Next
Previous
Showing posts with label ধারাবাহিক. Show all posts
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















পর্ব ২৭



সে এক সময় ছিল যখন দার্শনিকের দল পরমাত্মার অস্তিত্ব নিয়ে তর্কবিতর্কে

মেতে উঠতেন। তবে আজকাল তর্ক হচ্ছে গম উৎপাদন নিয়ে। দার্শনিকদের এক দল

বলছেন—দেশে যথেষ্ট গম উৎপন্ন হচ্ছে, শুধু শয়তান দোকানদারদের মজুত করে

গুদামে লুকিয়ে রাখার অভ্যাসের ফলে সমস্যা হচ্ছে।

দ্বিতীয় দলের অভিমত হল—গম বলে কিছুর অস্তিত্ব আছে কি? থাকলেও এদেশে

তো নেই। এই অন্তহীন তর্কবিতর্কের ঢেউ একসময় শিবপালগঞ্জে পৌঁছে গেল।

লোকজন শুধু গম নয়, দুধ -দই- ঘি নিয়েও ওইরকম নাস্তিকতা দেখাতে লাগল।

এইরকম খাদ্যসংকটে কুস্তির আখড়া কি হাওয়া খেয়ে বা খাইয়ে বেঁচে থাকবে? ক’বছর

আগে ছেলেছোকরার দল ব্যায়াম আর কুস্তির দাঁও প্যাঁচের অভ্যাস করে ক্লান্তিতে চুর

চুর হয়ে বাড়ি এলে অন্ততঃ ভিজিয়ে রাখা ছোলা এবং ঘোল খেতে পেত। এখন সেটাও

গেছে। এটা এবং আরও কিছু জিনিস মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি হল যে গ্রামের

নওজোয়ানদের নিষ্কর্মা ও কুঁড়ে হওয়া ছাড়া কোন কাজ রইল না। ওরা ছেঁড়াখোঁড়া

পোষাকের উপর রঙিন পাতলুন-পায়জামা পরে রোগা পাতলা পা ঢাকল এবং বুকে মাংস

লাগুক -না- লাগুক, বুকের মধ্যে সায়রা বানুর সংগে শোয়ার স্বপ্ন ভরে অলিগলিতে

পানের পিক পিচ করে ফেলে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল।

ওদের মধ্যে বেশ ক’জন কখনও কখনও খেতখামার-কলকারখানা এবং জেলখানা ঘুরে

ফেরত এসে যেত। যারা ওদিকপানে যাবার সাহস জোটাতে পারে নি, তারা স্থানীয় কলেজে

মুখ্যু হওয়ার পাঠ নিতে ভর্তি হত। এই ধরণের কলেজ হামেশা কোন স্থানীয় জননায়কের

প্রেরণায় সাধারণ লোকের মধ্যে শিক্ষা প্রসারের নাম নিয়ে খোলা হত। এর আসল

উদ্দেশ্য ওই জননায়ক ভদ্রলোকের জন্যে আগামী বিধানসভা অথবা লোকসভা

নির্বাচন জেতার জমি তৈরি করা এবং আসল কাজ বলতে কয়েকজন মাস্টার ও সরকারি

অনুদানের শোষণ করা। এইসব কলেজ সাময়িক ফ্যাশনের হিসেবে বিনা আগুপাছু ভেবে

চালিয়ে যাওয়া হয়। আর এটাও পাক্কা যে ওখানকার ছাত্রের দল নিজেদের জন্মসূত্রে

প্রাপ্ত আর্থিক ও সামাজিক অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকবে এবং কখনোই সেই জায়গা

ছাড়িয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করবে না। সরকারি উচ্চপদ এবং ব্যবসাপাতি যাঁদের হাতে,

তাঁদের মনোপলিতে ওই কলেজগুলোর থেকে কোন বাধা আসবে না।

সে যাই হোক, এইসব শোরগোলে আখড়া সংস্কৃতি খতম হওয়ার উপক্রম, আর গ্রামের

নবযুবকদের শারীরিক বিকাশ এখন ওদের মানসিক বিকাশের সংগে পাল্লা দিচ্ছে।

সেভাবে দেখলে শিবপালগঞ্জে একটা আখড়া থাকা এবং তাতে কিছু ছেলেছোকরার

নিয়মিত যাতায়াত এক মহত্বপূর্ণ তথ্য বটে।




বলার দরকার নেই যে এসব হচ্ছে বদ্রী পালোয়ানের সৌজন্যে। বেশ কয় বছর ধরে ও

নিয়মিত আখড়ায় গিয়ে ব্যায়াম করে, চ্যালাদের মধ্য কুস্তি প্রতিযোগিতা করায়। যখন

ওরা কাউকে তুলে আছাড় দেয়, বা শরীরের কোন অঙ্গে চোট লাগিয়ে দেয়, তখন সবাই

মেনে নেয় যে চ্যালাটি এখন পুরো পালোয়ান হয়ে গেছে।

আর বেশ ক’দিন কসরত করে এবং কুস্তি লড়ে কোন চ্যালা যদি উঃ আঃ করতে করতে

ঘরে ফেরে তো বুঝতে হবে ও আখড়ার কনভোকেশন থেকে ডিগ্রি নিয়ে বাড়ি এসেছে।

আজ আখড়া থেকে দুই পালোয়ান টলতে টলতে বেরোল। একজন বদ্রী, অন্যটি ছোটে।

দুজনেরই ন্যাড়া মাথা। তার উপর ঘাম আর মাটি মিশে যেন পলেস্তারা পড়েছে। ঘাড়ের

পেছনে গণ্ডারের মত বেশ ক’টা চামড়ার ভাঁজ। দুজনেই ল্যাঙগোটের এক প্রান্ত হাতির

শুঁড়ের মতন সামনে ঝুলিয়ে চলছে। ল্যাঙোটের সরু পট্টির পাশ থেকে অণ্ডকোষের

সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের নজরে স্পষ্ট হচ্ছে। তবে যেমন শিল্পের

দোহাই দিয়ে হেনরি মিলার ও ডি এইচ লরেন্সকে অশ্লীলতার অভিযোগ থেকে ছাড়

দেওয়া হয়, তেমনই ভারতীয় ব্যায়ামের দোহাই দিয়ে ওই দুই পালোয়ানকেও ওসব

দেখানোর ছাড় দেওয়া হয়।

ছোটে পালোয়ানের সমাবর্তনের ডিগ্রি বেশ কয়েক বছর আগে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু

আজ বোধহয় পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি পেয়েছে। তাই একটু পরে পরেই খুব ধীমে স্বরে

উঃ আঃ করছে। কিন্তু গুরুর সামনে আত্মসম্মান রক্ষা করতে আওয়াজ মুখ থেকে ‘হায়’

না হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাসের সংগে মিশে ‘হাব্‌’ গোছের রূপ নিয়ে বেরোচ্ছে। বদ্রী চলছে

চুপচাপ, যেন ছোটের কষ্টের সংগে ওর কোন সম্পর্ক নেই।

আজ বদ্রী পালোয়ান ছোটে ব্যাটাকে ধোবী পাছাড় লাগিয়ে চিত করেছে।

এই প্যাঁচের প্রয়োগ করতে বদ্রী পালোয়ানকে এক অনেক উচ্চস্তরের কবির মত কাজ

করতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “বিজয়িনী” কবিতায় এক নারীর কোন সরোবরের

স্নান করার সময় কামদেব আদি কিছু পাত্রের বিষয়ে অভূতপূর্ব কল্পনা করেছিলেন।

ধোবী পাছাড় প্যাঁচ কষার জন্যে বদ্রীকে তার চেয়ে বেশি অদ্ভূত কল্পনা করতে হয়েছে।

যেমন এটা আখড়া নয়, এক চমৎকার সরোবর--- “সমীরণ প্রলাপ বকিতেছিল

প্রচ্ছায়সঘন পল্লব-শয়নতলে---“।

ওই পরিবেশে ও নিজেকে এক ধোপা হিসেবে কল্পনা করল, আর প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোন

নারীর পেটিকোট। ফের ও সেই ব্যাটার হাত টেনে নিজের পিঠের দিক থেকে কাঁধের উপর

উঁচুতে তুলে আখড়ার মাটিতে আছড়ে ফেলল। আছড়ে ফেলার সময় খেয়াল রাখতে হয় যাতে

মাটিতে পড়ার সময় পেটিকোটের সামনের ভাগ উপরের দিকে থাকে। অর্থাৎ

প্রতিদ্বন্দ্বীকে এমন ভাবে পটকাতে হবে যাতে সে মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে।




তারপর?

“বিজয়! বিজয়! মহান বিজয়! শত্রু জানু পাতি বসি , নির্বাক বিস্ময়ভরে নতশিরে---“।

বদ্রী পালোয়ান আজ ছোটেকে আছাড় মারার সময় একটু বেশি কল্পনা করে ফেলল। ওর

কল্পনায় এটা আখড়া নয় পুকুর। আর এটা আখড়ার মাটির আল নয়, পুকুরের ঘাটের

সিঁড়ির পাথর। ফলে ছোটে পালোয়ানের যখন আখড়ায় চিৎ হয়ে আখড়ার উপর বিছিয়ে

থাকা ‘প্রচ্ছায় সঘনপল্লব” দেখার কথা, ও দেখল চোখ থেকে আগুনের ফুলকি

বেরোচ্ছে, কোমরের নিচের অংশ আখড়ার জমির বাইরে , উপরের অংশ আখড়ার ভেতর।

আর ও নেহাত বেহায়া, নইলে কোমর ভেঙে যাওয়ার কথা।

কপালগুণে বদ্রী হল ছোটে পালোয়ানের ওস্তাদ, নইলে এতক্ষণে ওর চোখ থেকে জল

আর মুখ থেকে হাজার গালির ফোয়ারা ছুটত। কিন্তু ওস্তাদের প্রতি সম্ভ্রম দেখিয়ে ও

চুপচাপ হাঁটছে, বেশি কষ্ট হলে মুখ থেকে একটা ‘হাব্‌’ গোছের আওয়াজ বের করছে।

কিন্তু ওর বিপদ এখানেই শেষ হল না। চলতে চলতে বদ্রী পালোয়ান জিজ্ঞেস করল, “কী

হে, সেদিন জোগনাথের হয়ে সাক্ষী দিতে গিয়ে তুমি কীসব বলে এসেছ”?

“কোন শালা জোগনাথের সাক্ষী? আমি তো পুলিসের সাক্ষী ছিলাম”। ছোটে কোমরের

ব্যথা চেপে গিয়ে বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে বলল।

বদ্রী বেশ শান্ত স্বরে বলল, “সোজা প্রশ্নের সোজা জবাব চাই। এর মধ্যে শালা-

ভগ্নীপতিকে নিয়ে টানাটানি কেন”?

“কে আবার ত্যাড়া চাল দিচ্ছে”? ছোটে বলল বটে, কিন্তু গলার জোর যেন কমে গেল।

বদ্রী পালোয়ান এসব নিরর্থক কথাবার্তা এড়িয়ে সোজা প্রশ্ন করল, “তুমি সেদিন

সাক্ষী দেবার সময় বেলাকে নিয়ে কী বলেছ”?

“আমার কী বলার ছিল? তখন যা মুখে এল বলে দিলাম”।

বদ্রী পালোয়ান বড় নরম গলায় কথা বলছিল। এবার ছোটের হাথ ধরে বলল, “ওর

জোগনাথের সংগে কোন ইন্টুমিন্টু ছিল”?

ছোটে নিজের হাতটা আস্তে করে ছাড়িয়ে নিল। আঙুল ধরে বাহু ধরা যায়। আবার বাহু

ধরলে ধোবীপাট প্যাঁচ লাগিয়ে কাউকে চিত করা যায়—এটা ও একটু আগেই দেখেছে। কথা

পালটানোর জন্যে বলল, “আমি কি জানি কার সংগে কার ইন্টুমিন্টু চলছে? গাঁয়ের

চারপাশে অড়হরের খেত। তার আড়ালে কে কার সংগে লাগাচ্ছে, আমি কোথায় কোথায়

উঁকি দেব”?




বদ্রী আগের মতই নরম আওয়াজে বলল, “কিন্তু তুমি নাকি বলেছ যে নিজের চোখে

বেলাকে জোগনাথের সংগে সটরপটর অবস্থায় দেখেছ”?

“বললে কী হয়”?

বদ্রী পালোয়ান হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। কড়া আওয়াজে বলল, “কেন হয় না? তুমি বলেছ কি

বলনি”?

এবার ছোটে পালোয়ানের একটু ভয় ভয় করতে লাগল। ওর গলার স্বরে বেপরোয়া ভাব

গায়েব। শাশ্বত কালজয়ী সাহিত্যের লেখকও যেমন রেডিওর প্রশ্নকর্তার সামনে

হড়বড়িয়ে যায়, তো তো করে, তেমনই ছোটে বদ্রী পালোয়ানের সামনে হড়বড়িয়ে গেল।

মাফ চেয়ে বলল, “ গুরু, বলেছিলাম তো! বলতে গিয়ে অনেক কিছু বলেছিলাম। আদালতে

সাক্ষী দেওয়া বলে কথা! যা মুখে এল, বলতে থাকলাম। কে ওখানে সত্যি বলে”!

বদ্রী পালোয়ান অন্ধকারে খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। যে কাজটা কোন পালোয়ান

সহজে করতে পারে না, বদ্রী সেটাই করতে লাগল। অর্থাৎ কিছু একটা ভাব ছিল।

ছোটে এতে আরও ঘাবড়ে গেল। একটু তুতলে তুতলে বলল, “গুরু, কী নিয়ে এত চিন্তা-

ভাবনা? ভাবনাচিন্তা ছোটলোকের কাজ। আমাকে বল, হয়েছেটা কী”?

বদ্রী ধীরে ধীরে বলল, “ভাবছি, তোকে লাথি মেরে মেরে শায়েস্তা করি? নাকি জুতোপেটা

করি? শালা, তোর মুখে কুকুরের ছানা পেচ্ছাপ করে! থু ! থু !”

এই বলে ও বেশ ঘেন্নার সঙ্গে মাটিতে একদলা থুতু ফেলল।

ছোটে হক্কাবক্কা! থেমে থেমে অনুনয় করতে লাগল, “এমন কথা বল না গুরু! বলে দাও

কোথায় কী ভুল করেছি”।

“তুমি শালা বললেও বুঝতে পারবে কি? এক ভাল ঘরের মেয়ের সম্মান গোটা দুনিয়ার

সামনে ধূলোয় ছুঁড়ে ফেললে। তোমার চোখে এটা কিছুই নয়”?

ব্যস্‌ এইটুকু ব্যাপার! এবার ছোটে পালোয়ান শান্তিতে দম নিল। ফের বেপরোয়া ভাব

দেখিয়ে বলল, “গুরু, আমি যাই বলে থাকি, সেসব তো ভরা আদালতে ঈশ্বরের দিব্যি গেলে

বলেছি। সবাই জানে যে আদালতে যা বলা হয় তার কোন মাথামুণ্ডু নেই। এতে কার কী

ক্ষতি হোল”?

বদ্রীকে চুপ করতে দেখে ছোটের হিম্মত আরও বেড়ে গেল। অর্থাৎ নিজস্ব ঢঙে বাকি

দুনিয়াকে পোকামাকড় ভেবে ও নিজের কথাটা শেষ করল, “এই জন্যে আমাকে জুতো পেটা

করবে, গুরু? বাহ্‌ গুরু, তুমিও কখনও কখনও এমন সব কায়দা করে কথা বল যে আমিও

অবাক হয়ে ভাবতে থাকি—হয়েছেটা কী”?




বদ্রী পালোয়ান দুই হাতে নিজের গর্দান মালিশ করে তার উপর দু-চারটে তামাচা

লাগালো। এভাবে ও নিজের ঘাড়ে জমে প্লাস্টার হওয়া আখড়ার ধূলোমাটি ঝেড়ে ফেলল

এবং এতক্ষণ ধরে যা যা ভাবছিল সব এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলল। তারপর আচমকা হেসে

উঠে বলল, “তুই শালা খানদানী খচ্চর। ডাইনে বাঁয়ে দেখে চলতে হয় না? বেলা মেয়েটি

এখন তোর আম্মা হতে যাচ্ছে। তাকে তুই ছেনাল বল বা অন্য কোন নোংরা শব্দ—গালি

তোরই গায়ে লাগবে”।

“এটা কী বললে গুরু”?

“বলার কী আছে? একমাসের ভেতর বেলার বিয়ে হবে। বদ্রী পালোয়ানের সংগে। আর তুই

সানাইয়ে পোঁ ধরবি। মাথায় কিছু ঢুকল”?

সার্কাসের জোকার ফালতু প্রলাপ বকে, বাঁদর-নাচ নাচে। রাস্তায় তামাশা করা ঢোল

বাজাতে বাজাতে হাতের কাঠের টুকরো বগলের তলা দিয়ে কায়দা করে ঘুরিয়ে তাল-ফেরতা

বাজায়। আখড়ায় দু’তিন পালোয়ান খামোখা হাতের উপর ভর করে পা শূন্যে তুলে বিচ্ছুর

মত চলে। গোধূলি বেলায় ঘরে ফেরার সময় বাছুর মাথা ঝুঁকিয়ে খানিক এলোমেলো দৌড়তে

থাকে। তারপর লাফালাফির আনন্দে ওপাশের ডোবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। শনিচর ব্যাটা

অকারণে হঠাৎ চেঁচায়—উর্‌ র্‌ র্‌!

বদ্রী পালোয়ানের কথা শুনে ছোটে পালোয়ানের মনে হল ওইরকম কিছু অর্থহীন

প্রলাপের বোঝা ওর সামনে ফেলে রাখা হয়েছে। আর কেউ ওকে ওই জঞ্জালের গাদায়

চিত করে পটকে দিয়েছে। ওর মুখ থেকে খালি একটা কথা শোনা গেল, “এসব কী বলছ

গুরু”?

“যা বললাম কানে ঢোকে নি”? বদ্রী হালকা ভাবে ঠাট্টা করার ছন্দে বলতে লাগল, “কী

ব্যাপার? কানে খুব ময়লা জমেছে? আবার শোন, আমি বেলাকে বিয়ে করছি। ওকে কথা

দিয়েছি। সেদিন তুমি যখন এজলাসে দাঁড়িয়ে ওর বদনাম করছিলে আমার এক এক রোঁয়া

আগুনে জ্বলছিল। মন চাইছিল --এক চাঁটিতে তোমার মাথা পেটে ঢুকিয়ে দি। কিন্তু তুমি

আমার চ্যালা। তাই পালক-বালক ভেবে মাফ করে দিলাম”।

একটা দীর্ঘশ্বাস! তারপর বদ্রী নিজের কথা শেষ করল এই বলে—“ যাক, যা হবার হয়ে

গেছে। এবার থেকে জিভে লাগাম দাও”।

ছোটের এখনও মনে হচ্ছে যে ও ফালতু কথার জঞ্জালের উপর চিত হয়ে শুয়ে আছে। আর

বদ্রী পালোয়ান যা বলছে সেসব কোন স্বপ্নলোকের কথা। ও বলল, “গুরু, তুমি হলে

বামুন। মেয়েটা বেনে। একটু ভেবে কথা বল। বৈদ্যজী মহারাজ যদি খেরে গিয়ে জিদ ধরেন

তাহলে তোমার পুরো ইস্কিম ভস্কে যাবে”।

বদ্রী বলল—“ হাথী চলে বাজার মেঁ, কুত্তা ভোঁকে হাজার মেঁ”।




ছোটে প্রায় হাতে পায়ে ধরতে লাগল, “গুরু, তুমি দেখছি প্রবাদ আউড়ে যাচ্ছ। এতে

বৈদ্যজী গলে যাবেন”?

মনে হচ্ছে মনের গোপন কথা বলে ফেলে বদ্রী একটু হালকা হয়েছে। ও জবাব না দিয়ে

সিটি বাজাতে লাগল।

আরও খানিকক্ষণ হাঁটার পর পুরো ব্যাপারটা আর তার গুরুত্ব ছোটে পালোয়ানের মগজে

ঢুকল। বেলার সম্বন্ধে উড়ো খবর ছিল যে রূপ্পন বাবু ওকে একটা চিঠি লিখেছেন।

এইভাবে উড়তে উড়তে ওর কানে এটাও পৌঁছেছিল যে কোন ছুঁড়ি রাত্তিরে বৈদ্যজীর ছাতে

এসেছিল। তবে রঙ্গনাথের সংগে ধাক্কা লাগায় পালিয়ে গেছল।

যে বাড়িগুলোর ছাত থেকে অনায়াসে বৈদ্যজীর ছাতে আসা যায় তার মধ্যে গয়াদীনের বাড়ি

একটি। রূপ্পনবাবু একদিন বলেছিলেন যে কোন মেয়ের লেখা চিঠি রঙ্গনাথের হাতে

এসেছে। কিন্তু রঙ্গনাথ সে নিয়ে খুলে বলছে না। ছোটে পালোয়ানের সন্দেহ হচ্ছিল যে

রূপ্পন বাবু কিছুদিন ধরে বেলার পেছনে লেগে আছেন আর প্রায় পটিয়ে ফেলেছেন। এই

পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ একী! বেলার সাথে বদ্রী পালোয়ানের সম্বন্ধ আর মামলা

অনেকদূর গড়িয়েছে! ছোটে হড়বড়িয়ে গেল।

জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু গুরু, শুনেছি রূপ্পনবাবু বেলাকে নিয়ে কিছু চিঠিচাপাটি

করেছিলেন”?

--“হ্যাঁ করেছিল। ছেলেমানুষ। বোকামি করেছে”।

-“শুনেছি, ওদিক থেকেও পালটা চিঠি এসেছিল”।

বদ্রী পালোয়ান কড়া সুরে বললে, “কে বলেছে”?

--“কেউ না, গুরু”।

-“তাহলে তুমি শুনলে কী করে”?

--“মন পড়ছে না গুরু। তবে কেউ না কেউ অমন হাওয়ায় উড়তে থাকা কথার পিঠে বলে

থাকবে”।

বদ্রী পালোয়ান চুপ। যখন কেউ কথাবার্তার সময় আদালতে ঈশ্বরের নামে দিব্যি গেলে

সাক্ষী দেয়ার পেশাদারি কায়দার নকল করে তখন আর কোন প্রশ্ন করা অর্থহীন হয়ে

যায়। বদ্রী খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর খুলে বলল, “হ্যাঁ, চিঠি এসেছিল। তবে

আমার জন্যে। কিন্তু ওটা ঠিক চিঠি ছিল না। আজকালকার মেয়েদের ন্যাকামি—ফিল্মি

গানটানের কথায় ভর্তি”।




ছোটে এবার তোষামুদে স্বরে বলল, “ তো গুরু, ব্যপারটা কয়েক বছর ধরে চলছে, কী বল?

ছাতের উপরেই---“।

বদ্রী বলল, “ছোটে, এতবড় খবরটা সবার আগে শুধু তোমাকেই বললাম। যতটা শুনলে তাই

অনেক। বেশি খোঁচাখুঁচি করার দরকার নেই। আর দেখ, কাউকে বোল না যেন”।

ছোটে পালোয়ান অন্ধকারে কারও বারান্দার বাড়িয়ে রাখা একটা কোণায় হোঁচট খেল।

এগুলো গ্রামের লোক কোন জমির টুকরো হাতিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে বানায়। মুখে এল কাঁচা

খিস্তি। তারপর কোমরের ব্যাথার প্রতি সম্মান দেখিয়ে একবার ‘হাব্‌’ গোছের আওয়াজ

বের করে বদ্রীকে বলল, “কাউকে বলব না গুরু”।

--“কিছুদিন পরে সবাই জানতে পারবে। কিন্তু এখন খবরটা চেপে রাখ”।

-“বললাম তো গুরু! কাউকে বলব না”।

একটু পরে বদ্রী পালোয়ান হেসে উঠল। বলল, “বাহ, রে ছোটে! কেমন যুগলের জোড়

বানিয়েছ! বেলা চক্কর চালাবে জোগনাথের সংগে? শালা ফুটো পয়সার গুড়! বেলা যদি ওর

হাত ধরে তো তোতলাতে থাকবে। তুমি বেলাকে ওর সংগে জোড় বানিয়ে দিলে? তুমি শালা

খড়ুসের খড়ুস! মাথামোটার হদ্দ”!

ছোটে পালোয়ানের কোমর থেকে একটা ব্যথা ঝিলিক দিয়ে উঠল। মনে হোল ধোবীপাছাড়

দিয়ে কেউ ওকে ফের পটকে দিয়েছে।

একজায়গায় এসে ওরা আলাদা হয়ে নিজের নিজের ঘরের পথ ধরল। কিন্তু তার আগে

বদ্রী ফের ছোটেকে মনে করিয়ে দিল—ওর আর বেলার সম্পর্কের কথা যেন পাঁচকান না

হয়। ছোটে বড় নিষ্ঠার সংগে গোপনীয়তার শপথ নিল। কিন্তু এই শপথ ওইসব তথাকথিত

শপথের মতই—যা রাজভবনে নেওয়া হয়। ফলে পরের দিনই বদ্রী পালোয়ানের সংগে

যাদের মোলাকাত হল, তাদের মধ্যে অনেকেই বদ্রীকে বদলে যাওয়া চোখে দেখতে লাগল।

(চলবে)
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















২২. আবহমান বাঙালী জীবন তথা বাঙালিত্বের প্রতি





সুপ্রিয়বরেষু

বাসু

তোমার চিঠি যখন পেলাম ঠিক তার চার ঘন্টা পরেই আমার ফ্লাইট ছিল লন্ডন যাবার তাই চিঠিটা পড়া হয়নি, সঙ্গে নিয়ে গেলেও কাজের চাপে সেই চিঠি আবার বারদিন পরে আমার সাথে ফিরে এসেছে। বিস্তর সময় পরে গতকাল অফিস শেষে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় তোমার চিঠি পড়েছি। তোমার চিঠি পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে পড়ছিল পরিমল ভট্টাচার্যর‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ প্রসঙ্গ। 'সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা' কে শুধু একটি উপন্যাস বললে ভুল বলা হবে, পরিমল ভট্টাচার্যের লেখালেখির সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা জানে তাঁর গদ্যের একটি নিজস্ব ভূগোল আছে। তিনি নিছক কাহিনি বলেন না, তিনি ইতিহাসের গায়ে কান পেতে, হারিয়ে যাওয়া জনপদের ধ্বনি শোনেন, নদীর ভাঙন ও মানুষের স্মৃতিকে একই সঙ্গে হৃদয়ে ধারণ করেন। পরিমল ভট্টাচার্যর ‘ফিল্ড নোটস ফ্রম আ ওয়াটারবোর্ন ল্যান্ড’ তো পড়েছো তাঁর সেই নদী চেতনার দেখা এখানেও মেলে এবং তা গুরুত্বপূর্ণ, আমরা তো জানি বাংলার ইতিহাস নদী ছাড়া অসম্পূর্ণ। সাতগাঁর পতনের পিছনেও নদীর ভূমিকা ছিল। লেখক নদীকে ইতিহাসের চরিত্রে পরিণত করেছেন। এই বইটি বড় ক্যানভাসে সময়, স্মৃতি, নদীসভ্যতা, উপনিবেশ, ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, মিথ, পরিযান, ভাষা ও মানুষের অন্তর্গত বিষন্নতার এক বিশাল আর্কাইভ। ইতিহাস, মিথ এবং স্মৃতির এক জাদুময় আখ্যান। হুগলি ও সরস্বতী নদীর মধ্যবর্তী প্রাচীন বন্দর নগরী সাতগাঁর পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটি ৭০০ বছরের পুরোনো এক বিপন্ন জনপদের ও বহুবর্ণ সংস্কৃতির মহাকাব্য। বইটা শেষ করেছি অনেকদিন হলো এখনো উপন্যাসের পটভূমি, চরিত্ররা ঘিরে আছে মনে হয় মাথার প্রতিটি কোষে মিশে গেছে চোখের তারায় ফুটে ওঠে ত্রিবেণীতে গঙ্গা, ভাগীরথী ও সরস্বতীতে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় এই দুই শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে পলি জমে জমে সৃষ্টি হয় মাছের আকৃতির এক ভূমি, যার নাম মৎস্যভূমি যা প্রাক ইসলামিক পাল ও সেন যুগ থেকে ষোড়শ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত ধারণ করে রেখেছে জমজমাট এক বাণিজ্যকেন্দ্র, সপ্তগ্রাম বন্দর। চলতি কথায় সাতগাঁ। সপ্তদশ শতকে সরস্বতী ক্রমশ: ক্ষীণকায়া হতে শুরু করলে সাতগাঁ বন্দর তার কৌলিন্য হারাতে শুরু করে। লেখক কোনো নির্দিষ্ট সন-তারিখ ধরে এগিয়ে যাননি। এখানে ইতিহাস নির্মিত হয়েছে স্মৃতি আর শ্রুতির পথ ধরে, যেখানে অতীত এবং বর্তমান ক্রমাগত একে অপরের পিঠে এসে ভর করে। উপন্যাসটির গভীরতম পরত লুকিয়ে আছে এর সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। বাপ্পাদিত্যকে এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বলা যায়। তার পিতা পূর্ববঙ্গের সন্তান। যাদের বলা হয় বাঙাল। সিলেটি। তারা এখনও সিদলের স্বাদ ভুলতে পারেননি। কিন্তু তার মা শিউলি কেবল ঘটী নয়, সাতগাঁর জয়রামবাটির অন্তত সাতশো বছরের নাড়ির যোগ তাদের। বাঙাল-ঘটী শব্দের পরিচয়সূচক ব্যবহার একশো বছরের অধিক নয়। আবার বাপ্পাদিত্যর মাতামহ বা শিউলির বাপের বাড়ির বংশলতিকার গোড়ায় দেখা যায় কোন সুদূর অতীতে উত্তর ভারতের কনৌজ থেকে এসে গঙ্গা-সরস্বতীর মধ্যকার মৎসভূমিতে বসবাস শুরু করেছিলেন তারা। মাঝে দরপ খান এই অঞ্চল জয় করলে এই বংশের রামাচার্য নতুন শাসককে বলেন --'আমরা পুরোহিত বংশ বটে, তবে মন্দিরে বিগ্রপূজাই আমাদের একমাত্র বৃত্তি নয় ---- আমরা শাস্ত্র পাঠ করি, শিক্ষাশ্রমে অধ্যাপনা করি। এর বাইরে কোনোরূপ জাগতিক বৃত্তি আমাদের বর্ণে নিষিদ্ধ। বারোটি নিষ্কর গ্রাম ও সংলগ্ন কৃষিজমি থেকে আমাদের অন্নসংস্থান হয়। শত শত বছর শাসকেরা এই ব্যবস্থাকে মান্যতা দিয়েছে। আপনি ব্যতিক্রম, আপনি সেই জমিতে কর চাপিয়েছেন। আমাদের সম্মিলিত আবেদন, আপনি সেই জমি আগের ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দিন।' দরপ খান তাদের পূর্বব্যবস্থা কেবল বহাল রাখেননি, বরং এই অঞ্চলের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সাতগাঁর জমিনে পা পড়েছে পর্তুগীজদের, পা পড়েছে ইংরেজদের -- সংমিশ্রিত হয়েছে সাংস্কৃতিক রঙ। সেই নতুন রঙে তৈরি হয়েছে একটি জনপদের ক্যানভাস। কেন্দ্রীয় চরিত্র বাপ্পাদিত্য (যার বাবা দেশভাগের ছিন্নমূল প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং মা সাতগাঁর স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে) এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে রাষ্ট্র তার কাছে নাগরিকত্বের প্রমাণ বা সাবুদ চাইছে। এর প্রতিটি উপাখ্যান আসলে বাপ্পাদিত্যের সেই আইনি খাঁড়ার বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। সে প্রমাণ করতে চায়, সাতশো বছর ধরে এই মাটির জল-হাওয়ায় তার পূর্বপুরুষদের অস্তিত্ব মিশে আছে। সেই বাপ্পাদিত্যই আমাদের নিয়ে যায় ক্যানভাসের কেন্দ্রে। আমরা পিছিয়ে যেতে থাকি ক্রমশ। আশপাশটা পাল্টে পাল্টে যেতে থাকে। গলা জড়িয়ে ধরে মিথ, ফ্যান্টাসি, পুরাণ। আমরা সাতশো বছর পিছিয়ে যাই। একটি কনৌজি ব্রাহ্মণ পরিবারের নয়টি প্রজন্ম এবং উনপঞ্চাশটি চরিত্র আমাদের ঘিরে জীবন্ত হয়ে ওঠে। লেখক আমাদের নিয়ে যান হুগলি আর সরস্বতী নদীর সংযোগস্থলে থাকা সেই অদ্ভুতুরে মায়াভূখণ্ডে, যার নাম সাতগাঁ। কত ঘটনাই সেখানে ঘটে! আমরা জানতে পারি আজকের বাপ্পাদিত্য ছেলেবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে মার্টিন্স কোম্পানির ছোটো রেলগাড়ি চেপে এসেছে এই জাদুভূমিতে, যেখানে রেলের চাকায় বাজে কেরেস্তান-গোরস্তান ধ্বনি, হাওয়া দিলে গির্জার চালে বেড়ালের কান্নার মতো শব্দ হয়, যেখানে নারীরা নদীতে ডুব দিয়ে দূরবাসিনী আত্মীয়ার সঙ্গে জলে-জলে বার্তা বিনিময় করে, নৈয়ায়িকেরা কুয়োর পেতনির শাপে ব্যাঙ হয়ে যায়, প্যারিস থেকে তরুণ কবি এসে খুঁজে পায় তার ক্লেদজ কুসুম, সার্জেন-পাদরি নদীর খাত ঘুরিয়ে দেয়, দুর্দম তুর্কী যোদ্ধা এসে মায়াবী ভূমিতে বাঁধা পড়ে, সংস্কৃত শিখে গঙ্গাস্তোত্র লেখে, পুরুষেরা পুনর্জন্ম নিয়ে বংশে ফিরে আসে, এমনকি এক ফিরিঙ্গিও ফিরে আসে কাকাতুয়ারূপে... কী অসম্ভব নিপুণ এক নির্মিতি! এতটুকু বিচ্যুতি নেই বয়ানে। উপন্যাসের প্রথমেই দেখা যায় রাষ্ট্রের নতুন নাগরিকত্ব আইনের বেড়াজালে আটকে পড়েছে বাপ্পাদিত্য। বিচারকের কাছে তার জবানবন্দিই হল এই বৃহত্তর উপন্যাস। সাতশো বছরের প্রায় নয় প্রজন্ম ধরে চলে আসা কথকতা। ইতিবৃত্ত। অবিশ্বাস্য রকমভাবে অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে চলেছে বাপ্পাদিত্য। আইনের চোখে তা কতটা প্রামাণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে সেটা বড় কথা নয়, পাঠকের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে বাধ্য করেছেন লেখক। পাঠক অনায়াসে বিশ্বাস করবেন -- শিউলির নদীর জলে ডুব দিয়ে জলমাধ্যমে দূরের প্রিয়জনের সাথে কথোপকথন কতটা বাস্তব। দরপ খাঁ, যিনি দুর্ধর্ষ তুর্কী শাসক এই জনপদের প্রেমে পড়ে এই গঙ্গার সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন গঙ্গাস্তোত্র। তা পাঠ করে হিন্দু ব্রাহ্মণগণ। কিংবা পর্তুগীজ নাবিকের কাকাতুয়া হিসেবে ফিরে আসা -- সবই বাস্তব হয়ে ওঠে পাঠকের চোখে। রয়েছে ইতিহাসের সত্যতা। কিন্তু রাষ্ট্রকে কিভাবে বিশ্বাস করাবে বাপ্পাদিত্য যে এই ভূমির সাথে তার কত প্রজন্মের সম্পর্ক? তার যে জন্ম সার্টিফিকেট নেই! রথীন যখন তাকে জানায় -- 'কিন্তু তুমি তো ইন্ডিয়ায় জন্মেছ বাবা! দ্যাটস আ ফ্যাক্ট'। বাপ্পাদিত্য বলে -- 'সেটা তুই জানিস, আমি জানি রাষ্ট্র তো আর জানে না। রাষ্ট্র প্রমাণ চায়'।

মিথ নির্মাণ বা ইতিহাস প্রাজ্ঞতা দেখানোর মোটিভ নয়, বরং দর্শককে দ্রষ্টব্যের আরও কাছে নিয়ে গিয়ে অস্তিত্বের একেকটা চিহ্ন পুনরুদ্ধারই যেন তাঁর একমাত্র পরিকল্পনা। এ তো কেবল বাপ্পাদিত্যর ইতিহাস নয়, বরং গোটা একটি জাতির উৎসমুখে দাঁড়িয়ে লেখকের এই পরিবেশনা। লাতিন আমেরিকার ইতিহাস যেমন নিমজ্জিত থাকে মার্কেজের তৈরি বুয়েন্দিয়া পরিবারে, ঠিক তেমনি স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবারটির সাতশো বছরের প্রাককথনে ডুবে আছে বাংলার বহুস্তরীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাস। পড়তে পড়তে মনে হতে পারে উপন্যাসটির ম্যাজিক রিয়্যালিজ়ম লাতিন আমেরিকার অনুকরণ। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না ম্যাজিক রিয়্যালিজম লাতিন আমেরিকায় যুবক হলেও বাংলাসাহিত্যে তার শৈশবকাল বহু আগেই রচিত ঠাকুরমার ঝুলি রূপকথার গল্পে আর তাই বাংলার লোকবিশ্বাস, ভূতপ্রেত, নদীপুরাণ, স্বপ্ন, মঙ্গলকাব্য, গ্রামীণ কল্পনা ও স্মৃতির ভিতর থেকে উঠে এসেছে বহুবার। বাংলার গ্রামীণ জীবনে বাস্তব ও অলৌকিকের সীমানা কখনও খুব স্পষ্ট ছিল না। মৃতেরা ফিরে আসে, নদী কথা বলে, গাছের আত্মা থাকে, বাতাসে পূর্বপুরুষের ফিসফিসানি শোনা যায়। ‘হাওয়াতাঁতি’ শব্দটিই এই অলৌকিক বাস্তবতার জাদু।

পরিমল ভট্টাচার্যর ‘নাহুমের গ্রাম’-এ যেমন আমরা পড়েছিলাম ‘হেলেন’ নামের পুতুলটির এক জায়গা থেকে ভাসতে-ভাসতে আর-এক স্থানে পৌঁছে যাওয়ার ইতিবৃত্ত, সাতগাঁর কাহিনিও যেন তেমনই ভেসে বেড়ায় এক প্রজন্ম থেকে আর-এক প্রজন্মের জল-হাওয়ার বুননে। ‘হয়তো সেই কাহিনির বুননের ভেতর কোনো একটি বাঁকে’ আটকে পড়ে তারা। সেখান থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে পাওয়া বড় সহজ নয়। তবে মুক্তির এক সহজ উপায় বের করে নেওয়া যেতে পারে। পরিমল ভট্টাচার্যর পাঠবিশ্ব সম্পর্কে অনেকটাই ধারণা করে নেওয়া যায় তাঁর লেখা অন্যান্য বইগুলি থেকে, এ ছাড়াও আমরা জেনেছি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, বোর্হেস, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কিংবা সমরেশ বসুর প্রভাবের কথা। সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা পড়তে-পড়তে মনে আসে এমনই অনেক সৃষ্টির কথা। ইনসুলারিটি থেকে মুক্তি পাওয়ার, বাঁকে আটকে পড়া থেকে বেরিয়ে আসার এ-ই এক উপায়। সাতগাঁ–পর্তুগিজ়দের পোর্তো পেক্যেনো (‌ছোট বন্দর)–তার গির্জা, ক্রীতদাস, শাকম্ভরী দেবী, বনলতা, সরোজা, কলার ভেলায় ভেসে আসা মেয়ে মান্দাসী আর সেই জলজ মৎস্যভূমি জুড়ে ঘটে চলা হাজারও অবস্থান নির্মাণ করে চলে ভাষা আর ক্ষমতার সমীকরণের কাহিনি। যেখানে ভাষা ফুরিয়ে যায়, ইতিহাসও যেন থেমে থাকে স্থির, কেবল বুদ্‌বুদের মতো মৃত সময়ের মুখের ভিতর থেকে বেরোতে থাকে জলের ধারা। জে এম কুটসিয়ার লেখা উপন্যাস ফো-র শেষ পৃষ্ঠাটির কথা মনে আসে বারবার, ক্রুসো আর তার ফ্রাইডে যেন আদিরামবাটির কোনও বংশধর! কুটসিয়ার এই উপন্যাসের মূক ফ্রাইডে আর মান্দাসী দাঁড়িয়ে থাকে পাশাপাশি–কিন্তু তাদের ইতিহাস (মাইক্রোহিস্ট্রি, হিস্ট্রি ফ্রম বিলো–যা-ই বলি না কেন) শুনতে পাওয়া যায় কি আদৌ? আজও? ডুবোজাহাজের ভিতর জল স্থির, শান্ত–‘দ্য সেম ওয়াটার অ্যাজ় ইয়েস্টারডে, অ্যাজ় লাস্ট ইয়ার, অ্যাজ় থ্রি হান্ড্রেড ইয়ার্স আগো,’ লিখেছেন কুটসিয়া। এই জলের ছায়াও কি এসে পড়ে সাতগাঁয়ে? মৃত ফ্রাইডের মুখ খোলার চেষ্টা করা হয়। এ বার কি তার মুখ থেকে, নীচের মহল থেকে বেরিয়ে আসবে ভাষা? ‘His mouth opens. From inside him comes a slow stream, without breath, without interruption’। মিস্ট আর মিস্ট্রি বুনে চলে হাওয়াতাঁতিরা, অক্ষরপুঞ্জ দিয়ে গড়া হয় কল্পকাহিনি; বিরতিহীন, বিরামহীন। উপন্যাসটির আর একটি বড় গুরুত্ব তার বিষন্নতায়। কিন্তু এই বিষণ্ণতা নিছক নস্টালজিয়া নয়। এটি সভ্যতার ক্ষয় সম্পর্কে এক গভীর অনুভব। মানুষ প্রযুক্তিগত ভাবে যত উন্নত হচ্ছে, ততই একাকী, বিচ্ছিন্ন ও স্মৃতিহীন হয়ে পড়ছে। ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ সেই শূন্যতার অনুভূতিকে ধারণ করে।

পড়তে পড়তে মনে হতে পারে এইভাষা সাম্প্রতিক সময়ের উপন্যাসের ভাষা নয় কিংবা দৃশ্যের পর দৃশ্য, কুয়াশা, নদী, ভাঙা বন্দর, পুরনো বাড়ি, বাতাসের শব্দ— সব মিলিয়ে তাঁর গদ্য অনেক সময় সিনেমাটিক। বিশেষত তারকোভস্কি-র মতো সময়কে তরল করে দেওয়ার প্রবণতা তাঁর লেখায় অনুভব করা যায়। চোখে পড়বে লেখকের বারংবার প্রসঙ্গান্তরে যাওয়া। লেখক হয়ত এভাবেই লিখতে চেয়েছেন। খানিকটা জার্নালের মতো। তাই অনেক পাঠকের কাছে এই ভঙ্গিতে চলা পছন্দসই মনে হয়ত হবেনা। তাই পাঠের তাল কেটে যেতে পারে বারবার। আজকের বাংলা সাহিত্যের একটি বড় অংশ দ্রুতপাঠ্য ও প্লটনির্ভর। সেখানে পরিমল ভট্টাচার্যের গদ্য ধীর, ধ্যানমগ্ন, বহুস্তরীয়। তিনি পাঠককে সহজ উপভোগের জায়গায় রাখেন না। বরং তাকে ইতিহাস, ভূগোল, ভাষা ও স্মৃতির স্তরগুলির মধ্যে প্রবেশ করতে বাধ্য করেন। এই ধীর গতি আজ রাজনৈতিক ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমান সময়ের বাজার ও প্রযুক্তি মানুষকে ক্রমাগত দ্রুততার মধ্যে বন্দি করে রেখেছে। মানুষ আর থামতে জানে না, গভীর ভাবে পড়তে জানে না, মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ সেই দ্রুততার বিরুদ্ধে এক সাহিত্যিক প্রতিরোধ। এটি পাঠককে ধীরে পড়তে শেখায়, শুনতে শেখায়, হারিয়ে যাওয়া সময়ের শব্দ শুনতে শেখায়। এই উপন্যাস উপকথায় ভরা। তার অনেকগুলোকেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। মনে হতে পারে মূল উপন্যাসকে দুর্বল করেছে এবং গোলকধাঁধায় ফেলে কাহিনির অবয়ব বৃদ্ধি করা হয়েছে মাত্র। প্রথম আলো, সেইসময় পড়া বাঙালির কাছে মনে হতে পারে অজস্র তথ্য, ইতিহাস, চরিত্রের বিচিত্র সমাবেশ ঘটাতে গিয়ে পাতায় পাতায় বেশ জবরজঙ করে ফেলেছেন লেখক আরেকটু পরিমিতবোধ থাকতে পারতো কিংবা প্রশ্ন জাগতেই পারে শুরুতেই বিভিন্ন চরিত্র কাল্পনিক বলে ডিক্লারেশন দিয়ে কি লেখক একটা স্বাধীনতা নিয়েই রেখেছেন, খানিকটা আগাম জামিনের মতো আর তাই যে সব চরিত্রের ছায়া তিনি ব্যবহার করেছেন পাঠকের কাছে তাদের প্রকৃত স্বরূপ চেনানোর জন্য কোনও ফাঁক রাখেননি। যেমন কাঁঠালপাড়ার রাজমোহন চাটুজ্জেকে দিয়ে বন্দেমাতরম লিখিয়েছেন। কলকাতায় রাজেন্দ্রলাল সরকার অকাতরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে গেছেন। প্রসাদ শাস্ত্রী প্রাচীন বাংলা বই-এর অনুসন্ধানে ঘুরেছে সাতগাঁ থেকে নেপাল অবধি। আরও অনেক। এইসব চরিত্রকে প্রকৃত চেহারায় লেখক কেন দেখালেন না তা বোধগম্য হয় না। চেনা চরিত্র নিয়েও কল্পনার সুযোগ তো লেখক নিতেই পারতেন। নাম বদল করে ব্যবহার ব্যাপারটাকে যেন সস্তা করে দিয়েছেন বলে মনে হতে পারে। এক যুগের বেশি সময় ধরে লিখছেন পরিমল ভট্টাচার্য তাঁর প্রিয় কালো জামা গায়ে চাপিয়ে খুঁজতে বেরোন স্মৃতিকে। গদ্যের নতুন ভাষার জন্ম দেন। বারবার প্রথা ভাঙেন। তিনি বলে থাকেন, ‘লেখায় কোন লাইনের প্রয়োজনীয়তা আছে আর কোনটা নেই, সেটা বুঝতে হবে। প্রয়োজনে খুব প্রিয় লাইন বাদ দিতে হবে।’ তাঁর লেখার একটা ধারা আছে। তিনি কোনও কিছুই কোনও বিশেষ খোপে ফেলতে চান না। ভ্রমণ, স্মৃতি, ইতিহাস এইসবের খোপে থাকতে চান না তিনি। তিনি শুধু লিখতে চান। পাঠকের কাঁধে হাত দিয়ে হেঁটে যেতে চান বহুদূর। এই বই পড়তে পড়তে মনে হয়— নদী শুধু জল বয়ে নিয়ে যায় না, সঙ্গে বয়ে নিয়ে যায় মানুষের জীবন, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, স্মৃতি ও বিস্মৃতি। আর সেই হারিয়ে যাওয়া সুরগুলোই যেন হাওয়ার তাঁতে বুনে চলেছে ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’। এ এক এমন পাঠ-অভিজ্ঞতা, যা শেষ পৃষ্ঠা উল্টে দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে মনের ভেতর নদীর ঢেউয়ের মতো নিজের স্মৃতির সঙ্গে অনুরণিত হতে থাকে। লেখক জানেন তিনি সর্বজ্ঞ নন। ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকার হাতড়েই তাঁকে কুড়োতে হয়েছে যাবতীয় মনিমুক্তো। বাপ্পাদিত্যের একক ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় ইতালো কালভিনোর দ্য রোড টু সান জিওভান্নি, যেখানে উনি লিখছেন, ‘from the depth of the opaque I write..’ আলোচ্য উপন্যাসের লেখকও বহুমাত্রিক একটি ছায়া-অতীতকেই নির্বাচন করেছেন। ফিকশনের বহুরৈখিক গতি কখনোই পাঠককে বিভ্রান্ত করে না, বরং এই বহুস্বরীয় ইতিহাস স্বীকৃতি পায় পাঠকের ব্যক্তিগত উপলব্ধিতে। ফিকশনকে যদি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমান্তরাল বাস্তব হিসেবে ধরে নেওয়া যায় তাহলে সেই বাস্তবের নির্মাণে প্রকরণগত ভাবে লেখক চূড়ান্ত সফল। ভুলে গেলে চলবে না আজকের বাপ্পাদিত্য, প্রৌঢ় বাপ্পাদিত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্র। নাগরিকত্বের প্রমাণ চাইছে রাষ্ট্র। চাইছে এভিডেন্স। বাপ্পাদিত্যর সমস্ত মুখের কথা, স্মৃতির কথাকে উড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্র বলছে, ‘শো, ডোন্ট টেল’। বাপ্পাদিত্য বলছেন, ‘আমি ডিফেডেন্ট, আমিই ডিপোনেন্ট’। প্রত্যুত্তরে রাষ্ট্র বলছে এভিডেন্সে ইতিহাস থাকতে পারে, ভূগোল থাকতে পারে, কিন্তু সাহিত্য নয়। নো পোয়েট্রি! ঠিক এই বিপন্নতা থেকেই উপন্যাসের অবতারণা। রাষ্ট্রের সমস্ত অযৌক্তিক প্রশ্ন ও আগ্রাসী অবিশ্বাসের সামনে তাই এই আবহমানতার সচেতন প্রতিষ্ঠা। একটি জাতির ক্ষয় -জয়-দীনতা- গোঁড়ামো-বাণিজ্য, সর্বোপরি থেকে যাওয়ার বিস্তৃত ইতিহাসের প্রয়োজন এখানেই। এই বহুস্বরীয় আখ্যান এই প্রতিস্পর্ধীতার বক্তব্যেই প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রের সমস্ত অযৌক্তিক প্রশ্ন ও আগ্রাসী অবিশ্বাসের সামনে তাই এই আবহমানতার সচেতন প্রতিষ্ঠা। লেখক পরিমল ভট্টাচার্যকে অভিনন্দন, কারণ তিনি রাষ্ট্রশক্তির ছুড়ে দেওয়া বিপন্নতার সামনে এভিডেন্স হাজির করাতে পেরেছেন। কালাকালের দলিল, চিরকালের এই প্রবহমান থেকে যাওয়ার অনিবার্যতাকে প্রকাশ করতেই এই বিপুল নির্মিতির দায়ভার লেখককে নিতে হয়েছে। এই আখ্যান কেবল বাপ্পাদিত্যকে নয়, আমাদেরকেও উৎসমুখে ঠেলে দেয়। সময়ের তাঁত বুনেছেন পরিমল ভট্টাচার্য। তিনিই স্বয়ং হাওয়াতাঁতি, এ নিয়ে আর সন্দেহ থাকে না।

ধান ভাঙ্গতে শিবের গাজন বলে একটা বাগধারা আছে বাংলায় আমি সম্ভবত সেটাই করে ফেললাম আজ তোমাকে লিখতে বসে, আসলে তোমার চিঠি পড়তে পড়তে বাংলার এই পরিক্রমার কথাই মনে পড়েছে বারবার। রাত এখন প্রায় একটা! সারা সোসাইটি ঘুমিয়ে গেছে দূর থেকে ভেসে আসছে জাহাজের ডাক, রাস্তার কুকুরগুলো সে সুরে সুর মিলিয়ে চিৎকার করছে, এমন সময় প্রশ্ন জাগে— সভ্যতা কি শুধুই নির্মাণের ইতিহাস, নাকি বিলুপ্তিরও ইতিহাস?



ভালবাসা সহ-

সুস্মি

২৬ জুন, ২০২৬
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















পর্ব ২৬.২

এবার রাস্তা একদম ফাঁকা। ফৌজি কায়দার লোকটা ওখান থেকেই চেঁচিয়ে বলল, “চলো

ছেলের দল! ডবুল মার্চ! চলো-ও-ও”!

ঝোপের পেছনে স্বাভাবিক স্বরে কথাবার্তা চলছিল।

“হাঁ ভর্ফাই, অর্ফব চর্ফলো”! অর্থাৎ হাঁ ভাই, অব চলো!




“ইস সর্ফালে কে মুঁহ মেঁ কর্ফড়া খোঁর্ফোস দেঁ কি নির্ফিকাল দেঁ”? এই শালার মুখে

কাপড় ঠুঁসে দেব, কি বের করে দেব?

“খোঁর্ফোসে রহো”। ঠুসে দাও।

জনাপাঁচেক লোক ঝোপের পেছন থেকে এসে এবার রাস্তায় উঠল। কারও পা টলছিল না।

সবাই চুপচাপ চলছিল। আর ওদের চলার ভঙ্গিতে এমন ভাব যেন ওরা কোন গেরিলা

বাহিনী যাদের উপর সীমান্তে চীন সৈন্যের হাত থেকে দেশের বেদখল জমি ছিনিয়ে আনার

ভার। ভূতওয়ালা অশত্থ গাছের তলায় আসতে আসতে ওরা রাস্তা ছেড়ে মাঠে নেমে পড়ল।

হয়ত ভূতের ভয়ে বা সামনে থেকে চোখ ধাঁধানো আলো ফেলা গাড়ির জন্যে। ওরা পা

রেখেছে এমন একটা ক্ষেতে যার চারপাশে বাবুল গাছের কাঁটাভরা ডাল পোঁতা আছে। ওই

ক্ষেতে কোন ফসল ছিল না, জমি রক্ষার জন্যে সীমানায় কাঁটাওলা ডাল পোঁতা। একজন

গলা চেপে চেঁচিয়ে উঠল, “অর্ফরে বর্ফাপ, কর্ফাট”;! আরে বাপ! কাঁটা!

আরেকজন বলল, “কির্ফিস সর্ফালে নে বর্ফহাঁ কর্ফাটেঁ গর্ফাড়ে হ্যাঁয়”? কোন শালা

এখানে কাঁটা পুঁতে রেখেছে?

প্রথম লোকটি বলল, “রর্ফমচর্ফন্না নে”। রমচন্না করেছে।

“কর্ফব”? কবে?

“তুর্ফমহারে জর্ফানে কে বর্ফাদ”। তোমার জেল যাওয়ার পরে।

“তর্ফভী! অর্ফব অর্ফা গর্ফায়া হুঁ—খের্ফত তো হর্ফমারা হ্যায়। ইঁহা কর্ফাঁটা ক্যা

অর্ফপনে বর্ফাপ কা সর্ফমঝকর গর্ফাড়া হ্যায়”? তাই! এখন এসে গেছি—খেত তো

আমার। এখানে কাঁটা পুঁতেছে কী ভেবে? ওর বাপের জমি”?

“ গুর্ফুসসা ন হোও। তুর্ফুম অর্ফা গয়ে। সর্ফব চুরেন্ট হো জর্ফায়েগা’। রেগে যেও না।

এখন তুমি এসে গেছ। সব ঠিক হয়ে যাবে।

“ঠির্ফিক হ্যায়। পর্ফর ইয়ে কর্ফাঁটা আয়া কর্ফহাঁসে? কির্ফিস নে দির্ফিয়া”? ঠিক

আছে। কিন্তু এইসব কাঁটা কোত্থেকে এল? কে দিয়েছে?

ছোট্ট দলটি এবার খেত পেরিয়ে ফের রাস্তায় উঠেছে। মদের ভাটি আর পঞ্চাশ গজ দূর।

একজন সর্ফরী বুলি ছেড়ে বলল, “একটা বাবুলের ডালও রমচন্নার নিজের খেতের নয়।

কার খেত থেকে কেটে এনেছে”?

“কার বাবুল কে জানে”?

“বলতে হবে না। আমি ঠিক জানতে পারব”।

“যদি জানতেই পারবে তো জিজ্ঞেস করছ কেন”?




“এইজন্যে যে তোমার আসল রূপও ধরা পরবে”।

অন্য লোকটি হাসতে হাসতে সবাইকে বলল, “দেখ, জোগনাথ জেল থেকে জেরা করা শিখে

এসেছে”।

“চিন্তা কোর না গেঁয়োভূত কোথাকার! তোমাকেও শিখিয়ে দেব”।

দলটা এবার ভাটিখানায় ঢুকে গেল। ওখানে জনা পাঁচ-সাত আগে থেকে বসে ছিল। একজন

উৎসাহিত হয়ে বলল, “আরে জোগনাথ! জেল থেকে ছাড়া পেলে কবে”?

“আজ, দুপুরের পর”।

শ্রোতার উৎসাহ বেড়ে গেল। “কেমন ছিলে”?

“খুব ভাল”।

“চেনাজানা কাউকে দেখলে”?

“সবার সংগে চেনাজানা হয়েছে”।

“ওখানে বোধহয় বিসেসরও ছিল। দেখা হোল”?

“না। ওখানে সবাই বিসেসরের বাপ”!

“ওখানে সিসল থেঁতো করে দড়ি পাকাতে হত”?

ঘরের কোনা থেকে একটা ভারী গলার প্রশ্ন। জোগনাথ রেগে গিয়ে বলল, “কে বলছে?

কোন ব্যাটা মুর্গির ইয়ে—“?

“ ও আমার অতিথি”।

“ওকে বল নিজের ভেঁপু বাজানো বন্ধ করে। শিবপালগঞ্জে এসব চলে না”।

“শুনেছ অতিথি? এ হল জোগনাথ। সদ্য সদ্য জেল থেকে বেরিয়েছে। তোমাকে বলছে ভেঁপু

বাজানো বন্ধ করতে”।

“আমার কথাটা আরেকবার শুনে নাও । গোড়াতেই বলে দিচ্ছি —আমি কিন্তু একনম্বর

হারামি! চুপচাপ মদ গিলতে থাক, আর ওই কোনাতেই বমি কর। ফের সিসল থেঁতোর কথা

শুরু করলে তোমায় সিসল দেখিয়ে ছাড়ব”।

“শুনেছ অতিথি”?

“শুনবে কে? ওই কোণা তো খালি”।

“অরে! কোথায় গেল অতিথি? কেটে পড়ল”?




“আরে, বাহ রে অতিথি”!

জোগনাথ একটা দশ টাকার নোট বের করে দোকানদারকে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “সবাইকে

এক এক চুগগড় (পেগ) দাও। কেউ যেন ছাড়া না পায়! অনেক দিন পর নিজভূমে এসেছি”।

“অনেক টাকাপয়সা এনেছ দেখচি”।

“শনিচরা পঞ্চায়েত প্রধান হয়েছে। ওর হুকুম—আজ সবাই মনের সুখে মদ খাবে”।

“কিন্তু শনিচরার ট্যাঁকে পয়সা কই”?

“আরে এখন শনিচর আর সেই শনিচর নেই। ও এখন পঞ্চায়েত প্রধান। কিছু বুঝলে”?

সবাই এক এক চুগগড় হাতে নিয়ে বসে আছে। এটা ভাটিখানার বাইরের বারান্দা। এটাকে

দরমার দেয়াল তুলে রাস্তা থেকে আলাদা করা হয়েছে। ভেতরের ঘরে দোকানদারি।

বারান্দায় একটা লালটিন জ্বলছে যাতে যারা মদ খাচ্ছে তাদের চেহারা দেখা যায়। কিন্তু

ভেতরে জ্বলছে এক টেমি। তার আলোয় মদ যে বেচছে তার চেহারা দেখা যায় না।

বারান্দায় একটা বেঞ্চ, তাতে দু’জন বসে আছে। জোগনাথও ওখানে বসে পড়ল। কিছু

লোক মাটিতে পাতা চাটাইয়ে বসেছে। কয়েকজন কাঁচা মেজেতে বসে খাচ্ছে।

সাকী, মদের কলসি ও পেয়ালা—সব এখানে যা আছে তাই। দেশি মদের গন্ধ রাস্তায়

অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। মহাভারতের রাজা শান্তনু যেমন যোজনগন্ধার সুগন্ধ

নাকে আসলে টের পেতেন নারীটি কতদূরে, তেমনিই গন্ধ থেকেই লোকে বুঝতে পারে

এখানে দেশি মদের আড্ডা। আমাদের এখানে গন্ধই দেশি মদের বিজ্ঞাপনের কাজ করে।

তাই নামজাদা সংবাদপত্রে বিলিতি মদের বিজ্ঞাপন দেখতে পাবেন, দেশি মদের নয়। ওর

বিজ্ঞাপনের দরকার নেই।

দু’তিন চুমুকের পর জোগনাথ এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। তারপর বলল, “এতে জল

মেশানো হয়েছে”।

“কী বললে”?

“জল। মদে জল মিশিয়ে বেচা হচ্ছে”।

“আমারও মনে হচ্ছে”।

“আমারও”।

“আমারও। বেশ কিছুদিন ধরে এমন মনে হচ্ছিল। এখন তো জল মেশানো দারু আসলের

মতই লাগছে”।




দোকানদার নিজের গদি থেকে উঠে জোগনাথের কাছে এল। শীতল কন্ঠস্বরে

বলল—“ফুর্তি করে খাও। তোমার হাওয়া তো প্রথম পেগ থেকেই ফুস্‌ হয়ে গেছে। পোয়া-

আধপোয়া ফোকটে খেতে চাও তো ঝেড়ে কাশো, খাইয়ে দেব। কিন্তু জল মেশানো ওঁছা

লোকের কাজ। এখানে ওসব হয় না”।

জোগনাথের উপর এই লেকচারের সঠিক প্রতিক্রিয়া হল। পকেট থেকে দশ আর পাঁচ

টাকার কয়েকটা নোট বের করে বলল, “যেদিন ফোকটে মদ গেলার ইচ্ছে হবে, তাই করব।

কিন্তু ঘাবড়ে যেও না। এই দেখ, এতগুলো টাকা একসঙ্গে কখনও দেখেছ”?

দোকানদারটি রোগাপাতলা, কিন্তু ত্যাড়া আদমি, মুখের ভাব বেশ জেদী। যেতে যেতে

শুনিয়ে দিল,” আমার দেখার দিন চলে গেছে। এখন তোমার দেখার দিন। দেখতে থাকো”।

দুটো পেগ হয়ে গেছে। একজন প্রশ্ন করল, “এবার কী ভাবছ জোগনাথ”?

“টাকার অবস্থা বেশ টাইট”। বলার ঢং এমনি যেন কেউ কথাটা বিশ্বাস না করে। “আগে

দারোগাজীর সঙ্গে দু-দু হাত হয়ে যাক। বদলি হয়েছে তো কী? আমি ওকে ছাড়ার পাত্র

নই। এখানে আসার আগে শহরে ওনার বিরুদ্ধে একটা মোকদ্দমা দায়ের করে এসেছি। দশ

বার এজলাসে হাজির হলে ওনার পলেস্তারা খসে পড়বে”।

“কীসের মোকদ্দমা”?

“দেওয়ানি মোকদ্দমা। কেন, তুমি জানতে না? আমার উপর চুরির মিথ্যে মামলা করে উনি

আমাকে দু’তিন মাস হাজত বাস করিয়েছেন”।

“বৈদ্যজী জামিন করান নি”?

“উনি করাতে চাইছিলেন, কিন্তু আমি জিদ ধরলাম। বললাম, দারোগার নাম নিয়ে এখানেই

থাকব। ভাড়া দিতে হবে না”।

“ফের”?

“ আবার ফের কিসের? আমার মান-ইজ্জত গেল, চাষের ক্ষতি হল। একটা খেত রমচন্না

কব্জা করে নিল। সব মিলিয়ে আট হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়েছি। ডিক্রি পেয়ে গেলে

দারোগাজির ঘটিবাটি চাটি হয়ে যাবে”।

“কিন্তু কোর্ট ফীস? দেওয়ানি মামলায় খর্চা কম নয়”।

“সব ভগবান দেবে”।

“শোন ভাই জোগনাথ! বামুন ঘরে জন্মেছ, এদিক সেদিকের বাতেলাবাজি বন্ধ কর। সচ

সচ বাতাও”।




“হাঁ ভাই, আমিও তাই বলি। মাঝখানে ভগবানকে নিয়ে টানাটানি কেন? কোর্ট ফীস কে

দেবে”?

“একবার বলেছি না—ভগবান দেবে”?

“বিগড়ে গেছে, আর মুখ খুলবে না। আচ্ছা, নাই বললে। এটা বল -- মোকদ্দমা করবে?

নাকি লাগিয়ে এসেছ”?

“লাগিয়ে দিয়েছি”।

“কবে”?

“আজকে”।

ঝোপের পেছন থেকে একজন মানুষ টলতে টলতে বেরিয়ে এল। তারপর ব্যথায় কাতর

আর্তনাদ করতে করতে রাস্তায় উঠে চলতে শুরু করল। ওর মাথায় ভর করেছে আত্ম-

করুণা, আক্রোশ আদি সাহিত্যিক গুণ। ভাটিখানায় ওর কথা ঘুরে ফিরে যেভাবে পৌঁছে

গেল তার সারতত্ত্ব হলঃ

একটু আগে ভূতের ঘরওলা অশত্থ গাছের একটু আগে সড়কের কিনারে একটা রাহাজানি

হয়েছে। কয়েকজন লোক লুঠপাট করেছে। এখন ও থানায় রিপোর্ট লেখাতে যাচ্ছে। এবার

এক এক করে সবক’টা বদমাশের হিসেব চুকিয়ে দেবে।

মেজেতে জোগনাথের পায়ের কাছে বসে এক ব্যাটা বেশ ডাঁটের সঙ্গে গেলাসের পর

গেলাস খালি করছিল। সে বলল, “তোমার গাঁয়ের এই বাপারটা বড় খারাপ। লোকজন লেফট

রাইট করতে করতে সূয্যি ডুবতেই রাহাজানি করে বসে! এটা একদম ফালতু কাজ!

জওয়ান, তুমি কি বলবে বল”।

জোগনাথ স্রেফ মাথা নারল আর দোকানদারকে চেঁচিয়ে বলল—আরও এক পো (পাঁইট)

দিয়ে যাও ভাই। চাইলে এটাকে ‘ফোকট’ খাতায় ধরে নাও”।

খানিক পরে ওরা যখন টলতে টলতে দরমার আড়াল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় উঠল তখন

ওদের সামনে খালি সড়ক আর দু’একটা হাড়জিরজিরে কুকুর।

যে লোকটা ব্যথায় কাতরে কাতরে ঝোপের পেছন থেকে বেরিয়েছিল সে এখন স্বাভাবিক

ভাবে ওদের সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। কিন্তু এদের টের পাওয়ার অবস্থা ছিল না। ঘরে

ফেরার সময় চলতে চলতে লোকটার মনের কলুষ সাফ হয়ে গেল। ধর্মে আস্থা বেড়ে গেল।

কারণ থানায় যাওয়ার পথে একজন জ্ঞানী ওকে বুঝিয়ে দিলঃ “কী হবে থানায় রিপোর্ট

লিখিয়ে? যা গেছে, তা গেছে। লুঠের মাল কখনও ফেরত পাওয়া যায়?




“বল, তুমি হিন্দু না মুসলমান? হিন্দু হলে ভাগ্য মানতে হবে। তোমার কপালে এই

পঁয়তাল্লিশ টাকা লেখা নেই। এখন দৌড়োদৌড়ি করে কী হবে? ভগবানের যখন এটাই

ইচ্ছে।

“যাও, প্রাণে বেঁচেছ তাই ঢের। গত বছর ঠিক ওই জায়গাতেই একটা লোককে পাঁঠার মত

কেটে ফেলেছিল।

“রামনাম কর, আর ঘরে ফিরে সত্যনারায়ণের কথা পাঠ করাও। মামলা-মোকদ্দমায় যা

টাকা লাগত, সেটা ধর্মকর্মে খরচ কর।

“গরম দুধে হলদি মিশিয়ে খেয়ে নাও আর পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়। কাল সকাল নাগাদ সব

ভুলে যাবে”।

(চলবে)
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















২১. বঙ্গভঙ্গ থেকে বিশ্ববাংলা কেবল বিশ্বাসঘাতকতা





সুপরিচিতাসু সুস্মি,



তোমার চিঠি যখন পেলাম বাংলার মসদে তখন শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ২০২৬ ফলাফল প্রকাশের পরেই একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে প্রায় সবখানে বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা কবে সাম্প্রদায়িক হয়ে গেলো? তিনদশক শাসন করা কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বহুযুগ ধরে নামেই টিকে আছে, চৌত্রিশ বছরের সাম্রাজ্য পতনের পরে বামফ্রন্টের অবস্থাও একই বলতে গেলে। তৃণমূল ও বাম ঘরানার লোকজন পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে বিজেপিকে প্রতিহত করতে চেয়েছে বারবার। আমার মনে হয় বাংলার রাজনীতিতে এই বিজেপির এই ভূমিধস বিজয় "প্যারাডাইম শিফট" বা কাঠামোগত পরিবর্তন। এটি কেবল একটি দলের পরিবর্তন নয়, বরং স্বাধীনতার পর থেকে বাংলার রাজনীতিতে যে বাম-উদারপন্থী বা সেক্যুলার ঘরানার একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, তার ওপর এক বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আঘাত। এই বিশাল বিজয়ে একটা ব্যাপার নিশ্চিত কাজ করেছে বলেই আমার বিশ্বাস, বিজেপির দ্বারা তৈরি একটি 'কাউন্টার-হেজিমনি' বা পাল্টা-আধিপত্যের সফল রূপায়ণ। তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোষণ রাজনীতির যে অভিযোগ দীর্ঘ বছর ধরে বিজেপি তুলেছিল, তা বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মনে এই ধারণা তৈরি করতে সফল হয়েছে যে—প্রচলিত 'সেক্যুলারিজম' আসলে সংখ্যাগুরুদের অধিকারকে খর্ব করছে। ফলে, মানুষ ঐতিহ্যগত সেক্যুলার কাঠামো ভেঙে বিজেপির 'সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ' বা 'হিন্দুত্ব'-এর ন্যারেটিভকে গ্রহণ করেছে। ভুলে গেলে চলবে না এই পশ্চিমবঙ্গের রয়েছে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ইতিহাস। ছেচল্লিশের দাঙ্গা। দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস। দেশভাগের সময় ও পরে দাঙ্গার ক্ষত। সুপ্ত সেই সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকেই উসকে দিয়েছে মমতার রাজনীতি। প্রতিযোগিতার সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের আবহে পুরো ফায়দা তুলছে বিজেপি। সাতচল্লিশে স্বাধীনতা। দেশভাগ। বাংলা ভাগ। কোটি মানুষের জীবন–জীবিকায় কাঁটাতার। ভিটে হারানোর যন্ত্রণা। স্বদেশ, স্বজন হারানোর হাহাকার। ছিন্নমূল উদ্বাস্তু। বাংলার জনগণ যে সিদ্ধান্ত নিলো তার সুফল কুফল জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে কয়েক বছর। তোমার চিঠি পড়তে পড়তে মনে পড়ছিল একটি কথা যা বুঝতে শেখার কাল থেকেই শুনছি,বাঙালি সবসময় বড়াই করে বাঙালি খুব বুদ্ধিমান ও সংস্কৃতিবান। কিন্তু সারা ভারত যা করে বাঙালি ঠিক তার উল্টোটা করে। তার মানে, হয় বাঙালি বুদ্ধিমান আর সারা ভারত বুদ্ধিহীন। তাই বুদ্ধিমান বাঙ্গালী বাবুরা ছেলেমেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পরে চেয়ে থাকেন ব্যাঙ্গালোর, পুনে বা হায়দরাবাদ এর দিকে। চিকিৎসা করতে গেলে প্রাধান্য দেন ব্যাঙ্গালোর, মনিপাল,হায়দ্রাবাদ,মুম্বাই আর ভেলোরকে। ৪২ লক্ষ বাঙালি শ্রমিক পেটের দায়ে অন্য রাজ্যে কাজ করেন। এখানে কত পলিটেকনিক কলেজ আছে আর কর্নাটকে কত আছে এর তথ্য গুগলে সার্চ করলেই জানা যাবে। লজ্জা হয় না আমাদের, কোন বাঙালিকে ভাবতে দেখিনিনা একবারও এত পিছিয়ে পড়লাম কেন? ১৯৭৭ সালের পরে পশ্চিমবঙ্গ কোনোদিন কেন্দ্র রাজ্যে এক সরকার পায়নি। তার ফল হয়ত আমরা ভোগ করছি। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বঙ্গদেশে প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলমানরা ঢেলে ভোট দিল মুসলিম লীগকে আর বুদ্ধিমান হিন্দু বাঙ্গালী ভোট দিল ধর্ম নিরপেক্ষ কংগ্রেসকে। হিন্দুমহাসভা ভোটে হেরে গেল। কি আনন্দ। বছর ঘুরতে না ঘুরতে পুঁটুলি হাতে বউ বাচ্চা নিয়ে কোটি কোটি বাঙালি হিন্দু ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে এলো এ বঙ্গে ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্তরা আঁকড়ে ধরল কংগ্রেস আর মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবিরা বামপন্থাকে। তাও লজ্জা নেই। গর্ব করে বলে আমা-গো এত বিঘা জমি ছিল, এত বিঘা পুকুর ছিল, এত বড় বাড়ী- সব মনে আছে। মনে নেই কেবল কারা লাথি মেরে তাড়িয়ে ছিল। কারা আপনার বাড়ির মেয়েদের ধর্ষন করেছিল! প্রশান্ত সুর, প্রমোদ দাশগুপ্ত, অশোক মিত্র তাড়া খেয়ে এখানে এসে কমিউনিস্ট পার্টি করেছেন। প্রফুল্ল সেন বরিশাল ছেড়ে গান্ধীবাদ প্রচার করেছেন। আজ তোমাকে লিখতে লিখতে মনে হলো ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ আদতে বিদেশি মত ও পথের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং দেশীয় ইতিহাস ও বাস্তবতা সম্পর্কে উদাসীনতা। বামপন্থী ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিজীবীরা ভারতের শাসকশ্রেণীকে "৫,০০০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস" রচনা করে দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো: ভারত স্বাধীন হওয়ার ২০০ বছর আগে কি কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী বা বেলুচিস্তান থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত উপমহাদেশের মানুষ নিজেদের "ভারতীয়" বলে পরিচয় দিতেন? এই কৃত্রিম "ভারতীয় সভ্যতা" তত্ত্বকে রক্ষা করতে গিয়ে বামেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) হিন্দু সভ্যতার ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয় গঠনের প্রকল্পকে তাত্ত্বিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ তারা নিজেরাই সেই একই "সভ্যতা" তত্ত্বের বাহক। বাঙালি চিরকাল আত্মঘাতী, মনে পড়ছে নীরদ সি চৌধুরীর কথা ছিলেন যিনি আপাদমস্তক ব্রিটিশ ভক্ত। ভারতীয়ত্ব সম্পর্কে একটা নাকউঁচু মনোভাব। আর বাঙালি! বাঙালি সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন ‘বাঙালী থাকিব নাকি মানুষ হইব’। শশাঙ্কের আমল থেকে শুরু করে ইংরেজ আমলে এসে দেখবো দেড়শো বছরের ব্রিটিশ রাজধানী কলকাতায় নিজেদের করণিকের যোগানের স্বার্থে ব্রিটিশেরা কোম্পানির আমল থেকেই কলকাতা শহরে পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারে উদ্যোগী হয়। যার ফলে, ব্রিটিশদের অধীনে চাকরি করে স্থায়ী উপার্জন করতে ও ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার তাগিদ থেকে উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজের প্রতিনিধিরা কলকাতা কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে আবার ঔপনিবেশিক অর্থনীতির স্বার্থে, ব্রিটিশ শাসনের স্বার্থেই হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতা ভাঙার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর ফলে বঙ্গীয় রেনেসাঁ জন্ম নেয়, যা মূলত কলকাতার সাবর্ণ হিন্দু উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই সাবর্ণ সমাজই উনিশ শতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। এরাই ‘ভারত’ দর্শনের প্রবক্তা হয়। এরাই চরম ইসলাম বিদ্বেষ থেকে চালিত হয়ে ব্রিটিশ শাসকদের কাছাকাছি থেকে সমস্ত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভাগিদারী চাইলো। প্রথমে নতজানু হয়ে, তারপর কংগ্রেসের মতন প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে আর শেষ পর্যন্ত হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে। এই সম্প্রদায়ই কিন্তু উত্তর আর পশ্চিম ভারতে হিন্দুত্বের জিগির ওঠার অনেক আগেই "আনন্দমঠ" লিখে হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতে এক আদিম সভ্যতার জয়গান শুরু করে। এই সম্প্রদায়ই কিন্তু ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিল। বঙ্গ ভঙ্গ করার ব্রিটিশ অভিপ্রায় নিয়ে এরাই প্রশ্ন তোলে, জানতে চায় হিন্দু পশ্চিমের সাথে মুসলিম পূর্বের বিচ্ছেদ ঘটানোই কি এই বিভাজনের আসল কারণ? ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে শুধু প্রতিবাদে কাজ না হওয়ায়, বঙ্গ ভঙ্গ আটকাতে তারা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। কিন্তু সেটা কি সত্যিই স্বাধীনতার জন্যে? কোন দেশের স্বাধীনতার জন্যে? বঙ্গের না পঞ্জাবের? ১৯০৫ সালের আন্দোলনে সাবর্ণ ভদ্রলোকদের যোগদানের মূলে ছিল পূর্ববঙ্গে তাদের জমিদারি হাতছাড়া হওয়ার ভয়। এই জমিদারিগুলো পূর্ব বাংলায় হলেও, জমিদারেরা অধিকাংশই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে থাকতেন। আর এই জমিদারি রক্ষার তাগিদ থেকে যে ভদ্রলোকেরা একদিন বঙ্গ ভঙ্গের বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলে ধরলেন, ৪২ বছর পরেই তারা কিন্তু বঙ্গ ভঙ্গ নিয়ে টু শব্দটিও করেনি। বর্তমান বিজেপির প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী যখন বাংলা ভাগের পক্ষে, হিন্দু বাঙালি হোমল্যান্ড বানানোর দাবি নিয়ে হৈচৈ শুরু করেন, হিন্দু মহাসভার খুবই স্বল্প সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে, কমিউনিস্ট পার্টির ভদ্রলোক নেতৃত্ব কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে না। তাঁরা সেই সময়ে, যখন বাংলার অধিকাংশ দলিত, আদিবাসী, শূদ্র-নমঃশুদ্র মানুষ এবং মুসলিমের লেখা পড়া জানতেন না, নিজেদের সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজনীতিকে আবদ্ধ রাখেন দিস্তা দিস্তা কাগজ ছাপানো ও মধ্যবিত্ত কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে, যা সাধারণ হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে অবিশ্বাস কে ভাঙার কাজ করতে ব্যর্থ হয়। কংগ্রেস, লীগ আর মহাসভা যখন বিভেদের রাজনীতি করছে, হিন্দু সাবর্ণ জমিদারদের একটা অংশ আর মাড়োয়ারি পুঁজিপতিরা যখন মুখার্জীকে চাঁদা দিচ্ছে কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গ কে ইন্ডিয়ার অধীনে রাখার, তখন কমিউনিস্ট পার্টির কাছে ছিল এক সুবর্ণ সুযোগ। তাঁরা লেনিনীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে স্বাধীন, ঐক্যবদ্ধ বাংলার সমর্থনে দাঁড়াতে পারতেন, কিন্তু সেটা তাঁরা করেননি।



দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সুভাষ চন্দ্র বসুর অনুজ শরৎ চন্দ্র বসু, হুসেইন সোহরাওয়ার্দী ও কিরণ শঙ্কর রায় সেই বিভেদের দিনে, ১৯৪৬ সালের হানাহানির পরেও, এক সাথে বসে তৈরি করলেন স্বাধীন বাংলার রূপরেখা। যে বাংলার নাম তাঁরা দিলেন ঐক্যবদ্ধ, সমাজতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক বাংলা। যে বাংলায় কৃষকের-শ্রমিকের অধিকারের কথা তাঁরা বললেন, সেই বাংলার প্রস্তাব কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও মেনে নিয়েছিলেন। যখন তিনি বুঝেছিলেন যে পাকিস্তান বানানো মানে একই দেশে দুই ব্যবস্থা চালানো কোনো মতেই সম্ভব না আর পূর্ব পাকিস্তান গড়লে তাতে শিল্পোন্নত কলকাতা ও তার পার্শবর্তী অঞ্চলকে কংগ্রেস বা মাড়োয়ারি পুঁজি কোনো ভাবেই হাত ছাড়া করবে না, তখন জিন্নাহ বলেছিলেন যে ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন বাংলা হলে তিনি খুশি হবেন এবং সেই বাংলা পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আবদ্ধ থাকবে বলেও তিনি জানান। কিন্তু এই প্রস্তাবে কংগ্রেসের ভিতরে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সেই আলোড়ন সৃষ্টি হয় কারণ মাড়োয়ারি আর হিন্দু জমিদারদের প্রতিনিধি মুখার্জীর মহাসভা এই বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ করে। মুখার্জী বড়লাট কে লেখেন যে ভারত ভাগ হোক বা না হোক, বাংলা ভাগ চাই। এই সময়ে দাঁড়িয়ে, বাংলার শ্রমিক কৃষকের ঐক্যের স্বার্থে, মাড়োয়ারি আর হিন্দি পুঁজির থেকে বাংলার শিল্প ও বাণিজ্যের মুক্তির প্রশ্নে কমিউনিস্টদের কাছে সুবর্ণ সুযোগ ছিল ঐক্যবদ্ধ বাংলার স্বার্থে লড়াই গড়ে তোলার, লীগকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার ও কংগ্রেসের দেশপ্রেমী অংশ কে নিজের দিকে টেনে নেওয়ার।কিন্তু সেই কাজ না করে কমিউনিস্টরা পাকিস্তান তৈরির পিছনে তত্ত্বের জাল বোনা শুরু করেন। কমিউনিস্ট পার্টির সাবর্ণ ভদ্রলোক নেতৃত্বের কাছে সেদিন অসুবিধার ব্যাপার ছিল যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশে তাঁদের পক্ষে থাকা ও রাজনীতি করা সম্ভব হবে না। তাঁরা সেই “ভারতীয় দর্শনের” তাড়নায় সেদিনও বাংলার জায়গায় ভারতকে রাখলেন। ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় তথাকথিত ভদ্রলোক-চালিত বামপন্থী শক্তি এক লহমায় তেভাগা আন্দোলনকে শিকেয় তুলে হিন্দুত্বের, হিন্দি আধিপত্যের পতাকা তুলে ধরে।



উদ্বাস্তু বাঙালির কাছে কংগ্রেস ও কমিউনিষ্ট পার্টি আশ্রয়ের নাম হয় উঠলে একান্নতে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জনসংঘ। জওহরলাল নেহরু বললেন, ‘আরএসএসের জারজ সন্তান’। বাহান্নতে নির্বাচন। হাজারে হাজারে মানুষ আসছে ওপার থেকে। এপার থেকেও যাচ্ছে অনেকে। সেই নির্বাচনে আজকের বিজেপির পূর্বসূরি জনসংঘ লোকসভায় এ রাজ্য থেকে পেয়েছিল সাকল্যে দুটি আসন। কলকাতা দক্ষিণ–পূর্ব কেন্দ্র থেকে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। মেদিনীপুর থেকে দুর্গাচরণ ব্যানার্জি। সমর্থনের হার ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। রাজ্য বিধানসভায় পায় ৯টি আসন। সমর্থনের হার ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে, জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি পায় ২৮টি আসন। সমর্থনের হার ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পাঁচ বছর পর সাতান্নর নির্বাচন। লোকসভায় এ রাজ্য থেকে জনসংঘ জিততে পারেনি একটি আসনেও। সমর্থনের হার নেমে আসে দেড় শতাংশে। বিধানসভাতেও শূন্য, সমর্থনের হার কমে ১ শতাংশের নিচে, শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ। বিপরীতে কমিউনিস্ট পার্টির আসনসংখ্যা বেড়ে ৪৬। সমর্থনের হার বেড়ে ১৭ দশমিক ৮১ শতাংশ। সেদিন এহেন সহায়ক পরিস্থিতি পেয়েও দাঁত ফোটাতে পারেনি সাম্প্রদায়িক শক্তি। কিন্তু ভারত আর পাকিস্তান সৃষ্টি করার পরে দুই দেশের শাসকের কাছেই জরুরী হয়ে ওঠে ভাষার প্রশ্নটি। হিন্দুস্তানী ভাষার থেকে সৃষ্ট উর্দু আর হিন্দিকে তারা আরও বেশি করে ধর্মীয় ভাবে ঘষে মেজে নিতে থাকে। এরই ফল স্বরূপ ভাষা আন্দোলন তীব্র হয় পূর্ব পাকিস্তানে। অন্যদিকে ভারতে হিন্দি কে রাষ্ট্র ভাষা করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পরে দ্রাবিড় জনগণ, বিশেষ করে তামিল নাড়ুর জনগণ। অসংখ্য মানুষের রক্তের বিনিময়ে আটকানো হয় কংগ্রেসের হিন্দি চাপানোর ষড়যন্ত্র। এই লড়াইয়েও বাংলার কমিউনিস্ট নেতৃত্ব কে দেখতে পাওয়া যায়নি। যদিও ভারত সরকার হিন্দি চাপানোর সিদ্ধান্ত কে গত শতকের ছয়ের দশকে স্থগিত করে, সংবিধানের হিসাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ধীরে ধীরে ইংরাজি কে অবলুপ্ত করে হিন্দি কে চাপাতে বাধ্য, যদি না সংবিধান সংশোধন হয়। হিন্দি বা উর্দুর মতন কৃত্রিম ভাষাগুলো যে শুধুই ভাষাগত হামলা করে তাই নয় বরং সাংষ্কৃতিক হামলাও চালায়, ক্ষুদ্র ভাষা গোষ্ঠীগুলোকে, জাতিগুলোকে সাংস্কৃতিক ভাবে উপনিবেশে পরিণত করে, সেই ব্যাপারেও কমিউনিস্ট পার্টি কোথাও জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলেনি। ভদ্রলোক শ্রেণীও আসামের বরাক উপত্যকায় অহমীয় চাপানোর বিরোধিতা করে গুলি খায় কিন্তু কোথাও, পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলিমেরা যে ভাবে উর্দুর বিরুদ্ধে লড়ে গুলি খেয়ে প্রাণ দিলেন, সেভাবে হিন্দির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে থাকেননি। বরং হিন্দি সাম্রাজ্যের তিনটি থাবাকে—সেনা বাহিনী, বলিউড ও ক্রিকেট দলের প্রতি সে আনুগত্য দেখিয়েছে এবং এদের মধ্যে ঢোকার আপ্রাণ চেষ্টা করে এসেছে। কিন্তু এই ভদ্রলোক বামেদের মুখে ঝামা ঘষে দেয় তাদেরই স্বজাতির এক কমিউনিস্ট নেতা। ওপার বাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তু হিন্দু পরিবার কিংবা রাজ্যের হিন্দুদের মধ্যে তৈরি করতে পারেনি সমর্থনের এতটুকু ভিত। কারণ, বামপন্থী প্রগতিশীল শক্তি সেদিন গ্রাম-শহরে চ্যাম্পিয়ন করতে পেরেছিল শ্রেণির ইস্যু। দেশভাগের পরেই শহরে খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন, ট্রামের দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন, ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের জমির অধিকার, পুনর্বাসনের আন্দোলন, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন। আর গ্রামে জমিদার-জোতদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, গরিবদের খাদ্যনিরাপত্তার আন্দোলন। এই আন্দোলনগুলোর যোগফলেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বামপন্থীদের পথচলা শুরু। বামপন্থীদের উত্থান। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিকল্প নীতির লড়াই। যার কেন্দ্রে ছিল শ্রেণির ইস্যু। যা পেছনে ঠেলে দেয় পরিচিতি সত্তার রাজনীতিকে, যা পরাধীন ভারতে অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন দাপট চালিয়ে এসেছিল। শ্রেণির ইস্যুতে এই শ্রেণি ঐক্যেই ২০১১ পর্যন্ত ঘটেনি কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনা। ‘পঞ্চাশের দশকে প্রায় প্রতিবছরই কোনো না কোনো গণ-আন্দোলনের ডাক আমরা দিয়েছি এবং প্রতিটি আন্দোলনেই হাজার হাজার মানুষ কারাবরণ করেছে, লাখ লাখ মানুষ মিছিল ও সভায় অংশ নিয়েছে এবং বিভিন্ন দলমতের মানুষের সমর্থন আমরা পেয়েছি’, বলেছেন জ্যোতি বসু। প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের মাঝামাঝি সময়। ১৯৮১–এর সেপ্টেম্বরে। ‘গত তিন দশকের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা’ নিবন্ধে। ‘১৯৫২ সালের গণ–আন্দোলন ছিল দুর্ভিক্ষের অবস্থার বিরুদ্ধে। ১৯৫৩ সালের আন্দোলনের বিষয়বস্তু ছিল ব্রিটিশচালিত ট্রাম কোম্পানির ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে। ১৯৫৪ সালে শিক্ষকেরা প্রথম রাজভবনের সামনে রাস্তায় এসে বসলেন দাবি আদায়ের জন্য এবং অন্যান্য কর্মচারী মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন পেলেন। ১৯৫৬ সালের আন্দোলন ছিল বঙ্গ-বিহার সংযুক্তির সরকারি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। ১৯৫৮ সালে আবার খাদ্য আন্দোলন। ১৯৫৯ সালে খাদ্য আন্দোলনে ৮০ জন শহীদের কথা এখনো অনেকে ভোলেননি। ১৯৬০ সালে হলো সরকারি কর্মচারীদের ধর্মঘট। ১৯৬০-৬৫, চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ এবং পার্টির অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বের জন্য তেমন বড় কোনো আন্দোলন সংগঠিত করা না গেলেও ১৯৬৬-তে খাদ্য ও বন্দীমুক্তি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। এই ব্যাপক গণ-আন্দোলনগুলোর মধ্যে হয়েছে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে অসংখ্য আংশিক সংগ্রাম। কারখানায়, অফিসে, গ্রামে, স্কুল-কলেজে।’



বাংলা ও বাঙালি জাতিসত্ত্বার রয়েছে দীর্ঘ এক ইতিহাস, যা নির্মিতি দিয়েছে সমন্বয়বাদী এক সংস্কৃতির। যাতে যোগ রয়েছে আত্তীকরণ ও সাঙ্গীকরণের দুর্লভ গুণ। যাপিত জীবন এবং চৌদিকের প্রাণ ও প্রকৃতির সমন্বয়ে উদ্ভূত এই সংস্কৃতি কয়েক হাজার বছরের প্রবহমানতায় ঋদ্ধ। আপন ও অপরের যূথবদ্ধ পরিশীলন তাকে করেছে সমগ্র জাতির বেঁচে থাকার জন্য প্রাণ বায়ু বিশেষ। ১৯২০ দশকে যদিও কংগ্রেস ভারতবর্ষে অবিসংবাদিত রাজনৈতিক দল হিসেবে উঠে এসেছিল এবং তার অস্তিত্ব জাহির করার মতো সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানও খানিকটা অর্জন করেছিল; কিন্তু অদ্ভুতভাবে ব্রিটিশ নীতির প্রকৃত স্বরূপ বোঝার পরেও, মুসলমান সম্প্রদায়কে কখনই তারা দলের এক আবশ্যিক অঙ্গ করার জন্য, বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। যে কারণে ব্রিটিশ সরকার সবসময় ভাবার সুযোগ পেয়েছিল যে, কংগ্রেস আসলে, ‘representative of only a microscopic minority’। এর ফলস্বরূপ স্বভাবত সামাজিক দিক থেকে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মনের দূরত্ব বাড়ছিল। ঐতিহাসিক মুশিরুল মন্তব্য করেছেন, ‘The definition of‘Muslim identity’ was integrally related with relevant issues like economic discontent, escalating violence, projection of the political area, new social groups with higher levels of consciousness and greater stakes in power structures, which led to ‘community based strategies’। আবার ঐতিহাসিক অসীম রায়ের মতে, ‘The entire process of identity formation’ of the Bengal Muslims ‘on one hand underlines the seminal role of the elite, spurred into action by the changed historical circumstances of their position, their inner divergences and conflicts underlying their differential response, their manipulation of symbols of group identification for the optimal participation and mobilization of the masses’। মুসলিম লীগ সে সময়ে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিল যে, মুসলমান সম্প্রদায় অবশ্যই যৌথ সমস্যার এক সমাধানসূত্র খুঁজতে চায়; কিন্তু তা অবশ্যই সেই সময়ে তারা যে বিশেষ সুযোগ সুবিধাগুলো শাসকজাতির কাছ থেকে পাচ্ছিল, সেগুলোকে বর্জন করে নয়। সেসময় অনেক মুসলমান দ্বারা পরিচালিত পত্রিকায় এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় লেখা হয়, ‘The Hindu authors were sowing the seeds of distrust and hatred. If the Hindus were not aware of its consequences, the cordial relationships between the two communities would never be possible’। আবার শেখ ওসমান আলী মন্তব্য করেছিলেন, ‘Hindus might be advanced and cultured, but not all of them were. Similarly, though many Muslims might be backward and illiterate, not all of them were. Therefore there is no reason to regard Muslims as contemptible inferiors; I hope every Hindu brother, instead of regarding us with contempt or dislike, will embrace us with genuine brotherly love’। তাই, ১৯২০-এর দশকের পারস্পরিক বিশ্বাসহীনতা এবং সম্প্রদায়গত সহনশীলতা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসার এক ধারা যে পরবর্তী দশকের সম্প্রদায়গত ঘটনাক্রমকে বেশ জোরালোভাবে প্রভাবিত করেছিল, তা বলাবাহুল্য। সেই বঙ্গভঙ্গ ও দেশভাগের দগদগে দাগের সাথে অবজ্ঞা ও অবহেলার সাথে ক্ষত হয়ে জেগে থাকলো ভাষা আন্দোলন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নতুন দেশের স্বপ্ন দেখছে ওপার বাংলা আর এপার বাংলায় ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা সিপিআই (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি যে সব জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার, স্বীকার করে। সিপিআই (এম-এল) প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি যার কর্মসূচী হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার, হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। আর এর মূল কান্ডারি হন বাংলার কৃষক নেতা চারু মজুমদার। তাঁর তিন বছরের নেতৃত্বে চারু মজুমদার শুধু সিপিআই (এম-এল) কে ভারতের শাসক শ্রেণীর এন্টিডোট হিসাবেই গড়ে তোলেননি, এই দলটিকে তিনি ভারতের শোষিত জাতির মানুষের কাছেও একটি বন্ধু হিসাবে উপস্থাপন করেন। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট বিপ্লবীরাও এর ফলে সাহস পান। কিন্তু চারু মজুমদার পরবর্তী সময়ে নানা রাজ্যে বেড়ে ওঠার স্বার্থে, বিশেষ করে হিন্দি বেল্টে সংগঠন বাড়ানোর তাগিদে, সিপিআই(এম-এল) দলের বিভিন্ন গোষ্ঠী হিন্দির বিরুদ্ধে অবস্থান থেকে সরে আসে ধীরে ধীরে। বাংলা আবার প্রতারিত। এবং মজার বিষয় "মুক্তিযুদ্ধ" চলাকালীন কমিউনিস্টদের হাতে অস্ত্র দেওয়া হয়নি মস্কো আর দিল্লির হুকুমে। কমিউনিস্টরা আওয়ামীদের হয়ে প্রচার করেছে, মেডিক্যাল ক্যাম্প করেছে আর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করেছে, কিন্তু যুদ্ধ করেনি। বাংলাদেশ গঠনের সাথেই সিংহ যে শেখের সাথে ঐক্য করে মস্কোর হুকুমে নিজের দল কে আওয়ামী লীগে বিলীন করে বাকশাল গঠন করেন ও যে ভাবে কমিউনিস্ট পার্টি শেখের সমস্ত অপকর্মের সময় তার জোটসঙ্গী হিসাবে নীরব থাকে তার ফল দলটিকে আজও বাংলাদেশে ভুগতে হচ্ছে। একটি বৃহৎ সংগ্রামী দল থেকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আজ শুধুই বিবৃতি প্রকাশ করার পার্টিতে পরিণত হয়েছে। এই ১৯৭১ সালে যখন চারু মজুমদার ও সিপিআই(এম-এল) কংগ্রেসি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ সহ নানা জায়গায় লড়ছে, তখনই কিন্তু কংগ্রেসীদের সাথে হাত মিলিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির ভদ্রলোক নেতৃত্ব শ্রীমতি গান্ধীকে এশিয়ার মুক্তি সূর্য আখ্যা দেন। ভাঙ্গা বাংলার পাশে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ জন্ম নিল। দুই বাংলাতেই খেতে-পরতে পারা ভদ্রলোকের সন্তানদের মধ্যেই বাম মনোভাব বেশি দেখা যায়, আর তারা বঙ্গীয় আত্মপরিচয় নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদ ভাবলেই তারা শিউরে ওঠে পারিবারিকভাবে লালিত-পালিত ইসলাম বিদ্বেষের কারণে। তারা মনে করে হিন্দি ভারতের রাষ্ট্র ভাষা। তাই মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় থেকে সেলিম সাহেব, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের মতন তাঁরাও যে কোনো সময় হঠাৎ হিন্দি সংলাপ বলে আসর গরম করার চেষ্টা করেন। তাঁরাও বলিউড, ক্রিকেট আর সেনাবাহিনীর সম্মিলিত প্রয়াসে তৈরি ভারত দর্শনে বিশ্বাসী। অথচ তারা জানে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসাম পর্যন্ত বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার ততদিন থাকবে যতদিন বাঙালি মুসলিম থাকবে। কারণ শেষ পর্যন্ত রাস্তায় নেমে বিজেপির সাথে লড়াই করার কাজ এই সম্প্রদায়ই করবে। এই সম্প্রদায়কেই নিজেকে বাঁচানোর জন্যে বাংলা ভাষা ও নিজের অস্তিত্ব কে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু তবুও তারা বাংলার আপামর দলিত, আদিবাসী ও মুসলিমদের থেকে নিজেকে বাঁচিয়েই রাখবে।



মনে রাখা জরুরি শুধু সংস্কৃতি দিয়ে একটা জাতি বাঁচে না তার শ্রী বা সমৃদ্ধি প্রয়োজন। সংস্কৃতি মনের খোরাক কিন্তু পেটের খোরাক না জুটলে মানুষ সাধের সংস্কৃতিও জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য। এগারোতে পালা বদলের পর মানুষের আশা ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে এমন কিছু গুণগত পরিবর্তন আনবেন, যা স্বাধীনতা পরবর্তী কংগ্রেস সরকার বা ৩৪ বছরে বামেরা আনতে পারে নি। কিন্তু পরিবর্তনের পনের বছর পর পশ্চিমবঙ্গবাসী দেখছে, তারা মধ্যম থেকে অধমে পরিণত হয়েছে। আলিমুদ্দিনে বসে অনিল বিশ্বাসেরা তবু মধ্যমেধায় সার-জল দিতেন কিন্তু কালীঘাটের পাল্লায় পড়ে বাঙালির মেধাশূন্য হ‌ওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা- সব গোল্লায় গেছে। কমপক্ষে তিরিশ শতাংশ সরকারি বাংলামাধ্যম হাইস্কুল পড়ুয়া শূন্য হ‌ওয়ার মুখে। মধ্যবিত্তের বাংলামাধ্যম থেকে আস্থা উঠে গেছে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে রাজ্যের শহরাঞ্চলে সব সরকারি হাইস্কুল বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারি স্কুলগুলিতে ছেলেমেয়েদের বছরভর ‘সাব-স্ট্যান্ডার্ড’ শিক্ষা দিয়ে পরীক্ষায় ভুরি ভুরি নম্বর পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার অবস্থাও তদ্রুপ। অধিকাংশ কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। কোনও দিন নিয়োগ হবে‌ বলেও মনে হয় না। বহু কলেজে ক্লাস নেওয়ার পাট উঠে গেছে। রাজ্যের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলি দক্ষতাহীন, জ্ঞানবর্জিত ডিগ্রিধারী শিক্ষিত-উচ্চশিক্ষিত যুবক-যুবতীর সংখ্যাই কেবল বাড়িয়ে চলেছে বছর বছর। এমনকি ভাল পড়ালেখা করেও লাভ নেই। নামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দারুণ নম্বর নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের সাত-আট বছর পরেও বেকার থাকতে হচ্ছে ছেলেমেয়েদের। রাজ্যে এমন একটা দল সরকারে, যার কোনও ‘ভিশন’ নেই, ‘মিশন’ একটাই- চুরি করা। দলটা হরেক কিসিমের ধান্ধাবাজদের একটা বৃহৎ ছাতা, ছত্রিশ দল থেকে যেখানে এসে জুটেছে সবাই। দলের যিনি মাথা, তাঁর নিয়ন্ত্রণহীন আত্মপ্রেম ইতিমধ্যেই ‘মেগালোম্যানিয়ায়’ পরিণত হয়েছে এবং রাজ্যের মানুষকে সেই যাতনা দিবানিশি সহ্য করতে‌ হচ্ছে দাঁতে দাঁত চেপে। বাঙালির দরকার প্রভূত সম্পদ ও সমৃদ্ধি। কিন্তু বাঙালিকে বানানো হচ্ছে ভাতাজীবী। বাঙালি ছেলেমেয়েদের দরকার ভাল রোজগার। অথচ ‘তোলাবাজি’ ছাড়া তাদের সামনে কোন‌ও ‘অপশন’ এখন নাক পর্যন্ত ঋণে ডুবে থাকা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজস্বের সবথেকে নির্ভরযোগ্য উৎসের নাম আবগারি।‌ লোকজন ঠাট্টা করে বলে, বাংলায় সরকার চলে ‘মালের’ পয়সায়। মদের দোকানের লাইসেন্স চাওয়া মাত্রই পাওয়া যায়। বাংলার গা গঞ্জেও তিন-চারটি করে অনুমোদিত বিলিতি মদের দোকান। দারু খেয়ে যুবকদের বেকারত্বের জ্বালা ভোলার ভাল ব্যবস্থা করেছে সরকার। বাঙালির বিধিই বুঝি বাম! বছর পনের আগে কত সাধ করে ঘরে ডেকে এনেছিল ঘাস। আশা একটাই- মধ্যম থেকে অধমে নামার পর উত্তম হ‌ওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোন‌ও রাস্তা নেই। অধমের অনিবার্য পরিণতি পতন। পতনের মুখ থেকে বাঙালি কি ঘুরে দাঁড়াবে না? বাঙালি জাতি নিশ্চয় পতনের দুয়ার থেকে ফিরবে। ফিরবেই। তবে ভুলে গেলে চলবে না বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদকে বাদ দিয়ে আজ বাঙালির কথা বলা ধৃষ্টতা। আবার বঙ্গের নানা শোষিত জাতি—গোর্খা, কামতাপুরি, রাভা, সাঁওতাল, চাকমাদের কথা বাদ দিয়ে শুধু বাঙালি জাতীয়তার কথা বলাও উচ্চবিত্তের বিলাসিতার জাতীয়তাবাদ। আজ নানা রাজ্যে বাঙালির উপর হওয়া উৎপীড়নের বীজ লুকানো আছে এই মাটির তলায়। সেই বীজ একা মুখার্জী রোপন করেননি। বিংশ শতকে বিশেষ করে সুভাষকে বের করে দেওয়ার পর থেকে বাংলার বুকে মূলধারার কংগ্রেসি রাজনীতির লুম্পেনীকরণ ঘটেছে যেটা বিধান রায় সামনে থাকার জন্য সেভাবে স্পষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু বাঙালি ভদ্রলোকের একটা ক্রমান্বয়ে নেগেটিভ ফিল্টারিং ঘটেছে কংগ্রেসি রাজনীতিতে। বাঙালি প্রধানত বিপ্লবী, এবং সে বিপ্লবী চিন্তাধারা বিংশ শতকে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের হাত থেকে ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক বামপন্থার একচেটিয়া হয়ে যাবে। কমিউনিস্ট নেতাদেরও দায় আছে। যদিও সিপিআই(এম-এল) একবার চেষ্টা করেছিল, তবুও ব্যাপক ভাবে ভারতে আগ্রাসী হিন্দির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারাও বর্তমানে রাজনৈতিক বাধ্যকতার কারণে পিছিয়ে গেছে।বাঙালি নিপীড়ণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বাঙালি ভদ্রলোক সম্প্রদায় বিশ্বাসের অযোগ্য তাদের ইসলাম বিদ্বেষের কারণে। বাংলার কমিউনিস্টরাও ভরসার অযোগ্য তাদের দিল্লী প্রীতির কারণে। তবুও বঙ্গীয় জাতির মুসলিমরা ধর্মীয় মৌলবাদ ও দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবেন। তাঁরা উর্দুর বিরুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, হিন্দির বিরুদ্ধেও দেবেন। ভদ্রলোক সম্প্রদায় দেবে না।



বিংশ শতকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক প্রকাশ সঠিকভাবে ঘটে নি। কংগ্রেস সর্বভারতীয় আর সিপিএম আন্তর্জাতিক। আনন্দমার্গ বা আমরা বাঙালি কেউই বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠন নয়। সুনীলরা বাংলাদেশ থেকে ভাষাবাদ আমদানি করেছিলেন, সেটার উত্তরাধিকার বহন করে আজকে তৃণমূল সমর্থিত একাধিক ভাষাবাদী সংগঠন। বলা দরকার নব্বই দশকের শেষেও বিজেপির একটা ছোটখাট উত্থান ঘটেছিল, তপন শিকদার দমদমে এবং জলু মুখার্জি কৃষ্ণনগর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কাজেই সিপিএমের জন্য ভাষাবাদ কেবল আমরা বাঙালি নয়, ওই বিজেপি আটকাতেও স্ট্র্যাটেজিক প্রয়োজনে এসে থাকবে। এবারও আমরা দেখেছি যে মমতা ব্যানার্জি ভাষাবাদী কয়েকটি সংগঠনকে দিয়ে বিজেপির বিরোধিতা করিয়েছেন। তবে তাতে নির্বাচনে কতটা লাভ হয়েছে, আর গ্রেটার বাংলাদেশের আশঙ্কা কতটা বেড়েছে সাধারণ হিন্দু ভোটারের কাছে, সেটা আলোচনাসাপেক্ষ। যে ভোটার বিজেপির দিকে চলে গেছে, সে তৃণমূলের মদতে চলা এই সব সংগঠনের ভাষাবাদ দেখে আকৃষ্ট হয়নি? নব্বই দশকে সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, মূলধারার একাডেমিয়া ও মিডিয়া বাংলাদেশে হিন্দুর এথনিক ক্লিনজিং-সংক্রান্ত তথ্য সবটাই সেন্সর করত। আজকের বাংলায় দাঁড়িয়ে প্রতিটি বাঙালিকে বুঝতে হবে কংগ্রেস বাঙালির প্রতিষ্ঠান নয়। যার বীজ বপন শুরু হয়েছিল রাধাকান্ত দেব আর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে এককালে, চরমপন্থী আর নরমপন্থী, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি আর চিত্তরঞ্জন দাশ পরস্পর লড়াই করে সেদিন গান্ধীর হাতে ভারতকে তুলে না দিলে আজ কংগ্রেস নামধারী আদ্যোপান্ত লুম্পেন দল তৃণমূল আর আদ্যোপান্ত অবাঙালি দল বিজেপির মল্লযুদ্ধের এই অলীক কুনাট্য রঙ্গে বাঙালির অস্তিত্বকে ডোডোপাখির মত এত বিপন্ন দেখাত না। এই পরিস্থিতে দাঁড়িয়ে মেকি বাম-হিন্দুত্ব চক্রান্ত ব্যর্থ করা একটি গুরু দায়িত্ব। বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সাম্য আন্দোলন গড়ে তোলাও আজ জরুরী। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন ইতিহাসের এই বিশ্বাসঘাতকতার মুখোমুখি হওয়া এবং সত্যিকারের গণমুখী রাজনীতি গড়ে তোলা।



বহুবছর পর তোমাকে ছাতামাথা কি যে লিখলাম পড়তে বিরক্ত লাগলে পড়ার প্রযোজন নেই, আসলে এইসব কথা আজকাল আর প্রকাশ্যে বলা যায় না, বললেই কিছু অন্ধ মানুষ তেড়ে আসে নয়ত দলকানার মতন কথা জুড়ে তাই এইসব আজকাল বলতেই চাইনা। তুমি বুঝবে বলেই এত বড় চিঠি তোমাকে লিখে ফেললাম। নিরন্তর ভালো থেকো। এখানে এখন ভীষণ গরমের পরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। ভেসে যাচ্ছে চরাচর, কাগজের নৌকা বানিয়ে তোমার কাছে পৌঁছে যাওয়া যেত যদি এইরাতে বেশ হতো বলো…





হারিয়ে যাওয়া সময়ের আনন্দটুকু নিয়ে

বাসু

২৬ মে, ২০২৬

0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in




















২২


সেই ঘটনার পর থেকেই ক্রিস্টিনা জলির সঙ্গে মধুর ব্যবহার করত। আবার মাঝেমধ্যে বেশ আধিপত্য দেখাত। সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে বেরোত। তরুণ সেই শিল্পী বন্ধু, আলফ্রেড, যার সঙ্গে ক্রিস্টিনা প্রায়ই দেখা করতে যেত, তার সঙ্গেও জলির আলাপ করিয়ে দিয়েছিল সে। সেই শিল্পী অদ্ভুত সব ছবি আঁকত। ক্যানভাসে যেন রঙের উচ্চকিত লড়াই। সাহস এবং নির্মমতার প্রকাশ ছিল তার শৈলীর মধ্যে। মনে হত এক পাষাণহৃদয় আত্মা নিজের সঙ্গেই ছলনা করতে ব্যস্ত। ক্রিস্টিনা আলফ্রেডকে বেশ পছন্দ করত। প্রেমের সীমানা ছাড়িয়ে তার প্রীতি ব্যক্তিপুজার স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। আলফ্রেড এই ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করত, কারণ সেও ক্রিস্টিনার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী ছিল। আলফ্রেড খুব বাকপটু, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, রসিক হলেও যথেষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের ছিল। এবং বন্ধুত্বের প্রথম দিন থেকেই সে চেয়েছিল যাতে সে ক্রিস্টিনার কাছে ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।


ক্রিস্টিনার মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিত এবং ক্রিস্টিনার সুপ্ত প্রতিভার আবিষ্কারক ছিল আলফ্রেড। ক্রিস্টিনা অবশ্য শিল্পীর আঁকা ছবি দেখলেও সেসব নিয়ে বিশেষ আলোচনা করত না। কিন্তু যখন সে ছবি দেখত, তখন তার মধ্যে এক তীব্র আগ্রহ লক্ষ্য করেছিল আলফ্রেড। সাধারণত ক্রিস্টিনা উদাসীন স্বভাবের মানুষ। কিন্তু ছবি দেখবার সময়ে তার মধ্যে অদ্ভুত একটা মনঃসংযোগ দেখা যেত। তার বাহ্যচেতনা বিলুপ্ত হত। গোটা দুনিয়া তখন তার কাছে চলমান দৃশ্যাবলীর মত মনে হত।


আলফ্রেড তাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে সে নিজে কখনো ছবি এঁকেছে কি না। ক্রিস্টিনা বলেছিল যে ছবি তাকে বিশেষ টানে না। কিন্তু সে নানা ধরনের আকার, শরীরী ভঙ্গিমা, হাত পায়ের গড়ন, মুখের অভিব্যক্তি এসব দেখতে ভালবাসে। সে অতীতে প্রচুর মুখোশ বানিয়েছে। হাত কিম্বা মুখের ভাস্কর্যও বানিয়েছে সে আগে। কিন্তু সেসব বানানো একেবারেই সহজ নয়। আলফ্রেড তার হাতের কাজ দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখানে বোর্ডিং স্কুলে সে কিছুই নিয়ে আসেনি এবং এখানে আসবার পরে সে সেরকম কোনও কাজ করেনি।


‘আমার ভাই আমার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিভার অধিকারী’ বলে ক্রিস্টিনা… ‘সে চিত্রকর হতে চায়। তার বয়স মোটে বাইশ। কিন্তু সে বয়সের তুলনায় অনেক পরিণত কাজ করে। আমি তার মত একেবারেই পারি না। ভাস্কর হয়ে ওঠাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, ভাই বলেছে যে ভাস্কর্য গড়তে গেলে সবার আগে আঁকতে জানতে হয়।’


আলফ্রেড ক্রিস্টিনাকে প্রস্তাব দিয়েছিল একসঙ্গে বসে কাজ করবার জন্য। ক্রিস্টিনা খুবই খুশি হয়েছিল এই প্রস্তাবে এবং তার কাজের ধরনধারণ দেখে আলফ্রেড চমকে গিয়েছিল। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ক্রিস্টিনা কাজ শিখছিল। যেখানে সে আটকে যেত, সেখানে আলফ্রেড তাকে বুঝিয়ে দিত অনেকখানি। ফলে যে কোনো কাজ করেই ক্রিস্টিনা আলফ্রেডের মতামতের অপেক্ষা করত। শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে আলফ্রেডই ছিল তার একমাত্র শিক্ষক।


আলফ্রেড গভীরভাবে ক্রিস্টিনার প্রেমে পড়েছিল। ক্রিস্টিনার উপস্থিতি তার কাছে অভ্যেসে পরিণত হয়েছিল। সে ভাবতেও পারেনি যে ক্রিস্টিনা কোনওদিন তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। কাজেই ক্রিস্টিনা যখন বলেছিল যে বোর্ডিং স্কুলে তার থাকবার মেয়াদ আর মাত্র দুই মাস, তখন সে কথা শুনে আলফ্রেড খুব বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল। সে বলেছিল যে সে এমন কথা ভাবতেও পারছে না। ক্রিস্টিনা হাসিতে ফেটে পড়েছিল… ‘যাই হোক, তবে আমার কাছে আর এমন কী বা পাবে তুমি?’


আলফ্রেড ঘাড় বাঁকা করে তাকিয়েছিল তার দিকে। নিঃশব্দ এক রাগে ফেটে পড়ছিল সে… ‘বেশ…ভাল বলেছ… সে কথা যেন তুমি জানোই না।’ উত্তেজিত হয়ে বলেছিল সে… ‘দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমি তোমার বিষয়ে চিন্তা করি।’


ক্রিস্টিনা উঠে দাঁড়িয়েছিল। তারপর সেদিন যেভাবে বোর্ডিং স্কুলের প্রধানা শিক্ষিকার পাশে গিয়ে গা ঘেঁষে বসেছিল, ঠিক সেভাবে সে আলফ্রেডের পাশে গিয়ে বসল। আলফ্রেড আবেগপ্রবণ হয়ে তার হস্তচুম্বন করবার চেষ্টা করেছিল। ক্রিস্টিনা ফিরে তাকিয়েছিল তার দিকে এক অদ্ভুত ভোঁতা শীতলতা নিয়ে। তারপর তার ঠোঁটে দীর্ঘচুম্বন দিয়েছিল।


যখন জানাজানি হয়ে গেল যে আলফ্রেডের স্টুডিওতে ক্রিস্টিনা মাঝেমধ্যে জলিকে নিয়ে যায়, তখন একদিন জলিকে ডেকে পাঠানো হল প্রধান শিক্ষিকার ঘরে। সব শিক্ষিকা উপস্থিত ছিলেন। জলি ভয়ে কাঁপতে লাগল। দীর্ঘ সময় ধরে তাকে খুঁটিনাটি বিভিন্ন বিষয়ে কঠোর জেরা করা হতে লাগল।


“ক্রিস্টিনার সঙ্গে একদম মিশবে না।” বলা হল তাকে… “তার প্রভাব অত্যন্ত খারাপ এবং বিপজ্জনক।”


জানালার ফ্রেমের সামনে মেঝের দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল জলি। তার ছোট জাপানি ধাঁচের মুখমণ্ডলে কোনও অভিব্যক্তি না থাকলেও বোঝা যাচ্ছিল যে সে শালীনতা বজায় রাখবার জন্য চুপ করে আছে। কোনও কথা বলবার সাহস যোগাচ্ছিল না তার মনে। কথা বলতে গেলে কণ্ঠস্বর কেঁপে যাবে, এরকম ভেবেছিল সে। শিক্ষিকারা বলে যেতে লাগলেন…


‘আজ থেকে অন্য ঘরে ঘুমাবে তুমি। ক্রিস্টিনার সঙ্গে পড়াশুনা কিম্বা অন্য কোনও বিষয়ে কোনও যোগাযোগ রাখবে না।’


জলি তীব্রভাবে কেঁপে চোখ বুজে ফেলল এই কথা শুনে। কিন্তু সে কিচ্ছুটি বলল না। চোখও খুলল না।


‘তোমাকে যা করতে বলা হয়েছে, তুমি সে ব্যাপারে সহমত পোষণ করো তো?’ পাশ থেকে বলে উঠলেন প্রধানা শিক্ষিকা। ‘পরিষ্কার জানাও যে তুমি এই নিয়মকানুন সঠিকভাবে মেনে নিতে রাজি কি না।’ জলি নীরবে মাথা নাড়ল। সেই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছিল যে যদি সে ক্রিস্টিনাকে একটিবার দেখতে পায়! সে এত কথার মধ্য থেকে শুধু এইটুকুই বুঝতে পেরেছিল যে শিক্ষিকারা ক্রিস্টিনার কাছ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাইছেন।


-‘কিন্তু জলি’ প্রধান শিক্ষিকা আবার বলে উঠলেন… ‘তুমি কি বুঝতে পারছ না যে তোমার ভুল সংশোধন করবার জন্য আমরা তোমাকে একটা সুযোগ দিতে চাই? তুমি খুব বিশ্রীভাবে নিয়মভঙ্গ করেছ এবং তোমার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত এই কারণে যে এই কথাটা আমরা তোমার অভিভাবকদের জানাচ্ছি না।’


জলি একটু অবাক দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকাল… ‘কিন্তু আমি ক্রিস্টিনাকে ভালবাসি’ সে বলল, ‘ওর সঙ্গে এক ঘরে থাকতে পারলে আমার ভাল লাগবে।’


শিক্ষিকাদের ধৈর্যের পরীক্ষা এখন। একজন শিক্ষিকা বিড়বিড় করে ক্রিস্টিনার কুপ্রভাবের ফলে জলি এমন উদ্ধত আচরণ করছে, এই স্বগতোক্তি করলেন। প্রধানা শিক্ষিকা বললেন যে এখনই জলিকে তার সিদ্ধান্তের কথা পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে।


জলির জাপানি চোখ হঠাৎ বেশ বড় হয়ে উঠল। এত বড় আকারে যে তার চোখ কখনো খুলতে পারে, এরকম ঘটনা কেউই আগে লক্ষ্য করেনি। ভয়ে না রাগে এমন হল, সে কথা বলা মুস্কিল। জলি তার ছোট ছোট দুই হাতে জানালার পাল্লা চেপে ধরল। চিৎকার করে উঠল সে, ডুকরে ডুকরে কেঁদে বলতে লাগল… ‘কিন্তু আমি ক্রিস্টিনাকে ভালবাসি।’ বারে বারে হাহাকার করে বলতে লাগল সে… ‘কিন্তু আমি ক্রিস্টিনাকে ভালবাসি।’


ঠিক তখনই ক্রিস্টিনা প্রবেশ করল সে ঘরে। ভেজানো দরজায় আগাম টোকা না দিয়েই সে ঢুকে পড়ল। গটগট করে সে জলির দিকে এগিয়ে একটু ঝুঁকে তার কাঁধে হাত রাখল। তারপর দাঁড়াল তার পাশে। ক্রিস্টিনা জলির থেকে অনেকটা লম্বা এবং যুবতীসুলভ দেহ তার। তুলনায় জলির শরীর এখনো অপরিণত। যৌবনের লক্ষণ প্রকট হয়নি এখনো। জলিকে প্রায় বালকের মত দেখাচ্ছে ক্রিস্টিনার পাশে। ক্রিস্টিনার ভারি গড়ন বেশ টানটান দেখাচ্ছে। সে জলিকে সাহস দেবার জন্য এসেছে এখন। অদম্য আত্মবিশ্বাসে তার মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে আছে।


প্রধানা শিক্ষিকা ক্রোধে টকটকে লাল হয়ে গেলেন… ‘তুমি এখানে কী ভাবে এলে?’ কর্কশস্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে শান্তভাবে বলে উঠলেন তিনি… ‘তুমি এখানে দরজায় দাঁড়িয়ে আড়ি পাতছিলে, তাই না?’


ক্রিস্টিনা জলির দিকে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিল। একথা শুনে সে মাথা তুলল এক মুহূর্তের জন্য…


-‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আড়ি পাতছিলাম আমি। কারণ আমার মনে হয়েছিল যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে।’


তার কথা শুনে শিক্ষিকারা চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন। বাক্যহারা হয়ে সবাই প্রধানা শিক্ষিকার দিকে তাকালেন, যিনি একটা টেবিলের সামনে টকটকে লাল, হতভম্ব মুখ নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ক্রিস্টিনা একেবারে প্রধান শিক্ষিকার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।


‘আপনি জলিকে শাস্তি দেবেন না!’ সে বলে… ‘আপনি খুব ভাল করেই জানেন যে তাহলে আপনারা নিজেরাই নিজেদের মূর্খ প্রমাণ করে ছাড়বেন।’ যদিও তার কণ্ঠস্বর উষ্ণ বন্ধুত্বপূর্ণ এবং কিছুটা উদাসী, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি প্রধানা শিক্ষিকার চোখ থেকে এক মুহূর্তের জন্য সরে যায় না। চোখের পলক ফেলে না ক্রিস্টিনা। তার চোখে কি একইসঙ্গে ব্যঙ্গ এবং নির্মমতা?


-‘আমি সব ঠিক করে দেব।’ জলির দিকে ফিরে ক্রিস্টিনা তার সঙ্গে চলে আসতে বলে। তারপর জলির ঘাড়ে হাত রেখে তাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।


এই ঘটনায় কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন না শিক্ষিকারা। তারা বেরিয়ে যাবার আগে দরজা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত সবার চোখ ক্রিস্টিনার দিকে নিবদ্ধ থাকে। প্রধান শিক্ষিকার প্রতি করুণাবশত সম্ভবত সবাই চুপচাপ বসে থাকেন।


ক্রিস্টিনার বোর্ডিং স্কুলের কার্যক্রম শেষ হবার কিছু আগে ঘটেছিল এই ঘটনা। তারও বেশ কিছুদিন পর সেই বোর্ডিং স্কুলে এসেছিল ইনেস। তবে ইনেসের সঙ্গে ক্রিস্টিনার আলাপ বেশি জমে উঠতে পারেনি। কারণ ক্রিস্টিনা অনেকটা সময় আলফ্রেডের সঙ্গে কাটাত এবং স্কুলের পাঠক্রমের দিকে বিশেষ মনোযোগ ছিল না তার। স্বাভাবিক কারণেই, ক্রিস্টিনাকে নিয়ে যত কাণ্ডকারখানা ঘটেছিল বোর্ডিং স্কুলে, সেই সমস্ত কথা ইনেসের কানেও পৌঁছেছিল। জলির ঘটনাও জেনেছিল সে। যদিও ইতিমধ্যে জলিরও পাঠক্রম শেষ হয়ে গিয়েছিল। বোর্ডিং স্কুল থেকে যাবার সময়ে তার মা এসেছিলেন তাকে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য।


ক্রিস্টিনার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য ইনেসের বেশ আগ্রহ ছিল। যদিও সে শুনেছিল যে ক্রিস্টিনা খুব অহংকারী আর উদ্ভট স্বভাবের মেয়ে, তবে সামনাসামনি দেখে ইনেসের সেরকম কিছু মনে হয়নি। বরঞ্চ তার সঙ্গে আলাপ করে বন্ধু হবার ইচ্ছে জেগেছিল তার। ক্রিস্টিনার ঘরেও একবার গিয়েছিল সে। ক্রিস্টিনা তখন প্রস্তুত হচ্ছে বোর্ডিং ছেড়ে দেবার জন্য। অর্ধেক জিনিসপত্র গোছগাছ হয়ে গেছে। ঘরের বাইরে স্যুটকেস দাঁড় করিয়ে রাখা।


-‘তুমি কয়েক সপ্তাহ আগে এলে ভাল হত!’ ক্রিস্টিনা বলেছিল।


ইনেস বিষণ্ণ বোধ করছিল। বোর্ডিং স্কুলে এসে ইস্তক সেভাবে কোনও মেয়ের সঙ্গে এখনও তার বন্ধুত্ব হয়নি। কিন্তু এই লম্বা, বুদ্ধিমতী মেয়েটি, যে এক দুই দিনের মধ্যেই চলে যাবে, তাকে তার বেশ পছন্দ হয়েছে।


- ‘তুমি তো তাও একা ছিলে না।’ ইনেস বলে… ‘জলি ছিল তোমার সঙ্গে।’


ক্রিস্টিনা মাথা নাড়ে। ‘খুব ভাল, মিষ্টি মেয়েটা। কষ্ট পেল… কিন্তু, যাই হোক… তুমি আরেকটু আগে এলে… তোমার সঙ্গে কথা বলতে বেশ লাগে আমার!’


ইনেসের একটু অস্বস্তি হতে থাকে। ক্রিস্টিনার আপাত উদাসী কণ্ঠস্বরের মাঝে একটা আবেগী চোরাস্রোত আছে, যেটা বিপজ্জনক অথচ শান্ত, গভীর এক আবেদনে ভরপুর। ক্রিস্টিনার হাতদুটির মধ্যেও আছে সেই আবেদন। বড়সড়, সাদা, সুন্দর হাতদুটি স্থিরভাবে রেখেছে সে তার গাঢ় রঙের পোশাকের উপর। সুডৌল সেই বাহুদুটির উপর ঝুঁকে যে কারো ইচ্ছে হতে পারে হস্তচুম্বন করবার জন্য।


ইনেস সোজা হয়ে বসে। নিজের ভাবনার গতিপ্রকৃতি দেখে একটু অদ্ভুত দ্বিধাবোধ জাগে তার নিজের মনেই। সে লক্ষ্য করে ক্রিস্টিনা বিস্ময়ে তার চোখের পাতা, ভ্রু একটু উপরে তুলে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে কি পড়তে পেরেছে ইনেসের মনের ভাবনা?






(চলবে)