Next
Previous
Showing posts with label প্রচ্ছদ নিবন্ধ. Show all posts
0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - সুকান্ত ঘোষ

Posted in








তারা আপনাকে দেখেই ঠিক করে ফেলেছে

১৯৯০ সালের কথা - স্যান্ড্রা ফরসাইথ নামে মায়ামি ইউনিভার্সিটির এক গবেষক একটা বেশ সাধারণ কিন্তু আবার চালাকি মেশানো পরীক্ষা করলেন। তিনি চারজন মহিলাকে ভিডিওতে রেকর্ড করলেন, যাঁরা একটা ম্যানেজমেন্ট পোষ্টের জন্য ইন্টারভিউ দিচ্ছেন। চারজনের প্রত্যেককে চার রকমের পোশাকে, যে পোশাকগুলো সাজানো হয়েছিল ‘পুরুষালি’ হবার মাত্রা অনুযায়ী। এক নম্বর পোশাক সবচেয়ে নরম, মেয়েলি; চার নম্বর সবচেয়ে কড়া, কাটা-কাটা, প্রায় পুরুষের স্যুটের মত। তারপর ব্যাঙ্কিং আর মার্কেটিং জগতের ১০৯ জন লোককে সেই ভিডিও দেখানো হল আওয়াজ বন্ধ করে। মানে, কে কী বলছেন তা শোনার উপায় নেই, শুধু দেখা যাচ্ছে। বলা হল যে মহিলারা ইন্টারভিউ দিয়েছেন তাঁদের সবার যোগ্যতা, ডিগ্রী, অভিজ্ঞতা সমান – এবার আপনারা নম্বর দিন।

ফলাফল কি হল অনুমান করতে পারছেন? যাঁরা বেশী ‘পুরুষালি’ পোশাক পরেছিলেন, তাঁদের অনেক বেশী মাত্রায় দৃঢ়চেতা, আত্মনির্ভর, ক্ষিপ্র, আক্রমণাত্মক এবং সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম বলে মনে করা হল। এবং তাঁদের চাকরী দেবার সুপারিশও বেশী এল। মজার ব্যাপার, ইন্টারভিউ যিনি নিচ্ছেন তিনি পুরুষ না মহিলা, ব্যাঙ্কার না মার্কেটিং-এর লোক, তাতে বিশেষ কিছু হেরফের হল না। মানে, সবাই একই ছাঁচে ভাবছে।

এবার আপনি বলতেই পারেন, ভাই বড়ই সরলীকরণ করে ফেললে কেসটা। এমন ব্যাপার স্যাপার হলে তো সব কোম্পানীর বড় পোষ্টের লোকজনকে ব্র্যাড পিট হতে হবে! কিন্তু আমরা জানি তা তো হয় না। তার মানে ভিতরে থাকলে বা বাকিদের থেকে লক্ষণীয় ভাবে ভালো হলে এই সব পোষাক ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে হয় না। আর যদি গড়পড়তা লোক হয়ে বাকিদের সাথে ফাইট দিতে হয়, তাহলে একটা চান্স থেকে যায় পোষাক দিয়ে প্রভাব ফেলার বা প্রভাবিত হবার।

ফরসাইথ-ও সেটা জানতেন না এমন নয়! তিনি নিজেও কিন্তু সৎ ভাবে লিখেছিলেন যে পোশাকের প্রভাব ব্যক্তির নিজের প্রভাবের তুলনায় ছোট – মুখ, ভঙ্গী, হাসি, হাত নাড়ার ধরণ, এ সবের ওজন বেশী। কিন্তু তারপরেই তিনি এমন একটা কথা লিখেছেন যা বেশ জোরালোঃ পোশাক জিনিসটা সহজে বদলানো যায়, মুখ বদলানো যায় না! এবং এই ‘সহজে বদলানো যায়’ বলেই গোটা একটা শিল্প গড়ে উঠেছে আমাদের ঘাড়ে চেপে। সেই পোষাক এবং ফ্যাশন ইন্ডাষ্ট্রি নিয়ে কথা পরে হবেক্ষণ।

তবে কিনা এই নিয়ে গবেষণার লিষ্ট লম্বা, এবং প্রায় সবই এক দিকে ঝুঁকে আছে। ফর্ম্যাল জামা পরা টিচিং অ্যাসিষ্ট্যান্টদের ছাত্ররা বেশী বুদ্ধিমান ভাবে, কিন্তু কম ইন্টারেষ্টিং। ফর্ম্যাল পোশাক পরা থেরাপিষ্টের কাছে ক্লায়েন্ট দ্বিতীয়বার ফিরে আসে বেশী। হাই স্কুলের ছেলেমেয়েদের জামাকাপড়ের ধরণ দেখে বন্ধু এবং শিক্ষক – দু’পক্ষই ঠিক করে ফেলে ছেলেটি বা মেয়েটি পড়াশুনায় কেমন। আর সবচেয়ে বাজে তৈরী হওয়া ধারণাটি হল - উঁচু পদের চাকরীতে কোন মহিলা যদি একটু বেশী আকর্ষণীয় করে সাজেন, তাঁকে কম যোগ্য বলে মনে হয়। মানে মেয়েদের জন্য দড়িটা এত সরু যে হাঁটাই মুশকিল, বেশী মেয়েলি হলে অযোগ্য, বেশী পুরুষালি হলে ‘অ্যাগ্রেসিভ’, আর সুন্দরী হলে তো কথাই নেই! খুবই গুণী এবং তার সাথে প্রচন্ড সুন্দরী একজনাকে খুবই কাছাকাছি একছাদের তলায় দীর্ঘদিন দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আমরা এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করতাম, এমনকি নিজেদের মধ্যে ছোটখাট পরীক্ষাও, সেই সব নিয়েও দীর্ঘ লেখা লিখে ফেলা যাক। তবে সে সবই কিন্তু বাকি প্রকাশিত স্টাডিগুলির সমর্থনসূচকই ছিল বেশীর ভাগ সময়।


সুন্দর দেখতে বলেই আপনি ঠিক কথা বলছেন না

ওদিকে চেহারার বাজারদর মাপার কাজটা করেছেন অর্থনীতিবিদরা। ড্যানিয়েল হ্যামারমেশ প্রায় গোটা কেরিয়ার এই নিয়ে খরচ করেছেন – ‘পালক্রোনমিক্স’ বলে ইয়ার্কি করে ডাকা হয় জিনিসটাকে, সৌন্দর্যের অর্থনীতি। তাঁর হিসেব অনুযায়ী আমেরিকায় এক জন সুশ্রী মানুষ গোটা কর্মজীবনে গড়ে প্রায় দুই লক্ষ তিরিশ হাজার ডলার বেশী রোজগার করেন গড়পড়তা-থেকে-কম-দেখতে সহকর্মীর তুলনায়। শতাংশের হিসেবটা ছোট – দু-তিন-চার শতাংশ – কিন্তু তিরিশ বছর ধরে জমলে আর ছোট থাকে না। সুন্দর লোকেরা চাকরী বেশী পান, প্রোমোশন বেশী পান, ব্যাঙ্কে লোন পান সহজে, সুদটাও তাঁদের দিতে হয় একটু কম। এ জিনিসও আমি নিজে সামনা সামনি দেখেছি – পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরতে গিয়ে কত জিনিসের ডিসকাউন্ট পেয়েছি কেনার সময়, অনেক সময় না চাইতেই, কেবল সাথে সুন্দরী একজন ছিল বলে!

এবার একটা ইনটারেষ্টিং পরীক্ষার কথা বলি, যেটা আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়েও একটু খোঁচা দিয়ে যায়! আগে থেকে জানা ছিল যে ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের ভোটাররা বেশী সুশ্রী বলে মনে করেন – অষ্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা – চার জায়গার নির্বাচনের ডাটাতেই এইরকম ফলের ইঙ্গিত দিয়েছিল একসময়। এখন প্রশ্ন হল, কেন? দুটো ব্যাখ্যা সম্ভব। এক, ডানপন্থী লোকজন এমনিতেই দেখতে ভালো – কারণ সুন্দর লোকেরা বেশী রোজগার করেন, আর বেশী রোজগেরে লোকেরা সম্পদের পুনর্বন্টন কম পছন্দ করেন। একটা নিখুঁত গোল বৃত্ত। দুই, ডানপন্থী দলে প্রার্থী বাছাই করার সময়েই চেহারার উপর বেশী জোর দেওয়া হয়।

হেলসিঙ্কি ইউনিভার্সিটির জান-এরিক লনভিষ্ট এই দুটোকে আলাদা করার জন্য এক দারুণ ভাবনা বেছে নিলেন। তিনি রাজনীতিবিদদের ছেড়ে ধরলেন বুদ্ধিজীবীদের – ডানপন্থী ও বামপন্থী পত্রিকায় যাঁরা লেখেন, সেই সব অধ্যাপক-লেখকদের ছবি। যুক্তিটা সহজ: বুদ্ধিজীবী হবার জন্য কেউ কাউকে সুন্দর হতে বলে না। ওই লাইনে সুশ্রী মুখের কোন বাজারদর নেই।

ফল বেরুলো - বিচারকরা ছবি দেখে দিব্যি আন্দাজ করতে পারলেন কে বামপন্থী আর কে ডানপন্থী (মুখ দেখে রাজনীতি চেনা যায়, এ এক আলাদা অস্বস্তিকর গল্প)। কিন্তু সৌন্দর্য? ডানপন্থী বুদ্ধিজীবীরা মোটেই বেশী সুশ্রী নন। উল্টে, ছবির কোয়ালিটি আর ‘গ্রুমিং’-এর হিসেব বাদ দিয়ে দেখা গেল বেশী সুশ্রী মানুষরা বরং বামপন্থী পত্রিকাতেই বেশী লিখছেন। ডানপন্থীরা যেখানে এগিয়ে, সেটা সৌন্দর্য নয় – সেটা হল পরিপাট্য। চুল আঁচড়ানো, দাড়ি কামানো, জামার ভাঁজ। মানে, ঈশ্বরপ্রদত্ত মুখ নয়, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খরচ করা সময়।

লনভিষ্টের পেপারটার নাম, যার থেকে ভালো নাম হতে পারত না, ‘Just because you look good, doesn’t mean you’re right’। দেখতে ভালো বলেই আপনার কথাটা ঠিক, তা নয়। ইংরেজীতে ‘right’ শব্দটার দুটো মানে – ‘ঠিক’ এবং ‘ডান’। লনভিষ্ট ভাষার সাথে একটু খেলা করেছেন আর কি!

নোবেলজয়ী লেখক আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার এক জায়গায় লিখেছিলেন, পোশাকের ভিতরে এক অদ্ভুত ক্ষমতা লুকিয়ে থাকে। কথাটা কেবল কথার কথা নয়, ওটা মাপা যায় বা মাপার চেষ্টা অন্তত অনেকেই করেছেন দীর্ঘদিন ধরে। তাই সেই নিয়ে গবেষণাও কম নেই।

এখন এটা একটু কমেছে গত কিছু বছর হল, বিজনেস ক্লাসের লাইনে দাঁড়ালে (বিশেষ করে ভারতে), গেট খুলে বোর্ডিং-এর আগে একবার করে এসে টিকিট চেক করে যায়। এমন নয় যে আগে করত না, কিন্তু আগে মাঝে মাঝে ফট করে হয়ত লাইনে দাঁড়ানো কাউকে বলেই দিত, “আপনার লাইন এটা নয়, ওটা ওদিকে”। আমার সাথে অনেকবার হয়েছে এটা। টিকিট চেক না করে কি দেখে তারা বিজনেস ক্লাস বা ইকনমি ক্লাসের পার্থক্য করত তারা বলে আপনার মনে করেন? যেহেতু ট্রাভেল একটু বেশিই করতে হয় – তাই পরীক্ষাও চালিয়ে ছিলাম আগে কখন এরা আর জিজ্ঞেস করবে না আমি ইকনমি ক্লাসে কিনা। দেখেছিলাম হাতে ইংরাজি বই থাকলে প্রশ্ন কম করে।

বহু আগে এই সব নিয়ে বেশ বিরক্ত হতাম। সুধা ম্যাডাম এই নিয়ে ফুটেজ দেবার বহু আগে থেকেই এই জিনিস চলে আসছে। তো এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই একদিন আবিষ্কার করলাম, আমি যা নিয়ে বিরক্ত হচ্ছি, গত পঞ্চাশ বছর ধরে দুনিয়ার সাইকোলজিষ্ট, সমাজতত্ত্ববিদ, আর ইকনমিষ্টরা তা নিয়ে রীতিমতন ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা চালিয়ে গেছেন। এবং তাঁদের ফলাফল আমার বিরক্তিকে সমর্থনই করে, আরো খানিকটা অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়ে।


এবার উল্টো দিক – জামাকাপড় আপনাকে কী করে?

এতক্ষণ যা বললাম তা হল, অন্যরা আপনাকে জামা দেখে বিচার করে। সেটা তো জানা কথাই, শুধু মাপজোখ হয়েছে। আসল চমকটা এল ২০১২ সালে।

নর্থওয়েষ্টার্ন ইউনিভার্সিটির দুই গবেষক, হাইয়ো অ্যাডাম আর অ্যাডাম গ্যালিনস্কি একটা শব্দ বানালেন: ‘এনক্লোদ্‌ড কগনিশন’। বাংলায় বলা যেতে পারে ‘পরিহিত মনন’, যদিও তাতে জিনিসটার মজাটা মরে যায়। তাঁদের বক্তব্য এই যে জামাকাপড় শুধু অন্যের চোখে আপনাকে বদলায় না, জামাকাপড় আপনার নিজের মাথার ভিতরের ধারণাটাও বদলে দেয়।

তাঁরা বেছে নিলেন সাদা ল্যাব কোট। প্রথমে ৩৮ জনকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলেন যে হ্যাঁ, লোকে সাদা ল্যাব কোট দেখলে মনে করে – মনোযোগী, সতর্ক, দায়িত্বশীল, বৈজ্ঞানিক। তাহলে যদি আপনি সেই কোটটা গায়ে চড়ান, আপনার মনোযোগ কি বাড়বে?

প্রথম পরীক্ষা করা হল স্ট্রুপ টেস্ট। যাঁরা জানেন না, ব্যাপারটা এই: স্ক্রীনে একটা শব্দ ভেসে উঠবে, ধরুন ‘লাল’ – কিন্তু লেখাটা নীল কালিতে। আপনাকে বলতে হবে কালির রঙ, শব্দটা নয়। শুনতে সহজ, করতে গিয়ে মাথা ঘুরে যায়, কারণ মস্তিষ্ক পড়া বন্ধ করতে পারে না। ১৯৩৫ সাল থেকে এই টেস্টকে মনোযোগ মাপার সোনার কাঠি বলা হয়। দেখা গেল, যাঁরা ল্যাব কোট পরে বসেছেন, তাঁরা কঠিন প্রশ্নগুলোতে প্রায় অর্ধেক কম ভুল করছেন সেই তুলনায় যাঁরা নিজের জামাতেই আছেন।

এখানেই থামলে গল্পটা বিশ্বাসযোগ্য হবে না হয়ত। প্রশ্ন উঠতেই পারে, সাদা কোটটা তো নিছক ‘ডাক্তার’ কথাটা মনে করিয়ে দিচ্ছে, তাতেই কাজ হচ্ছে না তো? গায়ে চড়ানোর দরকার কী?
তাই দ্বিতীয় পরীক্ষা। ৭৪ জন ছাত্রছাত্রীকে তিন ভাগে ভাগ করা হল। এক দলকে একই ডিসপোজেব্‌ল সাদা কোট পরানো হল, বলা হল এটা ডাক্তারের কোট। আর এক দলকে একদম হুবহু সেই একই কোট পরানো হল, শুধু বলা হল এটা শিল্পীর কোট, ছবি আঁকার সময় পরে। তৃতীয় দলকে কোটটা পরানো হল না, শুধু টেবিলে সাজিয়ে রাখা হল সামনে, বলে দেওয়া হল ওটা ডাক্তারের কোট। তারপর সবাইকে ‘দুটো ছবির মধ্যে চারটে তফাৎ খুঁজে বার করুন’ ধরণের কাজ দেওয়া হল – মনোযোগ ধরে রাখার পরীক্ষা।

ফল: ডাক্তারের কোট গায়ে থাকা দলটা বাকি দুই দলকে হারিয়ে দিল। আর বাকি দুই দলের মধ্যে, শিল্পীর কোট পরা দল আর ডাক্তারের কোট দেখা দল, কোন তফাৎই নেই!
অর্থাৎ কাপড়টা এক, সুতোটা এক, ওজন এক। বদলেছে শুধু নামটা। কোটের গায়ে যে অদৃশ্য লেবেলটা সাঁটা আছে – ‘ডাক্তার’ না ‘শিল্পী’ – সেটাই আপনার মনোযোগ ঠিক করে দিচ্ছে। এবং শুধু লেবেল যথেষ্ট নয়, গায়ে চড়াতেই হবে। দেখলে হবে না।

অ্যাডাম আর গ্যালিনস্কি লিখলেন, এনক্লোদ্‌ড কগনিশনের দুটো শর্ত: এক, জামার প্রতীকী অর্থ; দুই, জামাটা সত্যি সত্যি গায়ে দেওয়ার শারীরিক অভিজ্ঞতা। দুটো একসাথে না হলে কিছু হয় না।


এবং তারপর সেই পরীক্ষা ভেঙে পড়ল

অ্যাডাম-গ্যালিনস্কির পেপারটা হইহই করে বিখ্যাত হয়ে গেল। ছ’বছরে দুশোর বেশী উদ্ধৃতি, খবরের কাগজে লেখালিখি, টেড টক-এর মালমশলা। এবং তারপর, ২০১৯ সালে, ডেভিন বার্নস আর তাঁর সহকর্মীরা কাজটা আবার করলেন। এবারে আগে থেকে সব কিছু ঘোষণা করে – কী মাপব, কতজনের উপর, কীভাবে হিসেব কষব, সব রেজিষ্টার করা, যাতে ফল দেখে পরে অঙ্ক পাল্টানো না যায়। অনেক বেশী লোক, অনেক বেশী ট্রায়াল।


ভাবছেন কি পাওয়া গেল পরীক্ষায়? ল্যাব কোটের কোন প্রভাবই পাওয়া গেল না!

বার্নস দেখালেন, তাঁদের যন্ত্রপাতি এতই সূক্ষ্ম যে সাত মিলিসেকেন্ডের তফাৎও ধরা পড়ছে। কাজেই ‘ভুলটা আমাদের যন্ত্রের’ – এ ওজর চলবে না। ল্যাব কোটের এফেক্ট যদি থেকেও থাকে, সেটা এত ছোট যে মূল পরীক্ষায় ওটা ধরা পড়ারই কথা নয়।

এবার এই সময়েই বিজ্ঞানীদের সঠিক চরিত্র বোঝা যায়। অ্যাডাম আর গ্যালিনস্কি একই জার্নালে একটা উত্তর লিখলেন যা পড়ে উনাদের প্রতি সম্মান বেড়ে যেতে বাধ্য। তাঁরা লিখলেন, রিপ্লিকেশনের কাজটা যোগ্য হাতে হয়েছে, এবং তার ফল তাঁদের নিজেদের স্ট্রুপ-ফলাফল নিয়ে সত্যিকারের সন্দেহ তৈরী করছে। ঝগড়া নয়, গোঁজামিল নয়, ‘আমাদের বোঝোনি’ নয়। তারপর তাঁরা বললেন – কিন্তু মূল ধারণাটা, যে আমরা যা পরি তা আমাদের ভাবা-অনুভব-করা-আচরণকে প্রভাবিত করে, সেটা অন্য অনেক পরীক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছে।

এবং সেটা মিথ্যে নয়। যেমন ধরুন মাইকেল স্লেপিয়ানের কাজ, পাঁচটা পরীক্ষায় তিনি দেখিয়েছেন, ফর্ম্যাল পোশাক পরলে মানুষ বেশী বিমূর্ত ভাবে ভাবতে শুরু করে। গাছের দিকে না তাকিয়ে জঙ্গলটা দেখে, ছোট ছোট বিশদের বদলে বড় ছবিটা ধরে। মাঝখানে যে জিনিসটা কাজ করছে তা হল ‘ক্ষমতার অনুভূতি’ – টাই বাঁধলে যেমন নিজেকে খানিকটা তফাতের, খানিকটা উপরের মানুষ মনে হয়, আর দূর থেকে দেখলে সব কিছুই বড়-বড় দাগে দেখা যায়।

তার মানে, সাদা কোট পরে বসে থাকলেই আপনি খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করবেন - এই সহজ, লোভনীয়, ইনস্টাগ্রামে-ছড়ানোর-মত সিদ্ধান্তটা টেকে না। কিন্তু জামার সাথে মনের একটা যোগ আছে – সেটা একটা ঘটনা।


সাঁতারের পোশাক এবং একটা অঙ্ক পরীক্ষা

জামা যে কেবল আত্মবিশ্বাস বাড়ায় তা নয়। কখনো কখনো সে কেস কেলো-ও করে দেয়।

১৯৯৮ সালে বারবারা ফ্রেডরিকসন এবং তাঁর সহকর্মীরা একটা পরীক্ষা করেছিলেন যেটার কথা আমি প্রথমবার পড়ে বেশ ভেবেছিলাম। ছাত্রছাত্রীদের বলা হল, এটা ‘আবেগ এবং ক্রেতা-আচরণ’ নিয়ে একটা গবেষণা – তাদের কিছু জিনিসপত্র পরে দেখে মতামত দিতে হবে। তারপর প্রত্যেককে একা একা একটা ট্রায়াল রুমে ঢুকিয়ে দেওয়া হল, সামনে আয়না। অর্ধেককে দেওয়া হল একটা সোয়েটার। বাকি অর্ধেককে সাঁতারের পোশাক। সেই পোশাক পরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই তাদের কিছু প্রশ্নপত্র ভরতে দেওয়া হল, তারপর কিছু খাবার চাখতে দেওয়া হল, এবং শেষে একটা অঙ্ক পরীক্ষা।


ঘরে আর কেউ নেই, কেউ দেখছে না। তবুও -

মেয়েদের ক্ষেত্রে সাঁতারের পোশাক জন্ম দিল লজ্জা এবং একটা তীব্র আত্ম-বিতৃষ্ণার। তারা খাবার কম খেলো, নিজেকে সংযত করলো এবং অঙ্ক পরীক্ষায় খারাপ করলো সোয়েটার-পরা মেয়েদের তুলনায়। গবেষকদের ব্যাখ্যা: শরীরটাকে যখন বাইরের একজোড়া চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করি, তখন মাথার একটা বড় অংশ ওই পাহারা দেওয়ার কাজেই খরচ হয়ে যায়। অঙ্ক করার জন্য যা পড়ে থাকে, তা কম।

ছেলেদের ক্ষেত্রে? সাঁতারের পোশাক পরে তারা লজ্জা তো পায়নি বটেই বরং পেয়েছে তাদের হাসি। তারা লিখেছে নিজেদের ‘বোকা-বোকা’, ‘অস্বস্তিকর’, ‘হাস্যকর’ লাগছে। গবেষকরা রিপোর্টে লিখেছেন, ট্রায়াল রুমের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে কয়েকজনের হাসির আওয়াজ পাওয়া গিয়েছিল। তাঁদের খাওয়ায় কোন হেরফের হয়নি। অঙ্কেও না, বরং সামান্য ভালোই করেছিলেন।
একই ঘর, একই আয়না, একই কম কাপড়। একদলের কাছে সেটা ঠাট্টা, আর একদলের কাছে বিচারসভা।

এটা আমাদের বাড়ির ভিতরেও রোজ ঘটে, শুধু আমরা নাম দিই না। মেয়েটির ‘এই জামায় আমাকে মোটা লাগছে না তো?’ আর ছেলেটির ‘যা হোক একটা গলিয়ে নিয়েছি’ – এই দুটো বাক্যের মধ্যে যে অসমান দূরত্ব, তার একটা মাপ আছে, এবং সেই মাপটা কারো তৈরী করা।


বাজার এই পেপারগুলো পড়ে ফেলেছে

ভাবছেন এই যে সব গবেষণাপত্রের কথা লিখলাম, তারা শুধু জার্নালের পাতায় ধুলো খাচ্ছে? মোটেই না – মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টগুলো এগুলো আমাদের অনেক আগে পড়েছে।
‘অ্যাথলেজার’ শব্দটা শুনেছেন? অ্যাথলেটিক আর লেজার মিলিয়ে বানানো – ব্যায়ামের পোশাক, যা ব্যায়ামের বাইরেও পরা হয়। লেগিংস, জগার, হুডি, ইয়ো গা প্যান্ট। যে জিনিসটা জিমে পরার কথা ছিল, সেটা এখন অফিসে, ব্রাঞ্চে, মুদির দোকানে, বিমানবন্দরে। বাজারের মাপ? সমীক্ষা-সংস্থাগুলোর হিসেব একেক রকম, কিন্তু সবাই একমত যে ২০২৫ সালে এটা চারশো বিলিয়ন ডলারের [১ বিলিয়ন ডলার মানে মোটামুটি ১০০ কোটি টাকা] আশেপাশে দাঁড়িয়ে এবং আগামী দশ বছরে দ্বিগুণেরও বেশী হবে। একটা প্যান্টের ব্যবসা, যেটা কার্যত পঁচিশ বছর আগেও ছিল না।

২০১৯ সালে সারা লিপসন এবং তাঁর সহকর্মীরা প্রথমবার এই ট্রেন্ডটাকে শরীর-ভাবনার আয়নায় ফেললেন – কুড়িজন নিয়মিত অ্যাথলেজার-পরা মহিলার সাথে দীর্ঘ কথাবার্তা। যা বেরিয়ে এল, তা প্রায় নিখুঁত এক ফাঁদের নকশা।

এক, লেগিংস পরলে তাঁদের মনে হয় তাঁরা ফিট, স্বাস্থ্যসচেতন, আত্মবিশ্বাসী – পোশাকটা যেন একটা লাইফস্টাইলের সদস্যপত্র। এনক্লোদ্‌ড কগনিশন হাতেনাতে।

দুই, একই পোশাক শরীরটাকে এমন ভাবে ধরে রাখে যে যেখানে যেখানে ‘সমস্যা’, সেগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। একজন বলেছেন, আঁটোসাঁটো জিনিস পরলে আমি ঠিক বুঝতে পারি কোথায় কোথায় কাজ করতে হবে। আর একজন আরো এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, এই কারণেই তাঁর মাথায় প্লাষ্টিক সার্জারির কথা আসতে শুরু করেছে।

তিন, তাই তাঁরা জিমে যান। জিমে গিয়ে শরীর বদলায়, বদলটা লেগিংসে দেখা যায়, দেখে ভালো লাগে, আরো জিমে যান।

চার, এবং এটাই সবচেয়ে মনে হয় ইন্টারেষ্টিং – কুড়ি জনের মধ্যে উনিশ জনই স্পষ্ট বলেছেন যে এই গোটা ব্যাপারটা অবাস্তব, অসম্ভব, বিজ্ঞাপনের দুনিয়া বাস্তবের সাথে সম্পর্কহীন। তাঁরা জানেন, কিন্তু তবুও -

এটাকে গবেষকরা বলেছেন ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’। আমি বলব, এটাকে বলে ভালো ব্যবসা। আমার পিসতুতো দাদা অরবিন্দ যেটা ভালো বোঝে খুব! যে পণ্যটা আপনার অভাববোধ তৈরী করে এবং সেই অভাব মেটানোর পথও দেখায়, এবং যার দাম আশি ডলার – সেই পণ্যের চেয়ে নিখুঁত জিনিস বাজারে খুব বেশী নেই। জিমের সদস্যপদটা পর্যন্ত এত ভালো কাজ করে না, কারণ জিমে না গেলে অন্তত ব্যাপারটা চোখে পড়ে না। লেগিংস রোজ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হিসেব চায়!


ইউনিফর্ম – ক্ষমতার সবচেয়ে সস্তা রূপ

এবার একটু অন্য দিকে তাকানো যাক। আমাদের হাউসিং সোসাইটির সিকিউরিটি গার্ডরা অনেকেই যেভাবে ডেলিভারী বয়-গুলোকে হ্যাটা করে সেটা দিনের পর দিন দেখার পর এই দিকটা নিয়ে না কিছু লিখলে আমার নিজেরই খারাপ লাগবে।

১৯৯৬ সালে আমেরিকার শিক্ষা দপ্তর হিসেব করে দেখল, মাত্র ৩ শতাংশ সরকারী স্কুলে ইউনিফর্ম বাধ্যতামূলক। প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টন বললেন, ইউনিফর্ম ক্লাসঘরকে বেশী শৃঙ্খলাবদ্ধ, বেশী সুশৃঙ্খল করে তোলে – স্কুলগুলোর উচিত এটা চালু করা। ২০০৫ সালের মধ্যে সংখ্যাটা দাঁড়াল ১৪ শতাংশে। চারগুণেরও বেশী।


কিন্তু সত্যিই কি এত পজিটিভ এফেক্ট পাওয়া যায় ?

এলিসাবেতা জেন্টিলে আর স্কট ইমবারম্যান দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকার এক বিশাল শহুরে স্কুল ডিষ্ট্রিক্টের তথ্য নিয়ে বসলেন। সুবিধেটা এই যে সেখানে প্রতিটা স্কুল নিজে ঠিক করে ইউনিফর্ম চালু করবে কিনা, এবং আলাদা আলাদা বছরে করে। ফলে একই ছাত্রকে ইউনিফর্মের আগে আর পরে দু’ভাবেই দেখা যায়।

ফল? উঁচু ক্লাসে হাজিরা সামান্য বাড়ে, বছরে বাড়তি আধখানা দিন মত। শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় কোন উল্লেখযোগ্য হেরফের নেই। পরীক্ষার নম্বরে কার্যত কিছুই না।

তবে একটা জায়গায় বেশ বড় প্রভাব পাওয়া গেল, এবং সেটা প্রায় কেউ ভাবেইনি: প্রাথমিক স্কুলে ইউনিফর্ম চালু হবার পর শিক্ষকরা চাকরী ছেড়ে যাওয়া অনেক কমে গেল। গড়ে যেখানে পঁচিশ শতাংশ শিক্ষক প্রতি বছর চলে যেতেন, সেখানে পাঁচ শতাংশ কমে গেল।

অর্থাৎ ইউনিফর্মে ছেলেমেয়েদের কিছু বিশেষ হল না। যা হল, তা হল শিক্ষকদের। একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ ক্লাসঘরের চেহারা দেখলে শিক্ষকের নিজের মনে হয় জায়গাটা চালানোর মত। মজাটা এখানেই – ইউনিফর্ম শিশুদের বদলায় না, বদলায় শিশুদের দিকে তাকিয়ে থাকা লোকটাকে।

এই বিভ্রম কতদূর যেতে পারে, তার একটা মোক্ষম উদাহরণ পাওয়া যায় বেসরকারী নিরাপত্তারক্ষীদের ইউনিফর্ম নিয়ে লেখাপত্রে। আমেরিকার প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানীরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের লোকেদের প্রায়-পুলিশ পোশাক পরিয়ে এসেছেন – গাঢ় নীল শার্ট, ব্যাজ, বেল্টে ঝোলানো সরঞ্জাম। কারণ? লোকে ভয় পাবে, কথা শুনবে। ক্যালিফোর্নিয়ার আইনে এটা রীতিমতন নিষিদ্ধ – পোশাক এমন হতে পারবে না যাতে মনে হয় লোকটি সরকারী আইনরক্ষী।

আর যাঁরা এই নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁরা বলছেন, আইন বাদ দিলেও ব্যাপারটা ব্যবসার দিক থেকেই বোকামি। কারণ পুলিশের পোশাক পরলে মানুষ পুলিশের মত সেবা আশা করে – যা এঁরা দিতে পারেন না, দেবার অধিকারও নেই। আবার পুলিশের প্রতি মানুষের যত রাগ, বিরক্তি, তিক্ত অভিজ্ঞতা – সে সবও ছিটকে এসে এঁদের গায়ে লাগে। ঠকানোর চেষ্টা ধরা পড়লে মানুষ ক্ষমা করে না। লেখকদের যুক্তিটা চমৎকার: কর্তৃত্ব আসে আইন থেকে, আর ব্যক্তিগত গুণ থেকে। পোশাকের রঙ থেকে নয়। পৃথিবীর নানা দেশে পুলিশের পোশাক সাদা, খাকি, বাদামী, সবুজ, কালো – সব রকমই আছে। তাহলে কর্তৃত্ব কোন রঙে?


লাল স্নিকার এবং যাঁরা নিয়ম ভাঙার লাইসেন্স পান

এতক্ষণ পড়ে যদি ভাবেন তাহলে সবাই স্যুট পরাই ভালো, তাঁদের বলি একটু সবুর করুন। আমি নিজে যেহেতু কোট, স্যুট ইত্যাদি পরি না, তাই সেগুলো না পরলেও তেমন কিছু পার্থক্য হয় না এমন কিছু স্টাডির প্রতি দুর্বলতা আছে।

সিলভিয়া বেলেৎসা, ফ্রান্সেসকা জিনো আর অ্যানাট কেইনান, হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের এই তিনজন এক অদ্ভুত জিনিস দেখালেন, যার নাম দিয়েছেন ‘লাল স্নিকার এফেক্ট’। ধরুন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ফর্ম্যাল মিটিং-এ ঢুকলেন লাল স্নিকার পায়ে। বা ধরুন এক ভদ্রলোক দামী বুটিকে ঢুকলেন জিমের পোশাকে। ছাত্র বা দোকানের বিক্রেতা কী ভাবে?
গবেষণা বলছে – তাঁরা লোকটিকে বেশী উঁচু জাতের, বেশী ক্ষমতাশালী, বেশী যোগ্য বলে ধরে নেন। কারণ যুক্তিটা মাথার ভিতরে এই রকম চলে: এই লোকটা তো জানে নিয়মটা কী। তবুও ভাঙছে। মানে ভাঙার সামর্থ্য আছে। মানে ভয় পাবার কিছু নেই। মানে বড় লোক।

এই যুক্তিটা দিয়েই সিলিকন ভ্যালির হুডি, স্টিভ জবসের কালো টার্টলনেক, বিলিয়নেয়ারের ছেঁড়া জিন্স।

কিন্তু – এবং এই ‘কিন্তু’-টা বেশ জটিল - গবেষকরা খুব যত্ন করে দেখিয়েছেন কখন এই ম্যাজিক কাজ করে না। এক, যদি দর্শক জায়গাটাকে না চেনে (মানে নিয়মটাই যদি না জানে, তাহলে নিয়ম ভাঙাটা দেখবে কী করে?)। দুই, যদি মনে হয় লোকটা ইচ্ছে করে নয়, বেখেয়ালে ভুল করেছে। তিন, যদি সেখানে ফর্ম্যাল হবার কোন প্রত্যাশাই না থাকে।

অর্থাৎ, নিয়ম ভাঙার লাইসেন্স পাওয়া যায় কেবল তখনই, যখন সবাই জানে যে আপনার নিয়ম মানার আর দরকার নেই। আমার মত লোক টি-শার্ট পরে গেলে কোন ফ্যাক্টরির গেটে হয়ত দাঁড় করিয়ে দেবে – আর মার্ক জুকারবার্গ হুডি পরে গেলে সেটা দর্শন।

এ ব্যাপারটা আমাদের গ্রামের দিকে অন্য চেহারায় বহুদিন ধরে আছে। বড়লোক বড়ির কর্তা ময়লা ধুতি পরে বাজার করতে বেরুতে পারেন, তাতে কারো ভুল হয় না। ভুল হয় না কারণ সবাই জানে ধুতিটা কার। দারিদ্র্য আর সাদাসিধেপনার মধ্যে যে তফাৎ, সেটা কাপড়ে নয় – সেটা দর্শকের মাথায়।


লিফটের পাশের আয়না

সমাজতত্ত্বে এই গোটা ব্যাপারটার একটা সুন্দর ব্যাখ্যা আছে, যেটা দিয়েছিলেন গ্রেগরি স্টোন, ১৯৬২ সালে। তাঁর মতে পোশাক দিয়ে পরিচয় তৈরী হয় দুটো ধাপে। প্রথম ধাপ – যাকে তিনি বলেছেন ‘প্রোগ্রাম’ – আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখি এবং ঠিক করি আমি কী বলতে চাইছি। দ্বিতীয় ধাপ – ‘রিভিউ’ – অন্যরা আমাকে দেখে এবং প্রতিক্রিয়া জানায়। দুটো যদি মিলে যায়, আমার ‘আমি’-টা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যদি না মেলে? তাহলে, স্টোন বলছেন, মানুষ নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করে। ভাবলে বেশ ভজকট মনে হয়! মানে আমার নিজের সম্পর্কে ধারণাটা পুরোপুরি আমার নিজের হাতে নেই। ওটা একটা যৌথ প্রকল্প, যেখানে ভোট দেয় বাসের সহযাত্রী, অফিসের রিসেপশনিষ্ট, আর গেটের সিকিউরিটি ছেলেটি।

সাংগঠনিক পোশাক নিয়ে কাজ করা এক গবেষকদলের একটা কথা মাথায় গেঁথে গেছে। তাঁরা বলছেন, অফিসের সবচেয়ে অবহেলিত অথচ সবচেয়ে ক্ষমতাশালী যন্ত্রটি হল আয়না এবং লক্ষ্য করুন, আয়নাগুলো সাধারণত বসানো থাকে লিফটের পাশে। কেন? কারণ ঠিক ওইখানেই দুটো জগতের সীমানা - ঘর আর অফিস, ব্যক্তিগত আর সরকারী। কলার ঠিক করে নেওয়া, চুলে হাত বুলিয়ে নেওয়া, শাড়ির আঁচলটা টেনে দেওয়া – ওটা প্রসাধন নয়। ওটা সীমান্তে পাসপোর্ট দেখানো।


এবং একটা নতুন জামার গন্ধ

তাহলে কি দাঁড়ালো মোটের উপর? এত পরীক্ষা, এত পরিসংখ্যান, এত ব্যাখ্যা! কিন্তু আমাদের অনেকের মনে যে ছবিটা বা ছবিগুলো আসল হিসেবে গেঁথে থাকে, সেটা কোন জার্নালে ছাপা নেই।

ছোটবেলায় বছরে জামা হত কটা? গোটা কয়েক এবং তাদের প্রায় সব কটাই কেনা হত দুর্গা পুজোয়। কেনা হত মাসখানেক আগে, তারপর আলমারীতে তোলা থাকত, প্লাষ্টিকের প্যাকেট সমেত। মাঝে মাঝে খুলে দেখা হত বাড়িতে কেউ এলে। শুঁকে দেখা হত। নতুন কাপড়ের সেই গন্ধ – একটু কড়া, একটু মিষ্টি, খানিকটা রঙ আর খানিকটা মাড় – ওটা আসলে গন্ধ ছিল না, ওটা ছিল একটা প্রতিশ্রুতি। পুজোর সকালে ওটা গায়ে চড়ালে আমি একটু অন্য মানুষ হয়ে যাব।

এবং হতাম না কি আমরা? আমার তো মনে হয় সত্যিই হতাম এবং এখনো অনেকেই হয়। বুক চিতিয়ে হাঁটতাম, পাড়ার যে ছেলেটার সাথে ঝগড়া তার সামনে দিয়ে বার তিনেক ঘুরে আসতাম, আর মন্ডপে যে মেয়েটি প্রতি বছর আসত তার দিকে খানিকটা বেশী সাহস নিয়ে তাকাতাম। অ্যাডাম আর গ্যালিনস্কি এটার নাম দিয়েছেন এনক্লোদ্‌ড কগনিশন। আমরা নামটা জানতাম না, কিন্তু জিনিসটা জানতাম।

তফাৎ শুধু এই যে তখন জামাটা ছিল একটা ঘটনা – বছরে একবার। আর এখন জামা একটা অবিরাম ব্যবস্থা। এখন কেউ আপনাকে প্রতিশ্রুতি বিক্রী করে না; বিক্রী করে একটা অভাববোধের সাবস্ক্রিপশন। লেগিংস কিনবেন যাতে ফিট মনে হয়, ফিট নন বলে জিমে যাবেন, জিমের জন্য আরো লেগিংস কিনবেন। স্যুট কিনবেন যাতে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, তারপর দেখবেন সহকর্মীর স্যুটটা আরো ভালো।

গবেষণাগুলো পড়ে আমি এই সিদ্ধান্তে আসিনি যে কাল থেকে টি-শার্ট পরে অফিস যাব – সেটাতে নতুন কিছু নেই, কারণ আমি ট-শার্ট আর জিন্স পরেই অফিস যাই। তাহলে এই বিষয়ের পেপারগুলো পড়ি কেন? আসলে ব্যাপারটা বুঝতে চাই – বুঝতে চাই মানুষের মনস্তত্ত্ব। তো যা বুঝলুম তার একটা দিক হল, সরল ভাবে বললে - সকালে একটা জামা বাছি যেটা পরে অফিসে যাব, আর সারাদিন ধরে অন্যের জামা দেখে তাদের বিচার করি। প্রথম কাজটা নিয়ে আমরা অনেক ভাবি, অনেক খরচ করি, অনেক দুশ্চিন্তা করি।

দ্বিতীয় কাজটা নিয়ে আমরা কার্যত কিছুই ভাবি না। ওটা হয়ে যায়, আপনা আপনি, নিঃশব্দে, চোখের পলক পড়ার আগেই। ফরসাইথের ভিডিওতে আওয়াজ ছিল না – তবুও ১০৯ জন লোক দিব্যি বলে দিলেন কে চাকরীটা পাবার যোগ্য।

আমার মনে হয়, বদলানোর জায়গাটা ওইখানে। নিজের জামাকাপড় নিয়ে যত মাথা ঘামাই, তার এক শতাংশও যদি অন্যের জামাকাপড় নিয়ে নিজের জাজমেন্ট-টাকে চ্যালেঞ্জ করার কাজে খরচ করতাম, তাহলে হয়ত সামগ্রিক পরিস্থিতি উন্নতি হবার ব্যাপারে আমার নিজের একটু অবদান থাকত!

এখন প্রশ্ন হল, আজ সকালে আপনি যে পোষাকটা পরে বেরিয়েছেন – সেটা কে বেছেছে? আপনি? না কি আজ যাদের সাথে দেখা হবে, তারা?




তথ্যসূত্র


1) Adam, H., & Galinsky, A. D. (2012). Enclothed cognition. Journal of Experimental Social Psychology, 48(4), 918–925.
2) Burns, D. M., Fox, E. L., Greenstein, M., Olbright, G., & Montgomery, D. (2019). An old task in new clothes: A preregistered direct replication attempt of enclothed cognition effects on Stroop performance. Journal of Experimental Social Psychology, 83, 150–156.
3) Adam, H., & Galinsky, A. D. (2019). Reflections on enclothed cognition: Commentary on Burns et al. Journal of Experimental Social Psychology, 83, 157–159.
4) Slepian, M. L., Ferber, S. N., Gold, J. M., & Rutchick, A. M. (2015). The cognitive consequences of formal clothing. Social Psychological and Personality Science, 6(6), 661–668.
5) Forsythe, S. M. (1990). Effect of applicant's clothing on interviewer's decision to hire. Journal of Applied Social Psychology, 20(19), 1579–1595.
6) Fredrickson, B. L., Roberts, T.-A., Noll, S. M., Quinn, D. M., & Twenge, J. M. (1998). That swimsuit becomes you: Sex differences in self-objectification, restrained eating, and math performance. Journal of Personality and Social Psychology, 75(1), 269–284.
7) Lönnqvist, J.-E. (2017). Just because you look good, doesn't mean you're right. Personality and Individual Differences, 108, 133–135.
8) Berggren, N., Jordahl, H., & Poutvaara, P. (2017). The right look: Conservative politicians look better and voters reward it. Journal of Public Economics, 146, 79–86.
9) Hamermesh, D. S. (2011). Beauty Pays: Why Attractive People Are More Successful. Princeton University Press.
10) Lipson, S. M., Stewart, S., & Griffiths, S. (2020). Athleisure: A qualitative investigation of a multi-billion-dollar clothing trend. Body Image, 32, 5–13.
11) Gentile, E., & Imberman, S. A. (2012). Dressed for success? The effect of school uniforms on student achievement and behavior. Journal of Urban Economics, 71(1), 1–17.
12) Bellezza, S., Gino, F., & Keinan, A. (2014). The red sneakers effect: Inferring status and competence from signals of nonconformity. Journal of Consumer Research, 41(1), 35–54.
13) Johnson, K., Lennon, S. J., & Rudd, N. (2014). Dress, body and self: Research in the social psychology of dress. Fashion and Textiles, 1:20.
14) Johnson, K. K. P., Yoo, J.-J., Kim, M., & Lennon, S. J. (2008). Dress and human behavior: A review and critique. Clothing and Textiles Research Journal, 26(1), 3–22.
15) Lennon, S. J. (2012). Clothing and adornment: Social psychology perspectives. In Encyclopedia of Body Image and Human Appearance (pp. 321–327). Elsevier.
16) Fredrickson, B. L., & Roberts, T.-A. (1997). Objectification theory: Toward understanding women's lived experiences and mental health risks. Psychology of Women Quarterly, 21(2), 173–206.
17) Stone, G. P. (1962). Appearance and the self. In A. M. Rose (Ed.), Human Behavior and Social Processes. Houghton Mifflin.
18) Sena, J. F. (2015). Presenting a professional image. In Conflict Management for Security Professionals (Ch. 4). Elsevier/Butterworth-Heinemann.
19) Harding, N., & Tomkins, L. (2012/2013). 'Do I look right?' De-familiarizing the organizational fashioning of the body. European Management Journal (organizational dress and the mirror).
20) Glick, P., Larsen, S., Johnson, C., & Branstiter, H. (2005). Evaluations of sexy women in low- and high-status jobs. Psychology of Women Quarterly, 29(4), 389–395.
21) Morris, T. L., Gorham, J., Cohen, S. H., & Huffman, D. (1996). Fashion in the classroom: Effects of attire on student perceptions of instructors in college classes. Communication Education, 45(2), 135–148.
22) Fortune Business Insights / Grand View Research (2026). Athleisure Market Size, Share & Growth Reports (global market estimates, 2025–2026).




 ***গুরুচন্ডালী প্ল্যাটফর্মে সুকান্ত ঘোষের নিজস্ব ব্লগ থেকে নেওয়া। 

0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়

Posted in




















দু’মাস আগে কবি নজরুলের জন্মদিন পালন হয়ে গেছে। কিন্তু তাঁকে নিয়ে বিতর্ক এবং টানাটানি এখনও চলছে। জন্মেছিলেন রাঢ় বাংলার চুরুলিয়া গ্রামে। কিন্তু হয়ে উঠেছেন পড়শি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। আহা, তাতে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল? কোলকাতার জোড়াসাঁকোর রবীন্দ্রনাথের লেখা গান “আমার সোনার বাংলা” কি পদ্মাপারের জাতীয় সংগীত নয়? তাহলে নজরুল কী দোষ করলেন? বাংলাদেশ ওনার শ্বশুরবাড়ি বটে!

কিন্তু নজরুলের মত নেওয়া হয়েছিল কি? কী মুশকিল, রবীন্দ্রনাথেরও নেয়া হয় নি। তাতে কী?


কেউ ভোলে না কেউ ভোলে

পঞ্চাশের দশক। প্রাইমারি ক্লাসে পড়ছি। নজরুলের নাম শুনেছি শুধু, কবিতা টবিতা পড়া হয় নি। গান? নাঃ। একটা চূণের ডাব্বামার্কা রেডিও। তাতে ভক্তিমূলক গান, পল্লীগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত এই সব শোনা হয়। বেশিরভাগ সময় ওটা দাদু ঠাকুমার দখলে। আমরা শুনতাম শনি-রোববারে অনুরোধের আসর। ওই গানগুলো বিভিন্ন উৎসবের সময় চারদিকে ঝমঝমিয়ে বাজে। লাইনগুলো মুখস্থ হয়ে যায়। নজরুলগীতিকে ভীড়ের মধ্যে আলাদা করে চেনার মত সুযোগ ও কান তৈরি হয় নি।

তবে কাকাদের ব্যাচেলর্স ডেনের দেয়ালে অনেক ফটো টাঙানো। প্রথমে চুলদাড়িওলা কজন—দেখলে কীরকম সাধুবাবা সাধুবাবা ফীলিং হয়। এঁদের মধ্যে শুধু রবি ঠাকুরকে চিনি। দেখলেই গড় হয়ে ‘ঠাকুর নম’ বলতে ইচ্ছে হয়। তারপরে লেনিন দাদু, স্তালিন দাদু, পাগড়ি মাথায় ঋষি বঙ্কিমের পর আলাদা করে দু’জন।

একজন গালে হাত দিয়ে ঘুম ঘুম চোখে কিছু ভাবছেন। ঠিক করে গোঁফ ওঠেনি। দেখলে একডাকে কবি বলে চেনা যায়। উনি রানার বলে হেমন্তের গাওয়া হিট গানটার পদ্য লিখেছেন। পাশে আরেকজনের গোঁফদাড়ি নেই, কিন্তু মাথায় বাবরি চুল। বড় বড় টানা টানা চোখ, কেমন গল্পের রঘু ডাকাতের মত।

কাকাদের ধমক খাই। উনিও বড় কবি। ছোটকা একটা সুন্দরমত বই ধরিয়ে দেয়—গাঢ় সবুজ ডাঁটি ও পাতার উপর রক্তলাল পপি ফুল। বইটির নাম সঞ্চিতা। মায়ের বিয়েতে পাওয়া কালো রঙে বাঁধানো ‘সঞ্চয়িতা’ থেকে দাদু অনেক কবিতা পড়ে শোনায়। ওটা রবি ঠাকুরের বই। তা ইনি সঞ্চিতা নাম রাখলেন কেন? রবি ঠাকুরের নকল করে কবিতা লেখেন? ফের কানমলা।

--বোকার মত কথা না বলে পড়ে দেখ।

হুঁ, পাতা ওল্টালাম—“বাতায়ন পথে গুবাক তরুর সারি”! বাতায়ন মানে জানি, কিন্তু গুবাক? শব্দটা বিচ্ছিরি। বইটা রেখে দিলাম। দেখি ছোটকা কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। ফের তুলে নিলাম।

“সেদিন দেখিনু রেলে

কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে।

চোখ ফেটে এল জল।

এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল”?


আরে, এ তো সত্যি কথা! আরো ছোট বয়সে কাকাদের কোলে উঠে হাওড়া স্টেশনে গিয়েছিলাম। ঠিক এমন ঘটনা দেখেছি। লাল কুর্তা ও ময়লা ধুতি পরা, হাতে নম্বর লেখা পেতলের চাকতি বাঁধা হিন্দি বলা কুলিকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হোল। যা কানে এল—চার আনায় রফা হয়েছিল। কিন্তু মাল তোলার পর বাবুসাহেব একটা হলদেটে দু’আনি ছুঁড়ে দিলেন। কুলি নেবে না।

প্ল্যাটফর্মে উঠে দাঁড়িয়ে মানুষটা গায়ের ধূলো ঝেড়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে কু--ঝিক ঝিক করে এগোতে থাকা রেলগাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর চোখে জল ছিল না, আগুনও না। কেমন যেন গরুর মত বোবা দৃষ্টি।

নজরুল যেন আমার মনের কথা, ওর বোবা চোখের ভাষা নিয়ে লাইনটি লিখেছেন-- এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল? কিন্তু তারপরে ঘ্যান ঘ্যান করেন নি।

গর্জে উঠেছেন—“বেতন দিয়াছ? চোপরও যত মিথ্যাবাদীর দল!

                            কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোড় পেলি বল”!

আহা, বুকের মধ্যে দুর্গাপূজোর ঢাক বেজে উঠল। আকাশে গুর গুর করে মেঘ ডাকল।

খোলাখুলি বাবুসাহেবদের মিথ্যেবাদী বলা! চোপরও বলে ধমক দেয়া! এমন তো দেখিনি শুনিনি।

আর “এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল”? এই লাইনটা উনি লিখেছেন আমার জন্যে। আমি একা নই, আমার মত দুর্বলদের জন্যে। মানে যারা গায়ে গতরে রোগা প্যাংলা, খ্যাংরাকাঠি আলুর দম গোছের। যারা হাতাহাতিতে কখনই পেরে ওঠে না। শুধু মার খায়।

মার খায় স্কুলে, মার খায় খেলার মাঠে। আমাদের দেখলেই অন্যেরা চিনতে পারে—সহজ শিকার। এদের পেটানো যায়। এরা মাস্টারমশাইয়ের কাছে নালিশ করবে না। বাড়ি গিয়ে কেঁদে কেটে বাবা কাকাদের ডেকে আনবে না। মুখ বুজে মার খাবে।

কোন কোন টিম যেমনি ওপেনিং জুড়ি আউট হলেই দান ছেড়ে দেয়। ব্যাট বগলে প্যাভিলিয়ন থেকে এক এক করে আসে আর ফিরে যায়। তেমনই এরা মারামারি শুরু হলেই অপেক্ষা করে কখন মার খেয়ে মাটিতে পড়ে যাবে।

কিন্তু ভগবান আছেন। উনি কি একদিন এইসব অন্যায়ের বিচার করবেন না? নজরুল কিছু বলেন নি? ‘সঞ্চিতা’ ‘সঞ্চয়িতা’র কবিতার বৈচিত্র্যের ঢেউয়ে কয়েক বছর চাপা পড়ে গেল।

কিন্তু কয়েক বছর পরে ক্লাসের পাঠ্য বইয়ের সংকলনে পেলাম মনের মত উত্তর—“ফরিয়াদ”। শব্দটা আগে কখনও শুনিনি। উকিল দাদু বললেন—আসামী ও ফরিয়াদী। এখানে ফরিয়াদ মানে নালিশ। কার কাছে? ভগবানের কাছে।

বুকের পাটা আছে নজরুলের। সোজা ভগবানের কাছে নালিশ! কোন “ও অনাথের নাথ, ও অগতির গতি” বলে কান্নাকাটি, ভালভাবে বললে করুণ আর্তি, করা নয়। সোজা নালিশ।

“মাগে প্রতিকার, উত্তর দাও, আদিপিতা ভগবান”।

দারুণ লাগল। এই হোল কবিতা। হ্যাঁ, আগে রবি ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতা পড়েছি। সেটা অসাধারণ। কিন্তু উনি ভগবানকে প্রশ্ন করেছেন –তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো”?

কিন্তু নজরুল করেছেন নালিশ।

সে নালিশের বিশাল ফিরিস্তি, পাতার পর পাতা জুড়ে। ভগবানের রাজ্যে কত অবিচার, কত অন্যায়। তো ভগবান করেন কি! নিজের ডিউটি ঠিকমত করেন না?

পড়তে লাগলামঃ

“শ্বেত-পীত-কালো করিয়া সৃজিলে মানবে সে তব সাধ,

আমরা যে কালো তুমি ভালো জান নহে তাহা অপরাধ”।

আরে! এটাও আমার কথা। হরদম কালো বলে ব্যঙ্গবিদ্রূপ শুনি, --কালোভূত! কেলটে। জন্মেছি কালো হয়ে যদিও মা ফরসা—কিন্তু সেটা কি আমার দোষ! কিন্তু নজরুল কী করে টের পেলেন আমার কষ্ট? উনিও কি কালো?

কিন্তু শেষের দিকে এসে থমকে যাই। খানিক ভাবি, তারপর উল্লাসে ফেটে পড়ি।
“ওই দিকে দিকে বেজেছে ডংকা, শংকা নাহিক আর,

মরিয়ার মুখে মরণের বাণী উঠিতেছে মার! মার!”

নজরুল খোলাখুলি মারতে বলেছেন। উদোম ক্যালাতে বলছেন, কাদের? ওই যারা এতদিন ধরে তোমাদের মারছে তাদের। শুনতে বেশ ভাল লাগে। মারের পালটা মার!

তারপর ঘাবড়ে যাই। না, আমি কাউকে মারতে পারব না। তাহলে কী করব? পালিয়ে যাব, টেনে দৌড়? ওসব কিছু নয়। দলবেঁধে মার মার করে পকেটমারকে ক্যালাও? না, ওর মধ্যে আমি নেই। ভগবান ফরিয়াদ শুনছেন। একদিন তাঁর ন্যায়ের দণ্ড নেমে আসবে। সব ধর্মই এই আশ্বাস দেয়। আপাত আশ্বস্ত হওয়া যাক।

আচ্ছা, নজরুল নিজে কখনও কাউকে মেরেছেন? মারামারি করেছেন?

মনে পড়ল দেশ পত্রিকায় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ধারাবাহিক লিখতেন “কেউ ভোলে না কেউ ভোলে”।

বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের ছেলেবেলার স্মৃতি, বিশেষ করে বাল্যবন্ধু কোন এক দুখু মিঞার কথা।

--ছোটকা উনি কে?

-- উনি কল্লোল যুগের তিন মহারথী। কল্লোল পত্রিকার থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের অন্যতম—শৈলজানন্দ, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও অচিন্ত্যকুমার।

--মানে ঘনাদা ও পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ?

--দূর গাধা! তোর কথাটা ভুল নয়, আদ্দেক সত্যি।

--আর দুখু মিঞা?

--আরে উনিই তো বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম।

--বিদ্রোহী কবি কেন?

--উনি একটা কান্ড করেছিলেন। সারারাত জেগে লিখলেন একটা অন্যরকম কবিতা –বিদ্রোহী। তারপর সাত সকালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সামনে গিয়ে রাস্তা থেকে পাড়াজাগানো চিৎকার।

রবি ঠাকুর অবাক হয়ে দোতলার বারান্দা থেকে জিজ্ঞেস করলেন—কী ব্যাপার কাজী?

“গুরুদেব! আমি তোমায় হত্যা করব”!

সে কী! উনি পুলিশ ডাকেন নি?

--আরে বোকারাম! এ হত্যা সে হত্যা নয়। উনি চেয়েছিলেন বাংলা কবিতার ধারা বদলে দিতে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সেই কাজটা করেছিল। ছন্দে, মাত্রা বদলে, শব্দ চয়নে ও পুরাণকথার রূপক মিলে সে এক কাণ্ড। বাংলা কবিতায় বাঁধা পথের বাইরে পা ফেলা। প্রথম লাইনেই চমকঃ

“বল বীর

চির উন্নত মম শির।

শির নেহারি আমারি নতশির ওই

শিখর হিমাদ্রীর”।

আরও শোনঃ

আমি পিণাকপাণির ডমরুত্রিশূল ধর্মরাজের দণ্ড

আমি চক্র, মহাশংখ, প্রলয়নাদ প্রচণ্ড।

আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,

আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ।

আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,

আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুংকার”।

ছোটকার আবৃত্তি চলতে থাকে। আমি ভেসে যাই অনুপ্রাসের ঝংকার আর নতুন ধরণের শব্দের ছবির সারি দেখতে দেখতে। সাইক্লোন, ধ্বংস, পেরিয়ে সমস্ত নিয়মের শৃংখল ভেঙে টর্পেডো ভাসমান মাইন সব হয়ে বিদ্রোহী হঠাৎ মহর্ষি ভৃগু হয়ে ভগবান বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিচ্ছেন। কিন্তু আচমকা একি?

“আমি চিত-চুম্বন-চোর কম্পন

আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!

আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর”!

এবার কেমন কেমন লাগছে। উনি কোন কুমারী মেয়েকে স্পর্শ করেছেন! মরেছে! আর গ্রামের মেয়ের কাঁচলি নিয়ে চিন্তা করা, কল্পনা করা! এই কবি নির্ঘাৎ--

ছোটকাকে কবিতার নেশায় পেয়েছে। আবৃত্তি চলছেঃ

--“একি উন্মাদ ! আমি উন্মাদ! আমি সহসা আমারে চিনেছি আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ”।

বুঝেছি, এমন অকপট সত্যি বলতে উনিই পারেন। কিন্তু দুর্বলের পক্ষ নিয়ে কথা বলা সেই কবি কোথায় গেলেন? না, না। এই তো উনি পরশুরামের কুঠার হতে চাইছেন। কেন রে বাবা!

“যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না-

অত্যাচারীর খড়গকৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না,

বিদ্রোহী রণক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত”।

ভাল লাগে। একটা অন্যরকম অনুভূতি। যেমন শরতের ভোরে মহালয়ার পাঠে মহিষাসুর বধের পর বুকের ভেতরে হয়।

‘আমি সেইদিন হব শান্ত’।

বাঃ, কিন্তু উনিই কি শৈলজানন্দের বাল্যবন্ধু দুখু মিঞা। অবাক লাগে। আরে ছোটবেলায় কিছু না কিছু টের পাওয়া যায়। যেমন সাভারকর ছোটবেলায় তাঁর জন্মভূমি ভাগুর গাঁয়ে বাচ্চাদের দলবল জুটিয়ে রাতের অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে একটা পুরনো মসজিদের কাঁচ ভেঙে ছিলেন।

কিন্তু দুখু মিঞার বিদ্রোহ কোথায়? বরং বেশ কোমল কবি কবি ভাব। একটা চড়াই পাখির ছানা ওড়ার চেষ্টা করে পড়ে যাওয়ায় মা-চড়াইয়ের কষ্ট নিয়ে কবিতা লিখলেন। ওদিকে রবি ঠাকুরকে ছোটবেলায় দেখুন।

“আমসত্ত্ব দুধে ফেলি তাহাতে কদলী দলি

সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে।

হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ

পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে”।

বেশ, বামুন বাড়ির ফলার খাওয়া পেটুক ছেলের ছবি।


ভুল ভেঙে গেল। দুখু মিঞা কোন ব্যতিক্রম নন। ছোটবেলা থেকেই রোমান্টিক। বন্ধু শৈলজানন্দের সংগে পাল্লা দিয়ে লিখে ফেললেন কোন রাণীমার গড় নিয়ে আবেগঘন কবিতাঃ



“ওই ঝাউয়ের পাহাড়ে নীরব চিতাটি রাণীমার,

ও যে দপদপ জ্বলে লোকে বলে আলো আঁধিয়ার।

এই নিভে যায়, ওই জ্বলে ওঠে

থমকি চমকি পছি দিকে ছোটে

মিশে যায় শেষে রাজগড়ে উঠে

আবার তেমনই আঁধিয়ার।

বাচ্চা দুখু মিঞার শব্দচয়নে রবি ঠাকুরের প্রভাব স্পষ্ট। আহা, তাতে কী? বড় কবি অচিন্ত্য কুমারের রচনায় নেই? করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায়? কিন্তু আবেগ ও ছন্দের হাত? ওটা সবার হয় না, যার হয় তার হয়।

যেমন গলায় সুর ও কানে তালের বোধ--সবার থাকে না, যার আছে তার আছে।

দুখু মিঞা বড় হয়ে যখন নজরুল হলেন, তাঁর ছন্দ, অন্ত্যমিল এবং অনুপ্রাস অলংকার নিয়ে মারকাটারি নৈপুণ্যে ঘায়েল হয়ে কবিশেখর কালিদাস রায় লিখলেন –“নজরুল আমাদের কবিতা লিখতে দেবে না দেখছি। ও ‘অলস বৈশাখে’র সংগে ‘কলস কই কাঁখে’ মিলিয়েছে”।

বটেই তো।

“জল আনতে চললি যে তুই অলস বৈশাখে,

-----কলস কই কাঁখে”।

কিন্তু দুখু মিঞা যে মহা আড্ডাবাজ, ইয়ার্কিদেনেওয়ালা। এক বন্ধুর পাঠশালা পেরোনো হয় নি, কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা সফল ব্যবসায়ী। কনেবৌ বাপের বাড়ি থেকে স্বামীকে চিঠি লিখেছে।

ভাষাটা এইরকমঃ

“তুমি ভাল আছ। আমি কেমন আছি। ইতি-“।

সেই চিঠি পড়ে বন্ধুটি প্রেমে উলুত পুলুত। চিঠির জবাব লিখলেন শৈলজানন্দ। গোলাপি রঙের দামি কাগজের উপর বাঁদিকে ছোট করে ঠোঁটে চিঠি বয়ে নিয়ে যাওয়া পাখির মনোগ্রাম ছাপা।

দুখু মিঞা খুব হাসল। দেখল পাখির ছবির নীচে ছাপা রয়েছেঃ

“যাও পাখি, বোল তারে

সে যেন ভোলে না মোরে”।

বলল—“আর বোল এ চিঠিটি

লিখে দেছে শৈল।

বোল না বোল না যেন,

এ দিব্যি রইল”।

তো দুখু যে নজরুল হয়ে ঢাকায় আশু সোমের বাড়িতে কিশোরী রাণু সোমের (প্রতিভা বসু) পরিবেশন করা চা দেখে গেয়ে উঠবে “এত চা ওইটুকু কাপে, পাষাণী আনলে বল কে”—সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুখু যে নজরুল হয়ে গেছে। তাই দু’লাইনের চটজলদি ছড়ার রূপান্তর ঘটল চমৎকার এক গানে—“ এত জল ওই কালো চোখে, পাষাণী আনলে বল কে”।

আর ফক্কুড়ি? হো হো করে হাসির সংগে “দে গরুর গা ধুইয়ে”!

কিন্তু দুখু বিদ্রোহী নজরুল হলেন কী করে? বা ঠিক করে বললে কবে? সেই যে পেটের দায়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ফৌজে যোগ দিয়ে আফগানিস্তান ঘুরে এলেন, তখন উনি হাবিলদার দুখু মিঞা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে। অটোমানের সুলতানের বা খলিফার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শাসন তথা ধার্মিক নিদানের অধিকার টলটলায়মান। কারণ, ব্রিটিশ সরকারের হুকুম এবং তুরস্কে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আধুনিকতার জয়গান। উনি আইন করে খলিফাগিরি বন্ধ করে দিলেন।

কিন্তু সহজে কেউ ক্ষমতা ছাড়ে? তার আগে ভারতে মুসলমানদের মধ্যে শুরু হোল খিলাফত আন্দোলন, যার উদ্দেশ্য অটোমান সুলতানের খলিফাগিরি বহাল রাখা।

গান্ধীজি ভাবলেন—ইংরেজের বিরুদ্ধে হিন্দুদের সংগে মুসলিমদের একসাথে আনার সুবর্ণ সুযোগ। উনি খিলাফতের সমর্থন করলেন। কিন্তু ভারতীয় মুসলিম, কাজী পরিবারের নজরুল ইসলাম, উলটোপথে হাঁটলেন।

সংস্কারের সমর্থনে লিখে ফেললেন—“কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই”!

তাহলে কি উনি মুসলিম নন? কে বলল নন? তাহলে “মোহম্মদী” পত্রিকায় কেন প্রবন্ধ লিখতেন? কী করে লিখলেন ঈদের গান, আর এই গানটাঃ

“সাহারাতে ফুটল যে ফুল,

সেই ফুলেরই জ্বালা।

কেউ বলে হজরত মোহম্মদ

কেউ বা কমলিওয়ালা”।

আর কী প্রমাণ চাই?

বেশ, কিন্তু এদিকে মালকোষে এইরকম গান লিখেছেন যে!

“গরজে গম্ভীর গগনে কম্বু

নাচে শংকর নাচে স্বয়ম্ভু”।

আবার “মহাকালের কোলে এসে গৌরী হল মহাকালী”।

থামো, থামো; আরও আছে।

কতগুলো আগমনী গান আর দেবী দুর্গাকে নিয়ে বন্দনা গান বল দিকি?

গুনতে শুরু করঃ

“এলো রে শ্রীদুর্গা শ্রী আদ্যাশক্তি”, “জয় দুর্গা দুর্গতিনাশিনী”, “আয় মা উমা রাখো এবার”---

ব্যস্‌ ব্যস, এতেই হবে। তাহলে নজরুল কী? হিন্দু না মুসলমান? প্রতিমা পূজা বা ‘বুত-পরস্তি’ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়?

নজরুল নিজেই উত্তর দিয়ে গেছেনঃ

“হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?

কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার”।

তবু লোকের জিভ নড়ে, আজও নড়ে।

তাই লিখতে হয়ঃ

“সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন ‘আড়ি চাচা’!

যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা”।



খেয়াল করি, নজরুলের কবিতা ও গানে দুর্গা আনন্দময়ী দেশমাতৃকা হয়ে যান। যুদ্ধ থেকে ফিরে ইংরেজ তাড়ানোর ইচ্ছে ওর মনে প্রবল। ওঁর আগুন ঝরানো সম্পাদকীয়ের চোটে একের পর এক পত্রিকা নিষিদ্ধ হচ্ছে। আর নামগুলো কী—লাঙল, ধূমকেতু, নবযুগ আরও অনেক।

মিনার্ভা থিয়েটারে মহাষষ্ঠীর দিন অভিনীত “দেবী দুর্গা” নাটকের জন্যে গান লিখলেন নজরুল। মন্মথ রায়ের “কারাগার” নাটকের জন্যেও। “আগমনী” কবিতায় উনি দুর্গার বন্দনা করলেন ‘রণরঙ্গিনী’ রূপে। “দশদিকে তাঁর দশ হাতে বাজে

বাজে দশ প্রহরণ”।

দুর্গাকে ‘বেটি’ বলে আদর করে ডেকে আহ্বান করছেন লড়াইয়ের ময়দানে নামতে-- ‘ঢাল-তরবার’ নিয়ে ধ্বংস করতে ‘অত্যাচারী শক্ত চাঁড়াল’—স্পষ্টতই ইংরেজদের। এরপর কারাগারে যেতেই হয়।

তাতে কি! গেয়ে উঠলেনঃ

“কারারই লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট”।

আর একটি লাইনে ধরা পড়ল শুধু বঙ্গ বা ভারত নয় , গোটা বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা—“ আমরা ধরি মৃত্যুরাজার যজ্ঞ ঘোড়ার রাশ”।

উনি কোন একটি দলের সমর্থনে বদ্ধ ছিলেন না। দেশ স্বাধীন করতে হবে—যিনিই করুন, নেতাজি বা গান্ধীজি—সবাই তাঁর শ্রদ্ধেয়।

“আনকোরা যত নন-ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন খুশি,

‘ভায়োলেন্সের ভায়োলিন’ নাকি আমি বিপ্লবী -মন-তুষি।

‘এটা অহিংস’ বিপ্লবী ভাবে

নয় চরকার গান কেন গাবে?

গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতিরাম ভাবে কন্‌ফুসি”।

কিন্তু হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি কখনই আমাদের বঙ্গে স্থায়ী হয় নি। আপাত শান্তির তলায় বিদ্বেষের তুষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে , আজও নেভেনি। তাতে ধুনো দেয়ার লোকের অভাব কোন কালেই ছিল না।

দাঙ্গার আগুনে মানবিক বোধ পুড়তে দেখে ব্যথিত নজরুল লেখেন—“খালেদ আবার ধরিয়াছে অসি, অর্জুন ছোঁড়ে বাণ”। জাতের নামে বজ্জাতি সব তাঁর কাছে গোপন ছিল না।

তবে মুজফফর আহমেদের সংগে ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে থাকা ও বন্ধুত্ব তাঁকে আগ্রহী করে সাম্যবাদী আন্দোলনে। (এখন সেই বাড়ির সামনে একগাদা দোকানপাট, পেছনে সরকার পরিবারের পুরনো বাড়ি)।

‘গাহি সাম্যের গান” শুধু একটি বিচ্ছিন্ন কবিতা নয়, শুধু কুলি-মজুরের কথা নয়—তিনি চেয়েছিলেন সার্বিক সাম্য। বিশেষ করে পুরুষ ও নারীর সাম্য। বলেছেন সৃষ্টির যা কিছু তার অর্ধেক নারীর সৃষ্টি। নজরুল বললে কী হবে? আমরা সংসদে নারীর জন্যে অর্ধেক আসন বরাদ্দ করার কথা এখনও ভাবতে পারিনি। এক-তৃতীয়াংশ দেব কিনা, কবে দেব—সেই নিয়ে কামড়াকামড়ি চলছে।

“মিথ্যে শুনিনি ভাই,

এই হৃদয়ের থেকে বড় কোন মন্দির-কাবা নাই”।

তারপরেও নজরুল কতখানি হিন্দু বা কতখানি মুসলিম—আদৌ কোনটা কিনা, সে নিয়ে আজও তরজা চলে। আজ জীবিত থাকলে লাভ-জিহাদের অপবাদ শুনতে হত হিন্দু মেয়ে বিয়ে করার অপরাধে।

এক ফাঁকে টুক করে বলে দিই—বিশ্বে সাম্যবাদী আন্দোলনের বিখ্যাত গান, পারি কমিউনের শ্রমিকের লেখা দ্য ইন্টারন্যাশনালের লিরিক রাশিয়া থেকে গোপনে ভারতে এনেছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা অনুবাদ নজরুলের-‘অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত’ নামে। একজন সত্যিকারের কবির কলমে ধরা পড়েছে গানটির আত্মা।

“যত অত্যাচারের শিরে বজ্র হানি, হাঁকে লাঞ্ছিত-জনমন-মথিত বাণীঃ

নব জনম লভি অভিনব ধরণী ওরে ওই আগত”।

কিন্তু এতসব বিদ্রোহ-বিপ্লবের ভীড়ে হারিয়ে যায় নি দুখু মিঞা নামের নটখট ছেলেটা। ছোটদের জন্যে লিখেছে একগাদা কবিতা!

দেখুন, বর্ণপরিচয়ে কোন রস নেই। খালি এটা করিও না। ওটা করিও না। খালি পড়তে বস, নো খেলাধূলো, নো হৈ -হুল্লোড়।

রবি ঠাকুরের সহজ পাঠ? শিশু? শিশু ভোলানাথ? দারুণ সব কবিতা। আমাদের অন্য জগতে নিয়ে যায়। কিন্তু “ আমি আজ কানাই মাস্টার” বা “খুকি তোমার কিচ্ছু বোঝে না মা” গোছের তিন চারটে ব্যতিক্রম বাদ দিলে সবগুলো আসলে বড়দের জন্য। বাচ্চার বাবা-মায়ের জন্য।

সবচেয়ে ভাল মদনমোহন তর্কালংকারের “রাত পোহালো ফর্সা হোলো, ফুটলো কত ফুল”। কিন্তু যাকে বলে মজা বা Fun, তার দেখা পাওয়া গেল নজরুলের লিচুচোর, খাঁদুদাদু, কাঠবেড়ালিতে।

“ওমা তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং” দুখু মিঞা ছাড়া কে লিখতে পারতেন?

রবি ঠাকুরের প্রেমের গান ধূপের ধোঁয়ার মত, পূজা ও প্রেম মিশে যায়। নজরুল অনেক মাটির কাছাকাছি, অগুরু নয় দেহের গন্ধ পাই তাঁর প্রেমের গানে। পসন্দ আপনি আপনি!

তবে মিনমিনে গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত যদি বা বান্ধবীকে শোনাতে পারেন, নজরুলের গান গাইতে একটু গলার চর্চা দরকার।

এটা আমার মত হরিদাস পালের ব্যক্তিগত মত; রে রে করে উঠবেন না প্লীজ!


রবি ঠাকুর লিখলেন—“আজি হতে শতবর্ষ পরে,

                                        কে তুমি পড়িছ আজি আমার কবিতাখানি

                                            কৌতুহল ভরে”?

নজরুল অন্য ধাতুর। কোন কালজয়ী কবি হবার অমর হবার লোভ নেই।

“পরোয়া করিনা বাঁচি বা না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,

মাথার উপর জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।

প্রার্থনা কর যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,

যেন লেখা হয় মোর রক্তলেখায় তাদের সর্বনাশ”।।


উনি বললে কী হবে? একশ সাতাশ বছর হয়ে গেল। তবু নজরুলের গান কবিতা কিছুই আমরা ভুলি নি। কারণ, অনেক কিছু এখনও সেইরকম রয়ে গেছে। যেমনটি ছিল নজরুল বেঁচে থাকতে।
1

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়

Posted in




















এক বিশ্ব উষ্ণায়নে রক্ষে নেই তায় আবার সুপার এল নিনো! তারই মাঝে খেলাধুলার বড় আসর। গত পনেরো হাজার বছর ধরে যে উষ্ণ যুগ চলছে তার মধ্যে আবার গরমের প্রকোপ কখনও কমে কখনও বাড়ে। গত কয়েকবছর ধরে যে আবহাওয়া তেতে উঠছে তার অন্যতম ইন্ধন যোগাচ্ছে নগরোন্নয়ন, যুদ্ধ। প্রখর রৌদ্রতাপে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে জল অত্যধিক উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বলে বিশ্বের আবহবিদেরা পরীক্ষায় জেনেছেন। তার জন্যে এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এবং এই উত্তাপ যদি বাড়তে থাকে তাহলে মনে করা হচ্ছে ১৮৭৫ সালের মত সুপার এল নিনো হতে পারে, এবং অনুমান, ঘটনা সেই দিকেই এগোচ্ছে। ইতিমধ্যে ক্রান্তীয় দেশগুলো গরমে হাঁসফাঁস করতে শুরু করে দিয়েছে। ভারতের অনেক জায়গায় তাপমাত্রা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে, কিছু অংশে পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। কলকাতায় তাপমাত্রা পঁয়ত্রিশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করলেও জলীয় বাষ্প যবে থেকে ঢুকতে শুরু করেছে ভ্যাপসা গরমে ত্রাহি রব বেরোতে শুরু করেছে। রাস্তায় অবশ্য ‘হিট’ খুব বেশি লাগে। শুধু তাই নয় ইউরোপেও আবহাওয়া তপ্ত। ফ্রান্সে তাপমাত্রা বত্রিশ ডিগ্রি এবং তার মধ্যেই প্যারিসে লন টেনিস খেলা সবে শেষ হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে জুনেই সুপার এল নিনো তার খেল দেখাতে শুরু করে দেবে যার প্রভাব আমেরিকা-মেক্সিকো-কানাডায় চলা বিশ্বকাপ ফুটবলে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে যেমন হঠাত শুকনো আবহাওয়া বা প্রবল বৃষ্টি বা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস এরকম অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছাড়াও কিছু এলাকা উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।

এবছর জুন মাস বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক খেলাধুলা নিয়েই মেতে আছে। তবে তার মধ্যে যে যুদ্ধ ও হুমকির মতো দৈনন্দিন ঘটনাগুলো ঘটছে না তা নয়। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ যুদ্ধের মতো হয়ে যাচ্ছে, শান্তির নামে বৈঠকও চলছে মাসাধিককাল ধরে। সম্প্রতি শান্তি চুক্তি হয়েছে কিন্তু তার মেয়াদ কতদিনের তাতে সন্দেহ আছে। আর ইউরোপে তো যেদিন রাশিয়া বা ইউক্রেনের মনে হল যাই কয়েকটা ড্রোন পাঠিয়ে দিই সেদিন কিছু বাড়িঘর ভাঙল, মানুষ মরল। এরই মধ্যে নানা দেশে আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক প্রতিযোগিতা শেষ হল। প্যারিসে রোল্যান্ড গারোসে লন টেনিসের শেষ পর্যায়ের খেলাগুলো হল। আর এবার তো ফুটবলে বিশ্বকাপ জেতার লড়াই শুরু হয়ে গেছে, চলবে জুলাই অবধি। সেই নিয়েই এখন মেতে আছে দুনিয়া।

প্যারিসে এবারের টেনিসে কিছু উদ্ভট ঘটনা ঘটে গেল। অথচ টেনিস এমন একটা খেলা যেখানে জেতা-হারার সম্ভাবনার পাল্লা ভারি। একগুচ্ছ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হেরে গেল শুরুর কয়েক রাউন্ডের মধ্যেই। সাধারণত পেশাদার বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড়েরা কয়েকবছর স্থিতিশীল থাকে, তাদের মান ও বিজয় ধরে রাখে। যেমন গত কয়েকবছর ধরে ইটালির জানিক সিনার এবং স্পেনের কার্লোজ আলকারাজ চারটে বড় গ্রান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্টে রাজত্ব করে আসছে। তর্কের খাতিরে ধরলেও উনচল্লিশ বছর বয়সেও নোভাক জোকোভিচ সব সময়ের সেরা টেনিস খেলোয়াড় এবং এখনও স্রেফ মনের জোরে খেলে যাচ্ছেন। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চারটে গ্রান্ড স্ল্যামে সিঙ্গলসে খেলে মোট চব্বিশটা গেম জেতার সর্বকালীন রেকর্ড তাঁর আছে। মহিলাদের মধ্যে এই চারটে গ্রান্ড স্ল্যামে অবশ্য শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের মধ্যে কিছু রদবদল হতে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দশজন খেলোয়াড় ভাগাভাগি করে জিতেছেন। তবুও বেলারুসের সাবালেঙ্কা বর্তমানে শ্রেষ্ঠর শিরোপা নিয়ে বসে আছেন। এবছরে ফরাসি ওপেনে কিন্তু সব ওলটপালট হয়ে গেল। এবছর বেশ কিছু খ্যাতনামা খেলোয়াড় আসেননি, সম্ভবত প্যারিসে বত্রিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড গরমের জন্য।

কব্জির আঘাতের জন্য খেলাতে যোগই দিলেন না আলকারাজ। বিজিত হওয়ার লক্ষ্যের দ্বার থেকে ফিরে গেলেন সিনার প্রচণ্ড গরমে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে। বিশ্বে ছাপ্পান্নতম স্থানাধিকারী আর্জেন্টিনার সেরুন্ডোলোর কাছে বিচ্ছিরিভাবে পাঁচ সেটে হেরে আঠারো পয়েন্ট খুইয়ে বিদায় নিলেন। টেনিস ইতিহাসে আরও ভূমিকম্প। অস্বাভাবিকভাবে জোকোভিচ একটা বিরাট জয়ের মুখ থেকে ছিটকে গেলেন এবং ব্রাজিলের কিশোর ফনসেকার কাছে হার স্বীকার করলেন। খ্যাতনামাদের মধ্যে রইলেন শুধু জার্মানির আলেক্সান্ডার জভেরেভ, বর্তমানে বিশ্বে তিন নম্বরে আছেন। এর আগে একটাও গ্রান্ড স্ল্যাম জেতেননি। সেমিফাইনালে আর বাকি তিন খেলোয়াড় আগে কখনও সেমিফাইনাল পর্যন্তও পৌঁছননি। শেষ হাসিটা হাসলেন জভেরেভই, বিশ্বে দশ নম্বর স্থানাধিকারী ইটালির কোবোলিকে পাঁচ সেটে হারান।

মহিলাদের ক্ষেত্রেও একই অঘটনের সমাপতন। সাবালেঙ্কা বিপজ্জনকভাবে রাশিয়ার শ্নাইডারের কাছে হার মানলেন, সৌজন্যে অস্বাভাবিক এলোমেলো হাওয়ায় খেলতে গিয়ে ক্লান্তি। চার বারের ফরাসি ওপেন জয়ী ইগা সোয়াইটেক এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কোকো গাউফ দুজনেই খেলার শুরুতেই পরাজিত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে ছিটকে যান। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত বিশ্বে সর্বিনিম্ন স্থানে থাকা পোল্যান্ডের মায়া চোয়ালিন্সকা সেমিফাইনালে শ্নাইডারকে পরাস্ত করেন। এবছর ফরাসি ওপেন জয়ী হলেন রাশিয়ার উনিশ বছর বয়সী মীরা আনদ্রীভা। ১৯৯২ সালে মণিকা সেলেসের পর এত কম বয়সে কোনও মহিলা ফরাসি ওপেন জিতলেন।

গত অর্ধ শতকে ফরাসি ওপেনে এত বড় বিপর্যয় আগে হয়নি। দর্শকেরা কিছু কড়া প্রতিদ্বন্দ্বীমূলক খেলা দেখার আনন্দ হয়তো পেয়েছেন কিন্তু মনে মনে সবারই একটা ইচ্ছে থাকে নামী খেলোয়াড়ের খেলা দেখার। তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বয়স্কদের অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়ায় নবীনদের জয়ের সম্ভাবনা প্রবল প্রমাণ হয়ে গেল।

টেনিসের মতোই বিশ্বের নামী ফুটবলারদের খেলা দেখার অপ্রতিরোধ্য আগ্রহ বিশ্বকাপ ফুটবলে। ফরাসি ওপেন শেষ হতেই শুরু হয়ে গেল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শক্তির খেলা বিশ্বকাপ ফুটবল। এবছর উত্তর আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকো এই তিনটে দেশে খেলা হচ্ছে। ৩৯ দিনে ৪৮টা দেশ, ১০৪টে খেলা খেলবে। শুরুতেই চাপা মনোমালিন্য কারণ প্রথমত কানাডা এবং মেক্সিকো দুজনেরই আমেরিকার সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক একেবারেই ভাল নয়। তার ওপর বেশিরভাগ খেলা এবং বিশেষ করে শেষের খেলাগুলোর অধিকাংশ উত্তর আমেরিকায়। বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বের এক মহাবাণিজ্যিক অনুষ্ঠান যার উদ্বোধন অনুষ্ঠান এবং শেষ ষোলো থেকে ফাইনাল অবধি অর্থের আগমন সবচেয়ে বেশি। উদ্বোধন অনুষ্ঠান অবশ্য মেক্সিকোয় হয়েছে। সারা বছর ধরে মহাদেশগুলোয় এত প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলা হয় এবং টিভি ও সংবাদমাধ্যমে তাদের দেখা ও পড়া হয় যে নামী খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপে দেখার জন্য সারা পৃথিবীর লোক আগ্রহে থাকে। চার বছর অন্তর হয়ে চলা ১২২ বছরের এই খেলায় কত খ্যাতনামা খেলোয়াড় খেলে গেছেন এবং এখনও কত খেলছেন, এ যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মত। একদল যায় তো আর একদল উঠে আসে। গত শতকের ষাট-সত্তর দশকের খ্যাতনামা ফুটবলার পেলের সাথে গারিঞ্চা, অ্যালবার্তো, জেয়ারজিনহো, রিভেলিনো, এউসেবিও, বেস্ট, জোহান ক্রায়ফ, পুসকাস, স্তেফানো যুগের খেলোয়াড়দের পর আশির দশকে এল মারাদোনা, গুলিত, প্লাতিনি, ম্যাথাউস, জিকো, মার্কো ভন বাস্তেন, ভালদানো, জিদানের মত বিখ্যাত খেলোয়াড় আর এখন মাঠ কাঁপাচ্ছে রোনাল্ডো, মেসি, এমবাপে এবং এরকম আরও অনেক খ্যাতনামা। প্রত্যেকে তাদের শ্রেষ্ঠ খেলা উপহার দিতে চায় এই প্রতিযোগিতায়। দর্শকেরাও চায় সেটা। যারা মাঠে খেলা দেখার সৌভাগ্য অর্জন করে তারা ছাড়াও পৃথিবীর এক বিরাট সংখ্যক মানুষ যে যার বাড়িতে, ক্লাবে, হোটেলে, পাবে বসে, প্রয়োজনে রাত জেগেও, টেলিভিশনের পর্দায় এই খেলা দেখার আগ্রহ ধরে রাখে। যেসব দেশ খেলায় অংশগ্রহণ করে তাদের লোকেদের উৎসাহ তো থাকবেই নিজের দেশের খেলোয়াড়ের খেলা দেখার কিন্তু তার থেকে কিছু কম উৎসাহ পোষণ করে না বাকি দেশের লোকেরা।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস জুড়ে রয়েছে বিতর্ক, রাজনৈতিক কৌতূহল, পরিকাঠামোগত সমস্যা ও হিংস্রতা। এবছর শুরুর অনেক আগে থেকেই ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বিদ্বেষপূর্ণ। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে প্রথমে ইরান খেলতে আপত্তি করলেও পরে মানিয়ে নেয়, মেক্সিকোতে তারা প্রধান ঘাঁটি করে। এমনকি আমেরিকাও ইরানের খেলোয়াড়দের দেশে খেলার অনুমতি দেয় তবে শর্ত আরোপ করে যে খেলা শেষ হওয়ার পরের দিনই চলে যেতে হবে। আমেরিকা ভিন্ন দেশের ফুটবলার, সাংবাদিক এবং দর্শকদেরও সদা সন্দেহের আওতায় রেখেছে। বেশ কয়েকটা আফ্রিকার দেশের আগত খেলোয়াড়দের টারম্যাকেই সম্পূর্ণ সিকিওরটি চেক করে ঢুকতে দিয়েছে। কয়েকজনকে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রেখে তারপর অনুমতি দিয়েছে। খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক এবং বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত রেফারিকে বিমানবন্দর থেকেই পত্রপাঠ বিদায় দিয়েছে অনুমতি না মেলায়। বর্ণবিদ্বেষী ভাব ফুটে বেরিয়েছে আমেরিকার তরফে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের নিয়ামক ফিফা খেলা থেকে লাভের অঙ্কের প্রতি নজর আগে রেখেছে। দর্শকদের টিকিটের দাম খেলার গুরুত্ব অনুযায়ী ওঠানামা করার পথ খোলা রেখেছে। টিকিটের দাম কয়েক হাজার ডলার থেকে কয়েক-দশ হাজার ডলার। এবারের অন্যতম আকর্ষণ মেসি এবং রোনাল্ডো, দুজনেই চল্লিশের দোরগোড়ায় এবং এবছরই হয়তো তাদের শেষ বিশ্বকাপ খেলা। তাই তাদের নিয়ে উৎসাহ অনেক বেশি।

এবছরের খেলার বল উন্নত প্রযুক্তি মেশানো, তৈরি করেছে আডিডাস ট্রিওনডা। সংযুক্ত বল প্রযুক্তি দ্বারা নির্মিত। বলের ভেতরে কাজ করছে গতি সেন্সর যা বলের গতি, দিক এবং প্রতি সেকেন্ডে ৫০০টা স্পর্শ রেকর্ড করবে যার থেকে রেফারি অফ-সাইড এবং হ্যান্ডবলের সঠিক সময় নির্ধারণ করতে পারবে। বলের ভেতর ব্যাটারিকে ৯০ মিনিট চার্জ দিলে অতিরিক্ত সময় সমেত একটা খেলা সম্পূর্ণ করানো যাবে।

ভারতীয় সময়ানুসার ১১ জুন শেষ রাতে এই বিশ্ব মহোৎসব উদ্বোধন হয়ে যাওয়ার পর ১২ জুন রাতসকাল সাড়ে বারোটায় বল গড়াতে শুরু করেছে। প্রথম দিনই রেফারির বাঁশি খেলোয়াড় এবং দর্শক উভয়েই প্রশ্ন তুলে দ্বন্দ্বের সূচনা করেছে। জুলাইয়ের উনিশ তারিখ ফাইনাল। দেখা যাক, কোথাকার বল কতদূর গড়ায়।

এল নিনো যদি তার সুপার ফর্ম শুরুতেই খেলা চালু করে দেয় তাহলে ফুটবলের গতিবেগ চঞ্চল হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - সব্যসাচী মজুমদার

Posted in






















এই জগতে, জগত বলতে যতদূর মানুষ আন্দাজ করতে পেরেছে যতটা পদার্থ আছে, তার থেকেও বেশি অপদার্থ রয়ে গেছে। এন্টিম্যাটারের কথা বলতে চাইছি। এই যা কিছু আমরা চোখে দেখি, তার অনেক অংশ শূন্য। নিরাকার, নির্বাঁধ, অসীম। তাকে আমরা শূন্য বলি। কিন্তু,‌শূন্য মানে কি ? এর উত্তর দেওয়ার অধিকারী কি আমি ? তবুও মনে প্রশ্ন জাগে। সেই প্রশ্নের কারণে ভাবতে ইচ্ছে করে। এরকম একটা ভাবনা থেকে মনে হচ্ছিল শূন্য তো আসলে নিরাকার, নির্জন,রিক্ত নয়। সে রীতিমতো একটা অস্তিত্ব। একটা অবস্থা। অংকের ক্ষেত্রে শূন্য তৈরি হয় অসংখ্য, অনিঃশেষ নেগেটিভ সংখ্যার সংকলনে। কেবল অশেষ সেই সংখ্যার কল্পনা। আমাদের সমকালীন গবেষণাগুলিও জানিয়ে দিয়েছে, যাকে এই মহাবিশ্বে আমরা শূন্য বলে মনে করি; গ্রহ থেকে আরেকটি গ্রহের মাঝখানের দূরত্ব কেই ধরা যাক না, যেখানে মাঝেমাঝে উল্কা, বিচ্ছিন্ন গ্রহাণু চলাচল করে, যেখানে বাতাস নেই কেবল আলো আছে — শূন্য বলে মনে করি। কিন্তু, তবুও সেখানে আলো আছে। মানে অসংখ্য কণা রয়েছে, যাদেরকে আমরা চোখে দেখতে পাই। কিন্তু, যেখানে আলোও নেই ! বিজ্ঞানী বলছেন সেখানে রয়েছে এন্টিম্যাটার। এবং এই জগতে ( যতটা অনুমান করা গেছে ) যতটা পদার্থ আছে, তার চেয়েও বেশি এন্টিম্যাটার আছে। এবং তারাই বজায় রেখেছে ক্রমবর্ধমান মহাবিশ্বের ভারসাম্য।


আমাদের অনুভব প্রধানত এই দৃশ্যমান বস্তু সমূহকে নির্ভর করেই আবর্তিত হয়। কবিই কেবল বলতে পারেন, ' শূন্যের ভেতর এত ঢেউ '। শূন্যের স্তর, শূন্যের বহুমাত্রিকতা, অনুপস্থিতির তীব্র অভিঘাত একমাত্র কবিই ( কবিতা যিনি লেখেন তিনিই কবি — এরকম ধারণায় আটকে থাকতে চাইছি না ) অনুভব করতে পারেন সম্ভবত। আর এই সূত্রে যদি আন্দ্রেই আর্সেনেভিচ তারকোভস্কি'র ছবির প্রসঙ্গ ওঠে, তবে, কথা আমাদের স্বীকার করে নেওয়ার পর্ব চুকে গিয়েছে যে তারকোভস্কি কবি। সিনেমার কবি। ক্যামেরায় কবিতা লিখেছেন। অনুভব করতে চেয়েছেন আমাদের চারপাশের দৃশ্য জগৎ - অদৃশ্য জগতের। অদৃশ্যের অন্তরালে থাকা আরেক সমান্তরাল দৃশ্যগুচ্ছকে। আমাদের দেখিয়েছেন তারকোভস্কি, আমাদের অনুভব করিয়েছেন তারকোভস্কি। মানুষের মুক্তি চেয়েছেন, ব্যক্তি মানুষকে নির্ণয় করতে চেয়ে পার্টির- রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হয়েছেন, কিন্তু তার পরেও তারকোভস্কি তাঁর বেদনার দিকে, বিস্ময়ের দিকে, শূন্যতার দিকে যাত্রা অব্যহত রেখেছেন। ঠিক এ কারণেই আমার, একান্তই নিজের অনুভবে তারকোভস্কি'কে একজন বিশুদ্ধ কবি মনে হয়।


কেন বিশুদ্ধ কবি ?


সঙ্গত কারণেই এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। সেক্ষেত্রে একটি উত্তর নির্মাণের চেষ্টা করা যাক।
আমরা সকলেই জানি তারকোভস্কির সৃষ্টি সম্ভার ও স্বীকৃতি সম্পর্কে। ফলে সেসব তথ্য তুলে ধরে এই আলোচনাকে ভারাক্রান্ত করতে চাইছি না। বরং একবার জানা সত্ত্বেও মনে করে নিই কাকে বলে বিশুদ্ধ কবিতা। আলোচনায় সুবিধা হবে,




"message-free verse that is concerned with exploring the essential musical nature of the language rather than with conveying a narrative or having didactic purpose. The term has been associated particularly with the poems of Edgar Allan Poe. Pure poetry was also written by George Moore (who published An Anthology of Pure Poetry in 1924), "


এই কারণকে মনে রাখলে আমরা বিশুদ্ধ কবিতার কয়েকটি স্বভাবলক্ষণ পেতে পারি,


১.এ কবিতা কোনও বার্তা, উপদেশ,নির্দেশ,নির্ণয় কিছুই দিতে চায় না।


২.লিরিক্যালিটি থাকবে এবং অবশ্যই দৃশ্যের বর্ণনার সঙ্গে ওতোপ্রোতো জড়িয়ে থাকবে।


৩. ঘটনা বলতে,এমন ঘটমানতা যা তীব্রভাবে সম্ভাব্যকে আক্রমণ করে না।যা সম্ভাব্যের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চায়।


৪. সাংগীতিক ধর্ম বজায় থাকতেও পারে।যদিও এই সাংগীতিক ধর্ম বিষয়ের সাপেক্ষে নির্মীত হয়।




তারকোভস্কি কোন উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ছবি তৈরি করেছিলেন? কোন প্রোপাগান্ডা ছিল তাঁর ! আমরা জানি, মানুষের শিল্পী সত্তার সঙ্গে সবসময় পার্টি কালচারের বিরোধ ঘটেছে। ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে ঘটেছে, কমিউনিস্টদের সঙ্গে ঘটেছে, লিবারালদের সঙ্গেও ঘটেছে। আমরা এও জানি, পার্টি কালচার বা প্রোপাগান্ডা একজন শিল্পীর বহুস্তরিক বিন্যাসকে বাধা দেয়। একজন মানুষ হিসেবে, মানুষের শিল্প হিসেবে বিকাশের ঘাটতি সঙ্গত কারণেই প্রোপাগান্ডার আইসোটোপ তৈরি করে। এ কথা আমরা জানি বলেই আমাদের মনে পড়ছে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সলঝেনেৎসিনিন পর্যায় এপিসোড। আমাদের এক‌ই সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ছে এই কথা যে, তারকোভস্কি 'ইডিয়ট' -এর চিত্রনাট্য করার পর সেটি নাকোচ করেছিল সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র। যৌথ খামারের রাষ্ট্র রাশিয়া। এই প্রসঙ্গে একটা অদ্ভুত ধাঁধা তৈরি হয়। যদিও এই লেখার সঙ্গে ধাঁধাঁটির একটি সুদূরপ্রসারী সম্পর্ক রয়েছে।


কি সেই ধাঁধা ?


সাঁর্ত্র মনে করতেন ইতিহাসের চলন অনুভবের ক্ষেত্রে বার্গম্যান বা আন্তোনিওর থেকেও উৎকৃষ্ট তারকোভস্কি। সাঁর্ত্র স্টালিনের শাসন পদ্ধতির সমর্থক ছিলেন। সাঁর্ত্র অস্তিত্ববাদী। এই অস্তিত্ববাদের অন্যতম প্রবক্তা ডস্টয়ভস্কি। এবার তারকোভস্কি যখন ইডিয়ট অবলম্বনে সিনেমা করার কথা ভাবছেন, নাকোচ করছে রাষ্ট্র। যদিও সাঁর্ত্র তাঁর অবস্থান বদল করেছেন অনেকক্ষেত্রেই। তবে এ ক্ষেত্রে এই জটিল বিন্যাসটি আমাদের এই তথ্য দিচ্ছে, কোন‌ও নির্দিষ্ট মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে বা নির্দিষ্টিকৃত করে বিষয়কে ব্যখ্যা করতে গেলে জটিলতা সৃষ্টি হবেই। যেমন এক্ষেত্রে হয়েছিল সাঁর্ত্রর। যদিও আমরা পরবর্তী সময়ে এই জটিলতাটি অনেকটা‌ই স্পষ্ট রূপ ধারণ করতে পেরেছিল।


যা হোক, মূল আলোচনায় ঢুকলে আমাদের যে সামনে যে নির্ণয়টি ফুটে উঠছে, তা হল, বিশুদ্ধ কবি হিসেবে তারকোভস্কিকে অনুমান। আমরা বিশুদ্ধ কবিতার যে লক্ষণ গুলিকে একবার দেখে নিয়েছি সেই অবস্থান থেকে যদি তারকোভস্কির সিনেমার দিকে তাকাই, তবে, ইভানস চাইল্ডহুড ( ১৯৬২ ) থেকে দ্য স্যাক্রিফাইস ( ১৯৮৬) পর্যন্ত প্রলম্বিত তারকোভস্কির সিনেমায় খুঁজে পাই এমন কিছু চিহ্ন ও চিন্তা ও চিন্তার বিনির্মাণ, আমাদের প্ররোচিত করে বাস্তবতার সমান্তরাল আরেকটি জায়মান মনোজগতের নির্মাণে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে শ্রীসঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের একটি চমৎকার মন্তব্য,
"যদিও বোদল্যেরের সেই সমুদ্রবিহঙ্গ আলবাট্রসের মতোই তারকোভস্কি নিজেকে 'সমাজতান্ত্রিক' ব্যবস্থায় নির্যাতিত, রুদ্ধগতি ও অসহায় ভাবেন, কিন্তু একই সঙ্গে কখনওই মনে করেন না যে, শিল্পীর সঙ্গে সমাজের বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত। এক নিবিড় ইতিবচন থেকে তিনি মনে করেন, সিনেমায় যত প্রকট বাস্তবের অন্তর্গত থেকেই অনাহত বাস্তব তাঁকে রচনা করতে হবে।" ( সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, তারকোভস্কির ডায়েরি : অনশ্বর রোজ নামচা )


সময় পর্বে তারকোভস্কি সক্রিয় ছিলেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির মনোভাবের ক্ষেত্রে ভীষণ জরুরি ছিল সময়টি। কেন ? যে সময় তাঁর কাজের সূচনা, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব তার সোনালী অতীত অতিক্রম করেছে। কিছু মিথ, কিছু রূপকথা, অনেকটা রিয়েলিটির দ্বন্দ্ব তখন অবশিষ্ট। ক্রমশ লিবারেলদের সামনে প্রচ্ছন্ন হতে শুরু করেছে। আর যখন শেষ করছেন তারকোভস্কি, তার তিন বছর পর ঘটবে চেচেস্কুর বক্তৃতা পর্ব। আসতে চলেছে বিখ্যাত নব্বই দশক। অর্থাৎ প্রার্থিত যৌথ খামারের অবলুপ্তি আপাতত ঘটতে চলেছে তারকোভস্কি জেনে গেছিলেন কেবল তো নয়, তাঁর জীবনের বিশ্বাস, চিন্তা এবং অবস্থানের‌ও একটি বিবর্তন ঘটে গেছে। তা কেবল স্বপ্ন বয়নের বিবর্তন নয়, স্বপ্ন ভঙ্গের‌ও।


আমরা তো এটুকু সকলেই বুঝতে পারি তারকোভস্কি যেমন সামাজিক মানুষের জন্য আশা খুঁজতে চেয়েছিলেন, তেমন‌ই চেয়েছিলেন ব্যক্তি মানুষের মুক্তি। এই মুক্তি কামনাকে যদি অস্তিত্ববাদ বলে মনে করি কিংবা তরজমায় নির্ভর না করে যদি সরাসরি এক্সিসটেনসিয়ালিজম বলে ভাবতে চাই, তবে কমিউনিস্ট পার্টি সরাসরি তত্ত্বটিকে নাকোচ করেছিল। এমনকি বুর্জোয়াদের শেষ চেষ্টা গোছের তকমা লাগিয়ে দিয়েওছিল। ( একটি সূত্র আবার মনে পড়ছে এই প্রসঙ্গে, অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি সাঁর্ত্রকে নাকোচ করছে। অথচ সাঁর্ত্র ছিলেন অন্যতম মার্ক্স ব্যখ্যাকার )। প্রসঙ্গে ফিরলে দেখা যাচ্ছে, তারকোভস্কির এই ব্যক্তি মানুষের আত্ম উন্মোচনের কাঙ্খার সঙ্গে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত, পলিটব্যুরো নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থার সংঘাত তৈরি হবে এতো বলাই বাহুল্য। ওয়াল্টার হুইটম্যান কথিত 'I contain multitude ' যেন অনেকাংশে, অনেক স্তরন্যাসে ধরা পড়ে তারকোভস্কির ছবিতে। ছবির বয়ানে।


রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও ব্যক্তি মানুষের আত্ম সন্ধানের, আত্ম নিমগ্নতার অধিকার আছে, এই ধারণা তো আমলা তান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে বিরক্তির, অস্বস্তির, বিবমিষার কারণ হয়ে উঠবে— স্বাভাবিক। তারকোভস্কি আপোস করেননি। নিজের কথা বলেছেন। তাঁর প্রত্যেকটি লং শট যেন সে কথা বলতে চায়। এবং এই প্রসঙ্গে আমরা আবার এই আলোচনায় ফিরে আসতে পারি কেন তারকোভস্কি বিশুদ্ধ কবি?


প্রথমত তারকোভস্কির সিনেমা মানুষের পরিশুদ্ধি, মানুষের প্রসন্ন বোধ, মানুষের কবিত্বের প্রমা বহন করেছে মাত্র। এর চেয়ে বেশি কোন‌ও নির্দিষ্ট দার্শনিক বোধ কিংবা রাজনৈতিক চিন্তাকে অনুসরণ করেনি।


দ্বিতীয়ত তারকোভস্কির লং শট। একটা দৃশ্যকে অনেক্ষণ ধরে একটি অবস্থান থেকে বহু মাত্রায় ও বিনির্মাণে দেখে নেওয়ার আয়োজন যেন। প্রতিটি লং শট একটি কাব্যের একটি অংশকে পুনঃ পুনঃ পাঠের ও পুনরাবিস্কারের প্রক্রিয়া যেন। নাটকীয় মুহূর্ত গুলিও অবলীলায় অনুচ্চকিত হয়ে ওঠে গ্রন্থনা ও উপস্থাপনায়। তৈরি করে একটা অনিবার্য মূর্ছনার। আমাদের এখন‌ই মনে পড়ছে স্টকারে যেখানে 'জোন'-এর কাছে এসে রেল কোম্পানি থেকে চোরাই গাড়িটিকে ছেড়ে দিয়ে একলা হয়ে যাচ্ছে তিনজন। কুয়াশা ঘন জলাভূমির ভেতরে তিনটি ল্যাম্পপোস্ট। একটি গীতিকাব্য তৈরি করে মাত্র।


তৃতীয়ত তারকোভস্কির ছবিতে কেবল মানুষ নয়, অন্যান্য প্রাণী গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ঘোড়া, যেমন কুকুর। মাত্র কয়েকটা দৃশ্যেই মাত্র শহরকে দেখেছেন তারকোভস্কি। এবং যতবার দেখেছেন ততবার তাকে প্রেক্ষাপটের তুলনায় বিসদৃশ, কৃত্রিম করে দেখান‌ই যেন উদ্দেশ্য। মূলত মানুষের গড়ে তোলা শহর ব্যতিরেকে পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণ করাও ছিল তারকোভস্কির অন্যতম উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যে তিনি সফল। এবং সফল বলেই তিনি অনেকটাই মেটাফিজিক্যাল বলেও মনে হয়।


এক্ষেত্রে আরেকটি কৌতুহলেও আক্রান্ত হতে হয় যে, কেন তথাকথিত পশুরা তাঁর শিল্পের অন্যতম চিহ্ন হয়ে উঠছে ? এ কারণেই বলে মনে হয়, তারকোভস্কি তাঁর পরিবেশের, অস্তিত্বের প্রতিটি অবস্থান, কৌণিক বিন্দু থেকে দেখতে চান তাঁর সঙ্গে অস্তিত্বের, জায়মানতার কি সম্পর্ক ? জানতে চেয়েছেন বলেই হয়তো দৃশ্যের প্রতিটি বিন্দু, প্রতিটি সরণ, প্রতিটি চলনকে অনুভব করতে, অনুবাদ করতে চেয়েছিলেন ক্যামেরায়। হয়তো চেয়েছিলেন স্বাধীন দৃশ্যের উদারতা।


এখন, সেই স্বাধীনতার ওপর, ব্যক্তি মুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ নামিয়ে এনেছিল রাষ্ট্র। অস্তিত্ববাদের বিকাশ মেনে নেয়নি — এই তথ্য আমরা ইতিপূর্বে এই আলোচনায় এনেছি। এখন এই প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসতে চাই। কেননা, এই কথাটি নির্ণয় করা খুবই জরুরি যে, তবে কি তারকোভস্কির প্রসঙ্গের অন্তরালে এই কথাটি বলতে চাইছি যে, অস্তিত্ববাদের সপক্ষে ?


বলাটা অপরাধ নয় যদিও। তবুও, একথা তো ঠিক, যে, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের ধারণাটি এখন অনেকটাই প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। বরং তার বদলে এই তথ্য মানুষ জেনে নিয়েছে যে, তার সাফল্যের পেছনে, তার অস্তিত্বের বিকাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে গোষ্ঠী চেতনা। অর্থাৎ একসঙ্গে ভাবার এবং ভাবানর ক্ষমতা। এবং আজকের মানুষের পক্ষে একা বেঁচে থাকাটা কার্যত অসম্ভব। এ কারণেই গোষ্ঠী নির্ভর জীবন ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের ধারণাকে হয়তো খুব গুরুত্ব দিতে চায়নি। আমি নির্ণায়ক কেউ ন‌ই। অধিকারীও ন‌ই। তবে এক্ষেত্রে এই বিষয়টিই আমার কাছে বড় হয়ে উঠছে যে, কোন‌ও মতকে, মতের বিকাশকে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য হানিকর হয়ে উঠছে, রাষ্ট তাকে বাধা দিলে সেটি বোধহয় রাষ্ট্রের পক্ষে ভাল বিজ্ঞাপন হয় না বা আদর্শ রাষ্ট্রের উদাহরণ‌ও হয় না।


কিন্তু, এই যে ব্যক্তি মুক্তির চিন্তাকে ধারণ করেছিলেন তারকোভস্কি, সেই কাঙ্খিত মুক্তি কি পেলেন তিনি? এই প্রশ্নের সমাধানের জন্য আমাদের দারস্থ হতে হয় তিনটি ছবির — ভয়েজ ইন টাইম ( ১৯৮২), স্টকার ( ১৯৮৩), দ্য স্যাক্রিফাইস ( ১৯৮৬)। মনে রাখতে হবে, এই সময়ের ইতালিতে কমিউনিস্ট পার্টির শাসন চলছে।


বিশেষ করে ক্যান্সার আক্রান্ত তারকোভস্কি যেভাবে স্যাক্রিফাইস শেষ করেছেন, পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে মানুষকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত যেভাবে নিজেকে এবং পরিবারকে ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করেন, তাতে এ ছবি কাব্য হয়ে ওঠে শেষ পর্যন্ত এবং তারকোভস্কি'কে পৌঁছে দেয় অনেকটাই মেটাফিজিক্যালিটির কাছাকাছি। তারকোভস্কির সিনেমা হয়ে ওঠে সামাজিক মানুষের পুনর্বিন্যাস। 'ইডিয়ট'কে কেন্দ্র করে যে অভিমান গড়ে উঠেছিল, তা অবস্থানেই যেন স্যাক্রিফাইস বুঝিয়ে দেয় রাষ্ট্রিয় দখলদারিত্বের সমান্তরালে একটি প্রত্যাহারের প্রবণতাও থেকে যায়। তাকে স্বীকার করতে হয়। তার ধারণাকে আত্তিকরণ। ন‌ইলে একটি রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত জড় মানচিত্রে পরিণত হয়। তাকে তখন নস্যাৎ করা সহজ। তারকোভস্কি রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতায় বিশ্বাস করেছিলেন।


মানুষের সিনেমার এক শীর্ষ বিন্দু তারকোভস্কি, মানবিক মহাকাব্যের একটি অধ্যায় তারকোভস্কি।
0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - হিন্দোল ভট্টাচার্য

Posted in

আমি রাজনীতি নিয়ে লিখতে বসিনি কোনোদিনই এইভাবে—অন্তত এমন এক তীব্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে নয়। আমার কাছে রাজনীতি ছিল দূরের এক মঞ্চ, যেখানে বক্তৃতা হয়, বিতর্ক হয়, মতভেদ হয়—কিন্তু সেইসব যেন আমার দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে না। আমি আমার মতো করে লিখি, পড়ি, মানুষের সঙ্গে মিশি, কবিতার শব্দে, গল্পের শরীরে মানবিকতার ছোট ছোট আলো খুঁজি। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, সেই আলোটুকু কেবল ম্লানই হয়নি—তার উপর যেন ইচ্ছাকৃতভাবে ধুলো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আমি এখন খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি—এই যে ভোটের ঢক্কানিনাদ, এই যে গণতন্ত্রের উৎসব বলে প্রচারিত এক বিশাল আয়োজন—এর ভেতরে কোথাও একটা গভীর, লজ্জাজনক দরদাম চলছে। মানুষের সম্মানকে এখানে মুদ্রা বানানো হয়েছে। প্রতিশ্রুতিগুলো আর স্বপ্ন নয়, সেগুলো হয়ে উঠেছে লেনদেনের ভাষা। যেন আমার জীবন, আমার দুঃখ, আমার অভাব—সবকিছুই একটা দর কষাকষির টেবিলে তুলে রাখা।

আমি শুনি—“রাস্তা করে দেব”, “চাকরি দেব”, “বাড়ি করে দেব”—এইসব প্রতিশ্রুতির শব্দগুলো এখন আমার কানে আর আশ্বাসের মতো শোনায় না। বরং মনে হয়, যেন কেউ আমাকে কিনতে চাইছে। আমার ভোট, আমার বিশ্বাস, আমার অস্তিত্ব—সবকিছুর একটা দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে।

আমি দাঁড়িয়ে থাকি সেই লাইনে—গরমে, ধুলোয়, অস্বস্তিতে—আর ভাবি, এই যে আমি, একজন মানুষ হিসেবে আমার যে সম্মান, তা কি সত্যিই এত সস্তা? আমার পাঁচ বছরের জীবন কি একটি বোতামের চাপে মাপা যায়? আমি কি কেবল একটি আঙুলে কালি লাগানোর মুহূর্ত?

আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল, এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আমরা “উৎসব” বলে উদ্‌যাপন করি। কী ভয়ঙ্কর শ্লেষ লুকিয়ে আছে এই শব্দটার মধ্যে! উৎসব—যেখানে আনন্দ থাকে, সমতা থাকে, সম্মান থাকে। অথচ এই তথাকথিত উৎসবের ভেতরে আমি দেখি অসমতা, দেখি প্রলোভন, দেখি অপমানের সূক্ষ্ম বিনিময়।

আমি দেখেছি, কীভাবে মানুষকে আলাদা আলাদা দলে ভাগ করা হয়—ধর্মের ভিত্তিতে, ভাষার ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে। তারপর প্রতিটি দলকে আলাদা আলাদা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যেন আমরা সবাই মানুষ নই—আমরা সবাই আলাদা আলাদা ‘টার্গেট গ্রুপ’। আমাদের দুঃখ, আমাদের চাহিদা—সবকিছু বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, মাপা হচ্ছে, তারপর তার উপর ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক কৌশল।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা হারিয়ে যাচ্ছে, তা হল মানুষের প্রতি সম্মান। আমি আর একজন নাগরিক নই—আমি একজন ভোটার। আর এই “ভোটার” পরিচয়ের ভেতরে আমার সমস্ত মানবিক পরিচয় যেন মুছে যাচ্ছে।

আমি বুঝতে পারি, আমাকে বোঝানো হচ্ছে—এই ব্যবস্থাটাই আমার স্বাধীনতা। আমাকে বলা হচ্ছে—“আপনি আপনার প্রতিনিধি বেছে নিচ্ছেন।” কিন্তু আমি যখন দেখি, সেই প্রতিনিধি নির্বাচনের পর আমাকে আর মনে রাখে না, তখন আমার মনে হয়, আমি কি সত্যিই কাউকে বেছে নিচ্ছি, না কি আমি নিজেই বেছে নেওয়া হচ্ছি—একটি ব্যবস্থার দ্বারা, যা আমাকে ব্যবহার করতে চায়?

আর এই ব্যবহারটাই সবচেয়ে অমানবিক। কারণ এটি খুব সূক্ষ্ম, খুব পরিকল্পিত। এটি সরাসরি আঘাত করে না—এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। আমার আত্মসম্মানকে, আমার ভাবনাকে, আমার বিশ্বাসকে।

আমি মাঝে মাঝে খুব তীক্ষ্ণ এক রকমের শ্লেষ অনুভব করি—যখন দেখি, ভোটের আগে আমাকে সম্মান করা হচ্ছে, আর ভোটের পরে আমাকে ভুলে যাওয়া হচ্ছে। তখন মনে হয়, এই সম্মানটা আসলে সম্মান নয়—এটি একটি অভিনয়। একটি প্রয়োজনীয় অভিনয়, যা আমাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য করা হয়।

আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি—আমি কি এই অভিনয়ের অংশ? আমি কি এই ভণ্ডামিকে মেনে নিচ্ছি? আমার নীরবতা কি এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। কারণ আমি জানি, আমি একা নই। আমার মতো আরও অসংখ্য মানুষ আছে, যারা এইসব অনুভব করে, কিন্তু হয়তো প্রকাশ করতে পারে না। অথবা করে না—কারণ ভয় আছে, ক্লান্তি আছে, অথবা হয়তো এক ধরনের অভ্যেস তৈরি হয়ে গেছে।

এই অভ্যেসটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। যখন আমরা অমানবিকতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করি, তখন আমরা আর তার বিরুদ্ধে দাঁড়াই না। তখন আমরা কেবল বেঁচে থাকি—কিন্তু মানুষ হিসেবে নয়, একটি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে।

আমি এই অবস্থাকে মেনে নিতে পারি না। আমি চাই, আমার কণ্ঠস্বর থাকুক—যত ক্ষুদ্রই হোক। আমি চাই, আমি বলতে পারি—এই যে ভোটের নামে, গণতন্ত্রের নামে, যে দরদাম চলছে, তা আমি মেনে নিচ্ছি না।

আমি চাই, আমি মনে রাখতে পারি—আমি কেবল একজন ভোটার নই, আমি একজন মানুষ। আমার সম্মান আছে, আমার ভাবনা আছে, আমার অনুভূতি আছে।

আর এই স্মৃতিটুকুই হয়তো আমার সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

কারণ যতদিন আমি নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে পারব, ততদিন এই অমানবিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ দখল সম্ভব নয়।

আমি জানি, এই লড়াই খুব ছোট—প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু তবুও, এই ছোট ছোট প্রতিরোধই হয়তো একদিন বড় হয়ে উঠবে।

হয়তো একদিন, এই ঢক্কানিনাদের শব্দের ভেতর থেকে সত্যিকারের মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যাবে—যেখানে প্রতিশ্রুতি নয়, সম্মান থাকবে; যেখানে ভয় নয়, বিশ্বাস থাকবে; যেখানে রাজনীতি নয়, মানুষ প্রধান হয়ে উঠবে।

সেই দিনের অপেক্ষাতেই আমি লিখে যাই—নিজের মতো করে, নিজের ভাষায়, নিজের ক্ষুদ্র অথচ অদম্য মানবিকতার পক্ষে।