গল্প - প্রিয়দর্শিনী দেবাদ্রিতা
Posted in গল্প-----প্রাক-কথন-----
বহুদিন আগেকার কথা।ঠিক এক শতাব্দী পূর্বে মোগল বাদশাহ আলমগীর গত হওয়ার পর থেকেই ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলাতে শুরু করেছে।উত্তরে শিখরাজ্য। পূর্বে সুবিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি সম্পূর্ণ বাংলা বিহার আর উড়িষ্যার কিছুটা গ্রাস করে নেমে গেছে দক্ষিণে- সেই সিংহল অবধি। সেখানে রাজত্ব করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সমস্ত মধ্যভারতখানাই মারাঠা শক্তির অধীন। সিন্ধিয়া, ভোঁসলে, হোলকার ও পেশোয়া; এই চতুস্তম্ভের ওপর নির্মিত শক্তিশালী মারাঠা কনফিডেরসি।সুপ্রাচীন কালের স্বাধীন রাজাদের মধ্যে রয়েছেন কেবল লখনৌ ও মহিশুরের নবাব, হায়দরাবাদের নিজাম আর রাজপুতানার গুটিকয়েক রাজ্য।
ঠিক এই সময়ে, যখন মোগল সূর্য অস্তমিতপ্রায় আর বাতাসে ভেসে আসছে যুগান্তরের পদধ্বনি,তখন এই ভারতবর্ষেরই একটি কোণে, মহাকালের কলমে একটি অদ্ভুত নাটক রচিত হয়েছিল ।বহু বড়ো বড়ো মহীরুহ মুখ থুবড়ে আছড়ে পড়েছিল ভূমিতে, প্রলয়ংকর উন্মাদনায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো বহুদর্শী বহু নয়ন।
তারপর অকস্মাৎ, চিরকালীন নিয়মে, আবার সমস্ত শান্ত হয়ে গেলো। অপূর্ব সমস্যার পাওয়া গেল অভূতপূর্ব সমাধান।সেদিনকার রঙ্গমঞ্চের পাত্র-পাত্রীরা সকলেই আজ কালের গর্ভে বিলীন। কেবল ইতিহাস- তার বৃদ্ধ জরাজীর্ণ বুকে সযত্নে রেখে দিয়েছে কাহিনীর নির্যাসটুকু।।
-----১-----
“নীল সুকোমল,শরীর অমল,কমলে গঠিত অঙ্গ –
ভারের কারণ হীন আভরণ,সহজে মোহে অনঙ্গ
কমল বদন,কমল নয়ন,কমল-গঞ্জিত গণ্ড
দ্বিকর কমল,কমলাঙ্খিতল,ভুজ কমলের দণ্ড”
রাজকুমারীর প্রিয়তমা বয়স্যা সত্যভামা গান গাইছে।বঙ্গাল মুলুকের গান।সত্যভামার মা নিজেও বঙ্গাল দেশের মেয়ে।মার কাছ থেকে মেয়ে শিখেছে।কুমারী এ গানখানি শুনতে বড় ভালবাসেন।মনে হয়- যেন তাঁরই কথা ভেবে– অতীত কালের এক কবি লিখে রেখে গেছেন এ গান। একে তো কাব্যের নায়িকা আর কুমারী সমনাম্নী,তারপর কিশোরী রাজবালাকে দেখলে,তার রূপ বর্ণনা করতে গেলে- অন্য কোনও কথা মনে আসে না- কমলনয়না,কমলাননা কুমারী, সাক্ষাৎ কমলালয়ার মতনই রাজপুরী আলো করে আছেন।
সাল- ১৮০৭ খৃষ্টাব্দ।স্থান- উদয়পুর রাজপ্রাসাদ।মেবারের সিংহাসনে আসীন মহারাণা ভীমসিংহ।।তাঁরই কন্যা দশম বর্ষীয়া কৃষ্ণা।বাপের আদরের দুলালী, মায়ের নয়নমণি।মরুভূমির বালুকা সরোবরে প্রস্ফুটিত সহস্রদল কমল।
রাজ্যে আজ আনন্দের ধুম।সমস্ত রাজপথ সাজানো হয়েছে ফুলের মালায়।সরকারী খরচে দরজায় দরজায় বসেছে মঙ্গলঘট।মহারাণী অর্ষাজাবাদে স্বয়ং যাচ্ছেন কারুণী দেবীর মন্দিরে পুজো দিতে।মাত্র এক বছর আগে যে কালো ছায়া নেমে এসেছিল রাজদুহিতার জীবনে – যার থেকে উত্তরণের কোন আশাই ছিল না আর ,কেবল দেবীর আশীর্বাদেই তা সম্পূর্ণ রূপে দূরীভূত হয়েছে! মেবার আর সে মেবার নেই সত্য,তবে এতবড় আনন্দের দিনে উৎসব হবে না– এতটা অধঃপতন আজও ঘটেনি।
ব্যাপার কিন্তু সেরকম সাংঘাতিক কিছু নয়! কুমারী কৃষ্ণার বিয়ে ঠিক হয়েছে। রাজপরিবারে শত শত মেয়ে- প্রতি বছরই কারো না কারো সম্বন্ধ আসে। তাতে কোন নূতনত্ব নেই। প্রাত্যহিক জীবনের অন্য পাঁচটা বিষয়ের মতোই সহজ স্বাভাবিক ভাবে দেখা হয় সেসব ঘটনা!
তবে আজ যে কেন এরকম বিশেষ উৎসব হচ্ছে রাজ্যজুড়ে, সে কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে আমাদের কিছুটা পিছিয়ে যেতে হবে। বুঝে নিতে হবে বর্তমানের সামগ্রিক অবস্থাটাও।
বস্তুতঃ সমস্ত রাজপুতানার মধ্যে মেবারের অবস্থাই এ সময় সবচেয়ে সঙ্গীন।মরুপ্রদেশের অন্যান্য রাজ্যগুলি– যথাক্রমে মারবার,অম্বর প্রভৃতি এতদিনে মোগল বাদশাহের বশম্বদ বা সম্রাট-পরিবারের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ,ফলে ভারতেশ্বরের কুটুম্বিতার সুবিধাও তারা পেয়েছে।কিন্তু মেবার তো তা পারে না।মহারানা বলেন-মেবারের সিংহাসনের অধিষ্ঠাতাদের মধ্যে এখনো শিশোদিয়া রক্ত প্রবহমান– সূর্যপুত্র শিলাদিত্য– বাপ্পাদিত্য থেকে শুরু করে সমর-সিংহ,লক্ষণ সিংহ,অরি সিংহ,হাম্বীর,চন্ডের মত বীরপুরুষ যে সিংহাসনের স্বার্থে জীবনব্যয় করেছেন;রাণা কুম্ভ,রাণা প্রতাপ,রাজ সিংহ,সংগ্রাম সিংহ যাদের পূর্বজ – বিধর্মীর হাতে তারা কি ভাবে কন্যা সম্প্রদান করবে?দেহে প্রাণ থাকতে কেমন ভাবে স্বীকার করবে অন্যের বশ্যতা ?
মেবারের অবস্থা তাই টালমাটাল।কোষাগার শূন্যপ্রায়।বেতন না পেয়ে মারাঠা সৈন্যেরা লুট করেছে চিতোর।জলাভাবে কৃষিকাজও ব্যাহত বেশ কয়বছর।দাদা দ্বিতীয় হাম্বীর সিংহ মাত্র ১৬ বছর বয়সে মারা গেলেন হাতে রাইফেল ফেটে গিয়ে।দশ বছরের ভীমের কাঁধে রাতারাতি উঠল মেবার শাসনের গুরুভার।তারপর বেশ কয়েকবছর পর,প্রায় বালকবয়স থেকে দায়িত্বের ভারে পিষ্ট হতে হতে রানা যখন অন্তরে-বাহিরে শুকিয়ে গেছিলেন, তখনি একঝলক টাটকা বাতাসের মতন জ্যেষ্ঠা রাজকুমারী কৃষ্ণার জন্ম।টালমাটাল রাজ্যে বহু দিন পর বেজে উঠল শঙ্খ।প্রথম সন্তান! কন্যা যদিও, পরগোত্র হয় যাবে, তবু সন্তান! ভীম সিংহ মেয়ের কোনো অভাব রাখলেন না। কুমারীকে রাজপরিবারের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে নিযুক্ত হলো শিক্ষক।তিনি অসামান্যা সুন্দরী, দিনে দিনে বিকাশ ঘটতে লাগলো গুণের, কুমারী পারদর্শিনী হয়ে উঠতে লাগলেন নানা বিদ্যাতেও।কন্যার পঞ্চম বর্ষে মহারাণা তাঁর বিবাহ স্থির করলেন মারবার নৃপতির সঙ্গে।প্রসঙ্গত, এঁর নামও ভীম সিংহ।কন্যার উচিত ঘর-বর মিলেছে,কুলগুরু আশীর্বাদ করে বললেন- ‘রাজ-যোটক’।মাতাপিতার মনে সুখের অন্ত নেই।তারপর হঠাৎ বিনামেঘে বজ্রপাত!তিন বৎসর পরে এক সন্ধ্যায় সংবাদ এল– ইহলোক ত্যাগ করেছেন মারবাররাজ।লুনী নদীর তীরে ভস্মীভূত হয়ে গেছে তাঁর নশ্বর দেহ।সহমরণে গেছেন তাঁর স্ত্রীরা ।।
খবর যখন এল– নবম বর্ষীয়া কৃষ্ণা তখন সঙ্গিনীদের সাথে পুতুলের সংসার পেতেছে।‘পুতুলের সংসারই বটে!’মহারাণা কন্যার মুখের দিকে চাইতে পারেন না।নিঃশ্বাস ফেলে ভাবেন– ‘সত্য সংসারে আর প্রবেশাধিকার রইল না কুমারীর।‘ বাগদত্তা কন্যার পতিনাশ– লগ্নভ্রষ্টা হওয়ার সামিল।বৈধব্য যাতনার থেকে কোন অংশে কম নয় এই দাহ।সর্বোপরি– এই সর্বনাশের ফলে তাঁর তনয়া তথা মেবারের রাজদুহিতা অশুভ বলে চিণ্হিত হবে বিশ্বের দরবারে।মেবারের অদৃষ্টে এত বড় অসম্মান, শিশোদিয়া বংশের এতবড় অপমান আর কি কখনও ক্ষয় হবে?
ক্ষয় হল।।এত বড় দুষ্টগ্রহেরও ক্ষয় হল।এ যে কোন ঐশী শক্তির মহিমা,কুমারী কৃষ্ণা যে দেবীর আশীর্বাদধন্যা– এ ব্যাপারে আর সন্দেহ রইল না কারোর।নইলে কে কবে শুনেছে– এমন ঘটনার পরও যোগ্য পাত্র স্বয়ং কন্যার পাণি প্রার্থনা করে?এ ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে,গত রাত্রে মহারাণার কাছে কৃষ্ণাকে বিবাহ করার অনুমতি চেয়ে পাঠিয়েছেন অম্বর-অধিপতি,তরুণ রাজা জগৎ সিংহ।
ভোর না হতেই তাই রাজ্যে জেগেছে উৎসবের হিল্লোল।মহারাজ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সকাল থেকে করছেন সারাদিনব্যাপী দরিদ্র-নারায়ণ সেবা।মহারাণী চলেছেন মন্দিরে, অর্ঘ্য-থালা হাতে,আর সন্ধ্যার অবসরে,প্রদীপ জ্বালিয়ে রাজকুমারী বসেছেন বেণী-বয়ন করতে।ললাটে স্বেদবিন্দু,কপোলে রক্তিমাভা, পরনে রক্ত-চিনাংশুক– প্রদীপের আলোয় মনে হচ্ছে দর্পণের ভিতর থেকে যেন স্বয়ং দ্বাপরযুগের কৃষ্ণা,স্বয়ম্বরের পূর্ব্-রাত্রের সমস্ত লজ্জা অঙ্গে মেখে চেয়ে রয়েছেন অপলকে।কানের কাছে সত্যভামা চুপি চুপি গান করছে–
“ক্ষেত্রি কুলে আছে এ যতেক সভাজন
যে বিন্ধিব মোর ভগ্নী করিব বরণ
ভূপতি হউক নহু নাহিক বিচার
লভিবেক কৃষ্ণা লক্ষ্য বিন্ধে শক্তি যার-“
------------------- ২ -------------------
আকাশে চাঁদ উঠেছে।প্রাসাদের এই কক্ষ থেকে নীচের বাগিচা দেখা যায় না যদিও,তবু গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।গ্রীষ্মের ফুলের গন্ধ।যুবরাজের আজিকার শয্যাসঙ্গিনী শয্যাপার্শ্বে নিদ্রিতা- ষোড়শী,সুন্দরী,তন্বী।।
যুবরাজ নয়,মহারাজ!আপনমনেই হেসে ফেলেন বিংশতি-বর্ষীয় জগৎ সিংহ।পিতা,মহারাজা সোয়াই প্রতাপ সিংহ স্বর্গারোহণ করবার পর প্রায় ৩ বৎসর হতে চলল তিনি সিংহাসনে বসেছেন।তবু মাঝেমধ্যে ভুল হয়ে যায়।
শয্যা ত্যাগ করে তরুণ রাজা কক্ষ-সংলগ্ন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।জ্যোৎস্নায় চরাচর ভেসে যাচ্ছে।মৃদুগলায় গুনগুনিয়ে ওঠেন-"তুম ভায়ে চান্দা/মায় ভয়ে চকোরী যো/ তুম টোডো পিয়া..." জগৎ সিংহ স্বভাবতই ভাবপ্রবণ– সঙ্গীত –শিল্পকলা প্রভৃতির অনুরাগী।এ জিনিস তাঁর রক্তে আছে।প্রতাপ সিংহ স্বয়ং কবি ছিলেন; ব্রজনিধি ছদ্মনামে তিনি বহু কবিতা রচনা করেছেন একসময়।
আজ শুক্ল পক্ষের ত্রয়োদশী।সমস্ত চরাচর ভেসে যাচ্ছে জ্যোৎস্নায়। রাত্রির মৃদুমন্দ বাতাসে জুড়িয়ে যাচ্ছে দেহ। সুস্পষ্ট,ঈষৎ হলুদ চন্দ্রের দিকে চেয়ে কেমন যেন বিমনা হয়ে যান কুমার।শুক্লপক্ষেই তিনি ‘কৃষ্ণা’ কে আহ্বান জানিয়েছেন– বিবাহ প্রস্তাব পাঠিয়েছেন মেবার কুমারী কৃষ্ণাকে।।
লোকে বলে তার দু চোখ নাকি হরিণের মতো।তার মুখে নাকি আধফোটা পদ্মের সৌন্দর্্য।কিন্তু সৌন্দর্্যের অভাব তো নেই অম্বর রাজপুরীতে- এই বিশ বৎসরের জীবনেই কত কত নারী এসেছে তাঁর শয্যায়– লাস্যময়ী,সুন্দরী,যৌবনবতী নারীরা।এই দুহাতে কত, কত না শরীর ঘেঁটে ফিরেছেন কুমার, চুম্বন করেছেন কত সুন্দর,স্ফুরিত ওষ্ঠাধর।তবু যা খুঁজেছেন– পাননি।এখনো যে নারী তাঁর শয্যায় নিদ্রিতা– তার কটিদেশ ঈর্ষণীয় রকমের কৃশ,তার দীর্ঘ আয়ত চক্ষু, তিলফুল জিনি নাসা। কিন্তু এরা সবাই কেবল ক্ষণিক আনন্দ দিতে পারে– এরা শান্তি দিতে পারে না ।
বড় অশান্তি!বড় হানাহানি চারিদিকে!পিতার দেহাবসানের সঙ্গে সঙ্গেই মারবার আর অম্বরের সখ্য হয়েছে ধূলিসাৎ।তারপর মারাঠাদের লুঠতরাজ তো এখন প্রায় নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যপার হয়ে উঠেছে।তবে দুই বৎসর পূর্বে শীতকালে– ভারত ভূখণ্ডে নবাগত শক্তি যে বণিক সম্প্রদায়– ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তাদের প্রতিনিধি লর্ড ওয়েলেস্লির সঙ্গে একখানা চুক্তি হয়েছে।সেই চুক্তি অনুযায়ী – মারাঠাদের উপদ্রব থেকে জয়পুরকে রক্ষা করবে কোম্পানি; কিন্তু সম্প্রতি আবার এক বিশ্বস্ত চর খবর পাঠিয়েছে– ওয়েলেস্লি নাকি শীঘ্রই অন্যত্র যাবেন– ইতিমধ্যে জনৈক জর্জ বারলো উপর মহলে বারবার বলে পাঠাচ্ছেন যে- দেশীয় রাজাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা কোম্পানির পক্ষে উচিত হবে না।
এত অশান্তি!এত রাজনৈতিক কূটচাল!বড় অসহায় লাগে জগতসিংহের!প্রয়োজন হলে জগৎ যুদ্ধের ময়দানে তরবারী হাতে দাঁড়াতে পারেন, রাজসভায় বসে বিচার করতে পারেন আপামর জনসাধারণের– কিন্তু এই রাজনীতির দাবাখেলাটা তাঁর আসে না।এই কয় বছরেই বড় ক্লান্ত,বড় বিদ্ধস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।জীবনটা বড্ডো ভারী লাগছে তাঁর– তাই তিনি আহ্বান জানিয়ে পাঠিয়েছেন সেই দুঃখী মেয়েটিকে– একদা জ্ঞান হবার আগেই যার বুকের উপরেও চেপেছিল পর্বতপ্রমাণ ভার– সমস্ত সমাজ যার ললাটে এঁকে দিয়েছিল কুলক্ষণার তিলক। সমস্ত রাজস্থান বলে– সেই মেয়েটির চোখ নাকি হরিণের মতন!তার মুখে নাকি আধফোটা পদ্মের মাধুর্য্য!
মাধুর্য্য! মায়াবী মাধুর্য্য! তাই কি তবে নারীর কাছে পুরুষের নিত্যকালের যাঞ্চা?হাজার সম্ভোগের অন্তরালে তবে কি চিরকাল ওই বস্তুটিরই কি খোঁজ করে ফেরে তৃষ্ণার্ত প্রেমিক পুরুষ?“কৃষ্ণা”- আনমনে নামটি উচ্চারণ করেন কুমার।“তোমার কাছে পৌঁছালেই কি ঘটবে এই সন্ধানের অন্ত?তোমার কোলে মাথা রাখলে কি আবার, সেই রাজা হওয়ার আগেকার দিনগুলোর মতন, শান্তিতে ঘুমোতে পারব আমি?”
-------------৩ ----------------
“বিশ্বাসঘাতক!” মধ্যরাত্রে ঘুম ভেঙ্গে চিৎকার করে ওঠেন মহারাজা।“বিশ্বাসঘাতক!সবাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে আমার সঙ্গে!”
মহারাজা মান সিংহ।।যোধপুরের বর্তমান মহারাজা। আজই সন্ধ্যায় ঠাকুর সোয়াই সিংহ চিঠি পাঠিয়েছে – সেই ঠাকুর সিংহ; পোখরানের সেই বিদ্রোহী সামন্ত রাজা- যাকে তিনি স্বয়ং এই কয়েকদিন আগে নির্বাসনদণ্ড দিয়েছিলেন,মারবারের সীমান্ত আজও যার কাছে বধ্যভূমি! সেই কৃমিকীট বিশ্বাসঘাতকটাও আজ তাঁকে নিয়ে মস্করা করার স্পর্ধা দেখায়!চিঠির অক্ষরগুলো বিষাক্ত তিরের ফলার মতন এখনও তাঁকে দংশন করে চলেছে।ধিক ধিক ধিক!ধিক বাহুবল!ধিক ক্ষত্রিয় জন্ম!ধিক এই রাজসিংহাসনে!
মান সিংহ সজোরে মুষ্ট্যাঘাত করেন দেওয়ালে।শিশুকাল থেকেই তাঁর মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে অন্যরা।এই যে ২১ বছর বয়সে তিনি মহারাজা হয়েছেন,এ রাজপদ তো বহু পূর্বেই তাঁর প্রাপ্য ছিল!প্রাক্তন মহারাজ বিজয় সিংহ– তাঁর নাতিদের মধ্যে মানকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। কিন্তু কি হল?ঠাকুরদা চোখ বুজতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল শেয়াল-শকুনের দল।পিতৃব্য-পুত্র ভীম অতর্কিত আক্রমণে,এতটুকু প্রস্তুতির অবকাশ না দিয়ে,অধিকার করে নিল সিংহাসন।হায় রে অদৃষ্ট!গতদিবসে যিনি ছিলেন যুবরাজ;পরদিন তাঁকেই সামান্য সামন্ত-রাজার মতন পালিয়ে আসতে হল জালোরে! সেখানে,প্রকৃতপক্ষে এ কবছর স্বেচ্ছা বন্দী জীবন যাপন করেছেন তিনি|প্রতি মুহূর্তে ভয়– এই বুঝি ভীম-নিযুক্ত গুপ্ত ঘাতক হত্যা করল তাঁকে!বিশ্বাস ঘাতক কৃমিকীটের দল সব!
মাড়বার রাজ্যের স্বাধীনতা নিয়েও নাকি ব্যবসা করেছে ওই পাষণ্ড।ম্লেচ্ছ বণিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আপোষ করেছে! ছিঃ ছিঃ। রাজা হয়েই মান ও চুক্তি ভেঙে দিয়েছেন।মোগল অবধি তাও মানা যায় – তা বলে বিধর্মী বণিক সম্প্রদায়? ধিক ধিক ধিক!ধিক ক্ষাত্রতেজ!ধিক বাহুবল!
সকলে ষড়যন্ত্র করছে তাঁর বিরুদ্ধে।সব্বাই,সব্বাই চেষ্টা করছে তাঁকে হাস্যাস্পদ করবার| ঠিক লিখেছে ঠাকুর সিংহ– মেবারের রাজদুহিতা, ওই কি যেন নাম– কৃষ্ণা – হ্যাঁ-তার সঙ্গে যখন ভীমের বিবাহ স্থির হয়েছিল,তখন ভীমের অবর্তমানে সে কন্যার উপর তাঁরই প্রথম অধিকার বর্তায়।আর রাণা কি না মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছে জয়পুরের ওই অপোগণ্ডের সঙ্গে!ওই ভণ্ড বিশ্বাসঘাতকটা!কদিন আগেই ভীমের ছেলে ঢোলকারকে নকল মহারাজা তৈরী করে যোধপুরের সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিল।সমস্ত জয়পুর আর বিকানীরের সৈন্য একত্র করেও যোধপুরের এক্তা ইটও অধিকার করতে পারেনি|মোট ২ লক্ষ টাকা নজরানা দিয়ে কুকুরের মতন পালিয়েছিল শেষমেশ।মান সে উপলক্ষ্যে জয়পোল নামে একটা জয়স্তম্ভ ও নির্মাণ করিয়েছিলেন।তার রং এখনো ফিকে হয়নি!আর এরমধ্যেই এতো সাহস বেড়ে গেছে জয়সিংহের!আর রাণারও আক্কেল বলিহারি। তাকে কন্যা দেওয়া তো ইছছাপূর্বক মান সিংহ কে অপমান!এত বড় সাহস, ঠাকুর সিংহ তাঁকে লিখেছে– ঘুঙ্গুর পরে বৌদির বিবাহে নাচ দেখিয়ে আসতে।উফ!
না না না।আর সহ্য করবেন না তিনি।কালই তিনি মেবারে বিবাহ প্রস্তাব পাঠাবেন।রাণা মানে তো ভালো– নইলে তিনি মেবারে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবেন।ইন্দোররাজ হোলকার তাঁর বন্ধু-স্থানীয়,গোয়ালিয়রের মারাঠা সিন্ধিয়াদেরও দলে নেবেন তিনি . মেবার এখন বীরশূন্য– ফাঁপা বংশ মর্যাদার অহংকার আর ইতিহাসের চর্বিতচর্বণ মাত্র সম্বল ওদের।এ অসম্মানের প্রতিকার করতে দরকার হলে তিনি দ্বিতীয় আলাউদ্দীন হবেন, শিশোদিয়া বংশে বাতি দিতে আর একজনকে ও রাখবেন না।স্থান কাল পাত্র ভুলে যুদ্ধনিনাদ করে ওঠেন মান সিংহ– “জয় ভবানী!“
---------৪ ---------
“আমি ভবানীর নামে শপথ করে তাঁকে মনে মনে পতিত্বে বরন করেছি।আর আজ এসব কি প্রসঙ্গ উঠছে?একি ছেলেখেলা?”
“ছেলেখেলা বই কি কুমারী!আমাদের মেয়েদের জীবনটাই তো একটা ছেলেখেলা।তা ছাড়া তুমি তো এখনও তাঁকে চোখে দেখনি সখী।এর আগেও তো একবার আরেকজনের সঙ্গে তোমার বিয়ের কথা উঠেছিল-“
“থাম সত্যভামা,থাম।“ রাজকুমারী বলে ওঠেন, “তখন আমার জ্ঞান বুদ্ধি হয় নি,সে একরকম। আর এই ১৫ বছর বয়স হতে চলল, দু বছর ধরে যাঁকে মনে মনে স্বামী বলে জানি- আর তাছাড়া নেহাত এতসব ঝামেলা হল,না হলে কোন মেয়েটা এতদিন আইবুড়ো থাকে বল না?“
মরুভূমির দেশে যখন ঝড় ওঠে, তখন তার রূপ হয় ভয়ংকর ।। বালিতে আচ্ছন্ন হয়ে যায় চারিদিক, ঝাপসা চোখে আপন পর চেনা যায় না– হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে মানুষ ছুটতে থাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে| বড় বড় বালি পাহাড় এক নিমেষে হাওয়ার তোড়ে অগণিত বালুকণায় রূপান্তরিত হয়ে পড়ে। ঝড় থামলে পরে তাদের অস্তিত্ব মাত্র থাকে না আর!
মেবারের ভাগ্যাকাশে এবার সেই ঝড় উঠেছে– কৃষ্ণার বিবাহ উপলক্ষ্যে । বহু শতাব্দী পূর্বে একবার এই ভারত ভূখণ্ডে আর্য্যাবর্তের সমস্ত রাজারা উন্মাদ হয়ে গেছিলেন– আরেকজন কৃষ্ণা রাজকুমারী দ্রুপদ-তনয়ার জন্য, আর এই এত শতাব্দী পরে পশ্চিম ভারতের সমস্ত প্রধান রাজারা অস্ত্রধারণের উপক্রম করেছেন ভীম-তনয়া কৃষ্ণাকে লাভের আশায়।
সেই হাহাকারটাই ঠিকরে ওঠে কুমারীর গলায় - “আমি কি দ্রৌপদী না কি ? আজ কেউ বলবেন ভীম সিংহ তোমার স্বামী;কাল ডেকে বলবেন – না না জগৎ সিংহ; পরদিন আবার বিবেচনা করতে বসবেন মান সিংহ কে নিয়ে।এখন আবার ওই দৌলত রাও সিন্ধিয়া;এত বড় আস্পর্ধা– নীচ মারাঠা হয়ে পদ্মিনীর বংশের রাজপুতানীকে অঙ্কশায়িনী করার স্বপ্ন দেখে!সেই ঘৃণ্য প্রস্তাব পাঠাবার আগে কেউ তার জিভটা কেটে নিতে পারল না? মেবার কি বীরশূন্য?এতদূর অধঃপতন ঘটেছে এ দেশের?সত্যভামা,এ কথা কানে শোনার চেয়ে আমার তো বিষ পানে আত্মহত্যা করা ভালো ছিল!”
“চুপ কর সখী। চুপ কর।“সত্যভামা কানে আঙ্গুল দেয়, “অমন কথা মুখেও এনো না।তা ছাড়া অন্যভাবে দেখলে সিন্ধিয়া কিন্তু শান্তি রক্ষা করবারই চেষ্টা করেছেন।।ভেবে দেখ, ওনার কথামত যদি তোমার এক বোনের সঙ্গে মাড়ওয়ার অধিপতি আর আরেক বোনের সঙ্গে অম্বর অধিপতির বিবাহ হয়,তবে ক্ষতিটা কোনখানে?”
“স্তব্ধ হও।।“ রাজকুমারীর গলা শুনে ভয় পেয়ে যায় সত্যভামা।এমন রূঢ় স্বর ইতিপূর্বে আর সে কখনও শোনেনি কুমারীর গলায়| “সত্যভামা!যা বোঝো না তা নিয়ে কথা বল না।তুমি বঙ্গালিনী।ও কথা তোমার মুখে মানায়| কিন্তু দেহে প্রাণ থাকতে রাজপুত কখনও শত্রুর সঙ্গে আপস করেনি,আর করবেও না।“
বস্তুতঃ গত তিন বছরে ব্যাপার ঘোরালো হয়ে উঠেছে। সিন্ধিয়া কে সঙ্গে করে জগৎ সিংহ যোধপুর যাত্রা করেছিলেন।কৃষ্ণা উপলক্ষ্য তো বটেই, তার উপর গত যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানিও অম্বরভূপের অন্তরে জাগ্রত ছিল। সিন্ধিয়ারও পাওনা বাকি ছিল যোধপুরের থেকে।অর্থমূল্যে স্বেচ্ছায় বিক্রীত হলেন মাড়ওয়ারের কয়েকজন বিদ্রোহী রাঠোড়। সবদিক থেকে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন মান সিংহ।চর মুখে খবর এল – এক ভারী বিশ্বস্ত বন্ধু নাকি নিশ্চিত আত্মহত্যা থেকে বাঁচিয়েছেন মানকে। দুজন গোপনে পালিয়ে গেছেন।আশ্রয় নিয়েছেন মেহরানগড় দুর্গে।
জয়পুর রাজস্থানের অন্তর্গত হলেও ঠিক মরুপ্রদেশ নয়।বরং ঈষৎ পাহাড় সমৃদ্ধ সমভূমিই বলা চলে তাকে।তাই সেই দুর্গম মরুদুর্গে যুদ্ধ চালাতে পারল না তারা। ছয় মাস অবরোধের পর জগৎ সিংহ দেখলেন আর বেশী দিন এভাবে থাকলে– অন্নাভাবে আর ব্যাধিতেই শেষ হয়ে যাবে তাঁর বাহিনী।শুধু হাতেই ফিরতে হল তাঁকে|
এর কিছুদিন পরেই শিবির বদল করলো সিন্ধিয়া।মান সিংহের তরফে গোয়ালিঅরের সেনাপ্রধান সরজেরাও ঘটেগে মেবারের এক সামন্ত রাজা, শাহপুরার শাসনকর্তা অমর সিংহকে আক্রমণ করে বসলেন। সেসময় ,কিছু জয়পুরগামী মেবারের রাজপ্রতিনিধি ছিল এখানে,বল-পূর্বক তাদের ফেরত পাঠানো হল উদয়পুরে।
তারপরেই এই প্রস্তাব।জগৎ সিংহ ইতিমধ্যে সৈন্যদল পাঠিয়েছেন মহারাণার সাহায্যার্থে। ভীম সিংহ নাকচ করে দিলেন সিন্ধিয়ার প্রস্তাব। সিন্ধিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল উদয়পুরে।রক্তক্ষয়কারী সঙ্গ্রামের পর– পরাজিত হল মেবার। মহারাণা বাধ্য হলেন নাথওয়াড়ার চুক্তিপত্রে সই করে সিন্ধিয়ার সঙ্গে আপস করতে।
“যে কথা বললে সত্যভামা – আর দ্বিতীয়বার যেন না শুনি । মর্যাদা হানির পূর্বে বরং প্রাণত্যাগ করা শ্রেয় - বাঙ্গালিনী – তুমি ছোট জাত – এই বংশ মর্যাদার ব্যাপারটা হয় তো ঠিক অনুধাবন করতে পারবে না –“
সত্যভামা চুপ করে মেঝের দিকে চেয়ে বসে থাকে।। এসব কথা তার কাছে নতুন নয়।। তার মা বঙ্গাল দেশ ছেড়ে এদেশে এসেছিলেন কেন ,লোকমুখে তার আভাস ইঙ্গিত সে পেয়েছে। প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলে না বটে, তবু রাজ্যের একজন গণ্যমান্য রাজপুরুষকে সে নিজেও ছেলেবেলায় কখনো সখনো তাদের বাড়ীতে আসতে দেখেছে।। মূলতঃ তাঁর অনুগ্রহেই তার রাজবাড়ীতে প্রবেশ– রাজদুহিতার সখী হিসাবে।।
কুমারী অতীতকালের গল্প বলে চলেছেন – ষোল হাজার রাজপুত মেয়ের পুড়ে মরার গল্প।।মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও –হলদীঘাটের যুদ্ধে সমগ্র মেবার সৈন্যের অসাধারণ বীরত্বের গল্প।। বহুবার – বহুজনের মুখে এসব কাহিনী অনুরণিত হয় রাজান্তঃপুরে।। সত্যভামা সেসব কথা শুনতে ভালোও বাসে।। তবে আজ কিছুতেই তার মন বসছিল না|সে অশিক্ষিতা নয়।। অত্যন্ত ছেলেবেলা থেকেই সে কুমারীর সঙ্গে থাকে – একই সঙ্গে তারা লালিত|তবু এদের ধরনধারণ সে বুঝতে পারে না। কি যে এদের এত মান আর কি যে মর্যাদা– যার জন্য কথায় কথায় সবাই প্রাণত্যাগ করছে! প্রাণ জিনিষটা বড় তুচ্ছ রাজা রাজড়াদের কাছে।ওটা দিতেও এদের বাধে না, নিতেও না।রাজকুমারী বলেন “কাপুরুষ বঙ্গালিনী”। কথাটা বোধ হয় সত্যি। এই প্রাণটুকুর জন্যই তারা মেয়ে মরদে খাটে– কেউ স্বৈরিণী হয়; কেউ দাসীবৃত্তি বা মোসাহেবী করে। এই যে সে, মুখে যতই সখী সখী বলুক- আসলে সেই মোসাহেব বই তো নয়।।সদা সর্বদা কুমারীর মন বুঝে কথা বলতে হয় তাকে। কোন সময় কোন মতের বিরোধিতা করলেই গর্বিতা রাজদুহিতার স্বর ভঙ্গিমা পালটে যায়।সে মেঝের দিকে তাকিয়ে অতি ক্ষুদ্র একটা নিঃশ্বাস ফেলে।।
হঠাৎ খেয়াল হয় – কুমারী অনেকক্ষণ কথা বলেন নি।একদৃষ্টে তার দিকেই চেয়ে আছেন।তাঁর সেই পদ্মের মত দুচোখ জলে টলটল করছে।
“বকেছি বলে রাগ করেছিস সত্য?” কুমারী এক আশ্চর্য রকম করুণ গলায় বলে ওঠেন। “কি করব বল।। মাথার ঠিক থাকে না। দেখছিস তো কি হচ্ছে চতুর্দিকে।। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে একদিনও শান্তি পেলাম না।“
সত্যভামা নীরবে উঠে দাঁড়ায়।নীরবেই আলিঙ্গন করে কুমারীকে| কোন কথা বলে না।এটাও তার কাজের অঙ্গ। কুমারীর ভাব পরিবর্তনের গভীরতাটা না বুঝে কথা বলা ঠিক হবে না। কে জানে আবার কি কথায় তাঁর মানে লেগে যাবে! কুমারী কিন্তু এবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন,”হ্যাঁ রে সত্য, আমি জানি তুই কি ভাবছিস।। কিসের এত মান মর্যাদা?তাই নারে? না না, ঘাড় নাড়িস না।। আমি জানি। আমি তোকে সত্যি উত্তর দেব দেখ। আসলে ওটুকুই তো সম্বল আমাদের– মেবারের আজ কি আছে বল? অর্থ নেই – সৈন্য নেই – বীরত্ব নেই – ধর্ম নেই – সমস্ত দেশটা ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের দিকে চলেছে। প্রতিবেশী রাজারা কেউ মানে না! প্রজাদের রক্ষা করতে পারি না! রাজপরিবারের মধ্যেই কত ব্যভিচারের প্রবেশ ঘটেছে! এর মধ্যে ওই গৌরব টুকুও যদি ছাড়ি, তবে কি নিয়ে থাকব আমরা?কি আশায় বেঁচে থাকব?”
“রাজকুমারী –“ সত্যভামা একটা মনমত জবাব দিতে চায়। রাজকুমারী শোনেন না।। আপন মনেই বলে চলেন “মর্যাদাই সব রে সত্য। এই দেখ না – এই যে এতগুলো রাজা; এতগুলো মস্ত মস্ত পুরুষমানুষ হঠাৎ আমার জন্য ক্ষেপে উঠেছে – যুদ্ধবিগ্রহ হচ্ছে ঠিকই , কিন্তু এই ব্যাপারটা , এই ব্যাপারটা কোন মেয়েটার না ভালো লাগবে বল? মিথ্যে বলব না ।। আমারও লাগত, জানিস।। এই আমিই সবার কামনার বস্তু ; এত শক্তি আমার আছে যে সমস্ত প্রতিবেশী রাজাদের ময়দানে নামিয়ে ছেড়েছি একেবারে; সবাই জান প্রাণ বাজি রেখেছে আমার জন্য – ভাবতেই কি নেশা লাগে| অহংকার হয় ! কিন্তু ভুল; নিদারুণ ভুল ! এখানেও সেই মান মর্যাদার গল্প – ওরা তো কেউ আমাকে চায় না ।। ওরা চায় মেবারদুহিতাকে, শিশোদিয়া বংশের রাজপুতানীকে । বুঝলি না – এই পরিচয়টা না থাকলে আমার দিকে কেউ ফিরেও চাইত না; পথের পাশে ফেলে যেত সবাই!এই পরিচয়টা ছাড়া যে আমি ভিখারিণী! এতবড় লোভ আমি কি করে সম্বরণ করব ?” মদগর্বিতা, উদ্ধত কুমারী কৃষ্ণা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে প্রায় ছুটে বেরিয়ে যান ঘর থেকে। সত্যভামা নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকে।।
-----------৫----------------
রাজকুমারী সেইদিন অমনভাবে উঠে যাওয়ার পর, আরও একবছর কেটে গেছে।। আজ শেষ রাত্রে প্রাসাদের খোলা ছাদে কুমারী কৃষ্ণা একলা দাঁড়িয়েছিলেন।। রাজস্থানের অধিকাংশ প্রাসাদের মতনই উদয়পুর দুর্গও পাহাড়ের উপর অবস্থিত।।ছাদে এসে দাঁড়ালে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় ।।
রাজদুহিতা তাঁর সুন্দর কোমল চক্ষুদুটি মেলে দেখছিলেন চারিধার| একদিকে পিছোলা দীঘি, অন্যদিকে জলমহল আর জগদীশ-মন্দির।।
ওই জলমহলে মেবারের মহারাণারা সূর্য-উপাসনা করতে যেতেন| ছেলেবেলায় কৃষ্ণাও গেছেন কখনো সখনো ভাই-বোনেদের সঙ্গে।। সূর্যের প্রথম আলো যখন প্রবেশ করে রাঙ্গিয়ে দিতে জল মহলের সাদা-কালো দেওয়ালগুলো – কি অদ্ভুত আনন্দ হত মনে। সে বয়সে ও আনন্দটা কিসের এবং কেন – এসব ভেবে দেখার ইচ্ছে করত না আদৌও। কেবল একটা নরম ভালোলাগার উত্তাপ ছড়িয়ে থাকত সারাটা দিনের সমস্ত কাজে।
কবে থেকে মেবারে আর সূর্য ওঠে না? যুদ্ধে যুদ্ধে দেশটা ছারখার হয়ে গেল।। জগৎসিংহ, মানসিংহ, সিন্ধিয়া, হোলকার – হ্যাঁ ইন্দোররাজ যশবন্ত রাও হোলকার ও নেমে পড়েছেন ময়দানে। তিনি রাণাকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন যে মান বা জগৎ কারো সাথেই কৃষ্ণার বিবাহ না দিতে।। উপরন্তু মান সিংহের এক বোনকে বিবাহ করুন জগৎ।। জগৎ সে প্রস্তাবে রাজী হন নি।। আপাতঃ আত্মভোলা ছেলেমানুষ অম্বররাজ কিভাবে যেন হঠাৎ ভয়ানকরকম রাজনীতিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। মূলত তার কূটকৌশলেই, হোলকার চুক্তিপত্রে সই করেছিলেন যে তিনি এ বিবাহের ব্যাপারে কথা বলবেন না আর – জয়পুরকেও রক্ষা করবেন সিন্ধিয়া আঘাত হানলে।জগৎ সিংহ সিন্ধিয়াকেও ক্রয় করে ফেলেছেন এক কোটী তঙ্কায়।। বিকানীরের সুরাট সিংহ আর টোকের আমীর খানও তাঁর পক্ষে নাম লিখিয়েছেন।।
কৃষ্ণার বোনেদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে।।ভাইরা এখন জোয়ান মরদ।।কৃষ্ণার বাবা সারাক্ষণ মন্ত্রীদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে বসে থাকেন।।পরামর্শ চলে অহরহ। যুদ্ধের পরামর্শ।। কৃষ্ণার মায়ের ললাটে বলিরেখাগুলো বড় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আজকাল।। মহারাণী সর্বক্ষণ দেবতার দয়া ভিক্ষা করেন।। তাঁর বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে ।। রাজবাড়ীর অন্য পুরন্ধ্রীরা , এমনকি পিসী চাঁদবাঈও কৃষ্ণাকে এড়িয়ে চলে আজকাল। যুবতী রাজদুহিতা একা একা প্রেতের মতন এ ঘর ও ঘর করেন। প্রতিমুহূর্তে মনে হয় এতদিনে তাঁর অন্য কোন সংসারে থাকবার কথা – এ গৃহে আর তাঁর অধিকার নেই ; এ স্থানটুকু তিনি জবরদখল করে বসে আছেন। সত্যভামার কথা মনে পড়ে – সে একবার কথাপ্রসঙ্গে বলেছিল বঙ্গালদেশে নাকি নিয়ম আছে যে বেলগাছ কাটতে নেই ।। তিনি যেন সেই গৃহস্থের শয়ন গৃহের দেওয়ালে জন্ম নেওয়া বেলগাছ – কাটাও চলে না – আবার রাখলেও বিপদ।। শিকড় ছড়িয়ে ছড়িয়ে ঘরের দেওয়ালটাই ভেঙ্গে ফেলে দেবে একদিন।।
প্রাকারের গায়ে সস্নেহে হাত বুলোন বোলান কুমারী।। জরাজীর্ণ অবস্থা। কতকাল মেরামত করা হয়নি। হবেই বা কি করে ? কোষাগারে অর্থ নেই।।কদিন আগেই সিন্ধিয়া দল পালটে ছারখার করে দিয়েছে জয়পুর আর উদয়পুর।হোলকার এখন নিঃস্পৃহ দর্শক। ভীম সিংহ শেষ অবধি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছেও সাহায্যের আবেদন করেছিলেন । তারা বলে পাঠিয়েছে কে এক নেপোলিয়নকে নিয়ে তারা এ মুহূর্তে বড়ই বিব্রত – তাদের পক্ষে কিছু করা এখন সম্ভব নয়।
ভোরের আলো ফুটছে ধীরে ধীরে।। ওই তো সোনারঙের রোদ ছড়িয়ে পড়ল পূর্ব দিকের গাঁ গুলোতে ।। ওসব গ্রাম এখন সুপ্ত।। কি নিশ্চিন্ত ওদের জীবন ! সত্যভামার মুখে ওদের কথা শুনেছেন কুমারী- ওখানকার মেয়েরা চারক্রোশ পথ হেঁটে কুয়ো থেকে জল আনে ঘড়ায় করে, ঘর নিকোয় , জ্বালানি সংগ্রহ করে , শিশুকে আগলায় , মরদের প্রহার সহ্য করে; আবার রাত্রে সেই অত্যাচারী স্বামীকেই পরম যত্নে বসে খাওয়ায় – মোটা মোটা বাজরার রুটি আর তেঁতুলের চাটনি।। কোন কোন দিন গৃহিণীর জন্য আর কিছুই পড়ে থাকে না।
একসময় এই অবমাননার কথা শুনলে ঘৃণায় রাগে গা রী রী করত কৃষ্ণার।। আজ তাঁর হিংসা হয় - মনে হয় আহা ওরা কেমন সুখে আছে! তিনিও যদি রাজদুহিতা না হয়ে,কৃষ্ণা না হয়ে, এক সামান্যা গ্রাম্য বধূ হতেন-
ওদের অন্ন নেই, বস্ত্র নেই , জল নেই , অর্থ নেই – তার উপর যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে কর চাপানো হয়েছে নতুন ।। কিন্তু কেন নেই? ভেবে দেখলে সেও তো তাঁর জন্যই ।। কার জন্য আজ মেবারের এই সর্বনাশ?
আমীর খান আবার শিবির বদল করেছে।। কর চেয়ে পাঠিয়েছে মেবার আর অম্বরে।। এর মধ্যে আবার উদয়পুরের সামন্ত রাজেদের মধ্যে বেধেছে অন্তর্দ্বন্দ্ব । রাণা সামলাতে পারছেন না এতদিক। সেই সুযোগে ক্ষমতালিপ্সু রাজপুরুষেরা ফণা তুলেছে। তাঁর জন্য কি মেবারের স্বাধীনতা সূর্য এবার অস্তমিত হবে ! এই এত বছরের বুক দিয়ে রক্ষা করা স্বাধীনতা! সহস্র বীরের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা! গত কয়েক বছরের যুদ্ধে অধিকাংশ সৈন্য হত। উদয়পুর ও জয়পুরের কোষাগার শূন্যপ্রায় ।কার জন্য এই ক্ষয়, এই ধ্বংস? আচ্ছা, ওরা তাকে অভিশাপ দেবে না? ওই সব সৈনিকের পরিবার? ওই গ্রামবাসীরা? তাঁর নিজের পরিজনেরা?
কৃষ্ণা হেসে ফেলেন উন্মাদিনীর মত| নিজের নামটা বড় পছন্দ ছিল তাঁর। সেটা যে এমন অভ্রান্ত ভাবে ফলে যাবে কে জানত! মায়ের কাছে গল্প শুনেছিলেন – কুরুকুল ধ্বংসের জন্য জন্ম হয়েছিল যাজ্ঞসেনীর ।। কৃষ্ণাও তেমন মরুভূমির প্রেতিনীর মতন ভাবী শ্বশুরকুল ও পিতৃকুলের সমস্ত প্রাণ-রস পান করে চলেছেন অনবরত। রক্ত দিতে দিতে রক্ত নিঃশেষ হয়ে আসছে– তবু তৃষ্ণা মিটছে না। মর্যাদা মূল্যায়নের এই মহাযুদ্ধের শেষে তিনিও কি এক মহাশ্মশানের সম্রাজ্ঞী হবেন?
ঊষার আলো আজ বড় উজ্জ্বল। গ্রামগুলোর চালে সোনা রঙের সঙ্গে লালিমার আভাস। কিন্তু সহসা ও কি হল?ও কিসের শব্দ? অমন একটা সমবেত কোলাহল ভেসে আসছে কেন? এতদূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা, তবু মনে হচ্ছে যেন অনেক মানুষ সমস্বরে আর্তনাদ করে চলেছে !
লালটাও ঠিক স্বাভাবিক নয়। ওই যে কালো ধোঁয়া আকাশটা ছেয়ে ফেলেছে! আগুন, আগুন লেগেছে! পুর্ব্ দিকের গ্রামগুলোতে আগুন লেগে গেছে কোনভাবে । এখুনি কাউকে খবর দেওয়া দরকার!
কৃষ্ণা নীচে নামতে যাবেন, এমন সময় সত্যভামা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে প্রণাম করে – “রাজকুমারী,নীচে চল। মহারাজ তোমাকে এখুনি ডেকে পাঠিয়েছেন ।“
-----------৬----------------
ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ান কৃষ্ণা । কই, বাবা ত নেই ঘরে! বিশাল ঘরখানার একপ্রান্তে কেবল একলা বিষণ্ণ মুখে মেঝের দিকে চেয়ে বসে রয়েছেন মহারাজ দৌলত সিংহ, করজৌলির মহারাজা। কৃষ্ণা এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করেন। দৌলত সম্পর্কে তাঁর পিতৃব্য; ৪ পুরুষ আগে মহারাণা ভীমের আর দৌলতের পূর্বজ ছিলেন একই ব্যক্তি। এই জ্ঞাতি কাকাটি্র সঙ্গে দেখা হয় না বড় একটা, তবু কৃষ্ণা তাঁকে বেশ ভালবাসেন ।।
দৌলত কৃষ্ণার মাথায় হাত রাখেন । কথা বলেন না কোন । কৃষ্ণা বিস্মিত হন ।। হেসে জিজ্ঞাসা করেন – “কই, আমায় আশীর্বাদ করলেন না কাকাজী? প্রতিবারের মত বললেন না তো, চিরায়ুষ্মতী হও?”
দৌলত সিংহ মুখ তুলে তাকান।। কৃষ্ণা এতক্ষণে দেখতে পায় – তাঁর দু চোখ আস্বাভাবিক রকমের রক্তাভ। মাথার চুল উসকোখুসকো। মুখে রাত্রি জাগরণের সুস্পষ্ট ছাপ। আরও একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার – মহারাজের গা থেকে কিরকম হালকা একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। মদ্যপ অবস্থায় কখনো তো রাজসকাশে আসেন না কাকামশাই!
“কি হয়েছে কাকাজী? আবার নতুন কোন অঘটন?” দৌলতের হাঁটু আঁকড়ে তাঁর পায়ের কাছে উপবেশন করেন কৃষ্ণা ।
সে স্পর্শে অকস্মাৎ থরথর করে কেঁপে ওঠেন দৌলত সিংহ।। কৃষ্ণা আজ ষোল বৎসরের যুবতী ।। সাক্ষাৎ দেবীপ্রতিমার মতন স্নিগ্ধ কমনীয় মূর্তি।তবে এ মেয়েকে তিনি জন্মাতেও দেখেছেন।। রাণার প্রথম সন্তানপ্রাপ্তির উৎসবে তিনিও ছিলেন আমন্ত্রিত।মোমের মতন নরম হাত পা ছিল শিশুটির।। ফোলা ফোলা গাল । থ্যাবড়া নাক।। তখনো তার চোখ ফোটেনি , ছোট্ট একখানা দোলনায় ঘুমোচ্ছিল সে। দৌলত নিজেও প্রায় কিশোর তখন। সদ্যোজাতর ছোট্ট নরম হাতখানা স্পর্শ করতে ঘুমন্ত অবস্থায়ই সে মুঠো করে ধরেছিল তাঁর তর্জনী।
“যে জিহ্বা এ আজ্ঞা দেয় – ধিক তাকে ।। এ কাজ না করলে যদি আমি বিশ্বাসের মূল্য না রাখতে পারি - তবে আমি বিশ্বাসঘাতক।। ভেঙ্গে যাক করজৌলির আনুগত্য।“ বিড়বিড় করে ওঠেন দৌলত।
“ কি বলছেন কাকাজী ? একটু জোরে বলুন, শুনতে পাচ্ছিনা।“ কৃষ্ণা জিজ্ঞাসা করে ।
“কিছু না, কিছু না।“ দৌলত সিংহ উঠে দাঁড়ান ।। কৃষ্ণার মাথায় আরেকবার হাত রেখে অস্ফুটে কি বলেন। তারপর দ্রুতপদে বেরিয়ে গিয়ে সোজা করজৌলির উদ্দেশে ঘোড়া ছুটিয়ে দেন|।
------------৭---------------
“পিতা, পিতা ।।“ বন্ধ দরজায় করাঘাত করে চলেছেন কৃষ্ণা ।। “একবার, কেবল একবার দরজা খুলুন।। নিজমুখে আমায় বলুন এ আদেশ আপনার। পিতা!” রুদ্ধ কপাটে মাথা ঠুকছেন মহারাণী আরশাজবদ ।। “দয়া কর । ওগো দয়া কর আমায় ।। দয়া কর তুমি! এ কথা – যে কথা শুনতেও পাপ – শুনলে গায়ের রক্ত জল হয়ে যায় – সে আদেশ, এ মহাপাপের আদেশ প্রত্যাহার কর তুমি!“ রুদ্ধ কপাট অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে , অন্তরাল থেকে ভেসে আসছে না কোন শব্দ ।।
“কেন পিতা, কেন ? কি অপরাধ করেছি আমি ?” ডাকতে ডাকতে কুমারীর গলা ভেঙ্গে যাচ্ছে, মহারাণীর কপালে রুধিরের রেখা। তবু দরজা খুলছে না।।
“কৃষ্ণা!” চমকে ফিরে তাকায় রাজকুমারী ।। পিসী চাঁদ বাঈ যেন কখন অতর্কিতে এসে দাঁড়িয়েছেন পিছনে। “কৃষ্ণা,মহারাজকে ছেড়ে দে। আমার সঙ্গে আয়। আমি তোকে বলছি কি হয়েছে ।“
কাকাজী অমন ভাবে বিদায় নেওয়ার পরই কৃষ্ণার মনটা খারাপ।। সে এসে বসেছিল মায়ের কাছে।।বহুদিন পরে মা-মেয়েতে কথা হচ্ছিল। এমন সময় ঘরে ঢুকল জয়ানদাস। কৃষ্ণার সহোদর ভাই। এগিয়ে এসে, কেউ কিছু বোঝবার আগেই, কৃষ্ণার বুকে ঠেকাল একখানা ছুরি। ছোট্ট অথচ ক্ষুরধার।। কৃষ্ণা চেয়ে রইল অবাক বিস্ময়ে ।। মহারাণীও স্তম্ভিতা ।। নড়াচড়া করতেও যেন ভুলে গেছেন সবাই।।
সে অবস্থায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল জয়ান। অতঃপর একসময় তার হাত থেকে স্খলিত হয়ে ছুরিখানা পড়ে গেল নীচে। অবরুদ্ধ স্বরে রাজপুত্র বলে উঠলেন – “পারব না । পারব না আমি।।“
কৃষ্ণা ব্যথাতুর হেসে জিজ্ঞাসা করেন – “তুই আমায় মারতে চাস ভাইয়া? কেন ভাই?” জয়ানদাস সবলে আলিঙ্গন করে ভগ্নীকে। দিদির চুলে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে ওঠে – “পিতৃ আদেশ!”
তাঁর পরেই এই দৃশ্যের অবতারণা। এক দণ্ড কাল ধরে পিতার কক্ষের দরজা খোলাতে পারেনি কৃষ্ণা ।। পিতার কাছ থেকে উত্তর মেলেনি –“কি এই আদেশের তাৎপর্য্য ? কতদূর এর সত্যতা?”
মহারাণী এখনও রাণার দুয়ারে কড়া নেড়ে চলেছেন।। চাঁদ বাঈ কৃষ্ণাকে এনে বসান একখানি ঘরে।। দরজাটা আস্তে আস্তে বন্ধ করে দেন। ক্ষণকাল চুপ করে থেকে তারপর বলেন – “আজ সকালে গাঁয়ে আগুন লাগার ঘটনা তুইই প্রথম দেখেছিস না?” কৃষ্ণা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে । “ও আগুন কে লাগিয়েছিল জানিস ? আমীর খান পিণ্ডারী। টোঁকের নবাব । মেবারের সর্বত্রই আজ এই আগুন। আর এ আগুন নেভাতে পারে একমাত্র একজন। সে হচ্ছিস তুই। কৃষ্ণা, মেবার না তোর মাতৃভূমি ?“
“পিসী – আপনি আমাকে বলুন কি করতে হবে ! “ কৃষ্ণা ব্যাকুল স্বরে জিজ্ঞাসা করে। “মেবারের জন্য আমি প্রাণ অবধি দিতে পারি। কিন্তু তাঁর সাথে পিতার এ আদেশের …” বলতে বলতেই স্তব্ধ হয়ে যায় রসনা। সহসা বিদ্যুৎচমকের মতন এ ভীষণ আদেশের অর্থ বোধগম্য হয় কৃষ্ণার । স্পষ্ট হয়ে যায় সবটুকু। কণ্টকিত হয়ে ওঠে সারা দেহ । কাঁপতে কাঁপতে সে চাঁদ বাঈয়ের দিকে তাকায়।দেখে, তিনিও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার দিকে।
“আমীর খান বলে পাঠিয়েছে মান সিংহের সঙ্গে তোর বিয়ে হয় তো ভালো, নইলে সে মেবার শ্মশান করে দেবে। রাঠোররা আমাদের চেয়ে বংশমর্যাদায় ছোট ।সবই তো জানিস। তুই- প্রতাপসিংহ, পদ্মিনীর বংশের মেয়ে । তোকে আর কি বলব!” চাঁদ বাঈ ফিসফিস করে ওঠেন –“তোর বেঁচে থাকার অর্থ এখন হয় কুলমর্যাদানাশ বা মেবারের স্বাধীনতানাশ।“
কৃষ্ণা ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ে– “কবে ? কখন?”। “এখুনি “ জলদগম্ভীর স্বরে ভেসে আসে উত্তর।
আজ? এখুনি?? এই তার ষোল বছর বয়স। আর সে প্রভাতের সূর্য দেখতে পাবে না ? খোঁপায় বেলফুলের মালা জড়াতে পারবে না? সন্ধ্যায় পিছোলা দীঘির পিছল ঘাটে পা ডোবাতে পারবে না ? রামায়ণ কথকতা শুনতে পাবে না? এখনো তো সে জানেনা ভালোবাসতে কেমন লাগে ঠিক! এখনও জানেনা কেমন হয় প্রিয়তম পুরুষের প্রথম স্পর্শ! আর কাল থেকে এ প্রাসাদে জলে-স্থলে-আকাশে-বাতাসে কোথাও সে নেই?
“একবার মা-বাবাকে প্রণাম করে আসি?” অস্ফুটে বলেন কুমারী।
“না । কারও সাথে দেখা করিস না আর।“ চাঁদ বাঈ অবিচলিতা।সস্নেহ স্বরে বলেন– “ এ সময়ে পৃথিবীকে বড় সুন্দর মনে হয়। কোন দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিস না।“ চাঁদ বাঈ বাড়িয়ে ধরেন একখানা সুদৃশ্য স্বর্ণ-ভৃঙ্গার।। তাতে পিছোলা দীঘির জলের মতন টলটলে নীল তরল ভরা! গরলাধার!
একমুহূর্ত ইতস্তত করে কৃষ্ণা তা গ্রহণ করে।তারপর একচুমুকে নিঃশেষ করে ফেলে পাত্রটা।
মহারাণী যখন খবর পেয়ে আলুথালু বেশে আর্তনাদ করতে করতে যখন এসে পৌঁছলেন, তখন কৃষ্ণার গাত্রবর্ণ নীল হয়ে গেছে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা ।তিন পেয়ালা হলাহল পান করেও সে এখনো অবধি জীবিতা। নবীন প্রাণ কিছুতেই পরিত্যাগ করতে চাইছে না স্ফুটনোন্মুখ তনুকে।।
এভাবে আরো দণ্ড কয়েক চলতে পারে ।প্রস্তুত হচ্ছে আরও কয়েক ভৃঙ্গার বিষ।। মহারাণী কন্যার অবস্থা দেখে আর কারও কাছে কিছু বললেন না। সকলকে সরিয়ে নিজে কন্যার মাথা তুলে নিলেন অঙ্কে, পিপাসার্ত ওষ্ঠাধরে ঢেলে দিলেন – কুসুম্বা !! রাজবাড়ীর সমস্ত আফিম সঞ্চিত করে প্রস্তুত করা সরবত!
মায়ের স্পর্শ পেয়ে কৃষ্ণা একবার মাত্র চোখ খোলবার চেষ্টা করেছিল। একবার কেবল বলে উঠেছিল –“মেবারের স্বাধীনতা অক্ষয় হোক ।।“ আরও কিছু বলতে চেয়েছিল সে – তবে জিভ তখন তার জড়িয়ে গিয়েছে।।
এরপরই,দেহের ধমনীতে প্রবাহিত রাজকীয় মর্যাদাপূর্ণ সমস্ত শিশোদিয়া রক্ত একবার ছুটে এল তার কপোলে; বিবাহ রাত্রির রক্তবাসের মতন – রাঙ্গিয়ে দিয়ে গেল তার আনন। মুদিত নেত্রে একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কৃষ্ণা। তারপরই ধীরে ধীরে সমস্ত মুখখানা হয়ে পড়ল ছাইয়ের মতন সাদা আর বরফের মতন শীতল।।
------------------৮-------------------
রাজকুমারী কৃষ্ণার গল্প এখানেই শেষ।।তবে উপসংহার আর একটু আছে ।।
কৃষ্ণা মৃত্যুর আট বছর পর, ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে, মেবার কোম্পানীর বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। সন্ধির শর্ত অনুযায়ী :-
১।) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী রক্ষা করবে মেবারের সীমান্ত। তাদের অনুমতি ব্যতিরেকে অন্য কোন রাজ্যের সঙ্গে কোনরূপ সম্পর্কে আবদ্ধ হতে পারবেন না মহারাণা।
২।) মেবারের আয়ের এক চতুর্থাংশ কর ৫ বছর ধরে পাবেন কোম্পানী-বাহাদুর। তারপর বছর বছর তারা মেবারের আয়ের তিন–অষ্টমাংশ পেতে থাকবেন।।
৩) মেবার ব্রিটিশ কোম্পানীর সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করবে সর্বতোভাবে। আর সেই আনুগত্য ও বিশ্স্বস্ততার পুরস্কার হিসেবে; সরকারের পক্ষে সুপ্রাচীন শিশোদিয়া বংশকে মর্যাদা দিতে মেবারপতির জন্য বরাদ্দ করা হল ১৯ খানা গান স্যালুট!
একটি দেশের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার মূল্য, একটি বংশের বিপুল মর্যাদা আর কুলগৌরবের মুল্য- মোট ১৯ খানা গান স্যালুট।
যোধপুরের মান সিংহ ও দৌলতরাও সিন্ধিয়া ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে সন্ধি করেন কোম্পানীর সঙ্গে। সে বছরই, অর্থাৎ ১৮১৮ খৃষ্টাব্দের ২১শে নভেম্বর – ২১জন রাণী ও ২৪ জন রক্ষিতাকে বিষাদসাগরে ভাসিয়ে অম্বরের সোয়াই রাজা জগৎ সিংহ স্বর্গারোহণ করেন ।
x---------------------------x
কৈফিয়ত
১। কাহিনীটি ইতিহাস আশ্রিত। সজ্ঞানে ইতিহাসকে কোথাও অতিক্রম করিনি। তবে কাহিনীর স্বার্থে কিছু যুদ্ধের সময়কাল সামান্য অদলবদল করা হয়েছে।
২। কাহিনীতে বর্ণিত সকল চরিত্রই ঐতিহাসিক। কেবলমাত্র সত্যভামা লেখিকার কল্পনাপ্রসূত।
৩। ঐতিহাসিক সমস্ত দলিল ইংরিজিতে। সেখানে এই উপাখ্যানের নায়িকার নাম krishna kumari - যা কিনা বাংলায় কৃষ্ণা-কুমারী বা কৃষ্ণ-কুমারী উভয়ই হওয়া সম্ভব। গল্পের স্বার্থে এক্ষেত্রে কৃষ্ণা কুমারী নামটিই বহাল রেখেছি।
তথ্যসূত্র
Annals and antiquities of rajasthan- James Todd
The Zenana -Letitia Elizabeth Landon
The Three Moons- Elizabeth Bruce Elton Smith
The Making of the Indian Princess- Edward Thompson
মহাভারত- কাশীরাম দাস
Wikipedia



0 comments: