণের পাহারায়। কালকে সকালে আবার আমরা এখানে বসবো। আগামি পরশুর মধ্যে আমি চার্জশিট জমা করতে চাই।

-দারোগাবাবু, আমার মনে হয় আপনার তৈরি হয়ে নামাই ভালো। কোর্টে সবার সামনে হেনস্তা হওয়ার চেয়ে নিজেদের মধ্যে একটা ঐক্যমত্যে এলে আপনি জোর গলায় বলতে পারবেন এটা ওপেন অ্যান্ড শাট কেস।

-সেটা আমাকে ভাবতে দিন, মিঃ রায়। কাল দেখা হবে।

পানু রায়, সুন্দরী এবং জগাই থানা থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।