গল্প - মনোজিৎকুমার দাস
Posted in গল্পহবু বর ও বরের ভগ্নিপতিরা শিবানীকে পাকা দেখা দেখতে এলে ইন্দুবালা প্রথম হবু নাতজামাই ব্রজগোপালকে দেখে কেন যেন অস্বস্তি বোধ করে। সাত ক্লাসে উঠার আগ থেকেই প্রভাত ও তার বউ মিনতি তাদের বড় মেয়ে শিবানীর বিয়ের কথা ভাবতে শুরু করে । ইন্দুবালা ভাবে- এহনকার দিনি এতটুহু মিয়্যার কেউ বিয়ে দেয়! আমাগেরে কালে না হয় এটা ছ্যাল। মুইর বিয়ে তো হইছেলো ১১ বছর বয়সে। কার্তিক মন্ডলের বাবা মুইকে পণ দিয়ে বেটার বউ করে ঘরে তুলিছিল।
পরক্ষণেই সে আবার ভাবে- এতটুহু বয়সে বিয়ে না দিয়েই বা করবি কী পিরভাতে। ছাওয়াল হবি হবি করে পিরভাতের বউ চারডা মিয়্যা বিয়োইছে। পিরভাতে এডা ওডা করে যা কামাই করে তাতে ওদের সংসারই তো চলে না। একটুহু বয়সে বিয়ে না দিয়ে কীবা করবি পিরভাতে।
তার সোয়মী কার্তিক মন্ডল তার বউ ইন্দুবালাকে বলল- এখন আইন হইছে মাইয়্যার বয়স ১৮ আর ছাওয়ালে বয়স ২১ এর কম হলিপারে বিয়ে দিয়া বেআইনী।
- পিরভাতের মাইয়্যা শিবানী তো মাঘ মাসে ১২ থিকে ১৩ বছরে পরিছে।
-ঠিকই কইছো পিরভাতের বাপ। হবু নাত জামাই ব্রজগোপালের বয়স তো শিবানী হতি তিন গুণ বেশি হবেনে। তার মানে ওর বয়স ৩৭ থেকে ৩৯ বছরের মত হবি মনে হয়।
- তুমার লগে মুইর বিয়ে ৯ বছর বয়সে হলিপারেও তুমি কিন্তুক ছিলে ২১ বছরের জোয়ান ছাওয়াল। পিরভাতের মাসি শাশুড়ি কদমবালা আর তার মাইয়্যা পরেশের বউ সোন্দরী আধ বুড়ো ছাওয়ালের লগে ফুলির কুঁড়ির নাহাল মুইর নাতনিডার সব্বোনাশ করার জন্যি লাগিছে। সে সময় ইন্দুবালা আধা বয়সী ছাওয়ালে সঙ্গে শিবানী বিয়েতে অমত করলে পরেশের বউ সোন্দরী তাকে বলেছিল- চাওয়াল হল সুনার মতো। মাওইমা জানেন না সোনার আংটি বাঁকাও ভাল ! তার কথায় ইন্দুবালাই প্রতিবাদ করেছিল।
নাতজামাইয়ের মতিগতি আর নাতজামাইয়ের মা ও বোনের দুর্ব্যবহারে ইন্দুবালা সুন্দোরী বলেছিল- দেখলি তো সোন্দরী আমার কথাই ঠিক হল কিনা । কটা ছামড়া থাকলি সোন্দরী হয় আর ছাওয়াল হলিপারেই সোনার আংটি হয় না যদি না তার গুণ না থাকে।
ইন্দুবালার বড় ছেলে প্রভাতের মেয়ে শিবানী বিয়ে ! এক কথা ভাবতে তার অনেক কথাই মনের কোণে ভেসে উঠে।
তারপর দিনের পর দিন গড়িয়ে যায়। ইন্দুবালার তারপর আরো দুটো ছেলে একটা মেয়ে হল। তার জাদেরও ছেলে মেয়ে হল। এক সময় হানুগঞ্জের মন্ডলবাড়ির একান্নবর্তী পরিবারে ভাঙন দেখা দিল। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে মন্ডলবাড়ি ছেলেরা যার যার মত হয়ে গেল। জমিজমা ভাগ হওয়ার পর কার্তিক মন্ডল যা পেল তার আয় থেকে তার পরিবারের ছয় ছয়টা মুখকে খাওয়ানো পরানো কার্তিক মন্ডলের পক্ষে কষ্টকর হয়ে পড়ল। মেয়েটার বয়স কয়েক মাস মাত্র। কার্তিক মন্ডলের ইচ্ছে ছিল তিনটি ছেলেকে লেখা পড়া শেখানোর। শেষ পর্যন্ত হল না। পিঠেপিঠে জন্মানো তিনটি ছেলে দিনে দিনে বড় হয়ে উঠল। ওরা প্রাইমারী স্কুলের লেখা পড়াও শেষ করতে পারল না। ওদের বাবার শরীরটাও ভাল না।
ইন্দুবালা মনে মনে ভাবে- পিরভাতে ছাড়াও তার আর দুই ছাওয়াল গনসা ও মঙলারও লেহাপড়া হল না। দেখতি দেখতি ছাওয়ালগুলো বড় হয়ে উঠল। তখন ছাওয়ালগুলো এটাওটা করে দুএক টাহা রোজগার করতি লাগল। পিরভাতের এতটকু বয়সে বিয়ে দিবার দরকার ছ্যাল না। কিন্তুক ইন্দুবালার শাশুড়িঠাকরোনের ইচ্ছেতে পেত্থমে পিরভাতের বিয়ে দিতি হেলো।
প্রভাতের বিয়ের আড়াই বছর পরে প্রভাতের বউ শিবানীকে জন্ম দিল। ইন্দুবালা আর দুটো ছেলের নাম গনসা ও মঙলা। তারা সব সময়ই কামারপাড়ায় বসে থাকে। কামারপাড়ায় বিয়ে যোগ্য মেয়ের অভাব নেই। এদিকে গনসা ও মঙলা এই দুজন কামারপাড়ায় রমেশ আর পরেশের কামারশালায় কাজ করতে থাকায় ইন্দুবালা ও তার স্বামী কার্তিক মন্ডল তো অবাক! কার্তিক মন্ডল তার বউ ইন্দুবালা একদিন বলল- গনসা ও মঙলার মতিগতি ভাল লাগতিছে না, কুথায় কী করে বসবিনি তার তা কী তুমি ভ্যাবি দেহিছো, বউ! ওগেরে বিয়ে আমি বোশেখ মাসের মধ্যিই দ্যাবো, মুই মনে মনে প্রিতিজ্ঞে করতিছি। কার্তিক মন্ডল সত্যি সত্যি তার কথা রাখল।
বিয়ের পর তিন ভাই এক সঙ্গেই থাকলেও কয়েক বছর যেতেই বউদের যুক্তি শুনে তিন ছেলেই যার যার মত আলাদা হলে গেল। ছোট মেয়েটাকে নিয়ে ইন্দুবালা ও কার্তিক মন্ডল এখন ছেলেদের থেকে আলাদা। কার্তিকের বয়স হয়েছে, ইন্দুবালার বয়সও আগের মত নেই। তিনটি প্রাণীর সংসার চালাতে গিয়ে তাদেরকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
প্রভাতের মেয়েটা এবার সাত ক্লাসে উঠেছে। সামনের পরীক্ষার পর আট ক্লাসে উঠবে। গনসা ও মঙলা দুটো করে মেয়ে, তার সবে প্রাইমারী স্কুলে যাচ্ছে। ইন্দুবালা ভাবলো- তিনটে ছাওয়ালের একটাও ছাওয়াল না হলিপারেও ওরা যদি মাইয়্যাগুলিকে লেহাপড়া শেখায় তা হলি ভালই হবি। দিনকাল বদলাছে। মাইয়্যা পেলারাও এহন লেহা পড়া শিখতিছে।
ইন্দুবালার ইচ্ছেটা পূরণ হবে না সে কয়েকদিন পরেই বুঝতে পারলো । মদন ঘটক মাঝে মধ্যেই তাদের বাড়িতে আসছে দেখে ইন্দুবালার মনে খটকা লাগল।
একদিন ইন্দুবালা বড়বৌমাকে বলল- মদন ঘটক পিরভাতে, আর তুমার সাথে কী বলতি একদিন পর পরই আসতিছে। ইন্দুবালা প্রভাতের বউয়ের কাছ থেকে জানতে পারল ওদের বড় মেয়ে শিবানীর জন্যে একটা ছেলের খোঁজ নিয়ে এসেছে। বড়বৌমার মুখ থেকে কথাটা শুনে ইন্দুবালা অবাক হয়ে বলল- এতটুকু মাইয়্যার বিয়ে! তুমরা কি পাগল হইছো? শ্বাশুড়ির কথা শুনে শিবানীর মা একটা কথাও বলল না।
কয়েকদিন পরে মদনগোপাল শিবানীর বাবা প্রভাত ও তার ভাইরা ভাই পরেশকে নিয়ে শিবানীর বিয়ের জন্যে ছেলে দেখতে যাবে এমন কানা ঘুষা ইন্দুবালার কানে গেল। প্রভাত তার মাসতোত শালিকা সোন্দরীকে নিজের পাড়ার পরেশের লগে বিয়ে দিয়ে গ্রামে একজন কুটুম করেছে নিজের শক্তি পাকাপোক্ত করার জন্যে।
ফটকি নদীর ওপারে গোসাইগাঁও এ শিবানীর বিয়ের জন্যে ছেলে দেখতে যাওয়ার আগে প্রভাত মাকে প্রণাম করে বলল- শিবানীর জন্যি ছাওয়াল দেখতি যাতিছি।
প্রভাতের কথা শুনে প্রতিবাদ করার ইচ্ছে ইন্দুবালার মনে জাগলেও শুভকাজে যাত্রার সময় ব্যাগড়া দিতে তার মন সায় দিল না। সে শুধু বলল- আচ্চা , ভালয় ভালয় আসগে।
ছেলে দেখে ফিরে এসে প্রভাত যতটা ছেলের বাড়ি, ছেলের মা ও বোনের প্রশংসা করল তার চেয়ে বেশি গুণগান করল প্রভাতের ভায়রা পরেশ আর মনদা ঘটক। প্রভাত তার মাকে শুধু বলল- ছাওয়ালের বয়স একডু বেশি, তাহলি পারে কিন্তুক জমিজিরেত আর ব্যবসাপাতি অঢেল। বোনডার বিয়ে হয়ে গেলিপারে সব কিচুরই মালেক জামাইবাবাজি।
সেখানে প্রভাতের ভায়রা পরেশ ও পরেশের বউ সোন্দরী ছিল। প্রভাতের কথা শুনে সোন্দরী তার ভগ্নিপতি প্রভাতকে বলল- ছাওয়ালের আবার বয়স বোলে কিছু আছে নাকি, সোনার আংটি বাঁকাও ভাল।
এবার ছেলে পক্ষের মেয়ে দেখতে আসার পালা হলেও তার কিন্তু প্রথমে এলো না। ইন্দুবালার বাড়ির বউরা প্রভাতের শালি পরেশের বউ সোন্দরীরা এবার দলবল সহ গোসাইগাঁও গেলেও তাদের শ্বশুরশাশুড়ি কার্তিক ও ইন্দুবালাকে যাওয়ার কথা কিন্তু বলল না। এতে কার্তিক মন্ডল মনে কিছু না নিলেও ইন্দুবালা মনে মনে গোসা করলো । কিন্তু কিছুই কাউকে বলল না। বউরা ফিরে এসে হবু জামাই ব্রজগোপাল, তার মা ও বোনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। প্রভাতের ভায়রা পরেশের বউ মানে প্রভাতের শালি সোন্দরী সারা গ্রাম ঘুরে ঘুরে হবু জামাই ব্রজগোপালদের কত যে প্রশংসা করল ! সোন্দরীকে গ্রামের লোকেরা বিশেষ করে মহিলারা গেজেট বলে ডাকে , সে তার মাজা ব্যাঁকা শাশুড়ি বুড়ির দিয়ে রান্নাবান্না থেকে যাবতীয় কাজকর্ম করিয়ে নিজে পাড়ায় পাড়ায় গল্প করে বেড়ানোই তার কাজ।
সোন্দরীর শাশুড়ি কমলাসুন্দরী তাকে বলল- পরেশরা বলতিছিল ছাওয়ালের বয়স নাহি বেশি, শ্বশুর জামাই এক জায়গায় দাঁড়ালে জামাইকে শ্বশুর আর শ্বশুরকে জামাই মনে হবি। শাশুড়ির কথা শুনে কথা শুনে পরেশের বউ সোন্দরীর আবারও বলল- সোনার আংটি বাঁকাও ভাল, পুরুষ মানুষের আবার বয়স!
হবু জামাইয়ের প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ। তারপর ব্রজগোপাল বন্ধুবান্ধব নিয়ে শিবানীকে দেখতে এল। শিবানী স্কুলের ইউনিফরম আর জামা পাজামা ছাড়া পরেনি। ওই দিন তাকে শাড়ি পরে ছেলে পক্ষের সামনে বসতে হল। ছেলের মামা শ্যামসুন্দর ব্রজগোপালের গার্জিয়ান। শ্যামসুন্দর মনে মনে ভাবল- ভাগনের বিয়ে দেওয়ার জন্য কম চেষ্টা করেনি। এত বয়সী ছেলে সাথে বিয়ে দিতে কোন বাবা মাই মাইয়্যা দিতি রাজি হয় না।
সে এবার ভাবল - মেয়েটি বাচ্চা হলেও বিয়ের জল গায়ে পড়লে বড় হতে কয়দিন। দুই পক্ষ রাজি হওয়ায় শিবানীর বিয়ে দিন ক্ষণ স্থির হল। ছেলেকে আশীর্বাদ করতে প্রভাত ভায়েরা পরেশ , পরেশের বউ সোন্দরী এবং শিবানীর মা ও তার জাদের গোসাইগাঁও গেল ।গ্রামের দুএকজন মাতবরকেও সাথে নিল। শুধু সঙ্গে নিল না তার বাবা ও মাকে।
কয়েক মাস পরে শিবানীর বিয়ে। ছেলে পক্ষ এর মাঝে দশ বার আত্মীয়স্বজন ও মাতবর সঙ্গে করে এসে শিবানীকে আর্শীবাদ করে গেল। বিয়ের আগ থেকেই বর ও কণে না পক্ষের মধ্যে আত্মীয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠল। তারপর একদিন ঘটা করে শিবানীর বিয়ে ভাল ভাবেই হয়ে গেল। কিন্তু শিবানীর বিয়ের পর কয়েকদিন যেতে না যেতেই থলের বিড়াল বেড়িয়ে পড়ল।
ইন্দুবালার মনে সংশয় লেগে ছিল তার নাতনি শিবানীর হবু বরকে দেখার পর থেকেই। তার একটাই ভাবনা এত বছর বয়সী নাতি জামাই তার নাতনি শিবানীকে মানিয়ে নিতে পারবে তো! সে মনে মনে ভাবল যে শিবানী সুখী হলেই তাদের সুখ।
প্রভাত এক মাইক্রোবাস ভর্তি করে আত্মীয়স্বজনদের কে নিয়ে শিবানীর বউভাতে গেল। এবারও ইন্দুবালা ও কার্তিক মন্ডলকে শিবানীর বাড়িতে নিয়ে গেল না প্রভাত। কিন্তু প্রভাত এবারও পরেশের বউ সোন্দরী, শিবানীর মা, তার জাদের সাথে গ্রামের মাতবরদের নিয়ে গেল বউভাতে। প্রভাতের ছোট ভাইয়েরা, মদন গোপাল ঘটকও তাদের সাথে গেল। আশীর্বাদের সময় না যাওয়া সোন্দরীর মাসি কদমবালা মানে প্রভাতের মাসি শাশুড়ি মহিলাদের মধ্যে এবারই প্রথম শিবানীর শ্বশুড়বাড়ি গোসাইগাঁও এসেছে।
আসলে প্রভাত তার কর্তা নয়, কর্তা তার বউ মানে শিবানীর মা। শিবানীর মায়ের ইচ্ছে ছিল বউভাতের পর শিবানী ও ব্রজগোপাল জামাইবাবাজীকে নিয়ে আসবে তাদের ওখানে ফিরানি ভাঙতে। শিবানী বুঝল ব্রজগোপালের বাড়ির আসল কর্তা তার বোন হেমাঙ্গী। হেমাঙ্গীর হাবভাব দেখে মনে সোন্দরীর মাসি কদমবালা মোটেই ভাল ঠেকল না। হেমাঙ্গী ব্রজগোপালকে বলল- দাদা,ফিরানি ভাঙার পরে দিনই বউকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসবি কিন্তুক। সে সময় কদম মাসি হেমাঙ্গীর কথায় প্রতিবাদ করে বলল- নতুন জামাই আবার ফিরানি ভাঙতে য্যায়ে শ্বশুর বাড়ি একদিন থ্যাকে নোতুন বউ নিয়ে বাড়ি ফেরে তাতো বাপের জম্মে কহন শুনিনি।
-এবারে জামাইয়ের দৌলতে শুনে রাখুন ।শিবানীর কলেজে পড়া ননদ হেমাঙ্গী কদম মাসিকে বলল। কথার পৃষ্ঠে কথা বলতে কদম মাসিও কিন্তু কম যায় না। নতুন কুটুম বাড়ি ভেবে সে আর কথা না বাড়াতে চাইলেও তবুও সে হেমাঙ্গী বলল- এ বাড়ির হত্তাকর্তা কি তুমি। ব্রজগোপালের কলেজে পড়া একডা অবিয়েত্তো বোন আছ বিয়ের আগে জানতি পারলি এত বছর বয়সী ছাওয়ালের সঙ্গে শিবানী দিদিভাইয়ের বিয়ে দিতে দিতাম না। কদমবালার কথা শুনে হেমাঙ্গী ও তার মা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। কদমবালাকে যাচ্ছেতাই বলে গালিগালাজ করতে দ্বিধা করল মা ও মেয়ে।
ব্রজগোপাল ফিরানি ভাঙতে এসে তার বোন হেমাঙ্গীর কথা মত ফিরানি ভাঙার পর দিনই শিবানীকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল। কদম মাসি সোন্দরীকে বলল- এত বয়সী ছাওয়ালের সাথে নাবালিকা শিবানীর বিয়ে দিতে আমার মন সায় দ্যায়নি। তুই গেয়ে বেড়াতে লাগলি ছাওয়ালের বয়স হইছে তাতে কী ! সোনার আংটি বাঁকাও ভাল !
শিবানী ফিরানি ভেঙে শ্বশুর বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর থেকেই শিবানীর উপর আসল খেল শুরু করল। শাশুড়ির চোখে বেটার বউ মন:পুত নয় শিবানী শাশুড়ির কথাবার্তায় দু’চার দিন গেলেই বুঝতে পারল। ব্রজগোপালে মা ও বোন হেমাঙ্গীকে গুজুরফুসুর করতে দেখে শিবানী কিছুই বুঝতে পারল না। তার নিজের বাবার বয়সের চাইতে বড় স্বামীকে আসলে শিবানী ভয় পায়।
পরদিন থেকে বাড়িতে হুলুস্থুল কান্ড শুরু হল। হেমাঙ্গী এর গলার সোনার হার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বেটি ও মা সব জায়গায় হারটা খুঁজে খুঁজে হয়রান। তারা শিবানীর বাক্স পেটরা খুঁজে পেতে দেখতেও তারা কসুর করল না। হেমাঙ্গী প্রথমে কথাটা বলল- কালুখালীর গদাগুণীনের কাছে গেলে কে আমার সোনার হার নিয়েছে জানতে পারা যাবে, মা। মা বেটি ছাড়াও অনেকেই জানে গদাগুণীর একজন ধাপ্পাবাজ।
শিবানী দিদিমা কদমবালার ওপর হেমাঙ্গীর রাগ তখনো পড়েনি। সে ও তার মা যুক্তি করে ঠিক করল শিবানীর কদম দিদিমাকে জব্দ করতেই হবে। কালুখালীর গদাগুণীনকে কাজে লাগিয়ে কদমবালাকে নাকানী চুবানী খাওয়াতে আর শিবানীর বাবার কাছ থেকে একটা সোনার হারের টাকা আদায় করতে হবে।
পরদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে হেমাঙ্গী গদাগুণীনের বাড়ি যেয়ে তার সহকারী বঙ্কাজী সাথে দেখা করে তার সোনার হার চোরের হদিস দেওয়ার কথা বললে বঙ্কাজী বলল- আপনি কাহাকে সন্দেহ করিতেছেন তাহার তাহার নাম আমাকে লিখিয়া দিন । কে আপনার হার চুরি করিয়াছে তাহা আপনি প্রকাশ করিতে পারিতেছেন না সেই নামটি গুণীনবাবাজী জনসমক্ষে প্রকাশ করিয়া দিবেন।
বঙ্কাজী সাধু ভাষায় কথা বলেন আর সবাইকে আপনি বলে সম্বোধন করেন। । গলায় জবাফুলের মালা। কপালে সিঁদুরের লম্বা টান। ছেলেটির বয়স একুশ থেকে পঁচিশের মধ্যে হবে। ফর্সা আর সুঠামদেহী খুব সুন্দর বলে ছেলেটিকে হেমাঙ্গীর মনে হল। এমন সুন্দর চেহারা ছেলেটি ধাপ্পাবাজি কাজের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছে তা হেমাঙ্গী ভেবে পেলে না। কলহপ্রিয় হলেও হেমাঙ্গী নিজেও কিন্তু সুন্দরী কম নয়।
ছেলেটি ভেবে অবাক হল -গুণীনজীর আখড়ায় এমন সুন্দরী মেয়ে তো কখনোই আসে না, আসে যত বদখত বুড়োথাড়া মহিলা কিংবা পুরুষেরা। সে উৎসুক দৃষ্টিতে হাসি হাসি মুখে হেমাঙ্গীর পানে তাকে বলল- - আগামীকাল মঙ্গলবার , ভাল দিন। আপনাদের বাড়িতে যাওয়া আসা করিয়া থাকে কিংবা দুই একদিন অবস্থান করিয়াছে এমন জনা কয়েক লোকের নামের একটি তালিকা এবং তাহার সাথে একান্নটি টাকা আপনি আগামীকাল দ্বিপ্রহরের আগে আমার মাধ্যমে গুণীনজীর কাছে জমা দিবেন। তবে একটি কথা হইতেছে যে এখানে আসিবার সময় গ্রামের অথবা পাড়ার মোড়লমাতুব্বর ,মেম্বার ও পণ্যমান্য লোকজনদেরকে সাথে নিয়া আনিবেন।
গদাগুণীজীর সহকারী বঙ্গাজীর হাতে কদমবালার নামটা জমা দিয়ে হেমাঙ্গী বাড়ি দিকে পা বাড়ালে ছেলেটি পেছন থেকে ডাক দিয়ে বললেন- ওই তালিকায় কিন্তু এই নামটি অবশ্যই থাকে।
- ঠিক আছে ।
- এতক্ষণ আপনার সঙ্গে কথা হইল , কিন্তু আপনার নামটি আমার শোনাই হইল না। হেমাঙ্গী তার নামটি তাকে বলে ওখান থেকে বাড়ির পথ ধরল।
এর মাঝে শিবানী ফোন করে তার মাকে জানাল আমারে ননদের সোনার হার হারিয়ে গেছে। তা দিয়ে এখানে গোন্ডগোল পাকিয়ে উঠেছে। পরদিন হেমাঙ্গী, তার মা এবং ব্রজগোপাল মোড়ল মেম্বার ও গ্রায়ের লোকজনদের কে নিয়ে গদাগুণীনের বাড়ি যেয়ে হাজির হলো। হেমাঙ্গী গদাগুণীনজী সহকারী বঙ্কাজীর হাতে সন্দেহভাজন চোরদের নামের তালিকার সঙ্গে একান্ন টাকা জমা দেবার সময় হেমাঙ্গীর মনে হল ছেলেটি যেন একটু বেশিই সাজগোজ করেছে। হেমাঙ্গী তার গা থেকে চন্দনের গন্ধ পেল।
- গুণীনজী ভেতরে পুজো করতিছেন। এখনই তিনি বাইরে আসবেন।
একটু পরেই গদাগুণীনজী বাইরে এলেন, হাতে পুজোর ফুল। ঘরের বারান্দায় আসন পেতে রেখেছে। গদাগুণীজী সেই আসনে বসে বঙ্কা নামের ছেলেটির কাছ থেকে সন্দেহভাজন চোরদের নামের তালিকার হাতে নিয়ে ধ্যানস্থ হলেন। ঘন্টা খানেক পরে তার ধ্যান ভাঙাল। এক সময় তিনি হেমাঙ্গীর দেওয়া তালিকার উপর চোখ রেখে বলে উঠলেন। কদমবালা।
হেমাঙ্গীদের সঙ্গে আসা ইউনুস মেম্বার সহ গ্রামের লোকেরা এক সঙ্গে বলে উঠল- ব্রজগোপাল , কদমবালা আবার কে? ব্রজগোপাল জবাব দেওয়ার আগেই হেমাঙ্গী কদমবালার পরিচয় দিল।
ইউনুস মেম্বার এলাকার খুব প্রভাবশালী,গুণীনজীর বুজুর্কী জানতে তার বাকি নেই। সামনে ইলেকশন তাই এ সব বুজুর্কীর কথা জেনেও ইউনুস নিশ্চুপ!
বাড়ি ফিরে হেমাঙ্গী ও তার মা প্রচার করে দিল নতুন বউয়ের দিদিমা কদমবালাই হেমাঙ্গীর সোনার হার চুরি করেছে। শিবানীর বিশ্বাস হল না তার কদম দিদিমা এটা করতে পারে। শিবানীর শাশুড়ি তার মা ও বাবাকে ফোন করে জানাল হেমাঙ্গীর সোনার হার তাদের কদম মাসি চুরি করেছে। ভাল ভালয় যেন ওটা ফেরত দিয়ে যায়। খবরটা শুনে কদমবালা তো হতবাক!
তারপর থেকে ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন আসতে লাগল। শিবানীর মা তার জামাই ব্রজগোপালকে ফোন করে আসল বিষয়টা জানতে চাইলে জামাইবাবাজী ফোনটা রিসিভ করে আমতা আমতা করে কী যেন বলে ফোনটা তার বোন হেমাঙ্গীর কাছে দিল। হেমাঙ্গী যে ভাষায় যা বলল তা ভাষায় ব্যক্ত করার নয়।
শিবানী বাবা মা ও পরেশ অনেক চেষ্ট করেও জামাই ব্রজগোপালের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে শিবানীর সঙ্গে কথা বললে সে বলল- তোমরা এসে এর ফয়সালা করে যাও নইলে আমাকে নির্যাতন ----
এইটুকু বলে সে ফোন কেটে দিল। ওখানকার ইউনুস মেম্বার প্রভাতের পরিচিত, তাই আসল ঘটনা জানার জন্যে তাকে ফোন করে জানতে পারল যে এ সব ধাপ্পাবাজী, সামনে ইলেকশন সে নিজে কিছু বলতে পারছে না।
তিনি শেষে বললেন- আপনার আসেন, আমি থেকে একটা ফয়সালা করে দেব। এবার শিবানীর বাবা হেমাঙ্গীর কাছে ফোন করে জানিয়ে দিল তারা কয়েকজন তাদের ওখানে যে কোনদিন যাবে বিষয়টার ব্যাপারে। প্রভাত ভাবল- জামাই বাড়ির আসল কর্তা জামাই নয় , আসল কর্তা জামাইয়ের সুন্দরী বোন হেমাঙ্গী ও তার মা। সে ইউনুস মেম্বারকে শুধু ওখানে যাওয়ার তারিখটা জানিয়ে রাখল।
কলেজ থেকে ফেরার পথে গদাগুণীনের বাড়ি কাছাকাছি এলে হেমাঙ্গী শিবানীর বাবার ফোন পেয়ে একটু অস্বস্তিবোধ করে এগিয়ে যেতেই গদাগুণীনের সাকরেদ বঙ্কা নামের ছেলেটিকে দেখতে পেল বকুল গাছটার নিচে প্যান্ট পরে বসে আছে। হেমাঙ্গী ভাবল- হার চুরির বিষয়ে যে ভাবে ঘোট পাকিয়ে উঠছে তাতে ওর পরামর্শ নেওয়াও দরকার। সে তাকে সব কথা খুলে বললে ছেলেটি হেমাঙ্গীকে বলল -নাজেহাল হতে না চাইলে তুমি তোমার চুরি না যাওয়া হারটা আর লুকিয়ে রেখ না।
ছেলেটার কথা হেমাঙ্গী মনে ধরল। হারটা লুকিয়ে রেখে কদমবালাকে জব্দ করা যাবে না।
সেদিন সন্ধ্যায় কালুখালী বাজারে ইউনুস মেম্বার ব্রজগোপাল বলল যে তার শ্বশুররা আগামীকাল আসছে। - তোরা সবাই কিন্তু বাড়ি থাকিস। ব্রজগোপাল বাড়ি ফিরে ইউনুস মেম্বারের বলা কথাটা মা ও বোনকে বলল। সে তার বউ শিবানীকেও তার বাপমাদের আসার কথাও বলল। হেমাঙ্গী ও তার মা ঘুজুরঘুজুর ফুসুর ফুসুর করার পর তারা দুজনেই শিবানীকে গালমন্দ করতে শুরু করল। শিবানী গালমন্দ খেয়ে কাঁদতে শুরু করল।
ব্রজগোপাল ইয়ারবন্ধুদের সাথে তাস খেলতে গেছে বটতলায়। শিবানী রাতে ভাবল – বাপমা এলে এবার সে এখান থেকে তাদের সঙ্গে চলে যাবে। পরদিন প্রভাত শিবানীর মা, তার মাসি কদমবালা , পরেশ, পরেশের বউ সোন্দরীকে নিয়ে শিবানীর শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে টেম্পুতে ওঠবার সময় শিবানী শাশুড়ির ফোন পেয়ে প্রভাত তো অবাক! শিবানীর শাশুড়ি বলল যে হেমাঙ্গীর সোনার হার পাওয়া গেছে তার নিজের আলমারীতে, ও ভুল করে ওটা রেখেছিল। আপনারা আসেছেন ------
প্রভাত রাগের চোটে ফোন কেটে দিয়ে ইউনুসকে মেম্বারকে ফোন করে সব কথা খুলে প্রভাত। শিবানীর দিদিমা কদমবালাকে চোর অপবাদ দিয়ে জব্দ করতে না পারায় হেমাঙ্গী ও তার মা শিবানীর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতে থাকে। আর তাকে বলে, তোকে আমরা জীবন থাকতে বাপের বাড়ি পাঠাবো না।
কয়েকদিন যেতে না যেতেই শিবানীদের পাড়া প্রতিবেশিরা কানাঘুষা শুনতে পায় শিবানীর শ্বশুর বাড়ি থেকে মেম্বার মাতুব্বর আসছে শিবানীর বাপের বাড়িতে কাদের দোষ আর কাদের গুণ যাচাই করার জন্যে তাদের সঙ্গে প্রভাতের জামাই মেয়েও আসবে। প্রভাতের ভায়রা ভাই পরেশ বলে বেড়াতে থাকে যে ব্রজগোপালের মা ও হেমাঙ্গীও আসছে। এবার বিচার কাকে বলে দেখতে পাবে বাছাধনরা।
সত্যি সত্যি ইউনুস মেম্বার ব্রজগোপাল, শিবানী ও গ্রামের মাতুব্বর মোড়লদের নিয়ে এক টেম্পু ভরে প্রভাতদের বাড়িতে আসে, তারা কিন্তু শিবানীর শাশুড়ি ও হেমাঙ্গীকে সঙ্গে আনতে পারে না। খাওয়া দাওয়ার পরে বিচার বসলে প্রথমে শিবানীর জবানবন্দী নিলে প্রকাশ পায় ব্রজগোপালের আসকারার তার মা বোন নাবালিকা শিবানীর ওপর যারপর নেই অত্যাচার চালিয়েছে। এমনকি প্রায় রাতেই শিবানীকে তার স্বামী বজ্রগোপালের সাথে শুতে দেয়নি। শিবানীর কথা শোনার পর ইউনুস মেম্বার ব্রজগোপালকে জিজ্ঞেস করে এ সব কথা সত্যি কিনা। ব্রজগোপাল কোন জবাব না দেওয়ায় ব্রজগোপালের সম্পর্কে মামা গোলক মোড়ল ব্রজগোপালকে একটা চড় কশে দেয়। ওখান থেকে আসা সবাই ব্রজগোপালকে গালমন্দ করে রায় দিয়ে যায় যে ব্রজগোপালকে শ্বশুর বাড়িতে সাতদিন থেকে তার বউ শিবানীর সঙ্গে ঠিকঠাক মত মেলামেশা করতে হবে এবং শ্বশুরশাশুড়ির সেবাযত্ন করার পর তারা খুশি হলে তার সঙ্গে শিবানীকে শ্বশুর বাড়িতে পাঠাবে।
ব্রজগোপাল সালিশের রায় মেনে নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে থেকে যায়। কিন্তু ভোর রাতের দিকে ব্রজগোপাল কাউকে এমনকি তার বউ শিবানীকে কিছু না বলেই পালিয়ে যায়, শিবানীর কাছ থেকে খবর জেনে বাসস্ট্যান্ড থেকে ব্রজগোপলকে প্রভাত ও পরেশ গিয়ে পাকড়াও করে আনে। কিন্তু ব্রজগোপাল তার মা ও বোনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরদিন আবার চম্পট দেয় । শিবানী ও শিবানী মার কান্নার শব্দ শুনে এগিয়ে আসে ইন্দুবালা , কদমবালা, সোন্দরী ও পাড়াপ্রতিবেশিরা। সব কথা শুনে ইন্দুবালা বলল- সোন্দরী তার ভগ্নিপতি প্রভাতকে কইছ্যাল- ছাওয়ালের আবার বয়স বোলে কিছু আছে নাকি, ছাওয়াল হলো সোনার আংটি , আর সোনার আংটি বাঁকাও ভাল।


0 comments: