প্রচ্ছদ নিবন্ধ - হিন্দোল ভট্টাচার্য
Posted in প্রচ্ছদ নিবন্ধআমি রাজনীতি নিয়ে লিখতে বসিনি কোনোদিনই এইভাবে—অন্তত এমন এক তীব্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে নয়। আমার কাছে রাজনীতি ছিল দূরের এক মঞ্চ, যেখানে বক্তৃতা হয়, বিতর্ক হয়, মতভেদ হয়—কিন্তু সেইসব যেন আমার দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে না। আমি আমার মতো করে লিখি, পড়ি, মানুষের সঙ্গে মিশি, কবিতার শব্দে, গল্পের শরীরে মানবিকতার ছোট ছোট আলো খুঁজি। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, সেই আলোটুকু কেবল ম্লানই হয়নি—তার উপর যেন ইচ্ছাকৃতভাবে ধুলো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আমি এখন খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি—এই যে ভোটের ঢক্কানিনাদ, এই যে গণতন্ত্রের উৎসব বলে প্রচারিত এক বিশাল আয়োজন—এর ভেতরে কোথাও একটা গভীর, লজ্জাজনক দরদাম চলছে। মানুষের সম্মানকে এখানে মুদ্রা বানানো হয়েছে। প্রতিশ্রুতিগুলো আর স্বপ্ন নয়, সেগুলো হয়ে উঠেছে লেনদেনের ভাষা। যেন আমার জীবন, আমার দুঃখ, আমার অভাব—সবকিছুই একটা দর কষাকষির টেবিলে তুলে রাখা।
আমি শুনি—“রাস্তা করে দেব”, “চাকরি দেব”, “বাড়ি করে দেব”—এইসব প্রতিশ্রুতির শব্দগুলো এখন আমার কানে আর আশ্বাসের মতো শোনায় না। বরং মনে হয়, যেন কেউ আমাকে কিনতে চাইছে। আমার ভোট, আমার বিশ্বাস, আমার অস্তিত্ব—সবকিছুর একটা দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি সেই লাইনে—গরমে, ধুলোয়, অস্বস্তিতে—আর ভাবি, এই যে আমি, একজন মানুষ হিসেবে আমার যে সম্মান, তা কি সত্যিই এত সস্তা? আমার পাঁচ বছরের জীবন কি একটি বোতামের চাপে মাপা যায়? আমি কি কেবল একটি আঙুলে কালি লাগানোর মুহূর্ত?
আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল, এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আমরা “উৎসব” বলে উদ্যাপন করি। কী ভয়ঙ্কর শ্লেষ লুকিয়ে আছে এই শব্দটার মধ্যে! উৎসব—যেখানে আনন্দ থাকে, সমতা থাকে, সম্মান থাকে। অথচ এই তথাকথিত উৎসবের ভেতরে আমি দেখি অসমতা, দেখি প্রলোভন, দেখি অপমানের সূক্ষ্ম বিনিময়।
আমি দেখেছি, কীভাবে মানুষকে আলাদা আলাদা দলে ভাগ করা হয়—ধর্মের ভিত্তিতে, ভাষার ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে। তারপর প্রতিটি দলকে আলাদা আলাদা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যেন আমরা সবাই মানুষ নই—আমরা সবাই আলাদা আলাদা ‘টার্গেট গ্রুপ’। আমাদের দুঃখ, আমাদের চাহিদা—সবকিছু বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, মাপা হচ্ছে, তারপর তার উপর ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক কৌশল।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা হারিয়ে যাচ্ছে, তা হল মানুষের প্রতি সম্মান। আমি আর একজন নাগরিক নই—আমি একজন ভোটার। আর এই “ভোটার” পরিচয়ের ভেতরে আমার সমস্ত মানবিক পরিচয় যেন মুছে যাচ্ছে।
আমি বুঝতে পারি, আমাকে বোঝানো হচ্ছে—এই ব্যবস্থাটাই আমার স্বাধীনতা। আমাকে বলা হচ্ছে—“আপনি আপনার প্রতিনিধি বেছে নিচ্ছেন।” কিন্তু আমি যখন দেখি, সেই প্রতিনিধি নির্বাচনের পর আমাকে আর মনে রাখে না, তখন আমার মনে হয়, আমি কি সত্যিই কাউকে বেছে নিচ্ছি, না কি আমি নিজেই বেছে নেওয়া হচ্ছি—একটি ব্যবস্থার দ্বারা, যা আমাকে ব্যবহার করতে চায়?
আর এই ব্যবহারটাই সবচেয়ে অমানবিক। কারণ এটি খুব সূক্ষ্ম, খুব পরিকল্পিত। এটি সরাসরি আঘাত করে না—এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। আমার আত্মসম্মানকে, আমার ভাবনাকে, আমার বিশ্বাসকে।
আমি মাঝে মাঝে খুব তীক্ষ্ণ এক রকমের শ্লেষ অনুভব করি—যখন দেখি, ভোটের আগে আমাকে সম্মান করা হচ্ছে, আর ভোটের পরে আমাকে ভুলে যাওয়া হচ্ছে। তখন মনে হয়, এই সম্মানটা আসলে সম্মান নয়—এটি একটি অভিনয়। একটি প্রয়োজনীয় অভিনয়, যা আমাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য করা হয়।
আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি—আমি কি এই অভিনয়ের অংশ? আমি কি এই ভণ্ডামিকে মেনে নিচ্ছি? আমার নীরবতা কি এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। কারণ আমি জানি, আমি একা নই। আমার মতো আরও অসংখ্য মানুষ আছে, যারা এইসব অনুভব করে, কিন্তু হয়তো প্রকাশ করতে পারে না। অথবা করে না—কারণ ভয় আছে, ক্লান্তি আছে, অথবা হয়তো এক ধরনের অভ্যেস তৈরি হয়ে গেছে।
এই অভ্যেসটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। যখন আমরা অমানবিকতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করি, তখন আমরা আর তার বিরুদ্ধে দাঁড়াই না। তখন আমরা কেবল বেঁচে থাকি—কিন্তু মানুষ হিসেবে নয়, একটি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে।
আমি এই অবস্থাকে মেনে নিতে পারি না। আমি চাই, আমার কণ্ঠস্বর থাকুক—যত ক্ষুদ্রই হোক। আমি চাই, আমি বলতে পারি—এই যে ভোটের নামে, গণতন্ত্রের নামে, যে দরদাম চলছে, তা আমি মেনে নিচ্ছি না।
আমি চাই, আমি মনে রাখতে পারি—আমি কেবল একজন ভোটার নই, আমি একজন মানুষ। আমার সম্মান আছে, আমার ভাবনা আছে, আমার অনুভূতি আছে।
আর এই স্মৃতিটুকুই হয়তো আমার সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
কারণ যতদিন আমি নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে পারব, ততদিন এই অমানবিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ দখল সম্ভব নয়।
আমি জানি, এই লড়াই খুব ছোট—প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু তবুও, এই ছোট ছোট প্রতিরোধই হয়তো একদিন বড় হয়ে উঠবে।
হয়তো একদিন, এই ঢক্কানিনাদের শব্দের ভেতর থেকে সত্যিকারের মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যাবে—যেখানে প্রতিশ্রুতি নয়, সম্মান থাকবে; যেখানে ভয় নয়, বিশ্বাস থাকবে; যেখানে রাজনীতি নয়, মানুষ প্রধান হয়ে উঠবে।
সেই দিনের অপেক্ষাতেই আমি লিখে যাই—নিজের মতো করে, নিজের ভাষায়, নিজের ক্ষুদ্র অথচ অদম্য মানবিকতার পক্ষে।



0 comments: